বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

ত্রয়োদশ অধ্যায়
ট ঠ ড ঢ

টানাপড়েন
‘টানাপড়েন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ পুনঃপুন ক্লান্তিকর কোনো কিছুর মধ্যে ঝুলে থাকা, সংকটের মধ্যে থাকা। বস্তুত কাপড় বোনার তাঁত ও এর একটি নিপুণ কার্যক্রম থেকে টানাপড়েন শব্দটির উৎপত্তি। তাঁতের ফ্রেমে বাঁধা দৈর্ঘ্যরে সুতোকে বলে ‘টানা’ এবং প্রস্থের সুতোকে বলে ‘পড়েন’। পড়েনের সুতো মাকুতে জড়ানো থাকে। তাঁতির হাতের দক্ষ সঞ্চালনে মাকু এদিক-ওদিক যাওয়া-আসা করতে করতে কাপড় বোনার কাজ চলতে থাকে। তবে কাজটি সহজ নয়। তাঁতি দক্ষ হাতের নিপুণ টানের অপূর্ব কৌশলে মাকুর পড়েন-সুতো তাঁতের টান-এর সুতোর সঙ্গে গেঁথে দিতে থাকে। টানা ও পড়েনের গ্রন্থনই হচ্ছে কাপড় বোনা। টানা-পড়েনের সুতোয় সামান্য এদিক-ওদিক হলে কাপড় বোনা বন্ধ করে দিতে হয়। তাই কাজটি শুধু বিরক্তিকর নয়, কষ্টকরও বটে। টানা সুতোর সঙ্গে পড়েনের সুতোর একঘেয়েমি শব্দ ক্লান্তিরকরভাবে অনবরত একই কাজ করে যাওয়ার বিষয়কে জীবনযাত্রার টানাপড়েন অর্থে ব্যবহার করা হয়।

টিটকারি
‘টিটকারি’ একটি মর্মবিদারক শব্দ। প্রাচীন এ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ঠাট্টা, উপহাস, ধিক্কার, বিদ্রƒপ, অশালীন মন্তব্য, অপমানজনক শব্দ প্রভৃতি। কোনো শব্দ যা অন্য কাউকে হেয় বা অপমানিত করার জন্য কিংবা উপহাস, ধিক্কার বা বিদ্রƒপ হানার জন্য করা হয় তা-ই ‘টিটকারি’। টিটকারির শব্দ কেবল মুখ দিয়ে বের হয় তা কিন্তু নয়, এটি নাক, হাতের আঙুল বা অন্য কোনোভাবেও হতে পারে। রাখাল বা চাষির গৃহপালিত পশু তাড়নোর চিরায়ত শব্দ থেকে ‘টিটকারি’ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। পশু তাড়ানোর সময় রাখাল বিভিন্ন শব্দ করে। বিশেষ করে জমি চাষের সময় পশুকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণের জন্য চাষি মুখে টিট-টিট শব্দ করে। এ টিট-টিট শব্দ থেকে টিটকারি শব্দটির উৎপত্তি। পশুকে টিটকারি দিলে পশু লজ্জা পায় কিনা বোঝা যায় না কিন্তু ঠিক পথে এগিয়ে যায়। তবে মানুষকে টিটকারি দিলে লজ্জায় কুণ্ঠিত হয়ে পড়ে, রাগে ফুলে ওঠে। টিটকারির আবার বিভিন্ন মাত্রা ও পরিমাত্রা আছে। মশ্করা সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে টিটকারি লজ্জার হলেও বহুলাংশে গ্রহণযোগ্য। দুলাভাই ও শালা-শালী কিংবা দাদা ও নাতি-নাতনির মধ্যে টিটকারি একটা পর্যায় পর্যন্ত অম্লমধুর বলা যায়। তবে অন্যক্ষেত্রে তা ভীষণ মর্মঘাতী। কখনো কখনো টিটকারির আঘাত শারীরিক আঘাতের চেয়েও জঘন্য হয়ে যেতে পারে। সম্পর্ক ছাড়াও লিঙ্গবিশেষে টিটকারির প্রতিক্রিয়া ভয়ানক। একই টিটকারি সমলিঙ্গে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, বিপরীত লিঙ্গ হলে তা সাংঘাতিক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। একজন ছেলে আর-একজন ছেলেকে যে টিটকারি দিয়ে উপহাস করার চেষ্টা করে সেই একই টিটকারি যদি একজন মেয়েকে দেওয়া হয় তা হলে ফল হয়ে যেতে পারে মারাত্মক।

টিপ্পনী
শব্দটির আভিধানিক অর্থ ফোড়ন-কাটা, বিরূপ মন্তব্য করা, অশালীন উক্তি করা, আলোচনায় বিদ্রƒপাত্মক বাক্য ব্যবহার, কথাবার্তায় মনঃকষ্টদায়ক মন্তব্য প্রভৃতি। এ ছাড়া বাংলা ভাষায় আর একটা টিপ্পনী আছে। সেটি হচ্ছে টীকা-টিপ্পনী। কোনো পাণ্ডুলিপি বা গ্রন্থের জন্য টীকা-টিপ্পনী অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। এ টীকা-টিপ্পনী বাগ্ভঙ্গি থেকে টিপ্পনী শব্দের উৎপত্তি। টীকা শব্দের অর্থ হচ্ছে দুরূহ ও জটিল শব্দের ব্যাখ্যা এবং টিপ্পনী হচ্ছে টীকার ব্যাখ্যা। সুতরাং উভয় শব্দ প্রায় সমার্থক বলা যায়। এ জন্য টিপ্পনী শব্দটি টীকা অর্থেও ব্যবহার করা হয়। টিপ্পনী দ্বারা গ্রন্থে দুরূহ ও জটিল শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। পাণ্ডুলিপিতে এ ব্যাখ্যা শোভনীয় ও আবশ্যক হলেও আলোচনা বা কথাবার্তায় এটি শোভনীয় না-ও হতে পারে। কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত কথা বললে শ্রোতৃবর্গের অনেকের মধ্যে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হতে পারে। তাই তাঁরা এরূপ অতিরিক্ত কথা বা টীকার ব্যাখ্যা বা টিপ্পনীকে বিরূপ মন্তব্য বা অশালীন উক্তি হিসাবে ধরে নিতে পারেন। অধিকন্তু মানুষ নানাক্ষেত্রে খুব স্পর্শকাতর হয়। একজনের কাছে যে কথা স্বাভাবিক ও শোভনীয় তা অন্যের কাছে মনঃকষ্টের হতে পারে। তাই আলোচনা বা কথাবার্তায় অতিকথন তথা ব্যাখ্যাকে বিরূপ বা অশালীন মন্তব্য গণ্য করা হয়। গুরুগৃহ থেকে টিপ্পনী শব্দটি এমন কষ্টকর অর্থ ধারণ করে। গুরুগণ তাঁদের পাণ্ডুলিপি বা গ্রন্থে অসংখ্য টিপ্পনী দিলেও শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে কোনো টিপ্পনী শুনতে আগ্রহী ছিলেন না। কোনো শিক্ষার্থী এরূপ টিপ্পনী দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে অশালীন, বিদ্রƒপ বা বিরূপ মন্তব্য বলে থামিয়ে দেওয়া হতো। মূলত এ কারণে পাণ্ডুলিপির আবশ্যক ব্যাখ্যাময় টিপ্পনী কথাটি বাঙালির বাগ্ভঙ্গিতে এসে ফোড়ন-কাটা, বিরূপ মন্তব্য করা, অশালীন উক্তি করা, আলোচনায় বিদ্রƒপাত্মক বাক্য ব্যবহার প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে।

টেক্কা
‘টেক্কা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ অতিক্রম করা, ছাড়িয়ে যাওয়া, টক্কর দেওয়া, পাল্লা দেওয়া, মোকাবেলা করা প্রভৃতি। তাসখেলা গভীর একাগ্রতায় মগ্ন থাকার মতো একটি খেলা। এ তাসখেলা থেকে ‘টেক্কা’ বাগ্্ভঙ্গির উৎপত্তি। যে তাসে একটি ফোঁটা থাকে সেটি হচ্ছে তাসের টেক্কা। তাসখেলায় টেক্কা হচ্ছে ক্ষমতাবান তাস। এটা যে পায় তার জয় বহুলাংশে নিশ্চিত হয়ে যায়। টেক্কা ফেলে পিঠ নেওয়া হলো আসল টেক্কা-মারা। টেক্কা মারলে জয়, টেক্কার এ নিশ্চিত জয়কে বাঙালিরা প্রাত্যহিক জীবনের কথাবার্তায় নিয়ে এসেছে। ‘টেক্কা মেরে’ জয়লাভ করার অর্থ হচ্ছে, অন্যকে কুপোকাত করে নিজের আসন স্থায়ী করে নেওয়া।

ট্যান্ডল
‘ট্যান্ডল’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ অনুচর, চামচা, দালাল। মালয়লাম শব্দ ‘টনডল’ থেকে ট্যান্ডল শব্দের উৎপত্তি। মালয়লাম ভাষায় জাহাজের খালাসিদের সর্দারকে ‘টনডল’ বলা হয়। প্রায় সবখানে এ পদে কর্মরত কর্মচারীগণ মালিকের একান্ত অনুগত লোক হয়। তারা সর্বদা মালিকের পক্ষ নিয়ে কাজ করে এবং নিরীহ শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার করে। ‘টনডল’ পদে সে লোককে নিয়োগ দেওয়া হতো যিনি মালিকের অত্যন্ত অনুগত এবং বিনা বাক্যব্যয়ে মালিকের সব আদেশ-নির্দেশ মেনে নেয়। ‘টনডল’ মালিকের নির্দেশমতো কাজ করত এবং অন্যান্য খালাসিদের ওপর অত্যাচার করত। টনডলের এমন আচরণ থেকে শব্দটি অনুচর, চামচা বা দালাল অর্থ ধারণ করে।

ঠুনকো
‘ঠুনকো’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ভঙ্গুর। যা সহজে ভেঙে যায় তা-ই ঠুনকো। নিম্নমানের সম্পর্ক, চারিত্রিক নিকৃষ্টতা প্রভৃতি অর্থেও শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। ‘ঠুন্’ শব্দ থেকে ঠুনকো বাগ্্ভঙ্গির উৎপত্তি। কাচ, চিনামাটির তৈজসপত্র, কাচের গ্লাস প্রভৃতি পড়ে গেলে ঠুন্ শব্দে ভেঙে যায়। পতনের পর যে সব বস্তু ‘ঠুন্’ শব্দ করে ভেঙে যায় সেগুলো হলো ঠুনকো জিনিস। ‘ঠুন্’ শব্দ হতে পাওয়া ঠুনকো শব্দ এখন শুধু কাচের বা চিনামাটির তৈজসপত্রের জন্য ব্যবহৃত হয় না; যে সব জিনিস সহজে ভেঙে যায়, বা নষ্ট হয়ে যায় সে সব জিনিসের ক্ষেত্রে বাগ্্ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, মানুষের মানবিক অনুভূতির প্রকাশেও ‘ঠুনকো’ শব্দের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। যেমন ঠুনকো ভালবাসা, ঠুনকো সম্মান, ঠুনকো চরিত্র প্রভৃতি।

ঢালাও
‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ বাছবিচার না করে কোনো কিছু করা, বিস্তৃত, প্রশস্ত, নির্বিশেষে, বিবেচনাবোধহীন প্রভৃতি। ‘ঢালা’ ক্রিয়া থেকে ‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ শব্দের উৎপত্তি। ‘ঢালা’ ক্রিয়ার অর্থ পাত্র বা সংরক্ষণ স্থান হতে কোনো কিছু উপড়ে দেওয়া, ছিটিয়ে দেওয়া, বিছিয়ে দেওয়া, ঢেলে দেওয়া বা ছুঁড়ে দেওয়া। গিন্নি শুধু রান্নার পাত্রে তৈল ঢালেন না, মাঝে মাঝে রেগে গেলে তৈলপাত্র উপুড় করে সারা মেঝেয় ঢেলে দিতেও দেখা যায়। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো নিজের ব্যবহারের প্রিয় রূপ-সজ্জার জিনিসপত্রও ঢেলে দেন। প্রথমটি আবেগের, দ্বিতীয়টি রাগের। দুটোই কিন্তু ঢালা। মানুষ যখন কোনো পাত্র হতে কিছু ঢালেন তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশি ঢালুন বা কম ঢালুন কোনটি ঢালবেন বা কোনটি ঢালবেন না তা নিয়ে কোনো বাছবিচার করেন না। অবশ্য ঢালার আগে তা যথার্থভাবে করাও সম্ভব নয়। তাই পাকা ফল পাড়তে গেলে কাঁচা ফলও পড়ে যায়। ঢালার পর প্রয়োজন হলে বাছবিচার শুরু করেন। ব্যবসায়ী বা কৃষক উৎপন্ন ফসল আগে তোলেন, তারপর শুরু করেন বাছাই ভালো-মন্দ, উৎকৃষ্ট-মাঝারি প্রভৃতি শ্রেণিতে বিভক্তকরণ। শস্যদানা থেকে ছিটা বাছা গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন রেওয়াজ। তবে ছিটা বাছার আগে শস্যকে ঢেলে নিতে হয়। ঢালার সময় কোনো বাছবিচার করা হয় না, ভালো-মন্দ নির্বিশেষে পুরোটাই ঢেলে দেওয়া হয়। ঢালার পর শুরু হয় বাছবিচার বা ছিটা বাছার কাজ। রাগের বশে কেউ যখন কোনো বস্তু ঢেলে দেন তখন কোনো বাছবিচার থাকে না। ঢালার পর রাগ কমে গেলে শুরু হয় বোধ, এটি চেতনা বা বাছবিচারের অনুভূতি। তখন আফসোস হয়, ঢেলে দেওয়া বস্তু হতে যতটুকু সম্ভব উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ অনেক সময় ঢালাওভাবে গ্রেফতার করেন। তারপর শুরু করেন বাছবিচার। ঢালার কাজটা বাছবিচারহীনভাবে করা হয়। এ বাছবিচারহীন ‘ঢালা’ থেকে বাংলা বাগ্ভঙ্গি ‘ঢালাও’ বা ‘ঢালাওভাবে’ শব্দের উৎপত্তি।

ঢি ঢি
নিন্দার্থে ব্যবহৃত শব্দটির আভিধানিক অর্থ ব্যাপক জানাজানি। ঢোল ও ঢোলের আওয়াজ থেকে বাগ্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। এটি অব্যয় পদ। ঢেঁড়া এক প্রকার ঢোল। একসময় বাংলাদেশের সর্বত্র এর বহুল প্রচলন ছিল। পেটালে ঢেঁড়া হতে বিকট শব্দে ঢি ঢি ধ্বনি বের হয়ে আসত। চারদিকের লোকজন শুনতে পেত ঢেঁড়া ঢোলের ঢি ঢি আওয়াজ। আগে প্রচারের জন্য এত আধুনিক মাধ্যম ছিল না। জমিদার, রাজা বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কিছু ঘোষণা বা জানান দেওয়ার প্রয়োজন হলে ঢেঁড়া পেটানো হতো। ঢেঁড়ার শব্দে চারদিক হতে লোকজন জড়ো হলে ঘোষক সমবেত লোকদের ঘোষণাটি শুনিয়ে দিত। এভাবে কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অল্পসময়ের মধ্যে লোকমুখে ছাড়িয়ে পড়ত। ঢেঁড়া পিটিয়ে ঢি ঢি শব্দের মাধ্যমে লোকজন জড়ো করে ঘোষণা প্রচারের প্রাচীন রেওয়াজ থেকে ঢি ঢি শব্দটি মানুষের বাগ্্ভঙ্গিতে উঠে আসে। এখন অবশ্য ঘোষণা প্রচারকে ঢি ঢি পড়ে গেছে বলা হয় না। বাগ্্ভঙ্গিটি নিন্দার্থে ব্যবহৃত হয়। কারও বদনাম বা খারাপ কিছু ছড়িয়ে পড়লে, বা খারাপ কিছু ঘটলেই কেবল ঢি ঢি পড়ে। ভালো কোনো কিছুর জন্য ঢি ঢি পড়ে না।

ঢিমেতাল
ধীরগতি, অতি ধীর, মন্থরগতি প্রভৃতি। ধ্রুপদী ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে ঢিমেতাল প্রয়োজন হয়। ‘ঢিমে’ ও ‘তাল’ শব্দের সমন্বয়ে ‘ঢিমেতাল’ শব্দের উৎপত্তি। ‘ঢিমে’ শব্দের অর্থ ধীর, মন্থর এবং ‘তাল’ শব্দের অর্থ সংগীতের তাল। ‘ঢিমেতাল’ হচ্ছে ধীর বা মৃদুলয়ে গেয়ে যাওয়া বা বাজিয়ে যাওয়া একটি তাল। এ ঢিমেতাল থেকে বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। তাল রক্ষার জন্য অনেক সময় ধ্রুপদী বা উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পীকে গান বা বাজানার কিছু অংশ ঢিমেতালে গাইতে হয় বা বাজাতে হয়। ঢিমে ত্রিতাল ও ঢিমে একতাল অতি ধীর ও মন্থরগতিতে গেয়ে যাওয়া হয় বা বাজিয়ে যাওয়া হয়। ঢিমেতালের এ মৃদু ও মন্থরগতিটি সংগীতজগৎ হতে মানুষের বাগ্্ভঙ্গিতে চলে এসেছে। কোনো অফিসে যদি ধীর বা মন্থরগতিতে কাজ হয় তা হলে তাকে ‘ঢিমেতালে কাজ চলছে’ বলা হয়। এটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

ঢুঁ-মারা
‘ঢুঁ-মারা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ খোঁজখবর নেওয়া। কোনোরূপ উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে কোথাও যাওয়া প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন বলা যায় : কোনো কাজ ছিল না, তবু বাজারে একটু ঢুঁ-মেরে এলাম। ঢুষ মারা থেকে ঢুঁ-মারা বাগ্্ভঙ্গির উৎপত্তি। এবার ঢুষ কে মারে দেখা যাক। গরু-ছাগল, মহিষ প্রভৃতি গৃহপালিত পশু প্রায়শ সুযোগ পেলেই কোনোরূপ ইশারা-ঈঙ্গিত ছাড়াই হঠাৎ ঢুষ মেরে বসে। গৃহপালিত পশুর ঢুষ মারার কোনো উদ্দেশ্য আসলে থাকে না। ইচ্ছে হলো এবং সুযোগ পেল, ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে একটা মেরে দিল এই আর কী! এরূপ ঢুষ মারা মূলত গৃহপালিত পশুর ক্ষণিকের আনন্দ। মানুষ যখন গরু-ছাগলের ঢুষ মারার মতো উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কোথাও যায় তখন তাকে বলা হয় ঢুঁ-মারা। গরু-ছাগলের শিং আছে বলে তাদের ঢুষে চন্দ্রবিন্দু নেই। কিন্তু মানুষের যেহেতু শিং নেই এবং কপালে শিং লাগানোরও কোনো সুযোগ নেই, তাই বাধ্য হয়ে ঢুঁ-মারা বাগ্ভঙ্গিতে চন্দ্রবিন্দু লাগিয়ে গরু-ছাগলের উদ্দেশ্যবিহীন কাজটাকে আরও সার্থক ও একনিষ্ঠ করে তোলা হয়েছে।

ঢেলে সাজা
নতুনভাবে শুরু করা, পুরনো বিষয়কে নতুন করে শুরু করা, কোনো কাজের মূল বিষয় অক্ষুণ্ন রেখে পদ্ধতিগত বিষয়ের পুরো পরিবর্তন প্রভৃতি অর্থে ‘ঢেলে সাজা’ বাগ্্ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হয়। তামাক ও হুঁকো থেকে ঢেলে সাজা বাগ্্ভঙ্গিটি এসেছে। একবার তামাক খাওয়া শেষ হওয়ার পর পুনরায় তামাক সেবন করতে হলে পুনরায় তামাক সাজাতে হয়। এ পর্যায়ে কল্কে উপুড় করে পোড়া-তামাক, ছাই ইত্যাদি ফেলে আবার নতুন তামাক ভরে নতুনভাবে আগুন দিয়ে কল্কে সাজাতে হয়। যদিও হুঁকো অপরিবর্তিত থাকে। অবশ্য মাঝে মাঝে হুঁকোর পানিও পরিবর্তন করতে হয়। কল্কে সাজানোর এ প্রক্রিয়াটি বাগ্্ভঙ্গি হিসাবে মানুষের বাক্যে চলে এসেছে। প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিগত কারণে তামাক-সেবন করা সম্ভব না-হলে পুনরায় কল্কে ঢেলে সাজিয়ে সেবনের উপযোগী করা হয়। তেমনি কোনো কাজ বা পরিকল্পনা নানা-কারণে বাস্তবায়নে বিভ্রাট বা অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। তেমন অবস্থায় ওটি কল্কে ঢেলে সাজানোর ন্যায় ঢেলে সাজিয়ে উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

 

error: Content is protected !!