বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন
পঞ্চদশ অধ্যায়

দক্ষ
দক্ষ একজন প্রজাপতি। তাঁর জন্ম সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ আছে। শ্রীমদ্ভাগবতে আছে দক্ষ ব্রহ্মার মানসপুত্র। ব্রহ্মার দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ হতে তাঁর জন্ম। তাই তাঁর নাম দক্ষ। তিনি মনুর কন্যা প্রসূতিকে বিবাহ করেন।

দক্ষযজ্ঞ
শব্দটির আভিধানিক অর্থ হট্টগোল, হইচই, লণ্ডভণ্ড, ওলটপালট প্রভৃতি। দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড, দক্ষযজ্ঞ বাধানো প্রভৃতি বাগ্্ভঙ্গি এসেছে ভারতীয় পুরাণ থেকে। দক্ষ ছিল ব্রহ্মার পুত্র। দক্ষের কনিষ্ঠ কন্যা সতীর সঙ্গে শিবের বিয়ে হয়। কথিত হয়, এক ঋষির যজ্ঞে শিব শ্বশুরকে অভিবাদন না-করায় দক্ষ অত্যন্ত রুষ্ট হন। শিবকে জব্দ করার জন্য দক্ষ নিজেই এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। ওই যজ্ঞে শিব ছাড়া সব মুনি-ঋষিদের আমন্ত্রণ করা হয়। দক্ষের কন্যা বিনা আমন্ত্রণে সে যজ্ঞে উপস্থিত হন। কন্যাকে দেখে দক্ষ শিবের নিন্দা করতে শুরু করেন। স্বামীর নিন্দা সহ্য করতে না-পেরে পতিব্রতা সতী দেহত্যাগ করেন। পত্নীর দেহত্যাগের সংবাদ পেয়ে ক্ষুব্ধ শিব সদলবলে যজ্ঞানুষ্ঠানে উপস্থিত হন এবং যজ্ঞক্ষেত্রের সমুদয় জিনিস তছনছ করে দেন। দক্ষ যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যে কাণ্ড ঘটান সেটিই ‘দক্ষযজ্ঞ’।

দক্ষিণ
‘দক্ষিণ’ একটি দিকবিশেষ, উত্তর দিকের বিপরীত, ডানদিক প্রভৃতি। সংস্কৃত হতে আগত শব্দটির মূল অর্থ শুধু উত্তরের বিপরীত নয়। এ ছাড়াও সংস্কৃত ভাষায় শব্দটির আরও অনেক অর্থ আছে। তন্মধ্যে চতুর, দক্ষ, নিপুণ, সৎ, প্রীতিপরায়ণ, বশংবদ, অকপট, বাৎসল্য প্রভৃতি অন্যতম। বাংলায় এসে দক্ষিণ শব্দটি দিক ছাড়া আর সব অর্থ হারিয়ে বসেছে। বাঙালিরা নিজেদের হাতকেও জাতপাতের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তাদের চোখে বাম হাতের চেয়ে ডান হাত দক্ষ, নিপুণ ও অনুপম। ডান হাতের প্রতিভূ হচ্ছে দক্ষিণ হাত; এটি তাদের চতুরতা, দক্ষতা, নিপুণতা, সততা, প্রীতিপরায়ণতা প্রভৃতির নিদর্শন। এ জন্য প্রিয় ও কাছের বশংবদ ব্যক্তিকে বলা হয় ‘দক্ষিণহস্ত’। দক্ষিণ হাত তথা ডান হাত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভালো কাজ করা হয়।

দণ্ডায়মান
শব্দটির অর্থ খাড়া, দাঁড়িয়ে আছে এরূপ। দণ্ড থেকে দণ্ডায়মান শব্দের উৎপত্তি। দণ্ড সোজা ও সটান। দণ্ডায়মান অর্থ দণ্ডের মতো সোজা ও সটান। একটি দণ্ডকে খাড়া করে রাখলে যে অবস্থা হয় সেটিই দণ্ডায়মান অবস্থা। কোনো মানুষ যদি দণ্ডের মতো সটান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেটিই হচ্ছে দণ্ডায়মান। ‘দণ্ড’ শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে ‘দমন সাধন, দমন কার্য সম্পাদন।’ যে বস্তু দিয়ে দমন করা যায় সেটি হচ্ছে দণ্ড। ‘দণ্ড’ হচ্ছে দীর্ঘ কিন্তু সোজা ও শক্ত অথচ সহজে বহনযোগ্য একটি সরল অস্ত্র, যদ্দ¦ারা আঘাত করা যায় এবং আঘাত করলে সহজে আঘাতপ্রাপ্ত জীব দমিত হয়। এটি সাধারণভাবে সবার কাছে ‘লাঠি’ নামে পরিচিত। এ লাঠি মানুষের আদি অস্ত্র। লাঠি দিয়ে মানুষ প্রথমে সহজে আঘাত করতে শেখে, দমন করতে শেখে মানুষ হয়ে মানুষকে কিংবা অন্য জীবকে। তাই বস্তুটির নাম হয় ‘দণ্ড’। এ জন্য দণ্ড অর্থে সাজা বা শাস্তিও বোঝায়। একসময় এ লাঠি দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া হতো। তাই এর নাম ‘দণ্ড’ এবং সাজাপ্রাপ্তকে বলা হয় ‘দণ্ডিত’। যদিও এখন দণ্ড বা দণ্ডিত বলতে লাঠির কথা মনে পড়ে না, মনে পড়ে সাজা ও সাজাপ্রাপ্তের কথা। এ দণ্ড হতে ক্রমান্বয়ে উৎপত্তি হয় নানা দণ্ডযুক্ত শব্দ। যেমন অর্থদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড, কারাদণ্ড, নির্বাসনদণ্ড। দণ্ডের দণ্ডদানের ক্ষমতার জন্য রাজা বা শাসক কিংবা ক্ষমতাবানদের বলা হতো ‘দণ্ডধর’। ভারতীয় পুরাণে যমের অপর নাম দণ্ডধর। কারণ তার দায়িত্ব প্রাণহরণ। বলা হয় যার লাঠি তার মাটি, বা যার দণ্ড তার ভাণ্ড। প্রাচীনকালে রাজা-বাদশার লাঠির ক্ষমতার ওপর তার প্রভাব নির্ভর করত।

দধীচি
মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, অথর্ব মুনির ঔরসে এবং কর্দমকন্যা শান্তির গর্ভে দধীচি জন্মগ্রহণ করেন। দধীচি সবসময় কঠিন ধ্যান ও গভীর তপস্যায় মগ্ন থাকতেন। বৃত্রাসুরের (অর্থাৎ বৃত্র নামের অসুর) আক্রমণে উৎপীড়িত ও স্বর্গচ্যুত দেবতারা জানতে পারেন, কেবল দধীচির অস্থি-নির্মিত অস্ত্র দিয়েই বৃত্রকে নিপাত করা যাবে। তখন দেবরাজ ইন্দ্র দধীচির নিকট গিয়ে সবিনয়ে তাঁর অস্থি প্রার্থনা করেন। পূর্বে একবার তপোভঙ্গ করার কারণে ইন্দ্র দধীচির বিরাগভাজন হয়েছিলেন। সেবার দধীচির তপস্যায় ভীত হয়ে তপোভঙ্গের জন্য ইন্দ্র অলম্বুষা নামের এক অপ্সরাকে প্রেরণ করেছিলেন। অলম্বুষার রূপ দেখে দধীচির বীর্য সরস্বতীর জলে পতিত হয়। সরস্বতী নদী তা উদরস্থ করে সারস্বত নামের এক পুত্রের জন্ম দেন। উদারচেতা দধীচি ইন্দ্রের পূর্বের শত্র“তায় বিস্মৃত হয়ে দেবতাদের উপকারের লক্ষ্যে প্রাণবিসর্জন দেন। ইন্দ্র মৃত দধীচির শরীর থেকে অস্থি নিয়ে বজ্র নির্মাণ করে নিরানব্বই বার বৃত্রদের নিহত করে স্বর্গালোক উদ্ধার করেন।

দম্কা
‘দম্কা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সহসা প্রবল-বেগে আগত, ঝটিকাবেগ, আকস্মিক সংঘটিত প্রভৃতি। বাতাস বা হাওয়ার গতিবেগ প্রকাশে শব্দটির অধিক ব্যবহার লক্ষণীয়। বস্তুত ফারসি ‘দম্গাহ্’ শব্দ থেকে বাংলা ‘দম্কা’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ভাষায় ‘দম্গাহ্’ একটি যন্ত্রের নাম। বাংলায় এ যন্ত্রটি ‘হাপর’ নামে পরিচিত। কর্মকার ও স্বর্ণকারগণ ‘হাপর’ ব্যবহার করেন। হাপরের কাজ হাওয়া/বাতাস উদগীরণ করে কয়লার আগুনকে আরও তপ্ত করে তোলা। হাপরে চাপ পড়লে ফস্ করে হঠাৎ বাতাস বেরিয়ে কয়লার আগুনে অক্সিজেন সরবরাহ করে। ফলে আগুন আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে। এটি করার জন্য হাপরের হাতলকে বারবার উঠানামা করাতে হয়। ফারসি ‘দম্গাহ্’ নামক যন্ত্রের মধ্য দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে আসা হাওয়াকে বাঙালিরা ‘দম্কা’ শব্দের মাধ্যমে ‘আকস্মিক’ অর্থে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এভাবে দম্গাহ্ শব্দটি বাংলায় যান্ত্রিক রূপ হারিয়ে সহসা প্রবল-বেগে আগত, ঝটিকাবেগ, আকস্মিক সংঘটিত প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে।

দম্পতি
‘দম্পতি’ শব্দের অর্থ ‘স্বামী-স্ত্রী’। কিন্তু প্রারম্ভে শব্দটির অর্থ ‘স্বামী-স্ত্রী’ ছিল না। অর্থগত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে শব্দটি অবশেষে স্বামী-স্ত্রীর যুগলরূপে বাঁধা পড়েছে। দম্পতিকে আজ আমরা যুগলমূর্তিরূপে দেখে অভ্যস্ত, কিন্তু একথা কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে যে, একসময় দম্পতি ছিল একক ব্যক্তি এবং সেই ব্যক্তিটি ছিল পুরুষ? বৈদিক সংস্কৃত ‘দম’ শব্দের অর্থ ছিল গৃহ। সংস্কৃত ‘দম’ আর লাতিন ‘ফড়সঁং’ একার্থক। প্রাচীন রোমে অভিজাত শ্রেণির লোকদের আবাসস্থলের নাম ছিল ‘ফড়সঁং’, রোম সাম্রাজ্যের প্রধান নগরগুলোতে ‘ফড়সঁং’ দেখা যেত। আধুনিক ইংরেজির ‘ফড়সবংঃরপ’ শব্দটি লাতিন ‘ফড়সবংঃরপঁং’ থেকে আগত। আর ‘ফড়সঁং’ থেকেই ‘ফড়সবংঃরপঁং’ শব্দের উদ্ভব। প্রাচীন সংস্কৃতে ‘দম’ শব্দটির অর্থ যেহেতু ‘গৃহ’ সুতরাং ‘দম্পতি’র অর্থ দাঁড়ায় ‘গৃহপতি’ বা ‘গৃহস্বামী।’ মোট কথা, বৈদিক যুগে গৃহের অধিপতিই ছিলেন দম্পতি। পরবর্তীকালে ‘দম’ শব্দটি পত্নী অর্থ ধারণ করে এবং ‘দম্পতি’ পত্নী ও পতির দ্বৈতরূপে আবির্ভূত হয়। এভাবেই ভাষাগত বিবর্তনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শব্দটি এক সময়ের দাম্পত্য সম্পর্কের মধুর বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। ‘দম্পতি’র প্রতিশব্দ জায়াপতি।

দম্ভোদ্্ভব
‘দম্ভোদ্্ভব’ মহাভারতে বর্ণিত একজন রাজা। নিজের শক্তি নিয়ে তাঁর প্রচণ্ড অহঙ্কার ছিল। তিনি মনে করতেন, ব্রহ্মাণ্ডে তাঁর মতো শক্তিশালী রাজা আর নেই। নিজের শক্তি নিয়ে প্রায়শ তাঁকে দম্ভোক্তি করতে শোন যেত। একদিন রাজ্যের ব্রাহ্মণগণ তাঁকে বললেন যে, গন্ধমাদন পর্বতে সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বনে রত নর ও নারায়ণের শক্তির তুলনায় তাঁর শক্তি অতি নগণ্য। দম্ভোদ্্ভব এ কথা শুনে অপমানিত বোধ করলেন এবং নিজের শক্তি প্রমাণের জন্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে নর ও নারায়ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রওনা দিলেন। প্রথমে নর ও নারায়ণ দম্ভোদ্্ভবকে যুদ্ধ হতে নিবৃত রাখার চেষ্টা করেন। নিজের শক্তির প্রতি প্রচণ্ড আস্থাশীল গর্বিত দম্ভোদ্্ভব যুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার জন্য সৈন্যদের নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় নর ও নারায়ণ একমুঠো ঘাস তীরের মতো দম্ভোদ্্ভবের দলের দিকে নিক্ষেপ করলেন। নিক্ষিপ্ত ঘাসে পুরো আকাশ সাদা হয়ে যায়। দম্ভোদ্্ভব-পক্ষের সকল সেনা ও অন্যান্যদের চোখ, কান ও নাকে ঘাস প্রবেশ করতে শুরু করল। এ অবস্থায় দম্ভোদ্্ভব নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করে কোনোরকমে রক্ষা পেয়ে নিজ দেশে ফিরে আসেন। দাম্ভিকদের পরিণতি ও পতন সম্পর্কে জ্ঞাত করার জন্য মহাভারতে এ গল্পটি করা হয়।

দর্পণ
‘দর্পণ’ শব্দের প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ হচ্ছে মুকুর, আরশি, আয়না প্রভৃতি। এটি সংস্কৃত শব্দ। এর মূল অর্থ হচ্ছে : যা হৃষ্ট বা আনন্দ দান করে। সংস্কৃতে যা হৃষ্ট বা আনন্দিত বা পুলকিত করে তা-ই হচ্ছে দর্পণ। একসময় দর্পণ বা আয়না ছিল না। নিজের মুখ দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। নিজের মুখ দেখতে হলে স্বচ্ছ ও ঢেউহীন স্তব্ধ জলের প্রয়োজন হতো। এমন জলও সহজে পাওয়া যেত না। কেউ নিজের মুখ দেখলে অজানাকে জানার আনন্দে বিমোহিত হয়ে পড়ত। বাংলায় দর্পণ নামে পরিচিত বস্তুটা এ কাজটি করায় তাই এর নাম হয় দর্পণ।

দর্শন
হিন্দু দর্শনশাস্ত্র ছয় ভাগে বিভক্ত। যথা : কপিলকৃত সাংখ্য, পাতঞ্জলিকৃত যোগ, কণাদকৃত বৈশেষিক, গৌতমকৃত ন্যায়, জৈমিনীকৃত পূর্ব-মীমাংসা বা মীমাংসা ও বেদব্যাসকৃত উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্ত।

 

দশহরা
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লাদশমীতে মঙ্গলবারে হস্তানক্ষেত্র গঙ্গা স্বর্গ হতে মর্ত্যে নেমে আসেন। এ জন্য দিনটি অত্যন্ত পবিত্র ও পুণ্যময়। এ তিথি নানা রকম পাপ ক্ষয় করে এবং এ তিথিতে স্নান ও দান করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। এ তিথিতে গঙ্গা দশবিধ পাপ ও দশ-জন্মার্জিত পাপ হরণ করেন বলে এর নাম ‘দশহরা’।

দশা
সহজ অর্থে ‘দশা’ হচ্ছে রাশির ওপর গ্রহের প্রভাব। কোনো গ্রহ রাশিতে প্রবেশ করলে তার প্রভাবের মেয়াদকে দশাকাল বলে। প্রতিটি গ্রহের জন্য একটি দশাকাল নির্দিষ্ট আছে। সেগুলো হলো কেতু ৭ বছর, শুক্র ২০ বছর, রবি ৬ বছর, চন্দ্র ১০ বছর, মঙ্গল ৭ বছর, রাহু ১৮ বছর, বৃহস্পতি ১৬ বছর, শনি ১৯ বছর ও বুধ ১৭ বছর। ‘শনির দশা’ মানে ১৯ বছর কঠিন দুর্গতি।

দশাশ্বমেধ
কাশীতে গঙ্গা নদীর একটি ঘাটের নাম। এটি একটি তীর্থস্থান। ব্রহ্মা রাজর্ষি দিবোদাসের সাহায্যে দশটি অশ্বমেধযজ্ঞ করেছিলেন। কাশীর যে স্থানে এ বিশাল যজ্ঞ হয়েছিল তার নাম দশাশ্বমেধ।
দাঁও
‘দাঁও’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ সুযোগ, সুবিধা, সহজে প্রচুর লাভ, সুযোগ বুঝে লাভজনক কিছু অর্জন করা প্রভৃতি। ‘দাও’ ফারসি শব্দ। ফারসি ভাষা থেকে এটি বাংলায় এসেছে। ফারসি ভাষায় শব্দটির উচ্চারণ হচ্ছে ‘দাও’। ফারসি ভাষায় ‘দাও’ শব্দের অর্থ হলো শতরঞ্জ বা পাশা খেলায় ঘুঁটি ফেলে সুবিধাজনক অবস্থান পাওয়া।

দাদখানি
‘দাদখানি’ অতি উৎকৃষ্টমানের এক প্রকার চাল। কথিত হয়, বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খানের (১৫৭৩-১৫৭৬) আমলে বঙ্গদেশে এ চালের চাষাবাদ শুরু হয়। সুলতানের দরবারে এ চালের বেশ চাহিদা ছিল। দাউদ খান নিজেও এ চাল পছন্দ করতেন। তাই এর নাম হয়ে যায় দাউদখানি চাল > দাদখানি চাল। দাউদখান কীভাবে দাদখানি হয়ে গেলেন এটাই বিস্ময়। অবশ্য বাংলায় এমন আরও অনেক শব্দের ব্যবহার আছে। যেমন আকবর থেকে আকবরি। শিশুকালে-পড়া কবি যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ; ১২ কার্তিক ১২৭৩ বঙ্গাব্দ  ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ; ১২ আষাঢ় ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ)-এর লিখিত ‘কাজের ছেলে’ কবিতায় বর্ণিত ‘দাদখানি চাল’ এখনও স্মৃতিকে উদ্বেল করে তোলে।

দাম/দরদাম
মহাবীর আলেকজান্ডারের আমলে গ্রিকদের একপ্রকার রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল ‘দ্রাখ্মে’। তিনি ভারতে আসার পর উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিশাল একটা এলাকা গ্রিক বা যবনদের দখলে ছিল। তখন দ্রাখ্মে দিয়ে দ্রব্যাদির মূল্য পরিশোধ করা হতো। এ ‘দ্রাখ্মে’ শব্দটির বানান ও উচ্চারণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে সংস্কৃতে ‘দ্রহ্ম’-রূপ ধারণ করে। এ ‘দ্রহ্ম’ শব্দ থেকে আসে দম্ম। দম্মের প্রাকৃত রূপের মধ্য দিয়ে আসে ‘দাম’। যার অর্থ মূল্য। আবার ‘দর’ শব্দের অর্থও মূল্য। ‘দাম’ শব্দের পূর্বে ‘দর’ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘দরদাম’। গ্রিক শব্দ হতে আগম ‘দাম’ এখন সংস্কৃত ‘মূল্য’ শব্দের চেয়ে অধিক জনপ্রিয়।

দায়ভাগ
হিন্দু উত্তরাধিকার-আইন। জীমুতবাহন এ আইন বাংলাদেশে প্রচলন করেন।
দাম্ভিক
‘দাম্ভিক’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অহঙ্কারী। সংস্কৃত হতে আগত শব্দটির মূল অর্থ ছিল কপটভাবে ধর্মপালনকারী ব্যক্তি। যে সকল ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য কপটভাবে ধর্মকর্ম করে তাদের প্রকাশের জন্য শব্দটি ব্যবহার করা হতো। তবে বাংলায় অতিথি হয়ে শব্দটি এর মূল অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। এখন দাম্ভিক বলতে কোনো বকধার্মিক বা বিড়াল তপস্বীকে বোঝায় না, দাম্ভিক বলতে অহঙ্কারী, দর্পী, অশালীন আচরণকারী প্রভৃতি লোকদের বোঝায়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম যারা পালন করত তারা ছিল স্বার্থপর, তাদের সিংহভাগ মৃত্যুর পরও নিজেদের আনন্দময় মনোবৃত্তি পূরণ এবং নরকের ভয়ে ও স্বর্গের লোভে ধর্ম পালন করত। ধর্মকর্ম পালন করত বলে তারা নিজেদের পরবর্তী জীবনে স্বর্গের একমাত্র অধিকারী ও ঈশ্বরের অতি প্রিয় দাবিতে দাম্ভিকতা প্রকাশ করত।

দিকবিদিক
‘দিকবিদিক’ শব্দের অর্থ দিক ও কোণ, চারদিক, সবদিক, হিতাহিত, ন্যায়-অন্যায়, বাহ্যজ্ঞান প্রভৃতি। ‘দিক’ ও ‘বিদিক’ নিয়ে দিকবিদিক শব্দের উৎপত্তি। ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত পার্শ্বনির্ধারক দশটি দিক রয়েছে। এর মধ্যে চারটি হলো ‘দিক’ এবং বাকি ছয়টি হলো ‘বিদিক’। দিকগুলো হচ্ছে : উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম এবং বিদিকগুলোর নাম : ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈর্ঋত, ঊর্ধ্ব ও অধঃ। যিনি এ সকল দিক ও বিদিক সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন তিনি চারপাশের বিষয়বস্তু ও প্রকৃতি নিয়ে সচেতন এমনটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। দিকবিদিক-জ্ঞান আধুনিক যুগেও লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর অন্যতম উপায় হিসাবে গণ্য করা হয়। তবে যারা দিকবিদিক জ্ঞান রাখে না, তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যায়। অতএব সফলতার জন্য দিকবিদিক-জ্ঞান আবশ্যক।

দিগগজ
‘দিগগজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মহামূর্খ, হস্তিমূর্খ (ব্যঙ্গার্থে)। অষ্টদিক ও অষ্টকোণ রক্ষাকারী হস্তিগণকে দিগগজ বলা হতো। অষ্টদিক ও অষ্টকোণ হচ্ছে : পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, নৈর্ঋত, ঈশান, অগ্নি ও বায়ু। অষ্টদিক ও অষ্টকোণ রক্ষাকারী হস্তিগণ হচ্ছেন : ঐরাবত, পুণ্ডরীক, বামন, কুমুদ, অঞ্জন, পুষ্পাদন্ত, সার্বভৌম ও সুপ্রতী। এ হস্তিগণ দিক রক্ষা করেন, দিকের প্রতি তীক্ষè দৃষ্টি রাখেন এবং দিকসমূহের যাবতীয় বিষয় দেবতাগণকে জানিয়ে দেন। দিগগজগণ সকল দিক ও সকল কোণসমূহের সকল সংবাদ রাখতেন, জানতেন ও বুঝতেন। এ জন্য তাঁদেরকে মহাপণ্ডিত হিসেব গণ্য করা হতো। দিগগজগণের এ সর্বজ্ঞ বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলা ভাষায় ‘দিগগজ’ শব্দটি মহাপণ্ডিত অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তবে সংস্কৃত ভাষার দিগগজ বাংলায় প্রবেশ করে তার অর্থ ধরে রাখতে পারলেও মান ধরে রাখতে পারেনি। বাংলা ভাষায় দিগগজ বলতে মহাপণ্ডিত বোঝালেও তা ব্যঙ্গার্থে প্রকৃতপক্ষে মহামূর্খকেই ইঙ্গিত করে।

দুরন্ত
শব্দটির প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ অশান্ত, দামাল, ভীষণ ও প্রখর প্রভৃতি। দুঃ ও অন্ত শব্দের সমন্বয়ে দুরন্ত শব্দটি গঠিত। ‘দুঃ’ শব্দের অর্থ খারাপ, ক্লেশ, কষ্টকর, অসহনীয় প্রভৃতি আর ‘অন্ত’ শব্দের অর্থ শেষ। সুতরাং ‘দুরন্ত’ শব্দের অর্থ হচ্ছে যার শেষটা কষ্টকর বা যার শেষ জীবন কষ্টদায়ক। কিন্তু শব্দটি বাংলায় এসে তার মূল ও আদি অর্থ হারিয়ে চমৎকার একটা শোভনীয় অর্থ ধারণ করে বসে আছে। এর কারণ আছে। একসময় বাংলায় যারা অশান্ত, দামাল, ভীষণ কিংবা প্রখর প্রকৃতির বা প্রচণ্ড একরোখা প্রকৃতির হতো তাদের শেষ জীবন কষ্টে যেত। কথায় বলে বাঘের বল বারো বছর। এ রকম চরিত্রের মানুষরা যৌবনকালে অনেককে কষ্ট দিত বা তাদের আচরণকে অনেকে অশোভনীয় মনে করত। ফলে শেষ বয়সে তারা কারও স্নেহ-সহানুভূতি পেত না। তাই ‘দুরন্ত’ শব্দটি বাংলায় এসে তার অর্থ হারিয়ে অশান্ত, দামাল, ভীষণ ও প্রখর প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে। অবশ্য এখন দুরন্তদের শেষকাল কষ্টে যায় না। যাদের দুরন্ততা সমাজ ও মানুষের কল্যাণ করে তারা শেষ বয়সেও মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় মনোরম জীবনযাপন করে।

দুষ্মন্ত
পুরুবংশীয় এক বিখ্যাত রাজা। একদিন বনে হরিণ-শিকারকালে মালিনী নদীর তীরে অবস্থিত কণ¦মুনির আশ্রমে উপস্থিত হন। কণ¦মুনি অনুপস্থিত থাকায় মুনির পালিতা কন্যা শকুন্তলা রাজাকে যথাসম্মানে অভ্যর্থনা জানান। দুষ্মন্ত শকুন্তলার পরিচয় জানতে চাইলে শকুন্তলা তাঁর পরিচয় ব্যক্ত করেন। বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গের জন্য ইন্দ্র নিজে মেনকা নামের এক অপ্সরাকে দায়িত্ব দেন। বিশ্বামিত্র অপ্সরার রূপে মুগ্ধ হয়ে তপস্যা ভঙ্গ করে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। ফলে, মেনকার গর্ভে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কন্যাকে মালিনী নদীর তীরে ফেলে দিয়ে মেনকা স্বর্গে গমন করেন। স্নান করতে গিয়ে কণ¦মুনি কন্যাকে শকুন্ত (পাখি) দ্বারা রক্ষিত হতে দেখে নিজের আশ্রমে এনে কন্যার মতো লালন-পালন করতে থাকেন। শকুন্ত-রক্ষিত কন্যা বলে তার নাম হয় শকুন্তলা। রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার পালিত পিতা কণ¦মুনির অপেক্ষা না-করেই গান্ধর্ব মতে শকুন্তলাকে বিয়ে করতে চান। শকুন্তলা বিবাহে সম্মতি প্রকাশের পূর্বে এ প্রতিশ্র“তি আদায় করে নেন যে, শকুন্তলার ঔরসজাত সন্তানই হবে রাজ্যের পরবর্তী রাজা। শকুন্তলার গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ছয় বছর বয়স হতেই সে বালক সকল প্রকাল জন্তু-জানোয়ার দমন করতে পারতেন। এ জন্য তার নাম হয় ‘সর্বদমন’। সর্বদমন যুবক হওয়ার পর রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে পুত্রসহ চতুরঙ্গ সৈন্যের দ্বারা রাজ্যে নিয়ে আসেন। রাজসভায় শকুন্তলা রাজাকে পূর্ব-প্রতিশ্র“তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁর সন্তানকে রাজা হিসাবে অভিষিক্ত করার প্রার্থনা করেন। দুষ্মন্ত পূর্বপ্রতিশ্র“তির কথা স্মরণ থাকা সত্ত্বেও বিস্মৃতির অজুহাত তুলে শকুন্তলাকে যেথা-খুশি-সেথা চলে যেতে বলেন। শকুন্তলা দুষ্মন্তকে তিরস্কার করে সভাস্থল ত্যাগ করতে চাইলে দৈববাণী হয় যে, দুষ্মন্তই শকুন্তলার পুত্রের পিতা এবং তিনি যেন দুষ্মন্তকে লালন-পালন করেন ও ‘ভরত’ নাম রাখেন। তখন দুষ্মন্ত শকুন্তলা ও তার পুত্রকে গ্রহণ করেন। আসলে দুষ্মন্ত দৈববাণীর মাধ্যমে রাজসভায় শকুন্তলা ও তার পুত্রের আসল পরিচয় বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে উপস্থাপনের কৌশল হিসাবে বিস্মৃতির ভাব ধরেছিলেন। যথাকালে ভরত রাজা হিসাবে অভিষিক্ত হন। আর এই ভরতের নামানুসারে এদেশের নাম হয় ভারতবর্ষ। দুষ্মন্তের অপর স্ত্রী লক্ষণার গর্ভজাত পুত্রের নাম জনমেজয়।

দেখ্ভাল্
হিন্দি ‘দেখ্না-ভাল্না’ শব্দ হতে বাংলা ‘দেখ্ভাল্’ শব্দের উৎপত্তি। এটি বাংলায় আগত নতুন শব্দ। ‘দেখ্না’ মানে দেখা এবং ‘ভাল্না’ মানে ভালোভাবে দেখা। দুটো প্রায় সমার্থক সহচর শব্দ। এ শব্দ-দুটোর মিলনে গঠিত হয়েছে ‘দেখ্ভাল্’।

দেবর্ষি
স্বর্গীয় ঋষি। এদের স্থান স্বর্গে। এ সব ঋষি পৃথিবীতে উন্নত জীবন-যাপন করার মাধ্যমে দেবতার শ্রেণিভুক্ত হয়ে গিয়েছেন। এমন ঋষির মধ্যে নারদ অন্যতম।
দৈত্য
কশ্যপের ঔরসে ও দক্ষরাজের কন্যা দিতির গর্ভজাত বংশধরগণ দৈত্য নামে পরিচিত। দেবতাদের সঙ্গে ছিল এদের চিরন্তন বিরোধ ও যুদ্ধ। দেবতাদের সঙ্গে দৈত্যের অসংখ্য যুদ্ধ ও জয়পরাজয়ের কাহিনি মহাভারত ও পুরাণে বর্ণিত আছে। ‘দানব’ হচ্ছে প্রায় দৈত্য শ্রেণিভুক্ত।

দোর্দণ্ড
সংস্কৃত ‘দোর্দণ্ড’ শব্দের বাংলা অর্থ প্রবল প্রতাপ। সংস্কৃত ‘দোঃ’ ও ‘দণ্ড’ মিলে ‘দোর্দণ্ড’ শব্দের উৎপত্তি। ‘দোঃ’ শব্দের অর্থ বাহু ও ‘দণ্ড’ শব্দের অর্থ লাঠি। সুতরাং দোর্দণ্ড শব্দের অর্থ দণ্ডরূপ বাহু বা দৃঢ়বাহু। ব্যবহারগতভাবে শব্দটির আদি অর্থ ছিল বলশালী ব্যক্তি। পরে শব্দটির অর্থের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। এখন শব্দটি আর বাহুবল হিসাবে ব্যবহৃত হয় না। বস্তুত আধুনিক যুগে লাঠির শক্তি শেষ। এখন কারও প্রভাব, শাসন, প্রতাপ বা পরাক্রমশীলতা প্রভৃতি যখন প্রতাপান্বিত হয়, তখন তাকে দোর্দণ্ড বলা হয়।

দ্বারকা
গুজরাটের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান। কৃষ্ণের নির্দেশে বিশ্বকর্মা এই শহর নির্মাণ করেন। কংসবধের পর কংসের শ্বশুর জরাসন্ধ ও অসুর কালযবনের অত্যাচার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণ যাদবগণকে নিয়ে দ্বারকায় আসেন। যদুবংশ ধ্বংসের পর যাদব-নারীদের নিয়ে অর্জুন হস্তিনাপুর যাত্রা করার সঙ্গে সঙ্গে দ্বারকা সমুদ্রগর্ভে প্লাবিত হয়ে যায়। দ্বারকা হিন্দুদের পরম তীর্থস্থান।

দ্বিগু
‘দ্বি গো যার বা যাকে গোদ্বয়ের বিনিময়ে ক্রয় করা হয়েছে অথবা যার দুটো গরু আছে’ তাকে দ্বিগু বলা হয়। শব্দটির ব্যবহার ব্যাকরণ পাঠের সময় ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। প্রকৃতপক্ষে দুটো গো (যা যায়) জোড়া হয় যে সমাসে, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। যেমন ‘ত্রি’ আর ‘ভুবন’ এ দুটো হলো গো। দ্বিগু সমাস এ দুটো গো-কে অক্ষত রেখে ‘ত্রিভুবন’ শব্দ গঠিত হয়েছে।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!