বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

চতুর্দশ অধ্যায়
ত থ

তখ্ত তাউস বা তখ্তে তাজ
আরবি ‘তাউস’ শব্দের অর্থ ময়ূর বা এমন কোনো যন্ত্র যার মুখ ময়ূরের মতো। মোগল আমলে রাজা-বাদশাহদের সিংহাসনে ময়ূরের নকশা থাকত। তাই সে সিংহাসনকে বলা হতো তখ্ত তাউস বা তখ্তে তাজ। ইতিহাসে আজও ময়ূর সিংহাসনের উল্লেখ রয়েছে, যা নাদির শাহ দিল্লি দখলের সময় লুট করে নিয়েছিল। কিন্তু ‘তখ্ত তাউস’ শব্দটি বাংলা ভাষায় পাকাপাকিভাবে থেকেই গেল।

তনয়
‘তনয়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ পুত্র, নন্দন, ছেলে, সন্তান প্রভৃতি। ‘তনয়’ সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় তনয় শব্দের অর্থ হচ্ছে : বংশবিস্তারক, বংশবিস্তারকারী। বস্তুত যার মাধ্যমে বংশবিস্তার ঘটে সংস্কৃত ভাষায় তাকে বলা হয় ‘তনয়’। তনয় শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ তনয়া। তনয় ও তনয়ার মাধ্যমে বংশবিস্তার ঘটে। তাই তনয় শব্দের বাংলা অর্থ ‘পুত্র’ এবং তনয়া অর্থ ‘কন্যা’। অবশ্য তনয় বা তনয়া দ্বারা বংশবিস্তার না-ও ঘটতে পারে। তাই বর্তমানে তনয় বা তনায়া শব্দের সঙ্গে বংশবিস্তারের কোনো সম্পর্ক নেই। এখন ‘তনয়’ বলতে পুত্র এবং ‘তনয়া’ বলতে কন্যাকে বোঝানো হয়।

তন্নতন্ন
‘তন্নতন্ন’ শব্দের অর্থ পুঙ্খানুপুঙ্খ, কোনো কিছু বাদ না-দিয়ে, সবিস্তারে প্রভৃতি। তন্নতন্ন সংস্কৃত হতে আগত এবং বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। ‘তন্নতন্ন’ শব্দের ‘তন্ন’ হচ্ছে সংস্কৃত, ‘তৎ ন’ বাগ্্ভঙ্গির সংক্ষিপ্ত রূপ। এর অর্থ ‘তা নয়’। সুতরাং এ হিসাবে ‘তন্নতন্ন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে : তা নয়: তা নয়। কোনো কিছু খুঁজতে গেলে লক্ষ্যবস্তু ছাড়া অনেক কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তু ছাড়া অন্য যা-ই কিছু পাওয়া যাক না কেন, বলা হয় তা নয়, আবারও অপ্রয়োজনীয় কিছু এসে যায় এবং বলা হয় তা নয়। বারবার এমন ঘটে। তাই বারবার উচ্চারিত হয় তা নয়, তা নয়। মানে যা খোঁজা হচ্ছে তা পাওয়া যাচ্ছে না। আরও খুঁজতে হবে। কীভাবে খুঁজতে হবে? ‘তা নয়’ করে করে সবিস্তারে এবং যা নয় সেটিও বাদ না-দিয়ে। আসলে কোনো কিছু খুঁজতে গেলে কোনো কিছু বাদ দেওয়া যায় না। তা-নয়, তা-নয় করে সব কিছু দেখতে হয়। এভাবে ‘তা-নয়’ শব্দটি হয়ে গেল কোনো কিছু বাদ না-দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে: তন্নতন্ন করে: দেখা।

তফাত
‘তফাত’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ পার্থক্য, দূরত্ব প্রভৃতি। আরবি ‘তাফাওয়াত’ শব্দ থেকে বাংলা ‘তফাত’ শব্দের উৎপত্তি। আরবিতে শব্দটির অর্থ ‘বিরতি’। বিরতি মানুষের জীবনের একটি অনিবার্য কাল। এটি কখনো আসে ইচ্ছাকৃতভাবে, আবার কখনো আসে আকস্মিক। যেভাবে আসুক না কেন, বিরতি বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর দূরত্ব সৃষ্টি করে। মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন কাজের মাঝখানে একটু বিরতি চায়। এ বিরতি পূর্বতন কাজ থেকে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি করে। আবার কেউ যখন বাধ্যতামূলক কর্মবিরতি পায় তখন আরও বেশি দূরত্ব ঘটে। কর্মকালীন জীবনধারার সঙ্গে বিরতি বা কর্মবিহীন জীবনের যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি রয়েছে দূরত্ব। তাই আরবি ‘তাফাওয়াত’-এর মূল অর্থ বাংলায় এসে পরিবর্তন হয়েছে সংগতকারণেই।

তর্জনী
‘তর্জন-গর্জন’ শব্দের ‘তর্জন’ অংশ থেকে তর্জনী শব্দের উৎপত্তি। বৃদ্ধাঙ্গুলি ও মধ্যমার মধ্যকার আঙুলটির নাম তর্জনী। আঙুলটির যেমন দৈহিক উপযোগিতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভাষিক উপযোগিতা। কাউকে কলা দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয় বুড়ো আঙুল কিন্তু কাউকে দেখে নেওয়ার জন্য বা হুমকি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় তর্জনী। তর্জনী নাড়ানোর ভঙ্গি দেখে মেজাজ বোঝা যায়। বৃদ্ধাঙ্গুলি ও মধ্যমার মাঝখানের আঙুল নেড়ে তর্জনগর্জন করা হয় বলেই এই আঙুলের নাম হয়েছে ‘তর্জনী’।

তাণ্ডব
‘তাণ্ডব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রলয়ঙ্কর, ভয়ঙ্কর, উদ্দাম-নৃত্য প্রভৃতি। ভারতীয় পুরাণের অন্যতম দেবতা শিব বা মহাদেবের সঙ্গে ‘তাণ্ডব’ শব্দের ব্যুৎপত্তি জড়িত। মহাদেব জটাজুটের বাঁধন খুলে রুদ্র নটরাজরূপে নৃত্য করতেন। তাঁর এ নৃত্যকে বলা হতো তাণ্ডব। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মহাদেব ধ্বংস ও প্রলয়ের দেবতা। মহাবিশ্বের মহাপ্রলয়ের পূর্বেও তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে নৃত্য করবেন। এ নৃত্যে পুরো বিশ্ব মহাকম্পনে ধ্বংস হয়ে যাবে। এ নৃত্যকেও ‘তাণ্ডব নৃত্য’ বলা হয়। মহাদেবের এ প্রলয় নৃত্য থেকে বাংলা ‘তাণ্ডব’ শব্দের উৎপত্তি।

তামাশা
‘তামাশা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কৌতুক, মজা, পরিহাস, ঠাট্টা, মস্করা, খেলা, ক্রীড়া, বাজি প্রভৃতি। ফারসি ‘তামাশা’ শব্দ থেকে বাংলা তামাশা শব্দের উৎপত্তি। তবে ফারসি তামাশা শব্দের অর্থ নাট্যশালা। নাট্যশালায় নাটকের মাধ্যমে কৌতুক, মজা, পরিহাস, ঠাট্টা, মস্করা, বাজি, ক্রীড়া প্রভৃতি বহুমুখী বিষয় উপভোগ করা যায়। নাটক জীবনের চিত্র। মানুষ প্রাত্যহিক জীবনের ধরাবাঁধা একঘেঁয়েমি থেকে আনন্দ নিতে নাট্যশালায় যায়। তাই ফারসি নাট্যশালা বাংলায় এসে কৌতুক, মজা, পরিহাস, ঠাট্টা, মস্করা, খেলা, ক্রীড়া, বাজি প্রভৃতি অর্থ ‘তামাশা’র মধ্যে ধারণ করেছে।

তালকানা
যার তাল কানা, সে-ই তালকানা। ‘তাল’ থেকে তালকানা পদের উৎপত্তি। এ ‘তাল’ কিন্তু গাছের ‘তাল’ নয়; ঝগড়াঝাঁটি করার জন্য অন্যকের দেওয়া কুমন্ত্রণাপ্রসূত তালও নয়। এ তাল গীত, বাদ্য ও নৃত্যের তাল। পুরনো তালের রস খেয়ে যে বেতালা হয় তাকে কিন্তু তালকানা বলে না। তালকানা শব্দের অর্থ যার তাল ও লয় জ্ঞান নেই। কাণ্ডজ্ঞানহীন অর্থেও ‘তালকানা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যার তাল ও লয়বোধ নেই তার গান বেসুরো হয়ে শ্রোতৃবৃন্দের কণ্ঠে সুধার পরিবর্তে বিরক্তি সৃষ্টি করে। তাই তালকানার সঙ্গীত সর্বত্র পরিত্যাজ্য ও বিরক্তিকর। তবে তালকানা ব্যক্তি বলতে শুধু তাল-লয় জ্ঞানহীন ব্যক্তিকে বোঝায় না। যার কথাবার্তা, আচার-আচরণ অস্বাভাবিক, বিরক্তিকর ও অন্যকে বিব্রত করে, তাকেও ‘তালকানা’ বলা হয়।

তালপাতার সেপাই
‘তালপাতার সেপাই’-এর ভাবার্থ হলো দুর্বল লোক। সেপাই মানে সৈনিক বা সিপাহি। অর্থাৎ তালপাতার মতো কৃশকায়/পাতলা/রোগা যে লোক, রূপকার্থে তাকে তালপাতার সৈনিক বলা হয়েছে। অন্য অর্থে নির্ঝঞ্ঝাট ব্যক্তি। যে অন্যায় এড়িয়ে চলে তাকে দুর্বল বলে। একসময় শিশুরা তালপাতা দিয়ে তৈরি পুতুল নিয়ে খেলত। সে পুতুলের আকৃতি খানিকটা বর্মপরা সৈনিকের মতো ছিল। পুতুলগুলো ছিল পাতলা, কৃশকায় এবং খুব দুর্বল। তালপাতার তৈরি এই পুতুল থেকে ‘তালপাতার সেপাই’ কথাটির উৎপত্তি।

তিনকুল
‘তিনকুল’ শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ তিন বংশ। তিন ও কুল মিলে তিনকুল। কুল মানে বংশ। আর তিন কুল হচ্ছে যথাক্রমে পিতৃকুল, মাতৃকুল ও শ্বশুরকুল। এ তিন বংশে যার কোনো আত্মীয়স্বজন থাকে না তাকে বলা হয় তিনকুলহীন বা নিরাশ্রয়।

তিলোত্তমা
দৈত্যরাজ নিকুম্ভের দুই পুত্র সুন্দ ও উপসুন্দ ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করে ত্রিলোক বিজয়ের জন্য অমরত্ব প্রার্থনা করে। ব্রহ্মা বলেন যে, পরস্পরের হাতেই এদের মৃত্যু হবে, অন্য কারও হাতে নয়। দেবতাদের অনুরোধে ব্রহ্মা বিশ্বকর্মাকে এক পরমাসুন্দরী নারী সৃষ্টি করতে বলেন। ত্রিভুবনের সমস্ত উত্তম জিনিস তিল তিল করে সংগ্রহ করে বিশ্বকর্মা এ সুন্দরীর সৃষ্টি করেছিলেন, ফলে এর নাম হয় তিলোত্তমা। তাঁকে দেখবার জন্য ব্রহ্মার চারদিকে চারটি মুখের সৃষ্টি হয় এবং ইন্দ্রের সহস্র চক্ষু সৃষ্টি হয়। সুন্দ ও উপসুন্দ তিলোত্তমার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে পাবার জন্য পরস্পর যুদ্ধ আরম্ভ করে এবং একে অন্যকে নিহত করে। বাংলা একাডেমির ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ তিলোত্তমার অর্থ বলা হয়েছে : হিন্দু পুরাণ মতে সুন্দ ও উপসুন্দকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে সৃষ্টির সকল প্রকার সৌন্দর্য থেকে তিল তিল করে আহৃত উৎকৃষ্ট অংশ দ্বারা সৃষ্ট অপ্সরাবিশেষ/স্বর্গের পরমাসুন্দরী অপ্সরা।

তুঙ্গস্থান
প্রত্যেকটি গ্রহের একটি করে উচ্চ (বীধষঃবফ) বা তুঙ্গক্ষেত্র আছে। রবির তুঙ্গস্থান মেষরাশি; চন্দ্রের তুঙ্গস্থান বৃষরাশি; এভাবে, মঙ্গলের তুঙ্গস্থান মকর; বুধের তুঙ্গস্থান কন্যা; বৃহস্পতির তুঙ্গস্থান কর্কট; শুক্রের তুঙ্গস্থান মীন; শনির তুঙ্গস্থান তুলা; রাহুর তুঙ্গস্থান মিথুন ও কেতুর তুঙ্গস্থান ধনু। রাশির জন্য গ্রহ তুঙ্গে থাকা শুভফলপ্রদ। বৃহস্পতি (শুভগ্রহ) কর্কট রাশিতে অবস্থান করলে এ রাশির জাতক বলতে পারে ‘বৃহস্পতি আমার এখন তুঙ্গে’।

তুবড়ি
‘তুবড়ি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অনর্গল কথা বলা, বিরামহীন কথা প্রভৃতি। তুবড়ি হলো এক প্রকার আতশবাজি। দেখতে অনেকটা বড় আকারের ভারতীয় পেয়াজের মতো। তুবড়ির মুখে অগ্নিসংযোগ করার কয়েক সেকেন্ড পর বিরামহীন ফোয়ারার মতো চারপাশে আগুনের স্ফুলিঙ্গ প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়ে। একবার অগ্নিসংযোগ করার পর তুবড়ির মুখ থেকে স্ফুলিঙ্গ বের হলে নিজে নিজে নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আর থামানো যায় না। কিছু কিছু লোক আছে যারা একবার কথা বলা শুরু করলে নিজে নিজে বন্ধ না-করা পর্যন্ত তাদের কোনোভাবে থামানো যায় না। এমন লোকদের কার্যক্রমের সঙ্গে তুবড়ির মিল আছে বলে বাংলা ভাষায় বিরামহীন কথা বলাকে ‘তুবড়ি’ বাগ্্ভঙ্গিতে আবদ্ধ করে দিয়েছে।

তুলকালাম
‘তুলকালাম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ তুমুল ঝগড়া, প্রচণ্ড কলহ, দীর্ঘ আলোচনা প্রভৃতি। তুলকালাম শব্দটি আরবি হতে আগত বাংলা ভাষার মেহমান। আরবি ‘তুল’ শব্দের অর্থ বিস্তার এবং ‘কালাম’ শব্দের অর্থ কথা বা বাক্য। অতএব তুলকালাম শব্দের অর্থ হচ্ছে দীর্ঘ বাক্য। দীর্ঘ বাক্য মানে দীর্ঘ আলোচনা। আর দীর্ঘ আলোচনা করতে হলে যে দীর্ঘ বাক্য প্রয়োজন তা বাঙালির চেয়ে আর বেশি কে জানে। অতএব ‘তুলকালাম’ শব্দের অর্থ ‘বাগ্বিস্তার’। এ থেকে এসেছে কথা কাটাকাটি, হৈচৈ, চিৎকার, চেঁচামেচি প্রভৃতি। ঝগড়াঝাঁটির প্রধান উপাদান কথা। কথা যত দীর্ঘ ও বিস্তৃত হয় ঝগড়া তত প্রবল ও প্রচণ্ড হয়। আরবি ‘তুলকালাম’ তথা বাগ্বিস্তারের মাধ্যমে বাংলা ঝগড়া প্রবল হয়ে ওঠে। তাই আরবি দীর্ঘ বাক্য বাংলায় এসে তুলকালাম বা ‘তুমুল ঝগড়া’ অর্থ ধারণ করেছে।

তৃণমূল
‘তৃণমূল’ শব্দের অর্থ অরাজনীতিক সামাজিক স্তর। শব্দটি বাংলা হলেও এটি একটি পারিভাষিক শব্দ। ইংরেজি মৎধংং ৎড়ড়ঃং বাগ্্ভঙ্গিটিকে বাংলায় ‘তৃণমূল’ করে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ইংরেজিতে মৎধংং ৎড়ড়ঃং বলতে যা বোঝায়, তৃণমূল শব্দ দিয়ে বাংলায়ও তা প্রকাশ করা হয়। মৎধংং ৎড়ড়ঃং কথার উদ্ভব হয় আমেরিকায়। খনিবিদ্যায় ব্যবহারের জন্য শব্দটির প্রচলন হয়েছিল। মাটির প্রথম স্তরকে বলা হতো মৎধংং ৎড়ড়ঃ। পরবর্তীকালে শব্দটির জন্মান্তর ঘটে এবং তা রাজনীতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। তখন এর অর্থ দাঁড়ায় : গ্রামের সাধারণ ভোটার যাঁরা প্রাচীন মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে আছেন এবং যাঁদের ওপর শহরের জীবনযাত্রার প্রভাব পড়েনি। ক্রমান্বয়ে ইংরেজিভাষী সকল অঞ্চলে কথাটি ছড়িয়ে পড়ে এবং অর্থ সামান্য পরিবর্তন হয়ে নতুন অর্থ দাঁড়ায় রাজনীতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে থাকা অরাজনীতিক মানুষ।

তেল
তেল বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি অতি প্রয়োজনীয় চর্বিজাতীয় পানীয়। বিশেষ ধরনের উদ্ভিজ্জ দানা বা শস্য হতে এ তরলটি তৈরি করা হয়। মূলত খাদ্য তৈরিতে তেল-এর অধিক ব্যবহার লক্ষণীয়। তিল, সরিষা, নারিকেল, তিসি, সয়াবিন, বাদাম, কদুর প্রভৃতিসহ আরও অনেক কিছু হতে তেল তৈরি হয়। মূলত তেল নামটি এসেছে ‘তিল’ হতে। একসময় আমাদের দেশে তিলই ছিল তেল তৈরির জনপ্রিয় উৎস। তাই তিলের নির্যাস তৈল নামে পরিচিতি পায়। এ অনুষঙ্গে যে উদ্ভিদেরই নির্যাস থেকে পদার্থটি তৈরি হোক না কেন, তা-ও তেল নামে পারিচিত।

তেলেবেগুনে
‘তেলেবেগুনে’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ খুব রেগে যাওয়া, ক্রুদ্ধ হওয়া, প্রচণ্ড রাগ দেখানো। মানুষ রেগে যায়, রাগকে যতই পাশব বলা হোক না কেন, ক্রোধ একটি রিপু হওয়ায় মানুষ না-রেগে পারে না। তবে প্রত্যেক রাগের পেছনে কোনো না কোনো উৎস থাকে। এ যেমন তেলেবেগুনে। ‘তেল’ ও ‘বেগুন’ শব্দের সহযোগে তেলেবেগুনে বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। এর পেছনে একটি কারণ থাকতে পারে, আবার অনেক কারণও থাকতে পারে। তেল আর বেগুনের মিলন হয় রান্নাঘরে। সুতরাং তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা বাগ্ধারাটি রান্নাঘর থেকে এসেছে। কাটা বেগুনের টুকরো তপ্ত কড়াইয়ের গরম তেলে ছেড়ে দিলে অকস্মাৎ যে ধরনের শব্দ ও দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, তা হঠাৎ রেগে যাওয়া মানুষের অবয়বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তেলেবেগুনে সংযোগের সময় তপ্ত তেল ছিটকে পড়তে পারে। এটি শরীরের যেখানে পড়ে সেখানে জ্বালা শুরু হয়। এরূপ প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ মানুষের সামনে যেই পড়ুক তারও রাগের আগুনে অপদস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রান্নাঘরে তেলেবেগুনের এ অনুষঙ্গ থেকে ‘তেলেবেগুনে’ বাগ্ধারাটির উৎপত্তি।

তোঘলকি
শব্দটির আভিধানিক অর্থ গোঁয়ার্তুমি, সৃষ্টিছাড়া, অপরিকল্পিত, অদূরদর্শিতা প্রভৃতি। এটি একটি ঐতিহাসিক নাম থেকে সৃষ্ট বাগ্্ভঙ্গি। দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের আচার-ব্যবহার ও চাল-চলনের ওপর ভিত্তি করে বাগ্্ভঙ্গিটি তৈরি হয়েছে। তিনি ১৩২৫ হতে ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তুঘলক ছিলেন অত্যন্ত অগ্রগামী ও পরিবর্তন মননশীলতার অধিকারী একজন আধুনিক মনের সৃজনশীল মানুষ। মধ্যযুগের সুলতান হলেও তার দৃষ্টি ছিল সুদূর ভবিষ্যতের আরও সুদূরে। শাসনকার্যে আধুনিকতা ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে তিনি অনেক পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর এ পরিবর্তনের মধ্যে শাসনকার্যে উলেমাদের অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা অন্যতম। এছাড়া তিনি দোয়াব অঞ্চলে করবৃদ্ধি, দিল্লি থেকে দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর, মুদ্রাসংস্কার ও তামার নোট প্রচলন করেন। তাঁর এ পরিবর্তন আধুনিকমনস্কতার পরিচায়ক হলেও যাদের জন্য তিনি এসব করেছিলেন তারা ছিল ধর্মীয় কুসংস্কার ও প্রাচীন ধ্যান-ধারণায় আবদ্ধ সংকীর্ণ মনের অধিকারী। ফলে তাঁর পরিবর্তন ধর্মান্ধ ও পশ্চাৎপদ মানসিকতার অধিকারী জনগণ গ্রহণ করতে পারেনি। সমকালীন ইতিহাসবেত্তাদের অনেকে তাঁকে পাগল রাজা বলে আখ্যায়িত করেছেন। মুহম্মদ বিন তুঘলকের এমন কার্যক্রম ও কাণ্ড থেকে ‘তোঘলকি’ বাগ্ধারাটির উৎপত্তি।

তোড়জোড়
‘তোড়জোড়’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ আয়োজন, উদ্যোগ, প্রস্তুতি প্রভৃতি। তোড়জোড় শব্দটি হিন্দি ভাষা হতে মেহমান হিসাবে বাংলায় এসেছে। ‘তোড়’ শব্দের অর্থ ছেঁড়া এবং ‘জোড়’ শব্দের অর্থ জোড়া দেওয়া। হিন্দি ভাষায় ‘তোড়জোড়’ শব্দটির অর্থ ছেঁড়া জিনিস জোড়া দেওয়া। মানুষ যে সকল জিনিস ব্যবহার করে তা প্রথম অবস্থায় নতুন থাকে এবং এসব জিনিস এনেই কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু ব্যবহারের ফলে আস্তে আস্তে তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। কখনো ছিঁড়ে যায়, কখনো-বা ভেঙে যায়। এরূপ ভাঙা বা ছেঁড়া জিনিস ফেলে দেওয়া হয় না, বরং জোড়া লাগানোর মাধ্যমে আবার নতুনভাবে কাজে লাগানো হয়। কাজের জিনিস ছিঁড়ে গেলে বা ভেঙে গেলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। জোড়া লাগানোর মাধ্যমে বা মেরামত করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রয়াস হচ্ছে বন্ধ কাজ শুরু করার উদ্যোগ। ভাঙা বা ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে সাময়িক থেমে থাকা কোনো কিছুকে জোড়া লাগানোর মাধ্যমে পুনরায় কাজ শুরুর আয়োজন করা হয়। এ অনুষঙ্গে ছেঁড়া জিনিস জোড়া দেওয়ার কর্মটি আয়োজন, উদ্যোগ ও প্রস্তুতির সমার্থক হয়ে যায়।

তোতা পাখি আর টিয়া পাখি
পাখির নাম হিসাবে আমাদের বাংলা শব্দভাণ্ডারে ‘তোতা পাখি’ আর ‘টিয়া পাখি’ খুব সাধারণ দুটো নাম হলেও এরা কিন্তু ঠিক এক বিষয় নয়। জীবজগতের শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যায় চংরঃঃধপরভড়ৎসবং বর্গের অন্তর্ভুক্ত পাখিদের সাধারণভাবে টিয়া পাখি বা চধৎৎড়ঃ ডাকা হয়, এ বর্গটিতে ৩৭২টি প্রজাতি ও ৮৬টি গণ রয়েছে। কিন্তু এই বর্গের অনেকগুলো প্রজাতির পাখিদের একনামে তোতা পাখি বা চধৎধশববঃ নামে ডাকা হয় যারা আকারে ছোট থেকে মাঝারি হয়ে থাকে এবং সেই সঙ্গে যাদের লেজের পালক লম্বা হয়। যেমন ব্রাজিলের ‘স্কারলেট ম্যাকাও’ যদিও টিয়া পাখি, কিন্তু তোতা পাখি নয়।

তোয়াক্কা
‘তোয়াক্কা’ শব্দের অর্থ পরোয়া, গ্রাহ্য প্রভৃতি। আরবি ‘তাওয়াক্’ শব্দ থেকে বাংলা তোয়াক্কা শব্দের উৎপত্তি। আরবি ভাষায় শব্দটির অর্থ নির্ভরতা, ভরসা, প্রত্যাশা প্রভৃতি। আরবি তাওয়াক্ শব্দের ব্যবহার শালীন ও নমনীয়, কিন্তু বাংলায় তোয়াক্কা শব্দের ব্যবহার অশালীন না-হলেও অবশ্যই নমনীয় নয়। এর মধ্যে একটা উদ্ধত ভাব থেকে যায়। বাংলায় এটি প্রতিপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার আস্ফালন হিসাবে প্রয়োগ করা হয়।

তোলপাড়
‘তোলপাড়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ওলটপালট, গণ্ডগোল, আলোড়ন, আন্দোলন, অস্বাভাবিক অবস্থা প্রভৃতি। ‘তোলা’ ও ‘পাড়া’ শব্দের সংযোগে তোলাপাড়া শব্দ গঠিত এবং ‘তোলা পাড়া’ শব্দদ্বয় থেকে তোলপাড় শব্দের উৎপত্তি। ‘তোলা’ শব্দের অর্থ উঁচু করা বা উঠানো এবং ‘পাড়া’ শব্দের অর্থ নামিয়ে আনা বা নামানো। সুতরাং ‘তোলাপাড়া’ শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হয় উঠানো-নামানো। উঠানো ও নামানো গতিশীল কর্ম। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় এ গতি চোখে পড়ার মতো নয় এবং চোখে পড়ার মতো হলেও উঠানো-নামানোর লক্ষ্যে সৃষ্ট-গতি কারও অকাম্য নয়। কিন্তু উঠানো-নামানোর গতি যখন প্রচণ্ডভাবে অস্বাভাবিক হয়ে যায় তখন সবার চোখে বিস্ময় আনে, চারদিকে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বস্তুত এ অনুষঙ্গে উঠানো-নামানো অর্থে ব্যবহৃত ‘তোলপাড়’ শব্দটি ওলটপালট, গণ্ডগোল, আলোড়ন, আন্দোলন, অস্বাভাবিক অবস্থায় এসে পড়েছে।

ত্যাঁদড়
‘ত্যাঁদড়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নির্লজ্জ, বেয়াড়া, বেয়াদব, ধূর্ত প্রভৃতি। ফারসি ‘তোন্দরোও’ শব্দ থেকে বাংলা ‘ত্যাঁদড়’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ভাষায় তোন্দরোও শব্দের অর্থ গতিশীল, দ্রুতগামী, উগ্র, ক্ষিপ্র, চরমপন্থী, উগ্রপন্থী প্রভৃতি। বাংলায় এসে শব্দটি তার প্রাক্তন অর্থ হারিয়ে যে-অর্থ ধারণ করেছে তা হুবহু অভিন্ন না-হলেও খুব বেশি ভিন্নতা নেই। গতিশীল, দ্রুতগামী, উগ্র বা চরমপন্থী যে কেউ হতে পারে না। এমন কার্যক্রম দেখাতে হলে কিছুটা ধূর্ততা আর কিছুটা নির্লজ্জতা এবং কিছুটা আদব-কায়দার বরখেলাপ প্রয়োজন। এটা চিন্তা করে বাঙালির হুজুগে মন ফারসি দ্রুতগামী, উগ্র ও চরমপন্থীদের নির্লজ্জ, বেয়াড়া, বেয়াদব ও ধূর্ত বানিয়ে দিয়েছে। চরমপন্থী তো সর্বত্র বেয়াড়া, ধূর্ত ও বেয়াদব বলে পরিচিত। ত্যাঁদড় শুধু নেতিবাচক অর্থে প্রয়োগ করা হয় না। ইতিবাচক ও স্নেহজ্ঞাপক পদ হিসাবেও এর ব্যবহার লক্ষণীয়। পিতামাতা অনেক সময় ছেলের দুষ্টুমি ও বেয়াড়া স্বভাব দেখে খুশিতে উদ্বেল হয়ে বলেন : ছেলেটা আমার বড় ত্যাঁদড়।

ত্রিশঙ্কু
‘ত্রিশঙ্কু’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ অনিশ্চিত অবস্থা। আগেও যেতে পারে না আবার পেছনেও হটে যেতে পারে না এমন অনিশ্চিত অবস্থাকে বাংলায় ত্রিশঙ্কু দশা, ত্রিশঙ্কু অবস্থা কিংবা ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলে থাকা প্রভৃতি বাগ্্ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়। ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত বিখ্যাত সূর্যবংশীয় খ্যাতিমান রাজা ত্রিশঙ্কুর অবস্থা থেকে বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। কথিত হয়, রাজা ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি কুলগুরু বশিষ্ঠের কাছে তার ইচ্ছা পূরুণের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রার্থনা করেন। কুলগুরু তা অসাধ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন। বশিষ্ঠের পুত্রগণের নিকট ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে যাওয়ার সহায়তা পেলেন না। এ অবস্থায় তিনি অন্যত্র সহায়তার জন্য গমনের সিদ্ধান্ত নেন। তাতে গুরুপুত্র বৃন্ধ তাকে চণ্ডালে পরিণত হওয়ার অভিশাপ দেন। এ অবস্থায় ত্রিশঙ্কু বিখ্যাত ঋষি বিশ্বামিত্রের শরণাপন্ন হন। বিশ্বামিত্র তপোবলে রাজা ত্রিশঙ্কুকে আকাশপথে স্বর্গে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু স্বর্গে বসবাসকারী দেবতরা ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গে ঢুকতে না-দিয়ে মর্ত্যপথে ঠেলে দেন। ইন্দ্র বলেন, “যেহেতু ত্রিশঙ্কু গুরুশাপে অভিশপ্ত, তাই তিনি স্বর্গে বাস করতে পারবেন না।” ত্রিশঙ্কু নিচে পতিত হতে থাকেন। বিশ্বামিত্র পতনোন্মুখ ত্রিশঙ্কুকে “তিষ্ঠ, তিষ্ঠ” বলে আবার আকাশপথে স্বর্গের দিকে ঠেলে দেন। ঊর্ধ্বালোকে বসে স্বর্গের দেবতারা আবার ত্রিশঙ্কুকে মর্ত্যপথে ঠেলে দেন। এভাবে একের পর এক ত্রিশঙ্কুর শুধু আসা-যাওয়া চলতে থাকে। দেবতা আর বিশ্বামিত্রের পরস্পর ঠেলাঠেলির কারণে বেচারা ত্রিশঙ্কু কোথাও স্থির হতে পারছিলেন না। অবস্থা ক্রমশ করুণ হতে করুণতর হয়ে ওঠে। এদিকে বিশ্বামিত্র দক্ষিণাকাশে অন্য এক সপ্তর্ষিমণ্ডল ও নক্ষত্রলোক সৃষ্টি করেন। তাঁর সৃষ্টজগতে তিনি দেবতা ও নতুন ইন্দ্রের সৃষ্টিতেও তৎপর হয়ে ওঠেন। এতে দেবতারা ভীত হয়ে বিশ্বামিত্রের কাছে নিজেদের মান রক্ষার আবেদন জানান। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে যেতে না-পারলেও বিশ্বামিত্র-সৃষ্ট আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলে থাকবেন এবং তার মধ্যে নিম্নশির ত্রিশঙ্কুও অবস্থান করবেন। ত্রিশঙ্কুর একবার স্বর্গে ও আর একবার মর্ত্যে যাওয়া-আসা এবং উভয়স্থানের কোথাও স্থির হতে না-পারার ঘটনা থেকে বাংলা বাগ্্ভঙ্গি ‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’ সৃষ্টি হয়েছে।

ত্রুটি
‘ত্র“টি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দোষ, অপরাধ, অভাব, প্রমাদ প্রভৃতি। শব্দটির মূল অর্থ ছিল ছিন্ন, কর্তিত, অল্প, সামান্য, সংশয় প্রভৃতি। কালক্রমে শব্দটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। বস্তুত কোনো কিছু ছিন্ন বা কর্তন করা ভালো নয়, অল্প বা সামান্য জিনিস দিলে কারও মন ভরে না। কোনো বিষয়ে সংশয় সৃষ্টি হলে গোলমাল শুরু হয়। অর্থাৎ ছিন্ন করা, কর্তন করা প্রভৃতি অপরাধমূলক এবং দোষণীয়। অন্যদিকে ‘সামান্য’ তো অভাব এবং ‘সংশয়’ প্রমাদের লক্ষণ। এতৎবিশ্লেষণে এটি প্রতীয়মান হয় যে, ‘ত্র“টি’ শব্দের মূল অর্থ ও প্রচলিত অর্থের বাহ্যিক আবরণে পরিবর্তন হলেও নতুন বোতলে পুরাতন মদের মতো মৌলিক বিষয় অভিন্ন রয়ে গিয়েছে।

থ হয়ে গেলাম
কোনো কারণে আমরা যখন থ মেরে যাই কিংবা থ হয়ে পড়ি, তখন আমরা অনেক কিছুই হই, যেমন অভিভূত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব, স্তম্ভিত, নির্বাক, অবাক ইত্যাদি। প্রচুর অর্থ বহন করলেও আমরা জানি থ একটি বর্ণ মাত্র ব্যঞ্জন বর্ণমালার সপ্তদশ এবং ত বর্গের দ্বিতীয় বর্ণ। কিন্তু আমরা যখন থ হই, তখন বর্ণমালার অক্ষরবৎ থ হই না হই শব্দভাণ্ডারের একটি শব্দস্বরূপ থ এবং সেই থ শব্দটির অর্থ হলো পর্বত। পর্বত অর্থে থ শব্দের ব্যবহার অন্ত্যমধ্যযুগের বাংলা কবিতায় শেষবারের মতো দেখতে পাওয়া যায়। তারপর থেকে শুরু হয় থ শব্দের আলঙ্কারিক বা উপমাঘটিত প্রয়োগ। ঘটনাচক্রে পড়ে আমরা অতি সংক্ষেপে থ হওয়া শিখি। এই শিক্ষাটা আমরা পাই থ অর্থাৎ পর্বতের নিকট থেকে। থ যেমন নিশ্চল-নিশ্চুপ হয়ে থাকে, তার এই ভাবটিই আমরা গ্রহণ করি বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন আমাদের মুখে আর কথা সরে না, আমরা হয়ে থাকি পর্বতবৎ মৌন ও নিশ্চল।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!