বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ত্রয়োবিংশ অধ্যায়

যজুর্বেদ
শত শাখাযুক্ত বেদ। এতে যজ্ঞানুষ্ঠানের মন্ত্রসমূহ ও নিয়ম পালনের মন্ত্রসমূহ নানাবিধ বিবরণসহ বর্ণিত আছে। এ বেদ কৃষ্ণযজুঃ ও শুক্লযজুঃ নামে দুই ভাগে বিভক্ত।

যজ্ঞ
‘যজ্ঞ’ আর্য জাতির প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দেবতার উদ্দেশে কোনো দ্রব্য দান করাকে ‘যজ্ঞ’ বলা হয়। ব্রাহ্মণগ্রন্থসমূহ প্রধানত যজ্ঞের বিবরণে পূর্ণ। কোন যজ্ঞে কী অনুষ্ঠান কর্তব্য, তা ব্রাহ্মণগ্রন্থসমূহে বিধৃত আছে। ইন্দ্র, অগ্নি, বিষ্ণু, রুদ্র প্রমুখের উদ্দেশে কোনো না কোনো দ্রব্য ত্যাগ করা হতো। এ ধরনের ত্যাগকে ‘আহূতি’ বলা হয়। যে দ্রব্য ত্যাগ করা হতো তার নাম ‘হব্য’। এ দ্রব্য ত্যাগের নাম ‘যাগ’। যে গৃহস্থের কল্যাণে যাগ অনুষ্ঠিত হতো তিনি ‘যজমান’। যিনি যজমানের হিতার্থে এ যাগকর্ম সম্পাদন করতেন তিনি যাজক বা ‘ঋত্বিক’। ঘৃত, চরু বা পায়সান্ন, দুগ্ধ, দধি, রুটি, পশুর মাংস, সোমলতার রস প্রভৃতি হব্যরূপে দেওয়া হতো।

যত দোষ নন্দ ঘোষ
এ বাগ্ধারাটি শ্রীকৃষ্ণের পালকপিতা নন্দ গোয়ালা বা ঘোষের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষ্ণকৃত বা তৎসময়ে সংগঠিত সকল অঘটনের দায় বর্তাত নন্দ ঘোষের কাঁধে। আবার অনেকে মনে করেন রাজা নন্দকুমার হতে এই বাগ্ধারাটির উৎপত্তি।
“রাজা নন্দকুমার ছিলেন নবাব সিরাজউদদৌলার অধীনে হুগলীর গভর্নর এবং লর্ড ক্লাইভের আমলে তিনি কালো কর্নেল নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। কারণ তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতি বিশেষভাবে অনুগত ছিলেন। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চে তিনি কাউন্সিলের সদস্য ফ্রান্সিস-এর কাছে একটি চিঠিতে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আনয়ন করেন। তিনি উল্লেখ করেন গুরুদাসকে দেওয়ান নিযুক্ত করার বিনিময়ে ১,০৪,১০৫ রুপি এবং মুন্নু বেগমকে নাবালক নবাব মুবারক-উদ-দৌলার অভিভাবক নিয়োগের বিনিময়ে ২,৫০,০০০ রুপি ঘুষ গ্রহণ করেন হেস্টিংস। কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়। কাউন্সিল ঘুষ হিসাবে গৃহীত টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রতি নির্দেশ দেন। এ ঘটনার কয়েক মাস পর গভর্নর জেনারেল এবং বরওয়েল-এর উদ্যোগে ফক্স এবং রাধাচরণের সঙ্গে নন্দকুমারকে ষড়যন্ত্রের অপরাধে গ্রেফতার করা হয়।
ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি নন্দকুমারের নামে জালিয়াতির মামলা করা হয়। প্রধান বিচারপতি ইলিজা ইমপে ছিলেন হেস্টিংসের বন্ধু। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জুন নন্দকুমারকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার আদেশ দেওয়া হয়। নন্দকুমারের আইনজীবী ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই জুন হতে ৪ঠা জুলাই পর্যন্ত নন্দকুমারের জীবন রক্ষার্থে প্রিভি কাউন্সিলে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এবং প্রিভি কাউন্সিলের রায় না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর না করার জন্য দরখাস্ত করেন। সুপ্রিম কোর্ট এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। নবাব একটি পত্রে প্রিভি কাউন্সিলের রায় না পাওয়া পর্যন্ত দণ্ডাদেশ না পালনের অনুরোধ করেন। সে অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করা হয়। অবশেষে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ই আগস্ট সকাল ৮টায় ফোর্ট উইলিয়ামের নিকটবর্তী কুলিবাজারে নন্দকুমারের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়। ‘যত দোষ … নন্দ ঘোষ?’

যথেষ্ট
প্রচুর, অনেক, খুব, ঢের প্রভৃতি। ‘যথা’ ও ‘ইষ্ট’ শব্দ হতে ‘যথেষ্ট’ শব্দের উৎপত্তি। ‘যথা’ শব্দের অর্থ যা, এবং ‘ইষ্ট’ শব্দের অর্থ মঙ্গলজনক বা কল্যাণকর। সুতরাং ‘যথেষ্ট’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সে বিষয় যা কল্যাণকর বা মঙ্গলজনক। এটি বললাম ব্যাকরণগত অর্থ। কিন্তু ‘যথেষ্ট’ শব্দের প্রচলিত ও অভিধানগত অর্থ হচ্ছে প্রচুর, অনেক, খুব, বেশি, ঢের। তো কেন এ পরিবর্তন? বাঙালিরা তাদের মাটি আর সবুজ প্রান্তরের মতো সরস এবং আবেগপ্রবণ। এ শব্দটির পরিবর্তনের সঙ্গে বাঙালির মননশীলতা ও মানুষের স্বাভাবিক ইচ্ছার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। প্রচুর পেলে মানুষ সন্তুষ্ট হয়, সম্পদ বেশি হওয়া মানে অধিক মঙ্গল। পেট পুরে খেতে কে না চায়। সুতরাং যা মঙ্গল করে তা হচ্ছে অধিক, বেশি, অনেক। এ সতত ইচ্ছাটির কারণে ‘যথেষ্ট’ শব্দটির অর্থের পরিবর্তন ঘটেছে। তবে যথেষ্ট অধিকাংশ ক্ষেত্রে মঙ্গলজনক হলেও সবসময় কিন্তু নয়। যেমন যথেষ্ট হয়রানির শিকার হওয়া কি মঙ্গলজনক? কিন্তু সেটিও তো ‘যথেষ্ট’।

যবন
প্রাচীন ভারতে আলেকজান্ডার পরিচিত ছিলেন যবনরাজ হিসাবে। বেদ-বিশ্বাসী ভারতীয়দের কছে বেদ-অবিশ্বাসী বিদেশি মাত্রই ছিল যবন। শব্দটি খাঁটি সংস্কৃত বলে মনে হয় না। এর ব্যুৎপত্তি [যু + অন (যুচ)-ক]; অর্থ বৈদেশিক, বর্বর, ইউরোপীয়, ইংরেজি, মুসলমান, গ্রিক বা আইওয়ানবাসী ও বেগবান অশ্ব প্রভৃতি। প্রাচীন ভারতীয়দের কাছে ম্লেছ ও যবন সমার্থক। বৌধায়নশাস্ত্রে বলা হয়েছে, ম্লেছরা গোমাংস ভক্ষক, বিরুদ্ধভাষী সর্বাচারহীন অন্ত্যজ জাতি। এ থেকে অনুমান করা যায়, ভারতীয়রা গোমংস ভক্ষণ পরিত্যাগ করার পর ম্লেছ শব্দটির উৎপত্তি।
কালিদাস যবন বলতে গ্রিকদের বুঝিয়েছেন। আইওনিয়া (ওড়হরধ) বা প্রাচীন গ্রিস ‘যবন’ শব্দের মূল উৎস। আইওনিয়া ফারসিতে ‘ইউনান’ বা ‘য়ুনান’। এ ইউনান বা য়ুনান থেকে সংস্কৃত ‘যবন’ শব্দের উৎপত্তি। প্রথমে যবন শব্দের অর্থ ছিল গ্রিকবাসী। কারণ তারা বেদ মানত না। গ্রিকদের ন্যায় ভারতের পশ্চিমের দেশগুলোর মানুষও বেদাচারী ছিল না। তাই গ্রিকদের মতো প্রাচীন ভারতীয়দের কাছে তারাও ছিল যবন। এ জন্য আইওনিয়া, গ্রিস ও পরবর্তীকালে আগত আরবীয়, ইউরোপীয়, ইংরেজ সবাই যবন। শব্দটির আর এক অর্থ বেগবান অশ্ব। প্রাচীন গ্রিকরা বেগবান অশ্বে চড়ে এসেছিল বলে হয়তো ভারতীয় বৈয়াকরণরা শব্দটির এ রকম অর্থ নির্ধারণ করেছিল।
উপরের আলোচনায় ‘যবন’ শব্দের চারটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত, তারা বিদেশাগত ও বিভাষী। দ্বিতীয়ত, তারা বেদ মানে না বা বেদ বিশ্বাস করে না, তৃতীয়ত, তারা গোমাংস-ভক্ষক ও সদাচারহীন। চতুর্থত, তারা বেগবান অশ্বারোহী। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যবন শব্দটির চূড়ান্ত অপব্যবহার ঘটান। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে ‘যবন’ শব্দকে মুসলমানের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তিনি যবনের চারটি বৈশিষ্ট্যই মুসলমানের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন। সাহিত্যকর্মে ঋষি বঙ্কিমের এমন অঋষিসুলভ আচরণ বাঙালি এখনও ভুলতে পারেনি।
যবনিকা
‘যবন’ থেকে যবনিকা। প্রাচীন ভারতে আলেকজান্ডার পরিচিত ছিলেন যবনরাজ হিসাবে। বেদ-বিশ্বাসী ভারতীয়দের কাছে বেদ-অবিশ্বাসী বিদেশি মাত্রই ছিলেন ‘যবন’। যবন-রাজ আলেকজান্ডার ভারত বিজয়ের পর উত্তর-পশ্চিম ভারতে গ্রিক বা যবনরা বিশাল একটা এলাকা দখল করে শাসনকার্য পরিচালনা শুরু করে। এখানে গ্রিকদের নিজস্ব ব্যবসায়-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজ্যপাট ছিল। গ্রিক বা যবনদের নাট্যকলাকে দ্বিতীয় শতকে যিনি ভারতীয় সাহিত্যে স্থান করে দিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন অশ্বঘোষ। অশ্বঘোষই প্রাচীন ভারতের প্রথম নাট্যকার। প্রথম ভারতীয় নাটক হচ্ছে উর্বশী বিয়োগ। যবনরা তাঁদের নাটকে চিত্রপট ব্যবহার করতেন। অশ্বঘোষও তার নাটকে চিত্রপট ব্যবহার করতেন এবং যবনদের কলাবিদ্যাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তিনি চিত্রপটের নাম দেন ‘যবনিকা’।

যুধিষ্ঠির
পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। শতশৃঙ্গপর্বতে ধর্মের সঙ্গমে কুন্তীর গর্ভে যুধিষ্ঠির জন্মগ্রহণ করেন। এ জন্য তিনি ধর্ম, ধর্মরাজ ও ধর্মপুত্র নামে খ্যাত। দুর্বাসার প্রদত্ত ক্ষমতায় কুন্তী মন্ত্রবলে যেকোনো দেবতাকে আহ্বান করতে পারতেন। স্বামীর অনুমতিক্রমে কুন্তী ধর্মকে আহ্বান করে যুধিষ্ঠিরকে লাভ করেন। তাঁর জন্মকালে দৈববাণী হয় যে এ জাতক ধার্মিকশ্রেষ্ঠ, নরোত্তম, সত্যবাদী ও পৃথিবীপতি হবেন। এখনও কোনো লোক ধার্মিক ও সত্যবাদী হলে তাঁকে ‘ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠি’র বলা হয়। অনেক সময় উপহাসচ্ছলে কথাটি বলা হয় যদিও।

যোজন
‘যোজন’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ পথের নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব, সংযোজন, বিয়োজনের বিপরীত, একত্রকরণ প্রভৃতি। দূরত্ব পরিমাপের প্রাচীন দেশীয় একক থেকে ‘যোজন’ শব্দটির উৎপত্তি। প্রাচীন হিসাব মতে, এক যোজন সমান চার ক্রোশ। আবার এক ক্রোশ সমান চার হাজার হাত এবং এক হাত সমান আঠারো ইঞ্চি। একসময় সাধারণ মানুষের জন্য হাঁটাই ছিল নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়। কতদূর পথ অতিক্রম করা হলো তা জানার এবং জানাবার জন্য পরিমাপের একক হিসাবে ‘যোজন’ শব্দটি প্রয়োগ করা হতো। এখন কিন্তু ‘যোজন’ শব্দের অর্থের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। অতিক্রম বলতে এখন শুধু দূরত্ব বোঝায় না, সফলতার সিঁড়িও বোঝায়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!