বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন
বিংশ অধ্যায়

বকধার্মিক
ভারতীয় পুরাণের একটি কথোপকথন থেকে ‘বকধার্মিক’ বাগ্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। এর আভিধানিক অর্থ কপট সাধু, ভদ্রবেশী-অভদ্র প্রভৃতি। এবার বাগ্ভঙ্গিটির উৎস নিয়ে আলোচনা করা যাক। শ্রীরামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ বনবাসকালে একদিন পম্পা সরোবরের তীরে ভ্রমণ করছিলেন। তখন ওই পম্পা সরোবরের তীর-নিকটবর্তী অগভীর জলে এক শ্বেতশুভ্র বককে খুব সন্তর্পণে ধীর পায়ে হাঁটতে দেখে রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে বললেন :
শনৈঃ শনৈঃ ক্ষিপেৎ পাদৌ প্রাণীনাং বধ শঙ্কয়া।
পশ্য লক্ষ্মণ পম্পায়াং বকঃ পরমধার্মিকঃ॥
অর্থাৎ, “হে লক্ষ্মণ, দেখ, এই পম্পা সরোবরের জলে বসবাসরত কোনো জীব মরে যেতে পারে এমন শঙ্কায় বক কেমন অতি সন্তর্পণে ধীরে ধীরে পদক্ষেপ করছে, অতএব বোধ হচ্ছে বক পরম ধার্মিক।”
রামচন্দ্রের সমস্ত দায়ভার ছিল লক্ষ্মণের হাতে। অগ্রজ রামচন্দ্রের আজ্ঞায় তাঁর জীবন-ধারণের উপযোগী সকল কাজ লক্ষ্মণই সম্পন্ন করেন, তাই তাঁর বাস্তবিক ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ছিল অধিক। তিনি রামচন্দ্রকে বললেন :
ন জানাসি রাঘব ত্বং বকঃ পরম দারুণঃ।
নির্জীব ভক্ষকো গৃধ্রঃ সজীব ভক্ষকো বকঃ॥
অর্থাৎ, “হে রাঘব, আপনি জানেন না যে এ শুভ্রকান্তি বক, ধার্মিক তো নয়ই, বরং অতিশয় নিষ্ঠুর, কেননা, ভয়ঙ্কর চেহারার গৃধ্র বা শকুন দেখতে ভয়ঙ্কর হলেও, তারা একমাত্র মৃত প্রাণীই ভক্ষণ করে, কিন্তু সুন্দর চেহারার বক সজীব অর্থাৎ জীবন্ত মাছকেই নিষ্ঠুরভাবে ভক্ষণ করে।”
বক মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে এক পা তুলে বিলে-ঝিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন তাকে দেখে মনে হয় কোনো সাধু একাগ্রচিত্তে কঠোর তপস্যায় মগ্ন। সাধুর মতো তপস্যায় মগ্ন দেখালেও বকের আসল উদ্দেশ্য মাছ-শিকার। মাছ নাগালে আসামাত্র তপঃবেশ ত্যাগ করে ঠোঁট চালিয়ে দেয় কঠোর নৃশংসতায়। অনুরূপ যারা ধার্মিক বেশে ভণ্ডামি বা কপটতায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে তাদেরকে বকের মাছ শিকারের তাগিদে সাধুর মতো দাঁড়িয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

বদ্ধপরিকর
‘বদ্ধপরিকর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দৃঢ়সংকল্প, কঠোর প্রতিজ্ঞা, ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘বদ্ধ’ ও ‘পরিকর’ শব্দ হতে বদ্ধপরিকর শব্দের উৎপত্তি। বদ্ধ শব্দের অর্থ বাঁধা আর পরিকর শব্দের অর্থ কাপড়। সুতরাং বদ্ধপরিকর শব্দের অর্থ কাপড় বাঁধা। কিন্তু সংস্কৃতজাত কাপড় বাঁধা বাংলায় এসে ‘দৃঢ়সংকল্প’ অর্থ ধারণ করেছে। মানুষ কাপড় পরে কাজ করে তবে কাপড় না-বেঁধে কেউ কাজ করতে পারে না। কাজ যত শ্রমসাধ্য, কঠিন ও বড় হবে কাপড় বাঁধার প্রকৃতিই তত শক্ত হবে। তাছাড়া কাপড় শক্ত করে না-বাঁধলে খুলে পড়ার সম্ভাবনা আছে। কৃষক মাঠে চাষ করা শুরু করার আগে এমন শক্তভাবে কাপড়কে বেঁধে নেয় যাতে পড়ে না যায়। কারণ কাজের মাঝখানে কাপড় পড়ে গেলে কাজের ব্যাঘাত ঘটবে। পর্বতারোহী, ডুবুরি থেকে শুরু করে সবাই কাজ শুরুর আগে শক্ত করে কাপড় বাঁধে। এ কাপড় বাঁধার ওপর কাজের ধরন, প্রকৃতি ও ইচ্ছা নির্ভরশীল। কেউ চায় না কাজের মাঝখানে বাধাগ্রস্ত হোক। ইদানীং মেয়েরাও পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করছে। তাদের ক্ষেত্রে কথাটা আরও সত্যি। কাপড় বেঁধে কাজ করতে হয়। ‘কাপড় বাঁধা’ কাজের ইচ্ছা, সংকল্প, অধ্যবসায় ও কঠোরতার ইঙ্গিত। তাই সংস্কৃত দৃঢ়সংকল্প বাংলায় কাপড় বাঁধা অর্থ ধারণ করেছে।

বধূ
বধূ শব্দের বর্তমান ও প্রচলিত অর্থ বিবাহিত স্ত্রী, বিয়ের কনে, ছেলের বউ প্রভৃতি। এটি সংস্কৃত শব্দ। ‘বধূ’ শব্দের মূল ও আদি অর্থ ‘যে যুবকের মন বাঁধে’। বধূ ছাড়া আর কেউ যুবকের মন বাঁধতে পারে না। তাই তো উচ্ছল-উদ্বেল-সমুদ্র-চঞ্চলময় যুবকও বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর নিরীহ ও গোবেচারা হয়ে যায়। যুবকের মন এমন শক্ত করে বধূ বেঁধে রাখে যে, তার আর নড়াচড়ার সুযোগ বলতে গেলে থাকেই না। বিয়ের আগে বধূ থাকে কনে, কনে হচ্ছে বাঁশির মতো সুরেলা মোহনীয় আবেশ। সে-কনে বধূ হওয়ায় বাঁশ হয়ে যুবককে লাশের মতো নির্জীব করে দেয়।

বরখাস্ত
‘বরখাস্ত’ ফারসি শব্দ। এর আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ চাকরিচ্যুত, ছাঁটাই, কর্মচ্যুত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত। কর্ম থেকে বাধ্যতামূলক অব্যাহতিই মূলত ‘বরখাস্ত’। ফারসি ভাষায় ‘বরখাস্ত’ শব্দের অর্থ ছিল জেগে-ওঠা, ওপরে-ওঠা, অদৃশ্য হওয়া, বিলীন হওয়া, হারিয়ে-যাওয়া প্রভৃতি। কিন্তু বাংলায় অতিথি হয়ে এসে ফারসি ‘বরখাস্ত’ তার পূর্বের অর্থ হারিয়ে ‘কর্মহীন’ অর্থ প্রকাশে ডুবে গেছে। কিন্তু কেন এমন হলো? যার চাকরি আছে তার জীবন আসলেই নিরুদ্বিগ্ন। হাবাগোবার মতো সকালে অফিসে যায়, সন্ধ্যায় ফেরে এবং মাস শেষে বেতন নিয়ে জীবনধারণ করে। কোনোদিকে তার খেয়াল থাকে না, কোনো চিন্তা থাকে না, ঢেউহীন নদী তথা পুকুরের মতো জীবন প্রবাহিত হয়। কিন্তু এমন নিরুদ্বিগ্ন জীবনের আধার চাকরিটা চলে গেলে সে অস্থির হয়ে পড়ে। প্রবল আবেগে সারা শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। অনেকে আবার চাকরি হারানোর পর লজ্জা, সংকোচ বা চাকরির খোঁজে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। মূলত চাকরিচ্যুতির পর ব্যক্তির এমন আচরণের অনুষঙ্গে ফারসি জেগে উঠা বা অদৃশ্য হওয়া ‘রখাস্ত’ বাংলায় এসে চাকরিটা সত্যি সত্যি হারিয়ে জেগে উঠেছে। এখন সে বুঝতে পারছে পৃথিবীটা শুধু চাকরি নয়। জীবনের এক দ্বার বন্ধ হলে হাজার দ্বার খুলে যায়।

বরদা
বর + দাতা থেকে বরদাতা এবং বরদাতা থেকে বরদা। যিনি বর দান করেন তিনি বরদা। ভারতীয় পুরাণে বরদা নামের একজন দেবী আছেন। সরস্বতীকেও ‘বরদা’ বলা হয়। কারণ তিনি তাঁর ভক্তদের বর দেন।

বর্বর
‘বর্র্বর’ শব্দের আদি ও প্রকৃত অর্থ ছিল ‘বিদেশি’। যার ভাষা বোঝা যায় না সে ‘বর্বর’। বৈদেশিকরা দেশীয় রীতিনীতি, ধর্মপদ্ধতি ও শিষ্টাচার বিষয়ে যখন অজ্ঞ তখন তারা অবশ্যই দেশীয়দের কাছে বর্বর। উপমহাদেশে আর্যদের কাছে দেশীয়রাই ছিল বর্বর। কারণ দেশীয়রা আর্যদের ভাষা বুঝত না। র্ব্-র্ব্ = বর্বর, প্রলাপার্থক অব্যয়। এ অব্যয় থেকে ‘বর্বর’ শব্দটির জন্ম। আরবিতেও এ অব্যয়টি সমার্থক। গ্রিক নধৎনধৎড়ং, ও ল্যাটিন নধৎনধৎড়ঁং শব্দও ‘বর্বর’ শব্দের সঙ্গে সমার্থক এবং উচ্চারণগত দিকেও যথেষ্ট মিল রয়েছে। ইংরেজি নধৎনধৎরধহ শব্দটি গ্রিক বা ল্যাটিন থেকে গৃহীত। এর অর্থ ভড়ৎবরমহবৎ। শেক্সপিয়র তাঁর বিখ্যাত ঈধৎরড়ষধহঁং নাটকেও শব্দটি এ অর্থে ব্যবহার করেছেন। বাংলা ‘অসভ্য’ শব্দটি বর্বর শব্দের সমার্থক ও সহচর। তাহলে সভ্য কে? সভায় যিনি সাধু তিনি সভ্য এবং সভায় যিনি অসাধু তিনি অসভ্য। সভায় এখন যাদের সভ্য বলা হয় তাঁরা কি আসলেই সাধু?

বর্ষ
ভারতীয় পুরাণে বর্ষ শব্দের অর্থ দেশ। পৃথিবীর বৃহৎ পর্বতশ্রেণির মধ্যে নয়টি বর্ষ রয়েছে। এ বৃহৎ নয় বর্ষ হচ্ছে : ভারতবর্ষ, কিম্পুরুষ, হরি, রম্যক, হিরণ¥য়, উত্তরকুরু, ইলাবর্ত, ভদ্রাশ্ব ও কেতুমালা।

বশংবদ
‘বশংবদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অনুগত, অধীন, হুকুমের আওতায়, বশবর্তী প্রভৃতি। বশংবদ সংস্কৃত শব্দ। এর আদি ও মূল অর্থ দ্বারা এমন আচরণের ব্যক্তিকে নির্দেশ করত ‘যিনি বলেন আমি নিশ্চিত বশ’। মূলত যে পূর্ব থেকে অন্যের বশে বা অধীনে বা অনুগত হওয়ার নিশ্চিত ঘোষণা দিয়ে বসে আছে, সেই ‘বশংবদ’। বাংলায় শব্দটির অর্থ-পরিবর্তন হয়নি। কারণ যিনি অনুগত, অধীন তিনিই তো বশংবদ। তবে এককালে সম্মানিত ব্যক্তি ও মুরব্বিদের চিঠি লেখার সময় চিঠির শেষে প্রেরক সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ ‘বশংবদ’ লিখত। পুরনো ব্যক্তিগত পত্রে এটি খুব দেখা যায়। এখন কিন্তু সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ শাব্দিক অর্থে দৃশ্যত বশংবদ লেখা না-হলেও চিঠিপত্রে কিন্তু বশংবদ রয়েই গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক পত্রে ‘আপনার অনুগত’ শব্দ এখন বশংবদের বাবা হয়ে অবস্থান করছে। কারণ অনুগত মানে বশংবদ এবং বশংবদ মানে অনুগত। অবশ্য এ অনুগত শব্দটি এখন প্রাচীন বশংবদ শব্দের ন্যায় সম্মান প্রদর্শনের জন্য লেখা হয়।
বসুমতী
পৃথিবীর অন্য নাম বসুমতী। সুবর্ণ অগ্নির তেজে বসুমতীর সৃষ্টি। পৃথিবী এ সুবর্ণ বর্ণ ধারণ করেছিলেন বলে তাঁর নাম হয় বসুমতী।

বস্তাপচা বুলি
‘বস্তা’ ও ‘পচা’ শব্দ দুটোর সমন্বয়ে ‘বস্তাপচা’ শব্দটির উৎপত্তি। বস্তা মানে থলে এবং পচা মানে নষ্ট। বস্তাপচা মানে বস্তায় পচা। বস্তায় রাখা বস্তু পচে গেলে তাকে বস্তাপচা বলা হয়। বস্তাপচা পণ্য সবসময় ফেলে দেওয়া হয় না। অনেক সময় তা বাজারে খুব সস্তা দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অথবা রাস্তার পাশে ফুটপাথে ফেলে দেওয়া হয় এবং যে কেউ তা দেখে ও বিনা আয়েসে সংগ্রহ করতে পারে। বস্তাপচা শব্দের পাশে বুলি বসলে হয় বস্তাপচা বুলি। ‘বুলি’ শব্দের অর্থ কথা। সুতরাং বস্তাপচা শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে বস্তায় পচা বুলি। কিন্তু এর প্রায়োগিক অর্থ হচ্ছে সস্তা কথা। অধিক ব্যবহারে যা সহজলভ্য হয়ে যায় তাকেও ‘বস্তাপচা’ বলা হয়। বস্তাপচা দ্রব্য যেমন সহজলভ্য ও প্রচুর। তেমনি যে সকল বাণী বা কথা যত্রতত্র প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয় এবং অর্থও খুব হালকা সেগুলোই হচ্ছে ‘বস্তাপচা বুলি’। বাংলা ছবি, নাটক ও আলাপ-আলোচনায় এটি একটি বহুল ব্যবহৃত কথা। যেমন জীবন একটা রঙ্গমঞ্চ… মায়ের পায়ের নিচে…। কথাগুলো ভালো, তবু বস্তাপচা হলো কেন? তবে কি বেশি ব্যবহারে ভালোরও পচন হয়? হ্যাঁ, অধিক ব্যবহারে ভালো জিনিসের পচন হয় বৈকি।

বাজখাঁই
‘বাজখাঁই’ শব্দের অর্থ গম্ভীর ও কর্কশ গলা বা কণ্ঠস্বর। কিন্তু এর ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাস অন্যরকম বাজবাহাদুর খাঁর গম্ভীর ও চড়া গলা। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে মালব প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন বাজবাহাদুর খাঁ। গীতবাদ্যে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতা ছিল। রাজকার্য অবহেলা করে তিনি সংগীত, নৃত্য প্রভৃতি কাজে অধিক সময় ব্যস্ত থাকতেন। বাজবাহাদুর খাঁ ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে একবার এবং ১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আর একবার সম্রাট আকবরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। অবশ্য দুইবারই তিনি হেরেছেন। শেষ জীবনে তিনি সম্রাট আকবরের দরবারে সংগীত-সাধক হিসাবে স্থান পান। বাজবাহাদুরের কণ্ঠ ছিল যেমন চড়া তেমন গম্ভীর। তার এ চড়া ও গম্ভীর গলা থেকে বাংলা ‘বাজখাঁই’ শব্দের উৎপত্তি ও বিকাশ।

বাটপাড়
‘বাটপাড়’ শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ প্রতারক, ভণ্ড, ঠক, শঠ প্রভৃতি। ‘বাট’ ও ‘পাড়’ শব্দ সহযোগে বাটপাড় শব্দের উৎপত্তি। সংস্কৃত বর্ত্ম থেকে বাংলায় বাট শব্দটি এসেছে। বাট শব্দের আভিধানিক অর্থ পথ বা রাস্তা এবং ‘বাটপাড়’ শব্দের অর্থ তাই যে বাটে পড়ে। বাটে পড়ে বাগ্ভঙ্গির অর্থ হচ্ছে : বাটে অর্থাৎ পথে আক্রমণ করে যে সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। আগে পথে পথিক সেজে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অনেকে সহপথিকের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যেত। প্রতারণার মাধ্যমে হরণ করত বলে তারা ‘বাটপাড়’। এখনও বাটপাড় আছে। তবে বাটপাড় আর ছিনতাইকারী অভিন্ন নয়। ছিনতাইকারীরা জোরপূর্বক নিয়ে যায় কিন্তু বাটপাড়েরা নিয়ে যায় প্রতারণার মাধ্যমে। এ বিবেচনায় যারা সহযাত্রী সেজে নেশার দ্রব্য খাইয়ে সর্বস্ব হরণ করে নিয়ে যায় তারাও ‘বাটপাড়’।

বাৎস্যায়ন
মল্লিনাগ বাৎস্যায়ন ছিলেন এক বেদজ্ঞ ভারতীয় দার্শনিক। তিনি গুপ্তযুগে (চতুর্থ-ষষ্ঠ শতকে) বর্তমান ছিলেন। কামসূত্র ও গোতমের ন্যায়সূত্র গ্রন্থের টীকা ন্যায়সূত্রভাষ্য-এর রচয়িতা রূপে তাঁর নাম পাওয়া যায়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মল্লিনাগ বা মৃল্লান। বাৎস্যায়ন ছিল তাঁর বংশনাম বা পদবি।
তাঁর রচনায় আছে, কুন্তলরাজ সাতকর্ণী সাতবাহন কামান্ধ হয়ে কর্তারি নামক অস্ত্রের সাহায্যে নিজপত্নী মাল্যবতীকে হত্যা করেন। এ কুন্তলরাজ খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে বিদ্যমান ছিলেন। অর্থাৎ, বাৎস্যায়নের বিদ্যমানকাল প্রথম শতকের পরে। বরাহমিহির-রচিত ‘বৃহৎসংহিতা’ গ্রন্থের অষ্টাদশ অধ্যায়টি কামকলা সংক্রান্ত্র। এর বিষয়বস্তু মূলত বাৎস্যায়নের গ্রন্থ থেকে গৃহীত। বরাহমিহির খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে জীবিত ছিলেন। বাৎস্যায়ন যেহেতু বরাহ-মিহিরের পূর্বে গ্রন্থ রচনা করেন সেহেতু তিনি প্রথম থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বিদ্যমান ছিলেন। বাৎস্যায়ন ছিলেন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তান। কেউ কেউ মনে করেন তাঁর বাল্যকাল কেটেছিল বেশ্যালয়ে, যেখানে তাঁর প্রিয় মাসি কাজ করতেন। এখান থেকে তিনি কামকলা সংক্রান্ত প্রথম প্রকৃত জ্ঞান লাভ করেছিলেন।

বাতিক
সংস্কৃতজাত বাংলা শব্দ বাতিক-এর আভিধানিক অর্থ পাগলামি, মানসিক উত্তেজনা, ছিট প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘বাত’ শব্দের সঙ্গে ই (ষ্ণিক্) প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘বাতিক’ শব্দ গঠিত হয়েছে। ‘বাত’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বায়ু। বায়ুপ্রবাহ থেকে ঝড়, সাইক্লোন, ঝঞ্ঝাবাত, বাত্যাপ্রবাহ প্রভৃতি জানমাল বিধ্বংসকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের উদ্ভব হয়। কিন্তু বাংলা ‘বাতিক’ ব্যাত্যাপ্রবাহ নয়। আয়ুর্বেদশাস্ত্র অনুযায়ী বায়ু, পিত্ত ও কফ্-এর সমন্বিত উপাদান মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা টিকিয়ে রাখে। এ তিনটি উপাদানের যথার্থ পরিমাণ উপস্থিতির ওপর স্বাস্থ্য নির্ভর করে। বায়ু একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরে বায়ুর প্রকোপ বাড়লে মানুষের মানসিক উত্তেজনা ও শারীরিক অবস্থা অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। এটাই হচ্ছে রোগ বা ‘বাতিক’। প্রকৃতিতে বায়ুপ্রবাহের একটি স্বাভাবিক মাত্রা ও গতি আছে। বায়ুপ্রবাহের গতি বৃদ্ধি পেলে প্রকৃতি পাগলের মতো অশান্ত হয়ে ওঠে। গাছপালা, ঘরবাড়ি, ধনজন সব ভেঙেচুরে শেষ করে দেয়। তেমনি মানুষের মধ্যে বায়ু বৃদ্ধি পেলেও মানুষ ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ প্রকৃতির মতো অশান্ত হয়ে ওঠে।

বাধিত
বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত ‘বাধিত’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ অনুগৃহীত, অনুগ্রহপ্রাপ্ত, কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ, করুণায় সিক্ত প্রভৃতি। ‘বাধিত’ সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে : বিড়ম্বিত, বিরক্ত, নির্যাতিত, বাধাপ্রাপ্ত প্রভৃতি। সংস্কৃত বিড়ম্বিত ও নির্যাতিত কীভাবে বাংলায় এসে অনুগৃহীত ও কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ হয়ে গেল তা বিশ্লেষণ করা যায়। প্রত্যেক মুদ্রার দুটি পিঠ রয়েছে। ভালো শব্দের বিপরীত মন্দ। ভালো আছে বলে মন্দ এবং মন্দ আছে বলেই ভালো। তাই পরস্পর বিপরীত হলেও একটি অপরটির পূরক এবং একইসঙ্গে সম্পূরক। ক্ষমতাবান লোকদের দ্বারা সাধারণ নিরীহ লোকজন সবসময় বিড়ম্বিত ও নির্যাতিত হয়। শুধু মানুষে নয়, পশুতেও এমন দেখা যায়। প্রকৃতিও আমাদের এমন শিক্ষা দেয়। ছোট মাছ অপেক্ষকৃত বড় মাছের আহার। বস্তুত এভাবে ক্ষমতাবানরা টিকে থাকে এবং নির্যাতন করে তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করে। তাই সাধারণ নিরীহ লোকজন ক্ষমতাবানদের অনুগ্রহের জন্য সবসময় লালায়িত থাকে। ক্ষমতাবানদের সন্তুষ্টিই তাদের নিরাপত্তার নিয়ামক। এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিরীহগণ সর্বদা শক্তিমানদের যেকোনো উপায়ে সন্তুষ্ট করে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ থাকতে চায়। বস্তুত এ কারণে সংস্কৃত ‘বাধিত’ শব্দের অর্থ বাংলায় এসে পুরো উল্টে গেছে। তবে উল্টে গেলেও মুদ্রার ওপিঠ হিসাবে মুদ্রার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বানচাল
‘বানচাল’ শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ ভণ্ডুল, ফেঁসে যাওয়া, ভেস্তে যাওয়া প্রভৃতি। ‘বান’ ও ‘চাল’ শব্দের সমন্বয়ে ‘বানচাল’ বাগ্ভঙ্গিটি গঠিত। ‘বানচাল’ শব্দের মূল অর্থ হলো নৌকার তক্তার জোড় ফাঁক বা আলগা হয়ে যাওয়া। নৌকা তৈরি করার সময় এক তক্তার সঙ্গে আর একটি তক্তাকে জোড়া দেওয়ার জন্য যে খাঁজ কাটা হয় তাকে বলা হয় ‘বান’। ‘চাল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ঢিলা হওয়া। সুতরাং ‘বানচাল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে তক্তাকে জোড়া দেওয়ার জন্য যে খাঁজ কাটা হয় সেটি ঢিলে হয়ে যাওয়া। বানচাল হলে নৌকা অকেজো হয়ে যায়। আর নদীর মাঝখানে যদি এমন ঘটনা ঘটে তো নৌকা ডুবে সহায়সম্পদ ও জানমালের প্রচুর হানি হতে পারে। তখন মাঝ-নদীতে নৌকার মাঝিমাল্লাসহ যাঁরা থাকেন তাঁরা সবাই ফেঁসে যান, শধু তাঁরা নন, নৌকা ডুবে যাওয়ায় নৌকার মালিকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। যে উদ্দেশ্যে নৌকার যাত্রা সে উদ্দেশ্যও ভণ্ডুল হয়ে যায়। সুতরাং দেখা যায়, বানচাল হলে অনেকের আশা-ভরসা ভণ্ডুল হয়ে যায়। অনেকে ফেঁসে যায় বিভিন্ন কারণে। ভেস্তে যায় অনেক কিছু। তাই নৌকার ‘বানচাল’ কথায় এসে যে-অর্থ ধারণ করেছে তা যেমন যৌক্তিক তেমনি প্রায়োগিক।

বানপ্রস্থ
‘বানপ্রস্থ’ মানব-জীবনের তৃতীয় আশ্রম বলে কথিত। প্রৌঢ় বয়সে সংসার ত্যাগ করে বনে বসবাসের নাম হচ্ছে বানপ্রস্থ। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস এ চার প্রকার আশ্রম। প্রথমে ব্রহ্মচর্য, তারপর গার্হস্থ্য, এরপর বানপ্রস্থাশ্রম গ্রহণ করতে হয়।
বামপন্থি
‘বামপন্থি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারী’। বাংলা ভাষায় ‘বামপন্থি’ আছে, কিন্তু ‘বামপন্থা’ নেই। অথচ ব্যাকরণের নিয়মানুসারে যারা বামপন্থা অনুসরণ করে তাদের ‘বামপন্থি’ হওয়ার কথা। একই ঘটনা দেখা যায় ‘দক্ষিণপন্থি’ শব্দে। ‘দক্ষিণপন্থি’ আছে, কিন্তু ‘দক্ষিণপন্থা’ নেই। তাহলে
‘-পন্থা’ ছাড়া ‘-পন্থি’ হয় কীভাবে? প্রকৃতপক্ষে বাংলা শব্দভাণ্ডারে বাংলা ব্যাকরণ মেনে ‘বামপন্থি’ শব্দটির উদ্ভব হয়নি। ইংরেজি ষবভঃরংঃ শব্দের বাংলা অনুবাদ হতে ‘বামপন্থি’ শব্দের উৎপত্তি। এবার দেখা যাক ষবভঃরংঃ কী।
ইউরোপের প্রাচীন সামাজিক প্রথা অনুযায়ী আমন্ত্রিত অতিথিগণের মধ্যে যাঁরা অতি সম্মানিত তাঁরা খাওয়ার টেবিলে কিংবা বৈঠকখানায় গৃহকর্তার ডান দিকে বসতেন। অভিজাত পরিবারের যেকোনো আপ্যায়নে এ প্রথা অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। এ সামাজিক প্রথাটি ক্রমান্বয়ে ইউরোপের অধিকাংশ দেশের পার্লামেন্টে সদস্যদের আসন বিন্যাসে স্থান করে নেয়। অভিজাতগণ সাধারণত রক্ষণীশল দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন। তাই রক্ষণশীল দল যে দিকে বসতেন তার বাম দিকে বসতেন প্রগতিশীল (র‌্যাডিক্যাল) দল। মাঝখানে বসতেন মডারেট দল। রক্ষণশীল অভিজাতগণের ‘বাম দিকে’ বসার কারণে কালক্রমে প্রগতিশীল দলের সদস্যদের ষবভঃরংঃ বা বামপন্থি নামে ডাকা শুরু হয়ে যায়। অন্যদিকে তাদের উল্টো দিকে আসনগ্রহণকারী সদস্যগণ হয়ে যান ‘দক্ষিণপন্থি’।
ইউরোপে দীর্ঘকাল ধরে প্রগতিশীল রাজনীতিক দলগুলোকে বামপন্থি দল নামে অভিহিত করা হতো। সময়ের বিবর্তনে রাজনীতিক অঙ্গনে যখন সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এবং আন্দোলন প্রবেশ করে তখন ‘বামপন্থি’ অভিধা পরিবর্তিত হয়ে প্রগতিশীল দলের প্রতিরূপ হিসাবে ‘সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারীগণ’ ষবভঃরংঃ নামে পরিচিতি পায়। একইভাবে বাংলা ভাষাতেও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারী ব্যক্তি বা রাজনীতিক দল ‘বামপন্থি’ হয়ে যায়।

বালখিল্য
‘বালখিল্য’ শব্দের অর্থ শিশুসুলভ। সংস্কৃত ভাষায় এটি বিশেষ্য পদ, কিন্তু বাংলায় বিশেষণ পদ। ভারতীয় পুরাণ মতে ‘বালখিল্য’ হলো বুড়ো আঙুল পরিমাণ লম্বা এক শ্রেণির মুনির নাম। ঋগ্বেদে উল্লেখ আছে, ব্রহ্মার শরীরের লোম থেকে এদের জন্ম। এরা ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং সংখ্যায় ষাট হাজার। এদের কিছু আচরণ পুরাণপ্রসিদ্ধ। মূলত বালখিল্য মুনিদের আচরণ থেকে ‘বালখিল্য’ বাগ্ভঙ্গির সৃষ্টি। বাংলায় ‘বালখিল্য আচরণ’ কথাটিার অর্থ শিশুসুলভ আচরণ।
কথিত হয়, একবার কশ্যপঋষি পুত্রকামনায় এক যজ্ঞ আরম্ভ করেন। কশ্যপ ইন্দ্রকে বালখিল্য মুনিদের যজ্ঞের কাষ্ঠ পরিবহনের কাজে নিযুক্ত করেন। খর্বাকৃতির দুর্বল দেহাবয়বের অধিকারী বালখিল্যরা সবাই মিলিতভাবে মাত্র একটি পত্র বহন করে আনার সময় জলপূর্ণ এক গোষ্পদে পতিত হন। এটি দেখে ইন্দ্র তাঁদের উপহাসপূর্বক উদ্ধার না-করে চলে যান। অপমানিত ও ক্রুদ্ধ বালখিল্যরা অধিকতর শক্তিশালী এক ইন্দ্রের সৃষ্টির জন্য এক মহাযজ্ঞ শুরু করেন। এ সংবাদ অবগত হয়ে ইন্দ্র কশ্যপের শরণাপন্ন হন। কশ্যপ তখন বালখিল্যদের বললেন যে, ব্রহ্মা দেবরাজ ইন্দ্রকে সৃষ্টি করেছেন। অতএব তাঁকে আর একটি ইন্দ্র সৃষ্টি করার জন্য প্রার্থনা করা হলে সৃষ্টিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তবে অন্য এক ইন্দ্র জন্মগ্রহণ না-করে পক্ষীশ্রেষ্ঠ জন্মগ্রহণ করবে। এ কথায় বালখিল্যরা সন্তুষ্ট হন। অতঃপর বিনতার গর্ভে সূর্যসারথি অরুণ ও পক্ষীজাতির ইন্দ্র ‘গরুড়’ জন্মগ্রহণ করেন।

বাল্মীকি
ভারতীয় পুরাণের একটি অন্যতম চরিত্র। বাল্মীকি বরুণের পুত্র এবং রামায়ণ-রচয়িতা মহর্ষি ও আদি কবি হিসাবে খ্যাত। তিনি দশরথ-এর সমসাময়িক ছিলেন। অযোধ্যার দক্ষিণে গঙ্গা নদীর তীরে অরণ্যের মধ্যে তমসা নদীর পাড়ে তাঁর আশ্রম ছিল। একাদিক্রমে ষাট হাজার বছর তপস্যারত থাকায় তাঁর সারাশরীর বল্মীকে আচ্ছন্ন হয়। এ জন্য তাঁর নাম হয় বাল্মীকি। ব্রহ্মার নির্দেশে তিনি ‘রামায়ণ’ রচনা করেন।

বাসর রাতে বিড়াল মারা
‘বাসর রাতে বিড়াল মারা’ একটি পৌরাণিক কাহিনি। এক রাজার দুটি কন্যাসন্তান ছিল। একজনের নাম নয়নমণি আর একজনের নাম চিন্তামণি। দুই কন্যা সার্বক্ষণিক দুটো বিড়াল নিয়ে থাকত। তারা বড় হলে রাজা অনুভব করলেন তাদের বিয়ে দিতে হবে। এখন বর পাওয়া যায় কোথায়। অবশেষে রাজার পছন্দের দুই ভাই পাওয়া গেল। নির্দিষ্ট দিন বিয়ে সম্পন্ন হলো। রাজার ছেলেসন্তান নেই। রাজ্য দুই ভাইকে ভাগ করে দেওয়া হলো। এক ভাইয়ের উত্তরখানে আর এক ভাইয়ের দক্ষিণখানে বাসর রাতের ব্যবস্থা করলেন। বড় ভাই বাসর রাতে গিয়ে দেখে, বড় রাজকন্যা একটা বিড়ালকে গভীরভাবে আদর করে চলছে। বারবার ডেকেও নববধূর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারল না। তখন বড় ভাই একটা তলোয়ার দিয়ে বিড়ালটিকে কেটে দুভাগ করে দেয়। কাণ্ড দেখে রাজকন্যা নয়নমণি ভয়ে অস্থির। সত্যিকার একজন বীর তার স্বামী। এরপর থেকে স্বামী যা-ই বলে রাজকন্যা তা-ই করে। অনেকদিন পর এক সভায় দুই ভাইয়ের দেখা। বড় ভাই ছোট ভাইকে জিজ্ঞাসা করল কেমন কাটছে দিনকাল। ছোটভাই বলল ভালো না, রাজকন্যা সারক্ষণ একটা বিড়াল নিয়ে থাকে। আমার দিকে খেয়াল দেওয়ার সময় তার নেই। ছোট ভাই বলল, তুমি কেমন আছ? বড় ভাই বলল খুব ভালো, আমি বাসর রাতেই বিড়ালকে মেরে ফেলেছি। ছোট ভাই ভাবল আমারও তাই করতে হবে। কয়েক মাস পর দু-ভাইয়ের আবার দেখা। ছোট ভাইয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন। বড় ভাই বলল কী হয়েছে? ছোট ভাইয়ের উত্তর : তোমার কথা শুনে আমিও বিড়ালকে তলোয়ার দিয়ে দুখণ্ড করেছি। কিন্তু রাজকন্যা রেগে গিয়ে আমাকে প্রচুর মেরে বন্দি করে রেখেছিল। আজই ছাড়া পেলাম। বড় ভাই বলল বোকা কোথাকার! বিড়াল বাসর রাতেই মারতে হয়। নইলে নিজেকে মরতে হয়।

বাহন
যে বহন করে সে বাহন। প্রায় প্রত্যেক দেবতারই কোনো না কোনো জীবজন্তু বাহনরূপে আছে। যেমন ব্রহ্মার হংস, বিষ্ণুর গরুড়, শিবের বৃষ, ইন্দ্রের ঐরাবত ও মেষ, যমের মহিষ, কার্তিকেয়ের ময়ূর, কামদেবের মকর বা টিয়াপাখি, অগ্নির ছাগ, বরুণের মৎস্য, গণেশের ইঁদুর, বায়ুর হরিণ, শনির গৃধ্র, দুর্গার সিংহ, লক্ষ্মীর প্যাঁচা, সরস্বতীর হংস, ষষ্ঠীর বিড়াল, বিশ্বকর্মার হাতি, শীতলার গর্দভ এবং নারদের ঢেঁকি।

 

বাহিনী
বাহিনী শব্দের আভিধানিক অর্থ সৈন্যদল, দলবাহ। এটি একটি অতি প্রাচীন শব্দ। ‘বাহ’ শব্দ থেকে ‘বাহিনী’ শব্দের উৎপত্তি। বাহ শব্দের অর্থ অশ্ব এবং বাহিনী শব্দের অর্থ অশ্ব বা ঘোড়া যার প্রধান সেনাঙ্গ। যে দলে অশ্বারোহী সৈন্যরা মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেটাই বাহিনী। একসময় গাড়ি ছিল না। অশ্বই গাড়ির ভূমিকা পালন করত। বিমানও ছিল না। সে সময় সামরিক দপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অশ্বারোহী দলের। আরও প্রাচীনকালে নৌ-সামরিক দপ্তরের ভূমিকাও ছিল অতি নগণ্য। মূলত অশ্বারোহী বাহিনীই দেশের সামরিক ব্যবস্থাপনার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করত। হয়তো এ কারণে ‘বাহিনী’ তথা অশ্বারোহী দলটি সামরিক দলের প্রতিশব্দ হিসাবে নিজের স্থান দখল করে নিয়েছে।

বিকাল
সময়জ্ঞাপক ‘বিকাল’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বহুমুখী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ দিনের শেষভাগ। দুপুরের পর শুরু হয় বিকাল এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত তার স্থায়িত্ব। মানুষের জীবনেও আছে সকাল, দুপুর, বিকাল আর সন্ধ্যা। সন্ধ্যা দিনের শেষ প্রহর; তার পূর্বের প্রহর বিকাল হচ্ছে শেষ প্রহরের আগমন বার্তার দিশারি। তাই বিকালকে কাব্যে যতই মধুরভাবে চয়ন করা হোক না কেন, জীবন ও দিনে বাস্তববাদীগণের কাছে এটি অন্যভাবে চিত্রিত। ‘বিকাল’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিরুদ্ধ কাল এবং ‘বিরুদ্ধ কাল’ মানে খারাপ কাল। এটাকে অনেকে ‘রাক্ষসী বেলা’ও বলে থাকেন। রাক্ষস যেমন সবকিছু দ্রুত ধ্বংস করে দেয় এ সময়টাও জীবনের সময়টুকু দ্রুত খেয়ে ফেলে। তাই দিনের শেষ অংশের নাম হয়েছে বিকাল বা রাক্ষসী কাল।

বিড়াল তপস্বী
‘বিড়াল তপস্বী’ বাগ্ভঙ্গিটির সার্থক প্রয়োগ দেখা যায় মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর ‘বিষা’-সিন্ধু’ উপন্যাসে। তিনি লিখেছেন : “সাবধান! ও সকল হিতোপদেশ আর কখনও মুখে আনিও না। তোমার হিতোপদেশ তোমার মনেই থাকুক। ভাই সাহেব! বিড়াল তপস্বী, কপট ঋষি, ভণ্ড গুরু, স্বার্থপর পীর, লোভী মৌলবী জগতে অনেক আছে, অনেক দেখিয়াছি, আজিও দেখিলাম।” এটি মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসের একটি বাক্য। এ বাক্যে ‘বিড়াল তপস্বী’ বাগ্ধারাটি প্রথম সাহিত্য-পদবাচ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বিড়াল শিকার ধরার পূর্বে তাপসের ন্যায় ভদ্র হয়ে বসে থাকে। মনে হয় যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারে না। কিন্তু শিকার নাগালে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে শিকারের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপরও থেমে থাকে না বিড়াল। শিকারকে ছেড়ে দেওয়ার ভানে সে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। কিন্তু যে মুহূর্তে শিকার আত্মরক্ষার চেষ্টা করে সে মুহূর্তে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিদগ্ধ
‘বিদগ্ধ’ শব্দের অর্থ রসজ্ঞানসম্পন্ন, বিদ্বান, পণ্ডিত প্রভৃতি। এটি সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে বিশেষভাবে দগ্ধ। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ‘বিদগ্ধ’ শব্দটি তিন প্রকার অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমত, ধূর্ত, চতুর, বুদ্ধিমান; দ্বিতীয়ত, বিদ্বান, পণ্ডিত, জ্ঞানী এবং তৃতীয়ত, রমণীরসিক নাগর, রসকালিবৎ প্রভৃতি। বৈষ্ণব সাহিত্যে শব্দটির ব্যবহার রমণীরসিক নাগর হিসাবে করা হয়েছে। বর্তমানে শব্দটি দ্বিতীয় অর্থ তথা বিদ্বান, পণ্ডিত, জ্ঞানী অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। এখন দেখা যাক, ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হতে শব্দটির এত বিচ্যুতির কারণ কী। ‘বিশেষভাবে দগ্ধ’ মানে বিদগ্ধ। এখানে দগ্ধ মানে আগুনে পুড়ে দগ্ধ হওয়া নয়। যদিও পুরাণে আগুনে পুড়ে দগ্ধ হওয়ার অনেক কাহিনি আছে। সেকালে নারীদের সতীত্ব পরীক্ষার জন্য অগ্নিপরীক্ষার প্রচলন ছিল। সীতার অগ্নিপরীক্ষা তো একটি অতিপরিচিত কাহিনি। আগুনে পোড়া যেমন কষ্টকর তেমনি ঐকান্তিক প্রয়াস ও কঠোর শ্রমের মাধ্যমে কোনো বিশেষ জ্ঞান, দক্ষতা বা বিদ্যা অর্জনও আগুনে পোড়ার চেয়ে কম কষ্টের নয়। আগুনে পুড়ে যেমন সোনাকে খাঁটি করা হয় তেমনি কঠোর শ্রম, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের আগুনে সাঁতার কেটে মানুষকে বিদ্বান, জ্ঞানী ও পণ্ডিত হতে হয়। তাই ‘বিশেষভাবে দগ্ধ’ অর্থে জ্ঞানী, পণ্ডিত, মহান ব্যক্তির প্রকাশ যথার্থ। সংস্কৃত ‘বিদগ্ধ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশেষভাবে দগ্ধ যেমন খাদ্য পাকস্থলীতে ‘বিদগ্ধ’ কিংবা জীর্ণ না-হলে অজীর্ণ রোগ হয়। বাংলা ভাষায় এসে শব্দটি প্রাচীনকালে বোঝাতে থাকল ধূর্ত ও বুদ্ধিমানকে, মধ্যযুগে বিদ্বান ও রমণীরসিককে; আর আধুনিক কালে রসকলাবিৎ কিংবা রসশাস্ত্রের পণ্ডিতকে।

বিধবা
‘বিধবা’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ হচ্ছে যে বিবাহিত মহিলার স্বামী মারা গেছে। বাংলা ভাষায় ‘বিধবা’ একটি আশ্চর্য শব্দ। এটি আদৌ কোনো স্ত্রীবাচক শব্দ নয়। শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে ‘যার কোনো পুরুষ বন্ধু নেই’। মেয়েদের একজনই তো পুরুষ বন্ধু থাকে, সেটি তার স্বামী। বিধবা হলে তো আর থাকে না পুরুষ বন্ধু।

বিনীত বিনত বিনয়াবনত
বিনীত শব্দের অর্থ বিনম্র, শান্ত, বিনয়ী, অমায়িক প্রভৃতি। ‘বিনয়’ শব্দ থেকে ‘বিনীত’ শব্দের উৎপত্তি। ‘বিনয়’ শব্দের মূল ও আদি অর্থ নয়ন। এ নয়ন চোখের মতো শুধু বাহ্যিক বস্তু দেখার নয়ন নয়। নয়ন বাহ্যিক জ্ঞান ও অন্তরচেতনায় বিভূষিত এক অনুপম আলো, যদ্দ¦ারা কোনো ব্যক্তি নিয়ত জ্ঞান অর্জন ও নিজেকে ঋদ্ধ করার সাধনায় মগ্ন থাকে। এ নয়ন থাকে ভালো-মন্দ, ভূত-ভবিষ্যৎ, কল্যাণ-অকল্যাণ প্রভৃতি দেখতে, বুঝতে এবং উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করে থাকে। এমন নয়ন যাঁর থাকে তিনি জ্ঞানী। তাঁর চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণে ফুটে ওঠে মহীয়ান্ উৎসব। এমন লোক সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। এ অর্থে বিনীত শব্দের অর্থ জ্ঞানী, সংযত, সুশিক্ষিত, অনাড়ম্বর, মার্জিত রুচি, সংস্কৃতিবান্ প্রভৃতি। তবে শব্দটির বর্তমান প্রচলিত অর্থ এগুলোর একটিও নয়। সাধারণত চিঠিপত্রের শেষে প্রেরকের নামের আগে চিঠির ইতিতে ‘বিনীত’ লেখা হয়। এর অর্থ বিনম্র, বিনয়ী, অনুগত প্রভৃতি। কিন্তু যাঁর মনে থাকে এমন নয়ন, জ্ঞানে যিনি ঋদ্ধ, শিষ্টাচারে অনুপম, তিনি কেন অন্যের অনুগত হয়ে গেলেন, কেন হয়ে গেলেন বিনম্্র? আসলে বিষয়টা হচ্ছে এই, যিনি জ্ঞানী তিনি সতত বিনম্র।
বস্তুত, ‘বিনীত’ শব্দটি ‘বিনয়’ থেকে জাত। ‘বিনয়’ শব্দের মূল অর্থ বিশেষ নয়ন। এই নয়ন যাঁর থাকে তিনি নিরন্তর জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকেন। তাঁর ভাষায়, চিন্তায়, কর্মে, আচরণে শৃঙ্খলাবোধ জন্ম নেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ‘বিনীত’ শব্দের মূল অর্থ সুশিক্ষিত, সংযত, নিয়ন্ত্রিত, অনাড়ম্বর, মার্জিত রুচি, সংস্কৃতিবান্ ইত্যাদি। কিন্তু এসব গুণের অধিকারী কোনো ব্যক্তি তো অন্যের কাছে নিজেকে ‘বিনীত’ বলে বিশেষিত করতে বা নিজের ঢাক নিজেই পেটাতে পারেন না। তাই ‘বিনীত’ লিখলে পত্র-প্রাপক ভাবতে পারেন পত্র-লেখক বুঝি তাঁর সঙ্গে ইয়ার্কি করছেন। দাপ্তরিক পত্র হলে, ঊর্ধ্বতন তাঁর অধস্তনের কাছে নিঃসন্দেহে কৈফিয়ত তলব করতেন এবং সাবধান করে দিয়ে বলতেন, আপনার যে পদগত অবস্থান, সেটা বুঝে তবে বিশেষণ লাগাবেন অর্থাৎ ‘বিনীত’ না লিখে, ‘বিনত’ লিখবেন। ধনী, শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত, ভদ্র ইত্যাদি বিশেষণ যেমন নিজের নামের আগে নিজের হাতে বসানো চলে না, নীতিগতভাবে ‘বিনীত’ বিশেষণও তেমনি চলে না। কিন্তু তারপরও চলে, অজান্তেই চলতে থাকে। এটাই হলো ভাষার জগতে শব্দের রহস্য। এবং এ রহস্যের কারণেই ‘বিনীত’ শব্দের বর্তমান অর্থ বিনম্র বিনীত, বিনয়ী, শান্ত ইত্যাদি। চিঠিপত্রে নাম স্বাক্ষরের আগে ‘বিনীত’ বলে বিশেষণ প্রয়োগের অলঙ্ঘনীয় রেওয়াজই দাঁড়িয়ে গেছে। দাপ্তরিক চিঠিপত্রেও বিনীত শব্দের ব্যবহার প্রায় বাধ্যতামূলক। তাই ঊর্ধ্বতনদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে অধস্তনগণ ‘বিনীত’ হতে বাধ্য হন। চিঠিপত্রে ‘বিনীত’ শব্দটি থাকলে পত্র-প্রাপক প্রীত হন। বিনীত স্বভাবের লোকদের সকলেই পছন্দ করে। তবু আমি বলব বিনীত না লিখে ‘বিনত’ বা ‘বিনয়াবনত’ লেখা ভালো, রবীন্দ্রনাথের মতো।

বিন্দুবিসর্গ
শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ অতিসামান্য অংশ, আভাসমাত্র প্রভৃতি। ‘বিন্দু’ ও ‘বিসর্গ’ দুটি পৃথক শব্দের সমন্বয়ে ‘বিন্দুবিসর্গ’ বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। বিন্দু সাধারণত ইংরেজি ফুল্স্টপের ন্যায় একটি চি‎হ্ন। গাণিতিক ভাষায় বিন্দু এমন একটি প্রত্যয় যার অবস্থান আছে কিন্তু কোনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নেই। তবে বিন্দুবিসর্গ শব্দের বিন্দু বলতে অনুস্বার বোঝানো হয়। বাংলা বর্ণমালার শেষ দুটি অক্ষর যথাক্রমে অনুস্বার (ং) ও বিসর্গ (ঃ) বর্ণদ্বয় ‘বিন্দুবিসর্গ’ শব্দের প্রতিভূ। বিন্দু বলতে কোনো ছোট বা সামান্য জিনিসকে বোঝানো হয়। বিন্দু বা অনুস্বারের পাশে অবস্থিত বিসর্গ দুটো বিন্দুর একটি কলাম। এটিও ক্ষুদ্র কিছু প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। এ কারণে ‘বিন্দুবিসর্গ’ শব্দটি বাংলা ভাষায় ‘অতিসামান্য কোনো বিষয়’ প্রকাশে একটি উত্তম সংযোজন নিঃসন্দেহে।

বিবিধ
‘বিভিন্ন’ ও ‘বিধা’ শব্দের সমাস হয়ে শব্দটির উৎপত্তি। বিভিন্ন বিধা যার = বিবিধ। এটি বহুব্রীহি সমাস। বিভিন্ন শব্দের অর্থ নানান, বহু, প্রভৃতি এবং ‘বিধা’ শব্দের অর্থ বিধি, বিধান, প্রকার প্রভৃতি। সুতরাং ‘বিবিধ’ শব্দের অর্থ বহুপ্রকার, নানাপ্রকার।
বিভীষণ
‘বিভীষণ’ ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত রাবণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। তাঁর স্ত্রীর নাম সরমা ও পুত্রের নাম তরণীসেন। রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ মহর্ষি বিশ্রবার তিন রাক্ষসপুত্র। বিভীষণ রাবণের ভাই হওয়া সত্ত্বেও গোপনে রামের সঙ্গে হাত মেলান। তিনি সুকৌশলে রামকে গুপ্ত সংবাদ প্রদান করে সহোদর ভাই রাবণের বিনাশ সাধনে সহায়তা করেন। বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎকে যজ্ঞশালায় হত্যা করেন। রাবণ সবংশে নিহত হলে বিভীষণ লঙ্কার সিংহাসনে বসেন এবং রাবণ-পত্নী মন্দোদরীকে বিবাহ করেন। বিভীষণের এ দেশদ্রোহীমূলক কর্মকাণ্ড হতে বাংলা ভাষায় প্রচলিত বিখ্যাত বাগ্ভঙ্গি ‘ঘরের শত্র“ বিভীষণ’ প্রবাদটির উৎপত্তি। এর সঙ্গে মিল পাওয়া যায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদদৌলার বিরুদ্ধে মীরজাফরের কর্মকাণ্ড।

বিরক্ত
‘বিরক্ত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ জ্বালাতন, ক্রুদ্ধ, অপ্রসন্ন প্রভৃতি। যা মনকে অস্থির করে, চিন্তায় অপ্রসন্নতা আনে, বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটায় তা-ই বিরক্তি এবং এর অর্থ জ্বালাতন, অপ্রসন্ন বা অসহনীয় অবস্থা সৃষ্টির উদ্রেককারী বিষয় হলেও আদি ও মূল অর্থ ছিল ভিন্ন। মূলত অনুরাগহীন বা ভালবাসার অভাব বোঝাতে কাউকে বা কোনো কিছু প্রকাশে ‘বিরক্ত’ শব্দ ব্যবহার করা হতো। এখন কিন্তু তা নয়। মূলত যেটি অনুরাগহীন, যার মধ্যে ভালবাসা নেই সেটিই বিরক্তিকর এবং এমন লোক যা-ই করুক না কেন সেটিই ‘বিরক্ত’ হয়ে করা। বিরক্ত ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। কেউ পরম প্রসন্ন হলেও মুহূর্তের মাঝে বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই বিরক্তির সঙ্গে কাজ, মনমেজাজ, চিন্তা-চেতনা ও পরিস্থিতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটা জিনিস কারও কাছে বিরক্তের হলে যে সবার জন্য বিরক্তের হবে তা নয়। বরং অন্যের কাছে তা পরম প্রত্যাশারও হতে পারে।

বিরাশি সিক্কার চড়
সিক্কা মানে মুদ্রা, বাদশাহি আমল ও পরবর্তীকালে কোম্পানি আমলের মুদ্রাও ‘সিক্কা’ নামে পরিচিত ছিল। ছোটবেলায় দেখেছি এক টাকার সে অচল রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে স্বর্ণকাররা এক তোলা অলঙ্কার মাপত। আশি (৮০) তোলায় সের হতো, বিরাশি (৮২) তোলায় নাকি ‘পাক্কা সের’ হতো। চপেটাঘাতকারীর হাতের ৮২ তোলা শক্তি; মানে পুরো শক্তি, প্রয়োগে যে চড় মারে তা-ই ‘বিরাশি সিক্কার চড়’ অভিধায় আখ্যায়িত।
বিরূপাক্ষ
পূর্বদিকে অবস্থিত দিগ্্হস্তী। এ হস্তী পৃথিবীকে ধারণ করে আছে। কথিত হয়, যখন বিরূপাক্ষ ক্লান্ত হয়ে মস্তক সঞ্চালন করে তখন পৃথিবীতে কম্পন হয়। এ কম্পনকে বলা হয় ভূমিকম্পন।

বিলাত
‘বিলাত’ শব্দটির অর্থ ইংল্যান্ড, ইউরোপ। বস্তুত ‘বিলাত’ অর্থ ইংল্যান্ড। বাঙালির কাছে বিলাত শব্দটা যখন বহুল প্রচলিত ছিল তখন ‘বিলাত’ বলতে শুধু ইংল্যান্ড নয়, পুরো ইউরোপকেই বোঝাত। এখন অবশ্য ‘বিলাত’ শব্দটি আগের মতো বহুল প্রচলিত নয়। এখন ইংল্যান্ডকে আর বিলাত বলা হয় না, ইংল্যান্ডই বলা হয়। তবে বাঙালির ‘বিলাত’ শব্দটি বিলাতি নয়, আরবি। আরবি ‘ওয়ালাত’ শব্দ ফারসি, উর্দু ও হিন্দি ভাষায় আরবি বর্ণ ‘ওয়াও’-এর উচ্চারণজনিত কাঠিন্যে পড়ে ‘বিলায়ত’ হয়ে যায়। বাংলা ভাষায় এসে ‘বিলায়ত’ আরও বিকৃত হয়ে ‘বিলাত’ হয়ে যায়। আরবি ‘ওয়ালাত’ শব্দের মূল অর্থ ওয়ালি বা গভর্নর-শাসিত দেশ বা প্রদেশ। এক সময় মিশর, ইরানসহ অনেক দেশ ছিল আরবদের ‘ওয়ালাত’। ভারতের মুসলমান রাজত্বের প্রথম দিকে ভারতীয় মুসলমানগণ পারস্য ও মধ্য-এশিয়ার দেশসমূহকে ‘বিলায়ত’ বলত। তাদের কাছে ওই সব এলাকার অধিবাসীরা ছিল ‘আহলে বিলায়ত’ বা দেশি লোক। ভারতের ব্রিটিশ শাসনামলে আকস্মিকভাবে শব্দটির অর্থ পাল্টে যায় এবং ‘বিলায়ত’ ভারতীয়দের কাছে হয়ে পড়ে ইংল্যান্ড বা ইউরোপ।

বিশদ
‘বিশদ’ শব্দের বর্তমান ও আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : সুস্পষ্ট, পরিষ্কার, পরিস্ফুট প্রভৃতি। কোনো বিষয় বা কারও ব্যাখ্যা যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির কাছে সহজ-সরল ভাষ্যে কোনোরূপ অস্পষ্টতা ব্যতিরেকে বোধগম্য হয়ে ওঠে তখন তাকে ‘বিশদ ব্যাখ্যা’ বলা হয়। তবে ‘বিশদ’ শব্দটির আদি অর্থ ছিল রমণীয়, চিত্তবিনোদনজনক, চিত্তপ্রসাদজনক। তাহলে কেন এখন সে অর্থ ‘বিশদ’ বহন করে না? একটু চিন্তা করলে দেখা যায়, আসলে বর্তমান ও পূর্বের অর্থের অন্তর্নিহিত প্রায়োগিক রূপ অভিন্ন। কোনো বিষয় কারও নিকট যখন সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে ওঠে তখন তার আর কোনো কিছু জানার থাকে না। জানার বিষয় সহজে বোধগম্য হওয়ার পর মন আপনা-আপনি সতেজ হয়ে ওঠে। প্রাপ্তির দোলায় চিত্ত হয়ে ওঠে প্রশান্ত। তাই অর্থের বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন হলেও অন্তর্নিহিত রূপ এখনও থেকে গেছে অভিন্ন।

বিশ্বকর্মা
ভারতীয় পুরাণ মতে বিশ্বকর্মা দেবশিল্পী। বেদে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বকর্মা বলা হয়েছে। তাঁর মাতা হচ্ছেন বৃহস্পতির বোন যোগসিদ্ধা এবং পিতা অষ্টম বসু ‘প্রভাস’। বিশ্বকর্মা শিল্পসমূহের প্রকাশক, অলঙ্কারের স্রষ্টা, দেবতাদের বিমান-নির্মাতা। তাঁর কৃপায় মনুষ্য জাতি শিল্পকলায় পারদর্শিতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি প্রাসাদ, ভবন, উদ্যান প্রভৃতির শিল্পী প্রজাপতি। বিশ্বকর্মা কেবল দেবশিল্পীই নন, দেবতাদের অস্ত্রাদিও তিনি প্রস্তুত করেছেন। স্বর্গ, লঙ্কাপুরী, রামের জন্য লঙ্কা-গমনের সেতুবন্ধ ছাড়াও তিনি আরও অগণিত শিল্পের আবিষ্কারক।
বিশ্বকর্মা বিশ্বের সব শিল্পের সৃষ্টি করেছেন। নিজের সন্তানকে সুন্দর রূপ দেওয়ার জন্য বিশ্বকর্মা বারবার আকৃতি বদলিয়ে যাচ্ছিলেন। যে রূপই দেওয়া হোক না কেন, বিশ্বকর্মা এর চেয়ে আরও সুন্দর অবয়ব দেওয়ার কাজে বহুক্ষণ সময় নষ্ট করছিলেন। দেবতাদের প্রয়োজনীয় কাজে বিঘ্ন হচ্ছিল। তাই তাঁকে নিজের সন্তান সৃষ্টির কাজ তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করার জন্য বলা হয়। অতঃপর বিশ্বকর্মা শেষবারের মতো সময় প্রার্থনা করেন। এবার তাঁর সন্তানকে যে রূপ দেওয়া হয় তা হচ্ছে চিকা বা ছুঁচো। সন্তানের চেহারা দেখে বিশ্বকর্মা ও তাঁর স্ত্রী হতভম্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু এরপর আর কোনো উপায় তাঁদের ছিল না।

বুজরুকি
পাণ্ডিত্যের ভান, অলৌকিক শক্তির অধিকার হওয়ার ভান, ছলনা, প্রতারণা, চালাকি প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে ‘বুজরুকি’ শব্দটা প্রয়োগ করা হয়। ফারসি বুজুর্গ্ শব্দ হতে বাংলা ‘বুজরুক’ এবং বুজুর্গি শব্দ হতে ‘বুজরুকি’ শব্দের উৎপত্তি। বুজুর্গ্রা যা করে সেটি বুজুর্গি বা বুজরুকি। ফারসি বুজুর্গ্ শব্দের অর্থ হলো বিশাল, বৃহৎ, মহৎ, মহান, বৃদ্ধ প্রভৃতি। ‘বুজরুক’ শব্দের পাশাপাশি বাংলাতে বুজুর্গ্ শব্দের ব্যবহারও চালু রয়েছে। বাংলায় প্রচলিত বুজুর্গ্ শব্দটি ফারসি বুজুর্গ্ শব্দের মহান ও মহৎ অর্থ দুটো ধারণ করেছে। বাকি অর্থগুলো ঠেলে দিয়েছে ‘বুজরুক’ শব্দের শরীরে। বুজুর্গ্ তাহলে কেন বুজরুক হয়ে অর্থের পরিবর্তন করল? মহান বা মহৎ ব্যক্তিদের অনেকে পাণ্ডিত্য বা অলৌকিকত্য প্রভৃতির ভান করে সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করে। এটি শুধু পারস্যে নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে ছিল এবং আছে। তবে সব মহান ব্যক্তিই যে এ রকম করে তা নয়। যারা এমনটি করে তাদের জন্য ফারসি বুজুর্গ্ বাংলায় ‘বুজরুক’ হয়ে গেলেও প্রকৃত মহান ব্যক্তিরা এখনও কিন্তু বুজুর্গ্ই রয়ে গেছেন।

বুদ্ধিশুদ্ধি
শব্দটির অর্থ বিচার-বিশ্লেষণবোধ, বুদ্ধির প্রখরতা, বিবেচনাবোধ প্রভৃতি। ‘বুদ্ধি’ ও ‘শুদ্ধি’ এ দুটো শব্দের সমন্বয়ে ‘বুদ্ধিশুদ্ধি’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। বুদ্ধি শব্দের অর্থ বিচার-বিশ্লেষণ, বিবেচনাবোধ প্রভৃতি এবং শুদ্ধি শব্দের অর্থ যথার্থতা নিরূপণ। বুদ্ধি অনেকের থাকে বা থাকতে পারে এবং তার প্রখরতাও হতে পারে অসাধারণ কিন্তু সে বুদ্ধি প্রয়োগে যদি বিবেচনাবোধ বা শুদ্ধি না-থাকে তা হলে ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’র মতো অবস্থা হতে পারে। বুদ্ধিতে যখন শুদ্ধি বা বিবেচনাবোধ আসে তখন তা সতর্কতাসমন্বিত প্রখরতায় রূপ নেয়। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই বলা হয় ‘সাবধানের মার নেই’। বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে যথার্থ বিবেচনাবোধ ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভালো-মন্দ যাচাই করে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করার অন্তর্নিহিত চেতনাবোধই ‘বুদ্ধিশুদ্ধি’। এটি কেবল তখনই দেখা যায় যখন কারও বুদ্ধিতে ‘শুদ্ধি’ এসে হাওয়া দেয়।

বুদ্ধু
‘বুদ্ধু’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বোকা, মূর্খ, বুদ্ধিহীন প্রভৃতি। তবে শব্দটি ব্যঙ্গার্থে অধিক ব্যবহার করা হয়। আরবি ‘বদু’ শব্দ হতে বাংলা ‘বুদ্ধু’ শব্দের উৎপত্তি। বাংলা ভাষায় আসার পর ‘বদু’ শব্দ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে ‘বদ্দু’ রূপ ধারণ করে। আরও পরে এ অতিথি শব্দটি বর্তমান বুদ্ধুরূপে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। আরবি বদু শব্দের অর্থ হলো : গ্রাম্য, অশিক্ষিত, গোঁয়ার, অবুঝ প্রভৃতি। কথিত হয়, আরবি ‘বেদুইন’ শব্দ থেকে ‘বদু’ শব্দের উৎপত্তি। উভয়ের অভিন্ন ধাতুমূল এটাই প্রমাণ করে। আরও দেখার বিষয় হচ্ছে : বদু আর বেদুইনের আচার-আচরণও অভিন্ন। বদুর মতো বেদুইনরাও গোঁয়ার ও আদিম স্বভাবের। আরবি এ ‘বদু’ শব্দ বাংলায় এসে রূপ পরিবর্তন করলেও অর্থের পরিবর্তন তেমন করেনি। অবশ্য আরবি ‘বদু’ আর বাংলা ‘বুদ্ধু’ এক নয়। আরবি বদুতে গোয়ার্তুমির সঙ্গে কিছু সাহসিকতাও রয়েছে। কিন্তু বাংলা ‘বুদ্ধু’ শুধু মূর্খ নয়, বোকা ও ভীরুও বটে। নইলে কি তাদের বুদ্ধু বলা যেত!

বুলেট ও ব্যালট
কথিত হয়, প্রাচীন গ্রিসে বিশ্বের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে কালের নির্বাচনসমূহে সাদা-কালো বুলেট (নঁষষবঃ) বাক্সে ফেলে ভোট দেওয়া হতো। এখনকার মতো কাগজের ব্যালট ছিল না। সমর্থক ভোটারগণ ফেলতেন যিরঃব-নঁষষবঃ আর বিপক্ষতা বোঝাতে ফেলা হতো নষধপশ-নঁষষবঃ। গ্রিসের এ নষধপশ-নঁষষবঃ হতে ইংরেজি নধপশ-নধষষরহম বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। বিখ্যাত গবেষক ও লেখক জর্জ স্ট্যানলির লেখায় নঁষষবঃ দ্বারা ভোট দেওয়ার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন : . . . ঃযবু মধাব ঃযবরৎ পযড়রপব নু নঁষষবঃ। আসলে নঁষষবঃ শব্দের মূল ও আদি অর্থ ছিল ছোট বল। ইংরেজি ভাষায় এসে নঁষষবঃ নিজেকে সামান্য পরিবর্তন করে নধষষড়ঃ হয়ে যায়। এ নধষষড়ঃ শব্দের অর্থও ছিল ‘ছোট বল’। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বুলেট ও ব্যালটের সম্পর্ক জন্ম থেকে অবিচ্ছেদ্য। হয়তো এ জন্য এখনও অনেক দেশে বুলেট ব্যালটকে নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও আধুনিক বুলেট ও ব্যালটের ভিতরে আকাশ-পাতাল তফাত।

বৃদ্ধ
‘বৃদ্ধ’ খুব পরিচিত একটি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ প্রবীণ, বয়োজ্যেষ্ঠ, মুরব্বি, অভিজ্ঞ প্রভৃতি। বৃদ্ধি মানে বর্ধনশীল যা বেড়েছে তা-ও বৃদ্ধি, যা বড় হয়েছে তা-ও বৃদ্ধি। এ ‘বৃদ্ধি’ শব্দ থেকে ‘বৃদ্ধ’ শব্দের উৎপত্তি। এটার সঙ্গে বয়স, অভিজ্ঞতা ও বড়ত্বের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বৃক্ষের সঙ্গেও বৃদ্ধ শব্দের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বৃদ্ধের ন্যায় বৃক্ষও দীর্ঘকাল বয়স নিয়ে বিস্তৃত হয় আকারে, বড়ত্বে আর গভীরতায়। হিন্দুধর্মীয় স্মৃতিশাস্ত্র মতে, কোনো মানুষের বয়স ৭০ বছরের বেশি হলে তাকে বৃদ্ধ বলা হয়। এ বৃদ্ধ অথর্ব বৃদ্ধ নয়, প্রবীণ। বয়স সাতাত্তর বছর সাত মাস সাত রাত পূর্ণ হলে ভীমরতি বা ক্ষ্যাপামি দেখা দেয়। এটাও বৃদ্ধের একটা রূপ। এ রূপটাকে প্রবীণ বলা যাবে না। বলা যায় বয়োজ্যেষ্ঠ।
বৃহন্নলা
বৃহৎ + নল + আ = বৃহন্নলা। এর মানে দীর্ঘভুজা। অর্জুন নপুংসক ছিলেন এক বছর, এ সময় তিনি বৃহন্নলা ছদ্মনাম ধারণ করেছিলেন। সংসদ বাংলা অভিধান (২০১১) লিখেছে : ‘বৃহন্নলা বিণ. দীর্ঘভুজা, দীর্ঘ বাহুবিশিষ্টা। বি. অজ্ঞাতবাসকালে ক্লীববেশী অর্জুনের ছদ্মনাম; (আল.) ক্লীব।’

বৃহস্পতি তুঙ্গে
জ্যোতিষীরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে একটি গোলক (৩৬০ ডিগ্রি) চিন্তা করে সমান ১২ ভাগে ভাগ (৩০ ডিগ্রি) করেন এবং এক একটি ভাগে এক একটি রাশি কল্পনা করেন। এর নাম ‘রাশিচক্র’। যেহেতু গ্রহগুলো রাশিচক্রে ক্রমাগত ঘুরছে, বিভিন্ন সময়ে তাই এরা বিভিন্ন রাশিতে অবস্থান করে এবং প্রতিটি গ্রহই রাশিচক্রের বারোটি রাশির প্রত্যেকটি অতিক্রম করে চলেছে। গড় হিসাবে চন্দ্র সোয়া দুই-দিনে, বুধ ১৮ দিনে, শুক্র ২৮ দিনে, রবি ১ মাসে, মঙ্গল ৪৫ দিনে, বৃহস্পতি ১ বছরে, শনি আড়াই বছরে এবং রাহু ও কেতু দেড় বছরে এক একটি রাশি অতিক্রম করে।

বেকুব
‘বেকুব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বোকা, বুদ্ধিহীন, স্বাভাবিক বোধশক্তিহীন, বুদ্ধিতে অপরিপক্ব প্রভৃতি। বাংলায় শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও এটি আরবি ও ফারসি ভাষার সমন্বয়ে গঠিত। আরবি অকুফ (ওকুফ) শব্দের অর্থ বুদ্ধি। এর সাথে ফারসি বে (অর্থ না) উপসর্গ যুক্ত হয়ে ‘বেওকুফ’ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। যা ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে ‘বেকুব’ শব্দে এসে স্থিতি পায়।

বেদব্যাস
ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত বে বিভাগকর্তা ‘কৃষ্ণদ্বৈপায়ন’ বেদব্যাস নামে পরিচিত। তিনি এক বেদকে শতশাখাযুক্ত চার ভাগে বিভক্ত করে ‘বেদব্যাস’ নামে অভিহিত হন। তিনি বশিষ্ঠের প্রপৌত্র পুত্র, শক্তির পৌত্র, পরাশরের পুত্র ও শুকদেবের পিতা। তাঁর মাতার নাম সত্যবতী। গায়ের বর্ণ কৃষ্ণ ও দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে তার নাম হয় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। তিনি মহাভারত, অষ্টাদশ মহাপুরাণ এবং ভাগবত-এর রচয়িতা।
বেদান্ত
ব্রহ্মের স্বরূপ-নিরূপক শাস্ত্রকে ‘বেদান্ত’ বলা হয়। বেদের পূর্বভাগ মন্ত্র, ঋক্, যজুঃ ও সামন। ওই পূর্বভাগের দর্শন পূর্ব-মীমাংসা। বেদের ব্রাহ্মণ ভাগই পূর্ব-মীমাংসার ভিত্তি। ব্রাহ্মণের শেষ ভাগ আরণ্যক ও আরণ্যকের শেষ ভাগ উপনিষদ। উপনিষদ ভাগকে বেদান্ত বলা হয়। এতে বেদের চরম বস্তু সন্নিবেশিত বলে এ অংশকে ‘বেদান্ত’ বলা হয়।

 

বেলেল্লা
‘বেলেল্লা’ শব্দের অর্থ ধর্ম ও নীতিহীন, নির্লজ্জ, লম্পট, উচ্ছৃঙ্খল প্রভৃতি। ফারসি ‘বে’ এবং আরবি ‘লিল্লাহ্’ মিলে ‘বেলেল্লা’ শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ভাষায় ‘বে’ অর্থ বিহীন, বিনা, ছাড়া প্রভৃতি। অন্যদিকে আরবি ‘লিল্লাহ্’ শব্দের অর্থ আল্লাহ্র জন্য। সুতরাং ‘বেলেল্লা’ শব্দের অর্থ যা আল্লাহ্র জন্য নয়। ধরে নেওয়া যায়, যা আল্লাহ্র জন্য নয় তা আল্লাহ্ পছন্দ করেন না, আর যা আল্লাহ্ পছন্দ করেন না তা ধার্মিকদের চোখে অবশ্যই ভালো কাজ নয়। হয়তো এ থেকে ‘বেলেল্লা’ শব্দটি এমন অর্থ ধারণ করেছে। অবশ্য বর্তমানে শব্দটি বহুলাংশে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে গেছে। ‘বেলেল্লা’ শব্দ নিয়ে গঠিত আর-একটি শব্দ ‘বেলেল্লাপনা’।

বৈকুণ্ঠ
বিষ্ণুর অপর নাম ‘বৈকুণ্ঠ’। কালীপ্রসন্ন সিংহের মহভারতে উল্লেখ আছে : আমি কুণ্ঠিত না-হয়ে জলের সঙ্গে পৃথিবীর, বায়ুর সঙ্গে আকাশের এবং তেজের সঙ্গে বায়ুর মিলন ঘটিয়েছি। তাই পাণ্ডবেরা আমাকে বৈকুণ্ঠ নির্দেশ করেন।

বৈদ্যুতিক লাইন
‘বিদ্যুৎ লাইন’ বললে এমন একটি লাইন বোঝাবে, যে লাইন বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য তৈরি করা হচ্ছে বা হয়েছে বা হবে কিন্তু এখনও বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হয়নি। বিদ্যুৎ প্রবাহের পূর্ব পর্যন্ত এটি বিদ্যুৎ লাইন। তবে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হবার পর ‘বিদ্যুৎ লাইন’ আর বিদ্যুৎ লাইন থাকে না, ‘বৈদ্যুতিক লাইন’ হয়ে যায়।

বৈভব
‘বৈভব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ঐশ্বর্য, সম্পদ, সমৃদ্ধি, ধন, প্রাচুর্য প্রভৃতি। এটি সংস্কৃত শব্দ। ‘বিভু’ শব্দ থেকে ‘বৈভব’ শব্দের উৎপত্তি। বিভু অর্থ ঈশ্বর, ভগবান, পরমদাতা, পরমপুরুষ। সুতরাং বৈভব শব্দের অর্থ ঈশ্বরের মহিমা, ঈশ্বরের ঐশ্বর্য। ‘বৈভব’ শব্দটি যতই ঐশ্বর্যময় হোক না কেন, শব্দটি এখন স্বাধীন ও এককভাবে খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না। বিত্ত, চিত্ত, মন প্রভৃতির সঙ্গে বসলে বৈভব শব্দটি সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। যেমন বৈভব অপেক্ষা বিত্তবৈভব, চিত্তবৈভব, মনোবৈভব শব্দগুলো আরও অধিক আকর্ষণীয়। বৈভব যেহেতু ঈশ্বরের ভাব সেহেতু এটি মহামূল্যবান একটি প্রত্যয়। যাঁর মধ্যে ঈশ্বরের ভাব আছে তিনি সত্যিকার অর্থে ঐশ্বর্যময়। তাই বৈভব দিয়ে শুধু জাগতিক সম্পদওয়ালাকে বোঝায় না, জাগতিক সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে মননশীল চেতনা ও আচরণগত সৌন্দর্যও থাকা চাই।

বোকার স্বর্গ
‘বোকার স্বর্গ’ বাগ্ভঙ্গির অর্থ কল্পিত সুখ, আহম্মকের চিন্তা, কল্পিত সুখে বিভোর থাকা প্রভৃতি। প্রাতিষ্ঠানিক একেশ্বরবাদ অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, বুদ্ধি, অপরিণত বুদ্ধি কিংবা বিকৃত মস্তিষ্ক যে সকল মানুষের ভালো-মন্দ চিন্তা করার কোনো ক্ষমতা থাকে না, তারা যদি কোনো পাপ কাজ করে ফেলে সেজন্য তাদের পাপী বলে গণ্য করা হবে না। কারণ তারা না-বুঝে এমন করেছে। এ জন্য তাদের কোনো বিচার হবে না এবং তাদের নরকেও যেতে হবে না। আবার স্বর্গ যেহেতু শুধু পুণ্যবানদের স্থান সেহেতু তারা স্বর্গেও যেতে পারবে না। এ অবস্থায় তাদের স্বর্গ ও নরকের বাইরে একটি ভিন্ন স্থানে রাখা হবে। এ স্থানে বোকাদের রাখা হয় বলে এর নাম ফুল্স্ প্যারাডাইস বা বোকার স্বর্গ। তবে বাগ্্ভঙ্গিটির প্রচলিত অর্থ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হতে ভিন্ন। মানুষ স্বভাবতই কল্পনাবিলাসী। নিজের প্রত্যাশিত ইচ্ছা যতই অধরা হোক না কেন, অনেকে কল্পনার মাধ্যমে তা উপভোগ করার চেষ্টা করে। অনেক বাস্তববাদী মানুষও মাঝে মাঝে তাঁর অপ্রাপ্ত ইচ্ছাকে কল্পনায় এনে ক্ষণিকের জন্য হলেও বিভোর থাকার চেষ্টা করেন।

বোমা
বস্তা থেকে দ্রব্যের নমুনা বের করার নিমিত্ত ব্যবহৃত একটি সরল যন্ত্রবিশেষ। ধান-চাল ও খাদ্যশস্যের গুদাম এবং দোকানে এ সরল যন্ত্রটির ব্যবহার দেখা যায়। এ বোমা দিয়ে খাদ্যশস্য-বোঝাই বস্তা হতে খাদ্যশস্য বা মালামালের কিছু নমুনা বের করে যাচাই করা হয়। বোমা দিয়ে বস্তা না খুলে বস্তা থেকে পণ্যদ্রব্যের নমুনা বের করা অতিপ্রাচীন কিন্তু খুব সহজ একটি পদ্ধতি। এ বোমার অনুষঙ্গে অনেকে বোমা মেরে আড়তের বস্তার মতো মানুষের শরীর-মন না খুলে কথা বের করার চেষ্টা করে। মানুষ তো আর বস্তা নয়; তাই সবসময় এমনটি সম্ভব হয় না। যখন সম্ভব হয় না তখন বলা হয় ‘পেটে বোমা মেরেও তার পেট থেকে কিছু বের করা গেল না’। অবশ্য বের হয়ে গেলে তো আর বোমার প্রয়োজন হয় না বলে পেটে বোমা মেরে কথা বের করা বাগ্ভঙ্গিটিও সুপ্ত থেকে যায়। আড়তের সহজ-সরলভাবে পণ্য নমুনা যাচাইয়ের যন্ত্র ব্যতীত আর একপ্রকার যন্ত্র আছে। তার নাম বোমা যা ফাটিয়ে বাংলাদেশে মানুষ মারা হয়, যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় শত শত, হাজার হাজার। এটি একটি মারাত্মক অস্ত্র। এ বোমা অনেক প্রকার। আকাশ হতে ছোঁড়া হতে পারে, হাত দিয়ে ছোঁড়া হতে পারে বা মাটির নিচে পুঁতেও রাখা হতে পারে। যেভাবেই ব্যবহার করা হোক না কেন, এ বোমার কাজ হচ্ছে জানমালের অনিষ্টসাধন। এ বোমা কিন্তু পর্তুগিজ ‘বোম্বারডেরিয়ান’ শব্দ হতে এসেছে।

বোম্বেটে
‘বোম্বেটে’ শব্দের অর্থ বেপরোয়া লোক, সাংঘাতিক লোক, অশালীন ব্যবহার করে এমন লোক। বোম্বেটে একটি সাংঘাতিক ভয়ঙ্কর চিত্রের মানুষের চরিত্রের প্রতিফলন। শব্দটির সঙ্গে ইউরোপীয় জলদস্যুদের নৃশংস চরিত্রের করুণ স্মৃতি জড়িত। পর্তুগিজ ‘বোম্বা’ শব্দ থেকে বাংলা বোমা শব্দের উৎপত্তি। অন্যদিকে পর্তুগিজ ইড়সনধৎফবৎরড় শব্দ থেকে বোম্বেটে শব্দের উৎপত্তি। বোম্বারডেরিও শব্দের অর্থ বোমাবাজ। সে অর্থে বোম্বেটে শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বোমাবাজ। কিন্তু বাংলায় বোম্বেটে শব্দের অর্থকে বোমাবাজ চিহ্নিত না-করে ‘বোমাবাজি’ তথা তাদের কর্মকাণ্ড ও আচরণকে নির্দেশ করেছে।
একসময় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ওলন্দাজ, দিনেমার ও পর্তুগিজ জলদস্যু এবং তাদের সহায়তাকারী মগ জলদস্যুদের সাংঘাতিক উৎপাত ছিল। তাদের আক্রমণের শঙ্কায় সাধারণ জনগণ শুধু নয়, জমিদার ও রাজারা পর্যন্ত তটস্থ থাকতেন। ইউরোপীয়ান এ জলদস্যুদের চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও দৈহিক অবয়বও ছিল ভয়ানক। তারা বোমাবাজির মাধ্যমে দস্যুতা সম্পন্ন করে মানুষের জানমাল ও সহায়সম্পদ লুণ্ঠন করত। যারা এমন কাজ করত তারা কখনো ভালো লোক ছিল না। তারা ছিল সাংঘাতিক ভয়ঙ্কর ও অশালীন। বস্তুত পর্তুগিজ ‘বোম্বারডেরিও’দের আচরণই বাংলায় বোম্বেটে শব্দে আশ্রয় নিয়ে তাদের কুকীর্তিকে ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের অঙ্গেও স্থায়ী আসনে স্থান করে নিয়েছে।
ব্যঙ্গ
‘ব্যঙ্গ’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ বিদ্রƒপ, ঠাট্টা, মজা, উপহাস, পরিহাস প্রভৃতি। তবে ‘ব্যঙ্গ’ শব্দের আদি ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ছিল অন্যরকম। মূলত যার অঙ্গ বিকৃত তাকে ব্যঙ্গ বলা হতো। বিকৃত অঙ্গের মানুষকে দেখে শিশুরা উপহাস করে, শুধু শিশুরা কেন বয়স্কদেরও অনেকে বিকৃত অঙ্গধারীদের নিয়ে ঠাট্টা করে, অযথা পরিহাস করে। অনেকে তাদের জন্মকে অভিশাপ ও পিতা-মাতার পাপের পরিণাম গণ্যে নানা বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য করে। সমাজ তাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না। যেখানে বিকৃত অঙ্গ সেখানে উপহাস, বিদ্রƒপ আর ঠাট্টা। তাই কালক্রমে বিকৃত অঙ্গের অধিকারী তথা ‘ব্যঙ্গ’ শব্দটি উপহাস-বিদ্রƒপ আর ঠাট্টা-মজার সমার্থক হয়ে যায়।

ব্যবসায়
‘ব্যবসায়’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ তেজারতি, কাজকারবার, কারবার, পেশা, জীবিকা, বাণিজ্য প্রভৃতি। তবে এর মূল অর্থ ছিল চেষ্টা, যত্ন, উদ্যম, অধ্যবসায় প্রভৃতি। ব্যবসা বলতে দীর্ঘদিন এগুলোকে বোঝানো হতো। কিন্তু কালক্রমে বাংলায় ব্যবসায় শব্দ তার আদি অর্থ হারিয়ে তেজারতি, কারবার, বাণিজ্য, জীবিকা প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে। এ পরিবর্তনের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাণিজ্য, তেজারতি, কারবার যে কেউ যেকোনোভাবে করতে পারে না। এগুলো করতে হলে প্রয়োজন চেষ্টা, উদ্যম, অধ্যবসায়, পরিকল্পনা, পরিবেশ ও উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রভৃতি। এসব শর্তাবলি ছাড়া বাণিজ্য মঙ্গলের পরিবর্তে সমূহ ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসে। তাই যার উদ্যম, যত্ন, চেষ্টা, প্রয়াস নেই তার বাণিজ্যে আসা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। এ জন্য উদ্যম, চেষ্টা, প্রয়াস, অধ্যবসায় প্রভৃতি শব্দের স্থান সংগতকারণে ‘ব্যবসা’ শব্দটা দখল করে নিয়েছে।

ব্রজ
মথুরা ও তার চারদিক। এ স্থান কৃষ্ণের লীলাভূমি, তাই মহাতীর্থস্বরূপ। এ ব্রহ্মভূমিতে বারোটি বন, উপবন, প্রতিবন ও অধিবন আছে।

ব্রহ্মর্ষি
প্রথমে ব্রহ্মর্ষি, তারপর দেবর্ষি, তারপর রাজর্ষি। কশ্যপ, বশিষ্ঠ, ভূগু, অঙ্গিরা ও অত্রি এদের গোত্রে ব্রহ্মর্ষিরা জন্মগ্রহণ করেন। ব্রহ্মার নিকট গমন করেন বলে এরা ব্রহ্মর্ষি।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!