বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন
ঊনবিংশ অধ্যায়

ফতুর
‘ফতুর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ রিক্ত, নিঃশেষ, শূন্য, নিঃস্ব, অসহায় প্রভৃতি। এটি আরবি শব্দ। আরবি ‘ফুতুর’ শব্দ থেকে বাংলা ‘ফতুর’ শব্দের উৎপত্তি। আরবি ‘ফুতুর’ শব্দের প্রয়োগ ও অর্থ দুটোই শরীর-সম্পর্কিত। আরবি ভাষায় শব্দটির অর্থ দুর্বলতা, অবসন্নতা, অলসতা, আলস্য, নির্জীবতা প্রভৃতি। বাংলা ভাষায় ‘ফতুর’ শব্দটির প্রয়োগ ও অর্থ শুধু শরীর সম্পর্কিত নয়, বরং পার্থিব সম্পদ সম্পর্কিত নিঃস্বতা প্রকাশে অধিক প্রয়োগ দেখা যায়। আরবি ‘ফুতুর’ শব্দের প্রসঙ্গে শরীর দুর্বল হলে যেমন মানুষের সবকিছুতে অসহায়ত্বের সূচনা ঘটে; তেমিন বাংলা ‘ফতুর’ শব্দের প্রসঙ্গে সহায়-সম্পদে ব্যক্তিবিশেষ রিক্ত হলে তার সবকিছুতে অসহায়ত্বের অনুপ্রবেশ দেখা যায়। তাই ‘ফতুর’ শব্দটি আরবি ভাষা হতে বাংলায় মেহমান হয়ে এলেও তার বাহ্যিক কিংবা অন্তর্নিহিত কোনো অর্থের বিপর্যয় ঘটায়নি। বরং আরও প্রসারিত করেছে।

ফলশ্রুতি
‘ফলশ্রুতি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘পুণ্যকর্মের ফলাফলের বিবরণ শ্রবণ করা’। ফল আর শ্র“তি মিলে ‘ফলশ্র“তি’ শব্দের উৎপত্তি। এটাতেও বোঝা যায় ফলশ্র“তি শব্দের অর্থ ফল-শ্রবণ। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানসমূহে যে অর্থে ‘ফলশ্র“তি’ লেখা হচ্ছে তা ভুল। ‘ফলশ্র“তি’ বা পাপ-পুণ্যের ‘ফলাফল বিবরণ’ লিখবেন না। ফলাফল, ফল, পরিণতি, পরিণাম ইত্যাদি অর্থবোধক ও মাধুর্যমণ্ডিত শব্দ ব্যবহার করুন।
ফল্গুধারা
ফল্গুধারা শব্দটির অর্থ ‘যে প্রবাহ বা ধারা বাইরে প্রকাশিত নয়’। ফল্গু একটি নদীর নাম। ভারতের বিহার রাজ্যের গয়ার মধ্য দিয়ে এটি প্রবাহিত। পবিত্রতার জন্য ফল্গু নদী হিসাবে বিখ্যাত। গ্রীষ্মকালে নদীটার বৃহদংশ একেবারেই শুকিয়ে যায়। কিন্তু বালি কিছুটা খুঁড়লেই জলের সন্ধান পাওয়া যায়। এ জন্য ফল্গু নদী অন্তঃসলিলা অর্থাৎ মাটির নিচ দিয়ে প্রবাহিত বলে খ্যাত। ভারতীয় পুরাণে রামের পত্নী সীতার অভিশাপে ফল্গু নদী অন্তঃসলিলা হয়ে যায়। ফল্গু নদীর এ অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে ফল্গু নদীর ধারা সংবেদনশীল বাঙালি মনের বাংলা ভাষায় স্থান করে নেয়। অনেকের স্নেহ-মমতা ফল্গুধারার মতো। বাইরে তার প্রকাশ নেই। আবার অনেকের মনে অসহনীয় বেদনা ফল্গুধারার মতো বহমান কিন্তু বাইরে প্রকাশ নেই।

ফাইফরমাশ
বহুল প্রচলিত ‘ফাইফরমাশ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ছোটখাটো কার্জকর্ম করা, অস্থায়ীভাবে কোনো ছোট কাজ করা, স্বল্প মজুরিতে কারও ছোটখাটো আদেশ-নির্দেশ পালন করা প্রভৃতি। আরবি ‘ফাহিশ’ এবং ফারসি ‘ফরমাশ’ শব্দের মিলনে বাংলা ফাইফরমাশ শব্দের জন্ম। আরবি ‘ফাহিশ’ শব্দের অর্থ অশ্লীল, কদর্য, খারাপ এবং ফারসি ‘ফরমাশ’ শব্দের অর্থ আদেশ, নির্দেশ প্রভৃতি। সুতরাং ফাহিশফরমাশ > ফাইফরমাশ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে অশ্লীল বা কদর্য বা খারাপ কাজের আদেশ। তবে বাংলায় ‘ফাইফরমাশ’ শব্দটি ব্যুৎপত্তিগত অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয় না। এখানে অশ্লীল বা কদর্য বা খারাপ কাজ বোঝাতে ছোটখাটো কাজ করাকে বা কাজ করার আদেশ প্রদানকে বোঝায়। বাংলায় ব্যবহৃত ‘ফাইফরমাশ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যা-ই হোক না কেন, এখানে অশ্লীল কিছু নেই। সবাই কিছু না কিছু ফাইফরমাশ খাটেন, কেউ মনিবের, কেউ পিতামাতার, কেউ-বা তার প্রিয়জনের নতুবা শ্রদ্ধেয় জনের। বউয়ের ফাইফরমাশ খাটে না, এমন লোক পাওয়া মুশকিল। অফিসের বসের ফাইফরমাশও সবাইকে খাটতে হয়, বসবিহীন লোক কি আছে শুধু বেকার
ছাড়া!
ফাঁকতাল
‘ফাঁকতাল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সুযোগ, সুবিধা, অনুকূল সময়, সুবিধাজনক অবস্থান প্রভৃতি। এটি সংগীতশাস্ত্রের একটি পারিভাষিক শব্দ। সংগীত করার সময় তালের যে অঙ্গে প্রস্বন বা ঝোঁক পড়ে না সে অঙ্গটিকে ‘ফাঁকতাল’ বলা হয়। তালের অঙ্কে শূন্য (০) দেখিয়ে স্বরলিপি বা তাললিপিতে কোথায় ফাঁকতাল হবে তা নির্দেশ করা হয়। ফাঁকতালের শূন্য নির্দেশের স্থানটিই তালের ক্ষণিক অবসর। এ অবসরকে বাংলা বাগ্ভঙ্গিতে ‘কথাবার্তায়’ সুযোগ অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। সংগীতশিল্পীরা দীর্ঘ সাধনায় অর্জিত অপূর্ব কৌশলকে সংগীতের ফাঁকতাল সামাল দেন। ঠিক তেমনি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও কখন কীভাবে ফাঁকতালকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে প্রত্যাশিত সিদ্ধি অর্জন করা যায় তা-ও কৌশলে অর্জন করতে হয়।

ফাতরা
‘ফাতরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অপ্রয়োজনীয়, নিষ্প্রয়োজন, মূল্যহীন, ধাপ্পাবাজ, বাজে, হালকা, খেলো, বাচাল, বিরক্তিকর প্রভৃতি। ‘ফাতরা’ কোনো বিদেশি ভাষা থেকে আসা শব্দ নয়। আমাদের বহুল পরিচিত কলাগাছ থেকে ‘ফাতরা’ শব্দের উৎপত্তি। কলাগাছের পাতা ধরে টান দিলে পাতার সঙ্গে ফড় ফড় শব্দে যে শুকনো বাকল উঠে আসে তাকে ফাতরা বলা হয়। কলাপাতা সংগ্রহের জন্য কলাগাছের পাতা ধরে টান দেওয়া হয় কিন্তু তৎসঙ্গে উঠে আসে অপ্রয়োজনীয় বস্তু ফাতরা। শুধু তাই নয়, বাচালের মতো অর্থহীন ও ফড়ফড় বিশ্রী শব্দে সৃষ্টি করে বিরক্তি। কলাগাছ বেশ প্রয়োজনীয় কিন্তু ফাতরা কোনো কাজের বস্তু নয়। কলাপাতা একটি প্রয়োজনীয় বস্তু, তবে তার সঙ্গে লেগে থাকা ‘ফাতরা’ মূল্যহীন। কলাপাতাকে কাজে লাগাতে হলে তার সঙ্গে লেগে থাকা ‘ফাতরা’ কেটে ফেলতে হয়। ফাতরা পরিষ্কার করা যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি বিরক্তিকর। ফাতরার এ অপ্রয়োজনীয় অবস্থান ও অবাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্যকেই বাংলায় ‘ফাতরা’ শব্দে তুলে ধরা হয়েছে। এ শব্দের মাধ্যমে কলাগাছের অপ্রয়োজনীয় ও বিরক্তিকর ‘ফাতরা’ বড় ভীষণ যত্নের কলাগাছ থেকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নেমে এসেছে।
ফালতু/ফাতরা
‘ফালতু’ শব্দের অর্থ ফাতরা, অপ্রয়োজনীয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত, বেকার, অর্থহীন, অনুপযোগী, অনাবশ্যক, না-হলেও চলে প্রভৃতি। হিন্দি ‘ফালতু’ শব্দ বাংলায় এসে ‘ফাতরা’ শব্দের স্থান ও অর্থ দখল করে নিয়েছে। ‘ফাতরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থও ‘ফালতু’র অনুরূপ। কলাগাছ থেকে ‘ফাতরা’ শব্দের উৎপত্তি। কলাগাছের পাতা ধরে টান দিলে পাতার সঙ্গে ফড় ফড় শব্দে যে শুকনো বাকল উঠে আসে তাকে ফাতরা বলা হয়। কলাপাতা সংগ্রহের জন্য কলাগাছের পাতা ধরে টান দেওয়া হয় কিন্তু তৎসঙ্গে উঠে আসে তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় বস্তু ফাতরা ফতফত শব্দ করে। কলাগাছ বেশ প্রয়োজনীয় কিন্তু তার তুলনায় ফাতরা অপ্রয়োজনীয়। ফাতরা পরিষ্কার করা যেমন সময়ক্ষেপক তেমনি বিরক্তিকর। ফাতরার এ অপ্রয়োজনীয় অবস্থান ও অবাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্যকেই বাংলায় ‘ফাতরা’ শব্দে তুলে ধরা হয়েছে।

ফিরিঙ্গি
পর্তুগিজ শব্দ ফ্রান্সেস (ঋৎধহপবং) থেকে ‘ফিরিঙ্গি’ শব্দের উদ্ভব। শব্দটি দিয়ে যেকোনো ইউরোপীয় জাতি বোঝানো হতো। ইংরেজিতে ফিরিঙ্গি শব্দের চারটি বানান দেখা যায়। যেমন ভবৎরহমর, ভরৎরহমর, ভবৎরহমবব, ভবৎরহমযবব. ফিরিঙ্গি শব্দের তিনটি মূল অর্থ রয়েছে। যথা : পর্তুগিজ ও ভারতীয় মিশ্রণজাত জাতি, ইউরেশিয়ান ও খ্রিস্টান। ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে ফিরিঙ্গি শব্দটি সম্মানার্থে ব্যবহৃত হতো। পরে ফিরিঙ্গি শব্দটি তুচ্ছার্থে বা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের মতে, ফরাসি ভৎধহপ হতে ভবৎরহমর, ভরৎরহমর, ভবৎরহমবব, ভবৎরহমযবব শব্দ চারটির উৎপত্তি। ‘আরব ও পারসিকদিগের সঙ্গে প্যালেস্টাইন নিয়ে ধর্মযুদ্ধের (পৎঁংধফব) সময় ইউরোপের খ্রিস্টানগণ ফ্রাঙ্ক নামে অভিহিত হতেন। ওই সময় সকলের বোধগম্য এক নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়, এর নাম ছিল খরহমঁধ ঋৎধহপধ বা ফ্রাঙ্ক ভাষা। পারসিক বা আরবগণ শব্দটিকে ফেরঙ্গ উচ্চারণ করতেন। এ ফেরঙ্গ শব্দের অপভ্রংশ ফিরিঙ্গি। পাশ্চাত্য দেশ অর্থে ফিরঙ্গ দেশ, তদ্দেশবাসি ফিরিঙ্গি।’ সংস্কৃত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম ও বাচস্পত্যে ‘ফিরঙ্গ’ শব্দটি আছে। সুতরাং বলা যায়, ফিরিঙ্গি শব্দটি একেবারে নতুন নয়। আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে ও ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গলে ‘ফিরিঙ্গি’ বলতে শুধু পর্তুগিজদের বোঝানো হয়েছে। পরে ইউরোপবাসীর সঙ্গে ভারতীয়দের মিশ্রণে সৃষ্ট সঙ্করজাতও ‘ফিরিঙ্গি’ নামে পরিচিতি পায়।

ফুলঝুরি
‘ফুলঝুরি’ শব্দের অর্থ ‘বাগাড়ম্বর, অর্থহীন বাগ্বিস্তার, অলঙ্কারবহুল কথা’ ইত্যাদি অর্থ প্রকাশে বাগ্ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হয়। মূলত কথা ও ফুলঝুরি শব্দ দুটোর মিলনে ‘কথার ফুলঝুরি’ বাগধারার উৎপত্তি। ফুলঝুরি একপ্রকার আতশবাজি। দেখতে অনেকটা আগরবাতির মতো। এটি হাতে ধরে আগুন দিলে স্ফুলিঙ্গ বের হয়ে পুষ্পবৃষ্টির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফুলঝুরি নামের আতশবাজির এ বৈশিষ্ট্য থেকে ‘কথার ফুলঝুরি’ বাগ্ধারার জন্ম। বক্তার মুখ দিয়ে কথার ফুলঝুরি ফুটতে পারে, লেখার মধ্যেও ফুলঝুরি থাকতে পারে। ‘ফুলঝুরি’ যেখান থেকেই ফুটুক তা অর্থহীন বাগ্বিস্তার ছাড়া কিছু নয়।

ফুলেল/ফুলের
‘ফুলেল’ শব্দের অর্থ পুষ্পময় বা ফুলের মতো, কুসুমিত, মুগ্ধকর, ফুলের মতো রমণীয় বা মোহনীয়। কিন্তু ‘ফুলের’ শব্দের অর্থ পুষ্পের। ‘ফুলেল’ বিশেষণ পদ, কিন্তু ‘ফুলের’ বিশেষ্য পদ। ‘ফুলেল শুভেচ্ছা’ অর্থ ফুলের মতো রমণীয় শুভেচ্ছা বা পুষ্পময় বা কুসুমিত শুভেচ্ছা। সুতরাং ‘ফুলেল শুভেচ্ছা’ হতে পারে কিংবা হতে পারে ‘ফুলের মতো শুভেচ্ছা’, কিন্তু ‘ফুলের শুভেচ্ছা’ হতে পারে না। কারও হাতে বই তুলে দিয়ে যেমন বলা যায় না ‘বইয়ের শুভেচ্ছা’ বা ক্রেস্ট তুলে দিয়ে ‘ক্রেস্টের শুভেচ্ছা’ জানালাম; তেমনি ফুল তুলে দিয়ে বলা যায় না ‘ফুলের শুভেচ্ছা’ জানালাম। ‘ফুলেল’ বিশেষণ পদ, রূপক অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। পুরো অনুষ্ঠানের কোনো বিশেষ অংশ না বুঝিয়ে ‘ফুলেল’ শব্দ দ্বারা পুরো অনুষ্ঠানকে প্রকাশ করা হয়। ফুলের শুভেচ্ছা = ফুল + এর শুভ + ইচ্ছা। ফুলের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা থাকতে পারে না। কিন্তু, ফুলেল শুভেচ্ছা বলতে পুষ্পময়/পুষ্পিত ও শোভনীয় ইচ্ছা, যে ইচ্ছা আপনি যেকোনো প্রিয়জনের উদ্দেশে নিবেদন করতে পারেন। অনেকে ‘ফুলেল’ শব্দের পরিবর্তে ‘ফুলল’ শব্দও ব্যবহার করে থাকেন। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানেও ‘ফুলেল’ শব্দটি আছে। শব্দটি কিন্তু প্রমিত নয়, তেমন প্রচলিতও নয়।

ফোড়ন কাটা
‘ফোড়ন কাটা’ বাগ্ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ কথার মধ্যে মন্তব্য করা, টিপ্পনী কাটা, বিরূপ মন্তব্য করা, বিব্রতকর কিছু বলা প্রভৃতি। রান্নাঘরে রান্নাবান্নার সময় তরকারিতে ‘ফোড়ন দেওয়া’ থেকে ‘ফোড়ন কাটা’ শব্দের উৎপত্তি। তরকারি সুস্বাদু করার জন্য গরম তেলের উপর জিরা, মরিচ, তেজপাতা প্রভৃতির সম্বরা দেওয়াকে ‘ফোড়ন দেওয়া’ বলা হয়। তবে তরকারির ফোড়ন আর বাগ্ভঙ্গির ফোড়ন অভিন্ন নয়। বাংলা ভাষায় বাগ্ধারা হিসাবে ব্যবহৃত ‘ফোড়ন দেওয়া’ অর্থ হলো : দু-জনের বা দু-পক্ষের কথা বা আলোচনার মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তি বা পক্ষের মন্তব্য করা। তরকারিতে ফোড়ন দিলে তরকারি সুস্বাদু হয় কিন্তু কথায় ফোড়ন কাটলে বক্তার মেজাজ গরম হয়ে ওঠে। তবে বক্তার মেজাজ গরম হয়ে উঠলেও কথায় ফোড়ন কাটলে অনেকে মজা পায়। তাই পরোক্ষভাবে ‘তরকারির ফোড়ন’ আর ‘কথার ফোড়ন’-এর মধ্যে বেশ মিল রয়েছে।

ফ্যাঁকড়া
‘ফ্যাঁকড়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ঝগড়া, ফ্যাসাদ, ঝঞ্ঝাট, বিঘ্ন, বাধা, ছলছাতুরী প্রভৃতি। গাছের ফ্যাঁকড়া হতে আলোচ্য অর্থ-সমৃদ্ধ ফ্যাঁকড়া শব্দের উৎপত্তি। গাছের উপশাখা বা ছোট ডালপালাকে ‘ফ্যাঁকড়া’ বলে। যত বড় গাছ তত বেশি ফ্যাঁকড়া। তবে সহজে ফ্যাঁকড়াকে ঝেড়ে ফেলা যায়। বড় প্রজাতির গাছের গুঁড়ির ফ্যাঁকড়া ছেঁটে না-দিলে গাছ কিন্তু ঠিকমতো লম্বা হতে পারে না। গাছের ফ্যাঁকড়া গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুষমমণ্ডিত বিস্তারে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এমনকি অনেক ছোট লতাগুল্মেও ফ্যাঁকড়া ছেঁটে দিতে হয়, নইলে আশানুরূপ শস্য পাওয়া যায় না। কোনো কাজ, পরিকল্পনা কিংবা প্রকল্প বা কার্যে ফ্যাঁকড়া লাগলে তাহলে গাছের ফ্যাঁকড়ার মতো আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। কারণ ‘ফ্যাঁকড়া’ কাজের স্বাভাবিক বিকাশ-প্রসারে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এ জন্য ফ্যাঁকড়া ছেঁটে ফেলতে হয়। এ শব্দ থেকে চন্দ্রবিন্দু-সহযোগে ফ্যাঁকড়া কথার উৎপত্তি।
ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব
বাগ্ভঙ্গিটির আভিধানিক অর্থ এমন ভয়ঙ্কর কিছু যা যে-ব্যক্তি সৃষ্টি করেছে সে-ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, নিয়ন্ত্রণহীন বিষয়, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তি, নিয়ন্ত্রহীন যন্ত্র, যে নির্মাতাকেও গ্রাহ্য করে না প্রভৃতি। ফ্রাংকেনস্টাইনের দানব বলতে সাধারণভাবে তাকে বোঝানো হয় যা নিয়ন্ত্রণহীন এক ভয়ঙ্কর সৃষ্টি, যে তার স্বার্থের কারণে প্রয়োজন হলে নিজের স্রষ্টাকেও অবলীলায় হত্যা করে ফেলে। ইংরেজি ভাষা হতে ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ শব্দটি বাংলায় কৃতঋণ শব্দ হিসাবে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছে। ইংরেজ রোম্যান্টিক কবি পি. বি. শেলির স্ত্রী মেরি শেলি শব্দটির স্রষ্টা। মেরি শেলির লেখা ‘ফ্রাংকেনস্টাইন অব দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’ উপন্যাসের ভয়ঙ্কর চরিত্র ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ হতে শব্দটির উৎপত্তি। এ উপন্যাসের মূল চরিত্র ফ্রাংকেনস্টাইন একজন খ্যাতিমান ডাক্তার, যিনি গবেষণার মাধ্যমে প্রাণ-সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে অবগত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি মৃত মানুষের হাড়গোড়, লোহালক্কড় প্রভৃতি দিয়ে নির্মিত একটি ভয়ঙ্কর দানবীয় মূর্তিতে প্রাণসঞ্চার করেন। ফ্রাংকেনস্টাইনের সৃষ্ট এ দানবটি ছিল যেমন বিকট তেমন ভয়ঙ্কর। তাই কেউ তাকে পছন্দ করত না, সে ছিল নিঃসঙ্গ, সবসময় বিষণ্ন থাকত। নানা কারণে ফ্রাংকেনস্টাইন ও তার সৃষ্ট দানবের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। দানব চারপাশের সকল বিষয়ে প্রচণ্ড বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে। সে প্রচণ্ড ভয়ঙ্কর ও নৃশংস হয়ে ওঠে। ফ্রাংকেনস্টাইন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় সে নিজেকে ধ্বংস করার পূর্বে তার স্রষ্টা ডাক্তার ফ্রাংকেনস্টাইনকেও হত্যা করে ফেলে।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!