বাংলা সাহিত্যে মুনীর চৌধুরীর অবদান

ড. মোহাম্মদ আমীন

 
আজ ২৭শে নভেম্বর খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্য সমালোচক মুনীর চৌধুরীর জন্মদিন। তিনি ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে নভেম্বর পিতার কর্মস্থল তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। পৈতৃক নিবাস নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানাধীন গোপাইরবাগ গ্রামে। মুনীর চৌধুরী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরীর চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। কবীর চৌধুরী তার অগ্রজ, ফেরদৌসী মজুমদার তার অনুজ।
 
মুনীর চৌধুরী ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার জন্য বন্দি হন। বন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন কবর নাটক। মুনীর চৌধুরী ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত পূর্ববঙ্গ সরকারের ভাষা-সংস্কার কমিটির রিপোর্টের অবৈজ্ঞানিক ও সাম্প্রদায়িক বিষয়বস্তুর তীব্র সমালোচনা করে  পূর্ববঙ্গের ভাষা কমিটির রিপোর্ট আলোচনা প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে এপ্রিল প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমিতে পঠিত হয়। কিন্তু মুসলিম ধর্মবিশ্বাসে আঘাতের অভিযোগে তাঁকে কৈফিয়ত দিতে হয়।  মীর মানস (১৯৬৫) প্রবন্ধ সংকলনের জন্য তিনি দাউদ পুরস্কার এবং পাক-ভারত যুদ্ধ সম্পর্কে লেখা  রচনা-সংকলন রণাঙ্গন (১৯৬৬)-এর জন্য সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধি লাভ করেন। তিনি ১৯৬৭-৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বাংলা বর্ণমালা ও বানান-পদ্ধতির সংস্কার প্রচেষ্টার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।
 
 
১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান সরকার বাংলা বর্ণমালাকে রোমান বর্ণমালা দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে আন্দোলনের সমর্থনে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করেন।
 
মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বাংলা টাইপরাইটারের জন্য উন্নতমানের কী-বোর্ড উদ্ভাবন করেন। যার নাম মুনীর অপ্‌টিমাAn Illustrated Brochure on Bengali Typewriter (1965) শীর্ষক পুস্তিকায় তিনি তাঁর পরিকল্পনা তুলে করেন।  এই নতুন টাইপরাইটার নির্মাণের লক্ষ্যে তিনি কয়েকবার তৎকালীন পূর্ব জার্মানিতে যান।
 
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে তিনি মে-জুন মাসে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসাবে এবং জুলাই মাস থেকে কলা অনুষদের ডিন হিসাবে কাজ করেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর  মুনীর চৌধুরীকে তাঁর বাবার বাড়ি থেকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।
 

রক্তাক্ত প্রান্তর (১৯৬২); চিঠি (১৯৬৬);  কবর (রচনাকাল: ১৯৫৩, প্রকাশকাল ১৯৬৬); দণ্ডকারণ্য (১৯৬৬); পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য (১৯৬৯); মানুষ(১৯৪৭): নষ্ট ছেলে (১৯৫০) প্রভৃতি তাঁর লেখা মৌলিক নাটক। প্রঙ্গত, দণ্ডকারণ্য (১৯৬৬) দণ্ড, দণ্ডধর, দণ্ডকারণ্য নামের তিনটি নাটকের সমন্বয়। অনুদিত নাটক হলো: কেউ কিছু বলতে পারে না (১৯৬৯): জর্জ বার্নার্ড শরYou never can tell-এর বঙ্গানুবাদ; রূপার কৌটা (১৯৬৯): জন গলজ্‌ওয়র্দিরThe Silver Box-এর বঙ্গানুবাদ; মুখরা রমণী বশীকরণ (১৯৭০);  শেকসপিয়ারেরTaming of the Shrew-এর বঙ্গানুবাদ। রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের জন্য তিনি ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। কবর নাটকটিকে বলা হয পূর্ববাংলার প্রথম প্রতিবাদী নাটক।

প্রবন্ধ গ্রন্থ: ড্রাইডেন ও ডি.এল. রায় (১৯৬৩); মীর মানস (১৯৬৫); রণাঙ্গন (১৯৬৬): সৈয়দ শামসুল হক ও রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একত্রে; তুলনামূলক সমালোচনা (১৯৬৯) এবং বাংলা গদ্যরীতি (১৯৭০) প্রভৃতি।

অর্জিত পুরস্কার ও সম্মাননা:  বাংলা একাডেমি পুরস্কার (নাটক), ১৯৬২; দাউদ পুরস্কার (মীর মানস গ্রন্থের জন্য) ১৯৬৫; সিতারা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬৬); স্বাধীনতা পুরস্কার (সাহিত্য) ১৯৮০ প্রভৃতি।

 

বাংলা সাহিত্যে মুনীর চৌধুরীর অবদান

লিংক: https://draminbd.com/বাংলা-সাহিত্যে-মুনীর-চৌধ/

error: Content is protected !!