বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

জলাঞ্জলি
‘জলাঞ্জলি’ শব্দের অর্থ বিসর্জন, অপচয়, সম্পূর্ণ পরিত্যাগ প্রভৃতি। ‘জল’ ও ‘অঞ্জল’ শব্দ হতে জলাঞ্জলি শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ হলো আঁজলাপূর্ণ জল। দুই হাত মোনাজাতের আকৃতি করে জলে ডুবিয়ে যে পরিমাণ জল তোলা যায় সে পরিমাণ জল হচ্ছে জলাঞ্জলি। তবে জলাঞ্জলি শব্দের আভিধানিক অর্থ পরিত্যাগ, বিসর্জন। যেমন তিনি শান্তির জন্য সহায়সম্পত্তি জলাঞ্জলি দিয়ে গ্রাম ছেড়েছেন। আবার খারাপ অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন মদ আর মহিলায় তিনি সকল সম্পত্তি জলাঞ্জলি দিয়েছেন। এবার দেখা যাক, শব্দটির অর্থ এমন হলো কেন। হিন্দুধর্মে শবকে দাহ করা হয়। শবদাহ-কার্যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মীয় পদ্ধতি ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে পালন করা হয়। শবদাহ প্রক্রিয়ার একবারে শেষ ধাপ হচ্ছে অঞ্জলি নিক্ষেপ। শবদাহ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মৃতের আত্মার শান্তি ও চিতা নেভানোর স্মারক হিসাবে এক অঞ্জলি জল হিন্দু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় চিতায় নিক্ষেপ করা হয়। অঞ্জলি প্রদানের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ স্বজন তাঁর প্রিয় মানুষটিকে চিরতরে পরিত্যাগ করে চলে আসেন। ধর্মীয় এ করুণ আনুষ্ঠানিকতা হতে বাংলা ‘জলাঞ্জলি’ এমন হৃদয়বিদারক অর্থ ধারণ করেছে।

জাঁদরেল
‘জাঁদরেল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ জবরদস্ত্, নামডাকওয়লা, জমকালো, মস্তবড়, বিখ্যাত, খ্যাতিমান প্রভৃতি। সামরিক বাহিনীর পদবি ইংরেজি শব্দ ‘জেনারেল (এবহবৎধষ)’ হতে বাংলা ‘জাঁদরেল’ শব্দের উৎপত্তি। জাঁদরেল বাংলা ভাষায় যতই জবরদস্ত্ হোক না কেন, এটা কিন্তু বাংলা শব্দ নয়। শব্দটি ইংরেজি ‘জেনারেল’ শব্দ হতে হিন্দি ভাষায় অতিথি হয়ে এসে পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় ঢুকেছে। ইংরেজ আমলে ‘জেনারেল’ ছিলেন সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত ক্ষমতাধর অফিসার। বেসামরিক অফিসারসহ সবখানে তাঁর দাপট ছিল অপ্রতিরোধ্য। জমকালো পোশাকে আচ্ছাদিত জেনারেল যখন তার অনুগত বাহিনী নিয়ে কুচকাওয়াজ করতেন তখন সাধারণ লোকজন হতবাক হয়ে দেখতেন। সৈন্যরা যখন জেনারেলকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিতেন, তা ছিল আরও ক্ষমতার চিহ্ন। সাধারণ কাজেও তাঁর ক্ষমতার দাপট সর্বজনবিদিত ছিল। জেনারেল-এর ক্ষমতার দাপট ও জমকালো পোশাকের জবরদস্ত্ চেহারা বাংলায় ‘জাঁদরেল’ হয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। এখনও সামরিক বাহিনীর কোনো জেনারেল কম জাঁদরেল নয়।

জিত-বিজিত
‘জিত’ এবং ‘বিজিত’ যদি বিপরীতার্থক হয়ে থাকে তবে, ‘জয়’ আর ‘বিজয়’ সমার্থক কীভাবে হয়? হতে পারে এটাই শব্দের এবং ভাষার বৈচিত্র্য। ‘বিজয়’ শব্দটি ‘বি’ উপসর্গ যোগে গঠিত। বিশেষভাবে জয়লাভ করাই হচ্ছে বিজয়। ‘বি’ উপসর্গ নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন গতি, বিরূপতা, বিশেষ, অভাব, বিপরীত, অবস্থানরত প্রভৃতি অর্থে বাংলায় ‘বি’ উপসর্গ ব্যবহার হয়ে থাকে। এখানে ‘বিজয়’ শব্দে ‘বি’ উপসর্গটি ‘বিশেষ’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়েছে।

জিলিপি
প্যাঁচবিশিষ্ট প্রায় গোলাকার একধরনের মিঠাই। এটি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। প্রত্যন্ত গ্রাম হতে রাজধানীর বস্তি পর্যন্ত সর্বত্র জিলিপির প্রবল চাহিদা ও জিহ্বাপ্রিয়তা রয়েছে। উপমহাদেশের সর্বত্র জিলিপি পাওয়া যায়। তবে জিলিপি ও তার নামের উৎপত্তি বাংলাদেশে নয়। হিন্দি ‘জলেবি’ শব্দ থেকে বাংলা ‘জিলিপি’ শব্দের উৎপত্তি। অন্যদিকে ফারসি ‘জলব’ থেকে হিন্দি ‘জলেবি’ শব্দের সৃষ্টি। তার মানে ‘জলব’ শব্দটি ফারসি হতে হিন্দিতে এবং হিন্দি হতে বাংলাদেশে এসে জিলিপি হয়ে গেছে। ফারসি ‘জলব’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘গোল হতে হতে’ বা ‘পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চলতে থাকা’। জিলিপির প্রস্তুত প্রক্রিয়ার সঙ্গে গোল হতে হতে বা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চলতে থাকা বাগ্্ভঙ্গির কার্যপ্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে জড়িত। কাপড়ের ছোট পুঁটলিতে জিলিপির উপকরণ নিয়ে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ও পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কড়াইয়ের তপ্ত তেলে ঢেলে জিলিপি তৈরি করা হয়। বিচিত্র প্যাঁচের এ মিঠাইটি তৈরির এ প্যাঁচালো পদ্ধতির জন্য এর নাম হয়েছে ‘জিলিপি’।

জুজুৎসু
‘জুজুৎসু’ জাপানি শব্দ। তবে এখন শব্দটি বাংলাতেও বহুল প্রচলিত। বাংলা একাডেমির ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ এর অর্থ দেওয়া হয়েছ : জাপান- দেশীয় মল্লবিদ্যাবিশেষ, কুস্তির প্যাঁচবিশেষ। ‘জুজুৎসু’ জাপানে অতি জনপ্রিয় একটি শারীরিক কসরৎ ও শক্তিপ্রদর্শনজনিত কুস্তির নাম। জাপানি ‘জু’ শব্দের অর্থ মৃদু এবং ‘জুৎসু’ শব্দের অর্থ কৌশল। সুতরাং ‘জুজুৎসু’ শব্দের অর্থ মৃদুকৌশল। এ হিসাবে ‘জুজুৎসু’ শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো : মৃদু কৌশলের মাধ্যমে শক্তিসাধ্য কাজ সম্পন্ন করা।

জের
‘জের’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ রেশ, সংক্রমণ, অনুবৃত্তি প্রভৃতি। ‘জের’ ফারসি শব্দ। ফারসি ভাষায় ‘জের’ শব্দটির অর্থ নিচে, নিচ, নিম্ন, অধঃ প্রভৃতি। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘জের’ শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘ইজা’। এটিও ফারসি শব্দ। তবে ফারসি ভাষায় ‘ইজা’ শব্দের অর্থ ‘জের’ নয়। ফারসি ভাষায় ‘ইজা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে : আরও, অধিকন্তু, এতদ্ব্যতীত, এছাড়া প্রভৃতি। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হিসাবের ‘ইজা’ বা ‘জের’ শব্দের সঙ্গে ফারসি ভাষার ইজা বা জের-এর সরাসরি কোনো মিল নেই। তবে হিসাবের খাতায় যখন ইজা বা জের লেখা হয় তখন বোঝা যায় আরও কিছু আছে যা ফারসি ‘জের’ বা ‘ইজা’ শব্দের মূল অর্থকে ইঙ্গিত করে। অতএব ফারসি হতে বাংলায় এলেও শব্দ-দুটো তাদের অস্তিত্বকে পুরোপুরি বিসর্জন দেয়নি।
মূলত ‘জের’ শব্দটি হিসাবের খাতায় বেশি ব্যবহৃত হয়। শব্দটির সাধারণ অর্থ হচ্ছে পূর্বের পাতার শেষ না-হওয়া হিসাব পরের পাতায় ওঠানো। যাকে সাধারণভাবে জের-টানা বলা হয়। ‘জের’ শব্দটি এখন শুধু হিসাবের খাতায় ব্যবহৃত হয় তা নয়; কৃতকর্মের পরিণাম, ভুলের মাসুল প্রভৃতি ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় : তোমার এ অপরিণামদর্শিতার জের তোমাকেই টানতে হবে।

জেরবার
ফারসি ‘জের-ই-বার’ শব্দ থেকে বাংলা ‘জেরবার’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ‘জের’ মানে নিচে এবং ‘বার’ মানে বোঝা। সুতরাং ‘জেরবার’ মানে বোঝার নিচে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত। যিনি বোঝার নিচে থাকেন তিনি পর্যুদস্ত না-হয়ে থাকতে পারেন না।

জ্বালাতন
আরবি ‘জালা-ওয়তন’ শব্দ থেকে ‘জ্বালাতন’ শব্দের উৎপত্তি। আরবি ‘জালা’ শব্দের অর্থ নির্বাসন এবং ‘ওয়তন’ শব্দের অর্থ দেশ। সুতরাং ‘জালাতন’ শব্দের অর্থ ‘দেশ থেকে নির্বাসন’। দেশ থেকে নির্বাসনের মতো কষ্ট খুব কমই আছে। যাকে দেশ থেকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে সে জানে এটি কত কষ্টের। আসলেই নির্বাসন খুবই দুঃখজনক এবং অন্তরে আগুন জ্বলার মতো কষ্ট দেয়। তাই জালা-য়তন = জালাতন শব্দটি বাংলায় এসে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে জ্বালাতন রূপ ধারণ করেছে। যার অর্থ পীড়ন। এই পীড়নের অর্থকে সার্থক করে তোলার জন্য ‘জলা’ হয়ে উঠেছে ‘জ্বালা’।

ঝটিকা-সফর
‘ঝটিকা-সফর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হঠাৎ ভ্রমণ, আকস্মিক যাত্রা, পূর্ব-ঘোষণা ছাড়া কোথাও যাত্রা বিরতি বা পরিদর্শন, হঠাৎ অল্পসময়ের জন্য কোথাও এসে অল্পক্ষণ অবস্থান করে আবার চলে যাওয়া, পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া কোথাও অল্পসময়ের জন্য যাত্রাবিরতি প্রভৃতি। ‘ঝটিকা’ ও ‘সফর’ শব্দের মিলনে ‘ঝটিকা-সফর’ শব্দের উৎপত্তি। ‘ঝটিকা’ সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ ঝড়, বাত্যা, ঘূর্ণিবায়ু প্রভৃতি। ‘সফর’ আরবি শব্দ, এর অর্থ ভ্রমণ, দেশ পর্যটন, যাত্রা প্রভৃতি। ঝটিকা বা ঝড় কোনোরূপ পূর্ব-ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ এসে হঠাৎ চলে যায়। তেমনি কোনো ব্যক্তিবিশেষের এমন পূর্ব-ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ কোথাও ভ্রমণ বা যাত্রাবিরতিকে ‘ঝটিকা-সফর’ বাগ্ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!