বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

সপ্তবিংশ অধ্যায়

সই
‘সই’ শব্দের আভিধানিক অর্থ স্বাক্ষর, দস্তখত। বাংলায় ‘সই’ শব্দের পাঁচটি অর্থ রয়েছে। আলোচ্য ‘সই’ অর্থ স্বাক্ষর। এ ‘সই’ শব্দটি আরবি ‘সহিহ্’ শব্দ থেকে এসেছে। আরবি ‘সহিহ্্’ বাংলায় ‘সহি’ হিসাবে এসে ‘সই’ শব্দে স্থিত হয়েছে। আরবি ‘সহি’ শব্দের অর্থ ঠিক, বিশুদ্ধ, নির্ভরযোগ্য, যথার্থ প্রভৃতি। ‘সই’-এর মাধ্যমে কোনো জিনিসের নির্ভুলতা, যথার্থতা, বিশুদ্ধতা প্রভৃতি নির্ধারণ করা হয়। কেউ কোনো দলিলে সই দিলে ধরে নেওয়া হয় যে, সইদাতার পক্ষে দলিলটিকে সত্য বলে প্রত্যয়ন করা হয়েছে। আর এক ‘সই’ হলো মেয়ে বন্ধু; যেমন খুখু আমার ছেলেবেলার সই।

সংকীর্ণ
‘সংকীর্ণ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ সংকুচিত, সরু, অনুদার, হীন প্রভৃতি। যেমন ‘সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তা’ কথায় ‘সংকীর্ণ’ অর্থ হয় হীন বা অনুদার। সংস্কৃত হতে আগত এ শব্দটির মূল অর্থ ছিল বহুলোক সমাকীর্ণ, অর্থাৎ বহুলোকে পূর্ণ, ব্যাপ্ত, মিশ্রিত ইত্যাদি। তাহলে কীভাবে এবং কেন বাংলায় এসে শব্দটি তার অর্থ পরিবর্তন করে ফেলল? যেখানে বহুলোক বাস করে, বহুলোক মিলিত হয় সেখানে ব্যাপ্ত বা বিস্তৃত পদ বা এলাকাও যোগাযোগ, যাতায়াত বা বসবাসের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়ে। সরু হয়ে পড়ে বিশাল যাতায়াতের পথ এবং আয়-রোজগারের পথ। হয়তো সে অর্থে সংস্কৃত ‘বিস্তৃত জনপদ’ বাংলায় এসে ‘সংকীর্ণ’ অর্থ ধারণ করেছে।

সংগ্রাম
‘সংগ্রাম’ শব্দটির আধুনিক ও প্রচলিত অর্থ ‘সমর/যুদ্ধ’। সমর বা যুদ্ধ থেকে নয়, মূলত ‘গ্রাম’ থেকে ‘সংগ্রাম’ শব্দের উৎপত্তি। সংগ্রাম শব্দের মূল অর্থ ‘যে বিবাদে গ্রামবাসী সম্মিলিত’। আদি অর্থটি অভিন্ন থেকে বর্তমানে ‘সংগ্রাম’ শব্দটি গ্রাম ছেড়ে দেশ বা জাতির জন্যও সম্মিলিত সমর বা যুদ্ধ প্রকাশে ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রামবাসীর ‘সম্মিলিত বিবাদ’ শব্দটিকে বাঙালিরা বেশ চালাকির সঙ্গে ‘সংগ্রাম’ বানিয়ে দিয়েছে।

সংবাদ
‘সংবাদ’ শব্দের প্রচলিত অর্থ খবর। তবে এর মূল অর্থ পরস্পর কথাবার্তা, সম্ভাষণ, সাদৃশ্য প্রভৃতি। মূলত ‘সন্দেশ’ থেকে ‘সংবাদ’। ‘সন্দেশ’ শব্দের মূল অর্থ যা সম্যকরূপে দিক্-নির্দেশনা প্রদান করে বা যা যথার্থ বিষয় বা বস্তুকে জানায়। একসময় সংবাদকে ‘সন্দেশ’ বলা হতো। সেকালে কোনো আত্মীয়কে সুখবর দিতে হলে খবরদাতা বা খবরদাতার পক্ষ থেকে আত্মীয় বাড়িতে মিষ্টান্ন নিয়ে যাওয়া হতো। এ অনুষঙ্গের সূত্রে ‘সন্দেশ’ শব্দের অর্থ ‘মিষ্টান্ন’ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এর অর্থ আরও পরিবর্তিত হয়। এখন ‘সন্দেশ’ বলতে কেবল বিশেষ ধরনের মিষ্টান্নকে নির্দেশ করে। ‘সন্দেশ’ শব্দের পরে আসে ‘সংবাদ’ এবং মুসলমান আমলে আসে ‘খবর’। ‘খবর’ ফারসি শব্দ কিন্তু ‘সন্দেশ’ ও ‘সংবাদ’ দুটোই সংস্কৃত শব্দ। এখনও গ্রামগঞ্জে নিমন্ত্রণের সংবাদ দিতে অনেকে গুরুত্বানুসারে পান-মিষ্টি নিয়ে আসেন।

সংহিতা
যাতে বিষয়সমূহ সংহিতা বা একত্রিত করা হয়েছে তাকে সংহিতা বলে। যেমন ঋগ্বেদসংহিতা, মনুসংহিতা প্রভৃতি। অন্যকথায়, মনু, অত্রি প্রমুখ ঋষিরা যে ধর্মশাস্ত্র প্রণয়ন করেন, তা ‘সংহিতা’ নামে পরিচিত। মনু, অত্রি, বিষ্ণু, হারীত, সংবর্ত, কাত্যায়ন, বৃহস্পতি, পরাশর, ব্যাস, দক্ষ, গৌতম, শীতাতপ ও বশিষ্ঠ প্রমুখ প্রণীত ঊনবিংশ সংহিতা রয়েছে।

সগর
ইক্ষ¦াকুবংশীয় রাজা। ‘স’ অর্থ সহ এবং ‘গর’ অর্থ বিষ। ‘বিষের সঙ্গে জাত’ বলে তাঁর নাম সগর। রাজা রাহুর ঔরসে ও স্ত্রী যাদবীর গর্ভে সগর জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে সগর নামের একটি জেলা ও শহর রয়েছে।
সঞ্জীবনী
যে বিদ্যার ফলে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা যায়, তাকে ‘সঞ্জীবনী বিদ্যা’ বলা হয়। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য এ বিদ্যা জানতেন।

সৎমা
‘সৎ’ অর্থ ভালো, সুতরাং ‘সৎমা’ অর্থ ভালো যে মা। কিন্তু সৎমায়ের মতো নিষ্ঠুর আর কেউ কি আছে? সৎমায়ের নৃশংসতার কতো করুণ কাহিনি প্রত্যহ আমাদের শুনতে হয়, অনেককে দেখতে হয়, কাউকে কাউকে ভুগতেও হয়। তো এমন নিষ্ঠুর ও নৃশংস মায়ের নাম কীভাবে ‘সৎমা’ হলো? সংস্কৃত ‘সপত্নী’ থেকে সতিন এবং সতিন থেকে ‘সৎ’ এসেছে। এ সৎ-এর সঙ্গে মা যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘সৎমা’। মূলত সতীনের ‘সৎ’ থেকে ‘সৎমা’ শব্দের উৎপত্তি। তাই সৎমা শব্দের ‘সৎ’ ভালো ‘সৎ’ নয়; সতিন সৎ। মঞ্জুভাষণ হিসাবেও অনেকে ‘সৎমা’ শব্দের ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করে থাকেন। জনৈক পণ্ডিতের কয়েকজন শিশু সন্তান ছিল। হঠাৎ তাদের মা মারা যায়। সন্তানের লালন-পালনের জন্য পণ্ডিত নতুন বউ ঘরে তুলতে বাধ্য হন। বিয়ের পূর্বে নতুন বউকে কথা দিতে হয়েছিল তিনি সততার সঙ্গে এবং সৎ থেকে পণ্ডিতের সন্তানদের লালন-পালন করবেন। পণ্ডিতের বাড়ি আসে নতুন বউ। অনেকে জানতে চাইতেন ‘এ কোন ধরনের মা?’ পণ্ডিত বলতেন ‘সৎমা’। খুশি হতেন পণ্ডিতের নতুন বউ। এখনও এরূপ কথা দিয়ে ও কথা নিয়ে অনেকে নিজের নতুন বউ এবং সন্তানের ‘সৎমা’কে বিয়ে করে।

সন/সাল
‘১৯৪৩ সালে/সনে সাহিত্যিক আহমদ ছফা জন্মগ্রহণ করেন।’ এ বাক্যটিতে ব্যবহৃত ‘সাল’ শব্দটি যদি খ্রিস্টাব্দ বোঝানোর জন্য লেখা হয় তাহলে সাল কিংবা সন লেখা ভুল, বাংলা সন প্রকাশের জন্য লেখা হয়ে থাকলেও ভুল। অউ (অহহড় উড়সরহর = রহ ঃযব ুবধৎ ড়ভ ড়ঁৎ খড়ৎফ) শব্দের অর্থ খ্রিস্টাব্দ, কখনো সাল বা সন নয়। এখানে লর্ড শব্দটি দ্বারা যিশু খ্রিস্টকে এবং বছর বলতে তাঁর মৃত্যুবর্ষকে প্রকাশ করা হয়েছে। তাই সাল বা সন শব্দটি ইংরেজি খ্রিস্টাব্দের বিকল্প হতে পারে না। যেমন হতে পারে না ‘হিজরি’-র বিকল্প সন বা সাল। বস্তুত ইংরেজি (ণবধৎ) শব্দের অর্থ সন বা সাল। খ্রিস্টাব্দ, বঙ্গাব্দ, হিজরি, মঘি কিংবা অন্য কোনো বছর-পরিমাপক পদ্ধতির নাম বোঝাতে সাল/সন ব্যবহার করা অশুদ্ধ। এগুলো ফুট, মিটার, পাউন্ড, কেজি প্রভৃতির ন্যায় এক প্রকার একক। অতএব ইংরেজি সন লিখতে খ্রিস্টাব্দ, বাংলা সনে বঙ্গাব্দ, হিজরি সনে হিজরি লিখুন সন বা সাল নয়।

সনদ
‘সনদ’ শব্দটি বিশেষ্য এবং আরবি শব্দ। সনদ শব্দটি মূলত আরবি ‘সানাদুন’ শব্দের বাংলা ও উর্দু প্রতিরূপ, যার বহুবচন ‘সানাদাত’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় স্বীকৃতিপত্র, প্রতিশ্র“তিপত্র, প্রমাণপত্র, দস্তাবেজ, রশিদ, সনদ। এর আরও অর্থ হতে পারে উপাধিপত্র বা প্রজ্ঞাপত্র ইংরেজিতে যাকে বলে ‘সার্টিফিকেট’। শুধু ‘সনদ’ শব্দ দ্বারাই উপাধিপত্র বা সার্টিফিকেট অর্থ প্রকাশ পায়। অনুরূপ শব্দ যেমন ‘ফরমান’ : এটি বিশেষ্য এবং ফারসি শব্দ। এর অর্থ হুকুমনামা বা আদেশপত্র। আমরা যেমন আদেশপত্রের অনুকরণে ফরমানপত্র বলতে পারি না, তেমনি উপাধিপত্র বা প্রশংসাপত্রের অনুকরণে সনদপত্রও লিখতে পারি না। শুধু ‘সনদ’ লিখলেই ঠিক হবে।

সন্দেশ
‘সন্দেশ’ নামটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। এর মূল অর্থ সংবাদ। পূর্বে কারও বাড়িতে সুখবর নিয়ে যাবার সময় হাতে করে কিছু মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখনও তা দেখা যায়। সুসংবাদ স্বভাবতই সুখের, মিষ্টিময়। তাই ফারসি সন্দেশ তথা সংবাদ বাংলায় সুসংবাদ বিতরণের অন্যতম সঙ্গী মিষ্টির সাথে একাকার হয়ে ‘সন্দেশ’ নাম ধারণ করে। উল্লেখ্য, পূর্বে সন্দেশ বলতে যেকোনো মিষ্টান্নকে বুঝাত। এখন অবশ্য ‘সন্দেশ’ একটি বিশেষ ধরনের মিষ্টি।

সপ্তসমুদ্র
ভারতীয় পুরাণে পৃথিবীর সমুদ্রসমূহকে সাতটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ সাতটি সমুদ্র হচ্ছে : লবণ, ইক্ষু, সুরা, সর্পি, দধি, দুগ্ধ, জল। ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত এ সাত সমুদ্রকে একত্রে ‘সপ্তসমুদ্র’ বলা হয়।
সব্যসাচী
‘সব্যসাচী’ শব্দের মূল অর্থ ডান ও বাম উভয় হাতে যিনি অসামান্য দক্ষতায় শর নিক্ষেপ করতে সক্ষম। মহাভারতের তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন এমন দক্ষতার অধিকারী ছিলেন বলে তাঁকে সব্যসাচী বলা হতো। তবে সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসে ‘সব্যসাচী’ শব্দের অর্থের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। এখন ‘সব্যসাচী’ বলতে নানাবিধ কর্মসম্পাদনে সক্ষম ব্যক্তিকে প্রকাশ করা হয়। যিনি একধারে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, ছড়া, প্রবন্ধ প্রভৃতি সৃষ্টিতে সক্ষম তিনি সব্যসাচী লেখক। সৈয়দ শামসুল হক এ অভিধায় ভূষিত।

সমস্যা
শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ জটিল, সংকট, দুরূহ প্রশ্ন, জটিল পরিস্থিতি, প্রতিকূল অবস্থা প্রভৃতি। শব্দটির আদি অর্থ ছিল : সংক্ষেপ করা, শ্লোক সম্পন্ন করার জন্য সংক্ষিপ্ত বাক্য, মিশ্রণ প্রভৃতি। মধ্যযুগের বাংলায় শব্দটির অন্য একটি অর্থ ধারণ করতে দেখা যায়। সেটি হচ্ছে : কূট বা জটিল প্রশ্ন। পরবর্তীকালে শব্দটি তার পূর্বের অর্থ পরিবর্তন করে প্রচলিত জটিল, সংকট, দুরূহ প্রশ্ন, জটিল পরিস্থিতি, প্রতিকূল অবস্থা প্রভৃতি অর্থ ধারণ করে। তো, এ পরিবর্তনের কি যৌক্তিক কোনো কারণ আছে? কারণ তো আছে, সঙ্গে অকাট্য যুক্তিও। সংক্ষেপ করা, সহজ করা বা শ্লোক সম্পূর্ণ করার জন্য বাক্যকে সংক্ষেপ করা প্রকৃত অর্থে অত্যন্ত জটিল ও দুরূহ কাজ। এর চেয়ে কঠিন কাজ খুব কম আছে। সে হিসাবে সমস্যার পূর্ব অর্থের চেয়ে বর্তমান প্রচলিত অর্থ আরও যৌক্তিক।

সম্ভ্রান্ত
‘সম্ভ্রান্ত’ সংস্কৃত হতে আগত একটি শব্দ। বাংলা অভিধানে শব্দটির অর্থ দেওয়া হয়েছে : অভিজাত, কুলীন, আশরাফ, মান্য, মর্যাদাশীল, সমাদরযোগ্য ইত্যাদি। কিন্তু শব্দটির মূল ও আদি অর্থ ‘আবর্তিত, ভীত, উৎকণ্ঠিত, হতবুদ্ধি’ প্রভৃতি। ‘সম্ভ্রান্ত’ ব্যক্তির দাপটে সাধারণ মানুষ ভীত, উৎকণ্ঠিত বা হতবুদ্ধি হয়ে যায় বলেই হয়তো শব্দটি বাংলায় আদি অর্থের পরিবর্তে বর্তমান অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। এতে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরও নাখোশ হওয়ার কারণ নেই।
সসেমিরা
‘সসেমিরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘বাহ্যজ্ঞানশূন্য, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব, প্রায় প্রতিকারহীন অবস্থা’। এটি সংস্কৃত কবি কালিদাসের ‘দ্বাত্রিংশপুত্তলিকা’ নাটকে বর্ণিত চারটি রহস্যময় শ্লোকের প্রত্যেকটির আদ্যাক্ষরের সমষ্টি। রাজা বিক্রমাদিত্যের বত্রিশ সিংহাসন এবং ভোজরাজাকে নিয়ে পৌরাণিক উপাখ্যান ‘দ্বাত্রিংশপুত্তলিকা’য় অভিশাপগ্রস্ত রাজপুত্র জয়পালের পিশাচ অবস্থা প্রাপ্তির পর হতবুদ্ধি অবস্থায় আপন মনে বলে ওঠেন, ‘সসেমিরা’। এ স্বগতোক্তি থেকে ‘সসেমিরা’ শব্দটির উৎপত্তি। যা আধুনিক বাংলায় ‘বাহ্যজ্ঞানশূন্য, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব, প্রায় প্রতিকারহীন অবস্থা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে প্রয়োগ করা হয়।

সহজ
সহজ শব্দের অর্থ সরল, সোজা, অকঠিন, শান্ত, অকপট, সহজাত, স্বাভাবিক। এর বিপরীত শব্দ হতে পারে কঠিন, জটিল প্রভৃতি। তবে সহজ কথাটির আদি ও মূল অর্থ ছিল : জন্মের সঙ্গে জাত, বংশগত ও স্বাভাবিক। মূলত, শব্দটি সহোদর বা একই মায়ের গর্ভজাত, যমজ প্রভৃতি বোঝানোর জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। এখন কিন্তু ‘সহজ’ শব্দটি যমজ বা সহোদর অর্থে প্রয়োগ করলে প্রয়োগকারীকে পাগল না-বলে কারও উপায় থাকবে না। যিনি সহজ তিনি অকপট, সরল, প্যাঁচগোঁজহীন, স্বাভাবিক হন। সহজ জিনিসকে বিনাকষ্টে আয়ত্তে আনা যায়। যা সহজ তা অর্জনে তেমন শ্রম দিতে হয় না। অর্থাৎ সহজ জিনিস সবসময় অনায়াসলব্ধ ও সহজগম্য। সহোদর, যমজ প্রভৃতির সম্পর্কের মতোই ‘সহজ’ বিষয়টি সরল ও অনাবিল বলেই হয়তো সংস্কৃত ‘সহোদর’ বাংলায় এসে সহজ হয়ে গেছে।

সহানুভূতি
‘অবলাবান্ধব’ পত্রিকার সম্পাদক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৪-১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ) ঝুসঢ়ধঃযু শব্দের বাংলা করেছিলেন সহানুভূতি। ‘সহানুভূতি’ শব্দ পেয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “সহানুভূতির উপর আমার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই।” ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ২৬ মাঘ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে পঠিত ‘শব্দচয়ন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, “সাহিত্যের হট্টগোলে এমন অনেক শব্দের আমদানি হয় যা ভাষাকে চিরদিনই পীড়া দিতে থাকে, যেমন সহানুভূতি।” স + অনুভূতি = সহানুভূতি। ‘সহানুভূতি’ শব্দের সঙ্গে ‘সহ, সঙ্গে বা সাথে’ বিদ্যমান। সহানুভূতির অর্থ হলো ‘অন্যের দুঃখ-বেদনা তার সঙ্গে সমান অনুভূতি’। তাহলে সহানুভূতির সঙ্গে বাগ্ভঙ্গির অর্থ হয় : ‘অন্যের দুঃখ-বেদনায় তার সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতি’। সংগতকারণে সহানভূতি শব্দের সঙ্গে পুনরায় সঙ্গে সাথে বা সহিত যুক্ত করলে শব্দটির অর্থ অনর্থকভাবে হাস্যকর হয়ে ওঠে। অতএব সহানুভূতি শব্দের সঙ্গে পুনরায় সঙ্গে/সাথে যোগ করা সমীচীন নয়।

স্তম্ভিত
‘স্তম্ভিত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হতবাক, হতভম্ব, আবিষ্ট, মুগ্ধ ইত্যাদি। ঘরের ‘স্তম্ভ’ বা থাম হতে শব্দটির ব্যুৎপত্তি। ঘরের স্তম্ভ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে, নড়েও না চড়েও না। মানুষ ‘স্তম্ভিত’ হলে স্তম্ভের ন্যায় কিছু মহূর্তের জন্য হলেও নিশ্চল হয়ে যায়। শুধু মানুষ কেন, প্রাণীর ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। ঘরের স্তম্ভ যেমন নড়ে না, নিশ্চল হয়ে থাকে তেমনি হতবাক হয়ে গেলে মানুষও স্তম্ভের মতো নিশ্চল হয়ে যায়। অবশ্য মানুষ স্তম্ভিত হলে স্তম্ভ হয়ে যায় না, স্তম্ভবৎ হয়ে যায়। এজন্য মানুষ বা প্রাণীর হতবাক/হতভম্ব বোঝাতে স্তম্ভকে এনে স্তম্ভিত করা হয়েছে। ‘সম্ভ্রান্ত’ ব্যক্তির দাপটে সাধারণ মানুষ ভীত, উৎকণ্ঠিত বা হতবুদ্ধি হয়ে যায় বলেই হয়তো শব্দটি বাংলায় আদি অর্থের পরিবর্তে বর্তমান অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।

সাঙ্গোপাঙ্গ
দলবল, অনুচর, চেলা, পরিষদ, বন্ধুদল প্রভৃতি। ‘সাঙ্গোপাঙ্গ’ একটি সংস্কৃত শব্দ। ‘বেদ’ ও তার বিভাজন অংশসমূহ ‘সাঙ্গোপাঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল। যেমন ‘বেদ’ পুরো শরীর কিন্তু শিক্ষা, কল্প, পুরাণ, ব্যাকরণ প্রভৃতি তার উপাঙ্গ। অর্থাৎ সাঙ্গোপাঙ্গ বলতে ‘বেদ’-এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অঙ্গ, উপাঙ্গ, খণ্ড, কাণ্ড প্রভৃতিকে প্রকাশ করা হতো। সাঙ্গোপাঙ্গ ছাড়া ‘বেদ’ পরিপূর্ণ কার্যনির্বাহে সফল হতো না। সাধারণভাবে প্রাত্যহিক জীবনের অনেক কাজ অনেকের পক্ষে ‘সাঙ্গোপাঙ্গ’ ছাড়া যথাযথভাবে করা সম্ভব হয় না। বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে বিষয়টি আরও কঠিনভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। এজন্য সংস্কৃত ‘বেদ-সংশ্লিষ্ট’ শব্দ ‘সাঙ্গোপাঙ্গ’ বাংলায় এসে দলবল, অনুচর, চেলা বা পরিষদ অর্থ ধারণ করেছে। আসলে শব্দটির বাহ্যিক অর্থ পরিবর্তন হলেও মূল অর্থ ঠিকই আছে। এমন অনেক ব্যক্তি আছে যারা অনুচর বা চেলা ছাড়া চলতে পারে না। রাষ্ট্রীয় কার্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিষদ ও পরিষদ অনিবার্য অঙ্গ।

সাতসতেরো
‘সাত-পাঁচ না ভাবা’ কিংবা ‘সাত সকাল’ ছাড়াও ‘সাত’ নিয়ে বাংলা ভাষায় আরও বেশ কয়েকটি বাগ্ধারার প্রচলন আছে। যেমন সাত জন্মে (কখনো), সাত-পাঁচ ভাবা (নানা চিন্তা), সাতঘাটের কানাকড়ি (অকিঞ্চিৎকর সংগ্রহ), সাতেও নেই পাঁচেও নেই (সংশ্রবশূন্য), সাতচড়ে রা করে না (অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির লোক), সাত পুরুষে না শোনা (বংশানুক্রমে অশ্র“ত), সাতরাজার ধন মানিক (কষ্টার্জিত মহা-মূল্যবান সম্পদ), সাত ঘাটের জল খাওয়া/খাওয়ানো (বহু বিপদে পড়া বা ফেলা), সাত তাড়াতাড়ি (অতি শীঘ্র), সাত দিক (সর্বত্র) প্রভৃতি। এ সকল ‘সাত’-যুক্ত বাগ্ধারায় ‘সাত’ সংখ্যাটি মূলত ‘সপ্তাহ’ বা ‘সাত দিন’ বর্ণনার মাধ্যমে সময়ের পরিধি (অতিরিক্ত বা কম) প্রকাশ করেছে। সাত হচ্ছে সপ্তাহের সাত বারের প্রতীক। যা দিয়ে ‘বার’ শুরু এবং শেষ। তাই সাত দিয়ে বিস্তৃত, আদি-অন্ত, গভীর, নিবিড়, সময়, বৃদ্ধি, হ্রাস, কম প্রভৃতি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হতো। শুধু তাই নয়, ‘সাত আসমান’, ‘সাত স্বর্গ’, ‘সাত নরক’, ’সাত সাগর’, ‘সপ্তরথী’, ‘সপ্তর্ষি’, ‘সপ্তলোক’, ‘সপ্তশতী’, ‘সপ্তানক’ ‘সৌভাগ্যের সাত’ প্রভৃতির আদি-অন্ত, পরিধিও সপ্তাহের সাতদিনের সঙ্গে অভিন্ন অর্থ প্রকাশে বাগ্ধারাগুলোকে প্রভাবিত করেছে। তাই ‘সাত’ শব্দটি যেমন অতিরিক্তি প্রকাশে ব্যবহার করা হতো তেমনি অতি-কম প্রকাশেও ব্যবহার করা হতো। কারণ সাত ছিল আদি-অন্ত বা কম-বেশির এবং ভালো-মন্দ প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির পরম ও চরম পরিধি।
‘সাত পুরুষে না শোনা’ বাগ্ধারায় ‘সাত’ দ্বারা দীর্ঘ সময় প্রকাশ করা হয়েছে। আবার ‘সাত তাড়াতাড়ি’ বাগ্ধারার বর্ণিত ‘সাত প্রকাশ করছে ‘স্বল্পতা’। তেমনি ‘সাত সকাল’ বাগ্ধারার ‘সাত’ দ্বারা অতি সকাল প্রকাশ করা হচ্ছে। এমন আরও কয়েকটি উদাহরণ : সাত সন্ধ্যা, সাত জনম, সাত যুগ ইত্যাদি।
সাবেক ও প্রাক্তন
‘সাবেক’ আর ‘প্রাক্তন’ : ‘সাবেক’ শব্দটি বাংলায় এসেছে আরবি সাবিক থেকে, কাজেই সাবেক বিদেশি শব্দ। ‘প্রাক্তন’ এসেছে সংস্কৃত থেকে, কাজেই প্রাক্তন তৎসম শব্দ। সাধারণভাবে, চলিত ভাষায় ‘সাবেক’ এবং সাধু ভাষায় ‘প্রাক্তন’ শব্দটি ব্যবহার করা যুতসই ও যথাযথ হবে বলে মনে হয়। ‘প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী’ ও ‘সাবেক সচিব’ এই দুটি বাগ্ভঙ্গিতে প্রাক্তন ও সাবেক এ বিশেষণ পদ দুটো পরস্পরের স্থলাভিষিক্ত হলে আমরা পাই ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ ও ‘প্রাক্তন সচিব’। প্রথম দুটি শব্দবন্ধের তুলনায় পরবর্তী দুটি শব্দবন্ধ শৈলীর দিক দিয়ে ভিন্ন হলেও অর্থের দিক দিয়ে অভিন্ন। তবে, প্রাক্তন শব্দের কিছু অর্থগত ও প্রায়োগিক অনুপমতা রয়েছে। ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’র ‘প্রাক্তন’ ভুক্তিতে : ‘হিন্দু বিশ্বাস মতে জন্মান্তরের; পূর্বজন্মে করা হয়েছে এমন (প্রাক্তনের ফল ত্বরা ফলিবে এ পুরে; প্রাক্তনের গতি, হায়, কার সাধ্য রোধে)।” উদ্ধৃতির উদাহরণে ‘প্রাক্তন’ শব্দটি ‘সাবেক’ শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সমীচীন হবে না। নিচের দুটো বাক্য লক্ষ করুন :
(১) সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন।
(২) প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। প্রথম বাক্যে ‘সাবেক’ প্রয়োগ ও দ্বিতীয় বাক্যে ‘প্রাক্তন’ প্রয়োগ সর্বোত্তম।

সামান্য
‘সামান্য’ শব্দের আভিধানিক অর্থ তুচ্ছ, নগণ্য, অগ্রাহ্য, হেলাফেলা, অল্প, সাধারণ প্রভৃতি। তবে এর মূল ও আদি অর্থ বর্তমান প্রচলিত অর্থ হতে অনেক দূরে ছিল। ‘সামান্য’ শব্দটির মূল অর্থ ছিল সমান ভাব, সমান সমান, সমানতা প্রভৃতি। এ সমান ভাব বা সমানতা কীভাবে তুচ্ছ বা নগণ্য হয়ে গেল তা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কোনো জিনিস ভাগ করার সময় প্রাচীনকালে বর্তমান কালের মতো যথার্থ পরিমাপক যন্ত্রের এত প্রাচুর্য ছিল না। থাকলেও সময় বা নানা অসুবিধা বিবেচনায় চোখের আন্দাজে পণ্যাদি ভাগ বা বিভাজন করা হতো। এখনও বাজারে মাছ, শস্য, সবজি প্রভৃতি দাঁড়িপাল্লা ছাড়া চোখের আন্দাজে ভাগ করে বিক্রি হতে দেখা যায়। ভাগসমূহ আপাতদৃষ্টিতে ওজন, গুণ ও পরিমাণে পুরোপুরি সমান হতো না, যেভাবে করা হোক না কেন, চোখের আন্দাজে করা হতো বলে সামান্য হেরফের থেকেই যেত। এ পার্থক্য তুচ্ছ, নগণ্য বা খুব অল্প হলে ধরে নেওয়া হতো বিভাজনগুলো সমান হয়েছে। এ জন্য সংস্কৃত ‘সামান্য’ শব্দের সমানতা বাংলায় এসে তুচ্ছ হয়ে গেছে। এছাড়া মানুষ কোনো ভাগে স¦াভাবিকভাবে যা পায় তা সবসময় কমই মনে করে থাকে। অর্থ পরিবর্তনে এ বিষয়টাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সাম্পান
চট্টগ্রাম অঞ্চলে, বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীতে ‘সাম্পান’ নামের এক বিশেষ ধরনের নৌকা চলাচল করে। প্রবল স্রোতেও এটি সহজে চালিয়ে নেওয়া যায়। চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্পান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের বিখ্যাত শিল্পী শেফালী ঘোষের ‘ওরে সাম্পানওয়ালা, তুই আমারে করলি দিওয়ানা…’ গানটি এখনও চট্টগ্রামের পথে-প্রান্তরে ঢেউ তোলে। ‘সাম্পান’ চীনা শব্দ। চীনে হালকা নৌকা বোঝাতে ‘সাম্পান’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। চীনা ‘সান’ ও ‘পান’ শব্দের সমন্বয়ে ‘সাম্পান’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। চীনা ভাষায় ‘সান’ শব্দের অর্থ তিন ও ‘পান’ শব্দের অর্থ পাটাতন। সুতরাং ‘সাম্পান’ শব্দের অর্থ তিন পাটাতনবিশিষ্ট। সাম্পান নামের নৌকাটি তিন পাটাতনের।

সালিশ
‘সালিশ’ শব্দের অর্থ বিচার, মধ্যস্থ, নিষ্পত্তিকারী মধ্যস্থ ব্যক্তি প্রভৃতি। আরবি থেকে শব্দটি বাংলায় এসেছে। সোজা কথায় ‘সালিশ’ অর্থ কোনো বিরোধ বা অন্য কোনো বিতর্কিত বিষয়ের মীমাংসার জন্য ওই বিরোধ বা বির্তকের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এমন মধ্যস্থ ব্যক্তি বা মাধ্যম। আর ‘সালিশি’ হলো মধ্যস্থতা। আরবি ভাষায় শব্দটির অর্থ ছিল তৃতীয়, তৃতীয় ব্যক্তি, তৃতীয় মাধ্যম। দুই বা ততোধিক ব্যক্তির ঝগড়া হলে তা মীমাংসা বা নিষ্পত্তি ওই দুই ব্যক্তি করতে পারে না। তা করার জন্য তৃতীয় ব্যক্তি বা তৃতীয় মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও এমন তৃতীয় রাষ্ট্রের উপস্থিতি দেখা যায়। রাজনীতিক বিরোধেও তৃতীয় রাজনীতিক শক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন।
সাহস
‘সাহস’ শব্দের অর্থ ভয়হীনতা, ভয়শূন্যতা, নির্ভীকতা, উৎসাহ, উদ্দীপনা প্রভৃতি। ‘সাহস’ সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় ‘সাহস’ শব্দের অর্থ অবিমৃষ্যকারিতা, হঠকারিতা, অনৌচিত্য, জোরপূর্বক অপরাধ সংঘটন, খুন, নরহত্যা, চৌর্য, পরদারগমন, কলহে লিপ্ত হওয়া, অসততা, ঝগড়া করা প্রভৃতি। সংস্কৃত হতে বাংলায় এসে শব্দটি পুরো নেতিবাচক অর্থ পাল্টে পুরো ইতিবাচক অর্থ ধারণ করেছে। আসলে বাঙালিরা শুধু বিচক্ষণ নয়, মহাবিচক্ষণও বটে। সংস্কৃত ভাষায় ‘সাহস’ শব্দের যে অর্থ সে সকল অনৌচিত্য কাজ তথা খুন, বলপূর্বক অপরাধ, ঝগড়া, নরহত্যা, পরদারগমন প্রভৃতি যে কেউ করতে পারে না। এমন কাজ করতে হলে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে ভয়হীনতা, নির্ভীকতা, উৎসাহ, উদ্দীপনা প্রভৃতি। বাংলার সাহস শব্দে এগুলো আছে বলে হয়তো ‘সাহস’ শব্দটা পূর্বের অর্থ বাদ দিয়ে ইতিবাচকতার ছদ্মাবরণে নেতিবাচক কাজ চালিয়ে যেতে পারছে। তাই সাহস সবসময় যে ভালো করে তাই নয়, মাঝে মাঝে অঘটনও ঘটিয়ে বসে সংস্কৃত ‘সাহস’-এর ন্যায়।

সাহেব
‘সাহেব’ শব্দটি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, মহাশয়, কর্তা, প্রভু, ইউরোপীয়, ইংরেজ, ক্ষমতাবান প্রভৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘সাহেব’ মূলত আরবি ‘সাহব’ থেকে এসেছে। তবে আরব থেকে শব্দটি সরাসরি বাংলায় আসেনি। ইরান হয়ে এবং ইরানের ভাষা-নাগরিকত্ব গ্রহণ করে ইরানিদের মাধ্যমে বাংলায় এসেছে। আরবি ‘সাহব’ শব্দের অর্থ হলো সহচর, সঙ্গী বা সাথি। আরবিতে এ ‘সাহব’ শব্দ থেকে তৈরি হয়েছে ‘সাহাবি’। বাংলা ‘সাহেব’ ও আরবি ‘সাহব/সাহাবি’ শব্দ সম্পর্কের দিক থেকে অভিন্ন হলেও দেশভেদে দুটোর অর্থের বিশাল ব্যবধান লক্ষ করা যায়। বাংলার ‘সাহেব’ কখনো আরবি ‘সাহবে’র মতো মানুষের সঙ্গী বা সাথি হতে পারেনি। ইরানি কায়দায় বাংলা ‘সাহেব’ প্রথমে হয়েছে প্রভু, তারপর হয়েছে সম্ভ্রান্ত মুসলমান বা মুসলমান ভদ্রলোক এবং আরও পরে হয়েছে ইউরোপ বা আমেরিকান সাদা চামড়ার অভিজাত। বর্তমানে যেকোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তিই ‘সাহেব’। এত পরিবর্তনের পরও ‘সাহেব’ কিন্তু তার পুরো চরিত্র অবিকল রেখে দিয়েছে হয়তো প্রভাবের জোরে।
স্নাতক
ব্যাচের্লস্ ডিগ্রির বাংলা স্নাতক। গ্র্যাজুয়েট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ডিগ্রি বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কেন এটি স্নাতক হলো? প্রাচীন ভারতে গুরুগৃহে অধ্যয়ন সমাপ্ত করে কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে বিদ্যাশিক্ষা সমাপ্তিসূচক আনুষ্ঠানিক স্নান করার রেওয়াজ ছিল। এটি ছিল সনদ প্রদানের মতো বাধ্যতামূলক। তাই বিদ্যাশিক্ষা সম্পন্নকারীদের বলা হতো স্নাতক। প্রাচীন গুরুগৃহের সে স্নান থেকে আধুনিক গর্বিত ডিগ্রি স্নাতকের ব্যুৎপত্তি। ইংরেজি ব্যাচের্লস্ ডিগ্রির ‘ব্যাচেলর’ শব্দটির উৎপত্তিও কৌতূহলোদ্দীপক। ইংরেজি ‘ব্যাচেলরস্’ শব্দটির উৎস ল্যাটিন ইধপপধষধঁৎবঁং. এর অর্থ রাখাল। তবে আধুনিক ব্যাচের্লস্ কিন্তু রাখাল নন। তারা রাখাল-নামীয় ডিগ্রি পাওয়ার পর আর রাখাল হতে চান না। এখানেই কাগুজে ডিগ্রির ব্যর্থতা।

স্থাণু
নীল-লোহিত রুদ্রকে ব্রহ্মা প্রজা সৃষ্টি করতে নিষেধ করে দেন। এ নিষেধাজ্ঞার পর রুদ্র ‘স্থিতোম্মি’ বা ‘আমি বিরত হলাম’ বাক্য উচ্চারণপূর্বক প্রজাসৃষ্টি কার্য ত্যাগ করেন। এই ‘স্থিতোহম্মি’ উচ্চারণ করায় ইনি ‘স্থাণু’ নামে অভিহিত হন। পুরাণের আর একটি কাহিনি মতে, মহাদেবের এক নাম স্থাণু। তিনি স্থির, স্থিরলিঙ্গ এবং নিজে ঊর্ধ্বে অবস্থান করে প্রাণীদের বিনাশ সাধন করেন। এ জন্য তিনি স্থাণু নামে পরিচিত। বাংলায় ব্যবহৃত ‘স্থাণু’ শব্দটিও এ ঘটনা হতে এসেছে।

সিংহভাগ
‘সিংহভাগ’ বাংলা ভাষায় পরিচিত একটি শব্দ। এর অর্থ অধিকাংশ কিংবা প্রায় সবটা। শব্দটি ইংরেজি খরড়হ’ং ঝযধৎব বাগ্ভঙ্গির অনুবাদ। ইংরেজগণ ঈশপের গল্প থেকে বাগ্ভঙ্গিটা গ্রহণ করেছে, যা কালক্রমে বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। ঈশপের গল্পটা অনেকের জানা। তবু প্রসঙ্গ বিবেচনায় আবার বলি। এক সিংহ এবং শেয়াল একত্রে একটা হরিণ শিকার করল। ভাগ করার সময় শেয়াল কিছু বলতে চাইলে সিংহ ধমক দেয় : সারাক্ষণ খাই-খাই কেন। চুপ করে বসে দেখ। আমি রাজা, অন্যায্য কিছু করব না। সিংহ হরিণটাকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে শেয়ালকে বলল : পণ্ডিত, ঠিক আছে তো!
শেয়াল : আমরা তো দুইজন, ভাগ তিনটা কেন?
সিংহ : তোমাকে তো আমরা পণ্ডিত বলে জানি। এখন বুঝলাম, তোমার জ্ঞান আছে কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান নেই। শোন, প্রথম ভাগটা আমার, কারণ আমি পশুরাজ। দ্বিতীয় ভাগটা শিকারে আমি যে শ্রম দিয়েছি তার পারিশ্রমিক। তৃতীয় ভাগটা নিশ্চয় তুমি আশা করে আছ? সেটাই উচিত। তৃতীয় ভাগ তোমার কিন্তু ভাগটা তুমি আমার সামনে থেকে নেবে কীভাবে? রাজা হিসাবে তো কমপক্ষে চার-পঞ্চমাংশ নজরানা দিয়ে দিতে হবে, নাকি!
অতএব সিংহ পুরোটাই নিয়ে নিল। শেয়াল পড়ে থাকা রক্ত আর হাড় খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে বাধ্য হয়।

 

সুচরিতাসু বনাম সুচরিতেষু
চিঠিতে বা কবিতায় বা গদ্যসাহিত্যে আমরা মেয়ে বন্ধুকে সম্বোধন করে লিখি বা বলি সুচরিতাসু; ছেলে বন্ধুকে সুচরিতেষু। ‘সুচরিত, সুচরিত্র [সুচোরিত্,
ত্ত্রো] বি উত্তম চরিত্র; সৎস্বভাব। বিণ সচ্চরিত্র। {স. সু + চরিত, সুপ্সুপা; সু + চরিত্র; বহু.}’ ‘সুচরিতা, সুচরিত্রা [সুচোরিতা, -ত্ত্রা] বি স্ত্রী. সৎস্বভাবা। বিণ সচ্চরিত্র। {স. সুচরিত + আ, সুচরিত্র + আ}’ ‘সুচরিতেষু [সুচোরিতেশু] সুচরিত্রের নিকট চিঠি লেখায় প্রথাসম্মত পাঠ। সুচরিতাসু স্ত্রী.। {স. সু + চরিত, ৭মী বহুব}’ সুচরিত থেকে স্ত্রীলিঙ্গে সুচরিতা এটুকু বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। সুচরিতাকে সম্বোধন করে বলছি সুচরিতাসু বলা চলে, এটাও সহজভাবে বোঝা যায় এবং মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু সুচরিতকে সম্বোধন করতে গিয়ে বলতে হয় : সুচরিতেষু।
কেন? সুচরিত শব্দটির সাথে ৭মী বিভক্তি ‘এ’ যোগ হয়ে সুচরিতে হয়েছে, তারপর সুচরিতাসু-র মতো -সু যুক্ত না-হয়ে যুক্ত হয়েছে ‘-ষু’, আমরা পেলাম সুচরিতেষু। কেন -ষু? এবং কেন নয় -সু? আসলে এটি সন্ধির নিয়ম। “সন্ধিবদ্ধ, সমাসবদ্ধ কিংবা উপসর্গজাত শব্দের পরপদে কখনো /স/ এবং কখনো /ষ/ হয়। সম্ভাষণসূচক শব্দে এ-কারের পর /ষ/ হয়। যেমন কল্যাণবরেষু কল্যাণীয়েষু প্রীতিভাজনেষু, প্রিয়বরেষু, শ্রদ্ধাস্পদেষু, সুচরিতেষু, সুহৃদবরেষু, কল্যাণীয়বরেষু, প্রিয়ভাজনেষু, শ্রদ্ধাভাজনেষু, বন্ধুবরেষু, শ্রীচরণেষু, সুজনেষু, স্নেহাস্পদেষু প্রভৃতি। সম্ভাষণসূচক স্ত্রীবাচক শব্দে আ-কারের পর স হয়। যেমন কল্যাণীয়াসু। আ-কারের পর স্ত্রীবাচক সম্ভাষণে সু হয়। যেমন কল্যাণীয়াসু, সুচরিতাসু, পূজণীয়াসু, মাননীয়াসু, সুপ্রিয়াসু ইত্যাদি। উল্লেখ্য, পুরুষবাচক সম্ভাষণে ‘ষু’ হয়।
ব্যাকরণের নিয়ম জানার পরও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সুচরিতেষু ও সুচরিতাসু জাতীয় পদের প্রয়োগে শুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য আমার একটি কৌশল মনে রাখনু : ‘পুরুষ’ শব্দে মূর্ধন্য-ষ আছে, ‘মহিলা’ শব্দে মূর্ধন্য-ষ নেই। সুতরাং পুরুষকে সম্বোধন করতে মূর্ধন্য-ষ দিয়ে -ষু লিখুন, -সু নয়। সুচরিতেষু; মহিলা-য় আ-কার আছে, পুরুষ-এ আ-কার নাই; সুতরাং মহিলাকে সম্বোধন করতে আ-কারসহ -তা লিখুন, -তে নয় : সুচরিতাসু।

সুতরাং
‘সুতরাং’ শব্দটি বহুল প্রচলিত এবং উপসংহারে অনেকে ব্যবহার করেন। এর আভিধানিক অর্থ অতএব, কাজেই, অগত্যা, এ হেতু প্রভৃতি। সংস্কৃত হতে শব্দটি বাংলায় এসেছে। সংস্কৃতে শব্দটির অর্থ : অধিকতরভাবে, অতিশয়, প্রচুর, অত্যন্ত প্রভৃতি। কিন্তু বাংলায় এসে শব্দটি অর্থ পরিবর্তন করেছে। এ অর্থ পরিবর্তনের হেতু আছে। অতএব দিয়ে বাক্য, চিন্তা বা কর্মের সমাপ্তির ইঙ্গিত টানা হয়। আর এ সমাপ্তির মূল হচ্ছে প্রচুর, অত্যন্ত বা পূর্ণ হওয়া। এটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যবস্তু অর্জনের বিষয়। লক্ষ্য অর্জিত হলে বিশ্রামের বা কর্ম ত্যাগের ইচ্ছা কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রবল হয়ে ওঠে। তাই বলা যায়, ‘সুতরাং’ শব্দটি সংস্কৃত হতে বাংলায় এসে ব্যাকরণগত অর্থ হারালেও অন্তর্নিহিত অর্থ তাকে হারাতে হয়নি।

সুধী
‘সুধী’ খুব পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। সংস্কৃত হতে আগত এ শব্দটি যার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয় তিনি ‘সু’ হোন বা না হোন শব্দটা শুনেই ‘সু’ হওয়ার ক্ষণিক আনন্দে হলেও মোহিত হয়ে ওঠেন। ‘সু’ মানে ভালো, উত্তম, সুন্দর এবং ‘ধী’ মানে বুদ্ধি, বোধশক্তি, জ্ঞান, মেধা প্রভৃতি। সুতরাং ‘সুধী’ মানে উত্তম বুদ্ধির অধিকারী ব্যক্তি, সুবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। অনেককে সূধী/সূধি/সুধি ইত্যাদি লিখতে দেখা যায়। এটি ভুল। সুধী সম্মানিত শব্দ। এতে হ্রস্ব ই-কার নয়, দীর্ঘ ঈ-কার দিতে হয় এবং হ্রস্ব উ-কার। অন্যদিকে ‘সুধি’ শব্দের অর্থ শুদ্ধবুদ্ধি, সহজ, ভালো বুদ্ধি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ দ্বিতীয় খণ্ড’ (অষ্টম মুদ্রণ ২০১১) গ্রন্থে লেখা হয়েছে : ‘সুধি’ বি [সং সুধী] শুদ্ধবুদ্ধি, সহজ ভাল বুদ্ধি। “দেখিতে দেখিতে বাঢ়ল ব্যাধি। যত তত করি না হয়ে সুধি।” সুধি মতি = শুদ্ধ মতি, বুদ্ধিপ্রকর্ষ। অতএব ‘সুধী’ অর্থে ‘সুধি’ লিখবেন না।

সুরা
সমুদ্র মন্থন হতে ‘সুরা’ দেবীর উদ্ভব হয়। সুরা দেবী তাঁকে গ্রহণের মিনতি নিয়ে দেব ও দানবদের কাছে যান। দানবগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন কিন্তু দেবগণ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। সুরাগ্রাহী নন বলে দানবরা ‘অসুর’ নামে অভিহিত হন।

সূত্রপাত
সূত্র পাতা থেকে ‘সূত্রপাত’। শব্দটির অর্থ ভূমিকা, সূচনা বা আরম্ভ। বাংলা সূতা বা সুতো শব্দের সংস্কৃত রূপ হলো ‘সূত্র’। এ সূত্রকে পাতা বা স্থাপন করার প্রক্রিয়াটাই হলো ব্যাকরণসিদ্ধ ‘সূত্রপাত’। সূত্রপাতের কাজটি করতে হয় সূত্রধর বা ছুতোর মিস্ত্রি বা রাজমিস্ত্রিকে। সুতো পেতে বা ফেলে তাঁরা সোজা লাইন টানেন বা লাইন সোজা করেন। ছুতোর মিস্ত্রি কাঠ চেরাই করার পূর্বে কালি-মাখা সুতো ফেলে লাইন টেনে নেন। ছুতোর মিস্ত্রির সূত্র পাতার কাজটা ‘সূত্রপাত’ শব্দে প্রকাশ পায়। ধীরে ধীরে শব্দটির ব্যাপক অর্থ সম্প্রসারণ ঘটে এবং যেকোনো কাজ শরু করার ব্যাপারটাই হয়ে পড়ে ‘সূত্রপাত করা’ বা ‘সূত্রপাত ঘটানো’।

সেতুবন্ধ
লঙ্কা গমনের জন্য রাম সমুদ্রের উপর একটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন। রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে গেলে, সীতা উদ্ধারের জন্য সুগ্রীবের পরামর্শে রাম সমুদ্রের উপর এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সুগ্রীব বিশ্বকর্মার পুত্র নলের ওপর সেতু নির্মাণের ভার দেন। নল প্রথম দিনে ২৪ যোজন, দ্বিতীয় দিনে ২০ যোজন, তৃতীয় দিনে ২২ যোজন, চতুর্থ দিনে ২২ যোজন, পঞ্চম দিনে ২২ যোজন সেতু নির্মাণ করে লঙ্কার বেলাভূমি পর্যন্ত সংযুক্ত করে দিয়েছিলেন। একশত দশ যোজন দীর্ঘ এ সেতু যেখান থেকে নির্মাণ শুরু হয়েছিল, সে স্থান ‘সেতুবন্ধ রামেশ্বর’ নামে খ্যাত। ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত এ ‘সেতুবন্ধ’ হতে বাংলা ‘সেতুবন্ধ’ শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ সম্প্রীতি, নৈকট্য, সহমর্মিতা প্রভৃতি।

সোম
ঋগ্বেদ অনুযায়ী ‘সোম’ এক প্রকার গুল্ম বা লতা। এ লতার রস আর্যদের অতি প্রিয় পানীয় ছিল। এ রস হতে উত্তেজক পানীয় প্রস্তুত হতো। পূজার সময় দেবতারা সোমরস দ্বারা পূজিত হতেন। সোমরস যজ্ঞের প্রধান আহূতি। ঋগ্বেদের সকল নবম মণ্ডল সোমের স্তবে পরিপূর্ণ। সোমবন্দনার সূক্তসংখ্যা ১২০। অপর ছয়টি সূক্তে সোমকে ইন্দ্র, অগ্নি, পূষা ও রুদ্রের সাথে অভিন্নভাবে স্তুতি করা হয়েছে। স্বর্গ হতে শ্যেনপক্ষী সোম আহরণ করেছিল। এ রস পান করলে অমর হওয়া যায়। এটি রোগ ও অঙ্গের বিকলতা দূর করে এবং সর্বরোগহর।

স্বয়ম্ভু
‘স্বয়ম্ভু’ শব্দের আভিধানিক অর্থ যিনি নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারেন। জীব সৃষ্টির লক্ষ্যে ভগবান বিষ্ণু জল সৃষ্টি করে তার মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডের বীজ নিক্ষেপ করেন। জলে নিহিত এ বীজ হতে সুবর্ণ অণ্ড উৎপন্ন হয়ে জলের উপর ভাসতে থাকে। সে অণ্ডে ব্রহ্মা স্বয়ং উৎপন্ন হন। সেজন্য তাকে ‘স্বয়ম্ভু’ বলা হয়।

স্বর্ণযুগ
সমৃদ্ধির কাল বোঝাতে ‘স্বর্ণযুগ’ বাগ্ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হয়। ইংরেজি ‘গোল্ডেন এজ’ থেকে ‘স্বর্ণযুগ’ শব্দের উদ্ভব। তবে স্বর্ণযুগের ধারণাটি ইংরেজদের নিজস্ব নয়। এটি ইংরেজরা প্রাচীন রোমকদের কাছ থেকে নিয়েছে। আবার রোমকরা নিয়েছে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে। প্রাচীন গ্রিসের কবি হেসিওদ্ পৃথিবীর কালকে চারটি যুগে বিভক্ত করেছিলেন। যথা : স্বর্ণযুগ, রৌপ্যযুগ, ব্রোঞ্জযুগ ও লৌহযুগ। গ্রিক পুরাণ মতে, স্বর্ণযুগ ছিল আদি-দেবতা ক্রনাসের যুগ। সে যুগে মানুষ পরম শান্তিতে বসবাস করত। কোনো ঝগড়া, হিংসা বা দ্বেষ ছিল না। চাষবাস ছাড়াই ফসল ও ফলমূল পাওয়া যেত। মূলত সমৃদ্ধির এমন উৎকর্ষকে প্রকাশের জন্য ‘স্বর্ণযুগ’ বাগ্ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হয়।

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!