বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন ও সর্ব-শংসতিগালি

ড. মোহাম্মদ আমীন

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

আবদুল হাকিম আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি।  তিনি অনুমান ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম শহরে মারা যান। নূরনামা তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনি নুরনামা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত বঙ্গবাণী কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের সব কবিতা, সব লাইন বিলুপ্ত হয়ে গেলেও  যে কবিতটি টিকে থাকবে সেটি বঙ্গবাণী। কারণ,  বঙ্গবাণী কবিতটি— সুস্পষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রশস্তি গেয়ে রচিত প্রথম কবিতা। 

মধ্যযুগের আর কোনো কবির কোনো লেখা কবিতা এত অধিক বার এত অধিক আগ্রহ আর গভীর মমতার নিবিড় নিষ্ঠায় পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়নি। এ বিবেচনায় ‘বঙ্গবাণী’কে বলা যায়— বাংলা সাহিত্যের সবার্ধিক পঠিত কবিতা।বলা হয়, তিনি আর কোনো কবিতা না-লিখলেও কেবল এই একটি কবিতার জন্য বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বহু আগে এটি লেখা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কবি আবদুল হাকিম কবিতাটি লিখেছেন। 

কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।

সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।

তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।

নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।


আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।

দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।

আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।

যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।


যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।

সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।

সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।

বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।


মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।

হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।।

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।


দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
এ পর্যন্ত আবদুল হাকিমের লেখা আটটি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এগুলো হলো:

(১) নুরনামা (১৯৬৯-১৬৭১),

(২) ইউসুফ জোলেখা,

(৩) লালমতি, ‌‌

(৪) শহরনামা,

(৫) সয়ফুলমুলুক,

(৬) কারবালা.

(৭) শিহাবুদ্দিননামা এবং

(৮) নসীহতনামা।

এখনকার মতো তখনও বাংলায় জন্মগ্রহণকারী কিছু বাঙালি  বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখাতে কুণ্ঠিত হতো না। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে মাতৃভাষার নিন্দা করত। মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষার নিন্দা করা মানে মায়ের নিন্দা করা। মাতৃভাষাকে উপহাস করা মানে জননীকে উপহাস করে। এসব করে কুলাঙ্গার। মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে কবি আবদুল হাকিম নূরনামা কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন:

“যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিদুটোয় মাতৃভাষা অবজ্ঞকারী বাঙালিদের জারজ আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম শালীন এবং সর্ব-শংসিত আদুরে গালি বলা যায়। বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত লোক নেই যিনি চরণদুটো পড়েননি। যিনি যত বেশি দেশপ্রেমিক, মাতৃভাষাপ্রেমিক তিনি তত বেশি বার এ গালিটি দিয়েছেন।

বঙ্গবাণী নামের একটি পত্রিকা ছিল। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেরণায় রমাপ্রসাদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নামটি কবি আবদুল হাকিমের বঙ্গবাণী কবিতার নামকরণ হতে গৃহীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতি, সংগীত, ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, সাহিত্য সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হত। দেশি বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিদের জীবনী, মতবাদ ছাপা হতো। ‘সবুজ পত্র’ এবং ‘কল্লোল’- এর মধ্যবর্তীপর্বে ‘বঙ্গবাণী’ প্রকাশিত হয়। ‘সবুজ পত্র’, ‘নারায়াণ’ এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার বহু লেখক এখানে যেমন লিখেছেন তেমনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পালের লেখা, চিত্তরঞ্জন দাশের অপ্রকাশিত গান প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায়। এখানে সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি প্রকাশিত হয়। 

error: Content is protected !!