বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস সম্পূর্ণ বই, এক মলাটে বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস পিডিএফ

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস

চতুর্থ অধ্যায়
উ ঊ ঋ

উচ্চাভিলাষ
উচ্চ + অভিলাষ = উচ্চাভিলাষ। যার অর্থ উচ্চ আশা। এটি দিয়ে কারও ধন, পদ, মর্যাদা, ক্ষমতা, জনবল প্রভৃতি অর্জনের আকাক্সক্ষা বোঝায়। অভিলাষ মানে ইচ্ছা, বাসনা। অন্যদিকে, স্বপ্ন + বিলাস = স্বপ্নবিলাস। যার অর্থ হচ্ছে স্বপ্নে বা কল্পনায় সুখভোগ করা। ‘উচ্চাভিলাষ’ শব্দে ইচ্ছা আর ‘স্বপ্নবিলাস’ শব্দে ভোগ দৃশ্যমান। স্বপ্নবিলাস হওয়া সহজ এবং সহজে তা করা যায়। কারণ স্বপ্ন দেখার কোনো শর্ত নেই। কিন্তু ‘উচ্চ’ তথা ধন/পদ/মর্যাদা/ক্ষমতা প্রভৃতি অর্জন না-করা পর্যন্ত তা উপভোগ করা সম্ভব নয়। স্বপ্ন যে কেউ দেখতে পারেন, তাই কারও স্বপ্নবিলাস থাকার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তবে উচ্চকে নিয়ে বিলাস করতে হলে তাকে আগে উচ্চ হতে হবে। স্বপ্ন বাস্তব হতেও পারে না-ও পারে। তবে স্বপ্ন বাস্তব হয়ে গেলে তা আর অভিলাষ থাকে না, বিলাসে পরিণত হয়। তাই স্বপ্ন অভিলাষ নয়, ‘বিলাস’। অন্যদিকে উচ্চ ‘বিলাস’ নয়, অভিলাষ।

উচ্চৈঃশ্রবা
দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনকালে সমুদ্র হতে ধবধবে সাদা একটি অশ্ব উদ্ভূত হয়। এটি উচ্চৈঃশ্রবা নামে পরিচিত। এ অশ্ব অমৃত পান করত এবং অশ্বদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল। এটির মালিক ছিলেন ইন্দ্র।

উজবুক
‘উজবুক’ শব্দটির অর্থ আহাম্মক, মূর্খ, বোকা, আনাড়ি, অশিক্ষিত ইত্যাদি। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলে উজবেকিস্তান থেকে যে সকল ভাড়াটে সৈন্য এসেছিল তাদের নাম ছিল উজবক বা উজবেক। এ উজবক বা উজবেকরাই বাঙালিদের কাছে উজবুক হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বাঙালিদের মধ্যেও উজবুক দেখা দিতে শুরু করে। উজুবকদের দৈহিক শক্তির খ্যাতি ছিল প্রবল কিন্তু মানসিক উৎকর্ষে তারা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সে থেকে মানসিক উৎকর্ষহীন ব্যক্তি বোঝাতে উজবুক শব্দটি চালু হয়ে যায়। এর অর্থ হয় দৈহিক শক্তিসর্বস্ব বুদ্ধিহীন ব্যক্তি এবং তা থেকে ‘উজবুক’ শব্দটি ক্রমান্বয়ে বোকা বা আহাম্মক অর্থে এসে দাঁড়ায়। স্থানীয় লোকজন উজবেকিস্তানের সৈন্যদের বুদ্ধিহীনতাকে কোনো নির্বোধ লোকের উপমা প্রদানের জন্য ‘উজবুক’ নামে ব্যবহার শুরু করে। এভাবে উজবুক শব্দটি ‘আহাম্মক বা বোকা লোক’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে বাংলা অভিধানে স্থান করে নেয়।

উজ্জয়িনী
আধুনিক উজ্জয়িনী। এটি বিক্রমাদিত্যের রাজধানী ছিল। প্রাচীন হিন্দু ভৌগোলিকেরা এখান থেকে সর্বপ্রকার ভৌগোলিক গণনা করতেন।

উঞ্ছবৃত্তি
‘উঞ্ছবৃত্তি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হীনজীবিকা, ভিক্ষাবৃত্তি, হেয় জীবনোপায়। বস্তুত উঞ্ছের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করাকে উঞ্ছবৃত্তি বলা হয়। উঞ্ছ শব্দের অর্থ হলো মাঠের শস্য কেটে নেওয়ার পর পরিত্যক্ত শস্যকণা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সংগ্রহ। এ ধরনের কাজ দ্বারা যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁর বৃত্তিই উঞ্ছবৃত্তি। একসময় অনেকে এভাবে জীবনধারণ করতেন। এখনও গ্রামাঞ্চলে এমন জীবিকাধারীদের দেখা যায়। তবে এখন উঞ্ছবৃত্তি বলতে হীনজীবিকা, ভিক্ষাবৃত্তি প্রভৃতিও বোঝায়।

উৎকোচ
‘উৎকোচ’ সংস্কৃত শব্দ। বাংলা ভাষায় এর অর্থ ঘুষ। অভিধানে উৎকোচ বলতে ‘অবৈধ সহায়তার জন্য প্রদত্ত গোপন পারিতোষিক’ বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় ‘উৎকোচ’ অর্থ ‘সৎপথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া’। সত্যি, উৎকোচ মানুষকে সৎপথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

উৎপত্তি ও ব্যুৎপত্তি
উৎপত্তি ও ব্যুৎপত্তি বিষয়টি যথাক্রমে ‘উৎসগত’ ও ‘কাঠামোগত’ প্রত্যয় হিসাবে ব্যাখ্যা করা যায়। উৎপত্তি শব্দের অর্থ বি. উদ্ভব, জন্ম, সৃষ্টি, আবির্ভাব, অভ্যুদয়। উৎপত্তি [সংস্কৃত, উৎ + √পদ্ + তি]। ‘ব্যুৎপত্তি’ শব্দের অর্থ বি. জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বোধ, পারদর্শিতা, গভীর পাণ্ডিত্য। ব্যুৎপত্তি [সংস্কৃত, বি + উৎপত্তি]। বাক্যে প্রয়োগ : ব্যাকরণশাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ ব্যুৎপত্তি রয়েছে।

উৎস
‘উৎস’ শব্দের আভিধানিক অর্থ উৎপত্তিস্থল, উদ্ভবস্থল, উৎপত্তিপ্রক্রিয়া প্রভৃতি। এটি সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় উৎস শব্দের অর্থ যে স্থান ক্ষরিত বা ঝরে পড়া জলে ভিজে যায়। সে স্থানের জল প্রবাহিত হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। সংস্কৃতে উৎস শব্দটি প্রস্রবণ, ঝরনা, ফোয়ারা প্রভৃতি অর্থেও ব্যবহার করা হয়। কোনো স্থানকে সিক্ত করতে হলে জল প্রয়োজন, সিক্ত স্থান হতে জলকে প্রবাহিত হতে হলে আরও অধিক জলের প্রয়োজন। এ জল আসে এমন একটি স্থান হতে যেখানে জলের উৎপত্তির অনুকূল উপাদান বা শর্ত রয়েছে। প্রস্রবণ, ঝরনা ও ফোয়ারার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা প্রয়োজন। জলের উৎপত্তিস্থল ছাড়া যেমন প্রবাহ, জলের সঞ্চয়, ঝরনা, প্রস্রবণ সম্ভব নয় তেমনি যেকোনো বিষয়ে উৎপত্তিস্থল বা উৎপত্তি-প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো বিষয় বা ঘটনার পরিস্ফুটন অসম্ভব।

উৎসব
‘উৎসব’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ অনুষ্ঠান, আনন্দানুষ্ঠান, পর্বানুষ্ঠান প্রভৃতি। সংস্কৃত হতে আগত শব্দটির মূল অর্থ ছিল : যা সুখ বা আনন্দ প্রসব করে। এখন বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত উৎসবের সাযুজ্য বিশ্লেষণ করা যাক। বাংলায় উৎসব বলতে এমন একটি সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বোঝায় যা আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে পালন করা হয়। ঈদ, দুর্গাপূজা, রাষ্ট্রীয় দিবস, পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক-পর্ব প্রভৃতি মানুষের মনে আনন্দ সঞ্চার করে। পর্ব বা অনুষ্ঠান অর্থ আনন্দ। বাংলায় উৎসব আনন্দ প্রসব করে বা আনন্দ দেয়। সুতরাং বলা যায় বাংলা ‘উৎসব’ শব্দের সংস্কৃত অর্থ প্রায় অভিন্ন রয়ে গেছে।

উৎসর্গ
‘উৎসর্গ’ শব্দের অর্থ কোনো মহান উদ্দেশ্যে দান বা অর্পণ। কোনো ব্যক্তি বিশেষকে বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নিবেদন প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে উৎসর্গ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কবি-সাহিত্যিকগণ তাঁদের গ্রন্থ প্রায়শ কাউকে না কাউকে উৎসর্গ করে থাকেন। পূজারিগণ দেবতার উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন বা উৎসর্গ করে থাকেন। ‘উৎসর্গ’ সংস্কৃত হতে বাংলায় এসেছে। সংস্কৃত ভাষায় এর অর্থ পূজায় বা যাগযজ্ঞে উপহার দেওয়া, দেবতার উদ্দেশে পশু বলি দেওয়া। পূজা একটি মহৎ কর্ম বলে স্বীকৃত। এ মহৎ কর্মে যা নিবেদন করা হয় তা সদুদ্দেশ্যে অর্পণ। তাই ‘উৎসর্গ’ শব্দটি মহান কোনো কাজে বা উদ্দেশ্যে দান বা অর্পণ অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য সংস্কৃত ভাষায় ‘উৎসর্গ’ শব্দের অর্থ আরও ব্যাপক। যেকোনো দান, পরিহার, পরিত্যাগ প্রভৃতি অর্থেও উৎসর্গ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। সে অর্থে মলত্যাগও উৎসর্গ। অবশ্য মলত্যাগের মতো মহান উৎসর্গ আর হতে পারে না। কারণ এর ত্যাগ মানুষের স্বাভাবিক, সুন্দর পুণ্যময় জীবনের অন্যতম নিয়ামক।

উত্তম-মধ্যম
‘উত্তম-মধ্যম’ শব্দটির অর্থ লাঞ্ছনাসহ প্রহার, বিস্তর পিটুনি, প্রচণ্ড প্রহার প্রভৃতি। বস্তুত এ সকল অর্থ প্রকাশে বাগ্ধারাটি ব্যবহার করা হয়। উত্তম ও মধ্যম শব্দের মিলনে উত্তম-মধ্যম। উত্তম শব্দের অর্থ ভালো, অত্যন্ত এবং মধ্যম শব্দের অর্থ মাঝারি। সুতরাং উত্তম-মধ্যম শব্দের অর্থ হয় ‘অত্যন্ত ও মাঝারি’। কিন্তু ‘উত্তম-মধ্যম’ বাগ্ধারার প্রচলিত ও আভিধানিক অর্থ ‘অত্যন্ত ও মাঝারি’ নয়। অন্যান্য বাগ্ধারার ন্যায় এটি তার বাহ্যিক অর্থ বিসর্জন দিয়ে নতুন একটি অর্থ ধারণ করেছে। সেটি হচ্ছে লাঞ্ছনাসহ প্রহার। কাউকে শুধু প্রহার করলে সেটি উত্তম-মধ্যম বলা যাবে না। উত্তম-মধ্যম বাগ্ধারার প্রকৃত অর্থের পরিস্ফুটন ঘটাতে হলে প্রহারের সঙ্গে অপমান থাকাও প্রয়োজন। (১) শিক্ষক ছাত্রটিকে দুষ্টুমি করার জন্য প্রহার করলেন; (২) শিক্ষক ছাত্রটিকে দুষ্টুমির জন্য উত্তম-মধ্যম দিলেন। এখানে প্রথম বাক্য প্রকাশ করছে শিক্ষক ছাত্রটিকে শুধু পিটুনি দিয়েছেন কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে প্রকাশ করছে শিক্ষক ছাত্রটিকে শুধু মারেননি, অপমানও করেছেন। হতে পারে সে অপমান কান ধরে দাঁড়িয়ে রাখা বা অন্যকিছু। তবে প্রচণ্ড প্রহার, বিস্তর পিটুনি অর্থেও ‘উত্তম-মধ্যম’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়। এর কারণ আছে। প্রচণ্ড পিটুনি দিলে কাপড়চোপড় ওলোট-পালটসহ বিভিন্নভাবে অপমান এমনিতে চলে আসে।

উত্যক্ত
‘উত্যক্ত’ একটি ভয়ানক শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ উদগ্রভাবে বিরক্ত বা অপমানকর বিরক্ত। ত্যক্ত শব্দের অর্থ পরিত্যক্ত, জ্বালাতন, বিরক্ত প্রভৃতি। সংস্কৃত ভাষায় উত্যক্ত শব্দের অর্থ দূরে নিক্ষিপ্ত করা বা পরিত্যক্ত। যাকে পরিত্যাগ করা হয়েছে সংস্কৃত ভাষায় তাকে উত্ত্যক্ত করা হয়েছে বলা যায়। কিন্তু বাংলা ভাষায় উত্যক্ত অর্থ এ হিসাবে উত্ত্যক্ত অর্থ পরিত্যক্ত নয়, দূরে নিক্ষেপও নয়; বরং উদগ্র বা প্রচণ্ডতা বা অপমানজনকভাবে ত্যক্ত করা বা জ্বালাতন করা। বাংলা ভাষায় উত্ত্যক্ত শব্দটি এখন শিশু বা নারীকে জ্বালাতন করার বিষয় প্রকাশে খুব বেশি ব্যবহার হয়। নারীর দিকে চোখ তুলে তাকালেও ওই নারী উত্ত্যক্ত হতে পারে এমনকি না-তাকালেও নারী যদি বলে সে অপমানবোধ করেছে। তা হলে খবর আছে। আসলে যে ব্যবহার অন্যের মনে বিরক্ত, জ্বালা, ক্ষোভ, অপমান সঞ্চার করে তা উত্ত্যক্ত। সংস্কৃতে কাউকে পরিত্যাগ করলে বা দূরে তাড়িয়ে দিলে তার মনে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় বাংলায় পরিত্যাগ না-করে শুধু উত্ত্যক্ত করলেও সে অবস্থার সৃষ্টি হয়।

 

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

error: Content is protected !!