বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

দ্বিতীয় অধ্যায়

আদিপুরাণ
এটি প্রথম পুরাণ নামে পরিচিত। সাধারণ্যে এটি ব্রহ্মপুরাণ নামে সমধিক পরিচিত।

আধিব্যাধি
‘আধিব্যাধি’ শব্দটির অর্থ রোগ-শোক, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট, সাংঘাতিক বিমার প্রভৃতি। আধি ও ব্যাধি শব্দের সংযোগে ‘আধিব্যাধি’ শব্দটা গঠিত হয়েছে। ব্যাধি শব্দের পৃথক ব্যবহার বাংলা ভাষায় রয়েছে কিন্তু আধি শব্দের পৃথক ও স্বাধীন ব্যবহার এখন আর দেখা যায় না। বাংলা ভাষায় ব্যাধির পূর্বে আধি শব্দটি কোনো রকমে নিজের ঠাঁই এখনও অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে। ‘আধি’ শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ মানসিক রোগ এবং ‘ব্যাধি’ শব্দের মূল ও আভিধানিক অর্থ শারীরিক রোগ। অতএব আধিব্যাধি শব্দের অর্থ দাঁড়ায় মানসিক ও শারীরিক রোগ। এ অনুষঙ্গে ‘আধিব্যাধি’ শব্দ মানসিক ও শারীরিক কষ্টকে প্রকাশ করে। শুধু শারীরিক ও মানসিক অসুবিধা নয়, মানুষের বিপদসংকুল ও কষ্টকর বিষয় বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অবশ্য যেকোনো বিপদ ও কষ্টে মানুষের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকে না।

আনসার
‘আনসার’ আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নিবেদিত বাহিনী বিশেষের নাম। শব্দটি মূলত আরবি ‘নাসির’ শব্দের বহুবচন। নাসির অর্থ সাহায্যকারী। হিজরতের পর মুহাজিরদের সাহায্যকারী মদিনাবাসী সাহাবাগণ ইতিহাসে ‘আনসার’ নামে পরিচিত। আমাদের বাংলাদেশে ‘আনসার’ নামে পরিচিত বাহিনী নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা করে থাকে। তাই এ বাহিনীর নাম রাখা হয়েছে আনসার। শব্দটি পবিত্র কুরানে অন্তত পাঁচ জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে।

আন্দোলন
‘আন্দোলন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিক্ষোভ, আলোড়ন, কোনো লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্ত সম্মিলিত প্রচার বা উত্তেজনা সৃষ্টি, সহিংস দাবিদাওয়া উপস্থাপন প্রভৃতি। তবে বাংলায় এখন শব্দটি ‘বিক্ষোভ’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে সমধিক ব্যবহৃত। পঞ্চাশ বছর আগেও আন্দোলন শব্দের অর্থ ছিল দোলায়মান, কম্পন, পুনঃপুন, দোলিত, কম্পিত প্রভৃতি। পাতার আন্দোলন শত শত পুস্তকে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলসহ তৎকালীন কবি-সাহিত্যিকগণের লেখায় ব্যবহৃত আন্দোলন শব্দের দিকে তাকালে কেবল দোলায়মান, কম্পন, পুনঃপুন, দোলিত, কম্পিত প্রভৃতি অর্থই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা হলে কেন এ পরিবর্তন? আন্দোলন হলে লতাপাতা বা সবুজ বনানীর মতো জনজীবনেও ভয় বা প্রত্যাশার কারণে কম্পনের সৃষ্টি হয়। হয়তো এজন্য শব্দটি তার প্রাচীন অর্থ বিসর্জন দিয়ে নতুন অর্থ ধারণ করেছে। ইদানীং শহরে, এমনকি অনেক গ্রামেও বনবনানী নেই বললেই চলে। হয়তো নিজেকে রক্ষার জন্য ‘আন্দোলন’ শব্দটি বনবনানীর কম্পমান দোলা ছেড়ে দিয়ে তপ্ত রাজনীতির আন্দোলনে সামিল হয়ে শহরবাসী হয়ে গিয়েছে।

আপামর/পামর থেকে আপামর
‘পামর’ থেকে ‘আপামর’। ‘আপামর’ শব্দটি সর্বসাধারণ বোঝাতে ইদানীং হরদম ব্যবহার করা হচ্ছে। বহুল ব্যবহারের কারণে শব্দটা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর আসল অর্থ অনেকের অজানা। ‘পামর’ শব্দের অর্থ নরাধম, পাপী, মূর্খ, নীচ, নিষ্ঠুর, জঘন্য ইত্যাদি। এ ‘পামর’ শব্দ থেকে ‘আপামর’ শব্দের উদ্ভব। অতএব আপামর শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ সাধারণ জনগণ বা ‘সর্বসাধারণ’ নয়। কিন্তু ব্যাকরণগত অর্থ যা-ই হোক, আপামর শব্দটি বর্তমানে সর্বসাধারণ প্রকাশে বহুল প্রচলিত একটি জনপ্রিয় শব্দ। এভাবে শব্দের, শব্দের অর্থের রূপান্তর ঘটে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এমন দেখা যায়। আপামর শব্দের আসল কিংবা ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কী, তা এখন আর বিবেচনার সুযোগ নেই। ‘আপামর’ বলতে এখন আমরা ‘সর্বসাধারণ’ই বুঝে থাকি।

আফ্রিদি
‘আফ্রিদি’ মোগল ও ব্রিটিশ শাসনের শেষ যুগে ভারত-আফগানিস্তান সীমান্তে বসবাসকারী যুদ্ধপ্রিয় একটি উগ্র উপজাতিবিশেষ। আবার আফ্রোদিতি, অঢ়যৎড়ফরঃব হচ্ছে গ্রিকদের প্রেমের দেবী। রোমানদের প্রেমের দেবী ঠবহঁং. গ্রিকদের প্রেমের দেবী কীভাবে উপমহাদেশে এসে যুদ্ধপ্রিয় একটি জাতির নাম ধারণ করল? আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সঙ্গে এ নামের সম্পর্ক আছে। যুদ্ধ আর প্রেম মূলত অভিন্ন সূত্রে গাঁথা একটি ভিন্ন প্রত্যয়। প্রেমের জন্য যুদ্ধ হয়, প্রেম ছাড়া কোনো যুদ্ধ কোনো কালে বিশ্বে সংঘটিত হয়নি। হোক-না তা নারীর জন্য, ভূমি, সম্পদ বা ধর্মের জন্য। ধর্মপ্রেমীরা ধর্মের জন্য, দেশপ্রেমীরা দেশের জন্য আর সম্পদপ্রেমীরা সম্পদের জন্য যুদ্ধ করে। গ্রিক পুরাণে নারী হেলেনের জন্য কী অঘটন ঘটেছিল তা কম-বেশি আমাদের জানা আছে। প্রতিনিয়ত যে যুদ্ধ, হানাহানি বা রক্তারক্তি হচ্ছে তার মূলে রয়েছে প্রেম। যেমন দলপ্রেম, ভূমিপ্রেম, ক্ষমতাপ্রেম, নারীপ্রেম, পুরুষপ্রেম ইত্যাদি।

আবর্জনা
‘আবর্জনা’ শব্দের প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ ময়লা, জঞ্জাল প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘আবর্জন’ শব্দ হতে বাংলা ‘আবর্জনা’ শব্দের উৎপত্তি। সংস্কৃতে শব্দটির অর্থ ছিল ত্যাগ করা, নত হওয়া, দান করা প্রভৃতি। কিন্তু বাংলায় এসে শব্দটি এসব সুখকর অর্থ হারিয়ে নোংরা, ময়লা, জঞ্জাল প্রভৃতি অর্থ ধারণ করেছে। এর কারণ রয়েছে। আবর্জনা ত্যাগ করতে হয়, ফেলে দিতে হয়, অতি সুচারুভাবে এর ব্যবস্থাপনা করতে হয়। দান করা, ত্যাগ করা যেমন মহৎ তেমনি নোংরা, জঞ্জাল প্রভৃতি বিচক্ষণতার সঙ্গে ত্যাগ করা আরও মহৎ। কেউ ধনসম্পদ ত্যাগ না-করলেও বাঁচতে পারে কিন্তু ময়লা এমন একটা জিনিস যা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আবশ্যিকভাবে ত্যাগ না-করলে মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সংস্কৃত ‘আবর্জন’ বাংলায় অতিথি হয়ে পূর্বতন অর্থ হারালেও আরও চমৎকার অর্থে সম্পূরক ভাষ্যে ‘আবর্জনা’ নাম নিয়ে কাজের মতো কাজ করেছে।

আমজনতা
‘আমজনতা’ শব্দটিকে অনেকে রসিকতা করে বলেন ‘ম্যাঙ্গো পিপল’। এখানে মূল শব্দটি হচ্ছে ‘জনতা’। ‘আম’ হচ্ছে উপসর্গ। এটি বিদেশি উপসর্গ; আরও পরিষ্কার করে বললে আরবি উপসর্গ। ‘জনতা’ শব্দের পূর্বে ‘আম’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে যে অর্থ প্রকাশ করে তা হচ্ছে, সাধারণ জনতা। তেমনি আরও শব্দ আমদরবার, আমমোক্তার। ‘আম’ বাংলায় উপসর্গ হলেও আরবিতে মূল শব্দ হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। عام অর্থ সাধারণ। বহুবচনে ‘আওয়াম’, ইয়া প্রত্যয় যুক্ত হয়ে এটি অর্থকে আরও সুনির্দিষ্ট করে দেয়। ইয়া ‘আমি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। কখনো জাতি অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘সাউদিয়া’ শব্দ দিয়ে একটি জাতি বুঝায়, এখানে ‘সাউদ’ শব্দের সঙ্গে ‘ইয়া’ যুক্ত হয়েছে। তেমনি ইয়েমেনি, আমরিকি, আওয়ামি প্রভৃতি আওয়ামকে আরও মজবুত করেছে।

আমদানি-রফতানি
পণ্যাদি বিদেশ থেকে আনা এবং স্বদেশ থেকে বিদেশে প্রেরণ অর্থে আমদানি-রফতানি বাগ্্ভঙ্গিটি ব্যবহার করা হয়। আমদানি ও রফতানি শব্দ দুটো মিলিত হয়ে আমদানি-রফতানি শব্দ গঠিত হয়েছে। এটি একটি দ্বন্দ্বসমাসজাত পদ। তবে আমদানি ও রফতানি দুটোই ফারসি শব্দ। আমাদান থেকে আমাদানি। ফারসি ‘আমাদানি’ শব্দ বাংলায় এসে হয়েছে ‘আমদানি’। ‘আমাদান’ শব্দের অর্থ আসা এবং ‘আমাদানি’ শব্দের অর্থ আসার যোগ্য। রাফতান থেকে রাফতানি। ফারসি ‘রাফতানি‘ শব্দ বাংলায় এসে হয়েছে ‘রফতানি’। রাফতান শব্দের অর্থ যাওয়া এবং রাফতানি শব্দের অর্থ যাওয়ার যোগ্য। ফারসি শব্দ দুটোর অর্থ সামান্য পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের প্রতিশব্দরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলায় যা আমদানি ফারসিতে তা ‘ওয়ারেদাত’ আবার বাংলায় যা রফতানি, ফারসিতে তা ‘সাদেরাত’।

আমন্ত্রণ/নিমন্ত্রণ
আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ এই দুই শব্দের অর্থ বিষয়ে কলিম খান ও রবি চক্রর্তীর বর্ণভিত্তিক-ক্রিয়াভিত্তিক অর্থকে আর একটু খোলসা করে সুস্পষ্টতা প্রদান করা যায়। আজকাল ইংরেজির প্রভাবে প্রতীকী প্রথায় ‘আমন্ত্রণ’ = ওহারঃধঃরড়হ এবং নিমন্ত্রণ = ওহারঃধঃরড়হ; অর্থাৎ দুটো বাংলা শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ ‘বর্ণভিত্তিক-ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধি’ অনুযায়ী এই শব্দ দুটোর অর্থভেদ ছিল। ইংরেজির প্রভাবে শব্দ দুটোর বাকি অর্থগুলো হারিয়ে শুধু ওহারঃধঃরড়হ (ভোজনার্থ আহ্বান)-এ পরিণত হয়েছে। আগে তা ছিল না। ‘মন্ত্রণা’ করার জন্য ডাকলে সে-ডাককে বলা হতো ‘আমন্ত্রণ’ এবং ‘মন্ত্র’ দেওয়ার জন্য ডাকলে, তাকে বলা হতো ‘নিমন্ত্রণ’। ‘আমন্ত্রণে’ ‘মন্ত্রের’ আয়োজন ছিল, ‘নিমন্ত্রণে’ মন্ত্রের নিয়োজন ছিল। এ কালের মতো করে বললে বলতে হয়, মন্ত্রী যখন জেলায় জেলায় বন্যা-পরিস্থিতি বিষয়ে ‘মন্ত্রণা’ করার জন্য জেলাপ্রশাসকদের ডেকে পাঠান, সেটি ‘আমন্ত্রণ’। কিন্তু যখন বন্যা-নিয়ন্ত্রণের উপায় বা ‘মন্ত্র’ তিনি নিজেই ঠিক করে রেখেছেন, সেটি রূপায়ণের উদ্দেশ্যে জেলাপ্রশাসকদের বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যদি তিনি তাঁদের ডেকে পাঠান, সেটি ‘নিমন্ত্রণ’। তবে এখন আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ শব্দের সে আদি অর্থ আর নেই।

নিমন্ত্রণ শব্দের আভিধানিক অর্থ দাওয়াত, ভোজনের আহ্বান, কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আহ্বান বা আমন্ত্রণ। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর বঙ্গীয় শব্দার্থকোষেও উভয় শব্দের উৎস অভিন্ন ক্রিয়ামূল (মন্্) নির্দেশ করা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অভিধানে নিমন্ত্রণ ও আমন্ত্রণ শব্দের অর্থগত কোনো পার্থক্য নেই। তবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অনির্ধারিত কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। অনেকে মনে করেন, যে দাওয়াতে বা যে আহ্বানে আহ্বানকারীর পক্ষ থেকে ভূরিভোজের ব্যবস্থা থাকে তাকে নিমন্ত্রণ এবং যেখানে আহ্বানকারীর পক্ষ থেকে সাধারণত ভোজের ব্যবস্থা থাকে না তাকে আমন্ত্রণ বলে। এ ব্যাখ্যা কিয়দংশ ঠিক হলেও পুরোপুরি ঠিক নয়। সাধারণত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে ছোটখাটো সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা অন্যান্য বিশেষ উৎসবসমূহে অভ্যাগতদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে ‘নিমন্ত্রণ’ শব্দটির অধিক ব্যবহার দেখা যায়। এ সকল দাওয়াতে সাধারণত ভূরিভোজের ব্যবস্থা থাকে। অন্যদিকে বড় আকারের রাজনীতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াতের বেলায় ‘আমন্ত্রণ’ শব্দটির অধিক ব্যবহার লক্ষণীয়। তবে এখানেও অনেক সময় ভূরিভোজের ব্যবস্থা না হলেও হালকা ভোজের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে অনেক বড় আকারের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানসমূহেও ভূরিভোজের ব্যবস্থা থাকে। নিমন্ত্রণের আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অভ্যাগতরা সাধারণত বিভিন্ন রকমের উপহার সামগ্রী নিয়ে আসেন কিন্তু আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে সাধারণত উপহার আনার রেওয়াজ নেই। আনা হলেও তাতে ব্যক্তি-উদ্যোগের চেয়ে সমষ্টিগত বা আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ অধিক পরিলক্ষিত। নিমন্ত্রিত অতিথিদেরকে আমন্ত্রিত অতিথিও বলা যায়। আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে উপহার দেওয়া হয় অনেক সময়। যেমন কোনো কোনো রাজনীতিক, রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিদের উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়। প্রয়োগ : (১) আলোচনা শেষ হওয়ার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিমন্ত্রিত অতিথিবর্গকে চা-পানের আমন্ত্রণ জানালেন। (২) রশিদ সাহেবের মেয়ের বিয়েতে জামান সাহেবকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। (৩) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।

আমলা
সংস্কৃত আমলক > প্রাকৃত -আমলঅ > বাংলা -আমলা; এর অর্থ আমলকী গাছ, আমলকী, সরকারি কর্মচারী, মুহুরি, কেরানি প্রভৃতি। শব্দটি বর্তমানে নঁৎবধঁপৎধঃ অর্থে সমধিক প্রচলিত। অনেকে বলেন, ‘আমলা’ আরবি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে, যার অর্থ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী, কেরানি, মুহুরি ইত্যাদি। কিন্তু ‘বেদ’-এ আমলা শব্দটি রয়েছে। প্রাচীন অভিধানসমূহে ‘আমলা’ অর্থ বানর ও ‘বানর’ অর্থে আমলা বলা আছে। সুতরাং বাংলায় ব্যবহৃত ‘আমলা’ আরবি শব্দ এটি ঠিক নয়। আসলে ‘আমলা’ অর্থ বানর। তবে আধুনিক অভিধানকারদের এটা পছন্দ হয়নি। তাই তাঁরা তাঁদের অভিধান থেকে হয় শব্দটি বাদ দিয়েছেন এবং শব্দটিকে আরব থেকে আমদানি দেখিয়ে জাতে তুলে এর বর্তমানে প্রচলিত অর্থটি দিয়েছেন। কারণ ইংরেজ আগমনের পূর্বে আরবীয় যেকোনো বিষয় ছিল মর্যাদপূর্ণ।
এবার দেখা যাক, আমলা অর্থ কেন বানর এবং কেন আমলকী। প্রাচীনকালেও অধিকাংশ আমলা স্বভাবচরিত্র ও আচার-আচরণে বানরের মতো নির্লজ্জ, ধূর্ত, বেহায়া ও সংকীর্ণ মনের অধিকারী ছিল। বানরের ন্যায় আমলারাও ছিল অদূরদর্শী। পরিপক্ব বা পুষ্ট হওয়ার আগে ফসলের খেতে হানা দিত। যত খেত তার সহস্রগুণ বেশি নষ্ট করে দিত। ভালো মন্দ বিবেচনাবোধ ছিল না, শুধু নিজের চিন্তা করত; এ থেকে ‘বানরের পিঠাভাগ’ প্রবাদটির উৎপত্তি। বানরের ন্যায় আমলারাও ফল হওয়ার আগে মুকুলগুলো খেয়ে ধ্বংস করে দিত। অধিকন্তু কয়েকদিনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেয়ে বাপের সম্পত্তি মনে করে বসত। যা থেকে ‘বানরের বনভাগ’ প্রবাদটির উৎপত্তি। আমলাদের স্বাদ আমলকীর ন্যায় তিক্ত কিন্তু চিবিয়ে রস বের করে নিয়ে খেতে পারলে শরীরের উপকার হয়। এ জন্য আমলাদের যত চাপে রাখা যায় দেশের ও জাতির তত কল্যাণ সাধিত হয়। তাই আমলা অর্থে আমলকীও বোঝায়। এর মানে আমলা থেকে উপকার পাওয়া যাবে যদি তাদের প্রচণ্ড শাসনে ও চাপে রাখা হয়। তাদের কোনো স্বাধীনতা দেওয়া যাবে না। তা হলে বানরের ন্যায় আচরণ করবে। ‘আমলা-কেশ-তৈল’ এর সঙ্গেও আমলার সম্পর্ক রয়েছে। আমলাকে পিষে এ তেল তৈরি করা হয়।

‘আমার কথা ফুরালো/নটে গাছটি মুড়ালো’
এককালে দাদি-নানি, মহিলা মুরব্বি বা কাজের মহিলা (তৎকালে গৃহস্থ বাড়িতে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদের একটা মর্যাদা ছিল, বর্তমান কালের মতো এত অবহেলা করা হতো না।) মাছ-মাংস, তরি-তরকারি বা শাক-সবজি কুটতে কুটতে শিশুদের তাঁরা গল্প শোনাতেন; বা গল্প শুনিয়ে তাদের শান্ত রাখতে হতো। তরকারির মধ্যে সাধারণত শাকটি সবার শেষে কুটার জন্য নেওয়া হতো। সেকালে নটে শাক ছিল যেমন সহজলভ্য, তেমনি উপাদেয়। প্রায়বেলা প্রত্যেক সাধারণ গৃহস্থের বাড়িতে এ শাকটি রান্না করা হতো। এমন অনেক সময় ঘটত যে, তরকারি কুটা শেষ হয়েছে কিন্তু গল্পটি শেষ হয়নি বা একটি গল্প শেষ হলেও শিশুরা আরও একটি নতুন গল্প বলার জন্য বায়না ধরেছে অথবা তরকারি কুটা শেষ হওয়ার আগে গাল্পিকের গল্প বলার ইচ্ছা বা স্মৃতি আর সাড়া দিচ্ছে না। তখন বলা হতো, আমার শাক কুটা শেষ অর্থাৎ কাজ শেষ, তাই গল্পও শেষ। ‘নটে গাছটি মুড়ালো’ মানে নটে গাছ থেকে পাতা (শাক) নিয়ে গাছটিকে পাতাশূন্য (মুড়া) করে ফেলা; অর্থাৎ শাক কুটা শেষ হয়েছে। বস্তুত ‘নটে গাছটি মুড়ালো’ বাগ্ভঙ্গিটি এখানে কার্যক্ষেত্র থেকে প্রতীকী অর্থে নিয়ে আসা হয়েছে। এর অর্থ বসে বসে কাজের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদের গল্প শুনানোর সুযোগ আর নেই। কারণ নটে শাক কুটাও শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ আর গল্প শোনানোর কোনো সুযোগ নেই। তাকে অন্য কাজে যেতে হবে। এ প্রাচীন রেওয়াজ থেকে প্রবাদটি সৃষ্টি হয়েছে। এর আর একটি উৎসার্থ আছে। সেটি হলো : তরকারি কুটা শেষ হয়েছে, মানে আমার ঝুড়িতে আর গল্প নেই বা আমার গল্প বলার ইচ্ছেও নেই এবং বাচ্চাদেরকেও আর গল্প শোনানো ঠিক হবে না। এখন পড়ার বা ঘুমানোর সময়। অতএব গল্প শেষ।

আয়তন
‘আয়তন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ক্ষেত্রমান, প্রস্থ, বিস্তার প্রভৃতি। কোনো বস্তু বা ভূমি কতটুকু পরিমাণ স্থান অধিকার করে আছে সেটিই ওই বস্তু বা স্থানের আয়তন। পৃথিবীর আয়তন কত তা আমরা জানি, বাংলাদেশের আয়তনও পরিমাপ করা আছে। এর মানে বাংলাদেশ যতটুক স্থানব্যাপী বিস্তৃত ততটুকু বাংলাদেশের আয়তন। আয়তন শব্দের মূল অর্থ ছিল : দৈবস্থান, মন্দির, যজ্ঞগৃহ। এর থেকে গৌণার্থে শব্দটিকে গৃহ, বাস্তুভূমি, ভিটা প্রভৃতি অর্থেও ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন শব্দটি শুধু ক্ষেত্রমান, প্রস্থ বা বিস্তার প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বাস্তুভূমি, ভিটি, গৃহ প্রভৃতি আয়তনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। যেখানে বাস্তুভিটা বা গৃহ সেখানে আয়তন অনিবার্যভাবে এসে যায়। তাই সংস্কৃত ‘আয়তন’ বাংলায় এসে অর্থ পরিবর্তন করলেও মন বা হৃদয়ের অন্তর্নিহিত অনুভূতির কোনো পরিবর্তন করেনি।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!