বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

অভিমান
অভিমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : আত্মীয়স্বজন কিংবা যেকোনো প্রিয়জনের অবজ্ঞা বা অবহেলাজনিত মনোবেদনা। আপনজন যত ঘনিষ্ঠ হয় মনোবেদনা তত অধিক ও তত জটিল হয়। সংগতকারণে মনোবেদনার প্রতিক্রিয়াও তত বেশি হয়। অতি ঘনিষ্ঠ ও গভীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামান্য কারণেও মনোবেদনা প্রবল হয়ে উঠতে পারে। এ মনোবেদনার কারণে অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলে। তবে ‘অভিমান’ শব্দের আদি অর্থ এমন ছিল না। শব্দটির আদি অর্থ হলো নিজের প্রতি মান, এমন ভাব। এ ভাব বা চেতনা থেকে শব্দের মূল অর্থ হয়ে দাঁড়ায় আত্মসম্মান, গৌরব, মান, অহঙ্কার প্রভৃতি। কোনো মানুষের মনে যখন এরূপ বোধের কারণে বঞ্চনার ভাব জাগে এবং বঞ্চনাটা যখন আসে প্রিয়জন হতে তখন হৃদয়-মন সত্যিকার অভিমানে ফুঁসে ওঠে। হিন্দি ভাষাতেও ‘অভিমান’ আছে এবং বাংলার মতো একই অর্থ বহন করে।

অভিসম্পাত
এর আভিধানিক অর্থ : অভিশাপ, শাপ, বদদোয়া প্রভৃতি। পুরাণ যুগে অভিসম্পাতে পরিমাণ ও কারণ ছিল যেমন ঘন তেমনি মজার ও বিস্ময়কর। অভিসম্পাত সং¯ৃ‹ত হতে আগত একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় শব্দটির অর্থ : যুদ্ধ, যুদ্ধের জন্য পরস্পর আগুয়ান, যুদ্ধের জন্য পরস্পর মুখোমুখি হওয়া ইত্যাদি। তবে বাংলায় এসে শব্দটি মূল অর্থ হারিয়ে অন্য অর্থ ধারণ করেছে। অন্য অর্থ ধারণ করলেও সংস্কৃত ‘অভিসম্পাত’ এর অর্থের সঙ্গে বাংলা ‘অভিসম্পাত’ এর দারুণ মিল রয়েছে। যুদ্ধ বা যুদ্ধের জন্য পরস্পর মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে বড় অভিশাপ আর নেই। অভিশাপ মানে অশান্তির জন্য প্রার্থনা; যে অভিশাপ দেয়, সে যাকে অভিশাপ দেয় তার চরম ক্ষতি কামনা করে। যুদ্ধও এমন, পরস্পর পরস্পরকে ধ্বংস করা বা ক্ষতিগ্রস্ত করাই যুদ্ধের কাজ। যা অভিসম্পাতের অনুরূপ।

অভ্যর্থনা
‘অভ্যর্থনা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ সমাদরে আহ্বান ও গ্রহণ। এটি সংস্কৃত হতে বাংলায় এসেছে। সংস্কৃত ভাষায় শব্দটির অর্থ ছিল প্রার্থনা করা, চাওয়া, আবেদন করা প্রভৃতি। তবে বাংলায় এসে শব্দটি তার অর্থ পরিবর্তন করে সমাদরে আহ্বান বা সম্মানের সঙ্গে আহ্বান প্রভৃতি অর্থ ধারণ করেছে। কেন এমন হলো বা এমন হওয়ার কোনো কারণ আছে কিনা দেখা যাক। প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান, অর্থশালী কিংবা বিভিন্ন কারণে মর্যাদাবান ব্যক্তিদের কাছে সংস্কৃত ভাষায় অভ্যর্থনা তথা প্রার্থনা করা হতো কিংবা কিছু চাওয়া হতো। যার বা যাদের নিকট থেকে কিছু চাওয়া হতো তাকে বা তাদেরকে সাদরে ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হতো, এটাই ছিল রেওয়াজ। সমাদর না করলে দেবেনই-বা কেন। যত বেশি সমাদর, তত বেশি প্রার্থনা পূরণ।
সংস্কৃতের এ কার্যটি বাংলায় এসে প্রার্থনা বা আবেদেনের পরিবর্তে ‘সমাদরে আহ্বান’ কথায় পরিণত হয়। বাংলায় যাকে অভ্যর্থনা করা হয় তার কাছ থেকে অভ্যর্থনা-প্রদানকারীদের কিছু না কিছু চাওয়ার থাকে। তাই সংস্কৃত অভ্যর্থনা বাংলায় এসে অর্থকে পরিবর্তন করে কার্যকরণগত ও উদ্দেশ্যগত উভয় দিককে একাকার করে দিয়েছে। এখন অভ্যর্থনার আড়ালে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কিছু না কিছু পাওয়ার থাকে।

অভ্যুত্থান
‘অভ্যুত্থান’ বাংলা ভাষায় পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি রাজনীতিক শব্দ। মূলত রাষ্ট্রীয় রাজনীতিক ক্ষমতাবদলের ধরন বোঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অভ্যুত্থান শব্দের মূল ও আদি অর্থ কাউকে সম্মান প্রদানের জন্য আসন থেকে উঠা বা উন্নত, উদ্গত হওয়া, অভ্যুত্থিত হওয়া প্রভৃতি। তবে শব্দটি এখন তার মূল অর্থ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। এখন অভ্যুত্থান বলতে জোরপূর্বক কাউকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। বাংলার বর্তমান ‘অভ্যুত্থান’ কাউকে সম্মান জানাবার জন্য আসন থেকে উঠে দাঁড়ানো নয়, বরং নিজে সম্মানিত হওয়ার জন্য, ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য অন্যকে আসন থেকে জোরপূর্বক তুলে দিয়ে নিজেই সে আসনে আসীন হওয়া।

অমরকণ্টক
বিন্ধ্য পর্বতের পূর্বদিকের একটি বিখ্যাত সমতলভূমি। এটি হিন্দুদের একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান। হিন্দুদের বিশ্বাস এ তীর্থস্থানে গেলে পুণ্য অর্জিত হয়। দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন লাভের জন্য অমরকণ্টকে গমনের কোনো বিকল্প নেই।

অমরাবতী
‘অমরাবতী’ ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একটি বিখ্যাত স্থান। ইন্দ্রের আলয় ও রাজধানী ছিল অমরাবতী। নগরটি বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেন। এটি ছিল সুমেরু পর্বতের উপর অবস্থিত দেবতাদের বাসভূমি। এখানে শোক, তাপ, জরা, মৃত্যু কিছু নেই। তাই এর নাম অমরাবতী। স্বর্গগঙ্গা নামে পরিচিত অলকানন্দা এ নগরীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

অমৃত
‘অমৃত’ শব্দটি শুনলে জেগে থাকার মধ্যেও একধরনের স্বপ্নিল অনুভূতিতে মনটা ভরে ওঠে। ‘অমৃত’ ভারতীয় পুরাণের একটি অতি উত্তম, পবিত্র ও বহুবিধ গুণধারী একটি মহামূল্যবান পানীয়। সুধা, পীযূষ ও জীবন-বারি, যা দেবতাগণ পান করে অমর হয়েছেন। হোমের সময় যে সব জিনিস অর্পণ করা হতো তাদের নাম ছিল অমৃত। সোমরসকে অমৃত বলা হতো। অমৃতের নির্ঝর ও পীযূষ নামে এ সোমরস খ্যাত ছিল। মহাভারত মতে, সমুদ্র মন্থনের ফলে এ অমৃত উৎপন্ন হয়েছিল।

অযোনিসম্ভবা
অযোনি হতে সম্ভব অর্থাৎ যোনি ব্যতীত সৃষ্ট যে বা যারা, সে বা তারাই অযোনিসম্ভবা। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের পুত্রেষ্টিযজ্ঞকালে যজ্ঞীয় অগ্নি হতে দ্রৌপদীর জন্ম হয়েছিল। তাই দ্রৌপদীকে অযোনিসম্ভবা বলা হয়।

অরণ্য
‘অরণ্য’ শব্দের অর্থ গভীর বন, জঙ্গল, কানন। অরণ্যের মতো ‘অরণ্য’ শব্দের ব্যুৎপত্তিও রহস্যময়। ‘অরমমান’ শব্দ থেকে অরণ্য শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীন ভারতে অনেকে গুরুগৃহে শিক্ষা গ্রহণ সমাপ্ত করে বাড়ি ফিরতেন না। তাঁরা চিরকুমার-ব্রহ্মচারী হয়ে সংসার ও নারীসঙ্গ বর্জন করে অধ্যাত্মবিদ্যার অনুশীলন করতেন। অনেকে অধ্যাত্মসাধনার জন্য বনে বসবাস করতেন। তাদের ‘অরমমান’ বলা হতো। সাধারণ্যে অরমমানগণ ‘অরণ’ নামে পরিচিত ছিল। মূলত এ অরণ শব্দ থেকে অরণ্য শব্দের উৎপত্তি।

অরণ্যে রোদন
এটি একটি জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত বাগ্ধারা। অরণ্যে রোদন বাগ্ভঙ্গির অর্থ নিষ্ফল আবেদন। অরণ্য শব্দের অর্থ গভীর বন। রোদন বলতে এখানে কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় আবেদন বা আকুতি বোঝানো হয়েছে। তৎকালে গভীর বন ছিল প্রকৃত অর্থে জনশূন্য। জনশূন্য বনে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য ক্রন্দন করলেও কেউ শোনার বা সাড়া দেওয়ার থাকত না। ফলে সকল প্রত্যাশা, আবেদন, আকুতি, ক্রন্দন বা আবেদন নিষ্ফল হয়ে যেত। এ ধারণা থেকে বাগ্ধারাটির উৎপত্তি।
অরুণ
অরুণ শব্দের আভিধানিক অর্থ সূর্য। শব্দটির উৎপত্তির সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের একটি কাহিনির সংস্রব রয়েছে। বিনতার প্রসূত ডিম দীর্ঘদিনেও বিদীর্ণ হচ্ছিল না। অথচ সপত্নী কদ্রুর সন্তানগণ দিন দিন বেড়ে উঠছিল দেখে বিনতা ক্ষুব্ধ হয়ে অকালে তাঁর ডিম্ব বিদীর্ণ করে ফেলেন। এ ডিম্ব হতে ঊরুহীন অবস্থায় এক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় অরুণ। ঊরুহীন ছিল বলে তিনি অন্ধরু বা ঊরুহীন নামে খ্যাতি পান। অরুণ সূর্যের সারথিরূপে সপ্ত অশ্বযুক্ত রথ চালনা করতেন। সূর্যের সারথি হিসাবে অরুণ শব্দটি বাংলায় ‘সূর্য’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা হয়।

অর্ধচন্দ্র
‘অর্ধ ও চন্দ্র’ মিলে অর্ধচন্দ্র। এর ব্যাকরণগত অর্থ হয় চাঁদের অর্ধাংশ। কিন্তু ‘অর্ধচন্দ্র’ বলতে চাঁদের অর্ধাংশ বোঝায় না। বহুল প্রচলিত এ শব্দটির আভিধানিক অর্থ গলাধাক্কা। গলাধাক্কা বিভিন্নভাবে দেওয়া যায়। কিন্তু মানুষ সাধারণত হাত দিয়ে গলাধাক্কা দেয়। তা হলে গলাধাক্কার সঙ্গে অর্ধেক চন্দ্র এলো কীভাবে? অর্ধচন্দ্র শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হলো অর্ধেক চাঁদ, বা অর্ধ-উদিত চাঁদ। কাউকে গলাধাক্কা দিতে হলে হাতের আকৃতিকে যেভাবে সাজাতে হয় তা অনেকটা অর্ধচন্দ্রের ন্যায় অর্ধবৃত্তাকার। হাতকে অর্ধচন্দ্রাকৃতি করে গলাধাক্কা দেওয়ার প্রচলিত কার্য থেকে ‘অর্ধচন্দ্র’ শব্দটির অর্থ হয়ে যায় গলাধাক্কা। বাঙালি কীভাবে আকাশের অর্ধচন্দ্রকে নিজের হাতের সঙ্গে রূপায়ন করে অন্যকে ধাক্কা দেওয়ার কাজে মিলিয়ে দিয়েছে।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!