বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

দ্বিতীয় অধ্যায়

আয়ুর্বেদ
‘আয়ুর্বেদ’ অতি প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র। এটি অথর্ববেদের অন্তর্গত। কারণব্যূহ অনুসারে এটি ঋক্বেদের উপবেদ। এটাকে পঞ্চম বেদও বলা হয়। প্রজাপতি চার বেদ হতে স্বতন্ত্র পঞ্চম বেদ নামে অভিহিত ‘আয়ুর্বেদ’ রচনা করেন। পরবর্তীকালে এটি আরও পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করা হয়। শল্য, শলাকা, কায়-চিকিৎসা, ভূতবিদ্যা, কৌমারভৃত্য, অগদতন্ত্র, রসায়নতন্ত্র, বাজীকরণতন্ত্র এ আট ভাবে আয়ুর্বেদশাস্ত্র বিভক্ত। এটাকে চিকিৎসাশাস্ত্রের আদিগ্রন্থসমূহের অন্যতম বলা হয়। একসময় আয়ুর্বেদশাস্ত্রই ছিল চিকিৎসার মূল ভিত্তি।

আরণ্যক
বেদের উপসংহার ভাগ ব্রাহ্মণ। এ ব্রাহ্মণের উপসংহার ভাগ হচ্ছে ‘আরণ্যক’। ব্রহ্মচর্য গ্রহণকালে অরণ্যাশ্রমে বাস করাকালীন গুরুর নিকট হতে যে উপদেশ ও শিক্ষা লাভ হয় তা এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অরণ্যে বসে গ্রন্থটি রাচনা করা হয়েছিল। তাই এর নাম ‘আরণ্যক’। আর এক বর্ণনা মতে, অরণ্যাশ্রমে এর উৎপত্তি বলে নাম হয় ‘আরণ্যক’। যজ্ঞাদি ধর্মানুষ্ঠানের জন্য যেমন ব্রাহ্মণখণ্ডের প্রয়োজন, তেমনি বানপ্রস্থাবলম্বীর জন্য আরণ্যকের প্রয়োজন।

আর্যাবর্ত
‘আর্যাবর্ত’ ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত একটি বিশাল এলাকা। এ এলাকাকে ঘিরে পৌরাণিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। পূর্ব-সমুদ্র, পশ্চিম-সমুদ্র, হিমালয় ও বিন্ধ্য পবর্ত এ চার সীমার মধ্যবর্তী বিশাল ভূভাগ আর্যাবর্ত নামে পরিচিত।

আর্ষপ্রয়োগ
ঋষির উক্তিকে ‘আর্ষ’ বলা হয়। সুতরাং ‘আর্ষপ্রয়োগ’ অর্থ ঋষির উক্তির প্রয়োগ। ঋষি হচ্ছে কবি ও মহাদ্রষ্টা মুনি। পরমার্থ তত্ত্বে যিনি খুব ভালো জ্ঞান ও সম্যক দৃষ্টি রাখেন, তিনিই ঋষি। পুরাণ মতে, যা হতে বিদ্যা, সত্য, তপঃ ও শ্র“তি সম্যকরূপে নিরূপিত হয় তিনিই ঋষি। অনেক সময় পণ্ডিত ও খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকগণও ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ অনেক শব্দ তাঁদের সাহিত্যকর্মে বসিয়ে দেন। লেখকের আকাশচুম্বী খ্যাতির কারণে এগুলোকে অশুদ্ধ বা ভুল বলে বাতিল করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। কালক্রমে বৈয়াকরণগণও অশুদ্ধ শব্দগুলোকে মেনে নেন এবং নাম দেন ‘আর্ষপ্রয়োগ’।
‘পূজারিণী’, ‘অশ্র“জল’, ‘সঞ্চয়িতা’ প্রভৃতি শব্দ ব্যাকরণের নিয়মানুসারে অশুদ্ধ, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। তাই এগুলো আর্ষপ্রয়োগ। ‘কাবুলিওয়ালা’ শব্দটি বাহুল্য দোষে দুষ্ট হলেও রবীন্দ্রনাথ এমন দুষ্টুমি করতে সঙ্কোচ করেননি। শরৎচন্দ্রের ‘অভাগী’ শব্দও অশুদ্ধ। শব্দগুলো আর্ষপ্রয়োগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, প্রচলিত সব অশুদ্ধ শব্দ কিন্তু আর্ষপ্রয়োগ নয়। ঋষি বা খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের ব্যবহৃত অশুদ্ধ শব্দ সাধারণ্যে বহুলভাবে প্রচলিত হলেই কেবল কোনো শব্দকে আর্ষপ্রয়োগ বলা যায়। অন্যথায় নয়।

আশ্কারা
‘আশ্কারা’ শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ আব্দার, প্রশ্রয় প্রভৃতি। এটি ফারসি থেকে বাংলায় এসেছে। ফারসি ভাষায় ‘আশ্কার’ শব্দের অর্থ গুপ্ত বিষয়ের প্রকাশ। বাংলায় আসার পরও শব্দটি তার ফারসি অর্থ অবিকৃত রেখে বেশ কিছুদিন চলছিল। রবীন্দ্রযুগেও ‘আশকারা’ শব্দের ব্যবহার গুপ্ত বিষয় প্রকাশ অর্থে বর্তমান ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে শব্দটির অর্থ পরিবর্তন হতে হতে প্রশ্রয় শব্দে এসে দাঁড়ায়। গুপ্ত বিষয় কে জানেন? যিনি কাছের লোক তিনি গুপ্ত বিষয় জানেন, যিনি কারও প্রিয় তার পক্ষে ওই ব্যক্তির গুপ্ত বিষয় জানা সম্ভব। যে যার যত কাছের, যত প্রিয় তার প্রশয়টাও বেশি ঘটে। এ জন্য প্রিয়জনের কাছে কেউ গুপ্ত কথা প্রকাশ করে দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। কারণ প্রকাশকারীর এমন বিশ্বাস থাকে যে, তার কথা গোপন থাকবে, তার কোনো শাস্তি হবে না। এভাবে প্রশ্রয়কারী বারবার একই ঘটনা ঘটাতে কুণ্ঠিত হন না। মূলত এ অনুষঙ্গে ফারসি আশকারা তথা গুপ্ত বিষয়ের প্রকাশ বাগ্্ভঙ্গিটা বাংলায় এসে ‘প্রশ্রয়’ হিসাবে মাথায় চড়ে বসে।

আশ্রম
ভারতীয় পুরাণে ‘আশ্রম’ শব্দটি বিভিন্ন স্থানে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রাহ্মণদের জীবনযাত্রার চারটি অবস্থা। যথা : ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। ব্রহ্মচর্য হচ্ছে ছাত্রাবস্থা, গুরুগৃহে বাস, গুরুসেবা, বেদাধ্যয়ন ও শিক্ষা। গার্হস্থ্য হচ্ছে গৃহী বা সংসারী হয়ে বিবাহিত অবস্থায় সংসারধর্ম পালন করা, পূজার্চনা, বেদাধ্যয়ন ইত্যাদি। বানপ্রস্থ হচ্ছে পঞ্চাশ বছর বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পর সংসারের কাজ সম্পন্ন করে বনগমন। সকল দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে ফলাহার, পূজার্চনা ও চিন্তায় অতিবাহিত করা। সন্ন্যাস হয়ে দেশে দেশে ভ্রমণ ও ভিক্ষান্নে দিনাতিপাত করাও এ অবস্থায় করা হয়। সকল আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের হাতে জীবন সমর্পণ।

আশ্বাসঘাতকতা
‘আশ্বাসঘাতকতা’ একটি নতুন শব্দ। এর অর্থ বিশ্বাসঘাতক-এর অনুরূপ। যারা বিশ্বাসের ঘাতক তারা বিশ্বাসঘাতক, তেমনি যারা আশ্বাসের ঘাতক তারা আশ্বাসঘাতক। যিনি কোনো আশ্বাস দিয়ে সে আশ্বাস রাখেন না কিংবা আশ্বাসের উল্টো করেন তাকে আশ্বাসঘাতক বলা হয়। এরূপ কর্মকে বলা হয় আশ্বাসঘাতকতা।

আষাঢ়ে গল্প
বাংলা এ বাগ্্ভঙ্গিটি একটি বহুল প্রচলিত বাগ্ধারা। এর আভিধানিক অর্থ উদ্ভট কাহিনি, অবিশ্বাস্য গল্প, আজগুবি গল্প, কল্পকথা প্রভৃতি। আষাঢ়ে অর্থ আষাঢ় মাসের, সুতরাং ‘আষাঢ়ে গল্প’ অর্থ আষাঢ় মাসের গল্প। কিন্তু বাগ্ধারার বাহ্যিক অর্থ আর অন্তর্নিহিত অর্থ এক নয়। আষাঢ় মাসে বাংলাদেশের প্রাচীন প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে জনজীবনের সম্পর্ক অনুষঙ্গে বাগ্ধারাটির উৎপত্তি। আষাঢ় মাসে প্রবল বর্ষণে চারদিক জলে থৈ থৈ করে। কোনো কাজকর্ম থাকে না বলে গ্রামবাংলার মানুষজন ঘরে বসে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে গালগল্পের আসরে মেতে উঠত। জীবনকাহিনি থেকে শুরু করে দৈত্যদানব, জিন-পরি-ভূত কারও গল্প বাদ যেত না। কেউ কেউ গল্প বানিয়ে নিজের জীবনের সত্য ঘটনা বলে চালিয়ে দিত। এখনও গ্রামবাংলায় আষাঢ় মাসে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। মূলত আষাঢ় মাসের এই গল্পগুজবের চিরায়ত অভ্যাস থেকে ‘আষাঢ়ে গল্প’ বাগ্ধারাটির উৎপত্তি।

আসর
‘আসর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সভা, মজলিশ, বৈঠক ইত্যাদি। আরবি আশর শব্দ থেকে বাংলা আসর শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ দশ। মহরম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার উৎপত্তিও ‘আশর’ শব্দ থেকে। সংখ্যাবাচক এ শব্দটি আরবি হতে বাংলায় এসে নানা মিথষ্ক্রিয়ার আবর্তে পড়ে সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করে। কিন্তু কীভাবে এমনটি সম্ভব হলো? দশজনে মিলে আসর গরম করার কথা প্রায় শোনা যায়। যদিও দশজনে মিলে জমানো আসরের মধ্যে দশজন থাকতে হবে এমন কথা নেই। মূলত রূপক বা গৌরবার্থক অর্থে দশ সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়। আবার বলা হয়, দশে মিলে করি কাজ হারি-জিতি নাহি লাজ। এখানেও দশজন অনিবার্য নয়। মনে হয়, বাংলায় প্রাচীনকাল থেকে লোকমুখে উচ্চারিত এ সকল দশভিত্তিক মজলিশ-জমানো ব্যবহারিক-বাক্ভঙ্গি থেকে আরবি আশর (দশ) বাংলা আসর (মজলিশ, বৈঠক) হয়ে বাংলা ভাষায় ঠাঁই করে নিয়েছে।

অ্যালবাম
‘অ্যালবাম’ শব্দের উৎস-ভাষা কোনটি? কিছু না-ভেবে হুট করে বলে দিয়েছিলাম : ইংরেজি। চাচার চোখমুখ দেখে ছোট ভাই বুঝে যায় আমার উত্তর ঠিক হয়নি। সে বলে দিল : ফরাসি। কারও উত্তর ঠিক হয়নি। বহুদিন আগে উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াকালীন ঘটনা। অতঃপর চাচা বুঝিয়ে দিলেন। অ্যালবাম শব্দের উৎস-ভাষা ল্যাটিন। অবশ্য এটি এখন বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ। বাংলা ভাষা ‘অ্যালবাম’ শব্দটি ইংরেজি ভাষা থেকে এবং ইংরেজরা নিয়েছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। ল্যাটিন অষনঁং শব্দ থেকে অ্যালবাম শব্দের উৎপত্তি। অষনঁং শব্দের অর্থ সাদা। প্রাচীন রোমে প্রজাসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রচারিত বিজ্ঞপ্তি শহরের কেন্দ্রস্থলে রাখা সাদা রঙের পাথরের ফলকে লিখে রাখা হতো। এ লিপি-ফলকের নাম ছিল অ্যালবাম। চাচা এখন নেই, বিগত প্রহর কিন্তু স্মৃতির অ্যালবামে অমর।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!