বাক্য: সংজ্ঞার্থ: আদর্শ বাক্য: আদর্শ বাক্যের শর্ত: বাক্যবিভ্রাট

 
ড. মোহাম্মদ আমীন
 
 
সংযোগ: https://draminbd.com/বাক্য-সংজ্ঞার্থ-আদর্শ-বা/
 
 
বাক্য: পরিস্থিতি বা পরিবেশ কিংবা পূর্বাপর উপস্থাপনা, বাস্তবতা, যৌক্তিকতা কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ধারণা, পর্যবেক্ষণ, পরিবেশনা প্রভৃতি এক বা একাধিক বিবেচনায় সমন্বিত এক বা একাধিক পদের দ্বারা যখন বক্তার কোনো মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় এবং শ্রোতা বা শ্রোতৃবৃন্দ তা সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারে তখন তাকে সংশ্লিষ্ট ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে বাক্য বলা যায়। যেমন:
 
(১) যাও। এসো। বাহ!
(২)  রাতে আকাশে চাঁদ দেখা যায়। তবে অমাবস্যায় দেখা যায় না। মেঘ থাকলেও। 
(৩) এক পলকের একটু দেখা  আরো একটু বেশি হলে ক্ষতি কী?
(৪) চোখে আমার সাত সাগরের ঢেউ, এমন কি আর দেখেছে কবে কেউ?
(৫) তাদের ধর্মমতে, পৃথিবী গোরুর শিঙের ওপর থাকে এবং শিং বদল করলে ভূমিকম্প হয়।
 
এক নম্বর উদাহরণে বর্ণিত “বাহ্‌!” বাক্যটির অর্থ অন্য কোনো পরিস্থিতিজাত বাক্যের পরিপ্রেক্ষিতে পরিপূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। দুই নম্বর ‍উদাহরণের “মেঘ থাকলেও” পদগুচ্ছটি পূর্বের বাক্যদ্বয় বিবেচনায় একটি আদর্শ বাক্য। কিন্তু পূর্বের বাক্যদ্বয় বিবেচনা না করলে তা আদর্শ বাক্য হবে না। কারণ এর দ্বারা বক্তার মনোভাব শ্রোতার কাছে পরিপূর্ণ অর্থ নিয়ে উদ্ভাসিত হবে না।
 
অনেকে মনে করেন, এক বা একাধিক পদের দ্বারা যখন বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তখন তাকে বাক্য বলে।  এটি ঠিক নয়। বক্তা যে-কোনোভাবে তার মনোভাব নিজের অনুধাবনমতে প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সেটি যদি শ্রোতার কাছে সংশ্লিষ্ট ভাষার বিধিমতে বোধগম্য না হয় তাহলে তা বাক্য হবে না।  রবীন্দ্রনাথের একটি লেখা দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়—
 
“কোনও সাহেব যদি বলে, রাস্তায় করে যাবার সময় গাড়ি দিয়ে যেয়ো, বুঝব সে বাঙালি নয়।”— ব্যাকরণগত নিয়ম পালিত হয়নি বলে উক্তিটি যথার্থ বাক্য হয়ে উঠেনি। অথচ বাক্যটি দ্বারা বক্তা তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু শ্রোতার কাছে তা  বাংলা ব্যাকরণমতে বোধগম্যভাবে  পরিবেশিত হয়নি। তাই এটি আদর্শ বাক্য হয়নি।
 
 
সুতরাং বাক্য হতে হলে সংশ্লিষ্ট পদ বা পদরাশির সম্মিলিত প্রকাশকে বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের কাছে সম্পূর্ণ  অনুধাবনযোগ্য হতে হবে।  নতুবা কেবল অর্থপূর্ণ হলে কেনো পদসমষ্টি বাক্য হবে না। যেমন: 
 
(৬) তাকে দেখামাত্র সবাই হাত—। এটি বাক্য হয়নি। এখানে হাত পদের পর অন্য পদের আকাঙ্‌ক্ষা রয়ে গেছে।  
 
(৭)  “স্নান খেতে করে আমার শেষ  গেলাম।” এটি বাক্য হয়নি। এখানে পদগুলো অর্থপূর্ণ হলেও পারস্পরিক  বিন্যাস অর্থপূর্ণ হয়নি।    “আমার স্নান শেষ করে খেতে গেলাম।” লিখলে বাক্য হতো।
 
(৮)কী সুন্দর রাতি, আকাশে উড়িতেছে একদল হাতি।” এই বাক্যটি অর্থপূর্ণ। কিন্তু সত্য ও যুক্তিযুক্ত কিংবা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অর্থপূর্ণ হলেও এটি বাক্য হয়নি।  তবে গল্প-কবিতায় হাতি সবকিছু করতে পারে।  আবার একটি বাক্য কারো কাছে বাস্তবতা বর্জিত কিংবা মিথ্যা বা বাতিল হলেও অন্য কারও কাছে তা পরম সত্য হয়ে প্রতিভাত হতে পারে। যেমন: এক ধর্মাবলম্বীর কাছে যা অতি বাস্তব ও সত্য বিষয় তা অন্য ধর্মাবলম্বীর কাছে হাস্যকর ও বাতিল গণ্য হতে পারে।
 
 
আদর্শ বাক্য
ব্যাকরণমতে, একটি আদর্শ বাক্যের কমপক্ষে তিনটি শর্ত থাকা অনিবার্য। যেমন:  (১)আকাঙ্ক্ষা, (২) আসত্তি ও (৩) যোগ্যতা। তবে  এর বাইরেও আরও কিছু শর্ত আছে। যেহেতু ওই শর্তগুলো সাধারণভাবে বিবেচনা করা হয় না, তাই আজ আলোচনা করা হলো না। অন্য একদিন আলোচনা করা হবে।
 
(১) আকাঙ্ক্ষা: বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণভাবে অনুধাবনের জন্য  এক পদ শোনার পর পরবর্তী পদ শোনার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। অন্যদিকে, বক্তারও এক পদ বলার পর পরবর্তী পদ বলার ইচ্ছা জাগ্রত হয়।  এই ইচ্ছাকে বলা হয় আকাঙ্ক্ষা। একটা পদের পর আরেকটা পদ শোনার ও বলার যে ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা তা পরিপূর্ণ না হলে কোনো পদসমষ্টি যতই অর্থপূর্ণ হোক না কেন, তাকে আদর্শ বাক্য বলা যাবে না। এমন বাক্যকে অসম্পূর্ণ বাক্য বলা যায়। যেমন: 
 
আজ জোছনা রাতে – – -। এটি বাক্য হলো না। কারণ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায়নি। জোছনা রাতে কী হলো?
আজ জোছনা রাতে সবাই- – -। এটিও বাক্য হলো না। কারণ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায়নি। জোছনা রাতে সবাই কী করেছে বা কী হয়েছে?
“আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।” এটি আদর্শ  বাক্য। কারণ এর মাধ্যমে বাক্যটির  আপাত  আকাঙ্ক্ষা এই বাক্যের জন্য পূর্ণতা পেয়েছে।
 
(২) আসত্তি:  বক্তার বক্তব্যের পরিপূর্ণ প্রকাশ ও বক্তব্যকে শ্রোতার কাছে সম্পূর্ণ  সহজবোধ্যতায় পরিবেশনের লক্ষ্যে  অর্থসঙ্গতি বজায় রেখে বাক্যের অন্তর্গত প্রয়োজনীয় পদসমূহের সুবিন্যস্ত সজ্জা বা বিন্যাসকে আসত্তি বলে। যেমন:
“আমি আগামীকাল একটা জরুরি কাজে ঢাকা যাব।” বাক্যের পদগুলো যদি এভাবে বলা হয়: “যাব একটা আমি কাজে ঢাকা জরুরি আগামীকাল।” তাহলে এটি বাক্য হবে না। যদিও এর সবকটি পদ অর্থবহুল। সুতরাং আদর্শ বাক্য হতে হলে অবশ্যই পদসমূহের পারস্পরিক অর্থপূর্ণ বিন্যাস অনিবার্য। যেমন: “প্রিয়া হবে এসো তারার দেবে খোঁপায় রানি মোর ফুল/ তৃতীয়া চাঁদের কর্ণে তিথীর দোলাবো চৈতি  চৈতি দুল।” এটি বাক্য হয়নি। পদগুলোকে নজরুল নিম্নরূপ সাজিয়েছেন। 
 
“মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেবে খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথীর চৈতি চাদের দুল।”
 
(৩) যোগত্যা: পদরাশিকে শুধু আসত্তিযুক্ত  আকাঙ্ক্ষায়  অর্থপূর্ণভাবে সজ্জিত করলে তা আদর্শ বাক্য হবে না। বাক্যের অর্থ হতে হবে বাস্তব, যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক বিবেচনায় সুস্পষ্টভাবে গ্রহণযোগ্য। যেমন:
“কী সুন্দর রাতি
আকাশে উড়িতেছে লাখ লাখ হাতি।”
 
এটি বাক্য হবে না। কারণ হাতি আকাশে উড়তে পারে না। বটবৃক্ষের  চূড়োয় ত্রিশটি মরা গোরুকে পাতা খেতে দেখলাম। এটিও বাক্য হবে না। কারণ এটি হাস্যকর অযৌক্তিক ও অবাস্তব।  বাক্যের অর্থ সত্য না হলে তা আদর্শ বাক্য হবে না। তবে যোগ্যতা-শর্তের  প্রচুর ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন:
 
এক ধর্মের বাণী অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে সত্য নাও হতে পারে। তাই যোগ্যতা কেবল বাস্তবতা, সত্য, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে না। এটি ধর্মীয় বিশ্বাস, গল্প-কবিতার কাল্পনিক পরিবেশনা প্রভৃতির ওপরও নির্ভরশীল। কারো ধর্মীয় বিশ্বাস কারো কাছে মিথ্যা, হাস্যকর কিংবা অবাস্তব হলেও ধর্মীয় বিশ্বাস বলে তার যোগ্যতা রক্ষিত আছে ধরে নিতে হবে। তেমনি গল্প-কবিতা কিংবা উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। গল্প-কবিতায় যেসব উপমা কিংবা কাহিনি বলা হয় তা মিথ্যা, অবাস্তব ও হাস্যকর হলেও বর্ণনা গুচ্ছ না  যেমন:
 
“সে আমার একমাত্র সোনার বরন কন্যা,
হাসলে নামে চাঁদের আলো কাঁদলে নামে বন্যা।”
 
 
error: Content is protected !!