বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

অষ্টাদশ অধ্যায়

পঞ্চকন্যা
ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত বিখ্যাত নারীচরিত্র। যথা : অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা ও মন্দোদরী। প্রত্যহ এঁদের স্মরণ করলে সকল পাপ দূর হয়। সংখ্যায় পাঁচ জন, তাই এঁদের নাম পঞ্চকন্যা।

পঞ্চতপা
চতুর্দিকে অগ্নি এবং উপরে সূর্য এ পঞ্চ উত্তাপের মধ্যে যে তপস্যা করে তাকে পঞ্চতপা বলা হয়।

পঞ্চতীর্থ
কুরুক্ষেত্র, গয়া, গঙ্গা, প্রভাস ও পুষ্কর।

পঞ্চদেবতা
গণেশ, গৌরী, আদিত্য, রুদ্র ও কেশব-কে একত্রে পঞ্চদেবতা বলা হয়।

পঞ্চপর্ব
পাঁচটি তিথিকে আশ্রয় করে হিন্দুদের পর্বদিন নিরূপণ করা হয়। সে পাঁচটি তিথি হচ্ছে : অষ্টমী, চতুর্দশী, পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও সংক্রান্তি।

পঞ্চপাণ্ডব
যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব এ পাঁচজনকে একত্রে পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়।
পঞ্চপিতা
জন্মদাতা, ভয়ত্রাতা, দীক্ষাদাতা, অন্নদাতা ও শ্বশুর এ পাঁচজন একজন মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এদের পঞ্চপিতা বলা হয়।

পঞ্চপ্রাণ
হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত দেহস্থ পঞ্চবায় হলো প্রাণ, আপান, সমান, উদান ও ব্যান।

পঞ্চবট
অশ্বত্থ, বিল্ব, বট, অশোক ও আমলকী এ পাঁচটি পবিত্র বৃক্ষকে একত্রে পঞ্চবট বলা হয়।

পঞ্চবটী
গোদাবরী নদীর উৎসস্থানের নিকটবর্তী ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত এক অনুপম অরণ্য। এখানে রাম নির্বাসনের কয়েক বছর আশ্রম নির্মাণ করে সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে বসবাস করেছিলেন। এ পঞ্চবটীবন থেকে সীতাকে অপহরণ করা হয়েছিল। অশ্বত্থ, বিল্ব, বট, অশোক ও আমলকী এ পাঁচটি পবিত্র বৃক্ষের সমন্বয়ে বনটি গঠিত বলে এর নাম পঞ্চবটীবন। বর্তমান নাসিক শহর পঞ্চবটী নামে কথিত ছিল। কারণ এখানে লক্ষ্মণ শূর্পণখার নাসিকা কর্তন করেছিলেন।

পঞ্চবৃক্ষ
স্বর্গের পাঁচটি বৃক্ষ, যথা : মন্দার, পারিজাত, সন্তানক, কল্পবৃক্ষ ও হরিচন্দন। এ পাঁচটি মহামূল্যবান বৃক্ষকে একত্রে পঞ্চবৃক্ষ বলা হয়।

পঞ্চভূত
পৃথিবীর অনিবার্য উপাদান ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। এ পঞ্চ উপাদানের একটি কম হলেও পৃথিবীর স্বাভাবিকতা আর থাকবে না।

পঞ্চযজ্ঞ
ব্রহ্মযজ্ঞ বা বেদপাঠ, নৃযজ্ঞ বা অতিথিসৎকার, পিতৃযজ্ঞ বা শ্রাদ্ধতর্পণাদি, দেবযজ্ঞ বা দেবপূজা, ভূতযজ্ঞ বা ইতরপ্রাণীর সেবা। এগুলো পুণ্যের কাজ। তাই এ পাঁচটি যজ্ঞকে একত্রে ‘পঞ্চযজ্ঞ’ বলা হয়।
পঞ্চরত্ন
নীলকান্ত, হীরক, পদ্মরাগ, মুক্তা ও প্রবাল।

পঞ্চলক্ষণা
পুরাণের পাঁচটি বিশেষ লক্ষণ। এ লক্ষণগুলো হচ্ছে : স্বর্গ, প্রতিস্বর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত।

পটভূমি
চালচিত্র, পারিপার্শ্বিকতা, পরিপ্রেক্ষিত প্রভৃতি। ‘পটভূমি’ শব্দের মূল, আদি ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো : সেই দৃশ্য যাকে পেছনে রেখে অভিনয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মুখ্য বিষয়ে ফুটিয়ে তোলার জন্য বা আরও আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে কোনো চিত্রের পেছনে যে অংশ অঙ্কন করা হয় সেটাও পটভূমি। পটভূমির কাজ ছিল মুখ্যচিত্র বা কলাকুশলীদের অভিনয়কে আরও মোহনীয় করে তোলা। চালচিত্র, পারিপার্শ্বিকতা বা পরিপ্রেক্ষিত থেকে কোনো বিষয়ের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা পাওয়া যায়; তেমনি পটভূমি দেখে চিত্র কেমন সুন্দর হবে, অভিনয় কতটুকু উপভোগ্য হবে তা অনুধাবন করা যেত। তাই শব্দটির প্রাচীন অর্থের বাহ্যিক বা অবয়বগত পরিবর্তন হলেও অন্তর্গত কোনো পরিবর্তন হয়নি।

পটল তোলা
‘পটল তোলা’ বাগভঙ্গির আভিধানিক অর্থ মরে যাওয়া, অক্কা পাওয়া, মৃত্যু, মরণ, পরলোকগমন প্রভৃতি। পটল থেকে পটল তোলা বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। পটল শব্দের অর্থ রাশি, অধ্যায়, সমূহ, চোখের পাতা, চোখের এক ধরনের রোগ, ঘরের চাল, সবজি বিশেষ। তবে পটলের যত অর্থই থাকুক, পটল বলতে যেটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটি হচ্ছে অনেকটা চোখের আকৃতির একটি ছোট সবজি। পটল মাঠ থেকে তুলে কৃষকরা বাড়ি নিয়ে যায়, নিজেরা খায়, বাজারে বিক্রিও করে। অহরহ পটল তোলা হচ্ছে, পটল তুলে দিব্যি আরামে পটল নিয়ে ক্ষেত ত্যাগ করেন কিন্তু পটল তোলার পর দেহত্যাগ করেছেন এমন ঘটনা খুবই বিরল। অথচ ‘পটল তোলা’র অর্থ মারা যাওয়া, কিন্তু কেন এমন অর্থ! অথচ পটলের সঙ্গে জীবনাবসান বা অক্কাপাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। পটল শব্দের একটি অর্থ চোখের পাতা। মানুষ মরলে চোখের পাতা উপরে উঠে যায়। এ জন্য অনেকে মনে করেন চোখের পাতা বা চোখের পাতা অর্থ-প্রকাশকারী ‘পটল’ থেকে ‘পটল তোলা’ বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। অর্থাৎ চোখের পাতা তোলা বা চোখের পাতা উপরে উঠে যাওয়া। আবার কেউ কেউ মনে করেন ঘরের চাল হতে পটল তোলা শব্দের উৎপত্তি। এর সপক্ষে তারা বিভিন্ন গানের কলির কথা উল্লেখ করে থাকেন। যেমন অনেক গানে আছে ভবের পটল তুলতে হবে মন, আজ বাদে কাল…। এখানে ‘পটল’ বলতে গৃহ বা চালা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নিবাস তোলা। মানুষ যখন অক্কা পায় তখনই কেবল বাস তোলে, বা চালা তুলে চিরতরে ভবের পটল গুটিয়ে যায়। অনেকে মনে করেন, পটল তোলা শেষ হলে পটল গাছ মরে যায়, তাই ‘পটল তোলা’ অর্থ মারা যাওয়া। কিন্তু এটি ভিত্তিহীন। কারণ শুধু পটল নয়, অনেক সবজি আছে যেগুলো তোলা শেষ হলে ওই সবজি গাছ মারা যায়।

পাঞ্চাল
ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। পাঞ্জাবকে এ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল বলা হয়। তবে হস্তিনাপুরের নিকটবর্তী কিছু অঞ্চলও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। পণ্ডিতগণের মতে, দিল্লি থেকে উত্তর ও পশ্চিমে বিস্তৃত স্থান, যা হিমালয়ের পাদমূল থেকে চম্বল নদী পর্যন্ত প্রসারিত তা পাঞ্চাল অঞ্চল। এটি রাজা দ্রুপদের রাজ্য ছিল। দ্রৌপদী ছিল পাঞ্চাল দেশের রাজকন্যা। তাই তাঁকে পাঞ্চালী বলা হয়।

পাড়া
‘পাড়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ছোট গ্রাম, গ্রামের অংশ, খণ্ডগ্রাম প্রভৃতি। ফারসি ‘পারা’ থেকে বাংলা ‘পাড়া’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ‘পারা’ শব্দের অর্থ অংশ, বিভাগ, খণ্ড প্রভৃতি। ফারসি ‘পারা’ শব্দের অংশ, বিভাগ বা খণ্ড যেকোনো কিছুর হতে পারে কিন্তু বাংলা ‘পাড়া’ বলতে কেবল গ্রামের অংশকে বোঝায়। পাড়া হচ্ছে গ্রামের অংশ বা গ্রামের একটি বিভাগ বা খণ্ড। পৌরনীতির ভাষায় কয়েকটি পাড়া মিলে একটি গ্রাম। এজন্য ফারসি ‘পারা’ বাংলায় এসে গ্রামের অংশ বা খণ্ড বা বিভাগ হিসাবে ‘পাড়া’-রূপ ধারণ করে।
পাতঞ্জল দর্শন
ভারতীয় পুরাণ মতে পতঞ্জল মুনি ‘পাতঞ্জল দর্শন’-এর প্রবক্তা। তাই তাঁর নামানুসারে এ দর্শনকে পাতঞ্জল দর্শন বলা হয়। পতঞ্জলি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সত্তা স্বীকার করে মানুষের পরিত্রাণ সাধনের লক্ষ্যে ‘যোগশাস্ত্র’ প্রবর্তন করেন। পাতঞ্জলির মতে, ঈশ্বর নিজের ইচ্ছানুসারে শরীর ধারণ করে জগৎ সৃষ্টি করেন। অতএব তাকে একরূপ সাকারবাদী বলা যায়। মানুষের বিভিন্ন প্রকার চিত্তবৃত্তি রয়েছে। এ সব বৃত্তির ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নির্ধারিত আছে। যেমন দর্শনের বিষয় রূপ, শ্রবণের বিষয় শব্দ, ঘ্রাণের বিষয় গন্ধ প্রভৃতি। মনকে এ সকল বিষয় হতে নিবৃত করে পরমেশ্বরের ধ্যান করাকে ‘যোগ’ বলা হয়। এ যোগের আটটি অঙ্গ। যেমন যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান এবং সমস্ত পুণ্যফলদায়ক ‘সমাধি’।

পাততাড়ি
প্রথমে বলে রাখা ভালো তালপাতার তাড়ি থেকে পাততাড়ি। এটি একটি অনবদ্য শব্দ, অপূর্ব ইতিহাস। মানুষের সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে পাততাড়ির অবদান অসামান্য। পাততাড়ি শব্দের আধুনিক অর্থ : সমুদয় জিনিস, জিনিসপত্র। একসময় শব্দটির অর্থ ছিল পাতার তাড়া/তাড়ি বা গুচ্ছ। এ পাততাড়ি ছিল তালপাতার তাড়ি যা শিক্ষার্থীদের হাতে থাকত। এ দেশে যখন কাগজের প্রচলন ছিল না, তখন পাঠশালায় তালের পাতায় লেখালেখি করা হতো। পাঠশালা বা গুরুগৃহে দিনের লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের তালপাতার তাড়ি ভালো করে গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরত। পাততাড়ি গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রাচীন এ অনুষঙ্গ থেকে ‘পাততাড়ি’ শব্দের উৎপত্তি। বর্তমানে এর অর্থ ভিন্ন হয়ে গেলেও মূল অভিব্যক্তি আগের মতো অভিন্ন রয়েছে।

পাতাল
পৃথিবীর নিচে অবস্থিত স্থান। পাতাল সাতটি স্তরে বিভক্ত। দেবী-ভাগবতে উল্লেখ আছে যে, অন্তরীক্ষের অধোদেশে পৃথিবী শত যোজন বিস্তৃত। এ পৃথিবীর অধোদিকে সাতটি বিবর রয়েছে। এদের পাতাল বলা হয়। এ সপ্ত পাতাল স্বর্গের চেয়েও সুখকর স্থান। এখানে দৈত্য, দানব ও সর্পরা পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে বাস করে। এ সাতটি স্তর হচ্ছে যথাক্রমে : অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল এবং পাতাল।

পাদোদক
পাদ + উদক শব্দের অর্থ পূজনীয় ব্যক্তির পা ধোয়া জল। পাদোদক = পাদ + উদক। বঙ্গীয় শব্দকোষে দুটি অর্থ দেওয়া আছে : (১) পাদ-প্রক্ষালনার্থ জল, (২) চরণামৃত অর্থাৎ (১) ‘পা ধোওয়া হয় যে জলে’ এবং (২) এ ঠিক পা-ধোওয়া জল-টল নয়, এ হলো ‘চরণামৃত’। কিন্তু কী এই চরণামৃত? ‘উদক’ এসেছে ‘উন্দ’ ক্রিয়া থেকে। ‘উদক’-এর স্বরূপ দু-রকমের (১) বাহ্যিক, (২) মানসিক। (১) বাহ্যিকভাবে দেখলে আপনি ভূমিতে একটা কোদালের কোপ মারলেন আর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ফিনিক দিয়ে জল আকাশের দিকে লাফিয়ে উঠে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল একেই বলে ‘উদক’; ‘আর্টেজিয় কূপ’-এ এরকম জল দেখা যায়। শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মকে অর্জুন ভূমিতে বাণ নিক্ষেপ করে তাঁকে উদক-দানের ব্যবস্থা করেছিলেন। আর (২) মানসিকভাবে দেখলে এর স্বরূপ হলো উপর দিকে উঠে সকল দিকে ছড়িয়ে পড়া যে কোনো দৈহিক বা মানসিক তৃষ্ণা-নিবারক বিষয় বা বস্তুই হলো ‘উদক’। প্রসঙ্গত ‘তর্পণ’-এ যে জলের কথা বলা হয় তাও হলো ‘উদক’।
তাহলে, বলা যায় ‘পাদোদক’ হলো এমন ধরনের ‘উদক’ যা কারও ‘পাদ’ থেকে বা ‘পাদন’ করা (পা ফেলে ফেলে এগোনো) থেকে উৎসারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেভাবেই উদক-পানকারীদের কাছে আসে। তার মানে এই পাদোদক আসলে উৎ-পাদন করা বস্তু বা বিষয়। মনীষী-পদবাচ্য রসিক ও জ্ঞানীজনেরা পদে পদে বা চরণে চরণে তাঁদের যে রসের কথার ও জ্ঞানের কথার উৎ-পাদন করেন, সে পাদোদককে ‘চরণামৃত’ বলে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা ও গানের চরণে চরণে বা পদে পদে যে পাদোদক দিয়ে গিয়েছেন, আমরা বাংলাভাষীরা কি রবীন্দ্রনাথের সে চরণামৃত বা পাদোদক নিত্য পান করি না? সর্বোপরি স্বয়ং পরমাপ্রকৃতি এ বিশ্বজগতের সর্বত্র, সমস্ত পদে পদে তাঁর সমস্ত কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্নের মাধ্যমে যে ‘পাদোদক’ বা চরণামৃত দিয়ে রেখেছেন, সেসব কথা বরং উত্তম-অধিকারীদের জন্য তোলা থাক।
পার/পাড়
‘পার’ ও ‘পাড়’ অনেক সময় একই অর্থ বোঝালেও প্রায়োগিক ধরন ভিন্ন। নদী, সমুদ্র ইত্যাদির তীর বোঝাতে ‘পার’ কিন্তু পুকুর, দিঘি, সরোবর ইত্যাদির তীর অর্থে ‘পাড়’ ব্যবহার করা হয়। আবার ‘পার’ অর্থ নদীর বিপরীত তীর (নদীর এ-পার ও-পার)। নিষ্কৃতি (পার পাওয়া) অর্থেও পার ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘অনেক কষ্টে বিপদ থেকে পার পাওয়া গেল।’ আবার প্রান্তদেশ (শাড়ির পাড়) বোঝাতে ‘পাড়’ ব্যবহৃত হয়। তবে সাধারণত বৃহৎ জলাশয়ের তীর বোঝাতে ‘পার’, ছোট জলাশয়ের তীর বোঝাতে ‘পাড়’। যেমন ‘নদীর পার, সাগরের পার কিন্তু পুকুরের পাড়।’ আসলে কি এ ব্যাখ্যা যথার্থ?
‘পার’ সংস্কৃত শব্দ। ‘পার’ বলতে বোঝায় নদীর বিপরীত তীর বা কূল। এছাড়াও শব্দটি আরও বিভিন্ন অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। যখন বলা হয়, গগন পারে সূর্য হাসে; তখন এর অর্থ প্রান্তভাগ। যখন বলা হয়, মাঠের পারে মাঠ, তার পারে হাট; তখন ‘পার’ অর্থ বোঝায় সীমানা। যদি বলা হয়, কৌশলটা কাজে লাগলে পার পাওয়া যাবে; এখানে ‘পার’ অর্থ প্রতিকার পাওয়া। আবার নিষ্কৃতি, উদ্ধার, রেহাই প্রভৃতি অর্থেও ‘পার’ ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘দয়াল পার কর আমারে, এ ভব সিন্ধুপারে।’ এখানে ‘পার’ অর্থ পরিত্রাণ। ‘সপ্তপাতাল ভেদ করি বাণ হল পার, শত্র“রা কম্পমান, রেহাই নাহি আর।’ এখানে ‘পার’ বলতে এক পাশ ভেদ করে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যাওয়া। উত্তীর্ণ হওয়া অর্থেও ‘পার’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘পরীক্ষার কঠিন বৈতরণী কোন প্রকারে পার করলাম।’ নিষ্কৃতি অর্থেও ‘পার’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।
‘পাড়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নদীর তীর, প্রান্ত, তট বা কূল, উঁচু জায়গা। সংস্কৃত পার, পাট বা পাটক থেকে শব্দটির উৎপত্তি। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পুকুর, জলাশয় বা কুয়োর চারপাশের বেষ্টনী, ক্ষেতের আল প্রভৃতি হচ্ছে ‘পাড়’। পরিধেয় বস্ত্রের প্রান্তভাগ বোঝাতেও ‘পাড়’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। এ ‘পাড়’ শব্দটির উৎস সংস্কৃত ‘পট্টি’। আবার পায়ের চাপ দেওয়াও ‘পাড়’; যেমন ঢেঁকিতে পাড়। পায়ের ‘পাড়’ এসেছে সংস্কৃত ‘পাত্্’ ধাতু থেকে।
অভিধান অনুসারে নদীর বিপরীত তীর হচ্ছে ‘পার’। তাহলে অন্য তীর ‘পাড়’। যদি কেউ বলেন, মমিন নদীর পার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, এর অর্থ মমিন নদীর ওপার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আবার যদি বলা হয়, মমিন নদীর ‘পাড়’ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, অর্থ হয় মমিন নদীর এপার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলায় ‘পার’ ও ‘পাড়’ শব্দ দুটো এ অর্থে ব্যবহার করা হয় না। লেখা হয়, এপার থেকে ওপার যাব, কেউ লেখে না ‘এপাড় থেকে ওপার যাব’। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস’। ওপরের আলোচনা হতে এটি প্রতীয়মান হলো : নদী বা জলরাশির তীর বোঝাতে ‘পার’ ও ‘পাড়’ শব্দের যে অর্থ দেওয়া হয়েছে তা অস্পষ্ট।

পাষণ্ড
‘পাষণ্ড’ একটি ঐতিহাসিক শব্দ। সংস্কৃত হতে আগত শব্দটির বর্তমান অর্থ নিষ্ঠুর, অত্যাচারী বা নরপিশাচ। তবে এর মূল অর্থ ছিল পাপচিহ্নধারী। এ শব্দ দিয়ে বেদবিরোধী ধর্মসম্প্রদায় : যেমন বৌদ্ধ ও জৈনদের বোঝানো হতো। প্রাচীন ভারতে হিন্দুগণের পাষণ্ড-দলন ছিল একটি নিত্যনৈমিত্তিক ধর্মীয় কৃত্য। সেকালে পাষণ্ড-দলন কথাটির অর্থ ছিল বৌদ্ধদমন। প্রাচীন ভারতের যে সকল অঞ্চল বৌদ্ধ সম্রাটদের অধিকারে ছিল, সে সব অঞ্চলের বৌদ্ধরা আবার হিন্দুদের বলত ‘পাষণ্ড’। বাংলায় শব্দটি প্রথমে অধার্মিক, বিধর্মী, নাস্তিক ইত্যাদির প্রতিশব্দরূপে প্রবেশ করে। পরে শব্দটির অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এখন ‘পাষণ্ড’ বলতে নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। এখন ধর্মীয় দলন-পীড়নের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

পিকেটার
ধর্মঘট, হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ প্রভৃতি পালনের অনুরোধ করার লক্ষ্যে রাস্তা, প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো জনবহুল স্থানে অবস্থানকারী। সাধারণত হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন রাজনীতিক আন্দোলন বা কর্মসূচি পালনের জন্য সমর্থকবৃন্দ রাস্তায় যানবাহন চলাচলে বাধা প্রদান করে থাকেন অথবা দলবদ্ধভাবে রাস্তায় বা প্রকাশ্যস্থানে অবস্থানপূর্বক স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে কর্মসূচি বা আন্দোলনের অনুকূলে দাবি জানানোকে ‘পিকেটিং’ বলে। যারা পিকেটিং করে তারাই ‘পিকেটার’। পিকেটিং ও পিকেটার দুটোই ইংরেজি শব্দ। মূলত ‘পিকেট’ শব্দ হতে ইংরেজি পিকেটিং ও পিকেটার শব্দের উৎপত্তি। তবে ‘পিকেট’ ইংরেজি শব্দ নয়, এটি ফরাসি শব্দ। পিকেট সামরিক বাহিনীর নিজস্ব গণ্ডীতে ব্যবহৃত একটি পারিভাষিক শব্দ। শত্র“পক্ষের গতিবিধির ওপর গোপনীয়ভাবে নজর রাখার জন্য সামরিক বাহিনীর একটি দল থাকে। এ দলটি ‘পিকেট’ নামে পরিচিত। ফরাসি ‘পিকেট’ শব্দের অর্থ ভিন্ন। ফরাসি ভাষায় ‘পিকেট’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সীমানা নির্ধারণের জন্য সুঁচালো আগা-বিশিষ্ট খুঁটির বেড়া। ইংরেজরা ‘পিকেট’ শব্দের সঙ্গে ফরাসি অর্থকেও সানন্দে গ্রহণ করেছে। ইংরেজ আমলে সৌখিন ভবনসমূহের চারদিকে যে বেষ্টনী দেওয়া হতো তা ‘পিকেট’ নামে পরিচিত ছিল। এখনও বাঙালি গৃহস্থ বাড়ির সামনে কাঠ, বাঁশ কিংবা লৌহ-নির্মিত পিকেট বা বেড়া দেখা যায়। পিকেট বা বেড়ার কাজ হচ্ছে সীমানার বাইরে থেকে প্রবেশে বাধা দেওয়া। ‘পিকেটার’দের কাজও প্রায় অনুরূপ। তারাও পিকেট বা বেড়ার মতো যানবাহনের চলাচল কিংবা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাদান করেন।

পীঠস্থান
তন্ত্র অনুসারে ৫২টি স্থানকে পীঠস্থান বলা হয়। যেখানে সতীর দেহাংশ শিব নিক্ষেপ করেছিলেন। কথিত হয়, দক্ষযজ্ঞে সতী মারা গেলে তাঁর মৃতদেহ স্কন্ধে বহন করে পৃথিবী পরিভ্রমণকালে শিব সীতার দেহ ছিন্ন করে ৫২টি স্থানে নিক্ষেপ করে।

পুকুরচুরি
পুকুর ও চুরি শব্দ থেকে পুকুরচুরি বাগ্ধারার উৎপত্তি। অভিধান ও প্রচলিতভাবে বড় কোনো দুর্নীতি, বড় প্রতারণা প্রভৃতি বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। পুকুর খনন করা একসময় ছিল অত্যন্ত জনহিতকর কর্ম। নদী ছাড়া সর্বসাধারণের সুপেয় পানির সার্বক্ষণিক উৎস ছিল পুকুরের জল। প্রচুর জমিজমা থাকলেও পুকুর খনন ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, কষ্টসাধ্য এবং অনিশ্চিত কাজ। পুকুর খনন করলেও সবখানে জল উঠত না, পাওয়া গেলেও বছরে কেবল কয়েকমাস জল থাকত। তাই পুকুর খনন করা ছিল সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল কাজ। বর্তমানে এমন ব্যয়বহুল কাজে যারা দুর্নীতি করে তাদের ‘পুকুরচোর’ এবং তাদের চৌর্যবৃত্তিকে ‘পুকুরচুরি’ বলা হয়। এ প্রসঙ্গে একটা গল্প শোনা যায় : বড়সাহেব ভাবলেন, অফিসের সামনে একটি সুন্দর পুকুর হলে ভালো হয়। সে লক্ষ্যে তিনি বাজেট চেয়ে উপরে লিখলেন। কিছুদিন পর অনুমোদনসহ বাজেট এল, কিন্তু কাজ শুরু করার আগেই বড়সাহেবের বদলির হুকুম এসে যায়। এখন কী করা? তিনি খুব সুন্দর করে পুকুর খননের সব ভাউচার তৈরি করলেন। ফাইলের ভিতরে পুকুর কাটা হয়ে গেল। যেখানে যা যা করা দরকার সব ঠিকঠাক করে পকেট ভারি করে তিনি বিদায় নিলেন। নতুন বস এসে দেখলেন পুকুর আছে/পুকুর নেই। তিনি বুদ্ধিমান। অতএব দেরি না করে অপরিকল্পিত পুকুর ভরাটের জন্য বাজেট চেয়ে উপরে লিখলেন। যথাসময়ে রমরমা বাজেট এসে গেল। তিনি খুব সুন্দর করে পুকুর ভরাটের সব ভাউচার তৈরি করলেন। ফাইলের ভিতরে পুকুর ভরাট হয়ে গেল। অতঃপর, যেখানে যা যা করা দরকার সব ঠিকঠাক করে নিজের সিন্দুক ভারি করে সুখনিদ্রা উপভোগ করলেন।

পুঙ্খানুপুঙ্খ
সংস্কৃত ‘পুঙ্খ’ শব্দের অর্থ বাণ বা শরের পালকযুক্ত বাণমূল। এ ‘পুঙ্খ’ শব্দের সঙ্গে ‘অনু’ যুক্ত হয়ে ‘অনুপুঙ্খ’ শব্দ গঠিত হয়েছে। শব্দটির অর্থ খুঁটিনাটি বা বিস্তৃতি বা নিবিড়তা। এটি সাধারণত বিশেষ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বাণ বা শর যেমন চারপাশের অগণিত বিষয় এড়িয়ে শুধু লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশ্যে ছুটে যায় এবং লক্ষ্যবস্তুকে খুঁজে নেয় তেমনি ‘অনুপুঙ্খ’ শব্দটির দ্বারাও অনেক বিষয় বা বিস্তৃতি এড়িয়ে নির্দিষ্ট বিষয় বা বস্তুকে লক্ষ করে ‘অনুপুঙ্খ’ শব্দের প্রাসঙ্গিকতা ধাবিত। যেমন অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা যায় তিনি নির্দোষ। ‘পুঙ্খ’ শব্দের সঙ্গে অনুপুঙ্খ যুক্ত হয়ে ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। এর অর্থ তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান বা আদ্যোপান্ত নিরীক্ষণ। এটি একটি বিশেষণ। যেমন সংশ্লিষ্ট সব নথি পুঙ্খানুপুঙ্খ করে দেখার পরও তদন্তদল মালেশিয়ার নিখোঁজ বিমানটির কোনো হাদিস পেলেন না। রচনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেও কোনো ত্র“টি পেলাম না।

পুণ্ড
ভারতীয় পুরাণ অনুযায়ী ‘পুণ্ড’ হচ্ছে বলিরাজের ক্ষেত্রজ পুত্র। রাজা বলি ঊর্ধ্বরেতা ছিলেন। বলির স্ত্রী সুদেষ্ণার গর্ভে ও মহর্ষি দীর্ঘতমার ঔরসে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম জন্মগ্রহণ করেন। পুণ্ড্র নিজের নামীয় রাজ্যের রাজা হন। বিখ্যাত পুণ্ড্র রাজ্যের রাজা ছিলেন পুণ্ড।

পুত
একটি নরকবিশেষ। এ নরকে নিঃসন্তান ব্যক্তিদের নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ‘পুত’ নামক নরক থেকে পিতাকে উদ্ধার করেন বলে পুরুষ সন্তানকে ‘পুত্র’ বলা হয়। ‘পুন্নাম’ অর্থাৎ পুৎ নামের যে নরক রয়েছে সেখানে সবাইকে গমন করতে হয়। সে নরক থেকে বংশধর পুত্র পিতাকে উদ্ধার করে স্বর্গে নিয়ে যায়।
পুরাণ
অতি প্রাচীনকালের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ, সমাজ, ধর্ম, রাজ্য, শাসন প্রভৃতি অবলম্বনে রচিত আখ্যায়িকা। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির নিজস্ব পুরাণ রয়েছে। উপমহাদেশে সাধারণত পুরাণ অর্থে ব্যাসাদি মুনি প্রণীত শাস্ত্রকে বোঝায়। ভারতীয় ‘পুরাণ’ দুই ভাগে বিভক্ত : মহাপুরাণ ও উপ-পুরাণ।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

পুরুষ/পরুষ
‘পুরুষ’ অর্থ পুংজাতীয় জীব, নারীর বিপরীত, মানুষ, ঈশ্বর, পরমেশ্বর ইত্যাদি। কিন্তু ‘পরুষ’ শব্দের অর্থ কড়া, রূঢ়, কর্কশ, পরুষভাষী অর্থ কটুভাষী; পরুষতা অর্থ কর্কশতা, ঔদ্ধত্য এবং পরুষকণ্ঠ অর্থ কর্কশকণ্ঠ। সুতরাং আপনার অধস্তন কেউ যদি কর্কশ অর্থে ‘পরুষ’ লিখে থাকেন তো ভুল ভেবে ভুলেও ‘প’-এর নিচে হ্রস্ব উ-কার দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

পূর্ব-মীমাংসা
জৈমিনী মুনি প্রবর্তিত দর্শনশাস্ত্রবিশেষ। এটা বেদান্তের অংশ। পূর্ব-মীমাংসার প্রধান উদ্দেশ্য হলো : বেদ-ব্যাখ্যায় সহায়তা করে মানুষকে ধর্মকর্মে অনুপ্রাণিত করা।

পেশল
পেশল শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ পেশিবহুল, শক্তিমান, বলিষ্ঠ, শক্তিশালী প্রভৃতি। সংস্কৃত ভাষায় ‘পেশল’ শব্দের মূল অর্থ হলো : রূপবান, সুন্দর, মোহনীয়, আকর্ষণীয়, সুকুমার, কোমল প্রভৃতি। বাংলায় যখন শব্দটি আসে তখনও এর মূল অর্থ বেশ কিছুদিন অবিকৃত ছিল। কিন্তু ক্রমান্বয়ে শব্দটি তার সুকুমার অর্থ হারিয়ে ‘শক্তিমান’ অর্থ ধারণ করে। আসলে যে পেশিবহুল, শক্তিমান, বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী সে সুন্দর। রুগ্্ণ ও পেশিহীন শরীর অসুন্দরের প্রতীক। অন্যদিকে পেশিবহুল শক্তিমান শরীর সৌন্দর্য আকর্ষণ ও মোহনীয়তার প্রতীক। শক্তিমান ও পেশিবহুল মানুষ বা জীবের প্রতি সবাই আকৃষ্ট হয়। পশুর বাজারেও শক্তিশালী পশুটি সুন্দরের কারণে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী সুন্দরের প্রতিভূ হিসাবে সংস্কৃত রূপবান, সুকুমার, সুন্দর প্রভৃতি মোহনীয় গুণবাচক শব্দটি বাংলায় শক্তিমান রূপে আবির্ভূত হয়।
পোঁ ধরা
‘পোঁ ধরা’ শব্দের অর্থ তোষামোদ করা। ‘পোঁ’ আর ধরা শব্দ মিলে ‘পোঁ ধরা’ শব্দের উৎপত্তি। পোঁ হলো সানাইয়ের ধ্বনিবিশেষ। সুতরাং ‘পোঁ ধরা’ অর্থ হলো সানাইয়ের ধ্বনি ধরা। সানাই পোঁ পোঁ করে বাজে বলে সানাইয়ের সুরকে পোঁ বলা হয়। মূল সানাইবাদকের সঙ্গে সহযোগী সানাইবাদক থাকে। মূল সানাইবাদক সানাইয়ের বিভিন্ন সুর তুললেও সহযোগী সানাইবাদক কেবল একটানা অপরবির্তনীয় সুর ‘পোঁ’-ই বাজিয়ে যান। মূলত এটাই তাঁর কাজ। আর সহযোগী সানাইবাদকের এ কাজটি হলো ‘পোঁ ধরা’। সানাইবাদকের অনুকরণে সহযোগী সানাইবাদকের অপরিবর্তনীয় পোঁ ধরা কার্য থেকে বাংলা বাগ্ধারা ‘পোঁ ধরা’-র উৎপত্তি।

পোয়াবারো
‘পোয়াবারো’ শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ অনুকূল বা পরম সৌভাগ্য। পাশা খেলার একটা দান হতে শব্দটির উৎপত্তি। পাশা খেলার একটা দান হলো ‘পোয়াবারো’। ছক্কার ঘুঁটি ফেলে কোনো চালে যদি পর পর ৬ + ৫ + ১ অথবা ৬ + ৬ + ১ দান পড়ে সেটাই ‘পোয়াবারো’ দান নামে পরিচিত। পাশা খেলায় ‘পোয়াবারো’ দান পাওয়া হলো জয়সূচক দান পাওয়া। এটি জয় ও সৌভাগ্যের নিশ্চিত বার্তা। জয় ও সৌভাগ্যের সঙ্গে জড়িত বলে পোয়াবারো দানটি ‘পোয়াবারো’ শব্দরূপে বাংলা বাগ্ভঙ্গিতে উঠে এসেছে।

প্রকাণ্ড
‘প্রকাণ্ড’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিশাল, বৃহৎ, বিরাট, অতিবৃহৎ, মস্তবড় প্রভৃতি। ‘প্রকাণ্ড’ শব্দের মূল ও আদি অর্থ গাছের গুঁড়ি। কাণ্ডের সঙ্গে ‘প্র’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে গুঁড়িটাকে আরও বিশাল অবয়ব দিয়েছে। তৎকালে গাছের গুঁড়ি হতো বৃহৎ ও বিশাল আকারের। এটাকে সহজে নাড়াচাড়া করা যেত না। গাছের গুঁড়ির এ বিশাল আকৃতি বাংলায় এসে যেকোনো বিশালত্বকে প্রকাশ করার সেবায় নেমে পড়ে।

প্রজাপতি
হিন্দু পুরাণ মতে ‘প্রজাপতি’ হচ্ছে বিশ্বের জীবসমূহের স্রষ্টা, জন্মদাতা ও পূর্বপুরুষ। বেদ শাস্ত্রে ইন্দ্র, সাবিত্রী, সোম, হিরণ্যগর্ভ ও অন্যান্য দেবতাকে ‘প্রজাপতি’ বলা হয়। মনুসংহিতায় ব্রহ্মাকে প্রজাপতি উপাধি দেওয়া হয়েছে। কারণ তিনিই প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা এবং পৃথিবীর রক্ষক। ব্রহ্মার পুত্র হিসাবে এবং দশজন ঋষির সৃষ্টিকর্তা হিসাবে স্বয়ম্ভূ মনুকেও প্রজাপতি বলা হয়। এ ঋষিরা ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং এ মানসপুত্র হতেই মানবের সৃষ্টি। এ জন্য এ দশজন ঋষিকে সর্বত্র প্রজাপতি বলা হয়েছে।

প্রতীক্ষা ও অপেক্ষার পার্থক্য
প্রথমে বলে রাখি, সাধারণত ‘প্রতীক্ষা’ ও ‘অপেক্ষা’ উভয় শব্দের অর্থগত কোনো পার্থক্য নেই। অপেক্ষা অর্থ প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা অর্থ অপেক্ষা। সহজ ভাষায় উভয় শব্দের পার্থক্য এত কম যে, অপেক্ষার স্থলে প্রতীক্ষা ও প্রতীক্ষার স্থলে অপেক্ষা লেখা যায়। তবে প্রতীক্ষার চেয়ে অপেক্ষার ব্যবহার ব্যাপক। শব্দদ্বয়ের পার্থক্য এত সূক্ষ্ম যে, গভীরভাবে নিরীক্ষণ না করলে পার্থক্য অনুধাবন করা অসম্ভব। উদাহরণ : অপেক্ষার যন্ত্রণা প্রতীক্ষার প্রহর/ প্রতীক্ষার অবসান অপেক্ষার নহর। সূক্ষ্ম পার্থক্যটি কী তা আরও বিশদ করা যায় : প্রতীক্ষা অর্থে যা ঘটতে পারে সে বিষয়ের জন্য অপেক্ষা করা। যেমন অধীরচিত্তে বসিয়া যুবক প্রেয়সীর প্রতীক্ষায়। প্রতীক্ষার সময় সাধারণত অপেক্ষার সময় থেকে দীর্ঘতর। যেমন তোমার জন্য দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। প্রতীক্ষার অবসান হয় না গো সখী। ধৈর্য, নির্ভরতা, কারণ, শঙ্কা প্রভৃতি অর্থেও অপেক্ষা ব্যবহৃত হয়। যেমন অপেক্ষা সফলতার সেতু। বৃষ্টির অপেক্ষায় কৃষিকাজ বন্ধ। অপেক্ষার যন্ত্রণা মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে ভয়াবহ।

প্রদক্ষিণ
‘প্রদক্ষিণ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ কোনো কিছুর চারপাশে ভ্রমণ বা পরিভ্রমণ, বিভিন্ন রাস্তা ঘোরা প্রভৃতি। যেমন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে। ‘প্রদক্ষিণ’ সংস্কৃত হতে বাংলায় এসেছে। এর ব্যাকরণগত অর্থ হলো প্রতিমা বা পূজনীয় ব্যক্তিকে দক্ষিণ বা ডান দিকে রেখে তার চারপাশে পরিভ্রমণ। এটি হিন্দুধর্মের একটি আচরণ বা নিয়ম। এ হিসাবে এটি একটি ধর্মীয় শব্দ। কিন্তু বাংলায় এসে ‘প্রদক্ষিণ’ শুধু অর্থই হারিয়ে ফেলেনি, সঙ্গে সে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দে পরিণত হয়েছে। আজকাল প্রদক্ষিণ যেভাবে করা হোক না কেন, তার মধ্যে ধর্মের চেয়ে কিন্তু বিজ্ঞান তথা বাস্তব কার্যকরণ অনেক বেশি। ‘ডাক্তারের নির্দেশে তিনি সকালবেলা পাশের মাঠটি তিনবার প্রদক্ষিণ করেন।’ এ বাক্যে ধর্মের বালাই নেই। যা আছে তা কার্যকরণগত ও চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কিত।
প্রফুল্ল
শব্দটির আভিধানিক ও মূল অর্থ : হাস্যময়, উল্লাসিত, প্রসন্ন, সহাস্য, আনন্দিত। ‘প্রফুল্ল’ শব্দের আদি ও মূল অর্থ প্রস্ফুটিত। যা প্রকৃষ্টরূপে ফুটেছে তা-ই প্রফুল্ল। একসময় শব্দটি ফুল ফোটার, ফোটা ফুলের বিবরণ প্রদান প্রভৃতি কাব্যিক শব্দ হিসাবে বাগানে সীমাবদ্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথের গানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন প্রফুল্লকদম্ব বন। শব্দটি এখন বাগানে আর নেই। এখন এর অর্থ প্রসন্ন, সহাস্য, আনন্দিত এবং বদন, চিত্ত, মন প্রভৃতির আনন্দঘন প্রসন্নতা বোঝাতে ‘প্রফুল্ল’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন প্রফুল্লচিত্ত, প্রফুল্লবদন, শান্তিজুড়ে চিত্তবদন। ফুল ও বাগানের সঙ্গে জন্মগত সম্পর্ক ছিন্ন করে আমাদের সেই দারুণ ‘প্রফুল্ল’ কখন কোন ফাঁকে বাগান ছেড়ে মানুষের হৃদয়, মন ও চিত্ত-বদনকে উৎফুল্লময় করে দেওয়ার জন্য উঠে এসেছে। প্রফুল্ল হয়তো বুঝতে পেরেছিল একদিন বাগানের সংখ্যা কমে যাবে। বাগান থাকলেও মানুষ আর বাগানে ফুল দেখতে যাবে না। বরং ফুলকে কেটে, জীবননাশ করে ঘরে এনে উপভোগ, দুঃখিত, ধর্ষণ করবে। হায়রে প্রফুল্ল, তুমি বড় বুদ্ধিমান; বাগান ছেড়ে দিয়ে বদন আর চিত্তে চলে আসায় ঘরে বসে তুমি ফুলের সুবাস নিতে পারছ।

প্রবন্ধ
সংস্কৃত ভাষায় ‘প্রবন্ধ’ শব্দের সাধারণ অর্থ ‘উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা’, কিন্তু বাংলায় শব্দটির অর্থ বংংধু বা রচনা। ‘প্রবন্ধ’ শব্দের মূলানুগ অর্থ ‘প্রকৃষ্ট বন্ধন যার’, বাংলায় রচনা মাত্রই ‘প্রবন্ধ’ (আলগোছে তফাতে থেকে সমালোচনা প্রবন্ধে একটু-আধটু ঠোকর দেয় অনেকেই অনুকরণ না হনুকরণ সৈয়দ মুজতবা আলী)। সংস্কৃত ভাষায় ‘নিবন্ধ’ শব্দটি অদৃষ্ট, ভাগ্যের লিখন, নিমিত্ত এরূপ অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। একই অর্থে বাংলায়ও প্রয়োগ আছে। যেমন, ‘নিবন্ধ খণ্ডাইতে পারে শকতি কাহার’ দৌলত উজির বাহরাম খান।
প্রবন্ধ ও নিবন্ধ শব্দদ্বয় আজকাল অনেকটা অভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলেও উভয়ের ব্যুৎপত্তি ও প্রায়োগিক পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃষ্ট বন্ধন যার সেটি ‘প্রবন্ধ’। এখানে সংশ্লিষ্টতা পরম্পরায় প্রবন্ধের বিস্তৃতি ও গভীরতা অসীম। নির্দিষ্ট বন্ধন যার সেটি ‘নিবন্ধ’। প্রকৃষ্টতার উল্লেখ না থাকলেও নিবন্ধ প্রকৃষ্ট বন্ধনঘটিত অপেক্ষাকৃত স্বল্প অবয়বের একটি প্রবন্ধ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট বন্ধনযুক্ত প্রবন্ধই নিবন্ধ। যেখানে লেখক একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নিজের প্রকৃষ্ট বিচরণ প্রকম্পিত রাখেন। নিবন্ধের নির্দিষ্টতা এর বন্ধন, বিস্তৃতি ও গভীরতাকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রেরণা যোগায়। যদিও এটি কেবল বিস্তারভিত্তিক নয়; বরং বিশ্লেষণ যৌক্তিকতার আদলভিত্তিক। ‘প্রবন্ধ’ একটি বিষয়কে যতটুক বিস্তৃত বিশ্লেষণে তুলে ধরে ‘নিবন্ধ’ তা করে না। ঠিক উপন্যাস আর বড় গল্পের মতো। নিবন্ধে নির্ধারিত বিষয়কে তুলে ধরার জায়গা সীমিত। তাই অল্পকথায় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলে ধরা প্রয়োজন।
প্রবন্ধে ‘প্র’ উপসর্গ, নিবন্ধে ‘নি’ উপসর্গ বসেছে। আকারে প্রবন্ধ বড় হবে, নিবন্ধ ছোট হবে। যেমন রচনা ও প্যারাগ্রাফ-এর পার্থক্যের মতো। লেখার সময় ‘প্রবন্ধ’ রচনায় তথ্য প্রদান করা হবে, প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনায় আনা যাবে, অপরদিকে ‘নিবন্ধে’ নিজের চিন্তায় নিজেকে বিষয়ের মধ্যে আটকে রাখতে হবে।
নিবন্ধের চেয়ে প্রবন্ধের গণ্ডি বড়। নিবন্ধ প্রধানত জার্নাল নির্ভর। জার্নালটি যে বিষয়ভিত্তিক, সাধারণত জার্নালভুক্ত নিবন্ধগুলো সেই নির্দিষ্ট বিষয়েরই হয়ে থাকে। প্রবন্ধের চেয়ে নিবন্ধ সুনির্দিষ্ট, গভীর, বিশ্লেষণধর্মী। বস্তুত কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখাই ‘নিবন্ধ’। এর সঙ্গে বর্ণনা যোগ করা হলে তা হয় ‘প্রবন্ধ’। সব নিবন্ধ প্রবন্ধ নয়, তবে সব প্রবন্ধই নিবন্ধ।

প্রবাদ ও প্রবচন
‘বদ্’ ধাতু নিষ্পন্ন ‘বাদ’ শব্দের পূর্বে ‘প্র’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে ‘প্রবাদ’ এবং ‘বচ্’ ধাতু নিষ্পন্ন ‘বচন’ শব্দের পূর্বে একই উপসর্গ যুক্ত হয়ে ‘প্রবচন’ শব্দের উৎপত্তি। ‘বদ্’ ও ‘বচ্’ উভয় ধাতুরই অর্থ বলা। ‘বাদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ উক্তি, কথন, বাক্য। অন্যদিকে বচন শব্দের আভিধানিক অর্থও কথা, বাক্য, উক্তি। সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিবেচনায় ‘প্রবাদ’ ও ‘প্রবচন’-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু উভয়ের প্রায়োগিক-রূপে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রবাদ ও প্রবচন-রূপে যে সব রচনা পাওয়া যায় সেগুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে এ পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রবাদ ব্যঞ্জনানির্ভর কিন্তু প্রবচন বাচ্যনির্ভর। মূলত এটিই উভয়ের মূল পার্থক্য। চয়নসূত্রে প্রবাদের একটি বাচ্যার্থ থাকে কিন্তু প্রবাদটি প্রকৃতপক্ষে সে অর্থে ব্যবহৃত হয় না; ব্যঞ্জনার্থেই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘ছাড় কড়ি মাখ তেল’ প্রবাদটির কথা উল্লেখ করা যায়। বাক্যটির সাধারণ অর্থ : ‘তেল গায়ে মাখতে হলে টাকা দিয়ে কিনতে হয়’। কিন্তু প্রবাদটি যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন সাধরণ অর্থ লোপ পেয়ে গূঢ়ার্থই কেবল প্রকাশ পায়। এর গূঢ়ার্থ হচ্ছে : অর্থ ছাড়া কিছু হয় না বা কিছুই পাওয়া যায় না।
‘যম, জামাই, ভাগনা এ তিন নয় আপনা।’ এটি একটি প্রবচন। কেন প্রবচন তা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। যম মানুষের জীবন নিয়ে যায়, কাউকে কোনো অবস্থায় ছাড়ে না। অন্যদিকে গৃহে জামাতার আগমন কিংবা ভাগ্নের অবস্থান দারিদ্র্যপীড়িত সংসারে বোঝাস্বরূপ। তবু তাদের কাউকে অবহেলা করা যায় না। বাধ্য হয়ে তাদের জন্য খরচ করতে হয়, আপ্যায়ন করতে হয় কিন্তু শত খরচ করার পরও কোনো প্রতিদান বা সুনাম পাওয় যায় না, বরং তারা আরও বেশি চেয়ে বসে, আরও দিতে হয়। জীবন ও সংসারের এরূপ তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বাক্যটি রচিত। এটি প্রবচন, কারণ এর কোনো রূপকধর্ম নেই, সরাসরি অর্থ আছে। ‘প্রবাদ’ ও ‘প্রবচনে’র আর একটি পার্থক্য হলো : সাধারণত প্রবাদের চেয়ে প্রবচন আকারে বড় হয়। তবে সবসময় যে বড় হবে এমন কথা নেই। প্রবাদ অজ্ঞাতপরিচয় সাধারণ মানুষের লোকপরম্পরাগত সৃষ্টি। অন্যদিকে কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল বিজ্ঞজনই প্রবচনের স্রষ্টা। এককথায় প্রবাদ লোক-অভিজ্ঞতার ফসল, অন্যদিকে প্রবচন ব্যক্তিমনীষার সৃষ্টি। প্রবচনের আধুনিক প্রতিশব্দ ‘সুভাষণ’।
তবে বাগ্ধারা হচ্ছে অর্থবোধক শব্দসমষ্টি। বাক্যে ব্যবহৃত প্রত্যেক শব্দের পৃথক অর্থ থাকে, কিন্তু বাগ্ধারার অন্তর্গত অর্থবোধক শব্দগুলো সম্মিলিতভাবে একটি অখণ্ড শব্দের ন্যায় অভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে।

প্রবীণ
শব্দটির প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ বয়োবৃদ্ধ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, বর্ষীয়ান, জ্ঞানী প্রভৃতি। তবে এর আদি অর্থ এমন ছিল না। প্রবীণ শব্দের আদি, মূল ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বীণাবাদনে প্রকৃষ্ট অর্থাৎ যিনি নিপুণ ও কুশলী হাতে বীণা বাজাতে পারেন। কালক্রমে শব্দটির অর্থের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এর যথেষ্ট কারণ আছে। যন্ত্রসংগীতের মধ্যে বীণা যেমন প্রাচীন, তেমনি ঐতিহ্যবাহী। এটার সঙ্গে হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রসঙ্গীতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি ভালোভাবে রপ্ত করতে হলে দীর্ঘ অনুশীলনের প্রয়োজন। দীর্ঘ অনুশীলন সময়ের ব্যাপার। এমন করতে হলে মানুষ যেমন বৃদ্ধ হয়ে যায় তেমনি হয়ে ওঠে দক্ষ। তাই এখন প্রাক্তন বীণাবদক তথা প্রবীণ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিজ্ঞ, নিপুণ, কুশলী, বহুদর্শী, বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন, বয়োবৃদ্ধ ইত্যাদিতে পরিণত হয়েছে। বীণা-বাদনে দক্ষ হতে হলে কুশলী, নিপুণ ও বহুদর্শী না-হয়ে কোনো উপায় থাকে না। মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ভার, শরীরের রোগ, পার্থিব নানা সমস্যা বেড়ে যায়। তবু যারা দীর্ঘকাল এসব উপেক্ষা করে বীণা বাদন শিক্ষা নিয়ে পড়ে থাকেন তাঁরা নিশ্চয় বহুদর্শীও বটে। তাই বীণাবাদনে প্রকৃষ্ট বোঝাতে যে শব্দটি ব্যবহার হতো তা এখন আধুনিক যুগে ‘প্রবীণ’ অর্থে ব্যবহার করা হয়।

প্রশ্রয়
‘প্রশ্রয়’ একটি ভালোবাসাপ্রসূত অর্ধ-নেতিবাচক শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ আশকারা, লাই, অনাবশ্যক আদর ইত্যাদি। এসব অর্র্থ প্রকাশে ‘প্রশ্রয়’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি আশকারা পেয়ে থাকে। এর কারণ হচ্ছে শব্দটির ব্যুৎপত্তি, প্রয়োগ ও হৃদ্যতাপ্রসূত ঝাল-সম সামান্য নেতিবাচকতা। সংস্কৃত হতে বাংলায় অতিথি হিসাবে আগত ‘প্রশ্রয়’ শব্দটির মূল, আদি ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ছিল : সম্মান, শ্রদ্ধা, বিনয় প্রভৃতি। বাংলায় এসে সংস্কৃত ‘প্রশ্রয়’ শব্দটির অর্থের বাহ্যিক রূপের কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। তবে অন্তর্নিহিত রূপের পরিবর্তন বিন্দুমাত্র ঘটেনি। যাকে সম্মান করা হয়, মর্যাদা দেওয়া হয় সে ক্রমশ মর্যাদা পেতে পেতে বেয়াড়া হয়ে ওঠে। কারও প্রতি বিনয় দেখালে সে অনেক সময় এটাকে ভুল বুঝে, ভয় মনে করে অশালীন আচরণ করতেও কুণ্ঠিত হয় না। এ জন্য বলা হয় ‘বানরকে প্রশ্রয় দিলে মাথায় ওঠে’। সম্মান, মর্যাদা, বিনয় মানুষের ব্যবহারকে লাই দিয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে বলে সংস্কৃত ‘সম্মান’-এর প্রতিশব্দ ‘বিশ্বাস’ বাংলায় এসে আশকারা শব্দের প্রতিশব্দে রূপান্তরিত হয়েছে। এ অনুষঙ্গে প্রশ্রয় শব্দটি নিজের অজান্তে নিজেকে নিজে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের মূল অর্থই হারিয়ে বসেছে।

প্রায়
‘প্রায়’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ সাধারণত, সচরাচর, ঘন ঘন, বারংবার, কাছাকাছি প্রভৃতি। তবে এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে : ইচ্ছাপূর্বক অনশন-মৃত্যু, মৃত্যু-আকাক্সক্ষায় আমৃত্যু অনশন, প্রাচুর্য ও বাহুল্য প্রভৃতি। তাহলে কেন শব্দটি এমন ব্যাপক অর্থ-পরিবর্তন করল? এর কি আসলেই কোনো যৌক্তিক কারণ আছে? অনেকে ইচ্ছাপূর্বক আমৃত্যু অনশন করেছে কিন্তু খুব কম সংখ্যক মানুষই মৃত্যুবরণ করেছে। কারণ আমৃত্যু অনশনকারী যখন খাবার অভাবে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যায় তখন তার আর স্বাভাবিক জ্ঞানবোধ থাকে না। তখন প্রশাসন তার শরীরে বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগ করে কিংবা অন্যভাবে খাইয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। আবার অনেকে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না-পেরে মৃত্যুর কাছাকাছি গেলে আত্মীয়স্বজন বা শুভার্থীদের অনুরোধে খাবার গ্রহণ করে। এমন ঘটনা সাধারণত, সচরাচর এবং ঘন ঘন ও বারংবার ঘটতে দেখা যায়। মূলত এ অনুষঙ্গে মৃত্যু-ইচ্ছায় অনশনকারীরা মৃত্যুর কাছাকাছি থেকে ফেরত আসে বলে ‘প্রায়’ শব্দটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে এমন অর্থ ধারণ করেছে।

প্রেক্ষিত/পরিপ্রেক্ষিত
‘পরিপ্রেক্ষিত’ ও ’প্রেক্ষিত’ শব্দের তফাত আকাশ-পাতাল। তবু অনেকে ‘পরিপ্রেক্ষিত’ অর্থে ‘প্রেক্ষিত’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। ‘প্রেক্ষিত’ শব্দ হতে ‘প্রেক্ষণ’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘দৃষ্টি’। ‘প্রেক্ষিত’ প্রেক্ষণ শব্দের বিশেষণ। এর অর্থ, যা দর্শন করা হয়েছে। প্রেক্ষণীয় শব্দের অর্থ ‘যা দেখা উচিত বা যা দেখা হবে’। ‘চবৎংঢ়বপঃরাব’ বা ‘ইধপশমৎড়ঁহফ’ অর্থে ‘প্রেক্ষিত’ লেখা ভুল। ‘চবৎংঢ়বপঃরাব’ বা ‘ইধপশমৎড়ঁহফ’ অর্থে ‘পরিপ্রেক্ষিত’ লিখুন, কখনো ‘প্রেক্ষিত’ লিখবেন না।

প্লুতো
‘প্লুত’ (প্লুতো) শব্দের অর্থ প্লাবিত (বিশেষণ) কিংবা সম্পূর্ণ সিক্ত বা ভেজা। অশ্বের স্বচ্ছন্দ চলার গতি বা লম্ফ দিয়ে গমনকারী জীব অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাংলা ব্যাকরণে একসময়ে পড়েছিলাম প্লুতো স্বরের কথা আজকাল আর তা চোখে পড়ে না। দূরাহ্বানের সময় কিংবা রোদনের সময় টেনে টেনে যে স্বর প্রলম্বিত করা হয় তাকেই ‘প্লুতো স্বর’ বলা হয়। বাচ্চারা যখন কাঁদে তখন তারা টেনে টেনে স্বরকে প্রলম্বিত করে। যেমন ‘আমাকে গাড়ি কিনে দাও-ও-ও-ও।’ কিংবা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে কুবের মাঝির হাঁক দূরের নৌকার মাঝিকে লক্ষ করে “যদু হে-এ-এ-এ …. মাছ কিবা।” সেদিনের ইলিশ মাছের দাম জানার প্রত্যাশায় দূরে অবস্থানরত যদুকে কুবেরের এই প্রশ্ন। এগুলো হচ্ছে প্লুত/ প্লুতো স্বর।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!