বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

চতুর্বিংশ অধ্যায়

রবিশস্য
‘রবি’ ও ‘শস্য’ শব্দদ্বয় মিলে ‘রবিশস্য’ শব্দের উৎপত্তি। যার আভিধানিক অর্থ : চৈতালি ফসল বা বসন্তকালীন ফসল। তাহলে এর নাম ‘রবিশস্য’ হলো কেন? কোথায় রবি আর কোথায় চৈতালি বা বসন্ত। এর কারণ আছে। ‘রবি’ বাংলা শব্দ হলেও ‘রবিশস্য’ শব্দের ‘রবি’ বাংলা নয়। এ ‘রবি’ আরবি থেকে বাংলায় এসেছে। আরবি ভাষায় ‘রবি’ শব্দের অর্থ বসন্তকাল। এ জন্য ‘রবিশস্য’ শব্দের অর্থ হলো : বসন্তকালের ফসল বা চৈতালি ফসল। যা বসন্তের শেষ মাসে অর্থাৎ চৈত্র মাসে কৃষকগণ ঘরে তোলেন

রসাতল
‘রসাতল’ শব্দের অর্থ ধ্বংস, বিনাশ, অধোগতি। ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত পাতালের ষষ্ঠ নিম্নস্তরের নাম ‘রসাতল’ হতে শব্দটির উৎপত্তি ও বিকাশ। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল নিয়ে ভারতীয় পুরাণের ত্রিভুবন গঠিত। পাতাল সাতটি স্তরে বিভক্ত। উপর থেকে নিচের স্তরগুলোর নাম যথাক্রমে : (১) অতল, (২) বিতল, (৩) সুতল, (৪) তলাতল, (৫) মহাতল, (৬) রসাতল ও (৭) পাতাল। রসাতলের মতো ষষ্ঠ গভীর পাতালে যে নিপতিত হয় তার উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই বাঙালিরা ধ্বংস বা বিনাশ কিংবা গোল্লায় যাওয়া বোঝাতে শব্দটি খুব মজা করে ব্যবহার করেন।
ভারতীয় পুরাণের একটি গল্প থেকে বাংলায় ‘রসাতলে যাওয়া’ বাগ্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। ধর্মরথ ছিলেন সগর রাজার পুত্র। সগর সকল দেশ জয় করে অশ্বমেধ যজ্ঞে দীক্ষিত হয়ে অশ্বমোচন করেন। অশ্ব বিভিন্ন দেশ অতিক্রম করে রসাতলে প্রবেশ করে। রসাতলে পুরুষোত্তম কপিলরূপে বসবাস করছিলেন। কপিল অশ্বকে আবদ্ধ করে রেখেছেন সন্দেহে সগর রাজার পুত্রগণ তাঁকে আক্রমণ করে বসেন। মহর্ষি কপিলের ক্রোধানলে সগর রাজের ৬০,০০০ পুত্র ধ্বংস হয়ে যায়। কেবল চারজন পুত্র জীবিত ছিলেন। এ জীবিত পুত্রগণ হচ্ছেন : বর্হকেতু, সুকেতু, ধর্মরথ ও মহাবীর।

রাগ
‘রাগ’ শব্দের বর্তমান আভিধানিক অর্থ ক্রোধ, রোষ, গোস্সা রঞ্জক-দ্রব্য প্রভৃতি। তবে ‘রাগ’ বলতে আমরা সাধারণত ক্রোধ, রোষ, গোস্্সা, ক্ষুব্ধতা ইত্যাদি বুঝে থাকি। প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত হতে বাংলা ভাষায় আগত ‘রাগ’ শব্দের আদি ও মূল অর্থ ছিল স্নেহ, প্রীতি, ভালবাসা, প্রেম, আদর প্রভৃতি। অনেকে এমন তথ্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু অনুরাগ, সংরাগ, পূর্বরাগ প্রভৃতি শব্দের অর্থের দিকে তাকালে তাঁদের বিস্ময় আর থাকবে না। ‘অনুরাগ’ শব্দ কিন্তু ভালবাসা কিংবা প্রেম-প্রীতির চেয়েও গভীর। নানা কারণে ‘রাগ’ শব্দের মূল অর্থ উল্টে গেলেও ‘রাগ’ শব্দের সঙ্গে নানা শব্দগুচ্ছ যুক্ত হয়ে যে সকল শব্দ গঠিত হয়েছে সেগুলোর অর্থ এখনও মূল অর্থের মতো অবিকল রয়ে গেছে। এ জন্য ‘রাগ’ যতই অনাকাক্সিক্ষত হোক না কেন, অনুরাগ বড়ই মধুর, নিঃসন্দেহে পরমভাবে কাক্সিক্ষত। কীভাবে ‘রাগ’ শব্দটির অর্থের এমন পরিবর্তন হলো? সংস্কৃত হতে বাংলায় আসার প্রাক্কালে ‘রাগ’ শব্দটি তার মূল অর্থ ‘ভালবাসা ও প্রেম-প্রীতি’ নিয়েই এসেছিল। কিন্তু হুজুগে বাঙালিরা সংস্কৃত ‘রাগ’ অর্থাৎ ভালবাসাকে তার মূল অর্থে ধরে রাখতে পারেনি। বাঙালিরা যেমন চঞ্চল তেমনি অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ। রাগতে রাগতে অর্থাৎ ভালবাসতে-বাসতে হয়তো ফতুর হয়ে যাওয়া বাঙালিরা সংস্কৃত ‘রাগ’-এর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তাই সংস্কৃত ‘রাগ’ তার আদি অর্থ হারিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ ধারণ করে। কিন্তু তার উপজাত শব্দগুলোর অর্থ পরিবর্তন করার মতো বুদ্ধি বা বোধ কোনোটাই তাদের ছিল না। তাই বাংলায় এখন ‘রাগ’ অর্থ ক্রোধ হলেও ‘অনুরাগ’ অর্থ প্রেম-প্রীতি।

রাজনীতি
‘রাজনীতি’ শব্দের উৎপত্তি গ্রিক শব্দ চড়ষরং থেকে। চড়ষরং শব্দের অর্থ হলো শহর বা রাজ্য। রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে নীতির আলোকে জনগণকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল নগররাষ্ট্র ও সভ্যদের সম্পর্কে চড়ষরঃরপং নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। চড়ষরঃরপং-এর শাব্দিক অর্থ হলো ঞযব ংপরবহপব ড়ৎ ধৎঃ ড়ভ মড়াবৎহসবহঃ ড়ৎ মড়াবৎহরহম, ংঢ়বপরধষষু ঃযব মড়াবৎহরহম ড়ভ ধ ঢ়ড়ষরঃরপধষ বহঃরঃু, ংঁপয ধং ধ হধঃরড়হ, ধহফ ঃযব ধফসরহরংঃৎধঃরড়হ ধহফ পড়হঃৎড়ষ ড়ভ রঃং রহঃবৎহধষ ধহফ বীঃবৎহধষ ধভভধরৎং. সাধারণ অর্থে ‘রাজনীতি’ হলো রাজশাসন বা রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি। উপরিউক্ত বর্ণনা মতে, রাজনীতি বলতে খারাপ বা নেতিবাচক কিছু বোঝায় না। কিন্তু তত্ত্ব কথা আর বাস্তব সবসময় এক হয় না। বাস্তবে রাজনীতি কথাটা আমাদের দেশে খারাপ কিছু ইঙ্গিত করে। ‘ছেলেটি রাজনীতির শিকার’ কিংবা ‘এখানে ভালো কিছু হবে না, রাজনীতি ঢুকে গেছে’ বা ‘তার সবকিছুতেই রাজনীতি আছে’ এ ধরনের কথা বা শব্দ চয়নের সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এ কথা তো অস্বীকার করা যায় না যে, রাজনীতির যে কদর্য রূপ আমাদের কাছে দৃশ্যমান, তা থেকে উপরিউক্ত বাক্যে রাজনীতিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার এ কথাও সত্য, সমাজের কোনো অংশ থেকেই ভালো মানুষ বা ভালো দিক সম্পূর্ণ উবে যায়নি। গুণগত পরিমাণ বা সংখ্যায় মাত্রাতিরিক্ত কম হলে খারাপটি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। সাধারণভাবে জন-বান্ধব নেতার সংখ্যা কমে আসায় খারাপ নেতৃত্ব নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি জনকল্যাণের জন্যই নিবেদিত থাকার জন্যই সৃষ্টি।

রামচন্দ্র
অযোধ্যার সূর্যবংশীয় রাজা দশরথের অশ্বমেধযজ্ঞ-লব্ধ জ্যেষ্ঠপুত্র। মিথিলায় গেলে রাম মিথিলার জনকরাজার আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বিশ্বামিত্রের পরামর্শে জনকের হরধনু ভঙ্গ করে জনকের বীর্যশুল্কা কন্যা সীতাকে বিয়ে করেন। দশরথ রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে ইচ্ছা করেন। এ সংবাদে দাসী মন্থরার প্ররোচনায় দশরথের দ্বিতীয় স্ত্রী ভরত-জননী কৈকেয়ী ঈর্ষান্বিতা হয়ে পড়েন। আশৈশব রামকে স্নেহ করলেও মন্থরার প্ররোচনায় কৈকেয়ী দশরথের পূর্বপ্রতিজ্ঞার সুযোগে এক বরে ভরতের যৌবরাজ্য লাভ ও অন্য বরে রামের চৌদ্দ বৎসর বনবাসের ব্যবস্থা করেন। এর ফলে সীতা ও লক্ষ্মণ রামের অনুসরণ করেন। রামের বনগমনের পর দশরথ পুত্রশোকে মারা যান। বনবাসের এক পর্যায়ে রাম গোদাবরী-তীরে পঞ্চবটী বনে কুটীর নির্মাণ করে বসবাস করতে লাগলেন। তখন এ বন রাক্ষসে পরিপূর্ণ ছিল। রাবণের বিধবা বোন শূর্পণখা এ বনে বাস করতেন। তিনি রামের নিকট প্রণয় নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত ও বিতাড়িত হলে সীতাকে গ্রাস করার চেষ্টা করেন। রামের আদেশে লক্ষ্মণ এ রাক্ষসীর নাক ও কান কেটে দেন। শূর্পণখার দুই ভাই খর ও দূষণ রামকে আক্রমণ করলে রাম তাঁদের দুজনকে এবং তাঁদের সকল সৈন্যকে বধ করে পঞ্চবটী বন রাক্ষসমুক্ত করেন। রাবণ সীতার রূপ-লাবণ্যের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে ও বোনের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে রাবণ সুকৌশলে সীতাকে হরণ করেন।
রামচন্দ্র পুত্ররূপে, মিত্ররূপে, প্রভুরূপে, স্বামীরূপে, প্রজাপালক রাজারূপে ও মহাশূররূপে অতুলনীয় আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। মর্ত্যলোকে তিনিই প্রথম স্বর্গরাজ্য স্থাপন করেছিলেন। সে স্বর্গরাজ্যের নাম ছিল রামরাজ্য। এ রামরাজ্যে রাজত্ব করতেন রাম। সে রাজ্যের লোকজনের কোনো অভাব, অশান্তি ও দুঃখ-কষ্ট ছিল না। সবাই ইচ্ছেমতো মহাসুখে দিনাতিপাত করত। রামরাজ্যের সে সীমাহীন সুখ-শান্তি ও ঐশ্বর্যের তুলনা টানতে এখন কোনো শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ রাজ্যের জনগণের জীবন-যাপনের তুলনা টানতে বলা হয় ‘রামরাজ্য’।

রামবাগ
রাম হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। হিন্দুধর্মে তিনি একজন জনপ্রিয় দেবতা। ভারতীয় পুরাণে রামকে অযোধ্যার রাজা বলা হয়েছে। রাজা ও দেবতা রাম-এর বড়ত্ব হতে নিচের শব্দ ও বাগ্ভঙ্গিগুলো বৃহৎ-বাচক শব্দে পরিণত হয়েছে :
রামকুঁড়ে অতিশয় কুঁড়ে; রামকলা বড় কলা; রামখিলি বড় পানের খিলি; রামঘুঘু বড় ঘুঘু; রামছাগল বড় ছাগল; রামঝিঙ্গা বড় ঝিঙ্গা; রামঢাক বড় করতাল (বাদ্য); রামদা বড় দা; রামধনু ইন্দ্রধনু, বড় ধনু; রামপটল বড় পটল; রামবেণী বৃহৎবেণী; রামবোকা অতিমাত্রায় বোকা; রামশালিক বড় শালিক; রামধোলাই সাংঘাতিক পিটুনি; রামকাড়া কাড়া (শ্রবণ কাড়ে এমন বাদ্যযন্ত্র) সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় (ধরনের) যে কাড়া; রামচকা চকাসমূহের (চক্রবাক পাখি) মধ্যে সবচেয়ে বড় (জাতের) যে চকা; রামচন্দ্র চন্দ্র (চাঁদি, কাঁচা টাকা, লক্ষ্মীমন্ত বিনিয়োগ পুঁজি, যে টাকা খেলে সেই ক্রিয়াকারী পুঁজি), সবচেয় বড় (পরিমাণের) যে চন্দ্র; রামরাজত্ব সবচেয়ে বড় যে রাজত্ব; রামরাজ্য সবচেয়ে বড় বা শ্রেষ্ঠ হওয়ায় কাম্য যে রাজ্য; রামশিঙা শিঙাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে শিঙা; রামায়ণ রাম-এর অয়ন বোধে পরিণত যাতে; অথবা, যে মহাকাব্যে রাম-এর বিষয়ে সব কথা লিখিত বা গীত হয়েছে। এরূপ : রামসাগর, রামকেলি, রামখড়ি, রামজামা, রামটেপা, রামঠেলা, রামদৌড়, রামপাখি, রামলীলা, রামডলা প্রভৃতি।
রামায়ণ
‘রামায়ণ’ একটি প্রাচীন সংস্কৃত মহাকাব্য। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, ঋষি বাল্মীকি ‘রামায়ণে’র রচয়িতা। এই গ্রন্থটি হিন্দুশাস্ত্রের স্মৃতি বর্গের অন্তর্গত। রামায়ণ ও মহাভারত ভারতের দুটি প্রধান মহাকাব্য। এই কাব্যে বিভিন্ন সম্পর্কের পারস্পরিক কর্তব্য বর্ণনার পাশাপাশি আদর্শ ভৃত্য, আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ স্ত্রী ও আদর্শ রাজার চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে মানবসমাজের আদর্শ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রামায়ণ নামটি ‘রাম’ ও ‘অয়ন’ শব্দ নিয়ে গঠিত একটি তৎপুরুষ সমাসবদ্ধ পদ, যার অর্থ রামের যাত্রা। রামায়ণ ৭টি কাণ্ড ও ৫০০টি সর্গে বিভক্ত ২৪,০০০ শ্লোকের সমষ্টি। এ কাব্যের মূল উপজীব্য হলো বিষ্ণুর অবতার রামের জীবন-কাহিনি। রামায়ণের শ্লোকগুলো ৩২-অক্ষরযুক্ত ‘অনুষ্টুপ’ ছন্দে রচিত। রামায়ণের সপ্তকাণ্ডের নামগুলো হচ্ছে : আদি বা বালকাণ্ড, অযোধ্যাকাণ্ড, অরণ্যকাণ্ড, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড, লঙ্কাকাণ্ড বা যুদ্ধকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড।

রাহাজানি
ফারসি ‘রাহজান’ শব্দ থেকে বাংলা ‘রাহাজানি’ শব্দটির উৎপত্তি। মূলত ফারসি ‘রাহ্’ শব্দ থেকে ‘রাহা’ শব্দ এসেছে। ‘রাহা’ শব্দের অর্থ রাস্তা, পথ, উপায় প্রভৃতি। যেমন রাহাখরচ মানে পথখরচ, ভ্রমণকালে প্রয়োজনীয় ব্যয়। এখন ‘রাহাজানি’ শব্দের অর্থ প্রকাশ্য রাজপথে ছিনতাই বা ডাকাতি। এছাড়া অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার অর্থেও ব্যবহার করা হয়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘রাহাজানি’ হচ্ছে এমন একটি কর্ম, যার মাধ্যমে পথিকের সঙ্গে থাকা মূল্যবান দ্রব্যাদি কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে পথিকের যাত্রা হয় বিঘ্নিত, জীবন হয় বিপন্ন। যে কর্ম পথিকের ‘রাহাজানি’ বা পথের খরচকে লুটে নিয়ে যায় সেটিই বাংলার ‘রাহাজানি’। ফারসি হতে বাংলায় এসে ‘রাহাজানি’ তার বাহ্যিক অর্থের পরিবর্তন ঘটালেও অন্তর্নিহিত অর্থ অভিন্ন রয়ে গেছে। এখানেই বাংলা ভাষার মাধুর্য।

রাহু
ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত এক দানব। তিনি বিপ্রচিত্তি দানবের ঔরসে ও দিতির কন্যা সিংহিকার গর্ভে উৎপন্ন চতুর্দশ সন্তানের অন্যতম। সমুদ্র মন্থনের পর বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ করে যখন দেবগণের সুধা ভাগ করে দিচ্ছিলেন তখন এ রাহু দেবরূপ ধারণ করে দেবতাদের সঙ্গে অমৃত পান করার জন্য একসঙ্গে উপবিষ্ট হন। তাঁর কণ্ঠ পর্যন্ত অমৃত প্রবেশ করলে চন্দ্র ও সূর্য রাহুকে চিনতে পেরে বিষ্ণু ও দেবতাদের কাছে তার স্বরূপ প্রকাশ করে দেন। তখন বিষ্ণু নিজের সুদর্শনচক্রের মাধ্যমে রাহুর মস্তক ছেদন করেন। তবে অমৃত পান করার ফলে রাহুর মৃত্যু হলো না। তার মস্তকভাগ ‘রাহু’ এবং দেহভাগ ‘কেতু’ নামে খ্যাত হয়। এ ঘটনার পর হতে চন্দ্র ও সূর্যের সঙ্গে রাহুর চিরশত্র“তার সূত্রপাত। তাই রাহু তাদের গ্রাস করে ফেলেন। রাহু চন্দ্রকে গ্রাস করলে চন্দ্রগ্রহণ হয় এবং সূর্যকে গ্রাস করলে হয় সূর্যগ্রহণ।

রিকশা
সম্পূর্ণ শব্দ ‘জিন-রিকি-শা’। জিন অর্থ মানুষ, রিকি অর্থ শক্তি ও শা অর্থ গাড়ি। সুতরাং জিন-রিকি-শা বাগ্ভঙ্গির অর্থ : মানুষ-শক্তি-গাড়ি। অর্থাৎ মানুষ নিজ শক্তি দিয়ে যে গাড়ি চালায়। রিকশা মানুষ নিজ শক্তি দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যায়। তাই এর নাম জিন-রিকি-শা; বাংলায় ‘রিকশা’।

রুমা
বানর-রাজ সুগ্রীবের স্ত্রী। বানর-রাজ বালী সুগ্রীবকে বিতাড়িত করলে রুমা বহুকাল বালীর আশ্রমে ছিলেন। পরে রাম বালীকে বধ করলে রুমা সুগ্রীবকে ফিরে পান। বান্দরবানে রুমা নামের একটি উপজেলা আছে। কথিত হয় বানর-রাজ সুগ্রীবের স্ত্রীর নামে এ জেলার নামকরণ হয়েছে রুমা।

রুমাল
‘রুমাল’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। কাপড়ের তৈরি এ বস্তুটি দিয়ে মুখ মোছা হয়। রুমাল ফারসি শব্দ। ফারসি ‘রু’ ও ‘মাল’ এর মিলনে হয়েছে ‘রুমাল। ফারসি ‘রু’ শব্দের অর্থ মুখ। ‘মাল’ শব্দের অর্থ ‘যা মুছে দেয়’। তবে ‘মাল’ শব্দের প্রকৃত মৌলিক অর্থ ‘মুছে দাও’। শব্দটা ‘রু’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এর অর্থ হয় ‘যা মুছে দেয়’। সুতরাং ‘রু + মাল’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় মুখ মুছে দাও। এটি অনুজ্ঞা পদ। সমাসে শেষ পদ হওয়ায় ‘মুছে দাও’ অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘মুছে দেয় যা’। সে হিসাবে রুমাল অর্থ ‘যা মুখ মুছে দেয়’।

রোজনামচা
‘রোজ’ ও ‘নামচা’ শব্দের সমন্বয়ে ‘রোজনামচা’ শব্দের উৎপত্তি। ‘রোজ’ শব্দের অর্থ প্রতিদিন এবং ‘নামচা’ শব্দের অর্থ লেখা, লিখন, অঙ্কন প্রভৃতি। সুতরাং ‘রোজনামচা’ শব্দের অর্থ : প্রতিদিনের লেখা। স্মৃতি হতে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় মানুষ প্রাত্যহিক কিছু ঘটনা লিখে রাখে। যেখানে ওই প্রাত্যহিক ঘটনাগুলো লিখে রাখা হয় সেটাই হচ্ছে ‘রোজনামচা’। যার অর্থ ‘দিনলিপি’।

রোমহর্ষক/লোমহর্ষক
‘রোম’ ও ‘লোম’ শব্দ থেকে রোমহর্ষক বা লোমহর্ষক শব্দের উৎপত্তি। ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ মতে, লোম বা রোম অর্থ শরীরজাত সূক্ষ্ম কেশ, পশম ইত্যাদি। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখ আছে : ‘রোমহর্ষণ (লোমহর্ষণ) হচ্ছে রোম-এর হর্ষণ (লোম-এর) হর্ষ অন যাহাতে।’ ভারতীয় পুরাণ মতে, রোমহর্ষণ বা লোমহর্ষণ বেদব্যাসের একজন প্রধান শিষ্য। বেদব্যাস, বেদ বিভাগ করে প্রথম চারজন শিষ্যকে তা শিক্ষা দেন। অতঃপর তিনি সূত-জাতীয় পণ্ডিত রোমহর্ষণকে ইতিহাস ও পুরাণ পাঠের জন্য শিক্ষা দান করেন। গুরুর আদেশে রোমহর্ষণ সমবেত ঋষিদের মধ্যে পুরাণাদি কীর্তন করতেন। ব্যাসদেবের মুখে শাস্ত্রাদি শিক্ষা করতে গিয়ে তাঁর রোমাদি বা পশমসমূহ বা কেশসমূহ হর্ষিত হয়েছিল বলে তাঁর নাম হয় ‘রোমহর্ষণ’। এ রোমহর্ষণ থেকে রোমহর্ষক বা লোমহর্ষক শব্দের উৎপত্তি। রোমহর্ষক ও লোমহর্ষক শব্দদ্বয় উভয়ে অভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।

রোমাঞ্চ
যাতে রোম অঞ্চিত হয় তা-ই রোমাঞ্চ। যা ঘটলে রোম খাড়া হয়ে ওঠে বা রোমের অন্ চয়িত হয় বা রোম নিজের অজান্তে চঞ্চল হয়ে তার পরিধিতে পৌঁছায়, সেটিই রোমাঞ্চ। ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ ১ম খণ্ডে কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী বলেছেন, ‘জড়সধহপব রোম (জড়সব) শহর ও জড়সধহ (সভ্যতা-সংস্কৃতি-ভাষা) নাম থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়। জড়সব নামক কেন্দ্রের অঞ্চ্ যতদূর বিস্তৃত সেটিই জড়সব + অঞ্চ্ বা জড়সধহপব-এর এলাকা।

রৌরব
একটি নরকের নাম। কূটসাক্ষী ও মিথ্যাবাদীরা এ নরকে যাবে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, এ রৌরবভূমি অতি তপ্ত অঙ্গারে আচ্ছন্ন। পাপিষ্ঠরা এ নরকে বিচরণ করে পদে পদে দগ্ধ হয়। একসময় যারা বাংলা ভাষায় কথা বলত, ব্রাহ্মণরা তাদের এ নরকে দগ্ধ হওয়ার ভয় দেখাত।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!