বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

ষড়বিংশ অধ্যায়
শ ষ

শনি
সূর্যের ঔরসে ও স্ত্রী ছায়ার গর্ভে দুই পুত্র যথাক্রমে শনি ও সাবর্ণি মনুর জন্ম হয়। যথাসময়ে চিত্ররথের কন্যার সঙ্গে শনির বিয়ে হয়। শনি ধ্যানমগ্ন ও পূজারত ছিলেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী ঋতুস্নাতা হয়ে সুন্দর বেশভূষা পরিধান করে স্বামীর কাছে নিজের মনোভাব প্রকাশ করেন। কিন্তু ধ্যানমগ্ন শনি স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন না এবং তার ঋতুও রক্ষা করলেন না। এতে স্ত্রী ক্রুদ্ধা হয়ে স্বামীকে অভিশাপ দেন : তুমি যার প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে-ই ধ্বংস হয়ে যাবে। বাংলায় ব্যবহৃত ‘শনির দৃষ্টি’ বাগ্ধারাটি এ ঘটনা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। গণেশ জন্মগ্রহণ করলে শনি তাকে দেখতে যান। গণেশের মাতা পার্বতীর অনুরোধ উপেক্ষা করতে না-পেরে শনি শিশু গণেশের দিকে দৃষ্টিপাত করামাত্র গণেশের মুণ্ড গলা হতে ছিন্ন হয়ে মাটিতে পাড়ে যায়। শনি যার দিকে তাকাতেন তারই মহা ক্ষতি হয়ে যেত।

শনির দৃষ্টি হলে পোড়া শোল পালায়
‘শনির দৃষ্টি হলে পোড়া শোল পালায়’ কথার অর্থ ‘কপাল মন্দ হলে অঘটন ঘটে এবং আরও কঠিন বিপত্তির উদ্ভব ঘটে।’ ভারতীয় পুরাণের একটি গল্প থেকে প্রবাদটির উৎপত্তি। শ্রীবৎস রাজা শনির কোপানলে পড়ে রাজ্যপাট হারিয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ভীষণ কষ্টে দিনযাপন করছিলেন। এ দুঃসহ অবস্থায় তিনি একটি শোল মাছ পেয়ে সেটি পুড়িয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা নিলেন। শোল মাছটি কেটে আগুনে পুড়িয়ে ছাই দিয়ে ধোয়ার জন্য নদীতে নিয়ে গেলেন। কিন্তু শনির কৌশলে পোড়া শোল মাছটি জীবন্ত হয়ে নদীতে পালিয়ে গেল। জলের নিচে পোড়া শোল মাছের তোলপাড় করা লাফানি দেখে বেচারা শ্রীবৎস রাজার পেটে যেন আগুন ধরে যায়। আক্ষেপ করে তিনি আপন মনে বলে ওঠেন : ‘শনির দৃষ্টি হলে পোড়া শোলও পালায়।’

শরশয্যা
শরশয্যা শব্দের আভিধানিক অর্থ মৃত্যুশয্যা, মুমূর্ষু অবস্থা প্রভৃতি। ‘শর’ ও ‘শয্যা’ এ দুটো শব্দের মিলনে ‘শরশয্যা’ শব্দের উৎপত্তি। মহাভারতে অর্জুন ভীষ্মকে অসংখ্য বাণে বিদ্ধ করলে ভীষ্ম সেসব বাণের উপর ভর দিয়ে শায়িত হন। বাণ বা শর দিয়ে নির্মিত কাঠামোর উপর শায়িত হয়েছেন বলে ওই শয্যা ‘শরশয্যা’ নামে পরিচিতি পায়। ইচ্ছামৃত্যুর বর থাকায় শরশয্যায় শায়িত থাকার পরও মৃত্যুবরণ না-করে ভীষ্ম দীর্ঘদিন জীবিতাবস্থায় শরশয্যায় শুয়ে থাকেন। কিন্তু নড়াচড়া বা কাজ করার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। মহাভারতের এ ঘটনা থেকে বাংলায় ‘শরশয্যা’ শব্দটি ‘মৃতপ্রায় ব্যক্তির শুয়ে থাকা’ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। বাংলায় ‘শরশয্যা’ শব্দটি মৃত্যুশয্যা বা অন্তিমকাল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

শশব্যস্ত
‘শশব্যস্ত’ অর্থ অতিব্যস্ত, ব্যস্তসমস্ত, চঞ্চল প্রভৃতি। এটি একটি প্রাণিবাচক শব্দ। ‘যা শশকের ন্যায় ব্যস্ত’ তাই শশব্যস্ত। শশক অর্থাৎ খরগোশ অতি চঞ্চল প্রাণী। সবসময় ব্যস্ত থাকে, সামান্য কারণেও তার ব্যস্ততার অন্ত নেই। প্রাণিকুলে ব্যস্ত ও চঞ্চল চরিত্রের অধিকারী এ প্রাণীটিকে মানুষ ভাষার মাধ্যমে ওই রকম চরিত্র প্রকাশের যোগ্য হিসাবে স্থাপন করেছে। তবে মানুষ শশকের ন্যায় সবসময় ব্যস্ততা না-দেখালেও নানা কারণে অতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার কোনো কোনো মানুষ স্বভাবগতভাবে চঞ্চল। তাদের ব্যস্ততা ‘শশব্যস্ত’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

শাক
‘শাক’ রান্না করে খাওয়ার উপযুক্ত লতাপাতা। পালং শাক, পুঁইশাক, কলমি শাক, ডাঁটা শাক, লাউ শাক, মুলা শাক, লাল শাক। তবে ‘শাক’ শব্দের আদি অর্থ মানুষ যদ্দ¦ারা ভোজন কার্য সম্পাদন করতে পারে। আমরা বলি ভাত খাচ্ছি, ভাত খেয়েছি কথাটা আসলে পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ শুধু ভাত সাধারণত কেউ খায় না। খাওয়াও সহজ নয়। ভাতের সঙ্গে নানা তরকারি ও বিভিন্ন ব্যঞ্জনের অনুষঙ্গ প্রয়োজন। এ বিবেচনায় সকল প্রকার সবজিই শাক। আরও ব্যাপক অর্থে মাছ-মাংসও কিন্তু শাক। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে শাক ছয় প্রকার। যথা : পত্র শাক, পুষ্প শাক, ফল শাক, নাল শাক, কন্দ শাক ও সংস্বেদন শাক। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী পালং, পুঁই, কলমি, লাল প্রভৃতি পত্র শাক; ফুলকপি, কলার মোচা, বকফুল, কুমড়ো ফুল প্রভৃতি ফুল শাক; লাউ-কুমড়োর লতা, পুষ্প শাক; কচুর লতি ইত্যাদি নাল শাক; বেগুন, ঢেঁড়শ, পটোল, চিচিঙ্গা ইত্যাদি ফল শাক; আলু, ওলকচু, মুলা, গাজর প্রভৃতি কন্দ শাক এবং মাশরুম, পাতাল কোঁড় প্রভৃতি সংস্বেদন শাক। তবে বর্তমানে বাংলার শাক কিন্তু সে অর্থে প্রয়োগ করা হয় না। বাংলায় ‘শাক’ শব্দ দিয়ে শুধু মূলত পত্র শাক বা পাতা শাককে বোঝানো হয়।

শিকেয় তোলা
‘শিকেয় তোলা’ বাগ্ভঙ্গিটির আভিধানিক অর্থ ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া। আপাতত নিষ্ফল বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে কোনো বিষয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা অর্থে বাগ্ধারাটির বহুল ব্যবহার দেখা যায়। ‘শিকে’ ও ‘তোলা’ শব্দ দুটির সংযোগে ‘শিকেয় তোলা’ কথাটির সৃষ্টি। ‘শিকে’ হলো পাটের বিনুনি দ্বারা প্রস্তুত একটি ঝুলন্ত আধার। একসময় এ দেশের প্রায় প্রত্যেক ঘরে জিনিসপত্র রাখার জন্য ‘শিকে’ ছিল অনিবার্য বস্তু। রান্নাবান্না বা খাওয়াদাওয়া শেষ করার পর হাঁড়িকুড়ি বা অবশিষ্ট খাদ্য শিকেয় তুলে রাখা হতো। প্রয়োজনবোধে এগুলো আবার নামানো হতো। সাময়িকভাবে কোনো দ্রব্যাদি তুলে রাখা কার্যক্রম হতে বাগ্ধারাটির উৎপত্তি।

শিখণ্ডী
‘শিখণ্ডী’ বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে একটি চমৎকার কাহিনি আছে। মহাভারত মহাকাব্যের এক বিখ্যাত চরিত্র শিখণ্ডী। তিনি ছিলেন নপংসুক। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শিখণ্ডী পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেন। নপংসুক বলে কুরুবীর ভীষ্ম শিখণ্ডীর উপর কোনো শর নিক্ষেপ করবেন না ঘোষণা করেছিলেন। যুদ্ধের দশম দিনে ভীষ্মের শরনিক্ষেপে পাণ্ডবগণ চরম বিপর্যস্ত। কিছুতেই ভীষ্মকে রোধ করা যাচ্ছিল না। তাঁর শরাঘাতে হাজার হাজার পাণ্ডব বীর নিহত। পরাজয় অতি নিকটে। এ অবস্থায় অর্জুন শিখণ্ডীকে সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু করেন। শিখণ্ডীকে দেখে ভীষ্ম শরবর্ষণে ক্ষান্ত হন। এ সুযোগে অর্জুন ভীষ্মকে ভূপাতিত করেন। শিখণ্ডী-বিষয়ক এ কাহিনি হতে বাংলার ‘শিখণ্ডী’ শব্দের উৎপত্তি। এখন শিখণ্ডী বলতে কেউ মহাভারতের বিখ্যাত চরিত্র শিখণ্ডীকে বোঝেন না। এখন এর অর্থ যাকে সামনে রেখে অন্যায় কাজ করা হয়।

শিরোপা
পারিতোষিক, পুরস্কার, খেতাব। ‘শিরোপা’ ফারসি শব্দ। এর মূল ও আদি অর্থ রাজা বা সম্রাট দ্বারা প্রদেয় মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরিধেয় পোশাক। তবে বাংলা বাগ্ভঙ্গিতে ‘শিরোপা’ বলতে এভাবে প্রদত্ত পরিধেয় পোশাক বোঝায় না। এর দ্বারা যেকোনো সম্মান, পুরস্কার, খেতাব প্রভৃতি বোঝায়। প্রতিযোগিতায় প্রদত্ত পুরস্কার বোঝাতে ‘শিরোপা’র ব্যবহার করা হয়।

শুশ্রূষা
‘শুশ্রƒষা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ সেবা, পরিচর্যা বা দেখাশুনা। তবে শুশ্রƒষা শব্দের মূল অর্থ হলো : ‘শোনার ইচ্ছা’। ‘শোনার ইচ্ছা’ সেবার অনিবার্য অনুষঙ্গ। অসুস্থ ব্যক্তির কখন কী-রকম বোধ হচ্ছে সেটা শোনা না-হলে সেবা করা সম্ভব নয়। এ কারণে ‘শোনা’ কর্মটি ‘শুশ্রƒষা’ শব্দটিকে ‘সেবা’কর্মের সঙ্গে একাকার করে দিয়েছে।

শোভাযাত্রা
‘শোভাযাত্রা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মিছিল। ‘শোভা’ ও ‘যাত্রা’ এ শব্দদ্বয়ের সংযোগে ‘শোভাযাত্রা’ শব্দের উৎপত্তি। এর দ্বারা শোভা বা সমারোহের সঙ্গে জনতার সম্মিলিত যাত্রা বোঝায়। যে যাত্রায় শোভাবর্ধনকারী উপকরণসহ যাত্রী থাকে মূলত সেটিই শোভাযাত্রা। একসময় রাজা ও জমিদারগণের যাত্রাকে ‘শোভাযাত্রা’ বলা হতো। এখন শোভাযাত্রার ধরন ও অর্থ দুটোই পাল্টে গেছে। শোভাযাত্রায় এখন শোভার প্রয়োজন হয় না। বহুলোক একত্রে কোনো উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে তাতে শোভা থাকুক বা না থাকুক সেটাই শোভাযাত্রা। এখন মিছিলের প্রতিশব্দ হিসাবেও ‘শোভাযাত্রা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
শ্রীমদ্ভাগবত
অষ্টাদশ মহাপুরাণের অন্তর্গত অষ্টাদশ খণ্ড শ্লোকযুক্ত মহাপুরাণ। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব এ গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি সমস্ত বেদ বেদান্ত ও পুরাণাদির সারমর্ম নিয়ে ব্রহ্মবিদ্যা সমন্বিত এ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ভগবতের দ্বাদশ খণ্ড শ্রীকৃষ্ণের মনুষ্যলীলা নিয়ে রচিত।

শ্রুতি
যা শ্র“ত হয় তা-ই ‘শ্র“তি’। কিন্তু পুরাণে শ্র“তির একটি বিশেষ অর্থ আছে। সেটি হচ্ছে : যা ভগবান কর্তৃক উদ্্ঘাটিত হয় তা-ই ‘শ্র“তি’। বেদের মন্ত্র ও ব্রাহ্মণকে ‘শ্র“তি’ বলা হয়। উপনিষদকেও এ পর্যায়ে ফেলা যায়।

শ্বাপদ
‘শ্বাপদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ মাংসাশী হিংস্র প্রাণী। যে প্রাণী একই সঙ্গে হিংস্র ও মাংসাশী সেটিই শ্বাপদ। কিন্তু ‘শ্বাপদ’ শব্দের মূল অর্থ কুকুরের পদ বা কুকুরের পা। ‘শ্বা’ সংস্কৃত শব্দ, এর অর্থ কুকুর; পদ মানে পা। এর বাহ্যিক অর্থ কুকুরের পায়ের মতো। সুতরাং শ্বাপদ বলতে যে সকল জীবজন্তুর পদ বা পা কুকুরের মতো তারাই শ্বাপদ। কিন্তু বাংলা ভাষায় শ্বাপদ বলতে হিংস্র জীবজন্তুই বোঝায়। এ অর্থে বাঘ, সিংহ, ভল্লুক প্রভৃতিও শ্বাপদ। শ্বাপদ বহুব্রীহি সমাসের একটি উদাহরণ।

শ্বেতহস্তী
প্রচুর ব্যয়বহুল বিষয়, যা পরিপালন করতে বা পরিচালনা করতে সর্বস্বান্ত হতে হয়। ‘শ্বেত’ ও ‘হস্তী’ শব্দ মিলে শ্বেতহস্তী। শ্বেত মানে সাদা আর
হস্তী মানে হাতি। সুতরাং ‘শ্বেতহস্তী’ মানে সাদা হাতি। আসলে এর বাহ্যিক অর্থ সাদা হাতি হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ যা লালন করতে প্রচুর ব্যয় হয় তা। থাইল্যান্ডের প্রাচীন নাম শ্যামদেশ বা শ্বেতহস্তীর দেশ। শ্যামদেশে শ্বেতহস্তী ছিল রাজকীয় সম্মান ও ঈশ্বরের অলৌকিক মহাশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক। দেশের সকল শ্বেতহস্তীর মালিক থাকতেন রাজা। রাজা রাজকীয় কোষাগার বা জনগণের অর্থ দিয়ে শ্বেতহস্তী লালন করতেন। এ হস্তী লালন-পালন করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হতো। ভারতবর্ষের ধর্মের ষাঁড়ের মতো শ্বেতহস্তীরা ইচ্ছেমতো বিচরণ করত। রাজার প্রতিনিধি ও পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে শ্বেতহস্তীকে প্রতিরোধ বা প্রতিহত করার ক্ষমতা কারও ছিল না। শ্বেতহস্তী শুধু খেত, কিন্তু কোনো কাজ করত না। শুধু ব্যয় হতো, আয় হতো না। রাজা কোনো কারণে যদি কোনো মন্ত্রী বা অমাত্যের ওপর অসন্তুষ্ট হতেন তাহলে সে মন্ত্রী বা অমাত্যকে রাজা শ্বেতহস্তী উপহার দিতেন। এ উপহার ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। উপহারস্বরূপ প্রাপ্ত শ্বেতহস্তীকে রাজকীয়ভাবে পরিপালন করতে হতো। এবং তা করতে গিয়ে ওই উপহারধারী অল্পসময়ের মধ্যে ফতুর হয়ে যেত। শ্বেতহস্তী পালন ছিল শুধু ব্যয়, আয়-রোজগারের কোনো বালাই ছিল না। এ অনুষঙ্গে প্রচুর ব্যয়বহুল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আয়বিহীন কোনো কাজ প্রকাশে ‘শ্বেতহস্তী’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়।


ষটকর্ম
স্মৃতি মতে যটকর্ম হচ্ছে : যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপন, দান ও প্রতিগ্রহ। তন্ত্র মতে : মারণ (প্রাণহারী ক্রিয়া দেবতা কালী); উচ্চাটন (স্বস্থান হতে উচ্ছেদ করবার ক্রিয়া দেবতা দুর্গা); স্তম্ভন (সকলের প্রবৃত্তিরোধক অর্থাৎ কার্যকারিতা শক্তি অবরোধকারী ক্রিয়া দেবতা রমা); বিদ্বেষণ (প্রণয়ীদের মধ্যে পরস্পর দ্বেষজনক ক্রিয়া দেবতা জ্যেষ্ঠা); বশীকরণ (যে ক্রিয়ায় লোক বশীভূত হয় দেবতা বাণী) ও শান্তি (যে ক্রিয়া দ্বারা রোগ, খারাপ কাজ, গ্রহদোষ নিবারিত হয় দেবতা রবি)। যোগশাস্ত্রে যোগের ছয়টি ক্রিয়া রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে দৃঢ়তা (আসনের দ্বারা), ধৈর্য (প্রত্যাহার দ্বারা), স্থৈর্য (মুদ্রা দ্বারা), লাঘব (প্রাণায়াম দ্বারা), প্রত্যক্ষ (ধ্যানের দ্বারা), নির্লিপ্ত (সমাধির দ্বারা), শোধন (ধৌতি, বস্তি, নেতি, লৌলিকা, ত্রাটক ও কপালভাতি) প্রভৃতি।

ষড়যন্ত্র
তান্ত্রিকদের তন্ত্রসাধনার ছয় রকম আভিচারিক প্রক্রিয়া থেকে ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দের উদ্ভব। আভিচারিক প্রক্রিয়া মানে নিজের ইষ্ট কিন্তু অন্যের অনিষ্ট সাধনের জন্য করা তান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তাই ষড়যন্ত্র শব্দের মূল অর্থ হলো ছয়টি বন্ধন। এ ছয় বন্ধনে যাকে বাঁধা যাবে তার সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। ছয়টি বন্ধনের সাধনাই হলো ‘ষড়যন্ত্র’। এ ছয়টি বন্ধন হলো : (১) মারণ বা প্রাণ হরণ করা; (২) মোহন বা চিত্তবিভ্রম ঘটানো; (৩) স্তম্ভন বা যাবতীয় প্রবৃত্তি নষ্ট করা; (৪) বিদ্বেষণ বা অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা; (৫) উচ্চাটন বা স্বদেশবিভ্রম ঘটানো এবং (৬) বশীকরণ বা ইচ্ছাশক্তি রোধ করে বশে আনা। বর্তমানে তান্ত্রিকতা না থাকলেও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ছয় প্রকার আভিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজের ইষ্ট ও অন্যের ক্ষতিসাধন অব্যাহত আছে।

ষণ্ড
দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের ষণ্ড ও অমর্ক নামের দুই পুত্র ছিল। দুই ভাই একযোগে হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদের শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। বরাহকল্পে দেবাসুরের মধ্যে কয়েকবার যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে দেবপক্ষে থেকে এঁরা যুদ্ধ করেন। প্রথমে এরা অসুরদের সেনাপতি ছিল এবং যুদ্ধে দেবতাদের পরাজিত করে। দেবতারা মন্ত্রণা করে এক বিশাল যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে ষণ্ডমার্ককে অমৃত পান করিয়ে দেবতারা তাদের অসুর পক্ষ ত্যাগ করার অনুরোধ করেন। অমৃতপানে মত্ত দুই অসুর-সেনাপতি অসুরপক্ষ ত্যাগ করে। ফলে পরবর্তী যুদ্ধে অসুরপক্ষ পরাজিত হয়।

ষোলোকলা
‘ষোলোকলা’ শব্দের অর্থ পূর্ণাবয়ব, সম্পূর্ণ, পুরোপুরি, চাঁদের ১৬ অংশ প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে ‘চাঁদের ষোলোকলা’ থেকে বাংলা বাগ্ভঙ্গি ‘ষোলোকলার’ উৎপত্তি। কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের পরিণতি বা পূর্ণতা প্রকাশে বাংলা ভাষায় ‘ষোলোকলা’ মনোরম কাব্যময় শব্দ। তবে এগুলো কিন্তু চম্পাকলা সাগরকলার মতো কলা নয়, ষোলোটি চন্দ্রকলা। চন্দ্রকলা বলতে বোঝায় পৃথিবী হতে দৃশ্যমান চন্দ্রে ক্ষয় এবং বৃদ্ধির সময়কাল। চন্দ্রকলাকে ষোড়শ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। চন্দ্রের বিভিন্ন আলোকিত অংশ বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়। শুক্লপক্ষে চন্দ্র প্রতিদিন একটু একটু করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে তার ষোড়শকলা সম্পূর্ণ করে। চন্দ্রের এ ষোড়শবিধ কলা হলো : অমৃতা, মানদা, পূষা, তুষ্টি, পুষ্টি, রতি, ধৃতি, শশিনী, চন্দ্রিকা, কান্তি, জ্যোৎস্না, শ্রী, প্রীতি, অক্ষদা, পূর্ণা এবং পূর্ণামৃতা। বাংলা বাগ্রীতিতে সোজা কথায়, মানুষের কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক পূর্ণতায় পৌঁছানোর নামই ‘ষোলোকলা পূর্ণ হওয়া’। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনের বাসনা পূর্ণ হওয়াই ‘ষোলোকলা পূর্ণ হওয়া’। আবার কারও কারও বেলায় পাপেরও ষোলোকলা পূর্ণ হয়, মানে তার পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদের ষোলোকলা পূর্ণ হওয়া মানে পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে জীবনের সফল পরিসমাপ্তি। অবশ্য ‘পরিপূর্ণ’ অর্থেও ষোলোকলার ব্যবহার দেখা যায়। যেমন শরৎচন্দ্র লিখেছেন : ‘বাপের স্বভাব একেবারে ষোলকলায় পেয়েছে।’

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!