বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

পঞ্চবিংশ অধ্যায়

লক্ষ্মী
ঋক্বেদে শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী হিসাবে লক্ষ্মীর নাম পাওয়া যায়। রামায়ণ অনুসারে, সমুদ্র মন্থনকালে ‘লক্ষ্মী’ পদ্মফুল হস্তে সমুদ্র হতে উত্থিত হয়েছেন। পুরাণ অনুসারে, মহর্ষি ভৃগুর ঔরসে ও তাঁর স্ত্রী দক্ষকন্যা খ্যাতির গর্ভে লক্ষ্মী জন্মগ্রহণ করেন। লক্ষ্মী শব্দের আভিধানিক অর্থ সৌভাগ্য, শ্রী, শোভা, সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য, সুবোধ, শান্তস্বভাব। হিন্দু পুরাণে বর্ণিত ধন, ঐশ্বর্য ও সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর নাম, আচরণ, স্বভাব ও ব্যবহার থেকে ‘লক্ষ্মী’ শব্দটির উৎপত্তি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি প্রিয় দেবী লক্ষ্মী যেমন সম্পদশালী, তেমনি সুন্দর এবং তেমনি আকর্ষণীয় তাঁর স্বভাব ও আচরণ। তিনি সর্বসম্পদে পূর্ণ এবং সকল শ্রী ও ঐশ্বর্যে ভরপুর অনন্যা এক দেবী। দেবতা ও অসুরগণের সমুদ্রমন্থনকালে দেবী লক্ষ্মী সমুদ্র হতে উত্থিত হয়েছিলেন।
দেবী লক্ষ্মীর চরিত্র ও আচরণ যাঁর মধ্যে দেখা যায়, যিনি সম্পদ, ঐশ্বর্য ও মোহনীয় আচরণে ঋদ্ধ তিনিই লক্ষ্মী। মা-বাবা তাঁদের ছেলেমেয়েকে ‘লক্ষ্মী’ বলে আদর করে ডাকেন। আবার অনেকে আরও এক পা এগিয়ে ডাকেন লক্ষ্মীসোনা। লক্ষ্মীর মতো চরিত্র হোক বা না হোক, প্রত্যেক সন্তান-সন্ততি প্রত্যেকের পিতা-মাতার কাছে আসলেই লক্ষ্মী সর্বসম্পদ, ঐশ্বর্য ও সুন্দরের বিমূর্ত অনিবার্যতা।

লাগাতার
‘লাগতার’ শব্দের অর্থ ধারাবাহিক, অবিচ্ছিন্ন প্রভৃতি। ‘লাগা’ ও ‘তার’ শব্দ হতে ‘লাগাতার’ শব্দের উৎপত্তি। তার মানে ‘ধারা’। ‘তার বাঁধ্না’ বা ‘তার লগানা’ হিন্দি বাগ্ভঙ্গি। বস্তুত ‘লগাতার’ হতে ‘লাগাতার’ শব্দের উৎপত্তি। ‘লগা’ একটি বিশেষণ পদ। লগাতার অর্থ লগ্নধার, অর্থাৎ ধারাবাহিক। এ ‘লগাতার’ শব্দ থেকে লাগাতার শব্দের উৎপত্তি।

লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন
আমরা এই প্রবাদের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু আমরা কি জানি কে এই গৌরী সেন? এ নামে কি আসলে কেউ ছিলেন? গৌরীকান্ত সেন সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতকের লোক। তাঁর আদি নিবাস সম্পর্কে দুটি ভিন্ন মত আছে। অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী তিনি পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার বালী শহরের (বর্তমান হাওড়া জেলার অন্তর্গত) অধিবাসী। অন্য মত অনুযায়ী তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের মানুষ। সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের এক ব্যবসায়ী পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতার নাম ছিল নন্দরাম সেন। আমদানি-রপ্তানির পারিবারিক ব্যবসায় গৌরী সেন অনেক টাকা উপার্জন করে বণিকসমাজে প্রসিদ্ধ হন। দুহাতে টাকা বিলিয়ে অনেক লোককে ঋণমুক্ত করেন অথবা বকেয়া রাজকর মেটাতে সাহায্য করেন। কেউ চাইলেই তিনি টাকা দিতেন। এ থেকেই ‘লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন’ প্রবাদের উৎপত্তি। অনেকে মনে করেন, হুগলীর গৌরীশঙ্কর শিবমন্দির তাঁর অর্থে নির্মিত। কলকাতা শহরে আহিরীটোলায় গৌরী সেনের বিশাল বাড়ি ছিল।

লাট
অত্যন্ত দাপুটে, ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি, মস্ত বড় লোক প্রভৃতি। ইংরেজি ‘লর্ড’ শব্দ হতে বাংলা ‘লাট’ শব্দের উৎপত্তি। ব্রিটিশ আমলে বড়লাট, ছোটলাট, জঙ্গিলাট প্রমুখ পদবির মানুষরা মহাদাপটে ভারত শাসন করতেন। তাঁদের দাপটের কাছে সাধারণ মানুষ ছিল অসহায়। স্থানীয় জমিদার ও রাজারা পর্যন্ত এদের সমীহ করতেন। লাটগণ সবাই ছিলেন ইংরেজ। গভর্নর জেনারেল ছিলেন বড়লাট, লেফটেনান্ট গভর্নর ছিলেন ছোটলাট ও জেনারেল ছিলেন জঙ্গীলাট। ইংরেজি লর্ড শব্দ বাংলায় প্রথমে লার্ড এবং পরবর্তীকালে আরও পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘লাট’ শব্দে স্থিতি পায়। ভারতবর্ষ শাসনকারী সব গভর্নর জেনারেলই লর্ড উপাধিধারী ছিলেন। লেফটেনান্ট গভর্নর ও জেনারেলগণের অধিকাংশই ছিলেন লর্ড। ইংরেজি শাসকদের মধ্যমণি লর্ড উপাধির কারণে বাংলায় ‘লাট’ শব্দটি ক্ষমতা ও জৌলুসজ্ঞাপক শব্দ হিসাবে বাংলায় স্থান করে নেয়।

লাটে ওঠা
নিলামে ওঠা, নিলামে একসঙ্গে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত, লটারির মাধ্যমে নিলামে ওঠা। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে যাঁরা শাসন পরিচালনা করতেন তাঁদেরকে দেশীয়রা ডাকতেন ‘লর্ড’। এ লর্ড থেকে ‘লাট’ শব্দের উৎপত্তি। তবে এ লাট কিন্তু লর্ড থেকে আসা ‘লাট’ নয়, এ লাট ইংরেজি লট শব্দ থেকে আগত। ইংরেজি লট শব্দের অর্থ গুচ্ছ, স্তূপ, সকল প্রভৃতি। কোনো জমিদারি নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত হলে প্রথমে তা ‘লাটবন্দি’ তথা বিক্রয়ের জন্য তালিকাভুক্ত করা হতো। লাটবন্দি করার পর তা নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এখন যেমন হাজার হাজার জিনিস নিলামে তোলা হয় তখন তেমন ছিল না। নিলামে তোলার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আকর্ষণীয় ছিল জমিদারি। লাট সাহেবরা বাকি খাজনাসহ নানা কারণে জমিদারি লাটে উঠিয়ে নিলামে বিক্রি করে দিতেন। রাতারাতি জমিদার হয়ে যেতেন সাধারণ প্রজা। সে লাট থেকে লাটে ওটা বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। এখন সে ব্রিটিশ যেমন নেই, তেমনি নেই জমিদারিও। কিন্তু ‘লাটে ওঠা’ থেমে নেই। তবে এ লাটে ওঠা কিন্তু শুধু নিলামে তোলা নয়। এ ‘লাটে ওঠা’ বলতে সর্বস্বান্ত হওয়া বোঝায়।

লাঠিসোটা
বিভিন্ন ধরনের লাঠি। ‘লাঠি’ ও ‘সোটা’ দুটো শব্দ নিয়ে ‘লাঠিসোটা’ বাগ্ভঙ্গিটি গঠিত। লাঠি শব্দের অর্থ আমরা সবাই জানি। তবে সোটা শব্দের অর্থ অনেকের জানা নেই। কারণ শব্দটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না। তবে অষ্টাদশ শতকেও শব্দটির ব্যবহার ছিল। ‘সোটা’ শব্দের অর্থ ছোট লাঠি। সুতরাং ‘লাঠিসোটা’ শব্দের অর্থ বিভিন্ন ধরনের বা ছোট ও বড় লাঠি। ব্যাকরণগত অর্থ ও আভিধানিক অর্থ একদম পরিষ্কার।
লাবণ্য
‘লাবণ্য’ একটি আবেগময় শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ : সৌন্দর্য, মাধুর্য, কান্তি, শোভা, চাকচিক্য প্রভৃতি। প্রাচীন এক কথাসাহিত্যিক লাবণ্যের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘মুক্তার ভেতর মোহময় সুন্দরে আবিষ্ট যে তরল-নির্বাণ প্রতিফলন পরিস্ফুট, সে প্রতিফলন অঙ্গে বিদ্যমান থাকলে তাকে লাবণ্য বলা যায়।’ তিনি যা-ই বলুন না কেন, ‘লাবণ্য’ শব্দের ব্যুৎপত্তি কিন্তু আবেগময় নয়, নিতান্তই সাধারণ ও রসকষহীন। ‘লাবণ্য’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ লবণত্ব বা নোনতা ভাব। এ বিবেচনায় ‘লবণাক্ত’ শব্দের অর্থ হওয়া উচিত ‘শরীরের নোনতা ভাব’। কিন্তু ‘নোনতা ভাব’ জিহ্বা দিয়ে স্বাদ গ্রহণের জিনিস, চোখ দিয়ে দেখার নয়। শরীরের ঘাম শুকিয়ে গেলে চামড়ার উপর লবণের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় এমন শরীরই কি তা হলে লাবণ্যময়? না, কেউ যদি অমন ভাবেন তা হবে নির্ঘাৎ পাগলামি।
লবণ স্বাদ বৃদ্ধির অন্যতম উপাদান, এর মধ্যে একপ্রকার আর্দ্রতা রয়েছে, যা দেহ লাবণ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। আধুনিককালেও প্রসাধন-সামগ্রীর মাধ্যমে লাবণ্য বৃদ্ধির অন্যতম কৌশল আর্দ্রতা রক্ষা। অধিকন্তু, লবণের মধ্যেও মুক্তাময় প্রতিচ্ছায়ার বিচ্ছুরণ ঘটে। হয়তো এ জন্য ‘লাবণ্য’ শব্দকে বাংলাভাষীরা ‘দেহের নোনতা ভাব’-এর পরিবর্তে ‘দেহের সৌন্দর্য’ রচনার ইঙ্গিত হিসাবে ব্যবহার শুরু করেছিলেন। লবণ শুকনো হলেও ভেজা ভাব। চট্টগ্রামের ভাষায় ‘লাবণ্য’ শব্দটি আরেকটু উন্নত ও সম্প্রসারিত হয়ে ‘ননাই’ রূপ ধারণ করেছে। অর্থাৎ ননীর মতো মাখোমাখো। উদাহরণ “কইলজার ভিতর বাঁধি রাইক্খুম তোঁয়ারে ও নানাই রে…।”

লালা
‘লালা’ শব্দের অর্থ মুখ থেকে নিঃসৃত জল, মুখজাত রস প্রভৃতি। লালা কিন্তু থুথু নয়। যেটি মুখ থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঝরে সেটি লালা। শিশুদের মধ্যে এমন প্রবণতা বেশি দেখা যায়। লালা সংস্কৃত শব্দ। এর মূল অর্থ হচ্ছে যা খাদ্য পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু লালা কি তাহলে খাদ্য পেতে ইচ্ছে করে? না, কিন্তু যার লালা ঝরে তার নিশ্চয় খাদ্য পেতে ইচ্ছে করে। লালা হয়তো তার এ ইচ্ছেকে প্রকাশ করে। প্রকাশ্য লালা ছাড়াও আর একপ্রকার লালা আছে। এটি লোভের লালা। এমন লালা যাদের ঝরে তাদের বলে ‘লালায়িত’। তেঁতুল বা টকজাতীয় কোনো কিছুর গন্ধ নাকে এলে জিভে লালা আসে, হয়তো ঝরে না কিন্তু আসে। এ আসাটাই হচ্ছে খাওয়ার ইচ্ছা। নতুন ও উপাদেয় কোনো খাদ্য দেখলেও মুখে লালা আসে। এটা প্রত্যেকে জানে।

লিঙ্গ
‘লিঙ্গ’ শব্দের প্রথম অর্থ ‘জ্ঞানসাধন’। অর্থাৎ, যার দ্বারা জ্ঞান সাধিত হয়, তাকে লিঙ্গ বলে। আজকের সাধারণ শিক্ষিত বাঙালির কাছে কথাটা বেশ অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিতেরা জানেন কথাটা শতকরা একশ ভাগ নির্ভুল। বহু প্রাচীনকাল থেকেই ‘লিঙ্গ’ শব্দের ওইরূপ অর্থ প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রায় সমস্ত পুরনো অভিধান ও শব্দকোষে ওইরকমই উল্লেখ রয়েছে। তাহলে কেন সে কথা ভাষাবিশেষজ্ঞ শিক্ষকেরা তাঁদের ছাত্র-ছাত্রীদের শেখালেন না? কেন আজকের শিক্ষিত বাঙালি ছেলেমেয়েরা এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাবা-মায়েরাও, লিঙ্গ শব্দের কেবল মবহফবৎ ও ঢ়বহরং এই দুটি অর্থই জানলেন?
একটি কারণ হলো, কেন যে ‘লিঙ্গ’কে ‘জ্ঞানসাধন’ বলা হতো, কিংবা ‘জ্ঞানসাধন’কে ‘লিঙ্গ’ বলা হতো, সে কথা ভাষাবিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের অনেকে জানেন না। আর যা জানা নেই, অভিধানে লেখা আছে বলেই সে কথা ছাত্রকে শেখাতে যাওয়া বিপজ্জনক। তার চেয়ে বরং ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই মঙ্গল। সে জন্য এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা সমীচীন মনে করেননি তাঁরা। কিন্তু একটি শব্দের দশটি অর্থের ভিতর থেকে মাত্র দুটিকে এইভাবে উত্তরসূরিদের শেখানোর ফলে বাংলা ভাষার শতকরা আশি ভাগ যে বাদ পড়ে যেতে পারে, সেকথা তাঁরা খেয়াল করেননি।
আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, বাংলা ভাষায়, ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে পর, বাংলা শব্দের ‘আত্মাবদল’ সাঙ্গ হয় এবং তার ফলে লিঙ্গ, যোনি প্রভৃতি শব্দগুলোর ভিতর থেকে তাদের পুরনো ও বহুকালক্রমে আগত অর্থগুলোকে বের করে ফেলে দিয়ে কেবল একটি বা কদাচিৎ দুটি করে অর্থকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যেমন লিঙ্গ শব্দের ভিতরে ঢ়বহরং এবং যোনি শব্দের ভিতরে াধমরহধ প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। যেহেতু প্রভু ইংরেজের ভাষায় একটি শব্দে একটি বিষয় বা বস্তুকে প্রকাশের একরৈখিক নিয়ম প্রচলিত, বাংলা ভাষার ভিতরেও সে নিয়ম প্রচলিত হয়ে যায়। আক্ষেপের কথা এই যে, রাজনীতিকভাবে আজ ব্রিটিশ চলে গেছে বটে, কিন্তু বাংলা ভাষার ভিতর আজও সে উপনিবেশ চালিয়ে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে।

লুনুলা
মানুষের নখের সাদা অংশের নাম ‘লুনুলা’ (খঁহঁষধ)। এটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ চাঁদ।

লেজেগোবরে
‘লেজেগোবরে’ শব্দটির অর্থ নাকাল, নাজেহাল। সাংঘাতিক বিপদে বা বিপাকে পড়লে মানুষের ‘লেজেগোবরে’ অবস্থা হয়। আবার আকস্মিক ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হলেও মানুষ নিজের অবস্থা ‘লেজেগোবরে’ করে ফেলে। ‘লেজেগোবরে’ বাগ্ভঙ্গিটি এসেছে ভয়ে-ভীত গরুর নিরুপায় আচরণ থেকে। গরু ভীষণ ভয় পেয়ে গেলে লেজ উপরে তোলার কথা ভুলে যায় এবং লেজ উপরে না-তুলে গোবর ত্যাগ করে। গোবরমাখা লেজের তখন যে অবস্থা হয় সেটাই ‘লেজেগোবরে’। অনেকে শব্দের ও বানানের প্রকৃত প্রয়োগ বা বানান না-জানলে অর্থেও এমন লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি করে বসে থাকে।

লেডিকেনি
এটি এক প্রকার মিষ্টির নাম। ভারতের বড়লাট (এড়াবৎহড়ৎ-এবহবৎধষ) লর্ড ক্যানিং (১৪ই ডিসে. ১৮১২১৭ই জুন, ১৮৬২)-এর স্ত্রী লেডি ক্যানিং-এর নামানুসারে পান্তুয়ার আদলে তৈরি তাঁর প্রিয় বাঙালি মিঠাই। লেডি ক্যানিং এ মিষ্টিটি খুব পছন্দ করতেন। তাই এটির নাম হয়ে যায় লেডিকেনি। উল্লেখ্য, লর্ড ক্যানিং ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ হতে ২১শে মার্চ, ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের বড়লাট ছিলেন। ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ বলা হয়েছে ‘লেডিকেনি’ অর্থ : ছানা দ্বারা প্রস্তুত প্রসিদ্ধ রসালো মিঠাইবিশেষ।
লেফাফাদুরস্ত
‘লেফাফাদুরস্ত’ শব্দের অর্থ পরিপাটি, সাজসজ্জা ও আচার-আচরণে নিখুঁত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কপট ও ফাঁকিবাজ। ‘লেফাফা’ ও ‘দুরস্ত’ শব্দের সমন্বয়ে লেফাফাদুরস্ত শব্দের উৎপত্তি। ফারসি ‘লেফাফে’ ও ‘দুরস্ত’ শব্দ দুটোর সংযোগেই বাংলা লেফাফাদুরস্ত। ফারসি লেফাফে শব্দের অর্থ : আবরণ, ছদ্মবেশ, আড়াল, আচ্ছাদন, ওপরের বেশ প্রভৃতি। অন্যদিকে দুরস্ত শব্দের অর্থ হচ্ছে : ত্র“টিহীন। সুতরাং ‘লেফাফাদুরস্ত’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় বাইরের আবরণ ত্র“টিহীন। তবে বাংলা বাগ্ভঙ্গিতে শব্দটির অর্থে বাইরের আবরণ ত্র“টিহীন এমন বোঝায় না। বাইরের আবরণ ত্র“টিহীন হলে যে ভেতরের আবরণ ভালো হবে না তা নয়। কিন্তু ‘লেফাফাদুরস্ত’ এমন অর্থ প্রকাশ করে যার বাইরের আবরণটিই ভালো কিন্তু ভেতরেরটা নয়।

ল্যাংবোট
‘ল্যাংবোট’ শব্দের অর্থ চামচা, অনুচর, পার্শ্বচর প্রভৃতি। এটি ইংরেজি হতে আগত। ইংরেজি লংবোট (ষড়হম নড়ধঃ) বাংলায় বিকৃত হয়ে ‘ল্যাংবোট’ হয়েছে। পালতোলা বড় জাহাজের সঙ্গে যুক্ত লম্বা নৌকাকে লংবোট বলা হতো। লংবোটে কোনো নাবিক থাকত না। খালি নৌকা মূল জাহাজের সঙ্গে বাঁধা থাকত এবং জাহাজ যেদিকে যেত নৌকাগুলোও জাহাজের সঙ্গে যেত। জাহাজকে অনুসরণ করাই ছিল নৌকার একমাত্র কাজ। লংবোট প্রয়োজন না-হলেও সবসময় জাহাজের সঙ্গে বাঁধা থাকত। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মূল জাহাজের সঙ্গে সবসময় লেগে থাকা ও অনুসরণ করার চরিত্র থেকে ‘ল্যাংবোট’ বাগ্ভঙ্গিটির উৎপত্তি। চামচা, অনুচর, তোষামুদে প্রভৃতি ব্যক্তিরাও ল্যাংবোটের ন্যায় বড় কারও সঙ্গে লেপ্টে থেকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাকে অনুসরণ করে।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!