বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

দ্বিতীয় অধ্যায়

আঁতাত
‘আঁতাত’ শব্দের অর্থ গোপন কর্মে সহযোগিতার সম্পর্ক, পরস্পর বন্ধুত্ব, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সদ্ভাব প্রভৃতি। তবে ইদানীং শব্দটি বিরোধীপক্ষের সঙ্গে অন্য কোনো পক্ষের গোপন-সম্পর্ক বোঝাতে নেতিবাচক অর্থে অধিক ব্যবহার হতে দেখা যা। যেমন সরকার জামায়াত ইসলামির সঙ্গে আঁতাত করেছে। বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত আঁতাত শব্দটি কিন্তু বাংলা নয়, ফরাসি। ফরাসি (ঊহঃবহঃব) শব্দের অর্থ এক রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের সদ্ভাব ও সহযোগিতামূলক অবস্থান। এর উচ্চারণও অনেকটা বাংলা ‘আঁতাত’ শব্দের ন্যায়। মেহমান হিসাবে ফরাসি হতে এলেও আঁতাত এখন ঘরজামাইয়ের ন্যায় বাংলায় স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। বাংলায় শব্দটি কিন্তু গোপন কর্মে সহযোগিতার সম্পর্ক প্রকাশে রাজনীতিক ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত। এখন তো রাজনীতির মাঠে আঁতাত ছাড়া কোনো বক্তৃতাই হয় না। সরকারের বা বিরোধী দলের কোনো নেতিবাচক দিক তুলে ধরতে এ শব্দটির বিকল্প খুব কমই আছে।

আক্কেল গুড়ুম
‘আক্কেল গুড়ুম’ বাগ্ভঙ্গির আভিধানিক অর্থ কিংকর্তব্যবিমূঢ়, জ্ঞান লোপ পাওয়া প্রভৃতি। কামান থেকে গোলা যেমন হঠাৎ গুড়ুম শব্দে উড়ে যায় তেমনি বিপাকে পড়লে মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধিও কামানের গোলার মতো গুড়ুম শব্দে মাথা থেকে উড়ে যায়। তবে এ গুড়ুম সবাই শুনতে পায় না। যার মাথা থেকে উড়ে যায় সে বুঝতে পারে কী হয়েছে, কী না-হয়েছে। এরূপ অবস্থাটাই মানুষের ‘আক্কেল গুড়ুম’ অবস্থা। মানুষের ‘আক্কেল গুড়ুম’ অবস্থা সব সময় হয় না। এটি তখনই হয় যখন মানুষ কোনো বিশেষ কথা বা সংবাদ শোনার জন্য বা বিশেষ কিছু দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত থাকে না অথচ সেটিই শুনতে হয়।

আক্ষেপ
‘আক্ষেপ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অনুতাপ, অনুশোচনা, বিলাপ, খেদ, অনুতপ্ত হওয়া ইত্যাদি। ‘আক্ষেপ’ সংস্কৃত হতে আগত বাংলা ভাষার একটি শব্দাতিথি। সংস্কৃত ভাষায় এর অর্থ ভর্ৎসনা, তিরস্কার, নিন্দা, দোষদ্ঘাটন, বদনাম প্রভৃতি। বিহ্বলতা, ব্যাকুলতা, অতি আবেগ প্রভৃতিও আক্ষেপ শব্দের প্রতিশব্দ। সংস্কৃত হতে বাংলায় আসার পর শব্দটি অন্যান্য অনেক শব্দের ন্যায় নিজের পরিচয় কিছুটা বিসর্জন দিয়ে বসেছে। ঠিক শ্বশুর বাড়ির বউয়ের মতো। মানুষ শুধু অন্যের সমালোচনা করে না, অনেক সময় নিজের সমালোচনাতেও অধীর হয়ে ওঠে। অবশ্য এমন সমালোচনা হয় নিজে নিজে, অন্তরের ভিতর নিজস্ব জগতে। কোনো কারণে মানুষ যদি কোনো ভুল বা ক্ষতিকর কিছু করে বসে বা কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে যায় তখন মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। তার ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় হয়ে যায় হতবিহ্বল। এ অবস্থায় মানুষ নিজে নিজেকে ধিক্কার দেয়। কেন এ কাজটা করল, কেন এমন ঘটল; হয়তো এ কাজটা না-করলে এমন ঘটত না প্রভৃতি প্রশ্ন তার মনে অনুতপ্ত-আবেগের জোয়ার তুলে দেয়। এ অনুতাপই মূলত ‘আক্ষেপ’। এ বিবেচনায় সংস্কৃত ‘আক্ষেপ’ আর বাংলা আক্ষেপের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না।

আখড়া
শব্দটির অর্থ গান-বাজনা শেখার স্থানবিশেষ, মল্লবিদ্যা প্রশিক্ষণের স্থান, আড্ডা, বাউলদের আশ্রম ইত্যাদি। সংস্কৃত ‘অক্ষবাট’ শব্দ থেকে আখড়া শব্দের উৎপত্তি। সংস্কৃতে অক্ষবাট শব্দের অর্থ অক্ষ বা পাশাখেলার আড্ডা। মূলত জুয়ার আড্ডাকে একসময় আখড়া বলা হতো। কারণ পণ রেখেই সেকালে পাশাখেলা হতো। সংস্কৃত অক্ষবাট বাংলায় কিছুটা নাম পরিবর্তন করে আখড়া হয়ে আসার পর অর্থেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আখড়া বলতে আর যাই বোঝানো হোক, জুয়ার আড্ডা বোঝায় না। অবশ্য আউল-বাউলদের আশ্রমকেও আখড়া বলা হয়। এখানে জুয়া চলে না, তবে গাঁজা চলে। ‘শনির আখড়া’ নামে পরিচিত ঢাকা শহরের জায়গাটি একসময় গান-বাজনা ও আউল-বাউলদের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল।

আগ্নেয়
দেবসেনাপতি কার্তিকেয় অগ্নিসম্ভূত ছিলেন। তাই তিনি অগ্নিজ ও আগ্নেয় নামে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, অগ্নিসম্ভূত অঙ্গিরারাও আগ্নেয় নামে অভিহিত হতেন।

আগ্নেয়াস্ত্র
অগ্নির পুত্র অগ্নিবেশ্যকে ভরদ্বাজ একটি মহামূল্যবান ও অত্যন্ত কার্যকর একটি অস্ত্র দিয়েছিলেন। এ অস্ত্রটি আগ্নেয়াস্ত্র নামে পরিচিত। অবশ্য সে অস্ত্র দিয়ে অগ্নি নির্গত হতো না। অগ্নিবেশ্য এ অস্ত্র দ্রোণকে প্রদান করেছিলেন। তাই এর নাম আগ্নেয়াস্ত্র। পরবর্তীকালে দ্রোণের নিকট থেকে অর্জুন এ অস্ত্র লাভ করেন। ভারতীয় পুরাণে এ অস্ত্রটি ছিল শত্র“র বিপক্ষে অত্যন্ত কার্যকর। এ অস্ত্রের নামানুসারে বাংলায় আধুনিক অস্ত্রকে কার্যকারিতার সঙ্গে তুলনা করে আগ্নেয়াস্ত্র বলা হয়।

আটঘাট
তবলার আটঘাট থেকে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘আটঘাট’ শব্দের উৎপত্তি। তবলার প্রতিটি ঘুঁটির উপর চামড়ার যে দুটি ফিতা বা চ্যাপ্টা দড়ি থাকে তার মাঝের অংশকে ঘাট বলা হয়। তবলায় মোট ঘাট আটটি। তবলা বাজানোর পূর্বে ঘুঁটির উপর হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ঘাটগুলো যত্নসহকারে খুব গভীরভাবে যাচাই করে বেঁধে নিতে হয়। নইলে তবলার আওয়াজ শুদ্ধ হয় না। তবলা বাজানোর পূর্বে প্রয়োজনীয় এ সাংগীতিক প্রস্তুতি তবলা থেকে বেরিয়ে বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়েছে। এখন ‘আটঘাট’ বলতে তবলার কথা কারও মনে হয় না। মনে কোনো কিছু সম্পাদনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে কিংবা সব বাধা দূর হয়েছে।

আড়ম্বর
‘আড়ম্বর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ জাঁকজমক, জমকালো, বাহুল্য, সমারোহ, আকর্ষণীয়, শানশওকত, আতিশয্য প্রভৃতি। তবে আড়ম্বর শব্দের মূল ও আদি অর্থ হচ্ছে তূর্যধ্বনি, হাতির ডাক, রণবাদ্য, গর্জন, মেঘের ডাক প্রভৃতি। বাংলা ভাষায় ব্যবহার-পরিক্রমায় শব্দটি ধীরে ধীরে পূর্বের অর্থ হারিয়ে নতুন অর্থ ধারণ করেছে। যেকোনো বড় ও শানশওকতময় কাজে একসময় তূর্যধ্বনি, হাতির ডাক, রণবাদ্য প্রভৃতির ব্যাপক আয়োজন ছিল। অনুষ্ঠানের গুরুত্ব ও বিস্তৃতির সঙ্গে এ বিষয়গুলোর ব্যাপকতার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। শুধু প্রাচীনকাল নয়, এখনও বিভিন্ন দেশে জাতীয় দিবস পালনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালনকালে কিংবা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনে তোপধ্বনি করা হয়। অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শনে বাদ্যর আয়োজন থাকে। সে অর্থে আড়ম্বর শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিবর্তন হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ একটুও ক্ষুণ্ন হয়নি।

আততায়ী
‘আততায়ী’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হননকারী, আক্রমণকারী, শত্র“। সংস্কৃত ভাষায় আততায়ী কে বা কারা তা সুনির্দিষ্ট করা আছে কিন্তু বাংলা ভাষায় আততায়ীর পরিচয় সুনির্দিষ্ট নেই। যে কেউ বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘আততায়ী’ শব্দের আততায়ী হতে পারে। সংস্কৃত ভাষায় আততায়ী ছয় প্রকার। যথা : গৃহে অগ্নিদাতা, বিষপ্রয়োগকারী, প্রাণহরণকারী, ধনাপহারক, ভূমিদস্যু এবং স্ত্রী-অপরহণকারী। এছাড়াও সংস্কৃতে আরও একজন আততায়ীর কথা বলা হয়। সেটি হচ্ছে রাজা কিংবা ক্ষমতাবানের নিকট কুৎসাকারী। কিন্তু বাংলা ভাষায় আততায়ীর এরূপ কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা রূপ নির্ধারণ করা নেই। তবে অজ্ঞাত হত্যাকারী বোঝাতে শব্দটি পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। বস্তুত বাংলা ভাষায় আততায়ী শব্দটি কেবল প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে আক্রমণকারী বা আঘাতকারীর পরিচয় প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। সংস্কৃতের মতো বাকিগুলো বাংলায় ‘আততায়ী’ হিসাবে ব্যবহারের কোনো নজির নেই।

আত্মসাৎ
‘আত্মসাৎ’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। অসদুপায়ে ধনসম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া বা অন্যায়ভাবে কোনো সম্পত্তি নিজের আয়ত্ত বা হস্তগত করা প্রভৃতি অর্থ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ‘আত্ম’ ও ‘সাৎ’ শব্দ মিলে আত্মসাৎ। ‘আত্ম’ শব্দের অর্থ নিজ। আত্মসাৎ শব্দের আদি ও মূল অর্থ ছিল নিজের অধীন, স্বায়ত্ত, স্বীয় আশ্রিত বা ভক্ত। মধ্যযুগেও শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। চৈতন্যভাগবত ও চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যে ‘আত্মসাৎ’ বলতে ভক্ত বা শিষ্য বোঝানো হয়েছে। চৈতন্যভাগবত কাব্যে কবি লিখেছেন : শ্রীচৈতন্য ভক্তি ও প্রেম দিয়ে বহু দুর্জনকে আত্মসাৎ করেছেন। চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে শ্রীচৈতন্য এক প্রবল শত্র“কে বশীভূত করেন। সে প্রসঙ্গে কবি লিখেছেন : ‘আত্মসাৎ করি তারে কৈল আলিঙ্গন’। কিন্তু এখন শব্দটি আগের সে শালীন ও ইতিবাচক অর্থ হারিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ ধারণ করেছে। এটাই ভাষা-স্রোতে আবর্তিত শব্দের ভাগ্য। শ্রীচৈতন্য হাজার হাজার লোককে আত্মসাৎ করেছেন। তৎকালে বাক্যটির অর্থ ছিল শ্রীচৈতন্য লক্ষ লক্ষ লোককে নিজের ভক্তি, প্রেম ও দরদ দিয়ে নিজের ভক্ত করে নিয়েছেন। এখন বাক্যটির অর্থ হয়েছে শ্রীচৈতন্য লক্ষ লক্ষ লোককে জোরপূর্বক অপহরণ করেছেন। দেখুন, শব্দের অর্থ কীভাবে বদলায় নদীর মতো, মনের মতো।

আদর্শ
‘আদর্শ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নমুনা, দৃষ্টান্ত, অনুকরণীয় বিষয় প্রভৃতি। যা অনুকরণযোগ্য, শ্রেষ্ঠ, সর্বজনীন হিসাবে উদাহরণ টানা যায়, অধিকাংশ লোকের গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টান্ত ও নমুনা হিসাবে উপস্থাপন করা যায় তা-ই আদর্শ। ‘আদর্শ’ শব্দের মূল অর্থ ছিল আয়না, আরশি। সংস্কৃত আদর্শ তথা আয়না বা আরশি বাংলায় এসে দৃষ্টান্ত, শ্রেষ্ঠ বা অনুকরণযোগ্য হয়ে পড়েছে। আয়নায় নিজেকে দেখা যায়। মানুষ প্রকৃতপক্ষে নিজের চেয়ে কাউকে শ্রেষ্ঠ ভাবে না। নিজের অনেক দোষ ত্র“টি কিংবা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সে কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবে, নিজের কল্যাণ চায়, নিজেকে নিজের মধ্যে অনুকরণ করে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে চায়। আয়নায় সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে কেবল নিজেকে নিয়ে চিন্তায় মেতে ওঠে। ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে নিজেই নিজের আদর্শ। এ আদর্শ বিম্বিত হয় আরশিতে। তাই সংস্কৃত আয়না (আদর্শ) বাংলায় এসে দৃষ্টান্ত, নমুনা, অনুকরণীয় প্রভৃতি রূপ ধারণ করেছে।

আদায়-কাঁচকলায়
পরস্পর দ্বন্দ্বময় সম্পর্ক প্রকাশের ক্ষেত্রে উপমাস্বরূপ ‘আদায়-কাঁচকলায়’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রমতে আদার গুণ হলো রেচন ও কাঁচকলার গুণ হলো ধারণ। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য হলে খেতে হয় আদা কিন্তু উদরাময় রোগে খেতে হয় কাঁচকলা। অধিকন্তু আদা যদি কাঁচকলার তরকারিতে পড়ে, তো কাঁচকলা আর সহজে সেদ্ধ হয় না। একটি অন্যটির বিপরীত কার্য করে। বস্তুত আদা ও কাঁচকলার পরস্পর বিপরীত এ গুণ হতে শব্দটির উৎপত্তি।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!