বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন
ষষ্ঠদশ অধ্যায়

ধনঞ্জয়
অর্জুনের অন্য নাম ধনঞ্জয়। সমস্ত জনপদ জয়পূর্বক প্রচুর ধন-সম্পদ সংগ্রহ করে তার মধ্যে বসবাস করতেন বলে অর্জুন ‘ধনঞ্জয়’ নামে পরিচিত।

ধন্য
‘ধন্য’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কৃতার্থ, সাধু, প্রশংসনীয়, সৌভাগ্যবান প্রভৃতি। সংস্কৃত ভাষা থেকে ‘ধন্য’ শব্দটি বাংলায় এসেছে। ধন্য শব্দের আদি অর্থ ধনশালী। যার প্রচুর ধন রয়েছে তিনি ধন্য। কিন্তু বাংলা ভাষায় ধন্য শব্দের অর্থ ধনবান না-বোঝালেও অন্তর্নিহিত অর্থ অনেকটা অভিন্ন। কারণ বাংলা ভাষায় তিনিই ধন্য যিনি সৌভাগ্যবান, ধনের অধিকারী না-হলেও নানা কৃতিত্বের অধিকারী। আবার যিনি ধনের অধিকারী তিনিও ধন্য। কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সময় বলা হয় ‘ধন্যবাদ’, অর্থাৎ যিনি কৃতার্থ করেছেন তাঁকে প্রশংসামূলক ধন্য বা ভাগ্যবান আখ্যায়িত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আবার ‘ধন্য’ শব্দের সঙ্গে মিল রয়েছে ‘ধান’-এর। এজন্য কবি গেয়েছেন : ধনধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা…। দেখা যায়, সংস্কৃত হতে বাংলায় এসে শব্দটির অর্থের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে কিন্তু মূল অর্থ অন্তর্নিহিত অনুভব বিবেচনায় রয়ে গেছে অভিন্ন।

ধন্বন্তরি
‘ধন্বন্তরি’ শব্দের অর্থ অব্যর্থ শক্তিসম্পন্ন ঔষধ বা চিকিৎসক। ভারতীয় পুরাণের একটি ঘটনার সঙ্গে ‘ধন্বন্তরি’ শব্দটির অর্থ ও ব্যুৎপত্তি যুক্ত। সত্যযুগে দেবতা ও অসুরগণ সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁরা অমৃত পান করে অমর ও নিরাময় হবেন। অমৃত লাভের জন্য তাঁরা মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড ও নাগরাজ বাসুকীকে মন্থনরজ্জু হিসাবে নির্ধারণ করে ক্ষীরোদ সমুদ্র মন্থন করতে শুরু করেন। মন্থনকালে লক্ষ্মী, অপ্সরাসহ আরও অনেক কিছুর সঙ্গে অমৃত ভাণ্ড হস্তে ধন্বন্তরি সমুদ্রগর্ভ হতে আবির্ভূত হন। পরে দেবতারা তাঁকে দেব-চিকিৎসক মনোনীত করেন। দেবতাগণের চিকিৎসক ‘ধন্বন্তরি’র নামানুসারে বাংলা ‘ধন্বন্তরি’ শব্দের উৎপত্তি।

ধর্ম
যমের অন্য নাম ধর্ম। তিনি মৃতদের ধর্মাধর্মের বিচার করেন বলে তাকে ধর্মরাজ বলা হয়। ধর্মরাজের বাহন হচ্ছে মহিষ ও আয়ুধ দণ্ড।

ধর্মঘট
সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে কিছু করা বা করা হতে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখা অর্থে ‘ধর্মঘট’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। তবে ধর্মঘট শব্দের ব্যুৎপত্তির সঙ্গে বর্তমানে প্রচলিত অর্থের মিল নেই। ‘ধর্মঘট’ অর্থ লৌকিক দেবতা ধর্ম ঠাকুরের উদ্দেশে নিবেদিত ঘট। ধর্ম ঠাকুরকে সাক্ষ্য রেখে প্রতিবছর বৈশাখ মাসে গঙ্গাজলে পূর্ণ করে এ ঘট স্থাপন করে কোনো বিষয়ে সিদ্ধিলাভের জন্য প্রতিজ্ঞা করা হতো। ধর্ম ঠাকুরের উপাসকদের বিশ্বাস ছিল, কোনো অধার্মিকের পক্ষে ধর্মঘট উত্তোলন বা ভঙ্গ করা সম্ভব নয়। ধর্মঘট স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা ও সিদ্ধিলাভের জন্যই ধর্মঘট শব্দটি ক্রমান্বয়ে ধর্ম ছেড়ে দাবি আদায়ের আন্দোলনে চলে আসে। মধ্যযুগের বাংলা কবিতায় ধার্মিক শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে ‘ধর্মঘটি’ শব্দ প্রচলিত ছিল।
এখন ধর্মঘট বলতে ধার্মিক বোঝায় না, যারা ধর্মঘট করেন তাদের বোঝায়। যারা ধর্মঘট করেন তাঁরা নিজেদের দাবি ন্যায্য-গণ্যে উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার প্রতিজ্ঞা করেন। অন্যদিকে প্রতিপক্ষরা ধর্মঘটীদের অন্যায্য ও সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে প্রতিহত করার প্রয়াস নেন।

ধর্মপুত্র
যুধিষ্ঠিরের অপর নাম ধর্মপুত্র। দুর্বাসার মন্ত্র-প্রভাবে কুন্তী ধর্মকে (যম) আকর্ষণ করেন। যমের ঔরসে ও কুন্তীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়।

ধর্মশাস্ত্র
এটি হিন্দুদের ধর্মপ্রতিপাদক গ্রন্থ। এটাকে আইনগ্রন্থও বলা হয়। পূর্বে প্রধানত মনুস্মৃতি ও যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি প্রভৃতিকে ধর্মশাস্ত্র বলা হতো। পরে ভগবান হতে ঋষিদের প্রাপ্ত যে সকল বিধান স্মৃতি হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তা ধর্মশাস্ত্র নামে পরিচিতি পায়। এ ধর্মশাস্ত্র তিনটি গুণবিশিষ্ট ছিল। যথা : আচার, ব্যবহার এবং প্রায়শ্চিত্ত।

ধস্তাধস্তি
‘ধস্তাধস্তি’ শব্দের অর্থ পরস্পর বলপ্রয়োগ, টানা-হ্যাঁচড়া প্রভৃতি। শব্দটি এখন বাংলা ভাষার অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি এসেছে ফারসি ভাষা হতে। মূলত ফারসি ‘দস্ত্ ওয়া দস্ত্’ বাগ্ভঙ্গির সঙ্গে ই-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘ধস্তাধস্তি’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ভাষায় ‘দস্ত্ ওয়া দস্ত্’ বাগভঙ্গির অর্থ হচ্ছে ‘হাতে-হাতে’ অথবা ‘হাতে হাত রাখা’ বা ‘হাতের উপর হাতের চাপ প্রদান’ ইত্যাদি। উল্লেখ্য ফারসি ‘দস্ত্’ শব্দের অর্থ হাত। এর দ্বারা ফারসি ভাষায় সহযোগিতা, দ্রুততা, আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য, সৌজন্য প্রভৃতি প্রকাশ করা হতো। তবে বাংলায় ফারসি এ বাগ্ভঙ্গিটি তার উচ্চারণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থ ও অন্তর্নিহিত ভাবেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। হাতে হাত রাখলে বাংলাদেশে আন্তরিকতা বোঝায় কিন্তু ফারসি ভাষায় হাতে হাত রাখলে আন্তরিকতা না-বুঝিয়ে বরং বলপ্রয়োগ বোঝায়। ফারসি ‘দস্ত্ ওয়া দস্ত্’ বা হাতে হাত বাংলায় সহযোগিতা বোঝায় না, বরং হাতকে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া কিংবা ধাক্কা দেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। ফারসি সৌজন্যময় করস্পর্শ বাংলায় এসে ‘ধস্তাধস্তি’ বা প্রবল হস্তচাপ ও ধাক্কাধাক্কিতে রূপ নিয়েছে।

ধান
‘ধান’ এক প্রকার খাদ্যশস্য। বাংলাভাষী সবার কাছে এটি অতি পরিচিত ও প্রিয় একটি শস্য। পৃথিবীর সব দেশে সব মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ‘ধান’ নামক এ শস্যটি সৃষ্টির সূচনা হতে মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য অনুপমতায় জড়িয়ে। তবে ধান শব্দটি বাংলা নয়। সংস্কৃত ‘ধান্য’ শব্দ হতে বাংলা ‘ধান’ শব্দের উৎপত্তি। সংস্কৃতে ‘ধান্য’ শব্দের অর্থ যাহা পোষণ করে। সে অর্থে যে সকল শস্য দেহ পোষণ করে সেগুলো ধান্য। সংস্কৃত ‘ধান্য’ শব্দের এ অর্থ বিবেচনায় গম, যব, ভুট্টা প্রভৃতিও ধান্য। কিন্তু বাংলায় ‘ধান’ বলতে কেবল যার থেকে চাল বের করা হয় সেটাকে বোঝায়। সংস্কৃত ভাষায় ধান্যকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা : শালি, ব্রীহি, শূক, শিম্বি ও ক্ষুদ্র। শালি হলো সে-ই শস্যদানা বাংলা ভাষায় যাকে ধান বলা হয়। এ শস্যদানা সতুষ অবস্থায় ধান, নিষ্তুষ করলে চাল এবং সিদ্ধ করলে ভাত হয়। ব্রীহিধান্য হলো : তিল; শূকধান্য হলো যব ও গম; শিম্বিধান্য হলো কলাই এবং ক্ষুদ্র ধান্য হলো কাউন। সংস্কৃত ভাষায় ধান্য বলতে যা-ই বোঝানো হোক না কেন, বাংলা ভাষায় ধান বলতে কেবল শালিধান্যকে বোঝায় যার থেকে চাল বের করে সিদ্ধ করলে ভাত হয়। এটিই আমরা তরি-তরকারি দিয়ে মনের সুখে খাই।

ধুন্ধুমার কাণ্ড
‘ধুন্ধুমার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ গণ্ডগোল, ভীষণ গণ্ডগোল, মহা তোড়জোড়, তুমুল কাণ্ড, মহা কোলাহল, মহা বিশৃঙ্খলা প্রভৃতি। মহাভারতে বর্ণিত বনপর্বের একটি মহা প্রকাণ্ড কাণ্ড থেকে ‘ধুন্ধুমার কাণ্ড’ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। ধুন্ধু নামের এক ভয়ঙ্কর দানব প্রবল ও একনিষ্ঠ তপস্যার বলে ব্রহ্মের নিকট থেকে বিশাল এক বর পেয়ে বসেন। এ বরের কারণে তিনি দেব-দানব ও রাক্ষস সবার অবাধ্য হয়ে ওঠেন। সমুদ্রের তলদেশে বালুকাময় একটি স্থানে ধুন্ধু বাস করতেন। ধুন্ধুর বাসস্থানের নিকট অন্য একটি স্থানে মহর্ষি উতঙ্কের আশ্রম ছিল। ধুন্ধু প্রায় সময় উতঙ্কের আশ্রমে নানাবিধ উপদ্রব করে আশ্রমের শান্তি ও মর্যাদার বিঘ্ন ঘটাত। বিরক্ত উতঙ্ক ধুন্ধুর অত্যাচার হতে রেহাই পাওয়ার জন্য অযোধ্যার রাজা কুবালেশ্বরের শরণাপন্ন হন। কুবালেশ্বর তাঁর একুশ হাজার পুত্র ও অসংখ্য সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ধুন্ধুকে বধ করার জন্য অভিযান শুরু করেন। এক সপ্তাহ ধরে বালুকাপূর্ণ সমুদ্র খনন করার পর ধুন্ধুকে পাওয়া যায়। ধুন্ধু তখন গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে ক্রুদ্ধ ধুন্ধু তার মুখনিঃসৃত অগ্নির প্রবল তাপে কুবালেশ্বরের সকল পুত্র ও সৈন্য-সামন্তকে ভস্ম করে দেন। কুবালেশ্বর ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে ধুন্ধুকে বধ করেন। ধুন্ধুকে মারার জন্য কুবালেশ্বর ‘ধুন্ধুমার’ নামে পরিচিতি পান। ধুন্ধুকে বধ করার জন্য যে মহা আয়োজন ও কর্মযজ্ঞ হয়েছিল তা-ই মূলত এ ‘ধুন্ধুমার কাণ্ড’ বাগ্ভঙ্গিটিতে উঠে এসেছে।

ধুরন্ধর
মানুষের মতো শব্দও মাঝেমধ্যে দুর্গতির মধ্যে পড়ে, তা রোধ করা যায় না। টাউট, শয়তান, ধড়িবাজ লোককে আমরা এখন বলি ধুরন্ধর। অথচ ষাট-সত্তর বছর আগেও ‘ধুরন্ধর’ শব্দটার এমন দুর্গতি ছিল না। তখন নেতা থেকে শুরু করে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে অনায়াসে ধুরন্ধর বলা যেত। আগে যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ সবাই ধুরন্ধর বিবেচিত হতো। অনেক গুণ না থাকলে ধুরন্ধর হওয়া যায় না। তাই বহু গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকেও ধুরন্ধর বলা যেত। উপাচার্য, অধ্যক্ষ, মহাপরিচালক, অধ্যাপক, নায়ক, লেখক সবাইকে তখন অনায়াসে ধুরন্ধর বলা সম্ভব ছিল।
‘ধুরন্ধর’ শব্দের সেদিনের সেই গৌরবের কথা মনে রেখে আজ যদি কেউ সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, আমাদের প্রাণপ্রিয় অতি ধুরন্ধর নেতা আপনাদের সামনে এখন ভাষণ দেবেন, তাহলে তার পরিণতি কী হবে, তা ভেবে বলা যায়, না ভেবেও বলা যায়। একালের ধুরন্ধরেরা হয়তো তখন ঘোষককে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে দেবেন।
‘ধুরন্ধর’ শব্দের মূল অর্থ হলো ভারবাহী বা ভারবাহক। প্রাচীনকালে ঘোড়া, গাধা, হাতি প্রভৃতিই ছিল ধুরন্ধর বা ভারবাহক। কারণ, তারা তখন মানুষের ভারী বোঝা বহন করত। কিন্তু মানুষ গাধা-ঘোড়াকে ধুরন্ধর শব্দের ভার দীর্ঘদিন বইতে না দিয়ে নিজেরাই একদিন ধুরন্ধরকে পিঠে তুলে নেয়। শুরু হয় ধুরন্ধর শব্দের আলঙ্কারিক প্রয়োগ। যিনি অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে কোনো দায়িত্ব অনায়াসে বহন করতে পারেন, তিনি হন ধুরন্ধর। পরিতাপের কথা, একালে এসে ধুরন্ধর শব্দটা অর্থগত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। চতুর, ধড়িবাজ ও ঘড়েলরা হয়ে পড়েছে ‘ধুরন্ধর’।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!