বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

তৃতীয় অধ্যায়
ই ঈ

ইঁদুর দৌড়
‘ইঁদুর দৌড়’ শব্দটি ইংরেজি ৎধঃ-ৎধপব শব্দের বাংলা অনুবাদ। ৎধঃ-ৎধপব শব্দটির জন্ম আমেরিকায়। এটি ছিল আমেরিকায় বহুল প্রচলিত একপ্রকার নাচ। এ নাচে অংশগ্রহণকারীরা ইঁদুরের মতো অস্থির ও চঞ্চলচিত্তে কোনোরূপ নিয়ম-নীতি ছাড়া ইচ্ছেমতো ছুটোছুটি করে নৃত্য করত। প্রকৃত অর্থে এখানে নাচের কোনো মুদ্রা ছিল না। যে যত অস্থিরচিত্তে বিশৃঙ্খলভাবে ইচ্ছেমতো দৌড়াদৌড়ি করত তাকে বলা হতো ভালো নৃত্যশিল্পী। বাংলায় শব্দটির অর্থ ও ব্যবহার দুটোরই পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে কোনোরূপ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না-করে যেকোনো উপায়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর চরম প্রতিযোগিতা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ভর্তি, চাকরি ও চারদিকে অভাবের যুগে লক্ষ্যবস্তু অর্জনের জন্য সকল বয়স ও শ্রেণির মানুষের যে তীব্র প্রতিযোগিতা তা আমেরিকার ইঁদুর-নাচের মতোই শৃঙ্খলাহীন।

ইংরেজ
‘ইংরেজ’ শব্দের বাংলা আভিধানিক অর্থ ইংল্যান্ডের অধিবাসী। তাদের ভাষায় ইংলিশ (ঊহমষরংয)। কিন্তু বাংলায় ইংলিশকে বলা হয় ইংরেজি। ইংরেজ কিংবা ইংরেজি কোনোটা ইংলিশ শব্দ নয়। ইংলিশ ভাষার শব্দভাণ্ডার থেকে বাঙালিরা অনেক শব্দ নিয়েছে কিন্তু তাদের জাতি ও ভাষার নামের ক্ষেত্রে তেমন হয়নি। উপমহাদেশে পর্তুগিজরা ইংরেজদের আগে এসেছিল। বস্তুত পর্তুগিজদের মাধ্যমে বাঙালিদের সঙ্গে ইংল্যান্ডবাসীর পরিচয় হয়। পর্তুগিজরা ইংল্যান্ডের নাগরিকদের ঊহমৎবু ডাকত। পর্তুগিজদের ডাকা সে ইংরেজ শব্দটিই বাঙালিরা গ্রহণ করে। তাই বাঙালিদের কাছে ইংল্যান্ডবাসী ইংরেজ এবং তাদের ভাষা ইংরেজি।

ইতিহাস
১. ইতিহ + আস = ইতিহাস, ২. গত বা অতীত বিষয়ের যে স্থিতিশীল রূপ আমাদের অধিকারে এসেছে বা যা উপদেশ পরম্পরা রূপে আছে। ৩. উপদেশ পরম্পরার আধার, লোকক্রমাগত কথা, পূর্ববৃত্তান্ত, প্রাচীন কথা, পৌরাণিক বিষয় বা উপাখ্যান, পুরাবৃত্ত-উপনিবন্ধপ্রায় গ্রন্থ, পুরবৃত্ত, মহাভারতাদি বৃত্তান্ত, বিবরণ, যরংঃড়ৎু প্রভৃতি অর্থে প্রচলিত। ‘ইত’ শব্দের অর্থ গত। তার গতিশীলতাকে অর্থাৎ ইত ইত করে চলতে থাকলে, তাকে বলে ইতি। সে ইতি যখন একটা স্থিতিশীল রূপ নেয় তখন তা ইতিহ। অধিকন্তু যাতে ইতিহ থাকে তা-ই ঐতিহ্য।

ইন্তেকাল
বাংলা অভিধানে ‘ইন্তেকাল’ শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে মৃত্যু। তবে এটি আরবি শব্দ। আরবি ভাষায় এর অর্থ স্থানান্তর, পরিবহণ প্রভৃতি। ভারতে মোগল রাজত্বের সময় জমিদারির মালিকানা পরিবর্তন, সম্পত্তির হাতবদল, রাজস্ব একখাত থেকে অন্য খাতে দেখানোর বিষয়গুলোকে ‘ইন্তেকাল’ শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হতো। এক জনের কাছ থেকে জমি কেনার পর নতুন মালিককে যে পুরনো মালিকের নাম খারিজ করিয়ে নিতে হয় সে প্রক্রিয়াটাও ‘ইন্তেকালি’ করানো নামে পরিচিত ছিল। শব্দটি বাংলা ভাষায় আসার পর অর্থের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং তা সম্পত্তি হস্তান্তরের পরিবর্তে আত্মার ইহলোক থেকে ‘পরলোকে স্থানান্তর’ অর্থে রূপ নেয়। এখন ‘ইন্তেকাল’ বললে কেউ সম্পত্তি হস্তান্তর বুঝবে না, ইহলোক হতে পরলোকে স্থানান্তর হয়েছে একটি লোক এমনটিই বুঝবে।

ইন্দ্র
ইন্দ্র ঋক্্বেদের প্রধান দেবতা। বেদে দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্রের স্থান প্রথম। বৈদিক দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্র শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও প্রচণ্ড শক্তিমান হিসাবে পরিচিত। কিন্তু পুরাণে তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এ তিন শক্তির অধীন। অপর সকল দেবতার ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী ছিলেন বলে তিনি দেবরাজ নামে খ্যাত। তবে দেবরাজ হলেও তিনি স্বয়ম্ভূ ছিলেন না। তাঁর মায়ের নাম অদিতি। ইন্দ্রের পুত্রের নাম জয়ন্ত, বালী ও অর্জুন। কন্যার নাম জয়ন্তী। ইন্দ্রের নগরের নাম অমরাবতী, অশ্বের নাম উচ্চৈঃশ্রবা, হস্তীর নাম ঐরাবত। তাঁর তরবারি ও ধনুর নাম ছিল যথাক্রমে পারন্ধ ও ইন্দ্রচাপ এবং অন্যান্য যে অস্ত্র তিনি ব্যবহার করতেন সেগুলোর নাম হচ্ছে : বজ্র, হ্রাদিনী ও দম্ভোলী।

ইন্দ্রপ্রস্থ
‘ইন্দ্রপ্রস্থ’ দিল্লির নিকটবর্তী একটি উপশহর। প্রাচীনকালে এটি যুধিষ্ঠিরের রাজধানী ছিল বলে মনে করা হয়। এখানে প্রাচীন ইন্দ্রপ্রস্থের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। খাণ্ডবারণ্যের মধ্যে এ নামের একটি নগর ছিল। কথিত হয় দেবতারা ইন্দ্রপ্রস্থ স্থাপনা করেন। এ স্থানে প্রাচীনকাল থেকে ইন্দ্র বিষ্ণুর পূজা করতেন। সে জন্য এর নাম হয় ইন্দ্রপ্রস্থ।

ইভ্টিজিং
ইভ্টিজিং ইংরেজি শব্দ। এর অর্থ কোনো নারীকে স্বাভাবিক চলাফেরা বা কাজকর্ম করা অবস্থায় যৌন হয়রানি, বিরক্ত, অপমান বা অন্য কোনোভাবে সম্মানহানিকর বা এরূপ মনে করার মতো এমন কিছু করা। বাইবেল-মতে ইভ্ পৃথিবীর প্রথম নারী। ইভ্ নামের সঙ্গে ইংরেজি ঃবধংরহম ক্রিয়া যুক্ত হয়ে ইভ্টিজিং শব্দের উৎপত্তি। মূলত ভারত, পাকিস্তন ও বাংলাদেশে শব্দটির বহুল প্রচলন লক্ষ করা যায়। নেপালেও শব্দটির প্রচলন রয়েছে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো শব্দটি যৌন হয়রানিমূলক পদ হিসাবে প্রচার-মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইভ্টিজিং শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ বিবেচনায় যথাপোযুক্ত নয়। তাই শব্দটি বর্ণিত অর্থে ব্যবহার না-করাই সমীচীন।

ইলশাগুঁড়ি
‘ইলশাগুঁড়ি’ শব্দের অর্থ গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। শব্দটি ইলশেগুঁড়ি বানানে সমধিক প্রচলিত। ইলিশ মাছের সঙ্গে ‘ইলশাগুঁড়ি’ নামের বৃষ্টির গভীর সম্পর্ক। এ রকম বৃষ্টির সময় জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়ে বলে প্রচলিত বিশ্বাস। এ বিশ্বাস থেকে ‘ইলশাগুঁড়ি’ শব্দটির উৎপত্তি। যে ধরনের বৃষ্টি হলে ইলিশ মাছ প্রচুর ধরা পড়ে সে ধরনের বৃষ্টিই হচ্ছে ‘ইলশাগুঁড়ি’ বা ‘ইলশেগুঁড়ি’।
ইস্তফা
‘ইস্তফা’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ কর্ম-পরিত্যাগ, সমাপ্তি, ত্যাগ প্রভৃতি। আরবি ‘ইস্তিফা’ শব্দ হতে বাংলা ‘ইস্তফা’ শব্দের উৎপত্তি। আরবি ‘ইস্তিফা’ শব্দের অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু বাংলায় এসে শব্দটি তার জন্মগত অর্থ পরিত্যাগ করে কর্ম-পরিত্যাগ বা সমাপ্তি ও ত্যাগ অর্থ ধারণ করেছে। মুসলিম আমলে বাঙালিদের কর্ম মধ্যপ্রাচ্য হতে আগত শাসক মুসলিমদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল। যতদিন তাদের সন্তুষ্ট রাখা যেত ততদিন কর্ম থাকত। এ সন্তুষ্টির অন্যতম নিয়ামক ছিল আনুগত্য ও বিনয়। যা অনেকটা দাসত্বের কাছাকাছি। ইংরেজি আমলেও এমনটি ছিল। কর্ম পেতে যেমন অনুনয়-বিনয় ও প্রার্থনার মাধ্যমে কর্মদাতাকে সন্তুষ্ট করা প্রয়োজন ছিল তেমনি কর্ম চলে গেলেও অনুনয়-বিনয়ের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা অত্যাবশ্যক ছিল। তাই আরবি ‘ক্ষমা’ বাংলায় এসে ‘ইস্তফা’ নামের মাধ্যমে ‘পদত্যাগ’ অর্থ ধারণ করেছে।


ঈশ্বর
হিন্দুধর্মে পৌরাণিক বিশ্বাসমতে মহাদেব ঈশ্বর নামে পরিচিত। তিনি একাদশতনু বা একাদশরুদ্র নামেও পরিচিত। কারণ তিনি একাদশ বার ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি ধারণ করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভিন্নমূর্তিরূপী তাঁর নামসমূহ হচ্ছে : অজ, একপাদ, অহিব্রধ্ন, পিনাকী, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর, বৃষাকপি, শম্ভু, হর ও ঈশ্বর।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

 

error: Content is protected !!