বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

সপ্তদশ অধ্যায়

নখদর্পণ
‘নখদর্পণ’ শব্দটি কোনো বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান বা সবিস্তার উপলব্ধি বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। নখ ও দর্পণ শব্দ মিলে নখদর্পণ বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। এর অন্যান্য অর্থ হলো : অলৌকিক শক্তিবলে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে নিজের নখে প্রতিবিম্বিত করে দেখানো; ২. (আল.) নিখুঁত ও সুস্পষ্ট জ্ঞান। নখদর্পণ = নখ দর্পণ যার। নখ-এর আর একটি অর্থ ইন্দ্রিয় নেই যার। তবে নখদর্পণ শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে নখই দর্পণ যাতে, দর্পণতুল্য প্রতিবিম্বিত অভীষ্ট বিষয়ের দর্শন করে যা, কোনো বিষয়ের ঘটনাবলির পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে প্রদর্শনের ব্যবস্থা আছে যাতে তাকেও নখদর্পণ বলা যায়। নখদর্পণ যখন বাগ্ধারা তখন এর অর্থ সবিশেষ অবগত বিষয়। হাত মানবশরীরের একটি শ্রেষ্ঠ অঙ্গ। হাতের ব্যবহার মানে আঙুলের ব্যবহার। আর আঙুলের ব্যবহার করতে গেলে নখ সবার আগে যায়। নখের প্রাণ নেই বলে এর ব্যবহারে শরীরের অন্য অংশের চেয়ে ভয় কম। ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও কম। অচেনা-অজানা বস্তুকে মানুষ সবার আগে নখ দিয়ে ছুঁয়ে, আঁচড়ে দেখে।
তার মানে হাতওয়ালা প্রাণী দৈহিকভাবে কারও সঙ্গে কোনো আচরণ করতে গেলে সবার আগে নখ ব্যবহার করে। নখ দিয়ে দেখলে কোনো অচেনা-অজানা বিষয়ের সব বিষয়ও জ্ঞাত হওয়া যায় যা সাধারণত চোখ দিয়ে দেখে বলা বা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। একটা জিনিস নরম নাকি শক্ত তা তো আর চোখ দিয়ে বোঝা যায় না। তা জানার জন্য নখ দিয়ে দেখতে হয়। তার মানে নখেরও চোখ আছে। দর্পণে যেমন কোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় নখ দিয়েও। অর্থাৎ আমাদের অস্তিত্বের বাইরের বস্তুসমূহের বিষয়ে প্রায়োগিক জ্ঞান সবার আগে লাভ করে নখ। ‘নখ’ আর ‘দর্পণ’ শব্দদ্বয়ের সম্মিলনে নখদর্পণ। দর্পণ মানে দেখা। একজন মানুষের নখ তার কাছে সবচেয়ে ভালোভাবে এবং সহজে দেখার বিষয়। শরীরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জানা থাকে নখ সম্পর্কে। তাই নখদর্পণ মানে ভালোভাবে দেখা হয়েছে বা জানা আছে এমন কোনো বিষয়। তবে এটি ‘নখদর্পণ’ শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : এমন বিষয় যা কারও সম্পূর্ণ জ্ঞান বা আয়ত্তে আছে। যেমন বাংলা বানান-রীতি তার নখদর্পণে।
নখদর্পণ সম্পর্কে বাংলা একাডেমি ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (২০১৪) লিখেছে : ‘বি. ১. নখরূপ দর্পণ বা নখই দর্পণ; যাতে মুখ দেখা যায়। ২. বিদ্যাবিশেষ এ বিদ্যা বলে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি নখরূপ দর্পণে সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় দেখতে পায়। ৩. (আল.) পূর্ণরূপে জ্ঞাত (তাস খেলায় এরা সব ঘুণ) কোন্ হাতে কী তাস আছে সব এদের নখদর্পণে।
নখরূপ দর্পণে পৌরাণিক মুনি-ঋষিগণ বিশ্বদর্শন করতেন। কথিত হয়, প্রাচীনকালে একপ্রকার গুণিন ছিলেন। তাঁদের কাছে কেউ কোনো কিছু জানার জন্য গেলে গুণিন তাঁর বুড়ো আঙুলের নখে তেল মাখিয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে আগত ব্যক্তিকে নখের দিকে তাকিয়ে অভীষ্ট বিষয় দেখাতেন। তখন নখটি আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে আগত ব্যক্তির ভূত-ভবিষ্যতের প্রতিফলন ঘটাত। এ সকল অনুষঙ্গে ‘নখদর্পণ’ বাগ্ভঙ্গিটি এমন অর্থ ধারণ করে।

নগর
নগর শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ বড় শহর। ‘নগ’ শব্দের অর্থ পাহাড় বা পর্বত। বস্তুত ‘নগ’ শব্দ থেকে নগর শব্দের উৎপত্তি। বড় শহরে সাধারণত পর্বত-উঁচু দালান দেখা যায়। নগর শব্দের মূল অর্থ যেখানে বাড়িঘর ‘নগ’ অর্থাৎ পর্বতের সমান উঁচু। অতএব ব্যাকরণগতভাবে এ ‘নগ’ শব্দের সঙ্গে ‘নগর’ শব্দের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সংগতকারণে শব্দের অর্থটাও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নটরাজ/তাণ্ডবনৃত্য
নৃত্যকলার উদ্ভাবক হিসাবে মহাদেবের আর এক নাম ‘নটরাজ’। কথিত হয়, তিনি নৃত্যের মাধ্যমে বিশ্বকে ধ্বংস করবেন। বিশ্বধ্বংসকালীন এ নৃত্যকে ‘তাণ্ডবনৃত্য’ বলা হয়। গজাসুর ও কালাসুর নিধন করেও মহাদেব তাণ্ডব নৃত্যে রত হয়েছিলেন। অন্য মতে, উত্তেজক দ্রব্য পান করার পর তিনি স্ত্রীর সঙ্গে তাণ্ডবনৃত্যে রত হন।

নন্দ
শ্রীকৃষ্ণের পালকপিতা নন্দগোপাল। মথুরার অপরদিকে অবস্থিত গোকুল গ্রামে গোপজাতীয় নন্দের বাস ছিল। সে সময় কংস মথুরার রাজা ছিলেন। নন্দের স্ত্রীর নাম যশোদা। যে রাতে যশোদার গর্ভে মহামায়া কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন, সে রাতে শ্রীকৃষ্ণও মথুরার কারাগারে দেবকীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। বসুদেবের স্ত্রী দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে কংসের মৃত্যু হবে এরূপ দৈববাণী ছিল। কংসের ভয়ে বসুদেব জল-ঝড়পূর্ণ মধ্যরাতে কৃষ্ণকে নন্দের বাড়িতে নিদ্রিতা যশোদার কোলে রেখে দেন এবং গোপনে যশোদার কন্যা মহামায়াকে এনে দেবকীর কোলে রেখে দেন। মহামায়ার জন্মের সময় তাঁর মায়াতে সকলেই আচ্ছন্ন ছিল। এজন্য বসুদেবের এ সন্তান-পরিবর্তন কেউ টের পায়নি। এদিকে কংস কৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্ত জানতে পেরে তাঁকে বধ করার জন্য গোকুলে ছদ্মবেশী চরদের পাঠান। নন্দ ভীত হয়ে কৃষ্ণকে বৃন্দাবনে নিয়ে যান। একদিন কংসের যজ্ঞে নিমন্ত্রিত হয়ে নন্দ কৃষ্ণকে নিয়ে মথুরায় যান। সেখানে কৃষ্ণ কংসকে বধ করে তাঁর সিংহাসন অধিকার করেন।

নন্দিগ্রাম
অযোধ্যা হতে এক ক্রোশ দূরে অবস্থিত। রামকে বনবাস থেকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ ভরত অযোধ্যায় না-গিয়ে এখানে বসবাস করে রাজ্যপালন করতেন। লঙ্কাজয়ের পর চতুর্দশ বর্ষে বনবাস শেষ হলে, রাম এ স্থানে ভ্রাতৃগণের সঙ্গে মিলিত হন এবং অযোধ্যায় ফিরে আসেন।

নবগ্রহ
ভারতীয় পুরাণ মতে রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু ও কেতু ‘নবগ্রহ’।

নাক উঁচু
‘নাক উঁচু’ কথাটির আভিধানিক অর্থ গর্বিত, আত্মাভিমানী, অসহ্য রকমের পছন্দপ্রবণ। তবে এর ব্যাকরণগত অর্থ অন্যরকম। নাক ও উঁচু শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে ‘নাক উঁচু’ বাগ্ধারটির সৃষ্টি। ঘটনাচক্রে নাকের একটি অনৈচ্ছিক আচরণ থেকে কথাটির উৎপত্তি। কোনো কিছু দেখে অবজ্ঞায় নাক সিঁটকালে নাকের ডগার দুপাশ সামান্য উঁচু হয়ে যায়। নাকের এ বিকৃত উঁচু-ভাবটাই বাংলা বাগ্ভঙ্গিতে ‘নাক উঁচু’ কথায় স্থান করে নিয়েছে।

নাকানিচুবানি
অসহায়ভাবে অপমানিত হওয়া, লাঞ্ছিত হওয়া বা করা। ‘নাকানি’ ও ‘চুবানি’ শব্দ দুটোর সংযোগে নাকানিচুবানি শব্দের উৎপত্তি। নাক পর্যন্ত যে পানি তার এককথায় প্রকাশ হলো নাকপানি। অন্যদিকে চুবানি শব্দের অর্থ হচ্ছে পানিতে ডোবানো ও ভাসানো। সুতরাং ‘নাকানিচুবানি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নাক পর্যন্ত পানিতে ডোবানো ও ভাসানো। নাক পর্যন্ত কাউকে পানিতে ডোবালে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। আবার ভাসালে সে নিঃশ্বাস নিতে পারে এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার নাক পর্যন্ত ডোবালে আবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এভাবে কাউকে বারবার পানিতে নাক পর্যন্ত ডোবানো ও ভাসানো হলে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত কষ্টে তার অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে। এটি খুব কষ্টকর অবস্থা। ব্যক্তিজীবনে মানুষ যখন কোনো কারণে এমন কষ্টকর অবস্থায় পড়ে সেটি প্রকাশের জন্য ‘নাকানিচুবানি’ বাগ্ভঙ্গি ব্যবহার করা হয়।

নাগর
অবৈধ প্রেমিকা, গোপন প্রণয়ী, প্রগলভ প্রণয়ী প্রভৃতি অর্থে শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। এককালে ‘নাগর’ বলতে বোঝাত নগরবাসী বা নাগরিক। তাছাড়া বিদগ্ধ, শান্তশিষ্ট, সভ্য, ভদ্র, রসিক প্রভৃতি অর্থে ‘নাগর’ শব্দটির বহুল প্রচলন ছিল। এখন ‘নাগর’ শব্দটি এ সকল অর্থ হারিয়ে সত্যিকার অর্থে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। মধ্যযুগে এসে নাগর শব্দটি তার এমন মোহনীয় অর্থ হারিয়ে নায়ক, প্রিয়া, বঁধু প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে। পরবর্তীকালে শব্দটির আরও ব্যাপক অর্থাবনতি ঘটতে থাকে এবং এরূপ ঘটতে ঘটতে অবৈধ প্রেমিকা, গোপন প্রণয়ী, প্রগ্লভ প্রণয়ী প্রভৃতি অর্থে স্থিতি পায়। এর কারণ রয়েছে। মূলত সভ্য, ভদ্র, রসিকলোকদের চাহিদা প্রেম-সমাজে অধিক। তাই এককালের নাগর তথা শান্তশিষ্ট, সভ্য, ভদ্র ও রসিক প্রমুখ আধুনিক যুগে এসে নাগর তথা অবৈধ প্রেমিকা হয়ে যায়।

নাভিশ্বাস
শব্দটির আভিধানিক অর্থ শেষ অবস্থা, চরম অবস্থা। নাভি ও শ্বাস মিলে ‘নাভিশ্বাস’ বাগ্ভঙ্গির সৃষ্টি। এবার দেখা যাক নাভিশ্বাস কী। মৃত্যুর প্রাক্কালে নাভিদেশ হতে ঊর্ধ্বমুখী যে শ্বাসটান দেখা যায় সেটাকে নাভিশ্বাস বলে। মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তে এমন ঘটনা ঘটে। নাভিশ্বাস উঠলে বুঝতে হবে তার এখন শেষ অবস্থা। জীবন হতে সে চরম মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নাভিশ্বাস ঘটনার এ অনুষঙ্গটি বাংলা বাগ্ভঙ্গিতে শেষ অবস্থা বা চরম অবস্থা প্রকাশ করে। তবে বাগ্ভঙ্গির এ নাভিশ্বাস মৃত্যুকালীন নাভিশ্বাস নয়। মানুষ যখন কোনো বিষয় বা কাজে বা কোনো কারণে চরম বিপদে অসহায় হয়ে পড়ে তখন তার নাভিশ্বাসের মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়। সেটা বোঝাতে এ বাগ্ভঙ্গিটি প্রয়োগ করা হয়।

নারী
নারী শব্দের অর্থ ছিল নেত্রী। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘নারী’ শব্দের একটা দুর্দান্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভাষাবিদ বিজয়চন্দ্র মজুমদার। ‘ভারতী’ সাময়িকীতে (১৩২০ সন আশ্বিন সংখ্যায়) বিজয়চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, “বেদের ভাষার মধ্যে যাহা প্রাচীনতম সেই ভাষার স্ত্রীজাতির সাধারণ নাম ছিল ‘নারী’। এই নারী শব্দ ‘নর’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গের রূপ নহে। ‘নর’ শব্দটি সুপ্রাচীন বেদসংহিতায় প্রচলিত নেই। যে যুগে ‘নর’ শব্দ ছিল না, কিন্তু ‘নৃ’ শব্দ ছিল, সে যুগে স্ত্রী শব্দ প্রকাশের জন্য নারী শব্দের যথেষ্ট প্রচলন ছিল এবং নারী শব্দের অর্থ ছিল নেত্রী, পারিবারিক বিষয়ের নেত্রী; তিনি ভোগ বিলাসের রমণী বা কামিনী ছিলেন না।” বোঝাই যাচ্ছে নর শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হবার পর থেকেই নারী জাতির অবনতি শুরু।

নাস্তানাবুদ
‘নাস্তানাবুদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দুর্দশা, বিপর্যয়কর অবস্থা প্রভৃতি। ফারসি ‘নি¯্Í ওয়্্ নাবুদ্’ বাগ্ভঙ্গি থেকে বাংলা শব্দ ‘নাস্তানাবুদ’-এর উৎপত্তি। ‘নি¯্্Í ওয়্্ নাবুদ্’ বাগ্ভঙ্গির অর্থ হচ্ছে ‘নাই, ছিলও না’। যার বর্তমানে কিছু নেই এবং অতীতেও কিছু ছিল না সে নিতান্তই হতভাগা। সে-ই ‘নিস্ত্ ওয়্ নাবুদ্’। এমন লোকের কোনো কিছু করার, চাওয়ার বা পাওয়ার থাকে না। সংগতকারণে সে নিতান্তই দুর্দশাগ্রস্ত। বাংলায় এদের বলা হয় নাস্তানাবুদ।
নিথুয়া
‘নিথুয়া’ শব্দটি বাংলা একাডেমির অভিধানে নেই। এটি একটি আঞ্চলিক শব্দ। ব্যবহারও বিরল। থুয়ে (থুয়ে : অ-ক্রি. রেখে) থেকে থুয়া। এ থুয়া শব্দের সঙ্গে নি উপসর্গ যুক্ত হয়ে নিথুয়া শব্দ গঠিত হয়েছে। এর সম্প্রসারিত অর্থ : যেকোনো কিছু থুয়ে (রেখে) যায় না, নিষ্ঠুর, সর্বনাশা, বিশাল, যার ক্ষুধার শেষ নেই, নিষ্ঠুরতার অন্ত নেই প্রভৃতি। প্রয়োগ : নিথুয়া পাথারে, নেমেছি বন্ধুরে/ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই। এখানে নিথুয়া শব্দটি দিয়ে নিষ্ঠুর সাগরের কথা বলা হয়েছে যে-সাগর সবকিছু নিয়ে যায় কিছুই রেখে যায় না, মহা রাক্ষস।

 

নিমগ্ন
শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ আচ্ছন্ন, নিবিষ্ট, একাগ্র, অনন্যমনা প্রভৃতি। ‘নিমগ্ন’ শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ হচ্ছে নিচে মগ্ন। মূলত যা জলের নিচে বা জলে ডুবে রয়েছে তাকে ‘নিমগ্ন’ বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে ‘নিমগ্ন’ শব্দ জলের নিচে ডুবে থাকা অর্থে প্রয়োগ করা হয় না। কেন অর্থের এ পরিবর্তন, এর কি কোনো যৌক্তিক কারণ আছে? আগে জলের নিচে নিমগ্ন বিষয়টি এখন চিন্তায় বা চিন্তার নিচে ডুবে থাকা প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। একটি জলের নিচে আর একটি হচ্ছে চিন্তার নিচে। অতএব অর্থের পরিবর্তন হলেও অন্তর্নিহিত ভাব অভিন্ন রয়ে গেছে।

নিমেষ
‘নিমেষ’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ খুব কম সময়, মুহূর্ত প্রভৃতি। ‘নিমেষ’ শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ পলক, চোখের পাতার স্পন্দন, চোখের পাতা ফেলার মধ্যবর্তী সময়। পর পর দুবার চোখের পাতা ফেলতে সাধারণত যে সময় লাগে তাকে বলা হয় ‘পলক’ এবং এ পলক হচ্ছে ‘নিমেষ’। ‘পলক’ ফারসি শব্দ। ফারসি পলক শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে নিমেষ। নিমেষ বলতে এখন চোখের পলক বোঝায় না, এর দ্বারা খুব স্বল্প সময়কে প্রকাশ করা হয়।

নিরানব্বইয়ের ধাক্কা
টাকা জমানোর ঝোঁক, সম্পদ গড়ে তোলার অতিরিক্ত প্রবণতা, লোভ, লালসা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে বাগ্ধারাটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রচলিত একটি গল্প থেকে বাগ্ধারাটির উৎপত্তি। এক কৃপণ ব্যবসায়ীর মাত্রাতিরিক্ত খরচকারী এক ছেলে ছিল। ছেলেটি আজেবাজে খরচে ছিল খুব ওস্তাদ। একদিন কৃপণ ব্যবসায়ী গোপনে নিরানব্বই টাকার একটা থলে এমনভাবে এমন জায়গায় রেখে আসে যাতে থলেটি তার ছেলের হাতে পড়ে এবং পিতার কারসাজির মর্মে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি না হয়। ছেলে টাকার থলেটি বাড়ি এনে গুণে দেখে নিরানব্বই টাকা রয়েছে। ছেলেটি নিরানব্বই টাকার সঙ্গে এক টাকা যোগ করে একশ টাকা করে। একসঙ্গে একশ টাকা দেখে ছেলের মধ্যে টাকা সঞ্চয় ও সংগ্রহের লোভ সৃষ্টি হয়। অতঃপর টাকা জমানোর নিমিত্ত সে প্রায় সকল খরচ বন্ধ করে দেয়। তার জমা টাকার পরিমাণ যত বাড়তে থাকে সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে লোভ। কৃপণ পিতা ছেলের উন্নতি দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও ছেলের সঞ্চয়-প্রবণতা ও আগের স্বভাব ত্যাগ করে অতিরিক্ত কঞ্জুসতায় কিছুটা হতভম্বও হয়ে যায়। এ ঘটনার অনুষঙ্গে ‘নিরানব্বইয়ের ধাক্কা’ কথাটি প্রচলিত।

নিরীহ
অসহায়, শান্ত, গোবেচারা, আলাভোলা প্রভৃতি অর্থ ‘নিরীহ’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ‘নিরীহ’ সংস্কৃত শব্দ। এর আদি ও মূল অর্থ কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত অর্থ হতে ভিন্ন। মূলত যার ‘ঈহা’ বা ‘ইচ্ছা’ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যার ইচ্ছা বলতে আর কিছু নেই, যার সব আশা-আকাক্সক্ষা তিরোহিত হয়ে গেছে তাকে বলা হতো ‘নিরীহ’। এখন কিন্তু এমন লোককে নিরীহ বলা হয় না, বরং আশা-আকাক্সক্ষা তিরোহিত হওয়ার কারণে ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া প্রকাশে নিরীহ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। আসলে যার ইচ্ছা, আশা, আকাক্সক্ষা প্রভৃতি তিরোহিত হয়ে যায় সে স্বাভাবিকভাবে ও সংগতকারণে অসহায়, শান্ত এবং গোবেচারা হয়ে পড়ে। হয়তো এজন্য ‘নিরীহ’ শব্দের এমন রূপান্তর বাঙালিরা সহজে মেনে নিয়েছে।

নির্ঘাত
‘নির্ঘাত’ শব্দের অর্থ প্রবল, প্রচণ্ড, ভয়ানক, কঠোর, অব্যর্থ, অবশ্যই প্রভৃতি। এটি একটি তৎসম শব্দ। এর আদি ও মূল অর্থ বজ্রপাত, ভূমিকম্প, ঝঞ্ঝাবাত প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মূলত বায়ুর সঙ্গে বায়ুর প্রচণ্ড সংঘর্ষে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ‘নির্ঘাত’ শব্দটি দিয়ে প্রকাশ করা হতো। সংস্কৃত ‘নির্ঘাত’ তথা বাংলা বজ্রপাত, ভূমিকম্প, ঝঞ্ঝাবাত্যা প্রভৃতি নিঃসন্দেহে ভয়ানক। এগুলো মানুষের জানমাল ও সহায়সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি করে। এমন নির্ঘাতের ভয়ঙ্করতা হতে রক্ষার জন্য যুগ যুগ ধরে মানুষের প্রয়াস ও আত্মসমর্পণ ভয়ঙ্কর স্মৃতি ও নৃশংস ইতিহাসের স্বাক্ষর হয়ে আছে। তাই সংস্কৃত ‘নির্ঘাত’ বাংলায় প্রচণ্ড, ভয়ানক, কঠোর প্রভৃতিরূপে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে।

নিশিকুটুম্ব
‘নিশি’ ও ‘কুটুম্ব’ শব্দ নিয়ে ‘নিশিকুটুম্ব’। নিশি অর্থ গভীর-রাত এবং কুটুম্ব মানে আত্মীয়। সুতরাং ‘নিশিকুটুম্ব’ মানে গভীর রাতের আত্মীয়। বাহ্যিক অর্থ রাতের আত্মীয় বোঝালেও ‘নিশিকুটুম্ব’ প্রকৃতপক্ষে গভীর রাতে আগত কোনো আত্মীয় বা কুটুম্ব নয়। তস্কর, চোর প্রভৃতি বোঝাতে নিশিকুটুম্ব শব্দটি ব্যবহার করা হয়। চোর, তস্কর, চুরি-করা প্রভৃতি শব্দ অশালীন গণ্যে অনেকে উচ্চারণ করতে চান না। এজন্য বলে নিশিকুটুম্ব। চক্ষুদান অর্থ চুরি করা। অনেকে ‘চুরি করা’ বাগভঙ্গি ব্যবহার না-করে বলেন ‘চক্ষুদান’। অশালীন শব্দের এমন ব্যবহারকে ‘মঞ্জুভাষণ’ বলা হয়। রাত্রিবেলা যে লোক চুরি করার জন্য আত্মীয়ের (ব্যঙ্গার্থে) মতো এসে গোপনে জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায় সে-ই নিশিকুটুম্ব। অবশ্য দিনের বেলাতেও চুরি হয়, তাকেও ‘নিশিকুটুম্ব’ বলা হয়। কারণ নিশিকুটুম্ব মানেই চোর। চোর সাধারণত রাতের বেলা আসে বলে শব্দটি ‘নিশিকুটুম্ব’।

নিষাদ
অনার্য জাতি। কোশল রাজ্যের সীমা ছাড়িয়ে এদের রাজ্য এবং শৃঙ্গবেরপুর এদের রাজধানী ও রামসখা গুহক ছিলেন এদের রাজা। রামায়ণে বর্ণিত আছে, নিষাদরাজ মৎস্য, মাংস ও মধু উপহার নিয়ে ভরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অগ্নিপুরাণে বর্ণিত একবার রাজা বেণের ঊরু মথিত হতে থাকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে এক কৃষ্ণবর্ণ ও খর্বাকৃতির পুরুষের জন্ম হয়। জন্মমাত্র ভীত অবস্থায় কৃতাঞ্জলিপুট হয়ে থাকে। তখন সবাই একে বলে ‘নিষাদ’, অর্থাৎ উপবেশন কর। সে হতে এ পুরুষ নিষাদবংশের প্রতিষ্ঠাতা হয়। মনুসংহিতায় আছে এ জাতি ব্রাহ্মণের ঔরসে ও শূদ্রার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।

নেপথ্য
রঙ্গমঞ্চের অন্তরালবর্তী স্থান, রঙ্গালয়ের সাজঘর বা সজ্জাঘর, নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীর দেহসজ্জা প্রভৃতি অর্থ বোঝাতে ‘নেপথ্য’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সহজ-সরল ভাষায় ‘নেপথ্য’ হচ্ছে এমন একটি আড়াল-স্থান যেখান থেকে একজন ব্যক্তি অনুচ্চস্বরে অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংলাপের খেই ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া যে আড়াল-স্থান থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীগণ অভিনয়ের পূর্বে বা চরিত্রের কারণে মাঝে মাঝে সাজগোজ করে সেটিও ‘নেপথ্য’। এটি সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় নেপথ্য শব্দের অর্থ নায়কের গমনীয় পথ। নায়কের গমনীয় পথ হচ্ছে গোপনীয় এবং আড়ালকৃত। নাটকের স্বার্থে তার পথকে গোপন রাখা হয়। যে পথ দিয়ে নায়ক রঙ্গালয়ে আরোহণ করে সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে। এ অনুষঙ্গে বর্তমানে ‘নেপথ্য’ শব্দটি রঙ্গমঞ্চ হতে উঠে সমাজের সর্বস্তরের আড়ালে থাকা ব্যক্তিকেও নির্দেশ করে। ঘটনার নেপথ্যে কে? নেপথ্যে থেকে কে রাজনীতির কলকাঠি নাড়ছে তা জনগণ জানতে চায় প্রভৃতি বহুল প্রচলিত বাক্যে ‘নেপথ্য’ শব্দের অর্থপরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখা যায়।

নৈমিষারণ্য
গোমতী নদীর নিকটবর্তী ঋষি ও মহর্ষিদের পবিত্র আবাসস্থল। গৌরমুখ মুনি এখানে নিমেষকালমধ্যে অসুর-সৈন্য ভস্মীভূত করেছিলেন। তাই এ স্থানের নাম নৈমিষারণ্য। এ অরণ্যে সমবেত ঋষিবর্গের সম্মুখে সৌতি মহাভারত পাঠ করেছিলেন। বর্তমানে স্থানটি উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর জেলায় ‘নিমসার’ নামে পরিচিত।

ন্যাকা
ভণ্ড, ভদ্রতার আড়াল, সততার ভানকারী প্রভৃতি। ফারসি ‘নেক্’ শব্দ থেকে বাংলা ‘ন্যাকা’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ভাষায় নেক শব্দের অর্থ পুণ্য, মঙ্গল, ভালো, কল্যাণ প্রভৃতি। ধর্মভীরু মানুষকে বাংলায় এখনও নেক মানুষ বা নেক বান্দা বলা হয়। যারা পুণ্যকর্মে নিবেদিত, ধর্মীয় আচারে নিষ্ঠ তারাও নেক বান্দা। কিন্তু নেক থেকে সৃষ্ট ন্যাকা বাংলায় সম্পূর্ণ উল্টো অর্থ ধারণ করে বসে আছে। সমাজে এমন কিছু ভদ্র, শিষ্ট ও পুণ্যবান লোক রয়েছে যারা প্রকৃত অর্থে ভেতরে ও বাইরে অবিকল। তারাই নেক। কিন্তু এমন অনেক লোক আছে যারা বাইরে সৎ দেখালেও ভেতরে ভেতরে অসৎ। সততার ভান করে তারা অসৎ কাজে মগ্ন থাকে। ‘নেক’-এর আড়ালে যারা গোপনে গোপনে নেকহীন কর্মে আচ্ছন্ন তাদেরকে প্রকাশের জন্য ‘ন্যাকা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!