বাঙালির আসবাবপত্র

Nripen Bhaumik
 
একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগ থেকে মানুষ কাঠ, পাথর ইত্যাদির সাহায্যে আসবাব তৈরি করা শিখেছে। স্কটল্যান্ডের ৫ হাজার বছর পুরাতন সভ্যতায় নানা ধরনের পাথরের আসবাব পাওয়া গেছে। প্রাচীন মিশরীয়রা যে নানা রকম আসবাবপত্র ব্যবহার করত তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
 
বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের আসবাবপত্র:
টেরাকোটা শিল্প, দেবদেবীর প্রতিকৃতি, মন্দিরভিত্তিক চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, কাঠ ও হাতির দাঁতের কাজের নমুনা থেকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের আসবাবপত্র সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
 
সেকালে প্রচলিত আসবাবপত্রের মধ্যে ছিল কাঠের তক্তপোশ, বেত অথবা বাঁশ দিয়ে তৈরি মোড়া, মোটা সুতি কাপড়ের তৈরি ডোরাকাটা শতরঞ্চি, সুতি কাপড়ে তৈরি লম্বা ফরাস, বসার জলচৌকি, হাতে বোনা পাটি, বিভিন্ন ধরনের মোটা মাদুর, কাঠের তৈরি
নৃপেণ ভৌমিক
বসার পিঁড়ি, পাট দিয়ে তৈরি ছালা, কুশা নামক ঘাসের তৈরি কুশাসন ইত্যাদি। বসা ও শোয়ার কাজে ব্যবহৃত এই সব আসবাবপত্রের সঙ্গে ছোটোখাটো আরও অনেক আনুষঙ্গিক আসবাবপত্র ছিল, যেগুলি এখন আর তেমন প্রচলিত নয়।
 
রান্না এবং খাবার কাজে ব্যবহৃত তৈজসপত্রের মধ্যে ছিল চীনামাটির বাসন, পিতল অথবা অন্য ধাতব থালা, পিতল অথবা মাটির তৈরি বাটি, পিতল বা মাটির তৈরি জলের ঘট, বদনা ও কলসি, মাটি ও পিতলের পাতিল, লোহার কড়াই ইত্যাদি। তাছাড়া, রন্ধন কাজে ব্যবহৃত আরও কিছু তৈজসপত্র ছিল যেমন, পোড়া মাটির মালসা, মসলা গুঁড়া করার জন্য পাথরের শিল-পাটা (শিল-নোড়া) ও হামানদিস্তা।
 
কাটা বা খনন কার্যে ব্যবহৃত গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও যন্ত্রের মধ্যে ছিল দা, মাছ ও সবজি কোটার বঁটি, সুপারি কাটার সরতা বা জাঁতি, কাঁচি, এবং কোদাল।
জিনিসপত্র রাখার তৈজসের মধ্যে রয়েছে বড়ো কাঠের সিন্দুক, বেতের তৈরি পেটরা, ধান-চাল ইত্যাদি রাখার জন্য বাঁশের মাচা, বাঁশের সরু পাত দিয়ে তৈরি ডোল, মাটির মটকি, বেতের ডালি, আগুন জ্বালানোর জন্য কুলসা, আইলা, ধান-চাল-ডাল ইত্যাদি রাখা বা বয়ে নিয়ে যাওয়ার পাটের ছালা, বাঁশের তৈরি সাজি ইত্যাদি।
 
সৃজনশীল নকশা সম্বলিত বেতের আসবাবপত্র হস্ত শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলার অমূল্য ও গৌরবময় ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বাঙলার বেত শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
 
আদি কাল থেকেই সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আসবাবপত্রের ক্রমবিবর্তন ঘটেছে। আঠারো শতকের শেষ অবধি বাংলার আসবাবপত্রের নকশা ও কারুকার্যের উৎস ছিল দুটি: প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতি এবং মধ্যযুগের মুসলিম সংস্কৃতি। এ ছাড়া কাঠ ও হাতির দাঁতের উপর কাজ করার প্রাচীন প্রাচ্য কৌশলও উৎস হিসেবে কাজ করেছে। এর পর একে একে এসেছে প্লাস্টিক ও স্টিলের আসবাবপত্র।
 
প্রাচীন কালে বাঙালি খাওয়াদাওয়া করত মাটিতে বসে, উদ্ভিজ্জ আসন পেতে। ঘুমাতো মেঝেতে খড় বা শুকনো লম্বা ঘাস পেতে, শীতকালে কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে। রান্না করত পিঁড়িতে বসে। পূজা-আর্চা করত কুশাসনে বসে।
 
আসবাব শব্দটি আরবি এবং অন্যান্য অনেক আসবাব-পত্রের নাম ফারসি এবং ইংরেজি ভাষা থেকে এসেছে। তাতে মনে হয় যে, মুসলমান আমল এবং ইংরেজ আমল থেকে বাঙালিরা ফার্নিচার ব্যবহার করতে শিখেছে।
 
আসবাব: ‘আসবাব’ এসেছে আরবি শব্দ ‘আস্‌বাব্‌’ থেকে। এর সমার্থক শব্দ তৈজসপত্র। আসবাবপত্র হলো গৃহস্থালির সরঞ্জাম বা জিনিসপত্র। গৃহে ব্যবহৃত অস্থাবর সামগ্রী যেমন চেয়ার, টেবিল, খাট, তক্তপোশ, আলনা ইত্যাদি। গৃহসজ্জার অন্যান্য যাবতীয় জিনিস, যেমন বিছানা, পর্দা, লেপ, তোশক, বালিশ, কম্বল, আয়না, বাতি ইত্যাদিও আসবাবপত্রের অন্তর্ভুক্ত।
 
মাচা, মাচান: এর অর্থ বাঁশ ইত্যাদির তৈরি উঁচু বেদি বা মঞ্চ; শিকারের জন্য তৈরি ভারা। এসেছে সংস্কৃত. ‘মঞ্চ’ থেকে। ধান-চাল ইত্যাদি রাখার জন্য প্রাচীন বাংলায় বাঁশের মাচা ব্যবহৃত হতো। বাঁশের মাচানের উপর তৈরি বাড়িকে বলা হয় ‘মাচান বাড়ি’।
ঢেঁকি: সাঁওতালি শব্দ। ধান ভানা বা শস্য কোটার জন্য ব্যবহৃত কাষ্ঠনির্মিত যন্ত্র। প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে এবং বঙ্গদেশে ঢেঁকি ব্যবহার হয়ে আসছে।
 
এক খণ্ড পাথরের চটান বা কাঠ খণ্ডে গর্ত খুঁড়ে মুষলের সাহায্যে শস্য কোটা হয়। মুষলটির মাথায় লোহার পাত জড়ানো থাকে। ৪/৫ হাত লম্বা একটি ভারী কাঠের আগায় মুষলটি জোড়া লাগানো থাকে। ভারী কাঠের গোড়ার দিকটি একটা আড়কাঠির সাহায্যে দুটি শক্ত খুঁটির উপর রাখা থাকে। শস্য কোটার জন্য ঢেঁকির গর্তে শস্য ঢেলে দিয়ে এক জন বা দুইজন মিলে ঢেঁকির গোড়ায় ক্রমান্বয়ে চাপ দেয়। অন্যদিকে মুষলের আঘাতের ফাঁকে ফাঁকে আরেক জন গর্তের কাছে বসে শস্যগুলি নাড়তে থাকে।
 
প্রাচীন বাংলায় ঢেঁকিছাটা চালের কদর ছিল খুব। ঢেঁকিছাটা চালে প্রচুর পরিমান ভিটামিন বিদ্যমান বলে এই চালের চাহিদা আজও কমেনি। অনেকেই খুঁজে খুঁজে ঢেঁকি ছাটা চাউল সংগ্রহ করেন। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান থেকে চিড়েও তৈরি করা হয়।
 
সেকালে নবান্নের সময় পিঠার জন্য ঢেঁকিতে চালের গুঁড়া করা হতো। বাংলার গ্রামীণ সমাজে এই নিয়ে গানও রয়েছে। ‘ও ধান ভানিরে ঢেকিতে পাড় দিয়া / আমি নাচি, তুমি নাচ হেলিয়া দুলিয়া / ও ধান ভানিরে…… ধান বেচিয়া কিনমু শাড়ি / পিন্দিয়া যাইমু বাপর বাড়ি / স্বামী যাইয়া লইয়া আইব গরুর গাড়ি দিয়া / ও ধান ভানিরে…।’ চিরায়ত বাংলার এই গান বাঙালির ঢেঁকির আবহ ও নবান্নের কথা জানান দেয়। ঢেঁকিতে বারা ভানা নিয়ে প্রবচনও রয়েছে – ‘চিরা কুটি, বারা ভানি, হতিনে করইন কানাকানি। জামাই আইলে ধরইন বেশ, হড়ির জ্বালায় পরান শেষ।’
 
সাধারণত বাবলা কাঠ দিয়ে ঢেঁকি তৈরি করা হয়। বাবলা কাঠ খুব শক্ত ও টেকসই হয়। ‘আমড়া কাঠের ঢেঁকি’ মানে অপদার্থ – ‘তুমি একটি আমড়া কাঠের ঢেঁকি, তোমাকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না’। আমড়া কাঠ খুব নরম বলে এমন বাগধারা সৃষ্টি হয়েছে। ‘আমড়াগাছি’ করা মানে তোষামোদ করা – ‘আর আমড়াগাছি না করে যা বলতে এসেছ বলে ফেল’। ঢেঁকি নিয়ে একটি জনপ্রিয় প্রবাদও আছে। ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’। যার ভাগ্য মন্দ তার কোনো অবস্থাতেই ভালো কিছু হতে পারে না। মর্মজ্বালায় ছটফট করা বুঝাতে বলা হয় ‘বুকে ঢেঁকির পাড় পড়া’। এখন ঢেকির ব্যবহার খুব একটা চোখে পড়ে না। যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে বিলুপ্ত হতে চলেছে ঢেকির ব্যবহার।
 
মই: মই সাঁওতালি শব্দ। অনেকের মতে এটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘মদিকা, মদি’ থেকে। বাঁশ, হালকা কাঠ, লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, ফাইবার গ্লাস, শক্ত প্লাস্টিক প্রভৃতির তৈরি সিঁড়ি। মই বাঙালির একটি প্রাচীন আসবাব। মই বেয়ে উঁচু জায়গায় ওঠা হয়। চষা জমিতে মাটি গুঁড়ো করার জন্য বাঁশের তৈরি মই ব্যবহৃত হয়। ‘মই দেওয়া’ মানে মই চালিয়ে চষা জমির জমাট মাটি গুঁড়ো বা ঝুরঝুরে করা।‘পাকা ধানে মই দেওয়া’ অর্থ অকারণে পরের ক্ষতি করা। ‘গাছে তুলে মই কাড়া’ বাগধারার অর্থ হলো কাজে নামিয়ে সরে পড়া।
 
ডোল: ধান ইত্যাদি শস্য রাখার জন্য বাঁশের চাঁচারি, হোগলা ইত্যাদি দিয়ে নির্মিত আধার বা ভাণ্ড। ‘ডামা-ডোল’ হলো ব্যাপক ও তীব্র গণ্ডগোল বা বিশৃঙ্খলা (এই ডামাডোলে সবকিছুই ওলটপালট হয়ে গেছে)। ডামা-ডোল দেশি শব্দ।
পাটি: পাটি দেশি শব্দ। পাটি এক ধরনের মেঝেতে পাতার আসন, দেখতে মাদুরের মতো। পাটির রাজা হলো শীতল পাটি। গরম কালে শোওয়ার জন্য ব্যবহৃত শীতল পাটি বেশ মসৃণ, শীতল ও আরামদায়ক।
 
‘মুরতা’ নামক এক ধরনের জলজ তৃণ থেকে এটি তৈরি হয়। স্থানভেদে একে ‘মুসতাক’, ‘পাটিবেত’ ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়। মুরতা গাছ দেখতে সরু বাঁশের মতো। গোড়া থেকে কেটে মুরতার কাণ্ড জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। দা দিয়ে চেঁছে পাতা ও ডাল-পালা ফেলে দেয়া হয়, দূর করা হয় ময়লা। এরপর বটি দিয়ে মুরতার কাণ্ডটিকে চিড়ে লম্বালম্বি কমপক্ষে চারটি ফালি বের করা হয়। কাণ্ডের ভেতর ভাগে সাদা নরম অংশকে বলে ‘বুকা’। এই বুকা চেঁছে ফেলে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি পাটি তৈরি করে তাকে বলা হয় ‘পাটিকর’ বা ‘পাটিয়াল’। বেতী যত সরু ও পাতলা হবে পাটি তত নরম ও মসৃণ হবে। এজন্য হাতের নখ দিয়ে ছিলে বুননযোগ্য বেতী আলাদা করা হয়ে থাকে। বেতী তৈরি হওয়ার পর এক-একটি গুচ্ছ বিড়ার আকারে বাঁধা হয়। তারপর সেই বিড়া ডেকচিতে জলের সঙ্গে ভাতের মাড় এবং আমড়া, জারুল ও গেওলা ইত্যাদি গাছের পাতা মিশিয়ে সিদ্ধ করা হয়। এর ফলে বেতী হয় মোলায়েম, মসৃণ ও চকচকে। আজকাল এই শিল্প অবলুপ্তির পথে।
 
মাদুর: এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘মন্দুরা’ থেকে। এক ধরনের তৃণ দ্বারা নির্মিত মেঝেতে পেতে বসার বা শয়ন করার আস্তরণ। গ্রীষ্ম কালে মেঝেতে মাদুর পেতে শোয়া বেশ আরামদায়ক।
 
জলপাতি নামক গাছের নরম চিকন ফালি দিয়ে মাদুর তৈরি করা হয়। বিশেষ ধরনের তাঁত যন্ত্রে যাঁরা মাদুর বোনেন তাদের বলা হয় ‘পাটিয়াল’। বাড়ির মহিলারা সমবায় গোষ্ঠী হিসাবে এই মাদুর তৈরি করে থাকেন।
 
সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে মাদুরের ব্যবহার হয়ে চলছে। অথর্ব বেদে মাদুরের ব্যবহার উল্লেখ করা আছে। সেখানে মাদুরকে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহাভারতে শুকনো ঘাসের আসনের উপর বসতে দেওয়া হতো বলে উল্লেখ করা আছে, যা মাদুরের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে।
 
ছালা: ছালা দেশি শব্দ, এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে। পাট দিয়ে তৈরি চটের মোটা থলি বা বস্তাকে বলা হয় ‘ছালা’। মাদুর বা তোশক হিসাবেও এককালে ব্যবহার হতো। প্রাচীন কালের গরিব বাঙালি ছালায় শুয়ে ঘুমাত। পরিবেশ বান্ধব এই আসবাবটি প্লাস্টিকের দাপটে অবলুপ্তির পথে। আজকাল ছালা বিশেষ দেখা যায় না। হাজার হাজার ডিজাইনের প্রায় ২৫০টি পণ্য তৈরি করা যায় পাট দিয়ে। ছালা তাদের মধ্যে একটি। ছালার বস্তায় ধান-চাল-ডাল-সার ইত্যাদি রাখা হয় এবং বহন করা হয়।
 
আসন: আসন সংস্কৃত শব্দ। মেঝেতে বসার জন্য ছোটো গালিচা বা ওই জাতীয় বস্তু। আসন হতে পারে বাঁশের চেঁচাড়ির, বেতের, কুশ নামক শুষ্ক তৃণের অথবা পশুর লোমে তৈরি। ‘কুশাসন’ ছিল কুশ নামক ঘাসের তৈরি আসন যা প্রাচীন কালে সাধারণত বসার আসন হিসাবে ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হতো।
 
পিঁড়ি: এসেছে সংস্কৃত ‘পিণ্ডি’ শব্দ থেকে। পিঁড়ি হলো ছোটো ও নীচু কাঠের আসন যাতে বসে প্রাচীন কালে বাঙালি কুটনা কুটত, রান্না করত এবং বিয়ে করত। গ্রামাঞ্চলে এখনও পিঁড়ির ব্যবহার চালু আছে। শহরের রান্নাঘরে পিঁড়ির ব্যবহার লুপ্ত হলেও বাঙালি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে কিন্তু বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠা করে না।
 
মোড়া: মোড়া দেশি শব্দ। প্রধানত বেতের তৈরি টুলজাতীয় নিচু গোলাকার আসন। বেতের তৈরি ধানচাল রাখার পাত্রকেও ‘মোড়া’ বলা হয়। অল্প জায়গায় বসার ব্যবস্থা করতে মোড়ার জুড়ি নেই। নান্দনিক নকশার মোড়া ও টুল ঘরের সাজে যোগ করে বাড়তি মাত্রা। বেত ও বাঁশের মোড়া এককালে খুব ব্যবহৃত হতো। এখন বেতের মতো দেখতে প্লাস্টিকের মোড়া বাজারে বেশি পাওয়া যায়। বিকেলে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসার জন্য ছোটো বা মাঝারি সাইজের মোড়ার জুড়ি নেই। এই আসবাব সহজেই তুলে নিয়ে যাওয়া যায়, জলে নষ্ট হয় না, ঘুণেও ধরে না।
 
চারপাই: এর অপর নাম চারপায়া, খাটিয়া। এর চারটে পায়া থাকে এবং এই পায়ার সঙ্গে লাগানো থাকে আড়ে এবং বহরে মোট চারটি কাঠের দণ্ড। উপরের দিকটি বোনা থাকে নারকেলের ছোবড়ার দড়ি দিয়ে বা নাইলনের দড়ি দিয়ে। গরম কালে এতে শুয়ে বেশ আরাম। সাধারণত দাওয়ায়, উঠানে বা রোয়াকে পাতা থাকে। এটি স্বাস্থ্যসম্মত আসবাব নয়। শু’লে এর মাঝখানটি ডেবে যায় এবং শিরদাঁড়া বেঁকে থাকে। ‘খাটিয়া’ হলো দড়ি ও বাঁশ দিয়ে তৈরি হালকা ছোটো খাট; এসেছে সংস্কৃত ‘খট্টিকা’ থেকে। খাটিয়া এবং চারপাই প্রায় সমার্থক।
 
চৌকি: শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘চতুষ্কী’ থেকে। চারটি পায়াযুক্ত কাঠের আসবাব যার অপর নাম তক্তপোশ। কাঠ-পেরেক দিয়ে কোনও মতে নির্মিত চৌপায়াকে চৌকি বলে। চৌকি একবারেই কাঠের সাথে পেরেক মেরে তৈরি করা হয়। তাই এর অংশগুলি ইচ্ছে মতো খোলা যায় না।
 
চৌকি তিন রকমের: কাঠের তৈরি বড়ো চৌকি যাতে শুয়ে বাঙালি ঘুমায়। মাঝারি মাপের চৌকিকে বলা হতো টোলচৌকি। একে বাঙালি টেবিলের মতো ব্যবহার করে লেখাপড়া করত। আরও ছোটো চৌকির নাম ‘জলচৌকি’ যাতে বাঙালি বসত এবং এতে বসে স্নান করত। এখনও জলচৌকি কমবেশি ব্যবহৃত হয়।
 
তক্তপোশ: কথাটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘তখ্‌ৎপোশ’ থেকে। কাঠের তৈরি সাদামাটা বড়ো চৌকিকে তক্তপোশ বলা হয়। এরও চারটি কাঠের পায়া থাকে, উপরে থাকে কাঠের পাতলা পাটাতন।
 
খাট: এসেছে সংস্কৃত ‘খট্ব’ থেকে। কারুকার্য শোভিত কাঠের তৈরি চৌপায়াকে বলা হয় খাট। খাটের বিভিন্ন অংশ ভাগ ভাগ করা থাকে। এর বিভিন্ন অংশগুলি জুড়ে একে সেট করতে হয় কিন্তু চৌকির ক্ষেত্রে তা করতে হয় না।
 
পালঙ্ক: তদ্ভব শব্দ এসেছে সংস্কৃত ‘পল্যঙ্ক’ থেকে। অর্থাৎ মূল্যবান খাট। কারুকাজ করা দামি কাঠের খাট যা ধনী ব্যক্তির শয়ন-কক্ষে শোভা পায়।
 
আলমারি: শব্দটি বাংলায় এসেছে পোর্তুগিজ ‘armario’ বা ইংরেজি ‘almirah’ থেকে। জামাকাপড় ও অন্যান্য দামি জিনিসপত্র রাখার কপাটযুক্ত লম্বা বাক্স। ‘ওয়ার্ডরোব’ হলো জামাকাপড় ঝুলিয়ে রাখবার আলমারি। এসেছে ইংরেজি ‘wardrobe’ থেকে।
দেরাজ: এসেছে ফারসি শব্দ ‘দরাজ্‌’ থেকে। দেরাজ এর বাংলা অর্থ হলো – টেবিল, আলমারি প্রভৃতির মধ্যেকার টানা যায় এমন বাক্স। দেরাজকে ইংরেজিতে বলা হয় ড্রয়ার (‘drawer’)।
 
সিন্দুক: এসেছে ফারসি ও আরবি শব্দ ‘সিন্দুক’ থেকে, যার অর্থ মজবুত বড়ো বাক্স যাতে মূল্যবান জিনিসপত্র রাখা হয়। সেকালে ধনী লোকের বাড়িতে সিন্দুক থাকতো। আজকাল সোনার দোকানে দেখা যায়।
 
পেটরা: এর অর্থ – বাক্স, তোরঙ্গ; ঝাঁপি, পেটি। পেটরা তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত. ‘পেটক’ থেকে। প্রাচীন বাংলায় বেতের তৈরি পেটরা চালু ছিল। বর্তমানে অবলুপ্ত আসবাব।
 
তোরঙ্গ, তোরঙ: এর অর্থ – লোহা বা ইস্পাতের তৈরি বড়ো বাক্স, পেটরা। শব্দটি বাংলায় এসেছে ইংরেজি শব্দ ‘trunk’ থেকে।
চেয়ার: এসেছে ইংরেজি ‘chair’ থেকে। হেলান দিয়ে বসার জন্য তৈরি চার পায়াযুক্ত উঁচু আসন। এর অন্যান্য প্রতিশব্দ হলো কেদারা, কুরসি। ‘কেদারা’ হলো আরামদায়ক চেয়ার। শব্দটি এসেছে পোর্তুগিজ শব্দ ‘cadeira, কাদেইরা’ থেকে। ‘কুরসি’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘কুর্‌সী’ থেকে। বর্তমানে কাঠ, প্লাস্টিক ও লোহা বা স্টিল দিয়ে চেয়ার তৈরি হয়। ‘হুইল চেয়ার’ হলো চাকাযুক্ত চেয়ার যা সাধারণত পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই চেয়ার নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতের রোগী নিজেও হাত দিয়ে চালাতে পারে। বর্তমানে ব্যাটারি-চালিত হুইল চেয়ারও বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।
 
টেবিল: এসেছে ইংরেজি ‘table’ শব্দ থেকে। লেখা, পড়া, খাওয়া ইত্যাদি কাজের জন্য কাঠ, লোহা, বেত বা প্লাস্টিকের তৈরি চার পায়াযুক্ত আসবাব। কাজের সুবিধার জন্য এটি কোনও কিছুকে অনুভূমিক উচ্চতায় আনতে সাহায্য করে। ইংরেজদের কাছে চেয়ারের ব্যবহার শেখার আগে বাঙালি জল-চৌকিকে এই কাজে লাগাত।
 
ডেস্ক: বাংলায় এসেছে ইংরেজি শব্দ ‘desk’ থেকে। ডেস্ক হচ্ছে একটি আসবাব যাতে টেবিলের মতো সমতল উপরিভাগ থাকে এবং বিদ্যালয়, অফিস, বাসায় অধ্যয়ন বিষয়ক কাজ, পেশাদারি অথবা ঘরের কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। ডেস্কের প্রায়ই এক বা একাধিক দেরাজ, প্রকোষ্ঠ, খুপরি থাকে যার মধ্যে বিভিন্ন জিনিস যেমন অফিসের সরঞ্জাম এবং কাগজপত্র রাখা যায়। ডেস্ক সাধারণত তৈরি হয় কাঠ অথবা ধাতু দিয়ে, যদিও মাঝে মাঝে অন্যান্য জিনিস যেমন কাচের ব্যবহারও দেখা যায়।
 
টুল: এসেছে ইংরেজি ‘stool’ থেকে। একজনের বসবার উপযোগী ছোটো কিন্তু জলচৌকির চেয়ে উঁচু আসনকে বলা হয় টুল। সাধারণত দেড় ফুট ইচ্চতার হয়। টুল তৈরি হয় কাঠ, বেত, স্টিল বা প্লাস্টিক দিয়ে।
 
তাক: তাক শব্দটি বাংলায় এসেছে আরবি শব্দ ‘তা’ক’ থেকে। আলমারি, দেওয়াল প্রভৃতিতে জিনিসপত্র রাখার জন্য থাক, খাঁজ বা খুপরি। ইংরেজি ‘বুক-শেলফ’ এর বাংলা অর্থ হলো বই রাখার তাক।
 
আলনা: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘আলম্বন’ থেকে। কাপড়-চোপড় ঝুলিয়ে রাখার বা ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখার কাঠের মঞ্চ। আজকাল আলনা খুব কম দেখা যায়। প্রায় অবলুপ্তির পথে এই আসবাব।
 
 
বিছানা: তদ্ভব শব্দ। এসেছে সংস্কৃত ‘বিচ্ছাদন’ থেকে। সমার্থক সংস্কৃত শব্দ ‘শয্যা’ অর্থাৎ যার উপরে বা যেখানে শয়ন করা হয়। এতে তোশক দিয়ে তার উপর জাজিম বা চাদর পেতে শোয়া হয়। বিছানা বলতে তোশক, লেপ, জাজিম, চাদর, বালিশ সবই বোঝায়।
 
তল্প: এর অর্থ বিছানা-বালি-মশারির বড়ো গাঁটরি। ‘তল্পি’ মানে কাপড়-চোপড়ের ছোটো পোঁটলা বা পুঁটলি। ‘তল্পি’ শব্দটি গঠিত হয়েছে সংস্কৃত. ‘তল্প’ + বাংলা. ‘ই’ এর জোড় কলমে। তল্পি-তল্পা মানে বিছানাপত্রের বড়ো গাঁটরি ও কাপড়-চোপড়ের ছোটো গাঁটরি; বোঁচকা-বুঁচকি। ‘তল্পিদার’ ও ‘তল্পিবাহক’ মানে মোটবাহী ভৃত্য বা মুটে। ‘মোট’ বাংলায় এসেছে তামিল ‘মোট্টই’ শব্দ থেকে। মোট বহনকারী ‘মুটিয়া, মুটে’ এসেছে বাংলা. মোট + ইয়া/এ থেকে।
 
তোশক: ফারসি শব্দ। কার্পাস তুলোকে ভালোভাবে ধুনে কাপড়ে মুড়ে সেলাই করা হয়। যে বিশেষ বয়নের কাপড় দিয়ে তোশক বা লেপ মোড়া হয় তাকে বলে ‘বাঁধিপোতা’। যে ব্যক্তি তুলো ধুনে এবং ধুনা তুলো দিয়ে বালিশ, লেপ, তোশক তৈরি করে তার নাম ‘ধুনরি, ধুনুরি’। ‘ধুনা, ধোনা’ ক্রিয়াপদের অর্থ হলো ধনুক আকৃতির যন্ত্র দিয়ে তুলোর পিঁজা পরিষ্কার করা। ধুনা এসেছে প্রাকৃত. ‘ধুন’ শব্দ থেকে।
 
গদি: এসেছে হিন্দি ‘গদ্দি’ থেকে। তুলো, নারকেল-ছোবড়া ইত্যাদি দিয়ে তৈরি শয্যা বা আসন। গদি তোশকের চেয়ে পুরু ও মোটা।
জাজিম: এসেছে ফারসি ‘জাজম্‌’ থেকে যার অর্থ নকশাদার মোটা চাদর যা তোশক, গালিচা, কার্পেট ইত্যাদির উপর বা মেঝেয় বিছানো হয়।
 
কম্বল: কম্বল সাঁওতালি শব্দ যার অর্থ অল্প শীতে ব্যবহারযোগ্য পশুর লোম দ্বারা নির্মিত মোটা পশমি চাদর। উলের কম্বলের দাম বেশি বলে বর্তমানে পলিয়েস্টার দিয়ে সস্তার কম্বল বানানো হচ্ছে। এত সস্তা যে, পলিয়েস্টার কম্বলের চেয়ে সুতির ওয়াড়ের দাম বেশি।
 
লেপ: শব্দটি বাংলায় এসেছে আরবি ‘লিহাফ’ থেকে। তুলোভরা, কাপড়ে মোড়া, শীত নিবারক মোটা গাত্রাবরণ। বেশি শীতে গায়ে দেওয়ার আবরণ। সাধারণত কার্পাস তুলো দিয়ে বানানো হয়।
 
বালাপোশ: ফারসি শব্দ। পাতলা লেপজাতীয় নরম গাত্রবস্ত্র যা অল্প শীতে কাঁথার মতো ব্যবহার করা যায়। তুলোর পাতলা পাতকে পুরানো বা নতুন শাড়ি দিয়ে মুড়ে সেলাই করে বানানো হয়।
 
কাঁথা: কাঁথা এসেছে সংস্কৃত ‘কন্থা’ থেকে। পুরানো বা ছেঁড়া কাপড় একত্রে সুচ-সুতো দিয়ে সেলাই করে তৈরি পাতলা আস্তরণ যা কম্বলের মতো অল্প শীতে ব্যবহার যোগ্য চাদর। বাংলার মেয়েরা সুপ্রাচীন কাল থেকে কাঁথা ও নকশি কাঁথা বানিয়ে আসছে।
নকশি-কাঁথা: নকশি শব্দের ব্যুৎপত্তি বাংলা. নকশা + ই । বাংলায় নকশা শব্দটি এসেছে আরবি ‘নক্‌শ্‌’ শব্দ থেকে। সাধারণ কাঁথার উপর বিভিন্ন ধরনের রঙিন সুতা দিয়ে নকশা তুলে যে বিশেষ ধরনের কাঁথা বানানো হয়, তাই নকশি-কাঁথা। সাধারণত শাড়ি বা পুরাতন কাপড়ের পাড় থেকে রঙিন সুতা তুলে এই কাঁথা সেলাই করা হতো। বর্তমানে রঙিন সুতা বাজারে সহজলভ্য। প্রথমে সাধারণ কাঁথার মতোই নকশি-কাঁথা ‘পাড়া’ হয় বা কয়েক স্তরের কাপড় দিয়ে কাঁথার জমিন সেলাই করে তৈরি করা হয়। তারপর সেই সাধারণ কাঁথার উপর রঙিন সুতা দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তোলে নারীরা। ‘পাটি বা চাটাই ফোঁড়’ এবং ‘কাইত্যা ফোঁড়’ নামে সেলাইয়ের দু্টি ধরন নকশি-কাঁথায় ব্যবহৃত হয়।
 
সাধারণত বর্ষাকালে যখন নারীদের হাতে খুব একটা কাজ থাকে না বা ঘরের বাইরের কাজ করার সুযোগ থাকে না, তখন নারীরা একা বা দল বেঁধে নকশি-কাঁথা সেলাই করে। নকশি কাঁথা একান্তভাবেই বাঙলার নারীর প্রাচীন শিল্প।
খেশ: ‘খেশ’ শব্দটি এসেছে ফারসি থেকে যার অর্থ আপন, নিজস্ব। নিজের পুরানো শাড়ির পাকানো ফালি আড়ে দিয়ে এবং বহরে রেশম সুতো দিয়ে তাঁতে বা হাতে বোনা এক রকমের গায়ে দেওয়ার চাদর যা অল্প শীতের বস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। খেশের শাড়ি, জামাকাপড়, পর্দা, বিছানার চাদরও বোনা হয়।
 
পুরানো কাপড় খেশের অন্যতম উপাদান। পুরানো শাড়ি ছাড়া খেশ বোনা সম্ভব নয়। বীরভূমের তাঁতিদের মতে, সুতির শাড়ি ছিড়ে ছোটো ছোটো সরু দড়ির মতো ফালি করে আড়ে বোনা হয়। আর বহরে থাকে নবদ্বীপ থেকে আনা সুতো। একটি সুতির পুরানো শাড়ি থেকে প্রায় ৮০-৮৫ ফালি তৈরি করা যায়। একটি ডবল বেডের চাদর তৈরির জন্য দশটা পুরানো শাড়ির সমস্ত ফালি লাগে। সিঙ্গল বেডের জন্য লাগে ছয়টা শাড়ির সব ফালি। একজন কারিগর এক দিনে মাত্র দুটি খেশের শাড়ি বুনতে পারেন।
 
বীরভূম অঞ্চলের তাঁতিদের নিজস্ব সম্পদ এই খেশ। এই তাঁতিদের মতে, তাঁদের পূর্বপুরুষদের খেশের কাজে হাতেখড়ি হয়েছিল শান্তিনিকেতনের শিল্পসদনে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে। এই কুটির শিল্পের জন্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম জড়িয়ে আছে।
লাইসেমপি: মণিপুরি শব্দ। খেশের মতোই তবে তা বোনা হয় তুলোর ফালি আড়ে দিয়ে এবং রেশম সুতো বহরে দিয়ে। তাঁতে বা হাতে বোনা এক রকমের গায়ে দেওয়ার চাদর যা অল্প শীতের বস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
 
সুজনি: এসেছে ফারসি ‘সোজনী’ থেকে। বিছানা ঢাকার মোটা চাদর, বেড কভার।
 
বালিশ: এসেছে ফারসি শব্দ ‘বালিশ্‌’ থেকে। শয়ন কালে মাথা রাখার শিমুল তুলোর তৈরি নরম উপাধান। কার্পাস তুলার বালিশও পাওয়া যায় তবে তা সস্তা কিন্তু ঘাড়ের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। ‘কোলবালিশ’ বা ‘পাশবালিশ’ হলো দুই হাতে বুকের কাছে বা কোলের মধ্যে জড়িয়ে ধরার বালিশ।
 
মশারি: মশার দংশন এড়ানোর জন্য বিছানার উপর খাটানোর উপযোগী সূক্ষ্ম জালের আবরণ। এসেছে সংস্কৃত. ‘মশহরী’ থেকে। ভাষাবিদ সুকুমার সেনের মতে, মশা তাড়াবার জন্য ঘরের মতো জালের ঘর হলো ‘মশারি’ < মশক ঘরিক। ‘ঘরিক’ মানে খুব ছোটো ঘর।
 
তাকিয়া: মাথার বালিশ ও কোলবালিশ যখন ঠেসান দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় তখন তাকে বলে ‘তাকিয়া বা গির্দা’। ‘তাকিয়া’ ও ‘গির্দা’ সমার্থক শব্দ, দুটি শব্দই বাংলায় এসেছে ফারসি থেকে।
 
ওয়াড়, ওড়: এসেছে সংস্কৃত ‘অরবেষ্ট’ থেকে। বালিশ, তোশক, লেপ, বালাপোশ, কম্বল, খেশ, লাইসেমপি, কাঁথা ইত্যাদির কাপড়ের তৈরি ঢাকনা, খোল বা আবরণ। সাধারণত কোরা সুতির থান দিয়ে ওয়াড় বানানো হয়।
 
শতরঞ্চি: এসেছে আরবি শব্দ ‘শতরঞ্জী’ থেকে। মেঝেতে পেতে বসার উপযোগী মোটা সুতোয় তাঁতে বোনা বড়ো রঙিন ডুরে চাদর। অনেকে তক্তপোশের উপর শতরঞ্চি পেতে তার উপর তোশক পাতেন।
 
ফরাস: এসেছে আরবি ‘ফর্‌শ’ থেকে। মেঝে বা তক্তপোশে পাতবার বড়ো মোটা কাপড়। ফরাস পেতে মজলিস বসে। মজলিস এসেছে আরবি ‘ মজলিস্‌’ থেকে।
 
গালিচা: এসেছে ফারসি ‘গালীচা’ থেকে। ঘরের মেঝেতে পাতার পশুর লোমে বা সিন্থেটিক লোমে তৈরি কার্পেট। বাঙলার মতো আর্দ্র আবহাওয়ায় এর ব্যবহার অস্বাস্থ্যকর।
 
কার্পেট: এসেছে ইংরেজি শব্দ ‘carpet’ থেকে। গালিচার ইংরেজি নাম হলো কার্পেট। শীতপ্রধান দেশে সাধারণত মেঝেতে কার্পেট পাতা হয়। কার্পেট আর গালিচা প্রায় সমার্থক।
 
কুশন: এসেছে ইংরেজি শব্দ ‘cushion’ থেকে। বর্তমানে কুশনের অর্থ হলো পেতে বসার বা পিঠে দিয়ে বসার গদিযুক্ত আসন। কুশন আর কুশাসন সমার্থক নয়।
 
পরদা: পরদা এসেছে ফারসি থেকে। আবরু রক্ষার জন্য দরজা-জানালায় ব্যবহৃত মোটা বস্ত্রনির্মিত আবরণ।
 
শামিয়ানা: এসেছে ফারসি ‘শাম্‌-আনহ্‌’ থেকে। কাপড়ের তৈরি অস্থায়ী চাঁদোয়া। কোনও অনুষ্ঠানের সময় বাড়ির উঠানে বা ছাদে খাটানো হয়।
 
তাঁবু: কাপড়ের তৈরি অস্থায়ী ঘরবিশেষ, শিবির। ইংরেজি শব্দ ‘tent’ । এসেছে আরবি শব্দ ‘তন্বু, তম্বু’ থেকে। ‘কানাত’ অর্থও তাঁবু বা তাঁবুর ঘের বা পরদা। ‌এসেছে তুর্কি শব্দ ‘ক’নাত্’ থেকে। আরবিতে খিমা অর্থও তাঁবু। আর তাঁবু নির্মাতাকে বলা হয় ‘খৈয়াম’।
ত্রিপল: এসেছে ইংরেজি শব্দ ‘tarpaulin’ থেকে। প্রধানত আলকাতরা মাখানো, জলনিরোধক মোটা কাপড়। অস্থায়ী সামরিক শিবির বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাময়িক বাসস্থান নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।
 
পিচ-চট: ‘পিচ’ (pitch) এসেছে ইংরেজি থেকে, এর অর্থ আলকাতরা থেকে উৎপন্ন কালো রঙের আঠালো পদার্থ। ‘চট’ দেশি শব্দ যার মানে পাটের আঁশ থেকে বোনা মোটা কাপড় বা ছালা। পিচ মাখানো চট যা জল নিরোধক হিসাবে টিন-টালির চালে বা ছাদে লাগানো হয়।
 
 
বাতি: বাতি এক প্রকার সরঞ্জাম যা অন্ধকার দূর করতে ব্যবহার করা হয়। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বর্তি’ শব্দ থেকে। যেমন মোমের বর্তি মানে মোমবাতি। বাতির ব্যবহার অতি প্রাচীন। সাধারণত বাতি বলতে বুঝায় কুপি, লন্ঠন, লম্ফ, শেজ বাতি, টর্চ লাইট, হারিকেন, হ্যাজাক ইত্যাদি। অতীতে লাইট হাউসের বাতির মাধ্যমে সমুদ্রের জাহাজকে দিক নির্দেশনা দেওয়া হতো ।
 
ঝাড়বাতি: হলো গুচ্ছাকারে সজ্জিত অনেকগুলি বাতির সমাহার। সাধারণত জমিদার বাড়িতে বা ধনী গৃহে দেখা যেত।
 
কুপি: এসেছে সংস্কৃত ‘কূপী’ বা ‘কূপিকা’ থেকে। কেরোসিনে জ্বলত। সাধারণত রান্না ঘরে বা পায়খানা ঘরে ব্যবহৃত হতো।
 
লম্ফ: শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘lamp, ল্যাম্প’ থেকে, যা ঘরের বাইরে বের হলে ঝড়ে বা বাতাসে নিভে যেতো। তারও আগে বাঙালি রেড়ির তেল বা সর্ষের তেলের পিদিম ব্যবহার করত। ‘পিদিম’ হলো প্রদীপের কথ্য রূপ। মোমবাতিও ব্যবহৃত হতো তবে তা অল্প সময়ে জ্বলে শেষ হয়ে যেত।
 
শেজ বাতি: শেজ দেশি শব্দ যার অর্থ কাচের আবরণী যুক্ত দীপ। সেকালে শেজ বাতি জ্বলত রেড়ির তেলে।
 
শামাদান: আরবি ‘শামা’ মানে প্রদীপ, বাতি। আর ‘দান’ অর্থ দীপাধার, শেজ। ‘শামাদান’ মানে প্রদীপ বসাবার জন্য কাঠের তৈরি দণ্ড, ডেঁড়কো।
 
পলতে: কুপি, লম্ফ, লন্ঠন, শেজ, হারিকেন ও পিদিমে সলতে ব্যবহৃত হতো। পাতলা কাপড়ের ফালি পাকিয়ে তৈরি প্রদীপ ও কুপির সরু পলতে-কে বলা হয় সলতে বা পলতে। ‘পলতে’ শব্দটি এসেছে ফারসি ‘পলীতাহ্‌’ থেকে। ফারসি ‘পতিলা’ মানে পাকানো বা পেঁচানো। আরবিতে লেখা হতো ‘ফ়তিলা’, কিন্তু লোকজন উচ্চারণ করত ‘পতিলা’। যেহেতু প্রদীপের সলতে বানানো হতো তুলো বা পাতলা ন্যাকড়ার ফালি পাকিয়ে পাকিয়ে, তাই পাকানো সলতে বোঝাতে বাংলায় পতিলা কথাটা ব্যবহার হতো। এই পতিলা প্রথমে পলিতা হয়ে, পরে ‘পলতে’ হয়ে গেছে।
 
সলতে: ‘সলতে’ কথা তৈরি হয়েছে বাংলা. ‘শলি’ ও ফারসি. ‘পলিতা’-র মিশ্রণে। মা মাসিরা প্রদীপ জ্বালানোর আগে পলতের ডগাটাকে পাকিয়ে ছুঁচলো করে দিতেন। ছুঁচালো ডগাওয়ালা জিনিস বোঝাতে বাংলা কথাটা ছিল ‘শলি’। তাই ছুঁচালো পলিতা মানে শলি-পলিতা। এই শলি-পলিতা > শলিতা এখন পতিলা বংশের একমাত্র ‘সলতে’ হয়ে জ্বলছে। ‘সলতে পাকানো’ এই বাগধারাটির মধ্যেও এই শলিতা ও পতিলা দুটোই লুকিয়ে আছে। বিজলি বাতি আবিষ্কারের পরে এইসব শব্দগুলি মিউজিয়ামে স্থান পেতে চলেছে!
পিলসুজ: ফারসি ‘সুখ্‌তান’ মানে জ্বালানো, পোড়ানো। যা জ্বলছে তা সুজ়-আনদান, পতিল-সুজ় মানে জ্বলন্ত পলতে। আরবিতে লেখা হতো ‘ফ়তিল-সোজ়’। কিন্তু বাঙালি এটির ফারসি উচ্চারণ করতো পতিল-সুজ়। এই পতিল-সুজ় থেকে বাংলায় পিলসুজ। অর্থাৎ পিলসুজ-এর মানে জ্বলন্ত পলতে। অর্থাৎ প্রদীপ।
 
ডেঁড়কো: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘দণ্ড’ থেকে। প্রদীপের আলো একটু বেশি করে ছড়ানোর জন্য প্রদীপকে একটু উঁচুতে তুলে দাঁড় করাতে কাঠের ডেঁড়কো ব্যবহার করা হতো। ডেঁড়কো আসলে একটি কাঠের দণ্ড যার তলার ভিতটি চওড়া, মাঝখানের ডাণ্ডাটি সরু, তার মাথায় প্রদীপ বসানোর জন্য একটা পাতলা কাঠ। এই হচ্ছে ডেঁড়কো। সে যুগে এর ফারসি নাম ছিলো শামাদান।
হারিকেন: সেকালের ঘর-বাড়িতে রাতের বেলায় জ্বলত ‘হারিকেন’। ‘হারিকেন’ স্পেনীয় শব্দ। হুরাকান ছিলেন মায়া সভ্যতায় বায়ু, ঝড় এবং দাবানলের দেবতা। এই হুরাকান থেকে স্প্যানিস হারিকেন (hurricane) শব্দের উদ্ভব। হারিকেন-এর অর্থ ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়। কাচের ঘেরাটোপে ঘেরা থাকে বলে, প্রবল ঘূর্ণিঝড়েও এই দীপাধারের আলো সহজে নিভত না। তাই এই বাতির নাম হয়ে যায় হারিকেন।
 
কেরোসিন তেলে জ্বলে কিন্তু ঝড়-জলেও নেভে না এমন কাচের আবরণযুক্ত লন্ঠনই হলো হারিকেন। হারিকেনে জ্বলে কেরোসিন তেলে চোবানো সলতে দিয়ে যাকে চাবির সাহায্যে বাড়ানো কমানো যায়। কাচের চিমনি দিয়ে বিশেষ কৌশলে নির্মিত এই বাতিটি বিদ্যুৎবিহীন গ্রামীণ এলাকায় এখনও বেশ জনপ্রিয়।
 
লন্ঠন: ছিল এমন আর এক বাতি যা ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্টার্ন’ (lantern) থেকে এসেছে। কাচ দিয়ে ঘেরা প্রদীপ। বিজলি বাতি আসার আগে বাঙালির ঘরে ঘরে জ্বলতো। এখন আর তেমন দেখা যায় না। হারিকেন বাজারে আসার আগে বাঙালি ব্যবহার করত কেরোসিন তেলের ‘বাতি’, ‘কুপি’, ‘লন্ঠন’ বা ‘লম্ফ’।
 
টর্চলাইট: ইংরেজি শব্দ। টর্চলাইট হচ্ছে হাতে বহনযোগ্য এক প্রকার বৈদ্যুতিক বাতি। টর্চলাইটে আলোর উৎস হিসেবে মূলত ছোট বৈদ্যুতিক বাল্ব বা আলোক বিচ্ছুরণ ডায়োড (এলইডি) ব্যবহৃত হয়। আমেরিকায় একে বলা হয় ফ্ল্যাসলাইট। এতে বিদ্যুতের উৎস হিসেবে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়।
 
১৮৯৯ সালে ব্যাটারি ও ছোটো আকৃতির লাইট বাল্ব আবিষ্কারের মাধ্যমে টর্চলাইট তৈরি সম্ভব হয়। একটি সাধারণ টর্চলাইটের সচরাচর তিনটি অংশ থাকে — প্রতিফলক দ্বারা ঘেরা একটি বাল্‌ব, ব্যাটারি ও একটি সুইচ। বর্তমানে টর্চলাইটগুলি বাল্‌ব বা এলইডি ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এবং বিদ্যুতের উৎস হিসেবে একবার ব্যবহারযোগ্য বা বহুবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও কিছু কিছু টর্চলাইট সৌরশক্তি ব্যবহার করেও চালিত হয়।
 
হ্যাজাক বাতি: কিছুকাল আগেও এর ব্যবহার দেখা যেত, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে। ভালো নাম পেট্রোম্যাক্স হলেও গ্রামাঞ্চলে এটি হ্যাজাক লাইট নামে বেশি পরিচিত ছিল। জার্মানির Max Graetz ১৯১০ সালে পেট্রোম্যাক্স বা হ্যাজাক বাতি আবিষ্কার করেন। যে কোনও অনুষ্ঠানে আলো করার কাজে এই লাইট ব্যবহার করা হতো। যেটি আলো দিত সেটি ম্যানটেল নামে পরিচিত ছিল, জ্বলত কেরোসিন তেলে। বর্তমানে বিজলি বাতির কল্যাণে আর এই লাইট-এর দরকার হয় না। কিন্তু একটি সময় এই লাইট আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বড়ো বড়ো বাড়িতে থাকত। গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এগুলি ভাড়া পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে লুপ্তপ্রায়।
খড়কে, খড়িকা: এর অর্থ সরু ছোটো কাঠি; দাঁত পরিষ্কার করার ছোটো সরু কাঠি। সাধারণত বাঁশ, কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি (বাং. খড় + ইকা / কে)। ‘খড়কে ডুরে’ মানে সরু ডোরার শাড়ি।
 
হাত পাখা: তাল পাতার তৈরি যে পাখা দিয়ে বাতাস করা হয়। ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা আসায় হাত পাখার দিন ফুরিয়েছে। সংস্কৃত ‘হস্ত’ থেকে হাত + সংস্কৃত ‘পক্ষ’ থেকে পাখা।
 
দেয়াল ঘড়ি: দেয়াল ঘড়িকে সাধারণত আসবাবের মধ্যে ধরা হয়। ঘড়ি তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘ঘটী’ থেকে। প্রাচীনকালে মানুষ সময় জানার জন্য জলঘড়ি ব্যবহার করত। বড়ো একটি ঘটি থেকে ছোটো একটি ঘটিকাতে জল ফেলে সময় জানার জন্য বিশেষ কৌশলে জলঘড়ি তৈরি করা হতো। বড়ো ঘটির নিচের ছিদ্র দিয়ে ঘটির নিচে রাখা ছোটো ঘটিকাতে বিন্দু বিন্দু জল পড়ত। ঘটিকা পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘটিকা সরিয়ে আর একটি খালি ঘটিকা ঘড়ার নিচে রেখে দেওয়া হতো। এই হলো ঘটী থেকে ঘড়ির উৎপত্তির ইতিহাস।
 
 
 
আসবাব তৈরির কারিগর ও যন্ত্র:
ছুতার, ছুতোর: প্রাচীন বাংলার কাঠের আসবাবপত্র যারা তৈরি করতেন তাদের বলা হতো ‘ছুতার’ বা কাঠের মিস্ত্রি। ছুতার তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘সূত্রধর’ থেকে। সামান্য কিছু যন্ত্রপাতির সাহায্যে এঁরা নিদারুণ দক্ষতায় বানাতে পারতেন বাঙালির নিত্য-ব্যবহার্য সব আসবাবপত্র।
 
কুড়াল, কুড়ুল: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘কুঠার’ থেকে। কুড়াল বা কুঠার হলো কাঠ বা গাছ কাটার জন্য কাঠের হাতল-ওয়ালা লোহার তৈরি ধারালো ভারী অস্ত্র। গাছ বা কাঠ কাটার জন্য ব্যবহৃত কাঠের হাতলযুক্ত লোহা আবিষ্কারের আগে প্রাচীন বাঙালি পাথরের তৈরি কুড়াল ব্যবহার করত।
 
করাত: লোহার পাত দিয়ে তৈরি এক দিকে দাঁত-কাটা যন্ত্র যা কাঠ চেরাই করার জন্য বা কাঠ কাটার জন্য ব্যবহৃত হতো। ‘করাত’ তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত. ‘করপত্র’ থেকে। ‘করাতি’ মানে করাত দিয়ে কাঠ চেরা যার পেশা। ‘শাঁখের করাত’ হলো এক ধরনের করাত যার দুই দিকেই ধার আছে। এটা শাঁখ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়। ধারালো বলে উভয় দিক থেকে বিপদ বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে,তাই ‘উভয় সঙ্কট’ বুঝানোর ক্ষেত্রে – বাংলায় ‘শাঁখের করাত’ প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়।
 
হাতুড়ি: দেশি শব্দ যার অর্থ – মোটা ও ভারী লোহার মাথাওয়ালা হাতে ধরে ব্যবহার করার যন্ত্র। কোনও বস্তুর ওপর সজোরে চাপ দিতে বা ঠুকতে হাতুড়ি ব্যবহৃত হয়। কাষ্ঠখণ্ড জোড়া দেওয়ার নিমিত্ত গুঁজি বা পেরেক ঠোকার কাজে ছুতাররা হাতুড়ি ব্যবহার করেন। বাংলাদেশে প্রচলিত হাতুড়ির মাথাটি লোহার এবং হাতলটি কাঠের তৈরি হয়ে থাকে। প্রস্তর যুগে পাথরের টুকরো দিয়ে হাতুড়ি বানানো হতো। হাতুড়ির ইতিহাস অতি প্রাচীন। খ্রিষ্টজন্মের প্রায় ২৪ লক্ষ বছর আগে থেকে পাথরের তৈরি হাতুড়ি ব্যবহারের কথা জানা গেছে। হাতুড়িকে মানুষের উদ্ভাবিত আদিমতম যন্ত্র বলা যায়।
 
বাটালি: দেশি শব্দ। এর অর্থ – ছুতারের ব্যবহৃত কাঠ কাটার হাতলযুক্ত ধারালো যন্ত্র। খালিহাতে কাঠ মসৃণ ও খোদাই করার কাজে বাটালি ব্যবহার করা হয়। এটি কুঠারের মতোই কিন্তু এটি ছোটো এবং এর ধারালো প্রান্ত হাতলের সাথে খাড়াখাড়ি ভাবে থাকে। প্রস্তর যুগে বাটালি তৈরি হতো পাথর দিয়ে।
 
রেতি, রেত: সমার্থক শব্দ উখা, উখো। লোহার তৈরি যন্ত্র যেমন, করাত ধার দিতে ছুতাররা রেতি ব্যবহার করে। এবড়োখেবড়ো লোহার পাতের গাত্রকে রেতি দিয়ে ঘষে মসৃণ করতেও এর ব্যবহার আছে। ইংরেজিতে একে বলে ফাইল (file)। উখা, উখোর ব্যুৎপত্তি অনিশ্চিত।
 
ভোমর: তদ্ভব শব্দ। ব্যুৎপত্তি – সংস্কৃত. ভ্রমি + যন্ত্র। একে ‘ভ্রমি-যন্ত্র’ও বলা হয়। ছুতোর মিস্ত্রির ব্যবহৃত তুরপুন যা দিয়ে কাঠের ফালিতে ছিদ্র করা হয়। দুই টুকরো কাঠ জোড়া দিতে এই ছিদ্রের মধ্যে কাঠ বা বাঁশের গুঁজি হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
রেদা: সূত্রধর যে অস্ত্রের দ্বারা কাঠ মসৃণ ও সমতল করে তাকে বলে রেদা। ‘রেদা’ এসেছে ফারসি ‘রন্দাহ্‌’ শব্দ থেকে। একে ‘ঘিসকাপ’ও বলা হয়। ঘিসকাপ এসেছে সংস্কৃত ‘ঘর্ষণ’ শব্দ থেকে।
 
বাইস: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘বাসি’ থেকে। ছোটো কোদালের মতো ছুতোরের যন্ত্র, যা দিয়ে কাঠ চাঁছা হয় এবং কাঠের মধ্যে গর্ত করা হয়। ছোটোবেলায় একটি ধাঁধা শুনেছিলাম, ‘হাতুড়ি বাটালি বাইসটা, চোরে নিয়ে গেল তিনটা, রইল কয়টা?’
কামার: লোহার তৈরি এই সব ছুতারের যন্ত্র যারা তৈরি করে তাদের বলা হয় কামার। ‘কামার’ তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘কর্মকার’ থেকে। হাপরে অতি তাপে লোহা গরম করে নেহাই-এর উপর রেখে বড়ো হাতুড়ি দিয়ে সজোরে পিটিয়ে কামার এইসব যন্ত্র তৈরি করে।
 
হাপর: এর অর্থ – প্রধানত ধাতু গলাবার বা গরম করবার কাজে ব্যবহৃত চুল্লি বা তাতে হাওয়া দেবার জন্য চামড়ার থলি, ভস্ত্রা (স্যাকরার হাপর, কামারের হাপর)। হাপর দেশি শব্দ।
 
নিহাই, নেহাই: এর অর্থ – কামার যে লৌহ-খণ্ডের উপর তপ্ত ধাতু রেখে পিটিয়ে পাত প্রস্তুত করে এবং বিভিন্ন অস্ত্র ও যন্ত্র তৈরি করে। নেহাই শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘নিধাপিকা’ থেকে।
 
শিরিষ-কাগজ: এই কাগজ দিয়ে ঘষে কাঠকে মসৃণ করা হয়। শিরিষ-কাগজ নাম হলেও এটি তৈরি হয় কাপড়ের উপর আঠা লাগিয়ে তার উপর বালির গুঁড়া লেপে দিয়ে। আসবাব বার্নিস করার আগে শিরিষ-কাপড় দিয়ে ঘষে কাঠকে মসৃণ করা হয়।
 
 
 
লিংক: https://draminbd.com/বাঙালির-আসবাবপত্র/
 
error: Content is protected !!