বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

অর্পণা
হিমালয়ের স্ত্রী মেনকা হতে অর্পণার জন্ম। অর্পণা শিবকে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যায় রত হলে তার জননী মেনকা স্নেহার্দ্রস্বরে বললেন “উ-মা”। অর্থাৎ হে পার্বতী, তপস্যা কর না। সে হতে অর্পণার অন্য নাম হয় উমা। তপস্যার সময় উমা অনাহারে থাকতেন, এমনকি গলিত পত্রও ভক্ষণ করতেন না। এ জন্য তাঁর আর এক নাম অর্পণা। পরবর্তীকালে শিবের সঙ্গে অর্পণার বিয়ে হয়েছিল।

অলক্ষ্মী
‘অলক্ষ্মী’ শব্দটির অর্থ দুর্ভাগিনী বা দুর্ভাগ্য-আনয়নকারী নারী। হতভাগ্য নারীদের প্রতি গালি বা কটাক্ষ প্রকাশেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। দারিদ্র্য ও শ্রীহীন বোঝাতে বলা হয় ‘অলক্ষ্মীর দশা’। কোনো ব্যক্তি বা সংসারে দুর্ভাগ্য কাউকে বারবার বিপর্যস্ত করলে বলা হয় ‘অলক্ষ্মী লেগেছে’। ভারতীয় পুরাণে ভাগ্যের দেবী লক্ষ্মী এবং দুর্ভাগ্যের দেবী অলক্ষ্মী। অলক্ষ্মী হচ্ছে ভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর বড় বোন। সমুদ্র মন্থনকালে তিনি লক্ষ্মীর সঙ্গে উঠে এসেছিলেন। তাঁর মূর্তি নিকষ কালো, পরিধেয় বস্ত্রও ছিল ঘোর কালো। লোহার অলঙ্কারে আচ্ছন্ন অলক্ষ্মীর সর্বাঙ্গে ছিল কাঁকরের রেণু এবং হাতে ছিল ঝাঁটা। গর্দভ ছিল তাঁর বাহন। ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করা ও মানুষের মধ্যে দুর্ভাগ্য ঢেলে দেওয়া ছিল তাঁর কাজ। সমুদ্র থেকে আবির্ভূত হলেও কেউ তাঁকে গ্রহণ করেনি। অনেক পরে দুঃসহ নামের এক মহাতপা মুনি অলক্ষ্মীকে বিয়ে করেন।
দুঃসহ মুনি নিজেও অন্যান্যদের নিকট দুঃসহ ছিলেন। তবু তিনি অলক্ষ¥ীর যাতনা সহ্য করতে না-পেরে তাঁকে (অলক্ষ্মীকে) পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন। অতঃপর স্বামী পরিত্যাক্তা অলক্ষ্মী মর্ত্যে তাঁর বাসস্থান কোথায় হবে তা দেবতাগণের কাছে জানতে চান। দেবতারা বললেন, যেখানে সর্বদা কলহবিবাদ সেখানে তুমি বাস করবে, যে ব্যক্তি কপটচারী, দুর্ভাগা, কদাচারী, মিথ্যুক, অন্যের অনিষ্টকারী, তুমি তাকে অবলম্বন করতে পারবে। তবে যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিত্য কলহ লেগে থাকে, চেপে আছে প্রবল অবিশ্বাস সে ঘরে তুমি মহানন্দে বাস করতে পারবে। এরপর বাসস্থান খুঁজে পেতে তার আর কোনো অসুবিধা হয়নি। অলক্ষ্মী দেখতে পায় মর্ত্যে তার মতো অবারিত বাসস্থান আর কোনো দেবতার নেই। পৌরাণিক এ দুঃসহ নারী চরিত্র থেকে বাংলা বাগ্্ভঙ্গি ‘অলক্ষ্মী’র উৎপত্তি। তবে বাংলা বাগ্্ভঙ্গির অলক্ষ্মী’ পুরাণের মতো এত ভয়ঙ্কর নয়। অনেক সময় ‘অলক্ষ্মী’ শব্দটি প্রিয়জনদের প্রতি আদুরে গালি হিসাবেও ব্যবহার করা হয়।

অলিগলি
‘অলিগলি’ শব্দটির অর্থ ছোট ছোট পথ, সংকীর্ণ পথ, গলিঘুঁজি, গুপ্তপথ ইত্যাদি। সাধারণভাবে শহরের সংকীর্ণ বা সরুপথ বা গলিঘুঁজিসমূহ অলিগলি নামে পরিচিত। গ্রামে গলিপথ শব্দটি প্রায় অপরিচিত, কারণ গ্রামে গলিপথ নেই। শহরে গলিপথ দেখা যায়। যতবড় শহর ততবেশি গলিপথ। ‘অলি’ ও ‘গলি’ এ দুটো শব্দের সমন্বয়ে অলিগলি শব্দটি গঠিত হয়েছে। বাংলায় ‘অলি’ শব্দের অর্থ ফুল, কোকিল, কাক, বৃশ্চিক প্রভৃতি। তবে অলিগলির ‘অলি’ কিন্তু বাংলা ‘অলি’ নয়। এটি ইংরেজি শব্দ। গলি শব্দটি গুজরাটি। ইংরেজি ‘অলি’ ও গুজরাটি ‘গলি’ মিলে হয়েছে বাংলা ‘অলিগলি’। মূলত ইংরেজি অলি (অষষবু) শব্দের অর্থ অপেক্ষাকৃত ছোট পথ এবং গুজরাটি গলি শব্দের অর্থও প্রায় অভিন্ন। তবে ইংরেজি অলি গুজরাটি গলির চেয়ে কিছু প্রশস্ত। এ অলিগলি মিলে বাংলায় হয়েছে অলিগলি, যা অনেকাংশে গুজরাটি ‘গলি’ অর্থকে ধারণ করেছে।

অল্প
বাংলা ভাষায় ‘অল্প’ একটি বহুল প্রচলিত ও বহুমাত্রিক অর্থদ্যোতক শব্দ। ঈষৎ, কিঞ্চিৎ, পরিমিতবিষয়ক, অকিঞ্চিৎকর, লঘু, সামান্য, পরিমিত, ষবংং বা কম অর্থ বোঝাতে; সীমায়িত বস্তু বা ব্যাপার, যার বৃদ্ধি বা বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ আছে, বারণ করা আছে, তাই অল্প অর্থাৎ ঈষৎ কম প্রভৃতি অর্থ বোঝাতে ‘অল্প’ শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। বহু কারখানায় মালিকের ইচ্ছেমতো উৎপাদন করার অধিকার নেই। কত উৎপাদন করা হবে তা সরকার বলে দেয় অথবা সরকারের নিকট থেকে অনুমতি নিতে হয়। ফলে তাদের উৎপাদন অল্প; একালের ভাষায় ংধহপঃরড়হবফ, বা সীমিত পরিমাণ। এ রকম বিষয়কে পূর্বে ‘অল্প’ বলা হতো, পরে তা প্রাসঙ্গিক বিষয় ছাড়িয়ে অপ্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে যায়। স্মর্তব্য, অল্প কিন্তু কম নয়, কম-এর চেয়ে বেশি। বঙ্গীয় শব্দার্থকোষে কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী অল্প শব্দের বিবর্তন ও আন্তর্জাতিকতার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ‘ধষঢ় = অনতি-উচ্চ পর্বত বা অল্প-পর্বত। হিমালয়ের তুলনায় সুইজারল্যান্ডের পাহাড় অনতি-উচ্চ বা অল্প সেজন্যই ল্যাটিন ভাষায় তাকে ধষঢ়বং এবং ইংরেজি ভাষায় ধষঢ়ং বলা হয়েছে। হতে পারে প্রাচীনকালে হিমালয়-দ্রষ্টা ভারতের কেউ সুইজারল্যান্ডে গিয়ে পর্বতটিকে ঐ নাম দিয়েছে অথবা সুইজারল্যান্ডের কেউ ভারতে এসে হিমালয় দেখে ফিরে যাবার পর পর্বতটিকে ঐ নাম দিয়ে থাকবে।’

অশ্বত্থামা
১. অশ্ব, স্থা = স্থিতি। ২. অশ্বের ন্যায় স্থাম (শৌর্যাদি) যাঁর; ৩. কৃপী-গর্ভজাত দ্রোণপুত্র। ইনি জন্মমাত্র উচ্চৈঃশ্রবার ন্যায় রব করেছিলেন এবং তাঁর বল দিগ্বিদিক ব্যাপ্ত করেছিল। এ জন্য তাঁর নাম অশ্বত্থামা। অশ্বত্থামা কুরুপক্ষীয় যোদ্ধা ছিলেন। তাঁর প্রধান কীর্তি অভিমন্যুবধ, রাত্রিতে সুপ্ত পাণ্ডবশিবিরে দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নাদির বিনাশ, ব্যাসাশ্রমে পাণ্ডববধার্থ ব্রহ্মশির অস্ত্র ত্যাগ, সে-অস্ত্রে পাণ্ডবের নিকট প্রাণপ্রতিদান। ভারতীয় পুরাণ মতে, অশ্বত্থামা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চৈঃশ্রবা অশ্বের মতো হ্রেষা রব করেছিলেন। তাই তিনি অশ্বত্থামা নামে অভিহিত হন।

অশ্বমেধ
প্রাচীন ভারতের অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ কঠিন এক যজ্ঞ। শ্রেষ্ঠ রাজাগণ পুত্রলাভ বা রাজচক্রবর্তী হয়ে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এ যজ্ঞ সম্পন্ন করতেন। নিরানব্বইটি যজ্ঞ করার পর অতি সুলক্ষণযুক্ত অতি দুর্লভ ক্ষমতা ও মোহনীয় দেহাবয়বের অধিকারী প্রচণ্ড বেগবান এবং সুগন্ধযুক্ত অশ্বের কপালে জয়পত্র বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হতো। ওই অশ্বের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজা সসৈন্যে অশ্বের অনুগামী হতেন। এ অশ্ব বছরকাল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করত। অশ্বের অগ্রগতি কোনো রাজা রোধ করতে এলে প্রমাণ হতো যে, তিনি অশ্বাধিকারীর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন না। তখন যুদ্ধের মাধ্যমে উভয়ের শক্তি পরীক্ষা হতো। ভিন্ন রাজ্যে অশ্ব প্রবেশ করলে সে রাজ্যের রাজাকে যুদ্ধ করতে হতো অথবা অশ্বাধিকারীর বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হতো। এভাবে অশ্বের অধিকারী রাজা অন্য সব রাজাকে বশ্যতা স্বীকার করাতে পারলে মহাসম্মানসূচক ‘রাজচক্রবর্তী’ উপাধি লাভ করতেন। এক বছর পর অশ্ব দেশে ফেরত আসার পর শাস্ত্রানুসারে যজ্ঞের আয়োজন শুরু করা হতো। যূপবদ্ধ অশ্বটিকে শাস্ত্রমতে ব্রাহ্মণগণ বধ করতেন। রাতে রাজপত্নীবর্গ অশ্বের মৃতদেহ রক্ষা করতেন। অশ্বের বক্ষঃস্থলের চর্বি আগুনে দগ্ধ করে যজ্ঞ-দীক্ষিত রাজা ধূম আঘ্রাণ করতেন। অশ্বদেহের অন্যান্য অংশ অগ্নিতে আহুতি দিয়ে হোম করা হতো। যজ্ঞ শেষে ব্রাহ্মণদের নানা দক্ষিণা এবং নিমন্ত্রিত নৃপতি ও অন্যান্য অতিথিগণকে যথাযোগ্য উপহার দিয়ে বিদায় করা হতো। হিন্দুধর্মে বিশ্বাস এ যজ্ঞের ফলে যজ্ঞকারী সর্বপ্রকার পাপ ক্ষয়, স্বর্গ ও মোক্ষ লাভ করেন। শত অশ্বমেধযজ্ঞকারী রাজা ইন্দ্রত্ব লাভ করতেন। এজন্য ইন্দ্রের আর এক নাম শতক্রতু। রামচন্দ্র ও যুধিষ্ঠির উভয়ে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন।

অশ্বিনী
একটি নক্ষত্রের নাম হলেও ভারতীয় পুরাণ মতে ইনি দক্ষ-প্রজাপতির কন্যা ও চন্দ্রের স্ত্রী। এ নক্ষত্রের আকৃতি অশ্বের মস্তকের মতো। এ জন্য এর নাম অশ্বিনী। এ নক্ষত্র আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাতে অবস্থান করে বলে, এ মাসের নাম আশ্বিন। চন্দ্রের সাতশ’ জন স্ত্রীর মধ্যে অশ্বিনী প্রথম।

অষ্টধাতু
শব্দটির অর্থ আট ধাতু বা আটটি ধাতুর মিশ্রণ। এই আট ধাতু হলো : সোনা, রুপা, তামা, পিতল, কাঁসা, রাং, সিসা ও লোহা। এ আট ধাতুর মিশ্রণকে বলা হয় অষ্টধাতু। এদেশে একসময় অষ্টধাতুর মাদুলির বহুল প্রচলন ছিল। রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে সর্বত্র অষ্টধাতুর মাদুলি বিক্রি হতো। সাধারণ জনগণের বিশ্বাস ছিল, এ মাদুলি দুরারোগ্য ব্যাধি হতে মুক্তি দিতে সহায়ক একটি অলৌকিক বস্তু। তাই এর বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। এখন অবশ্য বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রসারের কারণে অষ্টধাতুর মাদুলির সে জনপ্রিয়তা আর নেই। তবে এখনও শহরে, গ্রামে, ট্রেনে, বাস স্টেশনে, ফুটপাতে অষ্টধাতুর মাদুলি বিক্রি হতে দেখা যায়। বিক্রিও হয় ভালো।

অষ্টম খষ্ট মিটিয়ে তবে নষ্ট কোষ্ঠী উদ্ধার
বাগ্্ভঙ্গিটির আভিধানিক অর্থ সবচেয়ে জরুরি ও প্রয়োজনীয় কাজটা আগে সম্পাদন করা উচিত। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের অষ্টম আইন অনুসারে নির্দিষ্ট দিনে খাজনা দিতে না-পারলে জমিদারি নিলামে উঠত। এ ভয়ঙ্কর আইন হতে প্রবাদটির জন্ম। প্রথমে গুরু দায় হতে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা উচিত, তারপর অন্য কাজ। যে কাজ অতি জরুরি সেটি সম্পন্ন করার পর অন্য কাজে হাত দেওয়া উচিত। নইলে আম ও ছালা দুটোই চলে যেতে পারে। অষ্টম আইন অনুসারে খাজনা দেওয়াই সর্বাপেক্ষা জরুরি। নইলে জমিদারি চলে যেতে পারে। নষ্ট কোষ্ঠী উদ্ধারের কাজ খাজনা দেওয়ার পর করলেও চলে। কিন্তু কেউ যদি নষ্ট কোষ্ঠী উদ্ধার করতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করতে ভুলে যায় তা হলে তার জমিদারি আর কোষ্ঠী সবটাই শেষ হয়ে যায়।

অষ্টাবক্র
অষ্টাবক্র বলতে আভিধানিকভাবে তাকে বোঝায় যার শরীরের গঠন আঁকাবাঁকা, বেয়াড়া ছাঁদের, উদ্ভট দৈহিক গড়নের অধিকারী। ভারতীয় পুরাণের বিখ্যাত মহর্ষি ও সংহিতাকার অষ্টাবক্রের নাম হতে বাংলা এ বাগ্্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। মহর্ষি উদ্দালকের কাহোড় নামের এক শিষ্য ছিল। তিনি কাহোড়ের সঙ্গে নিজ কন্যা সুমতির (অন্য নাম সুজাতা) বিয়ে দেন। গর্ভবতী হওয়ার পর গর্ভস্থ বালক শ্র“তি দ্বারা সর্ববেদজ্ঞ হয়ে ওঠেন। গর্ভস্থ শিশু একদিন পিতা কাহোড়ের বেদপাঠ অশুদ্ধ বলায় কাহোড় ক্রুদ্ধ হয়ে পুত্রকে অভিশাপ দেন যে, ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে যার স্বভাব এত বক্র, ভূমিষ্ঠ হলে তার দেহের অষ্ট স্থান বক্র হবে। অভিশাপমতে গর্ভস্থ শিশু অষ্টবক্রে বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মায়।

অসুর
বেদের প্রাচীন বর্ণনা মতে ‘অসুর’ অর্থ দেবতা। পারসিক আবেস্তায় যাদের বলা হয় ‘আহুর’। দেবতা হিসাবে ইন্দ্র, অগ্নি ও বরুণকে অসুর বলা হতো। পরবর্তীকালে ঘটনাচক্রে এর অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। যারা দেবতার সঙ্গে বিরোধ করে, যারা সমুদ্রমন্থনে উত্থিত অমৃত পাননি তারাই অসুর অভিহিত হয়। ঋক্বেদের শেষে এবং অথর্ববেদে যারা দেবতা-বিরোধী এবং যাদের সুধা নেই তারা অসুর হিসাবে চিহ্নিত হয়। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে আছে : প্রজাপতির নিঃশ্বাস একবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এ প্রাণবন্ত নিঃশ্বাস হতে অসুরদের সৃষ্টি। বিষ্ণুপুরাণ মতে ব্রহ্মার জঙ্ঘা হতে অসুরদের সৃষ্টি হয়েছিল। অসুরদের তিনটি ইন্দ্র হচ্ছে : হিরণ্যকশিপু, বলি ও প্রহ্লাদ। যে সব অসুর দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিহত হতেন তাঁরা পৃথিবীতে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করে নানাপ্রকার বিপদ সৃষ্টি করতেন। দৈত্য, দানব এবং কশ্যপের বংশধরগণ এ শ্রেণির অসুর। ভারতীয় পুরাণ মতে, অসুর রাত্রি ও অন্ধকারের প্রতীক। তাঁরা পূজা ও যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান ধ্বংস করতেন।

অস্ত্রশস্ত্র
এটি একটি বহুবচনাত্মক শব্দ। এর অর্থ সমুদয় অস্ত্র, নানাবিধ অস্ত্র, সব রকমের অস্ত্র। অস্ত্র ও শস্ত্র দুটো আলাদা শব্দ। শব্দ-দুটোর মিলনে অস্ত্রশস্ত্র শব্দটির উৎপত্তি। অস্ত্র শব্দের অর্থ হলো এমন একটি যন্ত্র যা হাতে ধরে রেখে আঘাত করতে হয়। যেমন তরবারি, গদা, লাঠি প্রভৃতি অস্ত্র। দ্বিতীয় শব্দটিও এককালে স্বাধীন শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হতো। যেমন শস্ত্রপাণ, তবে এখন শব্দটির স্বাধীন কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি অস্ত্র শব্দের পরে বসে অস্ত্রকে বহুবচনে পরিণত করেছে। অস্ত্র শব্দের অর্থ হাত দিয়ে আঘাতযোগ্য অস্ত্র হলেও তার সঙ্গে শস্ত্র শব্দ যুক্ত হওয়ায় তার অর্থ হয়েছে সব ধরনের অস্ত্র।

অহংকার
‘অহংকার’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ গর্ব, বড়াই, অহমিকা, হামবড়ামি। সংস্কৃত এ শব্দটির সঙ্গে অহংকার, অহমিকা, অহমহমিকা প্রভৃতি সংস্কৃত শব্দ সমার্থক। মূলত সংস্কৃত ‘অহমহমিকা’ শব্দ হতে অহমিকা শব্দের উৎপত্তি। অহমহমিকা শব্দের অর্থ দুজনের মধ্যে পরস্পর আমিই বড়, আমিই শ্রেষ্ঠ, আমিই উত্তম এমন হামবড়া ভাব ও অযৌক্তিক দাবি। সর্বক্ষণ নিজেকে বড় ভাবা এবং অন্যকে নিজের তুলনায় ছোট মনে করাই হচ্ছে অহংকার। যার মনে এমন বোধ ও চেতনা থাকে সে অহংকারী। অহংকার সর্বক্ষণ একজন মানুষকে আত্মশ্রেষ্ঠত্বে বিভোর রাখে বলে সে কখনো শান্তি পায় না। অহংকার নিয়ে বাংলা ভাষায় অনেক চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহী কবিতা রয়েছে। ‘কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ভাই বলে যদি ডাকো গলা দেব টিপে’; আনারস কাঁঠালকে বলে তুমি বড় খসখসে; ছালুনি বলে সুঁই, তোমার মাথায় ছ্যাঁদা। এগুলো সব অহংকারীর স্বভাব-প্রকাশক উক্তি।

অহিনকুল
শব্দটির অর্থ চিরশত্র“তা, চিরস্থায়ী শত্র“তা। অহি শব্দের অর্থ সাপ, নকুল শব্দের অর্থ বেজি। প্রাণিকুলে সাপ ও বেজি পরস্পর চিরশত্র“। প্রাণিকুলের মতো মানুষের মাঝেও পরস্পর শত্র“তা বোঝানোর জন্য অহিনকুল শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সাপ ও বেজির মধ্যে শত্র“তা মেনে নেওয়া যায়, কারণ তারা প্রাণিকুলের ভিন্ন দুটি জাত। কিন্তু প্রাণিকুলের অভিন্ন জাত হয়েও মানুষের সঙ্গে মানুষের শত্র“তা মেনে নেওয়া যায় না। হয়তো এজন্যই পশুর ওপরে দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!