বাংলা সাহিত্যের বীরবল

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা সাহিত্যের বীরবল

প্রাবন্ধিক, পত্রিকা সম্পাদক, কবি ও গাল্পিক প্রমথ চৌধুরী ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। আজ তাঁর জন্মদিন। শুবাচের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। স্মরণ করি কৃতজ্ঞতায়। প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে। বীরবল ছিল তাঁর লেখক ছদ্মনাম।এ ছদ্মনাম থেকে বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তিত হয় বীরবলী ধারা।
তিনি ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৪২-১৯২৩) কন্যা ইন্দিরা দেবীকে (১৮৭৩-১৯৬০) বিবাহ করেন। লেখক আশুতোষ চৌধুরী (১৮৮৮-১৯৪৪) ছিলেন তাঁর অগ্রজ। প্রসঙ্গত, আশুতোষ চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভগিনী প্রতিভা দেবীর স্বামী।
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সবুজ পত্র বাংলা সাহিত্যে প্রথম চলতি ভাষারীতিতে লিখিত পত্রিকা।তাই তাঁকে বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রবর্তক বলা হয়।তাঁর সম্পাদিত অন্যান্য পত্রিকা: বিশ্বভারতী (১৩৪৯—১৩৫০), রূপ ও রীতি (১৩৪৭—১৩৪৯) এবং অলকা।
তিনি ইংরেজি ও ফরাসি সাহিত্যে সুপন্ডিত ছিলেন। ফরাসি সনেটরীতি ট্রিয়লেট, তের্জারিমা, ইটালীয় সনেট ইত্যাদি বিদেশি কাব্যবন্ধ বাংলা কাব্যে তিনিই প্রবর্তন করেন।সনেট পঞ্চাশৎ (১৯১৩) ও পদচারণ (১৯১৯) তাঁর লেখা দুটি কাব্যগ্রন্থ। বাংলা সাহিত্যে প্রথম বিদ্রূপাত্মক প্রবন্ধ রচয়িতা হিসেবেও তিনি খ্যাত। তাঁরই নেতৃত্বে বাংলা সাহিত্যে সূচিত হয়েছিল নতুন গদ্যধারা।
তেল-নুন-লকড়ী (১৯০৬), বীরবলের হালখাতা (১৯১৬), নানাকথা (১৯১৯), আমাদের শিক্ষা (১৯২০), রায়তের কথা (১৯১৯), নানাচর্চা (১৯৩২) প্রভৃতি তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ। চার-ইয়ারী কথা (১৯১৬), আহুতি (১৯১৯), নীললোহিত (১৯৪১), অনুকথা সপ্তক, ঘোষালে ত্রিকথা প্রভৃতি তাঁর গল্পগ্রন্থ।
প্রমথ চৌধুরী কলকাতা হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রাস এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এফ এ পাস করেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে দর্শন শাস্ত্রে বিএ (অনার্স), ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলাত যান। তবে ব্যারিস্টারি পেশায় স্থিত না হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা এবং সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।তিনি দীর্ঘকাল ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন।
১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত মাসিক  সবুজ পত্র প্রকাশনা এবং এর মাধ্যমে বাংলা চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে তখন একটি শক্তিশালী লেখকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে।  রবীন্দ্রনাথও এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রমথ চৌধুরী ‘বীরবল’ ছদ্মনামে এ পত্রিকায় ব্যঙ্গরসাত্মক প্রবন্ধ ও নানা গল্প প্রকাশ করেন। তাঁর এ ছদ্মনাম থেকে তখন বাংলা সাহিত্যে বীরবলী ধারা প্রবর্তিত হয়। তাঁর সম্পাদিত অন্যান্য পত্রিকা হলো বিশ্বভারতী (১৩৪৯-৫০), রূপ ও রীতি (১৩৪৭-৪৯) এবং অলকা।
প্রমথ চৌধুরী ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত একবিংশ বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষ-বক্তারূপে বঙ্গ সাহিত্যের পরিচয় তুলে ধরেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত জগত্তারিণী স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। ১৯৪৬ সালের ২রা ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
—————
error: Content is protected !!