বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

দ্বাবিংশ অধ্যায়

মগের মুল্লুক
অনেকেই ‘মগের মুল্লুক’ শব্দটা জানেন, কিন্তু অর্থ জানেন না। ‘মগ’ কারা বা ‘মুল্লুকটা’ কোথায়! বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ বছর আগে মগদে ভীষণ উপদ্রব ছিল। আরাকান, অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার, থেকে আসা মগ-জলদস্যুরা বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করার পর মগদের সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান হতে শুরু করে।
ব্রহ্মদেশ বা আরাকানের অধিবাসীদের বলা হতো ‘মগ’। মগের মুল্লুক মানে ব্রহ্মদেশ। এরা স্বেচ্ছাচারী ছিল। অরাজকতা, আইনের শাসন না থাকা এবং যথেচ্ছাচার বোঝাতে এখনও ‘মগের মুল্লুক’ কথাটা ব্যবহার হয়। অনেকে বলেন, বৌদ্ধদের মগ বলা হতো। বৌদ্ধ ধর্মে জীব বলি দেওয়া মহাপাপ, তাই তারা জীব বলি দিত না! কিন্তু হিন্দুধর্মে পুণ্যকর্ম হিসাবে দেবতাকে খুশি করার জন্য জীব বলি দেওয়া হতো। মোগল আমলে ত্রিপুরার মহরাজ গোবিন্দমাণিক্য যখন ভুবনেশ্বরী দেবীর মন্দিরসহ তাঁর রাজ্যের সকল স্থানে ও মন্দিরে জীব বলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, তখন রাজসভা থেকে ‘মগের মুল্লুক’ কথাটির উৎপত্তি হয়। সভাসদেরা বলতে শুরু করেন : “দেশটা কী ‘মগের মুল্লুক’ হইয়া গেল নাকি? শুনেছি বৌদ্ধ মগেরা রক্তপাত ঘটায় না। তাহলে মগ আর হিন্দুদের মধ্যে তফাত রইল কী? দেশটাকে মগের মুল্লুক করা যাবে না। এটি বৌদ্ধরাষ্ট্র নয়। মা দেবী অসন্তুষ্ট হবে।” এখন ‘মগের মুল্লুক’ কথাটি দিয়ে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ বা নৈরাজ্যময় অবস্থাকে নির্দেশ করা হয়।

মঞ্জুভাষণ
কথার শক্তি তরবারির চেয়ে প্রবল। বলা হয়, কথার চেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে এমন কোনো অস্ত্র নেই। আবার বলা হয়, কথার চেয়ে বেশি শান্তি দিতে পারে এমন পরম বিষয়ও পৃথিবীতে নেই। এ জন্য বলা হয়, শব্দব্রহ্ম। অর্থাৎ শব্দের শক্তি ব্রহ্মের মতোই অসীম। কোনো কিছু সোজাসুজি বোঝানোর জন্য যেমন শব্দ আছে তেমনি শব্দ আছে ঘুরিয়ে বলার। কোনো ভদ্রলোক অপ্রিয় কথা সহজে সোজাসুজি বলতে চান না। অপ্রিয় কথাটি যখন না বললেই নয়, তখন মোলায়েম করে ঘুরিয়ে বলেন। ইংরেজিতে শব্দ চয়নের এ কৌশলকে ঊঁঢ়যবসরংস বলা হয়। বাংলায় এ কৌশলকে ‘মঞ্জুভাষণ’ বলে। অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ চক্রবর্তী তাঁর লেখা ‘অলংকার চন্দ্রিকা’য় প্রথম ‘মঞ্জুভাষণ’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
জামানের বন্ধু রবিন চুরি করে। বড় লজ্জা হয় জামানের কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না, রবিন চুরি করে। বলল : রবিনের হাতটানের অভ্যাস আছে। বাজারে যাবার সময় স্ত্রীর কণ্ঠ : চাল বাড়ন্ত। মানে বাড়িতে চাল নেই। চাল নেই বলা লজ্জা ও দারিদ্র্য প্রকাশক। তাই ‘বাড়ন্ত’। ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইল, না দিয়ে বলা হলো : মাফ কর। অফিসে সাহেবকে ঘুষ দিয়ে বলল : কিছু মনে করবেন না স্যার, ভাবীর জন্য একটা শাড়ি আর বাচ্চাদের জন্য কিছু মিষ্টি কিনে নেবেন।
মঞ্জুভাষণের এ প্রক্রিয়ায় চোরকে বলে ‘নিশিকুটুম্ব’। ইংরেজিতে চোরকে ভদ্রতা করে বলা হয় ফেয়ার ট্রেডার, চাকরি থেকে ডিসমিসকে বলা হয় গোল্ডেন হ্যান্ডশেক, আর্লি রিটায়ারমেন্ট বা আর্লি রিলিজ। ‘বেশ্যা’ শব্দটি আগে খুব ব্যবহার হতো। এখন বলা হয় যৌনকর্মী। বাসার কাজের মেয়েকে ভদ্রতা করে আগে বলা হতো বুয়া, তারপর আরও ভদ্র হয়ে গৃহপরিচারিকা, এখন তো গৃহকর্মী। সবই ভদ্রতার জন্য করা এবং এগুলোই ‘মঞ্জুভাষণ’।

মথুরা
‘মথুরা’ ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত এবং মধুদৈত্য-নির্মিত একটি অপূর্ব সুন্দর নগরী। এটি যমুনার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান হিসাবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে মথুরা মহাপুণ্যস্থান এখানে শ্রীকৃষ্ণের হাতে রাজা কংসের মৃত্যু হয়।

মধুচন্দ্রিমা
সদ্য বিবাহিত দম্পতির একান্ত অবকাশ যাপনের অবস্থা ও অবস্থানকে ‘মধুচন্দ্রিমা’ বা ‘মধুচন্দ্রিকা’ শব্দ সহযোগে প্রকাশ করা হয়। ইংরেজি ভাষায় ‘হানি’ ও ‘মুন’ শব্দযোগে ‘হানিমুন’ শব্দটি গঠিত। ‘হানি’ অর্থ মধু আর ‘মুন’ অর্থ চন্দ্র বা মাস। ইংরেজি হানিমুন শব্দের আদি অর্থ হলো ‘মধু খাওয়ার মাস’। বাংলা মধুচন্দ্রিমার মধ্যে কিন্তু মধুপান বা মধুমাস হিসাবে কোনো শব্দ নেই। প্রাচীনকালে জার্মানির সামাজিক রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর এক মাস নবদম্পতিকে ভিন্ন এক জায়গায় রাখা হতো। সে সময় নবদম্পতিকে গ্যাঁজানো মধুর শরবত ঘটা করে পান করানো হতো যা ক্রমান্বয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও সম্প্রসারিত হয়। কালের বিবর্তনে নবদম্পতিকে মধু খাওয়ানোর ব্যাপারটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। শুধু থেকে যায় নবদম্পতির ভিন্ন স্থানে গিয়ে অবস্থানের রেওয়াজ। তবে আগের এক মাস নির্ধারিত সময়ও এখন আর মানা হয় না। কতদিন থাকবে কিংবা কোথায় কীভাবে থাকবে তা নির্ভর করে তাদের আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর।

মধুর
‘মধুর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মনোহর, প্রীতিদায়ক, অতিমিষ্ট, মনোরম, শান্তিদায়ক প্রভৃতি। শব্দটির সঙ্গে মৌমাছির মৌচাক হতে সংগৃহীত তরল ঘন মিষ্ট ‘মধুর’ নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মধুর শব্দের অর্থ মধুযুক্ত। যাতে মধু রয়েছে তা-ই মধুর। মধু একটি আদর্শ খাদ্য। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত খাদ্যের মধ্যে একমাত্র মধুই স্বাভাবিক অবস্থায় যতদিন রাখা হোক না কেন নষ্ট হয় না। এর স্বাদ খুব মিষ্টি। শুধু তাই নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। যৌবনকে এটি উজ্জ্বল রাখে, মনকে রাখে প্রফুল্ল। এ অনুষঙ্গে ‘মধু’ খাদ্যটি মধুর হয়ে বাঙালির বাগ্ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। ‘মধুর’ শব্দটি যেমন কাব্যিক তেমনি মোহনীয়। কবি-সাহিত্যিক ও প্রেমিক-প্রেমিকা, সব বয়সের মানুষের কাছে শব্দটি অতি প্রিয়। মৌচাকের তরল ঘন মিষ্টি দ্রব্যটির মতো ‘মধুর’ শব্দটি মনকে মিষ্টতায়, হৃদয়কে অনুপমতায় আর চিন্তাকে চঞ্চল বিকাশে উৎফুল্ল করে তোলে। কবির ভাষায় : মধুর মধুর বংশী বাজে কোথায় কোন কদম তলাতে…।

মধুরেণ সমাপয়েৎ
শুভ সমাপ্তি বোঝাতে ব্যবহৃত এ কথাটা এসেছে আমাদের প্রাচীন ভূরিভোজন রীতি থেকে। আহার আরম্ভ হতো ঘৃতে কিন্তু সমাপ্ত হতো মধুতে। এ বিষয়ক একটা শ্লোকের শেষাংশ হচ্ছে ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’। এখনও বিশেষ আনুষ্ঠানিক পঙ্্ক্তিভোজনে ব্রাহ্মণদের মধ্যে এ রীতির প্রচলন রয়েছে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ মধুরেণ সমাপ্তম্ হয়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিক এবং ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ ঘৃতারম্ভের উৎফুল্ল আয়োজন নিয়ে আবির্ভূত হোক।

মনকলা
মনে মনে মনকলা খাও, যতটা খেয়েছ আরও ততটা খাও, মোট যতটা খেয়েছ তার অর্ধেক খাও, এবার মোট কলার তিন ভাগের এক ভাগ তোমার কোনো সহপাঠীকে দিয়ে দাও, একটা আমার জন্য রেখে দাও, এখন কয়টা অবশিষ্ট আছে? ৩টা। সিদ্ধান্ত : তাহলে তো দেখছি তুমি প্রথমে ২টা কলা খেয়েছিলে! বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘মনকলা খাওয়া’ বাগ্ভঙ্গিটির অর্থ হলো : কল্পনায় বাঞ্ছিত বস্তু উপভোগ করা। মনে মনে মনকলা খাওয়ার এই মানসাঙ্ক থেকেই ‘মনকলা খাওয়া’ বাগ্্ভঙ্গিটির প্রবল মিল রয়েছে।

মন কষাকষি
মনোমালিন্য, বনিবনার অভাব, পরস্পর বিরূপ মনোভাব, বিরোধিতা প্রভৃতি শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ। আরবি ‘মুনাকশা’ শব্দ থেকে বাংলা ‘মন কষাকষি’ শব্দের উৎপত্তি। ‘মুনাকশা’ শব্দের অর্থ : ঝগড়া, প্রতিযোগিতা, বিতর্ক, শত্র“তা প্রভৃতি। ঝগড়া বা শত্র“তা হয় কখন? যখন বনিবনার অভাব থাকে, পরস্পর বিরূপ মনোভাব বা বিরোধিতা চাঙা দিয়ে ওঠে, তখন ঝগড়া ও পরস্পর শত্র“তা জন্ম নেয়। সুতরাং আরবি ‘মুনাকশা’ বাংলায় এসে তার অর্থ মোটেও হারায়নি। এবার প্রতিযোগিতা ও বিতর্কে চলে আসি। টেলিভিশনে যখন বিতর্ক হয় তখন প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য ঝগড়া নয়, অল্পসময়ের জন্য হলেও মহা ঝগড়ার ইঙ্গিত দেয়। প্রকৃতপক্ষে ঝগড়া, শত্র“তা, প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের মধ্যে মনোমালিন্য, বনিবনার অভাব, বিরূপ মনোভাব, বিরোধিতা প্রভৃতি অবশ্যম্ভাবী। এগুলো ছাড়া কখনো ‘মুনাকশা’ সৃষ্টি হতে পারে না। এ জন্য আরবি ‘মুনাকশা’ বাংলায় এসে ‘মন কষাকষি’ রূপে ঠাঁই পেয়েছে। এতে তার অর্থের তেমন পরিবর্তন হয়নি। তবে মাত্রার কিছুটা হেরফের ঘটেছে। আরবি মুনাকশার ঝগড়া ও শত্র“তা, প্রতিযোগিতা বা বিতর্ক বাংলা ‘মন কষাকষি’র চেয়ে একটু জটিল এবং কিছুটা তপ্ত। অবশ্য আরবীয় যাযাবর জাতিরা আদিম কাল হতে স্বভাবে ছিল কিছুটা তপ্ত ও উগ্র।
মনুসংহিতা
মানবধর্মশাস্ত্র। হিন্দুধর্মের অবশ্য-পালনীয় কর্তব্য, হিন্দু-জাতির আচার-ব্যবহার ও ক্রিয়াকলাপের যথাকর্তব্য নির্ধারণ করে যে সংহিতা গ্রথিত হয়েছে, তা মনুর দ্বারা সংকলিত হয়েছে। তাই এর নাম ‘মনুসংহিতা’। পণ্ডিতগণের অভিমত, বেদের পর মনুসংহিতা সৃষ্টি হয়েছিল। কথিত হয়, প্রথমে এতে একলক্ষ শ্লোক ছিল। এখন মাত্র ২৬৮৪টা শ্লোক পাওয়া যায়।

মন্তব্য
‘মন্তব্য’ শব্দের অর্থ অভিমত, মতামত। সংস্কৃত হতে আগত ‘মন্তব্য’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ চিন্তনীয়, বিচার্য। চিন্তা-ভাবনা করে সার্বিক ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক পরম্পরা চিন্তায় যা করা হয় তা-ই মন্তব্য। বাংলা ভাষায় বর্তমানে ‘মন্তব্য’ শব্দটি অভিমত বা মতামত অর্থে ব্যবহার করা হলেও ‘মতামত’ বা ‘অভিমত’ প্রদানে সবাইকে চিন্তা-ভাবনা করতে দেখা যায়। চিন্তা-ভাবনা না-করে কেউ মন্তব্য করে না। সুতরাং মন্তব্য চিন্তার ফসল। তাই ‘মন্তব্য’ মানে চিন্তনীয় বা বিচার্য এবং চিন্তনীয় বা বিচার্য মানে ‘মন্তব্য’।

মন্দ
‘মন্দ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মৃদু, অলস, মন্থর, খারাপ, দুষ্ট, অসৎ, অশুভ, প্রতিকূল, দুর্বল, কটু, কর্কশ প্রভৃতি। এতগুলো অর্থ থাকলেও মূলত খারাপ, মন্দ, দুষ্ট, অসৎ, অশুভ প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। শরীর খারাপ যাচ্ছে বোঝাতেও অনেকে শব্দটি ব্যবহার করে। যেমন বাবার শরীর কয়েক মাস যাবৎ বেশ মন্দ যাচ্ছে। মন্থর, ধীর প্রভৃতি অর্থেও এটি ব্যবহার হয়। যেমন মন্দগতির গাড়ি, সময়মতো বাড়ি পৌঁছানো যাবে না। ‘মন্দ’ সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় ‘মন্দ’ শব্দের অর্থ ধীর, স্বল্প, বিলম্বিত, নির্বোধ, মন্থর, ক্ষীণ, দুর্বল প্রভৃতি। বাংলায় এসে শব্দটি সামান্য অর্থ পরিবর্তন করলেও মূল অর্থ অভিন্ন রয়ে গেছে। তবে অধিকাংশ শব্দ এক ভাষা হতে অন্য ভাষায় অতিথি হয়ে এলে কিছুটা আচার-আচরণের পরিবর্তন হয়ে থাকে। মূলত এটাই স্বাভাবিক।
মমতা
‘মমতা’ শব্দের অর্থ মায়া, স্নেহ, দরদ, ভালবাসা, প্রেম, সহানভূতি প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে ‘মম’ শব্দ হতে মমতা শব্দের উৎপত্তি। ‘মম’ শব্দের অর্থ আমার। সাধু ভাষায় যার অর্থ মদীয়। সে হিসাবে ‘মমতা’ শব্দের মূল অর্থ ‘এটা আমার’। আমার ছাড়া আর কারও নয় বোঝাতে ‘মমতা’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। শব্দটা সে অর্থে একটু রুক্ষ শোনালেও আসলে এটাই ঠিক। যেটা মমতার, আদরের, স্নেহের এবং ভালবাসার সেটি কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। নিজেই একান্তভাবে নিজের করে রাখতে চায়। কারও ভালবাসার পাত্র বা পাত্রীকে অন্যে দখল করলে কেমন হয় তা রোমে ‘হেলেন’ এবং ভারতে ‘সীতা’র অপহরণের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ ভালবাসার প্রতি অন্ধ আবেগ ‘এটা আমার’ উচ্চারণে শুধু সীমাবদ্ধ রাখেনি। তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ঘটিয়েছে লঙ্কাকাণ্ড। তাই সংস্কৃত ‘এটা আমার’ বাংলায় ‘মমতা’ হয়ে ভালবাসা, স্নেহ ও প্রেম-প্রীতিকে আরও অর্থবহ করে দিয়েছে।

 

ময়দা
আরবি ‘মাইদাহ্্’ শব্দ হতে বাংলা ‘ময়দা’। আলেকজান্ডারের ভারত বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ময়দা সম্পর্কে ভারতবাসীর কোনো ধারণা ছিল না। যবের গুঁড়া বা গোধূমচূর্ণকে বারবার চালুনিতে চেলে মিহি করে বিভিন্ন উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতের কৌশল গ্রিকরাই সারা বিশ্বকে শিখিয়েছে। অত্যন্ত মিহি এ গোধূমচূর্ণকে (অর্থাৎ গমের গুঁড়া) আমরা ‘ময়দা’ হিসাবে চিনি। গ্রিক ভাষায় এর নাম সেমিদালিস। সংস্কৃত ভাষায় সেমিদালিস পরিবর্তন হয়ে হয় ‘সমিতা’। মুসলিম আগমনের পূর্ব-পর্যন্ত ময়দার ‘সমিতা’ নাম বহাল ছিল। আরবি ও ফারসি ভাষায় এ গোধূমচূর্ণের নাম ‘মাইদাহ্্’ এবং এ ‘মাইদাহ্্’ শব্দ থেকে বাংলা ‘ময়দা’ শব্দের উৎপত্তি।

মরহুম
শব্দটির প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ প্রয়াত, মৃত, স্বর্গীয়, লোকান্তরিত প্রভৃতি। ‘মরহুম’ আরবি শব্দ। এর অর্থ আল্লাহ্র পক্ষ থেকে রহমপ্রাপ্ত, করুণাপ্রাপ্ত, দয়াপ্রাপ্ত প্রভৃতি। বাংলাদেশের মুসলমানেরা তাদের মৃত আত্মীয়স্বজনের নামের আগে অনেকে ‘মরহুম’ শব্দ লিখে থাকেন। যদিও শব্দটির অর্থ মৃত নয়, তবু অনেকে মনে করেন ‘মরহুম’ শব্দের অর্থ মৃত। মরহুম শব্দের ‘মৃত’ অর্থ আমাদের অস্তিত্বে এমনভাবে গেঁথে আছে যে, মরহুম বলতে মৃত শব্দটাই কেবল ভেসে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে যিনি আল্লাহর মেহেরবানি বা দয়া বা করুণা লাভে সমর্থ হয়েছেন তিনিই ‘মরহুম’। আল্লাহ্র রহমত বা করুণাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা স্বর্গে স্থান পান। মুসলমানদের বিশ্বাস মৃতের পর আল্লাহ্র করুণাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা স্বর্গে যাবেন কিন্তু যাঁরা তাঁর করুণাপ্রাপ্ত নন, তাঁরা যাবেন জাহান্নামে। এ জন্য মৃত ব্যক্তির নামের আগে ‘মরহুম’ শব্দ লিখে এ কথা প্রত্যাশা করা হয় যে, মৃত ব্যক্তি আল্লাহর করুণা পেয়ে স্বর্গে গমন করেছেন। হিন্দুরা মরহুম লেখেন না, তৎপরিবর্তে লেখেন ‘স্বর্গীয়’। এর অর্থ মৃত ব্যক্তির আত্মা স্বর্গে আছেন।

মর্যাদা
‘মর্যাদা’ শব্দের অর্থ গৌরব, সম্মান, মূল্য, সম্ভ্রম, প্রতিপত্তি, প্রভাব, প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি। তবে শব্দটির মূল ও আদি অর্থ ছিল সীমা, ক্ষেত্র, নিয়ম, সদাচার প্রভৃতি। সেকালে যাঁরা নিজেদের সীমা, ক্ষেত্র ও নিয়মকানুনে নিষ্ঠাবান থাকতেন এবং সদাচার করতেন তাঁরাই মর্যাদার অধিকারী বলে গণ্য হতেন। কিন্তু শব্দটি বাংলায় এসে তার আদি অর্থ হতে কিছুটা সরে এসে অন্য অর্থ ধারণ করেছে। অবশ্য এ অর্থের সঙ্গে আদি অর্থের মিল রয়েছে। এখন সীমা বা ক্ষেত্র লঙ্ঘনকারীকে অমর্যাদার কাজ বলা হয় না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে এটি মর্যাদার কাজ। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় এমনকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তা দেখা যায়। যার সীমা লঙ্ঘনের ক্ষমতা ও সামর্থ্য যত বেশি সে তত মর্যাদাবান। এ জন্য বলা হয় ‘যার লাঠি তার মাটি’। আর নিয়ম ভাঙা ও অসদাচরণ তো এখন মর্যাদাবান বলে পরিচিত লোকদের অন্যতম কাজ। প্রাচীনকালে সামান্য সীমা লঙ্ঘনকে, কারও প্রতি অসদাচরণকে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো। এখন কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করে অন্যের সীমায় প্রবেশ করা, কথায় কথায় সাধারণ ও নিরীহ মানুষের প্রতি অসদাচরণ করাই মর্যাদাশীল লোকের স্বভাব। যার যত ক্ষমতা সে তত মর্যাদাশীল।

মহাজন
‘মহাজন’ শব্দের অর্থ বড় কারবারি, ব্যবসায়ী, সুদের কারবারি, সাধু, বৈষ্ণব পদকর্তা প্রভৃতি। সংস্কৃত ভাষায় শব্দটির মূল অর্থ ছিল লোকজন, মহাপুরুষ, মহাত্মা, শাস্ত্রকার, ধর্মতত্ত্ববিশারদ প্রভৃতি। এখনও সমাস করার সময় শিক্ষার্থীরা লেখে : মহা যে জন = মহাজন। তবে এখন বাংলার মহাজন সংস্কৃতের সে মহাত্মা মহাজন নয়। বাংলায় মহাজন বলতে বড় বড় ব্যবসায়ী, যারা পণ্যে ভেজাল দিয়ে, দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে এবং ওজনে কম দিয়ে বিত্তের পাহাড় গড়ে। মহাজন বলতে তাদের বোঝায় যারা সুদের ব্যবসায় করে। এ ছাড়া আড়তদার, ব্যাপারী প্রমুখও ‘মহাজন’ নামে পরিচিত। কেন সংস্কৃতের মহাত্মা বাংলায় বড় ব্যবসায়ী, আড়তদার ও সুদের কারবারিতে পরিণত হলো? বড় ব্যবসায়ী, সুদের কারবারি, আড়তদার প্রমুখ ছিল প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক। তাদের অধীনে অনেক লোক কাজ করত। এলাকার সাধারণ মানুষজন তাদের কাছে ছিল একপ্রকার জিম্মি। তারা যা বলত সেভাবে তাদের চলতে হতো। সাধারণ লোকজনের কাছে তারা ছিল ‘মহান জন’। সুতরাং বলা যায় সংস্কৃত ‘মহাত্মা’ বাংলায় এসে অর্থ হারালেও বিত্ত হারায়নি মোটেও।

মহাভারত
ভারতীয় মহাবংশচরিত ও কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ-বর্ণনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস-রচিত বিশ্বখ্যাত মহাকাব্য ‘মহাভারত’ শব্দের অর্থ ভরত বংশের মহাউপাখ্যান। এটি অষ্টাদশ পর্বে বিভক্ত। যথা : আদি, সভা, জন, বিরাট, উদ্যোগ, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্য, সৌপ্তিক, স্ত্রী, শান্তি, অনুশাসন, অশ্বমেধিক, আশ্রমবাসিক, মৌষল, মহাপ্রস্থান ও স্বর্গারোহণ। মহাভারতে একলক্ষ শ্লোক আছে। এটি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বৃহৎ মহাকাব্য। বেদব্যাস বদরিকাশ্রমে দীর্ঘ তিন বৎসরে মহাভারত রচনা করেন। পূর্বকালে দেবতাগণ তুলাদণ্ডে ওজন করে দেখেছিলেন যে, উপনিষদসহ চার বেদের তুলনায় ‘মহাভারত’ নামে পরিচিত গ্রন্থটি মহত্ত্বে ও ভারবত্তায় অধিক। এ জন্য এর নাম রাখা হয় মহাভারত।
মহাভারতের বিশালতা তথা দার্শনিক গূঢ়তা কেবল ভারতের পৌরাণিক আখ্যানই নয়, বরং এটিকে সমগ্র হিন্দুধর্ম এবং বৈদিক দর্শন ও সাহিত্যের সারসংক্ষেপ বলা যেতে পারে। ‘মহাভারত’ নামটির উৎপত্তি প্রসঙ্গে একটি আখ্যান প্রচলিত যে, দেবতারা তুলাযন্ত্রের একদিকে চারটি বেদ রাখেন ও অন্যদিকে বৈশম্পায়ন প্রচারিত ভারত গ্রন্থটি রাখলে দেখা যায় ভারত গ্রন্থটির ভার চারটি বেদের চেয়েও অনেক বেশি। সেজন্য ভারত গ্রন্থের বিশালতা দেখে দেবগণ ও ঋষিগণ এর নাম রাখেন ‘মহাভারত’। একে ‘পঞ্চম বেদ’ও বলা হয়। জগতের তাবৎ শ্রেষ্ঠ বস্তুর সঙ্গে একে তুলনা করে বলা হয়েছে : “মহত্ত্বাদ্ ভারতবত্ত্বাচ্চ মহাভারতমুচ্যতে।” বাংলাতেও মহাভারতের বিশালতা সম্পর্কিত একটি প্রবাদ রয়েছে : “যা নেই ভারতে, তা নেই মহাভারতে।” অর্থাৎ ভারতবর্ষে যা নেই ‘মহাভারতে’ও তা অনুপস্থিত।

মহোদয়
‘মহোদয়’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ মহাশয়, মহানুভব। এটি অনেকটা আরবি ‘জনাব’ আর ইংরেজি ‘স্যার’ শব্দের প্রতিশব্দ। ‘মহোদয়’ শব্দটি সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে। তবে বাংলায় ‘মহোদয়’ শব্দটিকে পারিভাষিক শব্দ বলা যায়। কারণ শব্দটি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় একই অর্থ বহন করে না। মূলত ‘মহৎ’ আর ‘উদয়’ এ দুটো শব্দের সমাসে ‘মহোদয়’ শব্দটির উৎপত্তি। সে হিসাবে ‘মহোদয়’ শব্দের মূল অর্থ দাঁড়ায় অভ্যুদয়, অতিসমৃদ্ধ, অতি উন্নত। কিন্তু বাংলায় শব্দটির অর্থ মহাশয় বা মহানুভব।

মাচা
‘মাচা’ শব্দের অর্থ বাঁশ, কাঠ প্রভৃতি দিয়ে তৈরি উঁচু স্থান বা উঁচু আসন। সংস্কৃত ‘মঞ্চ’ শব্দ হতে প্রাকৃতের স্তর পার হয়ে বাংলা ‘মাচা’ শব্দের উৎপত্তি। মঞ্চ ও মাচার কাজ বহুলাংশে অভিন্ন হলেও মঞ্চকে মাচা বলে মর্যাদা হানি করতে কেউ চান না। সংস্কৃত হতে প্রাকৃতের স্তর পার হয়ে এসেছে বলে ‘মাচা’ শব্দটি তার আর্য মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে। যদিও মঞ্চ ও মাচা তৈরির উপকরণ ও কায়দা অভিন্ন। তবে বাঁশ-কাঠের তৈরি যে উঁচু আসনে বক্তৃতা দেওয়া হয় তা আর ‘মাচা’ থাকে না। অভিজাত লোকজন যেখানে বক্তৃতা দেন সেটি তো আর অনার্য নামের হতে পারে না। ‘মাচা’ শব্দটি মূলত উঁচু আসনের চেয়ে সবজিবাগানে লতা ও ফলের আশ্রয়াসন হিসাবে সমধিক ব্যবহৃত। কুমড়ো, শিম, পুঁই প্রভৃতির লতা উঠানোর আধার ও বিস্তারের ক্ষেত্র হিসাবে বাঁশ-কাঠের তৈরি বেড়াজাতীয় বস্তুটি ‘মাচা’ নামেই বহুল প্রচলিত। অবশ্য গ্রামদেশে এখনও অনেকে বাঁশ-কাঠের তৈরি বিশেষ ধরনের উঁচু স্থানে বসে ক্ষেত পাহারা দেয়। এটিও মাচা। তবে এ মাচায় এসে যদি কেউ বক্তৃতা দিতে শরু করে তাহলে সেটি তখন আর ‘মাচা’ থাকে না, হয়ে যায় ‘মঞ্চ’। আসলে কাজই আসল, নামটা কেবল ধকল।
মাধুকরী/মাধুকরীবৃত্তি
‘মাধুকরী’ শব্দের অর্থ ভিক্ষাবৃত্তি। যদিও অভিধানে খুঁজতে গেলে ওই একই কথার একটু বিস্তারিত অর্থ পাওয়া যায়। মধুকর বা মৌমাছি যেমন ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহ করে তেমনি ভিক্ষুকও দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে অন্ন-বস্ত্র বা মৌলিক চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু সংগ্রহ করে। সুতরাং মধুকর ও ভিক্ষুকের কর্ম ও উদ্দেশ্য প্রায় কাছাকাছি। অন্তত পাঁচটি গৃহ থেকে সংগৃহীত ভিক্ষাকে ‘মাধুকরী’ বলা হয়। অভিধানে শব্দটির আরও একটি অর্থ পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে : পরের ভাব, তথ্য প্রভৃতি আত্মসাৎ করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া। ‘কুম্ভীলকবৃত্তি’র সঙ্গে মাধুকরীবৃত্তির এটাই অর্থগত মিল।

মানসপুত্র
‘মানসপুত্র’ মানে মন হতে উৎপন্ন পুত্র। ব্রহ্মার সাত কিংবা দশজন ‘মন’ হতে জাত পুত্র। এ মানসপুত্র হতে পৃথিবীর মানবজাতির জন্ম। এ দশজন মানসপুত্রকে ‘প্রজাপতি’ বলা হয়। যেমন মরিচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ, প্রচেতা, দক্ষ, ভৃগু এবং নারদ। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন সাতজন প্রজাপতি ছিলেন। তাঁদের ‘সপ্তর্ষি’ বলা হয়। এ সপ্তর্ষিদের এখন আকাশে তারারূপে দেখা যায়।

মান্ধাতার আমল
‘মান্ধাতার আমল’ অর্থ : পুরনো কাল, অনেক আগের। মান্ধাতা এক রাজার নাম। বোঝাই যাচ্ছে যে, এ রাজার রাজত্বকাল ছিল অনেক অনেক দিন আগে; আর তাই পুরনো সময়ের কথা বলতে গেলে বলা হয় ‘মান্ধাতার আমল’। মান্ধাতা ছিলেন সূর্যবংশের রাজা যুবনাশ্বের পুত্র। ‘রামায়ণে’র নায়ক রামও এ সূর্যবংশের রাজা ছিলেন। মান্ধাতার আমল বা রাজত্বকাল কত আগে ছিল, তা বোঝাই যাচ্ছে। মান্ধাতার জন্মের ইতিহাসটা আবার খুব অবাক-করা। যুবনাশ্বের কোনো ছেলে হচ্ছিল না। তখন তিনি মুনিদের আশ্রমে গিয়ে যোগ সাধনা করতে শুরু করলেন; যাতে তাঁর একটি পুত্রসন্তান হয়। এক সময় মুনিরা তাঁর সাধনায় সন্তুষ্ট হলেন। তখন তাঁর ছেলের জন্য তাঁরা এক যজ্ঞ শুরু করলেন। যজ্ঞ শেষ হলো মাঝরাতে। তখন কলসি ভর্তি মন্ত্রপূত জল বেদিতে রেখে তাঁরা ঘুমাতে গেলেন। কথা থাকল, এই কলসির জল যুবনাশ্বের স্ত্রী খেলে তাঁর ছেলে হবে। কিন্তু রাতে যুবনাশ্বের খুব তৃষ্ণা পেল। তিনি আর না পেরে নিজেই সে কলসির জল পান করে ফেললেন। সকালে উঠে মুনিগণ পুরো ঘটনা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “সন্তান তাহলে তোমার পেট থেকেই হবে।”
তবে তাঁরা যুবনাশ্বকে গর্ভধারণের কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেন। একশ’ বছর পূর্ণ হলে যুবনাশ্বের শরীর থেকেই মান্ধাতার জন্ম হলো। পরে রাজা হয়ে মান্ধাতা পৃথিবী-বিজয়ে বের হলেন। যুদ্ধ করতে করতে মান্ধাতা সারা পৃথিবীই জয় করে ফেলেন। অবশেষে পৃথিবী-বিজয় শেষ করে স্বর্গরাজ্য জয় করতে যান। তখন ইন্দ্র তাঁকে বলেন, “তুমি তো এখনও পুরো পৃথিবীই জয় করতে পারনি। মধুর পুত্র লবণাসুর এখনও তোমার অধীনতা স্বীকার করেনি। আগে তা করে এস, তারপর স্বর্গ নিয়ে ভেব। লবণাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে মান্ধাতা নিহত হন। এই হচ্ছে মান্ধাতার কাহিনি।

মামদো ভূত
বাংলার লোককথায় ভূতের অস্তিত্ব প্রবল। তারা মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়ায়। হিন্দুশাস্ত্রে প্রেতযোনিপ্রাপ্ত আত্মাকে ‘ভূত’ বলে। এরা হিন্দু ভূত। যে দেশে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করে সে দেশে হিন্দু ভূতের পাশে মুসলমান ভূত থাকবে না এমন হতে পারে না। মুসলমান ভূতেরাই হচ্ছে ‘মামদো ভূত’। ‘মহম্মদীয়’ শব্দ থেকে ‘মামদো’ শব্দের উৎপত্তি। সুতরাং ‘মামদো ভূত’ অর্থ মুসলমান ভূত। ‘মামদো ভূত’ নাকি আবার ভূতের চেয়েও ভয়ঙ্কর। মানুষ কখনো ভূত দেখেনি; দেখবেও না। তবু ভূত আছে, থাকবে এবং ভূতের ভয়ে মানুষের পিলে চমকে উঠবে। ভূত নেই, তবু ভূতের ভয়; এর চেয়ে অদ্ভুত আর কী হতে পারে!

মামলা
‘মামলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মোকদ্দমা, ব্যাপার, ঘটনা প্রভৃতি। ফারসি ‘মোয়ামেলা’ শব্দের বাংলা রূপ হচ্ছে মামলা। ফারসি মোয়ামেলা শব্দের অর্থ লেনদেন, ব্যবসায়, আচরণ, ব্যবহার প্রভৃতি। তবে এটি বাংলায় এসে তার অর্থ পাল্টে ফেলেছে। বাংলায় ‘মামলা’ শব্দ মোকদ্দমা দায়ের করা, কোনো জটিল বিষয়কে বোঝানো প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। তবে মোকদ্দমার ক্ষেত্রে শব্দটি আইন-আদালতের জগতে অতি পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। লেনদেন, ব্যবসায়, আচার-আচরণ প্রভৃতির মাধ্যমে মানুষের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে এ প্রত্যয়গুলোর অবিচ্ছেদ্য মিথষ্ক্রিয়া হচ্ছে জীবন, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মূল অনুষঙ্গ। এসব লেনদেন, আচার-আচরণ, ব্যবসায়, ব্যবহার প্রভৃতি ক্ষেত্রে দ্বিমত দেখা দিলে বা কোনোরূপ ঘটনা পরস্পরের স্বার্থ, চিন্তা বা অনুভবে ব্যাঘাত সৃষ্টি করলে তা মামালার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় এবং মানুষ মামলায় যায়।

মারপ্যাঁচ
‘মারপ্যাঁচ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কূটকৌশল, জাল, ফাঁদ, প্রতারণা প্রভৃতি। ‘মার’ ও ‘প্যাঁচ’ শব্দ-দুটোর মিলনে ‘মারপ্যাঁচ’ শব্দের উৎপত্তি। বাংলা ভাষায় নিজস্ব একটি ‘মার’ শব্দ রয়েছে। যার চারটি অর্থ আছে। তন্মধ্যে প্রথমত, ‘মার’ শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় পুরাণে কামদেবতার একটি নাম হচ্ছে ‘মার’। তৃতীয়ত, বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী তপস্যা বিঘ্নকারী দেবতা বা শয়তানকে ‘মার’ বলা হয়। চতুর্থত, ‘মার’ হচ্ছে আঘাত করা। কিন্তু ‘মারপ্যাঁচ’ শব্দে বর্ণিত ‘মার’ বাংলা ভাষার নিজস্ব কোনো শব্দ নয় এবং এর অর্থ বর্ণিত চারটির কোনোটিই ধারণ করে না। ‘মারপ্যাঁচ’ শব্দের ‘মার’ ফারসি হতে আগত। এর অর্থ সাপ। প্যাঁচ শব্দটিও ফারসি। এর অর্থ কুণ্ডলী। সুতরাং ‘মারপ্যাঁচ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সাপের কুণ্ডলী। সাপের কুণ্ডলী ভয়াবহ হোক বা না হোক, সাপ নামের মধ্যেই প্রাচীনকাল হতে কেমন একটা ভীতি বিরাজ করত। যেমন ভীতি বিরাজ করে ‘মারপ্যাঁচ’ শব্দে।

মারের সাগর
“আমি মারের সাগর পাড়ি দেব … ” এটা কোন সাগর? ‘মারের সাগর’ বলতে কবি এমন একটি স্থান/সাগর/প্রান্তর বুঝিয়েছেন যেটি ‘ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এবং যা পাড়ি দেওয়া জীবনযুদ্ধের ন্যায় কষ্টকর।’ ‘মার’ বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত সহজ ও বহুমাত্রিক অর্থদ্যোতক একটি শব্দ। যেকোনো সাধারণ অভিধানেও এর অর্থসমূহ দেওয়া আছে। ‘মার’ শব্দের সঙ্গে ষষ্ঠী বিভক্তি ‘র/এর’ যুক্ত হয়ে ‘মারের’ শব্দটির উৎপত্তি। এটি কোনো বিদেশি শব্দ নয়। ‘মার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘সাগর’ও নয়। তাহলে ‘মারের সাগর’ অর্থ হয়ে যায় ‘সাগর সাগর’।
এবার ‘মার/মারের’ শব্দের অর্থ কী দেখা যাক। মার (মারণ, মারা); মার = মর-হতে জাত। মারণ = মার (অন) যাতে। মারের = মার + এর। মারা = মার এর আধার যে। মার = বিরহীকে মারে যে (বিরহী-মারক)। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর বঙ্গীয় শব্দার্থকোষে সুস্পষ্টভাবে মার (মারের) অর্থ দেওয়া হয়েছে। মার = মারক, বিনাশক, ঘাতক, মারণ, তাড়ন, কাম, মৃত্য …ইত্যাদি; প্রহার, আঘাত, বিনাশ, শাসন, .., বিনাশ করা, বধ করা, প্রহার করা ইত্যাদি। ‘মারের সাগর’ মানে দুঃখময় সংসার, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগর, ভয়ঙ্কর সাগর, কষ্টময় জীবন। এখানে ‘মারের’ অর্থ শুধু সাগর নয়; মানুষকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়, অনেক বিরহ, ব্যথা, প্রিয়জনের মৃত্যু, বঞ্চনা ও বেদনা বহন করতে হয়। এ জীবনযুদ্ধই হচ্ছে ‘মার’ এবং মারের সাগর হচ্ছে এমন সংগ্রামমুখর সাগর। এখানে কবি ‘সাগর’ বলতে জীবনকে বুঝিয়েছেন এবং ‘মার’ শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন কঠিন ও সংগ্রামমুখর জীবন।

 

মার্কিন
‘মার্কিন’ শব্দটি এককভাবে পরিচিত না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাপকভাবে পরিচিত। আমেরিকা পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। বিশ্বে এমন লোক খুব কম আছেন যিনি আমেরিকার নাম শোনেননি। আমেরিকা আমাদের অনেকের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামে পরিচিত। আমেরিকানদের অনেকে মার্কিনি বলেন। আমেরিকান শব্দটি ইংরেজি শব্দ অসবৎরপধহ হতে এসেছে। আমেরিকান শব্দের আদ্যক্ষর এ (অ) ঝরে গিয়ে প্রথমে হয়েছে মেরিকান, যার অপভ্রংশ মার্কিন গধৎশরহ.

মালাউন
বাংলা একাডেমির ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’র পরিমার্জিত সংস্করণের ৯৮১ পৃষ্ঠায় ‘মালাউন’ শব্দের তিনটি অর্থ দেওয়া আছে ১. লানতপ্রাপ্ত; অভিশপ্ত; বিতাড়িত; কাফের। ২. শয়তান। ৩. মুসলমান কর্তৃক ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের লোককে প্রদত্ত গালিবিশেষ। অভিধানের ১০৫৪ পৃষ্ঠায় ‘লানত’ শব্দেরও তিনটা অর্থ দেওয়া আছে ১. অভিশাপ। ২. অপমান; লাঞ্ছনা; ভর্ৎসনা। ৩. শাস্তি।

মাস্তান
‘মাস্তান’ শব্দটি ফারসি থেকে বাংলায় আসে। ফারসি ‘মাস্তান্’ শব্দের অর্থ নেশাগ্রস্ত, মাতাল, দুর্বৃত্ত, গুণ্ডা ইত্যাদি। ফারসি ‘মাস্ত’ শব্দের অর্থও মাস্তানের মতো। উপমহাদেশে মুসলিম যুগে সুফি-দরবেশ, ঐশীপ্রেমে মত্ত, ভাবে-উন্মত্ত, জিকিরে-দেওয়ানা, বিবাগী ও খোদা-প্রেমে পাগল সুফিগণ নিজেদের ‘মাস্তান্’ বলা শুরু করেন। সাধারণ মানুষও বুঝে না-বুঝে সুফি-দরবেশগণকে ‘মাস্তান্’ বলতে শুরু করেন। ফলে পারস্যের দুর্বৃত্ত মাস্তান বাংলায় দরবেশ মাস্তানে পরিণত হয়। এভাবে ফারসি ‘মাস্তান্’ তার আদি অর্থ হারিয়ে ফেলে। সৌভাগ্যের কথা, এমনটি বেশি দিন থাকেনি। বাঙালিরা অল্পদিনের মধ্যে তাদের ভুল বুঝতে পারে। ফলে ফারসি ‘মাস্তান্’ তার আদি অর্থ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে ‘মাস্তান’ শব্দের বাংলা অর্থ উপদ্রবকারী, চাঁদাবাজ, বদমায়েশ, গুণ্ডা প্রভৃতি। মাস্তান বলতে এখন মধ্যযুগের মতো আর দরবেশ বোঝায় না।

মিছরি
‘মিছরি’ চিনি থেকে প্রস্তুত এক প্রকার মিষ্টান্ন। প্রকৃতপক্ষে ‘মিছরি’ হলো স্ফটিকের মতো দানাবাঁধা চিনি। প্রধানত চিনির তৈরি বলে মিছরি সাধারণত লালাভ সাদা রঙের হয়ে থাকে। হাইড্রোজ নামক রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে মিছরিকে সাদা করা হয়। তবে নানা প্রকার রঙ মিশিয়ে এটাকে বিভিন্ন রঙ দেওয়া হয়। বিভিন্ন ছাঁচে ঢালাই করে একে নানারকমের আকার দেওয়া হয়। ‘মিছরি’ নামের এ সুমিষ্ট শর্করাটি প্রথম মিসরে উৎপন্ন হয়েছে। এটি মিসর থেকে বণিক ও পর্যটকদের মাধ্যমে উপমহাদেশে আসে এবং ক্রমান্বয়ে এখানেও প্রস্তুত হতে থাকে। মিসর থেকে এসেছে বলে এর নাম হয় ‘মিসরি’, যা অপভ্রংশে ‘মিছরি’ নামে স্থিতি লাভ করে।

মিছিল
শব্দটির অর্থ মিছিল, পঙ্ক্তি, সারি প্রভৃতি। শব্দটির উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শব্দটি আরবি ভাষা হতে ফারসি হয়ে বাংলায় এসেছে। বাংলায় ব্যবহৃত মিছিল শব্দটি আরবি হতে ফারসি ভাষায় আগত ‘মিস্ল’ শব্দের মৌখিক রূপান্তর। মিস্ল শব্দের অর্থ সমজাতীয়, অভিন্ন রূপ, একই রকম, বিন্যস্ত, সমান, সমকক্ষ, সারি সারি প্রভৃতি। বাংলাতেও একসময় ‘মিছিল’ শব্দটি ফারসি মিস্্ল শব্দের অর্থ বহন করত। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে ‘মিছিল’ শব্দটি রয়েছে। এখানে ব্যবহৃত ‘মিছিল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে মোকদ্দমার কাগজপত্র, কাগজপত্রের ফাইল, নথি ইত্যাদি। মোকদ্দমার কাগজপত্র, ফাইল বা নথি প্রভৃতি বিন্যস্ত অবস্থায় রাখা হয় এবং অধিকন্তু একই নথিতে সমধর্মী বা সমপ্রকৃতির কাগজপত্র সজ্জিত করা হয়। এগুলো মিস্ল শব্দের অর্থকে অভিন্নভাবে নির্দেশ করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আড়তে গুড়ের কলসি ‘মিছিল’ করা হয়। এর অর্থ গুড়ভর্তি কলসিগুলো সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা বা বিন্যস্ত করা। এ গুড়ের কলসি মিছিলের সঙ্গেও কিন্তু ‘মিস্ল’ শব্দের অর্থের মিল রয়েছে। মোটরসাইকেল মিছিল, মোমবাতি মিছিল প্রভৃতি মিছিলেও সারি সারি ভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু এখন ‘মিছিল’ বলতে সারি, পঙ্ক্তি না-বুঝিয়ে রাস্তায় কোনো উদ্দেশ্যে বা দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে একাধিক মানুষের সম্মিলিত যাত্রা বুঝায়। এখানে মানুষের সারি বিন্যস্ত হোক বা না হোক তাতে কিছু যায় আসে না। মিছিল বলতে যা-ই বোঝানো হোক না কেন, বাংলার ‘মিছিল’ শব্দের সঙ্গে সমজাতীয়, অভিন্ন রূপ, একইরকম, সারি সারি, সমান, সমকক্ষ প্রভৃতি কম-বেশি বিভিন্নভাবে জড়িত। যখন কোনো মিছিল হয় তখন এগুলো মিছিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে যায়। সমজাতীয়, সারি সারি কিংবা সমকক্ষ না হলে তো আর মিছিল চলে না।

মিথিলা
প্রাচীন রাজ্য বিদেহের রাজধানী। এটি উত্তর বিহারে অবস্থিত। রাজা জনকের নগর হিসাবে প্রসিদ্ধ। এর অন্য নাম বিদেহ। এ জন্য মিথিলার রাজকন্যার নাম মৈথিলী বা বৈদেহী। বিশ্বামিত্র তাড়কাবধের সময় রাম ও লক্ষ্মণকে সঙ্গে করে মিথিলা গিয়েছিলেন।

মীরজাফর
একসময় মীরজাফর ছিল একটি নাম, এখন নাম নয়; শব্দ। ‘মীরজাফর’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক। একসময় মীরজাফর ছিল একটি খুব জনপ্রিয় নাম। মুসলিম শাসনামলে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদদৌলার পরাজয়ে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতামূলক ভূমিকার পূর্বে অনেকে তাদের সন্তানদের নাম রাখত মীরজাফর। মীরজাফর ছিলেন নবাব সিরাজউদদৌলার ভগ্নিপতি ও প্রধান সেনাপতি। নবাব আলীবর্দি খানের মৃত্যুর পর মীরজাফর প্রথমে ঘসেটি বেগম ও শওকতজঙ্গ প্রমুখের সঙ্গে ষড়্যন্ত্র করে নবাব সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করেন। সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীকালে মীরজাফর সাহেব মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ প্রমুখ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মীরজাফর নবাবের আসনে অধিষ্ঠিত হন। পরে মীরজাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে সিরাজকে হত্যা করা হয়। সিরাজের সেনাপতি হয়ে মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতামূলকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে কাজ করেছেন। তাঁর এ কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি বাংলার ইতিহাস ও সাহিত্যে বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থরূপে স্থায়ী হয়ে যান। মীরজাফর শব্দের বিশ্বাসঘাতকতা-অর্থ আর মুছবে না কখনো।

মুগ্ধ
‘মুগ্ধ’ শব্দের অর্থ মোহিত, বিহ্বল, বিভোর, অভিভূত, মনোহর প্রভৃতি। বাংলায় বহুল প্রচলিত হলেও ‘মুগ্ধ’ একটি সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় ‘মুগ্ধ’ শব্দের অর্র্থ মূঢ়, মোহগ্রস্ত বা মোহাবিষ্ট। মূঢ় শব্দের অর্থ অবিবেচক, বোকাচণ্ডি, বিবেচনাশূন্য, মূর্খ, আহাম্মক, নির্বোধ, তালমাল বোধহীন প্রভৃতি। মোহগ্রস্ত বা মোহবিষ্ট শব্দের অর্থ হচ্ছে বিবেকহীন, মোহ দ্বারা পরিচালিত বিবেচনাহীন ব্যক্তি। সুতরাং সংস্কৃত ভাষায় ‘মোহ’ শব্দের কোনো অর্থই নন্দিত নয়, সবগুলো অর্থই নিন্দিত, কেউ এমন অর্থ বহন করতে চায় না। কিন্তু বাংলা ভাষায় এসে শব্দটি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকার মতো আগ্রহে অভিভূত হয়ে উঠেছে। এর কারণ রয়েছে। আসলে কেউ কোনো কিছু দর্শনে মোহিত হয়ে গেলে, বিহ্বল হয়ে পড়লে তার কোনো বিবেচনাবোধ থাকে না। বিবেচনাশূন্য নির্বোধের মতো আচরণ করতে শুরু করে। তার অন্যতম প্রমাণ প্রেম। কেউ তার প্রেমিক বা প্রেমিকায় মুগ্ধ হয়ে কিংবা কোনো বস্তুর প্রতি মুগ্ধ হয়ে যে আচরণ করে থাকে সেখানে সংস্কৃত ‘মুগ্ধ’ শব্দের সবগুলো উপাদানই কিছু না কিছু পাওয়া যায়।

মুদ্রাদোষ
‘মুদ্রা’ ও ‘দোষ’ শব্দ নিয়ে মুদ্রাদোষ শব্দটি গঠিত। ‘মুদ্রা’ মানে টাকাপয়সা, অর্থ, সিলমোহর, ছাপ, হিন্দুদের দেবপূজাকালে বিভিন্ন ভঙ্গিতে করবিন্যাস, নাচের অঙ্গভঙ্গি, করতল বা পদতলের বিশেষ চিহ্ন প্রভৃতি। সুতরাং নানা কাজে ব্যক্তি বিশেষের বিভিন্ন মুদ্রা বা চিহ্ন বা অঙ্গভঙ্গি থাকে। সবার কথা বা বাচনভঙ্গি এক নয়। প্রত্যেকে একটি নিজস্ব মুদ্রা বা আঙ্গিকে আচরণ করে। তা হাতের, মুখের, চোখের বা শরীরের কিংবা স্বরবিস্তার, অঙ্গপরিচালনা যেকোনোভাবে হতে পারে। এ সব মুদ্রার অতি ব্যবহার কিংবা যে ব্যবহার অন্যের কাছে দোষের মনে হয় তা-ই ‘মুদ্রাদোষ’ হয়ে পড়ে। মুদ্রার সাথে ‘কর’ যোগ হলে হবে ‘মুদ্রাকর’ ছাপাখানায় যে বই ছাপায়; ‘-ক্ষর’ যোগ হলে ছাপবার টাইপ; ‘-ঙ্কন’ যোগ হলে সিল প্রভৃতির ছাপ; ‘-ঙ্কিত’ হলে ছাপযুক্ত; ‘-দোষ’ যোগ হলে একই বাচনভঙ্গি বা স্বভাবগত বাগ্ভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি করার কুঅভ্যাস; ‘বিজ্ঞান’ যোগ হলে ধনতন্ত্র; আর ‘-যন্ত্র’ যোগ হলে হবে ছাপা-কল যার অর্থ ‘মুদ্রাযন্ত্র’।

মুষ্টিমেয়
‘মুষ্টিমেয়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সামান্য, অল্পস্বল্প, একমুঠো, অল্পমাত্র প্রভৃতি। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে : সে পরিমাণ বস্তু, যা এক মুষ্টিতে ধারণ করা যায়। অর্থাৎ এক মুঠো পরিমাণকে মুষ্টিমেয় বলা হয়। কিন্তু প্রায়োগিক অর্থে মুষ্টিমেয় বলতে শুধু একমুঠো পরিমাণকে বুঝায় না। এক মুঠোর বেশি হোক বা কম হোক সামান্য পরিমাণ বোঝাতে ‘মুষ্টিমেয়’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। এর অন্য একটি অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে : যা প্রয়োজনের তুলনায় কম তা-ই ‘মুষ্টিমেয়’। অনেক সময় গণনার ক্ষেত্রেও ‘মুষ্টিমেয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন অনেককে বলতে শোনা যায়, ‘মুষ্টিমেয় লোক সভায় উপস্থিত হয়েছে’।

মুহূর্ত
খুব স্বল্প সময়ে, ক্ষণ প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে ‘মুহূর্ত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। কোনো বিষয়ে সময়ের স্বল্পতা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন মুহূর্তের মধ্যে বন্যায় সবকিছু শেষ হয়ে গেল। বিশাল শহরটি ভূমিকম্পের আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে ভূমিস্যাৎ হয়ে গেল। বাক্য দুটোতে ব্যবহৃত ‘মুহূর্ত’ শব্দটি একটি সময়জ্ঞাপক পদ। কিন্তু সময়টা কতক্ষণ? বাক্য দুটোয় একই শব্দ ব্যবহার করা হলেও বন্যা ও ভূমিকম্প একই সময়ে সবকিছু শেষ করে দেয়নি। এখানে সময়ের ব্যবধান থাকলেও একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ‘মুহূর্তে’র একটি সময়সীমা আছে। প্রাচীন ভারতীয় হিসাব মতে মুহূর্তের সময়কাল আটচল্লিশ মিনিট। কিন্তু বাগ্ভঙ্গিতে এটা আটচল্লিশ মিনিট বোঝায় না। এটা খুবই স্বল্পসময় বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। নিশ্চিতই আটচল্লিশ মিনিটের চেয়ে কম। ‘দেখতে না দেখতে মুহূর্তের মধ্যে বাসটি উল্টে নদীতে পড়ে গেল।’ এখানে বাসটি নদীতে উল্টে পড়তে কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগেনি। তবু ‘মুহূর্ত’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে।
মৃগতৃষ্ণা
‘মৃগ’ মানে হরিণ এবং ‘তৃষ্ণা’ মানে পিপাসা। উল্লেখ্য, মৃগ বলতে এখন শুধু হরিণ বোঝালেও একসময় মৃগ বলতে যেকোনো ধরনের পশুকে বোঝাত। সুতরাং ‘মৃগতৃষ্ণা’ মানে হরিণের পিপাসা বা পশুর পিপাসা। মরুভূমিতে প্রচণ্ড রৌদ্রতাপে বালির উপর প্রতিফলিত সূর্যকিরণ দূর থেকে স্বচ্ছ জলাশয়ের মতো মনে হয়। মরুভূমিতে জলাশয়রূপ এ-ভ্রান্তিকে বলা হয় ‘মরীচিকা’। মরুভূমিতে পিপাসায় কাতর মৃগ পানির খোঁজে বের হয়ে এদিক-ওদিক তাকালে অদূরে জলাশয়রূপ ভ্রান্তিকে প্রকৃত জল মনে করে ছুটে যেত। হরিণ যত এগিয়ে যায় জলাশয়ভ্রান্তি তত দূরে সরে যায়। তৃষ্ণায় কাতর মৃগ জলের আশায় আরও দ্রুত দৌড়ায়। মৃগ যত দ্রুত দৌড়ায় জলাশয়ভ্রান্তিও তত দূরে সরে যায়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে তৃষ্ণার্ত মৃগ কাতর হয়ে ঢলে পড়ে। তপ্ত রৌদ্রে ভীষণ কষ্টে অচিরে প্রাণ হারায়। মৃগের এ তৃষ্ণা নিবারণার্থে ছুটে চলা ভ্রান্তি ও মৃত্যুর কথা প্রকাশ করা হয় ‘মৃগতৃষ্ণা’ শব্দটির মাধ্যমে। তবে এখন শব্দটি শুধু মরীচিকা প্রকাশ করে না। ভ্রান্তির পেছনে ছুটে চলার মাধ্যমে জীবন ও সহায়সম্পদের ক্ষতিকেও বোঝানো হয়।

মৃগনাভি
কস্তুরি শব্দের মানে কী? সোজা উত্তর মৃগনাভি। ‘মৃগ’ মানে হরিণ। সুতরাং মৃগনাভি মানে হরিণের নাভি। তবে এর আভিধানিক অর্থ বলতে শুধু মৃগনাভি বোঝায় না। বাংলা অভিধানে মৃগনাভি = কস্তুরি। আবার কস্তুরি = মৃগনাভি।

মেমসাহেব
‘মেম’ ও ‘সাহেব’ শব্দ দুটোর সমন্বয়ে ‘মেমসাহেব’ শব্দটির উৎপত্তি। ‘মেমসাহেব’ শব্দের অর্থ ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান মহিলা, চাকরিদাতার স্ত্রী, মহিলা চাকরিদাতা, কেতাদুরস্ত মহিলা প্রভৃতি। ‘মেমসাহেব’ শব্দটার বহুমুখী ব্যবহার লক্ষণীয়। বাসগৃহে কর্মরত শ্রমজীবীরা তাদের মালিকের স্ত্রী বা মহিলা মালিককে মেমসাহেব ডাকে। আবার অনেকে সৌখিন ও কেতাদুরস্ত নাতনি বা নাতবউকেও ‘মেমসাহেব’ ডাকে। ইংরেজি সধফধস শব্দের সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ সধ’ধস থেকে বাংলায় ‘মেম’ শব্দের উৎপত্তি। ইংরেজ আমলে সাদা চামড়ার মহিলারা ‘মেম’ এবং সাদা চামড়ার পুরুষরা ‘সাহেব’ নামে অভিহিত হতো। সাহেবের স্ত্রী বা কন্যা বা প্রতিভূ হিসাবে মেমগণ ধীরে ধীরে মেমসাহেব হয়ে যায়। তৎকালে ‘মিসিবাবা’ নামের আর একটি শব্দ প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ গৃহভৃত্যরা ইংরেজ মালিকের কন্যাদের সম্মানসূচক ‘মিসিবাবা’ নামে ডাকত। ইংরেজি মিস্ অর্থাৎ অবিবাহিতা মেয়ে বোঝাতে ‘মিসিবাবা’। ব্রিটিশ রাজত্ব শেষ হলে ইংরেজি মহিলা তথা মেমগণ স্বদেশে ফিরে গেলে স্থানীয় ধনী ও প্রভাবশালী মহিলারা মেমসাহেবের শূন্যস্থান দখল করে নেয়। তবে ‘মিসিবাবা’ সম্বোধনটি এখন আর শোনা যায় না। তবে ‘মেমসাহেব’ বেশ শোনা যায়।

মেরাশিসমুদ্গারিণী
শব্দটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদে রয়েছে। ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ (২০১০ খ্রিস্টাব্দ)-এ, ১. সমুদগীর্ণ বিশেষণ, কৃতোদ্গার; বমিত। ২. উক্ত; উচ্চারিত; কথিত। এ থেকে সমুদ্গারিণী সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এবার দেখা যাক ‘মেরাশি’ শব্দের অর্থ। বঙ্কিমচন্দ্র হুঁকার বিশেষণ হিসাবে ব্যঙ্গ করে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন। লাইন দুটো হলো : ‘হে হুক্কে! হে আলবলে! হে কুণ্ডলাকৃত মেরাশিসমুদ্গারিণী!’ এখান থেকে ‘মেরাশি’ শব্দের অর্থ জানা যায়। “একজন ভৃত্য শ্রমহারী তামাকু প্রস্তুত করিয়া আলবলা আনিয়া সম্মুখে দিল; দেবেন্দ্র কিছুকাল সেই সর্বশ্রমসংহারিণী তামাকুদেবীর সেবা করিলেন। যে এই মহাদেবীর প্রসাদসুখভোগ না করিয়াছে, সে মনুষ্যই নহে। হে সর্বলোকচিত্তরঞ্জিনী বিশ্ববিমোহিনী! তোমাতে যেন আমাদের ভক্তি অচলা থাকে। তোমার বাহন আলবলা, হুঁক্কা, গুড়গুড়ি প্রভৃতি দেবকন্যারা সর্বদাই যেন আমাদের নয়নপথে বিরাজ করেন, দৃষ্টিমাত্রেই মোক্ষলাভ করিব। হে, হুঁক্কে! হে আলবলে! হে কুণ্ডলাকৃতধূমরাশিসমুদ্গারিণী!” শব্দাংশটি মেরাশি নয়, বরং ধূমরাশি। সুতরাং মেরাশি শব্দের অর্থ ধূমরাশি।

মৌজ্
‘মৌজ্’ শব্দের বর্তমান প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ আনন্দ, উল্লাস, মহাসমারোহ, নেশাগ্রস্ততা। ‘মৌজ্’ কিন্তু আরবি শব্দ। আরবি ভাষায় শব্দটির অর্থ ঢেউ। এখন দেখা যাক, আরবের ঢেউ কেন বাংলায় আনন্দ-উল্লাস হয়ে গেল। আরবে নদী ছিল না, মরুভূমির তপ্ত হাওয়ায় আরবীয়রা ছিল সর্বক্ষণ ম্লান, অতিষ্ঠ। তাদের কাছে নদী ছিল স্বপ্ন। তাই স্বর্গকে আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করে গড়ে তোলার জন্য স্বর্গের পরতে পরতে রাখা হয়েছে নির্ঝরিণী। আরবের লোকেরা ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বণিক বা ধর্মপ্রচারক হিসাবে উপমহাদেশে এসেছে। এখানে এসে তারা নদীর ঢেউ দেখে মৌজ মৌজ স্বপ্নে গভীর আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠেছিল। এভাবে আরবের ঢেউ বাংলায় উল্লাসে পরিণত হয়। আসলে ‘ঢেউ’ বাংলা সাহিত্যে এক মোহনীয় শব্দ। কবি-সাহিত্যিকগণের ভাষায় ‘ঢেউ’ কমনীয়রূপে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। নদীর ঢেউয়ে তারা দেখেছে আনন্দ এবং মনের ভেতর উদ্বেল হয়ে ওঠা রূপের মাধুর্য। ঢেউ প্রেম-সারথি হয়ে যুগ যুগ ধরে বাংলা মায়ের সন্তান-সন্ততিদের হারিয়ে দিয়েছে উল্লাসের মহাসমারোহে। এমন একটা প্রাকৃতিক বিষয় তো মৌজময় হয়ে থাকারই কথা।

ম্যাগাজিন
‘ম্যাগাজিন’ শব্দের অর্থ সাময়িক পত্রিকা, পাঁচমিশালি বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান, কার্তুজের কুঠরি, অস্ত্রভাণ্ডার প্রভৃতি। আরবি ‘মাখ্জান্’ শব্দ হতে ইংরেজি ‘ম্যাগাজিন’ শব্দের উৎপত্তি। ‘মাখ্জান্’ শব্দের অর্থ ভাণ্ডার। ইংরেজি ভাষা শব্দটিকে এ অর্থে গ্রহণ করেছিল কিন্তু তা করেছিল শব্দটির সামরিকীকরণের মাধ্যমে। যন্ত্রপাতি, গোলাবারুদ ইত্যাদির ভাণ্ডার এবং রাইফেল ও রিভলবারের কার্তুজ কুঠরি প্রভৃতি বোঝাতে ইংরেজরা ‘ম্যাগাজিন’ শব্দটি গ্রহণ করে।
১৭৩১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন থেকে ‘ঞযব এবহঃষবসধহ’ং গধমধুরহ’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের সূত্রে ‘ম্যাগাজিন’ শব্দটি নতুন তাৎপর্য লাভ করে। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে জানানো হয় “এটি অস্ত্রভাণ্ডার নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অপূর্ব তথ্যভাণ্ডার। প্রতিমাসে এ ভাণ্ডারে অজ্ঞতা নাশ করার জন্য জ্ঞানের বিভিন্ন অস্ত্র জমা হতে থাকবে। এ জন্যই এটির নাম ম্যাগাজিন রাখা হলো।” সম্পাদকীয়টি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরপর থেকে ‘ম্যাগাজিন’ শব্দটি নতুন সাময়িক পত্রিকা, পাঁচমিশালি বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান প্রভৃতি অর্থেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!