বাঙালির খাবারদাবার

নৃপেন ভৌমিক

এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/বাঙালির-খাবারদাবার/

বাঙালির খাবারদাবার

আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে ভেতো বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, ডাল ও দই। ডাল বলতে সাধারণত মাষকলাই-এর ডাল বুঝাত। দই ছিল সেকালের বাঙালির খুব প্রিয় খাদ্য। একালেরও বটে। বাঙালির সাবেক ভোজন শুরু হতো ভাতের সঙ্গে সুক্তো দিয়ে, তারপর একে একে ডাল, ভাজা, চচ্চড়ি কিংবা ডালনার পরে পাতে পড়ত মাছ-মাংস। অম্বল বা চাটনিতেও শেষ হতো না সেই ভোজন। সবার শেষে আসত পিঠে-পায়েস-দই-মিষ্টি। তারও পরে লাগত মুখশুদ্ধি। মৌরি ভাজা, জোয়ান অথবা পান-চুন-খয়ের-জর্দা। 
ভোজন শেষ, আধুনিক ধূমপায়ী বাঙালির লাগে একটি বিড়ি, সিগারেট বা চুরুট।
 
খানা: উর্দু শব্দ, যার অর্থ আহার, খাদ্য, ভোজ। উর্দু ও ফারসির জোড়-কলমে তৈরি ‘খানহ্‌দানহ্‌’ শব্দ থেকে এসেছে ‘খানাদানা’, যার অর্থ খাওয়া-দাওয়া।
 
জলখাবার: জলখাবার হলো অপ্রধান খাবার। দুপুর বা রাতের প্রধান খাওয়ার বাইরে সকাল বা বিকালের অপেক্ষাকৃত অল্প আহারকে জলখাবার বলে। বাংলার অনেক জায়গায় সকালের খাবারকে জলখাবার বলে। বাঙালি মুসলমান বলে নাস্তা। নাস্তা ফারসি শব্দ। বিকালে যে টিফিন খাওয়া হয় তাও জলখাবার। সারা দিন মাঠে কাজ করছেন এমন কৃষকের জন্য মাঠে জলখাবার পাঠানোর রীতি ছিল। সে হতে পারে ডাল-ভাত বা মুড়ি-গুড় বা মুড়ি-বাতাসা।
 
জলযোগ: কোনও নির্দিষ্ট আহার নয়। বাঙালির আপ্যায়নের একটি ভঙ্গিও বলা যায়। এটি একান্তভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ। জলযোগ বলতে দুটি বাতাসা ও এক ঘটি জল হতে পারে, আবার এক রেকাবি মিষ্টি ও এক গ্লাস জলও হতে পারে। জলযোগে আপ্যায়ন করে জলখাবারও খাওয়াতে পারেন কেউ।
 
ফলার: ফলাহার। ফল ও আহার বা ফল মিশ্রিত আহার থেকে ফলাহার, তার থেকে ফলার। মধ্যযুগ থেকেই বাংলায় ফলার প্রচলিত ছিল। দুই রকমের ফলার আছে: পাকা ফলার এবং কাঁচা ফলার। লুচি মিষ্টি ইত্যাদির সঙ্গে ফলমূল আহার হলো পাকা ফলার। দই, চিড়ে আর ফলমূল হলো কাঁচা ফলার। ফলার পরিবেশন করা হতো মাটির সরায় বা মালসায়।
 
প্রাচীন বঙ্গের খাদ্যাভ্যাস
গ্রিক ও রোমান পর্যটক-দের বিবরণ থেকে জানা যায়, প্রাচীন বঙ্গের গঙ্গারিডি অঞ্চলে ধান, গম, যব, আখ চাষের পাশাপাশি সরিষা, কলাই এবং নারকেল চাষ হতো। তাছাড়া প্লিনি ও পেরিপ্লাস-এর লেখায় নানা ধরনের মসলার কথা বলা আছে।
 
বাঙালির খাদ্যাভাসের একটি আদি চিত্র মেলে চর্যাপদ-এ। চর্যাপদ যে সময়ে লেখা সেই সময়ের বাংলায় তখন ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব। চর্যাপদ-এ যাদের কথা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে তারা হলো হত-দরিদ্র মানুষের দুর্দশা। ভাতের পাশাপাশি সেই সময় দুধ, মাছ এবং মাংসেরও চল ছিল। ফল হিসেবে তেঁতুলের উল্লেখও চর্যাপদে পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্র তার বিখ্যাত অন্নদামঙ্গল কাব্যে ব্রাহ্মণ ভোজন-এর যে বিররণ দিয়েছেন তাতে নিরামিষ-আমিষ, অম্ল-মধুর, তিক্ত-কষা কোনও কিছুই বাদ নেই।
 
বিজয়গুপ্ত-এর ‘পদ্মপুরাণ’ বা ‘মনসামঙ্গল’-এ লখিন্দরের জন্মের আগে সনকার পঞ্চামৃতের ভোজের বিবরণ থেকেও সেকালের বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের একটি চিত্র পাওয়া যায়
‘চেঙ্গ মৎস্য দিয়া রান্ধে মিঠা আমের বৌল
কলার মূল দিয়া রান্ধে পিপলিয়া শৌল
কৈ মৎস্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল 
জিরামরিচে রান্ধে চিতলের কোল 
উপল মৎস্য আনিয়া তার কাঁটা করে দূর 
গোলমরিচ রান্ধে উপলের পুর 
আনিয়া ইলিশ মৎস্য করিল ফালাফালা 
তাহা দিয়া রান্ধে ব্যঞ্জন দক্ষিণসাগর কলা।
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ২
বাঙালির মধ্যযুগের খাদ্যাভ্যাস
নীহাররঞ্জন রায় ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ভাত সাধারণত খাওয়া হইত শাক ও অন্যান্য ব্যঞ্জন সহযোগে। দরিদ্র এবং গ্রাম্য লোকেদের প্রধান উপাদানই ছিল বোধ হয় শাক ও অন্যান্য সবজি তরকারি। ডাল খাওয়ার কোনও উল্লেখই কিন্তু কোথাও দেখিতেছি না। উৎপন্ন দ্রব্যাদির সুদীর্ঘ তালিকায়ও ডাল বা কলাইয়ের উল্লেখ কোথাও যেন নাই’।
 
শ্রীচৈতন্যদেব-এর খাদ্যাভ্যাস থেকে মধ্যযুগের বাঙালির নিরামিষ খাদ্যাভাসের একটি খণ্ড চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর খাদ্য তালিকায় থাকতো নিম-বেগুন, পটল ভাজা, বড়ি ভাজা, মুগের ডাল, দুধ, লাউ প্রভৃতি। সন্দেশ বা রসগোল্লার চল সেই সময় ছিল না। তবে মিষ্টির স্বাদ পূরণ হত মুগের বড়া, মাষকলাই-এর বড়া, ঘি-এর পায়েস, ক্ষীরপুলি, নারকেল পুলির উপাদেয় উপস্থিতিতে। বৈষ্ণবরা তখন থেকেই চৈতন্য আশ্রিত নিরামিষ খাদ্য ধারাকে অনুসরণ করে এসেছে। আজও তা চলছে। তাঁরা মুসুর ডাল ও পুঁই শাককে আমিষের দলে রাখতেন। এখনও কাটোয়া-র শ্রীপাট গৌরাঙ্গ বাড়ি ও মাধাইতলা-তে কৃষ্ণের ভোগে পুঁই ও মুসুর ডালকে অশুচি মানা হয়। মধ্যযুগের নিরামিষাশী বৈষ্ণবদের শেষ পাতে থাকত অম্বল এবং ‘তেঁতুলের ঝোল’ বা জলপাই-এর টক এবং মুখশুদ্ধিতে থাকত হরীতকী-তাম্বুল-কর্পূর।
 
মধ্যযুগে বাঙালির আমিষ খাদ্যাভ্যাসে ইন্দো-পারসিক রুচির সমন্বয় ঘটেছিল। সেকালের গোঁড়া হিন্দু রান্নায় যবন-এর মতো পিঁয়াজ-রসুন দিত না। মুরগির মাংসও ছিল তাদের কাছে অচ্ছুৎ। মধ্যযুগে হিন্দুর স্বতন্ত্র আমিষের তালিকায় সর্বপ্রধান ছিল মাছ। সেকালের খাদ্য তালিকায় মাছ যতই প্রাধান্য পাক না কেন, বাঙালির মুখ থেকে কিন্তু মাংসের আদিম স্বাদ মোটেই চলে যায়নি। হাঁস, ছাগল, হরিণ, পায়রা, খরগোশ, গোসাপ , কচ্ছপ এমনকি শজারু পর্যন্ত সেকালের বাঙালি খেত। কিন্তু পিঁয়াজ-রসুন ছিল অচ্ছুৎ। কালকেতুর উপাখ্যান-এ গোসাপ-এর মাংসের কথা জানা যায়। দুর্গা পূজায় বলির মাংস রান্নায় আজও পিঁয়াজ-রসুন-এর ব্যবহার চলে না। সেই ক্ষেত্রে বলির মাংস রাঁধার জন্য ঘি, লংকা, নারকেল, গরম মসলা প্রভৃতি ব্যবহার হয়। তবে বহিরাগত যবনদের হাতে মাংসের পদে ঢেলে পড়ত পিঁয়াজ-রসুন। তাদের খাবার ছিল বরাবরই ঝাঁঝাল, মসলাদার – পূর্ববঙ্গের ঢাকাই খাবারে যেমনটি দেখা যায়। সে সময় তাদের কাছ থেকে আজকের বাঙালি নানা মাংসের পদ পেয়েছে। যেমন – মোরগ মসাল্লাম, কোরমা, কালিয়া, কাবাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরিফউদ্দিন আহমেদ দেখিয়েছেন, মধ্যযুগে প্রাদেশিক রাজধানী রূপে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পর বাংলার পূর্ব অঞ্চলের নিজস্ব রন্ধন প্রণালীর সঙ্গে পারস্যের খাদ্য রীতির সংমিশ্রণেই ঢাকাই খাবারের উৎপত্তি হয়েছিল।
 
হিন্দু বাঙালির সঙ্গে মুসলমান বাঙালির রান্নার বেশ কিছু তফাত আছে। হিন্দু বাঙালির নিরামিষ রান্নার বৈচিত্র্য মুসলমান সমাজে নেই। বাঙালি মুসলমান মূলত আমিষভোজী। মুসলমানি শাক-সবজির তরকারিতে সামান্য হলেও আমিষের মিশেল থাকতে হবে। এই ধরনের রান্নার নাম ‘সালন, সালুন, সালোন, ছালুন’। পিঁয়াজ, রসুন, আদা, গরম-মসলা ওঁরা বেশি ব্যবহার করে। পরোটা ও সুজির হালুয়ার চল বেশি। ওঁরা রুটি বানায় আতপ চালের গুঁড়া দিয়ে। ‘সেমাই’ খুব চলে। মুসলমান বাড়িতে যে কোনও অনুষ্ঠানে ‘সেমাই’ রান্না প্রায় অপরিহার্য।
 
মুসলমান বাঙালির ভাত রান্না করার কৌশলও আলাদা। ‘পোলাও’ হলো ঘি-মসলা এবং মাছ-মাংস সহযোগে রাঁধা সুগন্ধ যুক্ত ভাত। এসেছে ফারসি ‘পলাও’ থেকে। সংস্কৃত ‘পলান্ন’ থেকেও শব্দটি এসে থাকতে পারে। সংস্কৃতে ‘পল’ শব্দের অর্থ মাংস। পল বা মাংস মিশ্রিত ভাতই হলো পলান্ন যা থেকে আসছে পোলাও। ‘বিরিয়ানি’ মানে মাংস সহযোগে তৈরি এক প্রকার পোলাও। এসেছে ফারসি ‘বিরআনি’ থেকে। এটি মুসলমান আমলে বাংলায় প্রবেশ করেছে। ফারসি ‘বেরয়াঁ’ শব্দের অর্থ ভাজা বা পোড়ানো। তা থেকেই সম্ভবত বিরিয়ানি শব্দটি এসেছে।
 
মাংস খাওয়া নিয়েও কিছু ফারাক আছে। হিন্দুর গোরুর মাংস খাওয়া নিষেধ, মুসলমানের শুয়োর-এর মাংস খাওয়া বারণ। হিন্দু বাঙালি খায় এক কোপে গলা কাটা পশুর মাংস। মুসলমানের কাছে সেই মাংস হলো ‘হারাম’ অর্থাৎ, আহার যোগ্য নয়। ওঁরা খায় ‘হালাল’ করা মাংস।
 
হালাল: প্রথমে পশুর গলার মূল ধমনি দুটি কেটে দিতে হবে, রক্ত ক্ষরণ শেষ হওয়ার পরে পশুর গলা পুরোপুরি কাটা হবে। হালাল শব্দটি এসেছে আরবি ‘হলাল্‌’ থেকে।
 
 
জবাই: এসেছে আরবি ‘জবহ্‌’ শব্দ থেকে। ‘হালাল’ আর ‘জবাই’ প্রায় সমার্থক। কিন্তু জবাই করা মাংস ধর্মীয় মুসলমানের কাছে হারাম।
হারাম: এক কোপে গলা কেটে পশু বধ করলে সেই মাংস মুসলমান-দের কাছে হারাম অর্থাৎ নিষিদ্ধ।
 
 
কুরবানি: কুরবানি এসেছে আরবি ‘কুর্‌বানী’ শব্দ থেকে, যার মানে পশুবলি। ইদুজ্জোহা উৎসবে ‘কুরবানি’ মাংসের একটি অংশ প্রতিবেশী ও গরিবের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া নিয়ম।
 
ইফতারি: সারা দিন রোজা রেখে সূর্যাস্তে যে খাদ্য ও পানীয় খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করা হয় তাকে বলে ইফতারি। ইফতারি হিসেবে শরবত, পিঁয়াজি, বেগুনি, আলুর চপ, ছোলা সিদ্ধ, মুড়ি, খেজুর, তরমুজ, পাকা পেঁপে ইত্যাদি ফল বাঙালি মুসলমানের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়।
 
শেহরি: ‘শেহরি’ আরবি শব্দ। রমজান মাসে প্রতিদিন ভোরে রোজা বা উপবাস শুরু করার আগে যে খাবার খাওয়া হয় তাকে শেহরি বলে। শেহরি হতে পারে ভাত-ডাল-তরকারি, পানতা ভাত অথবা রুটি-গোস্ত। ইসলাম ধর্মে মদ্যপান, ধূমপান নিষিদ্ধ। খাবার নষ্ট করা নিষেধ। অতিরিক্ত খাদ্য নষ্ট না করে তা রেখে দিতে হবে পরে খাবার জন্য।
 
ঔপনিবেশিক যুগে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস:
আধুনিক যুগের গোড়ায় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির খাদ্যাভাস বাঙালির খাদ্যকে প্রভাবিত করেছিল। সকালের প্রাতরাশে চা, বিস্কুট, পাউরুটি ইত্যাদি খাদ্য বাঙালি শিখেছিল বিদেশীদের কাছ থেকে। পোর্তুগিজ-এর কাছ থেকে আলুর ব্যবহার এবং দুধ কেটে ছানা তৈরির কৌশল শিখেছিল। হুগলি জেলায় পোর্তুগিজ প্রভাবে মিষ্টি তৈরিতে প্রথম ছানার ব্যবহার শুরু হয়। তার আগে বাংলার মিষ্টান্ন তৈরিতে মূলত ক্ষীর ও খোয়া ক্ষীর ব্যবহৃত হতো।
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৩
তণ্ডুলজাতীয় খাবার
ভাত: অন্যান্য দেশে যখন শুকনো মাটিতে ধান চাষ হতো, তখন বঙ্গদেশেই প্রথম জলাজমিতে ধান চাষ শুরু হয়। আর বাংলার আদিবাসী-কৌম সমাজের উত্তরাধিকারের ফলেই কৃষি প্রধান বাংলার প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে ভাত। চতুর্দশ শতকের ‘চর্যাপদ’-এর একটি বৌদ্ধ গানে দেখা যায় যে, বাড়িতে অতিথি এসেছে। অন্যদিকে হাঁড়িতে ভাত নেই বলে কবি বিপদে পড়ে দুঃখ করছেন।
 
পঞ্চদশ শতকে কৃষ্ণদাশ কবিরাজ রচিত ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে কলাপাতায় ঘি আর গরম ভাত দেওয়ার কথা জানা যায় মহাপ্রভুর ভোজনের বর্ণনায়।
 
নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) গ্রন্থে উল্লেখ করছেন, ‘ইতিহাসের ঊষা কাল হইতেই ধান্য যে-দেশের প্রথম ও প্রধান উৎপন্ন বস্তু, সে দেশে প্রধান খাদ্যই হইবে ভাত তাহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নেই। ভাত-ভক্ষণের এই অভ্যাস ও সংস্কার অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির দান।
 
বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। ফুটন্ত জলে চাল সিদ্ধ করে তৈরি ভাতই বাঙালির মূল খাদ্য। এর অপর নাম সিদ্ধ তণ্ডুল, অন্ন। ভাপে সিদ্ধ করা বা বাষ্প দিয়ে রান্না করা চালকেও ভাত বলা হয়। ‘ভাত’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ভক্ত’ থেকে। সংস্কৃত. ভক্ত > প্রাকৃত. ভত্ত > বাংলা. ভাত। হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, ওড়িয়া, মৈথিলি ও অসমিয়াতে ‘ভাত’; সিন্ধিতে ‘ভতু’ পাঞ্জাবিতে ‘ভত্ত’। সংস্কৃত ‘ভক্ত’ শব্দের মানে ভাগ। সামন্ত তান্ত্রিক আমলে সংসারের কর্তা সকলকে খাদ্য ও রসদ ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিতেন। প্রত্যেক ব্যক্তির প্রাপ্য অংশই হলো তার ‘ভক্ত’। ভাতই ছিল এই ভাগ করে দেওয়া রসদের সার। তাই ভক্ত শব্দের একটি মানে ছিল ভাত। প্রাচীন বাংলায় ভাতকে বলা হতো ‘ওদন’ (সং. √ উন্দ্ + অন)। ‘শিশু কাঁদে ওদনের তরে’ – কবিকঙ্কন।
 
ভাত থেকে এসেছে পানতা ভাত, বসা ভাত, ভাত ঘুম, ভাত মারা, ভাতকাপড়, ভাতুড়িয়া, ভাতুড়ে, ভাতুয়া, ভাতে ভাত, ভাতে, ভেতো, শাক-ভাত, হাড়হাভাতে, হাভাতে ইত্যাদি শব্দ।
 
‘পানতা ভাত’ হলো এক রাত জলে ভিজিয়ে রাখা বাসি ভাত।
 
‘বসা ভাত’ মানে মাড় না ফেলে যে ভাত রান্না করা হয়।
 
‘ভাত ঘুম’ হলো খাওয়ার পরই ভাতের মাদকতা থাকতে থাকতে যে ঘুম আসে।
 
‘ভাত মারা’ এর অর্থ প্রচুর ভাত খাওয়া, বেকার বসে বসে অন্ন ধ্বংস করা, উপার্জনের পথ বন্ধ করে দেওয়া।
 
‘ভাতকাপড়’ অর্থ অন্নবস্ত্র, খোরাক-পোশাক। খনার বচনে পাই, ‘কলা পুতে না কেটো পাত। তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।’
 
‘ভাতুরে, ভাতুড়িয়া’ মানে যে অন্নের জন্য অপরের গলগ্রহ হয়ে থাকে।
 
‘ভাতুয়া’ হলো ভেতো-র মূল রূপ। ‘ভেতো’ কথাটি এসেছে ভাতুয়া থেকে। ‘ভেতো বাঙালি’ বলে বাঙালির বদনাম আছে। মূলত ভাতই খায় বলে বাঙালির বিশেষণ হয়েছে ‘ভেতো’।
 
‘ভাতে’ মানে ভাতের সঙ্গে সিদ্ধ করা হয়েছে এমন (আলু ভাতে), গরম ভাতের তাপে সিদ্ধ (মাছ ভাতে), ওই ভাবে সিদ্ধ করা সবজি বা মাছ।
‘ভাতে-ভাত’ মানে ভাত ও তার সঙ্গে সিদ্ধ করা সবজি।
 
‘শাক ভাত’ মানে মাংস-মাছ-তরকারি বর্জিত শাক ও ভাত। অত্যন্ত দরিদ্রের উপযোগী সামান্য খাদ্য।
 
‘হাভাত’ এর অর্থ অন্নহীন দশা, ভাগ্যহীন ব্যক্তি (বাংলা. হা = অভাব + ভাত)। ‘হাভাতে’ মানে ভাতের জন্য হায় হায় করে এমন দরিদ্র ব্যক্তি বা অত্যন্ত লোভী ব্যক্তি। ‘হাড় হাভাতে’ বাগ্‌ধারার অর্থ হতভাগ্য।
 
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৪
 
তণ্ডুলজাতীয় খাদ্য
পানতা ভাত: পানিতে ভিজান বাসি ভাতকে বলে পানতা ভাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে লিখে গেছেন, ‘বাংলার জল হইতে জেলে, মদ হইতে মোদো, পানি হইতে পানতা, নুন হইতে নোনতা…।’ সংস্কৃত. পানীয় > পানি > পানি + তা > পানিতা > পানতা । পানতা ভাত হলো ভাত সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি। রান্না করা ভাতকে পানিতে এক রাত ডুবিয়ে রাখলে তা পানতা ভাতে পরিণত হয়। উঁচু কানা যুক্ত যে থালায় পানতা ভাত খাওয়া হয় তাকে বলে ‘পানতি’। গ্রাম বাংলায় এখনও পানতি-তে পানতা ভাত খাওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। ‘পানতি’ দেশি শব্দ।
পানতা ভাত গ্রামীণ বাঙালির একটি জনপ্রিয় খাবার। গ্রামীণ মানুষ সকালের নাস্তা হিসাবে পানতা ভাত খেয়ে থাকে। সাধারণত লবণ, কাঁচা লংকা ও পিঁয়াজ মিশিয়ে পানতা ভাত খাওয়া হয়। বাঙালি কবে থেকে পানতা ভাত খাচ্ছে তা জানা যায় না, তবে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে লিখে গেছেন, ‘বাসি পান্তা ভাত ছিল সরা দুই তিন।’ ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত বিজয় গুপ্ত-এর মঙ্গলকাব্য-এ পাই, ‘আনিয়া মানের পাত বাড়ি দিল পান্তা ভাত।’
 
ভাতে জল দিয়ে রাখলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট ভাতের শ্বেতসারকে গাঁজিয়ে ইথানল ও ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে। ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হওয়ার ফলে পানতা ভাতের অম্লতা বেড়ে যায় বলে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ভাত নষ্ট করতে পারে না।
 
সম্প্রতি আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দেখেছেন যে, ১০০ গ্রাম পানতা ভাতে প্রায় ৭৪ মিলি গ্রাম লোহা থাকে যেখানে সম পরিমাণ গরম ভাতে থাকে মাত্র ৩.৪ মিলি গ্রাম লোহা । এছাড়াও ১০০ গ্রাম পানতা ভাতে পটাশিয়াম-এর পরিমাণ বেড়ে হয় ৮৩৯ মিলি গ্রাম এবং ক্যালশিয়াম-এর পরিমাণ বেড়ে হয় ৮৫০ মিলি গ্রাম যেখানে সম পরিমাণ গরম ভাতে ক্যালশিয়াম থাকে মাত্র ২১ মিলি গ্রাম। এছাড়া পানতা ভাতে সোডিয়াম-এর পরিমাণ কমে হয় ৩০৩ মিলি গ্রাম যেখানে সম পরিমাণ গরম ভাতে সোডিয়াম থাকে ৪৭৫ মিলিগ্রাম।
 
তাছাড়া পানতা ভাতে গাঁজানোর ফলে অন্ত্র নালিতে উপস্থিত প্যানক্রিয়াটিক অ্যামাইলেজ সহ আরও কিছু এনজাইম-এর কার্যকারিতা বহু গুণ বেড়ে যায়। এর ফলে পানতা ভাতে উপস্থিত অলিগোস্যাকারাইড সহ আরও কিছু জটিল শর্করা খুব সহজেই হজম হয়ে যায়।
 
এছাড়া পানতা ভাত ভিটামিন বি-৬ এবং ভিটামিন বি-১২ এর ভালো উৎস। পানতা ভাত খেলে শরীর হালকা থাকে এবং কাজে বেশি শক্তি পাওয়া যায়, কারণ এটি গাঁজানো খাবার। মানব দেহের জন্য উপকারি বহু বন্ধু ব্যাকটেরিয়াও পানতা ভাতের মধ্যে বেড়ে উঠে।
আমানি: পানতা ভাতের জলকে বলা হয় ‘আমানি’।
 
আমানি দেশি শব্দ। আমানি গাঁজিয়ে তৈরি হয় ‘কাঁজি’ নামক মদ।
 
অন্ন: বাংলায় অন্ন বলতে সাধারণত ভাত বুঝায়। অন্ন সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ভাষায় কিন্তু অন্ন শব্দের অর্থ সব রকমের আহার্য দ্রব্য, খাদ্য দ্রব্য ইত্যাদি বুঝায়। অর্থাৎ সংস্কৃতে অন্ন বলতে ভাতও বুঝায়, রুটিও বুঝায়। সংস্কৃতে অন্ন চার প্রকার – ভক্ষ্য (চর্ব্য), ভোজ্য, লেহ্য ও পেয়। সেই অর্থে ঘোল কিংবা মদিরা-ও সংস্কৃত ভাষায় অন্ন। এই অন্ন শব্দ থেকে এসেছে অন্নকূট উৎসব এবং অন্নপ্রাশন জাতীয় শব্দগুলি।
অন্নকূট: অন্ন মানে ভাত, আর কূট মানে পাহাড়। পাহাড়ের মতো উঁচু করে অন্ন সাজিয়ে বৈষ্ণবদের উৎসব। কেবল বাংলায় নয়, গোটা ভারতেই হিন্দু অন্নকূট উৎসব পালন করে থাকে।
 
অন্নপ্রাশন: শিশুর প্রথম ভাত খাওয়ার উৎসব। চালু নাম মুখে ভাত। ছেলেদের ছয় বা আট মাসে আর মেয়েদের সাত বা নয় মাসে ভাত খাওয়ানো হয়। ইসলামে শিশুর অন্নপ্রাশনের বিধান নেই। কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মধ্যে অনেক জায়গাতেই ছয় বা সাত মাস বয়সে শিশুর মুখে ক্ষীরের পায়েস দিয়ে অন্নপ্রাশন হয়ে থাকে।
 
ফেন: ফেন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ফেনা’ থেকে। চাল ফোটাবার সময় অনেক ভাতের দানাই ফেটে গিয়ে তার মধ্যের স্টার্চ বা শ্বেতসার জলে মিশে যায়। এই শ্বেতসার মিশ্রিত জলীয় অংশকে বলে ফেন। ফেন ছেঁকে ফেলে দিলে ভাতে শ্বেতসার-এর অংশ অনেক কমে যায়। ফলে অনেক ভাত খেয়েও মোটা হওয়ার সম্ভাবনা কমে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় যখন চালের আকাল দেখা দেয় তখন ভাতের ফেন ভিক্ষা করে অনেক গরিব মানুষ ক্ষুন্নিবৃত্তি করত।
 
মাড়: মাড় এসেছে সংস্কৃত ‘মণ্ড’ থেকে। ভাতকে বেশি জল দিয়ে অনেক ক্ষণ ফোটালে ভাতের বেশির ভাগ অংশ গলে গিয়ে ফেনের মধ্যে মিশে খুব ঘন শ্বেতসার-এর লেই তৈরি করে। একে বলে মাড়। কাপড় ইস্ত্রি করার আগে তাকে কড়া করবার জন্যে মাড়ে ভিজিয়ে শুকানো হয়। একে ‘মাড় দেওয়া’ বলে। মাড় ও ফেন-এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। অল্প কিছু ভাত গলে গিয়ে ফেন তৈরি হয়, আর অধিকাংশ ভাত গলে গিয়ে তৈরি হয় মাড়।
 
জাউ: শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘যবাগূ’ থেকে। চাল বা খুদ খুব নরম করে সিদ্ধ করে তৈরি ফেন-ভাতকে বলে জাউ। মধ্যবাংলায় যব-এর ছাতু দিয়ে জাউ বানানো হতো। তবে খুদ, কাউনের চাল বা যব সিদ্ধ করেই সাধারণত যব তৈরি হয়। চালের অভাবে অনেক সময় গরিব মানুষ যবের ভাত খায়। তাকেও জাউ বলে। যবের দানা সিদ্ধ করলে আঠা আঠা হয়ে এলে নামিয়ে নুন দিয়ে খাওয়া হয়। কোথাও বলে জাউ, কোথাও বলে ঘাঁটি।
কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম-এর চণ্ডীমঙ্গল-এ পাই, ‘চারি হাঁড়ি মহাবীর খায় খুদ জাউ।’ বাংলায় যবের চাষ পরে কমে গিয়েছিল, তবে জাউ কথাটি লুপ্ত হয়নি। ‘খুদের জাউ’ শব্দে তা রয়ে গেছে।
 
খিচুড়ি: মিশ্রিত ডাল, আতপ চাল, ঘি প্রভৃতির সিদ্ধ অন্ন বিশেষ। বাঙালির অতি প্রিয় পদ। এসেছে সংস্কৃত থেকে। সংস্কৃত. কৃসর, কৃসরা > প্রাকৃত. কিসর, কিসরা > বাংলা. কিছর > খিচর > খিচরি > খিচড়ি > খিচুড়ি। খিচুড়িতে আলু, ফুলকপি আর মটর শুঁটি-ও দেওয়া হয়। খিচুড়ির সঙ্গে পাঁপড়, পটল ভাজা, তেলে ভাজা, ওমলেট বা ইলিশ মাছ ভাজা বাঙালির পছন্দের।
 
জগাখিচুড়ি: এই নামে বাংলায় একটি শব্দ আছে। তখনকার দিনে পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরে সারা ভারতের নানা জায়গা থেকে ভক্তরা আসত। আসার সময় সবাই নিজের ক্ষেতের নানা ধরনের তরিতরকারি নিয়ে আসত। খিচুড়ি রান্না করার সময় সেই সব সবজি রান্নার হাঁড়িতে দিয়ে দেওয়া হতো। চাল, ডাল ও নানা ধরনের সবজি মিশিয়ে যে খিচুড়ি তৈরি হতো তা প্রথমে জগন্নাথ দেবের খিচুড়ি, পরে আস্তে আস্তে জগাখিচুড়ি হয়ে যায়। অজস্র লোকের ক্ষুধা মিটানোর জন্য বিপুল পরিমাণ খিচুড়ি রান্না করা হতো বলে বেশির ভাগ সময়ই খিচুড়ির মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো না। ফলে মানহীন যে-কোনও জিনিসের সাথে জগাখিচুড়ি শব্দটি ব্যবহৃত হতে থাকে। কাল ক্রমে এই জগাখিচুড়ি শব্দটি নেতিবাচক শব্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
 
ভুনাখিচুড়ি: হলো খিচুড়ির মোগলাই সংস্করণ। প্রচুর মসলা দিয়ে তেলে বা ঘি-এ ভাজা চাল-ডাল দিয়ে ভুনাখিচুড়ি রান্না করা হয়। ‘ভুনা’ মানে ভাজা। ভুনাখিচুড়ি অপেক্ষাকৃত শুকনো বা ঝুরঝুরে হয়। মুসলমান বাড়িতে এই খিচুড়ি সাধারণত কষা মাংস দিয়ে খাওয়া হয়।
 
লপসি: শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘লপ্‌সিকা’ থেকে। চাল, গমের গুঁড়া, ডাল, ময়দা, তরকারি একসঙ্গে সিদ্ধ করে তৈরি মণ্ডের মতো একটি নিকৃষ্ট খাবার। জেলের কয়েদিদের এক সময়ে খাওয়ানো হতো এই খিচুড়ি জাতীয় নিম্ন মানের খাদ্য।
 
লপসি শব্দটির অন্য অর্থও আছে। গম ভাঙা (ডালিয়া) আর চিনি দিয়ে তৈরি একটি মিষ্টি খাবারকে গুজরাটি-রা বলে লপসি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এ লপ্‌সিকা-র অর্থ বলেছেন – মোহনভোগ, হালুয়া।
 
পায়েস: মিষ্টি সহযোগে দুধে ফুটান সুগন্ধি ছোটো চাল। এসেছে সংস্কৃত ‘পয়স্‌’ শব্দ থেকে। একে পরমান্ন, পায়সান্ন এবং মিষ্টান্নও বলা হয়।
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৫
তণ্ডুলজাতীয় খাদ্য:
মুসলমান ও ইংরেজ আমলে ভাত রান্না করার আরও অনেক রকমের পদ্ধতি বাঙালির হেঁশেলে ঢুকেছে। যেমন:
 
পোলাও: এসেছে ফারসি ‘পলাও’ থেকে। পোলাও হলো ঘি, মসলা এবং মাছ-মাংস সহযোগে রাঁধা সুগন্ধ যুক্ত ভাত। সংস্কৃত ‘পলান্ন’ থেকেও শব্দটি এসে থাকতে পারে। সংস্কৃতে ‘পল’ শব্দের অর্থ মাংস। পল বা মাংস মিশ্রিত ভাতই হলো পলান্ন যা থেকে আসছে পোলাও। মাংস বাদ দিয়ে নিরামিষ পোলাও অনেকে রান্না করেন, কিন্তু তাকে আক্ষরিক ভাবে পোলাও বলা সঙ্গত নয়। ‘জর্দা পোলাও’ হলো জাফরান, কিশমিশ, আনারস, মোরব্বা ইত্যাদি মিশ্রিত হলুদ রঙের সুস্বাদু মিষ্টি পোলাও।
 
খুসকা: ঘি দিয়ে রান্না করা ভাত। মুসলমানি রান্না। অনেকে একে ‘খুসকা পোলাও’ বলে। অল্প ঘি এবং স্বল্প উপকরণ দিয়ে রান্না করা পোলাওকে বলে ‘খুশ্‌কা পোলাও’।
 
তাহারি, তাহেরি, তিহারি: বিরিয়ানি জাতীয় হালকা পোলাও। তিহারি ঢাকার একটি বিখ্যাত নাস্তা। মাংস মেশানো এই পোলাওজাতীয় খাবারটি সকালের নাস্তা হিসেবে খাওয়া হয়। মাংস মিশিয়ে রান্না করা হলেও এতে জাফরান বা অন্য কোনও রং ব্যবহার করা হয় না।
 
বিরিয়ানি: মানে মাংস সহযোগে তৈরি এক প্রকার পোলাও। শব্দটি এসেছে ফারসি থেকে। এটি মুসলমান আমলে বাংলায় প্রবেশ করেছে। ফারসি শব্দ ‘বিরিয়ান’ আর ‘বিরিঞ্জ’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে ‘বিরিয়ানি’ শব্দের। ‘বিরিয়ান’ শব্দের অর্থ হলো রান্নার আগে ভেজে নেওয়া আর ‘বিরিঞ্জ’ অর্থ হলো চাল। বিরিয়ানি রান্নার আগে ঘি দিয়ে ভেজে নেওয়া হয় সুগন্ধি চাল, আর সে কারণেই বিরিয়ানি-র এমন নামকরণ।
 
কেউ কেউ মনে করেন যে, তৈমুর লঙ ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে বিরিয়ানিকে ভারতবর্ষের সীমানায় নিয়ে আসেন। শোনা যায়, একটি বিশাল মাটির হাঁড়িতে চাল, মসলামাখা মাংস, ঘি সব একসাথে পুরে ঢাকনাটি ভালো মতো লাগিয়ে দেওয়া হতো। এরপর গনগনে গরম একটি গর্তে হাঁড়ি-টিকে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হতো সব কিছু সিদ্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। সিদ্ধ হয়ে গেলে হাঁড়ি বের করে নিয়ে তৈমুর-এর সৈন্যদের খাওয়ানো হতো। সেই খাবার যাকে এখন পুরো বিশ্ব চেনে বিরিয়ানি নামে।
 
মতান্তরে, ভারতবর্ষে বিরিয়ানির সূচনা নাকি সম্রাট শাহজাহান-এর স্ত্রী মমতাজ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে, একদিন মমতাজ সৈন্যদের নিবাসে যান তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে। সেখানে গিয়ে দেখেন, সৈন্যদের খুবই করুণ অবস্থা। তাদের ভগ্নস্বাস্থ্য তাকে এতই ভাবিয়ে তুলল যে তিনি তৎক্ষণাৎ বাবুর্চিকে ডেকে নির্দেশ দিলেন চাল ও মাংস দিয়ে এমন একটি খাবার তৈরি করতে যা সৈন্যদের পুষ্টি দেবে এবং স্বাস্থ্যও ফিরিয়ে আনবে। আর তারপর যে খাবারটি তৈরি করা হলো, সেটি আজকে বিরিয়ানি নামে পরিচিত।
 
তেহারি বিরিয়ানি: বিরিয়ানির একটি বিশেষ পরিমার্জিত ধরন বলা চলে। এতে গো-মাংসের পরিমাণ থাকে কম, আলু ও হাড় থাকে বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাংসের চড়া দামের কারণে খরচ কমাতে বিরিয়ানি-তে এই বৈচিত্র্য আনা হয়েছিল।
 
কাচ্চি বিরিয়ানি: কাচ্চি বিরিয়ানির কাচ্চি শব্দটি এসেছে উর্দু কাচ্চা শব্দ থেকে, যার বাংলা অর্থ কাঁচা। গোরু বা খাসির কাঁচা মাংস সিদ্ধ না করে টক দই দিয়ে মাখিয়ে তার উপর আলু আর চালের আস্তরণ দিয়ে রান্না করা হয় কাচ্চি বিরিয়ানি।
 
ফ্রায়েড রাইস: এসেছে ইংরেজি ভাষা থেকে। এদেশে ইংরেজ-এর আমদানি। সুগন্ধি ছোটো চালের ভাতকে তেল বা ঘি দিয়ে সামান্য ভেজে তার সঙ্গে ছোটো ছোটো করে কাটা সিদ্ধ মাংস বা সবজি মিশিয়ে দেওয়া হয়। চাইনিজ ফ্রায়েড রাইস-এ মেশানো হয় সোয়া সস।
 
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৬
ডালজাতীয় খাবার:
ডাল: ডাল সাঁওতালি শব্দ। মতান্তরে, ডাল শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘দল, দালি’ থেকে।
ডাল হলো খোসা ছাড়ানো বা ভাঙা মাষকলাই, মুগ, মুসুরি, ছোলা, মটর প্রভৃতির দানা শস্য এবং তা দিয়ে রান্না করা তরকারি। প্রধানত বিউলি, মুগ, মুসুর, ছোলা, মটর, অড়হর, মাষকলাই, খেসারি প্রভৃতি শুঁটি জাতীয় ফসলের খোসা ছাড়ানো শুকনো বীজের সিদ্ধ করা পাতলা ঝোলই হলো ডাল। ঘন ডালও হয়। যেমন ছোলার ডাল, কলাই-এর তরকা। প্রাচীন বাঙালির খাদ্য তালিকায় ডালের উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, ডালের চাষ এবং ডাল খাওয়ার রীতি আর্য-ভারতের দান। মধ্যযুগে অবশ্য বাঙালি নানা রকমের ডাল খেত বলে জানা যায়। ডাল থেকে তৈরি হয় তরকারি, বেসন, ছাতু, বড়ি, বড়া, দই-বড়া, ছানা-বড়া, পাঁপড়, চানাচুর, ডালমুট, ডালপুরি ইত্যাদি। ছোলা-ডালকে ‘বুট’-ও বলা হয়। জলে ভেজানো অঙ্কুরিত ছোলা অনেকে কাঁচা খায়।
 
বেসন: বেসন দেশি শব্দ। প্রাচীন বাংলায় চাল-গুঁড়া চলত কিন্তু ডাল-গুঁড়া চলত না। পরবর্তী কালে ডাল ভিজিয়ে ডাল-বাটা চলত। ডাল-গুঁড়া অর্থাৎ বেসন-এর ব্যবহার বাঙালি শিখেছিল বৃন্দাবন-মথুরা-আগ্রা-দিল্লি থেকে, যেখান থেকে মুসলমান সংস্কৃতি এসেছিল। সাধারণত বুট বা কাঁচা ছোলা-ডালের মিহি গুঁড়াকে বলে বেসন। তবে মটর ডাল, মুসুরি ডাল, মাষকলাই-ও ব্যবহার করা যায়। বেশির ভাগ নোনতা খাবার এবং মিষ্টি তৈরি হয় বেসন দিয়ে। আলুর চপ, বেগুনি, ফুলুরি, ডিমের চপ, চিকেন চপ সহ নানা পদের খাবার বানাতে বেসন লাগে। বোঁদে, জিলিপি, মিহিদানা, লাড্ডু ইত্যাদি বহু মিষ্টির মূল উপাদান হলো বেসন।
 
ভেজাল এড়াতে বাড়িতেই বেসন তৈরি করে নেওয়া যায়। একটি মিক্সার-এ দুই কাপ ছোলার ডাল ও দুই চামচ চাল নিয়ে মিক্সার-এ ভালো ভাবে মেশাতে হয়। কয়েকবার মিক্সার-এ মিক্স করলে ডাল আর চাল ভেঙে পাউডারে পরিণত হয়। গুঁড়া হয়ে গেলে বেসন-এর পাউডার চালুনি-তে চেলে নিতে হয়। চালুনি-তে থেকে যাওয়া আধা ভাঙ্গা ডালগুলি আবার মিক্সার-এ দিয়ে মিক্স করে চালুনি-তে চেলে নিতে হয়। এই বেসন অনেক দিন পর্যন্ত এয়ার টাইট পাত্রে সংরক্ষিত রাখা যায়।
 
ছাতু: ছাতু তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘শক্তু’ থেকে। সংস্কৃত. শক্তু > প্রাকৃত. ছত্তু > হিন্দি. ছত্তু > বাংলা. সাতু, ছাতু। বেসন এবং ছাতু দুটিই ছোলার ডালের তৈরি। কাচা ছোলা গুঁড়া করলে তৈরি হয় বেসন। শুকনো খোলায় ভেজে খোসা ছাড়ানো ভাজা ছোলাকে গুঁড়া করলে পাওয়া যায় ছোলার ছাতু। ভাজা ছোলা ছাড়াও যব, গম, চাল, ভুট্টা ইত্যাদির মিহি গুঁড়াকেও ছাতু বলে। ছাতু আমাদের দেশের একটি প্রাচীন খাবার। তবে এখন এটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ছোলা, মাষকলাই, চিনাবাদাম, যব, ভুট্টা, গম ইত্যাদি ফসলের দানা আনুপাতিক হারে মিশিয়ে ভেজে জাঁতায় গুঁড়া করা হয়। এর সাথে চাল ভাজাও দেওয়া হয়। গুঁড়া করা সেই সব সামগ্রীকে বলা হয় ‘ছাতু’।
 
তবে কেউ কেউ এই সব দানা একসাথে না মিশিয়ে আলাদা ভাবেও গুঁড়া করে ছাতু তৈরি করেন। সে ক্ষেত্রে উপাদানের ওপর ভিত্তি করে সেই সব ছাতুর নাম দেওয়া হয়। যেমন ছোলা থেকে তৈরি করা ছাতুকে বলে ‘ছোলার ছাতু’, যব থেকে তৈরি করা ছাতুকে বলা হয় ‘যবের ছাতু’, চাল ভাজা থেকে তৈরি করা ছাতুকে বলে ‘চালের ছাতু’। মাষকলাই, চিনাবাদাম, যব, ভুট্টা, চাল ভাজা ইত্যাদি মিশিয়ে যে ছাতু করা হয় তাকে বলে ‘বাদাম-কলাই ছাতু’। ছোলাকে পরিষ্কার করে গরম বালিতে ভেজে নিয়ে গুঁড়া করে ছাতু তৈরি করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে ঢেঁকিতে বা মেশিনেও গুঁড়া করা হয়। মিলের তুলনায় ঢেঁকিতে গুঁড়া করা ছাতু খেতে স্বাদু হয়।
 
প্রাচীন কাল থেকেই বিকেলে নাস্তার জন্য মুড়ির মতো ছাতুও ছিল বাঙালির অত্যন্ত লোভনীয় ও জনপ্রিয় খাবার। ছাতুর সাথে পরিমাণ মতো জল মিশিয়ে গুড়, কলা, দুধ, আম ইত্যাদি সহযোগে খাওয়া যায়। এছাড়াও মুড়ির সাথে গুড়-কলা দিয়ে মেখেও ছাতু খাওয়া যায়। যারা শরীর চর্চা করেন তারা সকালে উঠে ছাতুর শরবত খান। সারা বছর না খেলেও অনেকেই গরম কালে ছাতুর শরবত খায়।
 
ছাতুকে ঘিরে প্রাচীন কালে হিন্দু সমাজে একটি সংস্কৃতি ছিল। চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে বোন ছাতু মেখে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভাইকে খাওয়াত। এই অনুষ্ঠানকে বলা হতো ‘ভাই ছাতু’। এখনও যা রীতি মতো বহু বাড়িতে পালন করা হয়।
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৭
ডালজাতীয় খাবার
বড়া: তদ্ভব শব্দ, বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘বটক’ থেকে। ভেজা ডাল বেটে তার পিণ্ড তেলে ভাজলে হয় ‘ডাল বড়া’। শব্দ মূল প্রায় এক হলেও বাংলায় বড়া ও বড়ির মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। দুটিই ডাল বাটার পিণ্ড। বড়া হলো রান্না করা অর্থাৎ তেলে ভাজা মুচমুচে ডাল বাটার পিণ্ড। বড়ি হলো ডাল বাটার ছোটো ছোটো পিণ্ড যা রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে রান্নায় ব্যবহার করা হয়।
 
বড়া মানে পেষাই করা চালের অথবা ডালের অথবা চটকানো কোনও ফলের সিদ্ধ করা বা ভাজা খাদ্য। চালের বেলায় সিদ্ধ করা হয়। ডালের বা ফলের বেলায় তেলে অথবা ঘি-এ ভাজা হয়। কিভাবে ভাজা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে বড়ার প্রকার ভেদ। সাধারণত বড়া বলতে অল্প তেলে বা ঘি-এ সেঁকে নেওয়া বোঝায়।
 
তুলো বড়া: প্রচুর তেলে বা ঘি-এ চুবিয়ে ভেজে নিলে তৈরি হয় নরম বড়া। ষোড়শ শতাব্দীতে একে বলত ‘তুলো বড়া’, অর্থাৎ তুলোর মতো নরম বড়া। এখন তুলো বড়ার বিশেষ কোনও সাধারণ নাম নেই। বড়াও বলে, ফুলুরি-বেগুনি ইত্যাদিও বলে।
 
পলতা বড়া: পলতা বড়া হলো তেতো স্বাদের বড়া। মুগের ডাল ভিজিয়ে তা পলতার সঙ্গে বেঁটে সেঁকে বড়া তৈরি করা হতো। এককালে পলতা বড়া রোগীর রুচিকর পথ্য ছিল। পটোলের পাতাকে বলা হয় পলতা।
 
দই বড়া: বর্তমানে বড়া নামটি রয়ে গেছে একমাত্র ‘দই বড়া’-য়। মাষকলাই বাটার তুলো-বড়া করে দই দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে হয় ‘দই বড়া’। আর দই-এর বদলে চিনির রসে ফেললে হয় ‘রস বড়া’। মসলা দেওয়া দই-এ ভিজানো কলাই ডালের বড়া বাঙালির নিজস্ব পদ। দক্ষিণ ভারতের দই বড়া নয়।
 
বড়ি: শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বটিক’ থেকে। বটিক থেকে উৎপন্ন বড়ি শব্দের সঙ্গে আ-প্রত্যয় যোগ করে একদা অবহট্‌ঠ ভাষায় তৈরি হয়েছিল ‘বড়িআ’, তার থেকে আধুনিক শব্দ হয়েছে ‘বোড়ে’ অর্থাৎ দাবার ঘুঁটি। মাষকলাই, মুসুরি, কলাই বা মটর ডালের বড়ি হয়। কলাই ডালের বড়ির সঙ্গে ছাঁচি কুমড়ো অথবা মূলোর মতো আনাজও বেঁটে দেওয়া হয়। খুব হালকা বড়ি হলে বলে ‘ফুল বড়ি’, যা ভাজা খায়। কুমড়ো বড়ি, মূলো বড়ি ঝোল-ঝালে চলে। অম্বলে চলে ফুল বড়ি আর মুসুর ডালের বড়ি। বড়ি-পোস্ত বাঙালির উপাদেয় ব্যঞ্জন।
তরকা: ‘তরকা’ হলো ডাল দিয়ে রান্না করা আর একটি ব্যঞ্জন। শব্দের ব্যুৎপত্তি অনিশ্চিত তবে ফারসি ‘তরহ্‌’ (মানে সবজি) শব্দের সঙ্গে ধ্বনিগত মিল আছে। তরকা হতে পারে সবুজ মুগ ডালের, মুসুরি ডালের, মাষকলাই ডালের, নিরামিষ বা আমিষ। রুটি, নান রুটি কিংবা পরোটা দিয়ে খাওয়ার জন্য চমৎকার একটি পদ।
 
আগের রাতে ছোলা-ডাল আর সবুজ মুগ-ডাল ভিজিয়ে রাখতে হয়। তারপর প্রেসার কুকার-এ দুই রকম ডাল, আধা কাপ জল আর সামান্য নুন দিয়ে ১০ মিনিট সিদ্ধ করতে হয়। এবার কড়াইতে সরিষার তেল ঢেলে, সেই সঙ্গে তিন থেকে চার চামচ ঘি দিতে হয়। কুচিয়ে নেওয়া পিঁয়াজ, রসুন, আদা দিয়ে ভালো করে কষাতে হয়। এবার কুঁচানো টম্যাটো দিতে হয়। টম্যাটো গলে এলে হলুদ গুঁড়া, জিরে, ধনে আর এক চামচ কাশ্মীরি লংকা গুঁড়া দিতে হয়। মসলা ভালো করে মিশে এলে সিদ্ধ করে রাখা ডাল ঢালতে হয়। রান্না হয়ে এলে উপর থেকে কসৌরি মেথি ও এক চামচ মাখন দিয়ে নামাতে হয়।
 
ধোকা: ডাল বাটা দিয়ে তৈরি নিরামিষ ব্যঞ্জন। ধোকা-র ডালনা বাঙালির একান্ত নিজস্ব রান্নার পদ। ডালনা বানানোর আগে ধোকা তৈরির কৌশল জানতে হয়। ছোলা ডাল বা মটর ডাল সারা রাত ভিজিয়ে রেখে সকালে মিহি করে বাটতে হয়। ডাল বাটার সঙ্গে পিঁয়াজের রস, কাঁচা লংকা বাটা ও লবণ ভাল করে মিশিয়ে নিতে হয়। তার পর কড়াইতে ঘি ও তেল গরম করে ডাল বাটা ভাজতে হয় যত ক্ষণ না কড়াই থেকে ছেড়ে আসছে। এর পর ছড়ানো বড়ো থালায় ডাল ভাজা হাতের চাপে সমান করে পেতে দিয়ে ঠান্ডা হলে বরফির আকারে কেটে নিতে হয়। তৈরি হয়ে গেল ধোকা।
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৮
ডালজাতীয় খাবার
পাঁপড়: এসেছে সংস্কৃত ‘পর্পট’ থেকে। সংস্কৃত. পর্পট > প্রাকৃত. পপ্‌পড > বাংলা. পাঁপড়। পাঁপড়-এর দক্ষিণী নাম ‘পাপড়ম’। এসেছে তামিল থেকে যা সংস্কৃত শব্দ পর্পট থেকে উদ্ভূত। পাঁপড় বা পাপড়ম হচ্ছে পাতলা, কুড়মুড়ে, থালা আকৃতির খাবার যা দুই বাংলায় বেশ জনপ্রিয়। এটি সাধারণত মাষকলাই ডাল থেকে তৈরি করা হয়। মুসুর, ছোলা, চাল, আলু থেকে তৈরি আটা দিয়েও পাপড় তৈরি করা যায়। পাপড় ভাজা নাস্তা হিসেবে পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় পাঁপড়ের সাথে পিঁয়াজ কুচি, গাজর কুচি এবং চাটনি পরিবেশন করা হয়। ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলে পাঁপড় শুকিয়ে, না ভেজে, তরকারি এবং সবজির সাথে রান্না করা হয়। অঞ্চল ভেদে পাঁপড়ের রেসিপি আলাদা হয়। এমনকি একেক পরিবারের তৈরি করা পাঁপড়-এর স্বাদ একেক রকম। মূল উপাদানের সঙ্গে লবণ, বাদাম তেল যোগ করলে স্বাদে বৈচিত্র্য আসে। একই ভাবে লংকা, জিরা, হলুদ, গোলমরিচ ইত্যাদি যোগ করা হয়। অনেক সময় ‘বেকিং সোডা’-ও যোগ করা হয়। খামির-কে পাতলা রুটির মতো করে বেলে রোদে শুকানো হয়। এরপর তাওয়ার উপর, সরাসরি আগুনে অথবা মাইক্রোওভেন-এ কড়া করে ভাজা হয়। গরম তেলেও ভাজা যায়।
 
ঘুগনি: ঘুগনি বর্মি শব্দ। পূর্ব ভারতে প্রচলিত এবং জনপ্রিয় নাস্তা। ছোলা বা মটরের সঙ্গে আলু, নারিকেল, টক প্রভৃতির সংমিশ্রণে রান্না করা সুস্বাদু খাবার। এটি মচমচে মুড়ির সঙ্গে মাখিয়ে খাওয়া হয়। লুচি বা পুরির সাথেও পরিবেশন করা যায়। ঘুগনি নিরামিষ ও আমিষ দুই রকমেরই হতে পারে। আমিষ ঘুগনিতে ভেড়ার মাংস বা মুরগির মাংসের ছোটো ছোটো টুকরা যোগ করা হয়। এটি পিঁয়াজ, কাঁচা লংকা ও ধনে পাতার কুঁচি সহযোগে খেতে খুব ভালো লাগে। এটি কলকাতার একটি জনপ্রিয় এবং স্বল্প মূল্যের খাবার। মাংসের ঘুগনি ‘কলকাতা ট্রেডমার্ক’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে।
 
তেলেভাজা: এমন এক প্রকার হালকা জলখাবার জাতীয় খাবার যা সরিষার তেলে ভাজা হয়। বেগুনি, পিঁয়াজি, পকোড়া, আলুর চপ ইত্যাদির সাধারণ নাম তেলেভাজা।
 
ফুলরি, ফুলুরি: ডালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি তেলে ভাজা যেকোনও খাদ্যবস্তুকে বলা হয় ফুলুরি। ছোলার ডালের বেসন জলে গুলে নরম করার অর্থাৎ ফাঁপাবার জন্য অনেক বার ফেটিয়ে নিয়ে তেলে বা ঘি-এ ভাজা খাদ্য বস্তুকে বলে ‘ফুলুরি’। পিঁয়াজি, বেগুনি, পকোড়া – এরা সবই ফুলুরি। ফুলুরি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ফুল + বটিকা’ থেকে।
 
পিঁয়াজি: পিঁয়াজের কুচি বেসন-এ মেখে ছাঁকা তেলে ভাজাকে বলে ‘পিঁয়াজি’। বাঙালির খুব প্রিয় ফুলুরি।
 
বেগুনি: বেগুনের পাতলা ফালি বেসন-এর কাইয়ে ভিজিয়ে ছাঁকা তেলে ভাজাকে বলে ‘বেগুনি’। পিঁয়াজি’ এবং ‘বেগুনি’-ও সেই অর্থে এক ধরনের ফুলুরি।
 
পটলি: পটোল-এর চিলতে বেসন-এ মেখে ছাঁকা তেলে ভাজাকে বলে ‘পটলি’। এই ফুলুরি কলকাতার উদ্ভাবন।
 
কুমড়ি: গৃহস্থের বাড়িতে কুমড়োর চাকতি নিয়ে বেসন-এ মেখে ছাঁকা তেলে ভাজাকে বলে ‘কুমড়ি’।
 
পকোড়া: এসেছে হিন্দি ‘পকোড়া বা পকোড়ী’ থেকে। তেলে-ভাজা বড়া। পকোড়া হতে পারে মুরগির মাংসের, পনিরের, সোয়াবিনের, সবজির, আলুর, পিঁয়াজের। পকোড়া আসলে ফুলুরির প্রকার ভেদ। ফুলুরি তেলে ভাজা হয় ডালের গুঁড়া দিয়ে, পকোড়া তেলে ভাজা হয় বেসন বা কর্নফ্লাওয়ার দিয়ে।
 
চানাচুর: চানাচুর এক প্রকার ভাজা নাস্তা জাতীয় হালকা খাবার। এর অন্য নাম ডালমুট। মুলত এটি ছোলা বা অড়হর ডালের মিহি গুঁড়া (বেসন) থেকে তৈরি হয়। তবে এতে প্রায়শই চিনাবাদাম, চিড়া, ভাজা মটর শুটিঁ ইত্যাদি যোগ করা হয়। বিশেষ করে ভাজা বাদাম চানাচুর-এর অপরিহার্য উপকরণ। চানাচুর হবে শুকনা, মুচমুচে, স্বাদে ঝাল। গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে খেটে-খাওয়া মানুষের কাছে স্বল্প মূল্যের চানাচুর সাময়িক ক্ষুধা নিবৃত্তিতে খুবই কার্যকর। লংকার গুঁড়া ও লবণের কারণে এটি নিজেই ঝাল, তবু প্রায়শই পরিবেশনের আগে পেঁয়াজ কুঁচি, কাঁচা লংকা, সরিষার তেল, কখনও আদা কুঁচি বা ধনে পাতা দিয়ে মাখিয়ে একে আরও সুস্বাদু করা হয়। এছাড়া মুড়ি দিয়ে মাখিয়েও চানাচুর পরিবেশন করা হয়। চানাচুর তৈরি ও বিক্রি করে হাজার হাজার বেকার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। মিষ্টি স্বাদের চানাচুরও প্রস্তুত করা হয়, কখনও কখনও এতে কিশমিশ ও কাজু যোগ করা হয়।
 
ডালমুট: ‘ডালমুট’ মানে তেল-ঘিয়ে ভাজা এবং নানান মসলা যুক্ত ছোলা বা মটর। ডালমুট আর চানাচুর প্রায় সমার্থক।
 
ঝুড়িভাজা: বেসনের তৈরি নোনতা নাস্তা। বেসন আর মসলার গোলা বানিয়ে ঝাঁঝরির মধ্যে দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গরম তেলে ফেলা হলে যে আকার তৈরি হয় তা দেখতে প্রায় ঝুড়ির মতো। তাই নাম হয়েছে ঝুড়িভাজা। এই ঝুড়িভাজা ভেঙে চানাচুর ও ডালমুট-এ মশানো হয়।
সাড়ে বত্রিশ ভাজা: চানাচুর বা ডালমুট জাতীয় মুখরোচক পাঁচমিশেলি খাবার (বাং. সাড়ে = বেশি, খুব + বত্রিশ = বহু বা নানান অর্থে + ভাজা)।
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ৯
আটা-ময়দার খাবার
রুটি: রুটি সাঁওতালি শব্দ। মতান্তরে, শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। সংস্কৃত. রোটিকা > হিন্দি. রোটী > বাংলা. রুটি। অনেকে মনে করেন, লাতিন ‘rota’ শব্দ থেকে এসেছে রুটি। লাতিন ‘rota’ শব্দের মানে হুইল বা চাকা। চাকিতে বেলে যেহেতু তৈরি হয়, সেহেতু তার নাম রোটি, রুটি। রুটি হলো প্রধানত আটা, ময়দা, চাল-বাটা ইত্যাদির লেচি-কে চাকিতে রেখে বেলন দিয়ে বেলে তৈরি করা পাতলা চাকতি যা আগুনে সেঁকে নিয়ে খেতে হয়। সুকুমার সেনের মতে, বাংলায় রুটি জনপ্রিয়তা লাভ করে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দী থেকে। বৃন্দাবন-মথুরায় চৈতন্য ধর্মের ঢেউ লাগার পর থেকে আটা-ময়দার খাদ্য বঙ্গদেশে চালু হয়।
 
ফুলকা রুটি: ফুলে ওঠা রুটিকে বলে ফুলকা রুটি। হিন্দিতে একেই বলে ‘ফুলকা রোটি’। আটার সাথে নুন মিশিয়ে গরম জল দিয়ে ভালো করে মেখে নিয়ে মাঝারি সাইজের গোল গোল লেচি কেটে নিতে হবে। এবারে আটা ছড়িয়ে তাতে লেচিকে বড়ো গোল করে বেলে নিতে হবে। তাওয়া-তে দিয়ে দুই পিঠ উলটে-পালটে ভালো করে সেঁকে নিতে হবে। এবারে রুটিকে আগুনের ওপর রুটি সেঁকার জালির ওপর রেখে দুই দিক উলটে-পালটে সেঁকতে হবে । আগুনের ওপর ধরলেই রুটি ফুলে উঠবে।
 
চাপাতি: চাপাতি শব্দটি হিন্দি ‘চপত’ শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ চ্যাপটা। রুটি ও চাপাতির মধ্যে একটু তফাত আছে। চাপাতি হলো হাতে চাপড় মেরে তৈরি হাত-রুটি; এতে চাকি-বেলন ব্যবহার করা হয় না। দুই হাতের তালুর মাঝে রেখে থাবড়ে থাবড়ে গোলাকার রুটি তৈরি করা হয়। প্রতি থাবড়ে ময়দার তালটি একবার করে ঘোরে। মোগল সম্রাট আকবরের জীবনীকার আবুল ফজল-এর লেখা আইন-ই-আকবরিতে চাপাতি-র কথা উল্লেখ আছে।
 
রুমালি রুটি: রুমালি শব্দটি এসেছে রুমাল শব্দ থেকে। রুমাল কথাটি আবার এসেছে ফারসি ‘রুমল্‌’ শব্দ থেকে। এটি এক ধরনের রুমালের মতো পাতলা বড়ো রুটি যার উৎপত্তি ভারতে। এটি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের জনপ্রিয় একটি খাবার। রুমালি রুটি তন্দুরি খাবারের সঙ্গে খাওয়া হয়। এই রুটি খুব পাতলা এবং রুমালের মত ভাঁজ করে পরিবেশন করা হয়। মোগল সাম্রাজ্য কালে কাপড়ের মত বড়ো আকারের রুমালি রুটি পরিবেশন করা হতো। রুমালি রুটি তৈরিতে আটা ও ময়দা দুই-ই ব্যবহার করা হয় এবং উলটানো গরম কড়াই-এর উত্তল অংশে সেঁকা হয়।
 
নান রুটি: যে রুটি সেঁকা হয় তন্দুর নামক উনানের উত্তপ্ত দেয়ালে। তন্দুরে যা রান্না হয় তাই ‘তন্দুরি’। তন্দুরে তৈরি রুটিকে তন্দুরি রুটি বা নান রুটি বলা হয়। এটি সাধারণ রুটির চেয়ে একটু পুরু হয়।
 
কুলচা: মসলা দেওয়া তন্দুরি রুটি। আকার সাধারণত লম্বাটে এবং অপেক্ষাকৃত বড়ো। কুলচা উত্তর ভারতের জনপ্রিয় খাবার। বাঙালিও কুলচা খাচ্ছে আজকাল।
 
পরোটা: শব্দটি এসেছে হিন্দি ‘পরেটা’ শব্দ থেকে। পালটে পালটে বেলা হয় বলে এই নাম। পরোটা হলো অল্প ঘি, বনস্পতি ঘি বা তেলে ভাজা রুটি। লুচির মতো ময়দা মেখে তা অনেকবার পাট করে বেলে রুটির মতো করে তাওয়ায় যথেষ্ট ঘি দিয়ে সেঁকলে হয় পরোট। এটা লুচির মতো ফুলে ওঠে না। অনেক বার ভাঁজ করে বেলে নিয়ে ঘিয়ে ডুবিয়ে ভাজলে হয় ‘ঢাকাই পরোটা’। এই নাম কলকাতার দেওয়া। রুটি বেলার সময় পুর হিসাবে আলু সিদ্ধ এবং সিদ্ধ কড়াই শুঁটি দিলে তৈরি হয় যথাক্রমে ‘আলু পরোটা’ এবং ‘শুঁটি পরোটা’। ‘মোগলাই পরোটা’ একটি জনপ্রিয় বাঙালি পরোটা যার মধ্যে মাংসের কিমা, ডিম, পিঁয়াজ ও লংকা প্রভৃতির পুর দেওয়া থাকে।
 
রোল: আসল নাম কাঠি রোল, সংক্ষেপে রোল। পরোটা-য় পুর দিয়ে বা না দিয়ে গোল করে মুড়ে দিয়ে যে নাস্তা তৈরি হয় তার নাম রোল। পুরের প্রকার ভেদে রোল হতে পারে বিফ রোল, মাটন রোল, চিকেন রোল, ভেজ রোল, এগ রোল ইত্যাদি। বাঙালির খাদ্যকোষ গ্রন্থে মিলন দত্ত জানিয়েছেন, রোল-এর উদ্ভাবক কলকাতার মোগলাই খাবারের দোকান ‘নিজাম’। বিংশ শতকের পঞ্চাশের দশকের কোনও এক সময়ে। তার আগে পরোটা আর কাঠি কাবাব আলাদা বিক্রি হতো। কাবাব-কে পরোটা দিয়ে মুড়ে তৈরি হলো কাঠি রোল।
 
লাচ্চা: আটা দিয়ে তৈরি বহু পরত-এর পরোটা। মোগল বাদশা-দের প্রিয় পরোটা। আর আছে ঘি-এ ভাজা লাচ্চা সেমাই।
 
শিরমাল: শিরমাল: দুটি ফারসি শব্দ যোগ হয়ে শিরমাল শব্দটি তৈরি হয়েছে। ‘শির’ শব্দের অর্থ দুধ, আর ‘মাল’ অর্থ দলাই মলাই। অর্থাৎ দুধ দিয়ে মাখা ময়দার পরোটা।
 
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ১০
আটা-ময়দার খাবার
লুচি: লুচি এসেছে বাংলার বাইরে থেকে, তুর্কির হাত ধরে অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকে। সম্ভবত পাল আমলের শেষ দিকে লুচি রাজার ও দেবতার ভোগে ব্যবহৃত হতো। হাজার বছর আগে চক্রপাণিদত্ত ‘দ্রব্যগুণ’ গ্রন্থে ‘শঙ্কুলী’ অর্থাৎ লুচির উল্লেখ করেছেন। তখন লুচি হতো তিন রকমের, খাস্তা, সাপ্তা ও পুরি। ঘি-এর ময়ান দিয়ে ময়দা ঠেসে লেচি বেলে ঘিয়ে ভাজলে খাস্তা, ময়ান ছাড়া লেচি বেলে ঘি-এ ভাজলে সাপ্তা, আর ময়দার জায়গায় আটা থাকলে পুরি। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর মতে, ২৫০ গ্রাম ময়দা থেকে তিরিশটি গোল লুচি হবে। তার বেশি মানেই আকারে গোলমাল।
লুচি শব্দটি বাংলায় কোথা থেকে এসেছে তা রহস্যে আবৃত। কোনও প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে লুচির কাছাকাছি কোনও শব্দ পাওয়া যায় না। প্রাকৃতেও লুচি শব্দটি নেই। আবার লুচি দেশি শব্দও নয়। কিছু সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের মতে, লুচি এসেছে সংস্কৃত ‘লোচিকা’ থেকে। লোচিকা অর্থ চোখের মণি। লুচি যেহেতু চোখের মণির মতো গোল তাই এমন নাম। হিন্দিতে পিচ্ছিল বোঝাতে ‘লুচ বা লুচলুচিয়া’ শব্দের ব্যবহার আছে। ঘি-এ ভাজা লুচি হাত থেকে পিছলে যায় বলে এর নামকরণ হয়েছে লুচি। অনেকে মনে করেন, লুচি এসেছে চীনা ভাষা থেকে।
 
লুচি আসলে ময়দার ছোটো রুটি যা ডুবো ঘি বা ডুবো তেলে ভাজলে ফুলকা রুটির মতো ফুলে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘যে আকাশে লুচি-চন্দ্রের উদয় হয়, সেখানেই আমার মন-রাহু গিয়া তাহাকে গ্রাস করিতে চায়।’ লুচি এখনও বাঙালির কাছে সমান প্রিয়।
 
পুরি: আটার তৈরি মোটা লুচিকে বলা হয় ‘পুরি’। পুরি সাধারণত ঘি-এ ভাজা হয়। ভাজার পরে ‘পুরি’ বাদামি রং ধারণ করে। পুরি অ-তৎসম শব্দ, কিন্তু ব্যুৎপত্তি অনিশ্চিত।
 
কচুরি: হাজার বছর আগের চক্রপাণিদত্ত-এর ‘দ্রব্যগুণ’ গ্রন্থেও কচুরির উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে ‘পুরিকা’ নামে। কচুরি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কর্চরিকা’ থেকে। হিন্দি ‘কচৌড়ী’-ও সম্ভবত একই সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে। অনেকের মতে, উত্তর প্রদেশ থেকেই বাংলায় কচুরি এসেছিল। কারণ বাঙালি তখন রুটি খেতে জানত না। মাষকলাই বেটে তার সঙ্গে আদা-মৌরি বাটা ও হিং মিশিয়ে লুচির পেটে পুরে দিলেই জন্ম নেয় কচুরি। সোজা কথায়, ডালের পুর দেওয়া লুচি হলো কচুরি। সেই ভাবে দেখলে, ছোলার ডালের পুরিকেও কচুরি বলতে হয়। কিন্তু খাঁটি কচুরিতে কাঁচা বিউলি-র ডাল আর হিং-এর পুর ছাড়া অন্য কিছু থাকা চলবে না।
 
রাধাবল্লভি: কলাই ডালের পুর দেওয়া ডালপুরির মতো বড়ো গোলাকার ঘি-এ ভাজা নোনতা খাবার। কচুরির পুর যখন পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা হয়ে ময়দার লেচিতে ভরা হয়, তখন তার নাম হয় ‘রাধাবল্লভি’।
 
খাস্তা কচুরি: হাজার বছর আগে চক্রপাণিদত্ত ‘দ্রব্যগুণ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ঘি-এর ময়ান দিয়ে ময়দা ঠেসে লেচি বেলে ঘিয়ে ভাজলে হয় খাস্তা। অর্থাৎ ‘খাস্তা’ সংস্কৃত শব্দ। মতান্তরে, খাস্তা শব্দটি এসেছে ফারসি ‘খস্তা’ থেকে। ‘খাস্তা কচুরি’ হলো প্রচুর ঘি-এর ময়ান দেওয়া মুচমুচে করে ভাজা কচুরি। কচুরি যেমন নোনতা হয়, নোনতা-মিষ্টি স্বাদেরও হয়, তেমন এই দুই স্বাদেরই খাস্তা কচুরিও হয়।
 
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ১১
আটা-ময়দার খাবার:
ফুচকা: সাঁওতালি ভাষায় ‘পুচকি বা ফুচকি’ বলে একটি শব্দ আছে, যার মানে ছোটো, ক্ষুদ্র। ফুচকা শব্দটি সাঁওতালি ভাষা থেকে এসেছে বলে মনে হয়। ফুচকা আসলে মচমচে ছোটো গোল আকৃতির কচুরি। ছোটো মানে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের বেশি নয়। এই সাইজের লুচিকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বলা হতো ‘পুচ্ছকা’। সাঁওতালি পুচকি শব্দ থেকেই পুচ্ছকা শব্দটি তৈরি হয়েছিল বলে মনে হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। পূর্ব ভারতে এবং বাংলাদেশে এর নাম ‘ফুচকা’, উত্তর ভারতে এটি পরিচিত ‘গোলগাপ্পা’ নামে, পশ্চিম ভারতে এরই নাম ‘পানিপুরি’। অনেকে মনে করেন, ফুচকার উৎপত্তি মগধে (বর্তমানে বিহার)। তখন এর নাম ছিল ‘ফুলকি’। পুর হিসাবে তখন গোল-আলুর বদলে অন্য কিছু দেওয়া হতো কেন না গোল-আলু ভারতে আসে পোর্তুগিজ-দের মাধ্যমে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। মানস দাসের মতে, ফুলকি থেকেই পরবর্তী কালে পানিপুরি এবং ফুচকা এসেছিল।
 
পাপড়ি: আটা ও সুজি দিয়ে তৈরি মুচমুচে ছোটো গোলাকৃতি কচুরি যার নাম ‘পাপড়ি’। এর মধ্যে মসলা মিশ্রিত কাঁচা লংকা-র কুঁচি সহ সিদ্ধ আলুর পুর ভরে তাতে তেঁতুল জল ঢেলে শাল পাতার ঠোঙায় পরিবেশিত হয়। তেঁতুল জলের পরিবর্তে পুদিনা জল বা টক দই-ও ব্যবহার করা হয়। বাঙালি মেয়েদের জিভে-জল-আসা নাস্তা।
 
চুরমুর: ফুচকার সমগোত্রীয় একটি খাদ্য। ভাজার সময় ফুচকার যে সমস্ত পাপড়িগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুলে ওঠে না সেগুলিই ব্যবহৃত হয় চুরমুর-এর উপাদান হিসাবে। সিদ্ধ আলু ডোমা ডোমা করে কেটে তাতে ফুচকায় ব্যবহৃত সব মসলা মিশিয়ে তার উপর পাপড়িগুলি ভেঙে ছড়িয়ে দিলে তৈরি হয় চুরমুর।
 
খাজা: খাজা তদ্ভব শব্দ এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘খাদ্য’ থেকে। সংস্কৃত. খাদ্য > খজ্জ > খাজা। খুব ভালো করে ভাঁজ করে খাঁজ কেটে লুচির আকারে বেলে হালকা করে ভেজে নিলে হয় ‘চাঁদসই খাজা’। চাঁদের মতো দেখতে বলে এই নাম। খাবার আগে রস দিয়ে নিতে হয়। আর এক রকমের খাজার নাম ‘বাংলা খাজা’। এই খাজাও পরতে পরতে তৈরি, লম্বা নৌকার আকারে। ভেজে নিয়েই রসে ডুবিয়ে নেওয়া হয়। রস শুকিয়ে গায়ে চিনির মতো লেগে থাকে।
 
নিমকি: প্রাচীন সংস্কৃতে নিমকি-র কোনও উল্লেখ নেই। আরবি ‘নামক’ শব্দের মানে নুন। ‘নিমকি’ মানে নোনতা। অর্থ সংকুচিত হয়ে নিমকি হয়ে গেল একটি নোনতা নাস্তার নাম। অনেকের মতে, ফারসি ‘নমকিন’ থেকে বাংলায় ‘নিমকি’ এসেছে। নিমকি আসলে ময়দায় প্রস্তুত একটি নোনতা খাবার যা নাস্তা হিসাবে খাওয়া হয়। খাজার মতো ময়দা মেখে একটু নুন মিশিয়ে কড়া করে ভাজতে হয়। নিমকি হতে পারে বড়ো ও ছোটো সাইজের।
 
শিঙাড়া: নামটি এসেছে তেকোনা আকার থেকে। তিন শিং-ওলা পানিফলের মতো সংস্কৃত ‘শৃঙ্গাটক’ শব্দ থেকে। পানিফল-এর সংস্কৃত নাম শৃঙ্গাটক। সংস্কৃত. শৃঙ্গাটক > প্রাকৃত. সিংগাডঅ, সিংগাড > বাংলা. শিঙ্গাড়া, শিঙ্গারা, শিঙাড়া, সিঙাড়া। মতান্তরে, সংস্কৃত. সমভুজা > সম্ভোজা > সিভুসা > সিঁঙুরা (নদিয়ার কথ্য ভাষার প্রভাবে) > বাংলা. সিঙ্গাড়া, সিঙাড়া, শিঙাড়া।
শিঙাড়াকে হিন্দিতে বলে ‘সামোসা’। সংস্কৃত. সমভুজা > সম্ভোজা > সাম্ভোসা > হিন্দি. সামোসা।
এটি হচ্ছে ময়দায় ঢাকা মসলা মিশ্রিত আলু-ফুলকপি ইত্যাদির পুর দেওয়া এবং তেল-এ ভাজা পানিফলের মতো তেকোনা আকৃতির স্বাদু খাবার। বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় তেলেভাজা, যা অনেকক্ষণ গরম থাকে।
শিঙাড়ার উৎপত্তি নিয়ে মতান্তর আছে। অনেকের মতে, শিঙাড়ার জন্ম নদিয়ার কৃষ্ণনগর শহরে। ১৭৬৬ সালে কৃষ্ণনগর-এর রাজা কৃষ্ণচন্দ্র-এর রাজসভার রাজ-হালুইকর, কলিঙ্গ তথা বর্তমান উড়িষ্যা থেকে আগত গুণীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠ পুত্র গিরীধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী দেবী আবিষ্কার করেছিলেন শিঙাড়া। ভারতীয় খাদ্য হিসেবে শিঙাড়ার সাথে রবার্ট ক্লাইভের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, এই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র-এরই সৌজন্যে।
ঐতিহাসিকদের মতে, শিঙাড়ার জন্ম ইরানে। আমির খসরু-র রচনাতেও শিঙাড়ার উল্লেখ আছে। খাদ্যটি যে অতি প্রাচীন তাতে সন্দেহ নেই। নবম শতাব্দীতে পারস্যের অধিবাসীরা যব এবং ময়দার তালের সঙ্গে গাজর, কড়াই শুঁটি, রসুন ও মাংস মেখে সেঁকে খেত। এরও বহু পরে তাঁরা বঙ্গদেশের বিভিন্ন মসলা সহযোগে তৈরি শিঙাড়া খেয়ে চমৎকৃত হন। তাহলে এটিই দাঁড়াচ্ছে যে, আধুনিক শিঙাড়ার জন্ম বাংলায়।
 
সামুচা: মুসলমানের তৈরি শিঙাড়ার প্রকার ভেদ। শুধু পিঁয়াজের পুর দিয়ে ভাজা পানের খিলির মতো তেকোনা ছোটো এবং চ্যাপটা খাদ্য যার খোলা অত্যন্ত পাতলা এবং মুচমুচে। আমির খসরু ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির মুসলমান অভিজাত-দের যে খাবারের তালিকা দিয়েছেন, তাতে মাংস, পিঁয়াজ আর ঘি দিয়ে তৈরি এক রকম সামোসা-র উল্লেখ করেছেন। তার প্রায় ৫০ বছর পরে ইবন বতুতা ওই খাবারকেই বলেছেন ‘সামুসাক’। মিলন দত্তের মতে, ওটিই আজকের সামুচা।
 
ডালপুরি: ‘ডালপুরি’ হলো ডাল বাটার পুর দিয়ে তৈরি পুরি বা লুচি। ডাল বাটার পুর দিয়ে রুটির মতো বড়ো আকারের ময়দার নরম লুচি-কে বলে ডালপুরি। কলকাতা অঞ্চলে একে ‘রাধাবল্লভি’ বলা হয়। ডালের পুর দেওয়া ভাজা খাবার হলো কচুরি। সেভাবে দেখলে, ছোলার ডালের পুরিকেও কচুরি বলতে হয়। কিন্তু না। খাঁটি কচুরিতে কাঁচা বিউলির ডাল আর হিং-এর পুর ছাড়া অন্য কিছু থাকা চলবে না। আবার ওই একই পুর যখন পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা হয়ে ময়দার লেচিতে ভরা হবে, তখন তার নাম হয়ে যায় ‘রাধাবল্লভি’।
 
 
বাঙালির খাবারদাবার ১২
আটা-ময়দার খাবার
বাংলাদেশের ঢাকায় মোগল ঘরানার আটা-ময়দার তৈরি ফালুদা, বাখরখানি ইত্যাদি খাবারের আগমন ঘটেছিল মোগল আমলে এবং সেকালে সারা ভারতে তা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
 
ফালুদা: ঘন মিষ্টি পানীয়। এসেছে পারস্য থেকে। ঘন দুধ, সিদ্ধ সেমাই, পেস্তা, কিশমিশ, কাজু, বাদাম, গোলাপ জল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি ফালুদা সাধারণত ঠান্ডা পরিবেশন করা হয়।
 
বাখরখানি: ময়দা দিয়ে তৈরি রুটি জাতীয় গোলাকার মচমচে খাবার যা একদা বাংলাদেশের সকালের নাস্তা হিসাবে একটি অতি প্রিয় খাবার ছিল। ময়দার খামির থেকে রুটি বানিয়ে তা মুচমুচে বা খাস্তা করে বাখরখানি তৈরি করা হয়। বাখরখানির উৎপত্তি স্থান হলো আফগানিস্তান, আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে। আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মুসলমানের কাছে এটি এখনও প্রচলিত খাদ্য। ইংরেজ আমলে বিস্কুট আমদানির পর থেকে বাখরখানি-র জনপ্রিয়তা কমতে কমতে আজ লুপ্তপ্রায়।
ব্রিটিশ আমলে আটা-ময়দার তৈরি যেসব খাদ্য বাংলায় ঢুকেছিল তাদের তালিকা নেহাত ছোটো নয়। নিচে কয়েকটি সম্পর্কে বলা হলো।
 
বিস্কুট: ইংরেজি বিস্কুট শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষা থেকে। লাতিন ‘coquere’ শব্দের অর্থ ‘to cook’। Bis = দুই বার + coctus = রান্না করা। তাওয়ায় সেঁকা রুটি এক বেলা, পাঁউরুটি দুই এক দিন, আর বিস্কুট খাওয়া যায় কয়েক মাস ধরে। মূল ফরাসি শব্দ biscut, পরে ইংরেজি ভাষায় আসা বিস্কিট (biscuit) বাংলায় বিস্কুট হয়ে গেছে, যার অর্থও দুই বার সেঁকা রুটি। প্রথম বার সেঁকার পর দ্বিতীয় বার সেঁকায় রুটিখানি শুকনো আর মচমচে হয়ে যায়, যা অনেক দিন পরেও খাওয়া যায়। এটি করা হতো সেকালের জাহাজিদের জন্য, যাতে দীর্ঘ সমুদ্র ভ্রমণে অনেকদিন ধরে খেতে পারা যায়। এখন বাঙালি বিস্কুট খায় চায়ের সঙ্গে।
 
লেড়ো: দেশি শব্দ। এক ধরনের হাতে তৈরি মুচমুচে বিস্কুট।
 
পাঁউরুটি: পাঁউরুটি শব্দের ‘পাঁও’ অংশটি এসেছে পোর্তুগিজ থেকে। ‘রুটি’ এসেছে সংস্কৃত থেকে। পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে তৈরি ফাঁপা রুটি। ইংরেজ এদেশে আসার পর বাঙালি পাঁউরুটি খেতে শিখেছে। পাঁউরুটি সেঁকে টোস্ট বানাতে শিখেছে।
কেক: ইংরেজি শব্দ। কেক আর এক রকমের পাউরুটি। পাশ্চাত্যের সেঁকা মিষ্টি। ময়দা, চিনি, ডিম, বেকিং পাউডার আর মাখন ব্যবহার করে এই মিষ্টি খাবারটি বানানো হয়। বাঙালি এখন ভীষণভাবে কেক-এর ভক্ত। বড়োদিন, বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন সব কিছুতেই তার কেক কাটা চাই।
 
স্যান্ডউইচ: আর্ল অব স্যান্ডউইচ জন মন্টাগু (১৭১৮-১৭৯২) ছিলেন স্যান্ডউইচের চতুর্থ আর্ল। তার ছিল দুর্দান্ত তাসের নেশা। তাস খেলতে গিয়ে পাছে সময় নষ্ট না হয়, তাই তিনি পাঁউরুটির মধ্যেই মাংসের খণ্ড পুরে খেয়ে নিতেন। তা থেকেই স্যান্ডউইচ খাবারের উৎপত্তি এবং তার নামকরণ। বাঙালি স্যান্ডউইচ খেতে শিখেছে ইংরেজের কাছে।
 
বার্গার: শব্দের ব্যুৎপত্তি স্থান নাম থেকে। জার্মানির হ্যামবার্গ শহরে তৈরি হতো বলে খাদ্যটির নাম হয় হ্যামবার্গার স্টিক (Hamburger steak)। হ্যামবার্গার স্টিক সংক্ষেপে হ্যামবার্গার হয়ে শব্দটি ইউরোপ ও আমেরিকা ঘুরে বাংলায় এল বার্গার হয়ে।
অন্যান্য বিদেশি খাবারের মধ্যে আছে নুডল, চাউমিন, পাস্তা, মোমো ইত্যাদি। আধুনিক বাঙালির কাছে এরাও বেশ জনপ্রিয় খাবার।
নুডল: এটি চীনদেশীয় খাবার, যা চীনাদের আবিষ্কার। নুডল শব্দটি জার্মান শব্দ ‘নুডেল’ থেকে এসেছে। ময়দার খামির থেকে তৈরি নুডল চীনের হান রাজত্বের প্রধান খাদ্য ছিল। এটি এমন এক ধরনের খাবার যা ঝটপট তৈরি করে খাওয়া যায়। সেই হিসেবে খুবই জনপ্রিয়।
 
চাউমিন: হচ্ছে এক ধরনের ভাজা নুডল জাতীয় খাবার। চাউমিন শব্দটি তাইশানি শব্দ ‘চাউ-মেইং’ এর রোমান রূপ। চাউমিন চীনা সমাজে খুবই জনপ্রিয় এবং চীনা রেস্তোরার মেনুতে একটি আবশ্যিক পদ। এটি দুই বাংলায় বেশ চালু খাবার। সাধারণত ডিম এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি যেমন গাজর, বিন্‌স দিয়ে চাউমিন তৈরি করা হয়। ডিম ছাড়া শুধু সবজি দিয়ে তৈরি করা হয় ভেজ চাউমিন। এছাড়াও আছে এগ চাউমিন, চিকেন চাউমিন এবং মিক্স চাউমিন। আজকাল বাঙালিও বাড়িতে চটজলদি খাবার হিসাবে চাউমিন বানাচ্ছে।
পাস্তা: ইটালির একটি প্রধান খাদ্য, যা সিসিলি-তে প্রথম ১১৫৪ সালে প্রামাণ্য খাদ্য হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পাস্তা অনেক ধরনের হয়ে থাকে। পাস্তা কয়েক মিনিটেই রান্না করা যায়। নুডল-এর সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে। পাস্তা আটা দিয়ে তৈরি করা হয়।
 
মোমো: ‘মোমো’ শব্দটির অর্থ হলো ‘মাংসে ভরা ভাপা ময়দার পুডিং’। এটি একটি তিব্বতি খাদ্য। মোমো বর্তমানে উভয় বাংলায় বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তিব্বতে এই খাদ্য তৈরির সময় চমরি গাই-এর মাংসকে পুর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভারতে মুরগি ও মোষের মাংস দিয়ে তৈরি মোমো-ই বেশি জনপ্রিয়। আমিষ মোমো-র পাশাপাশি নিরামিষ মোমো-ও তৈরি হয়ে থাকে। নেপাল-এর মানুষরাই এটি প্রথম তিব্বত থেকে নিয়ে আসে। পরবর্তী কালে কাঠমান্ডু থেকে ভারতে এই খাবারটি ছড়িয়ে পড়ে।
বাঙালির খাবারদাবার ১৩:
তরিতরকারি:
তরকারি: তরিতরকারি শব্দ-টি বাংলায় এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে। ‘তরকারি’ শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়: রান্নার উপযোগী সবজি এবং রান্না করা সবজি। মতান্তরে, তরকারি শব্দের প্রথম অর্ধেক ফারসি, শেষ অর্ধেক ধোঁয়াশা। তরকারির ‘তর’ এসেছে ফারসি ‘তরহ্‌’ (মানে সবজি) থেকে, ‘কারি’ শব্দটি ইংরেজি ‘curry’ কিংবা তামিল ‘কারি’ থেকে এসে থাকতে পারে। নীহাররঞ্জন রায় ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, যেসব তরকারি আমরা আদি কাল থেকে ব্যবহার করে আসছি তাদের অধিকাংশের নামই অস্ট্রিক ভাষা থেকে এসেছে। যেমন বেগুন, লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে, কাঁকরোল, কচু ইত্যাদি। মুকুন্দরাম-এর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে উল্লেখিত কয়েকটি সবজির নাম: বাগ্যন (বেগুন), কুমড়া, কাঁচকলা, মোচা, পলাকড়ি (পটোল), নট্যা (নটে শাক), লাউ, মান (মানকচু), আম্র (কাঁচা), তেঁতুল, মরিচ ইত্যাদি। ভারতচন্দ্র-এর কাব্যে আমরা পাই মূলা এবং তৈল শাক (সম্ভবত সরিষা শাক)-এর উল্লেখ। নানা ধরনের শাক খাওয়ার অভ্যাসও বাঙালির সুপ্রাচীন। মধ্যযুগে পোর্তুগিজরা ভারতে ‘আলু’ আমদানি করে। এই আলুকেই আমরা বর্তমানে গোল আলু বলি।
 
রস: বাঙালির রসনা সব রকমের স্বাদ গ্রহণে উন্মুখ। বাঙালির খাদ্যের মূল ভিত্তিই হলো রস। টক, ঝাল, মিষ্টি, তেতো – সব রকম রসের খাদ্যে তার টান। রস আবার ছয় রকমের: লবণ, কষায়, কটু, তিক্ত, অম্ল আর মধুর — নানান খাবারের এই ছয় ধরনের রস বা স্বাদই হচ্ছে ‘ষড়্‌ রস’। এই কয়টি স্বাদের বাইরে বাঙালির কোনও খাদ্য বা আহার নেই। লবণের স্বাদ হচ্ছে ‘লাবণ’। আমড়ার রস হচ্ছে ‘অম্ল’ বা ‘টক’। গাব-এর স্বাদ হচ্ছে ‘কষায়’ বা ‘কষ’। সরিষার স্বাদ হচ্ছে ‘কটু’ বা ‘ঝাঁঝালো’। উচ্ছে-করলার স্বাদ হচ্ছে ‘তিক্ত’ বা ‘তেতো’, এবং পাকা ল্যাংড়া আমের স্বাদ হচ্ছে ‘মধুর’। যে সমস্ত রস বাঙালি রান্নায় সাধারণত ব্যবহার হয় সেগুলি হলো: চিনির রস, মিষ্টির রস, খেজুরের রস, তালের রস কিংবা কোনও ফলের রস।
 
ব্যঞ্জন: তরকারির সংস্কৃত প্রতিশব্দ ‘ব্যঞ্জন’। সাধারণত শাক-আনাজের নিরামিষ ব্যঞ্জনকে তরকারি বলা হয়। তরকারি অর্থাৎ সরস রান্না অথবা সরস রান্নার দ্রব্য। যেমন পটলের তরকারি বা মাছের তরকারি।
বাঙালির মূল তরকারি হলো ভাজা, সুক্তো, ডাল, ঝাল, ঝোল, ক্ষর, টক, ঘণ্ট, লাবড়া (বা ঘ্যাঁট), চচ্চড়ি, সড়সড়ি, চাটনি। বাঙালির ভোজন শুরু হয় ভাজা দিয়ে, শেষ হয় চাটনি দিয়ে।
 
ভাজা: ‘ভাজা’ এসেছে সংস্কৃত থেকে। সংস্কৃত. √ভ্রস্‌জ > পালি. ও প্রাকৃত. ভজ্জ > বাংলা. ভাজ, ভাজা। ভাজা হলো ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য তেলে বা ঘি-এ শুকনো করে পাক করা শাক-সবজি বা মাছ-মাংস-পনির। যেমন বেগুন ভাজা, শাক ভাজা, উচ্ছে-করলা ভাজা, মাছ ভাজা ইত্যাদি। বাংলাদেশের মুসলমান বলেন ‘ভাজি’। ঘি না তেল, তেলের পরিমাণ ও তাপের হেরফের এবং তরকারি কখন কিভাবে ভাজা হচ্ছে তার উপর ব্যঞ্জনের স্বাদ-গন্ধ নির্ভর করে।
 
সুক্তো: সুক্তো শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘শুষ্ক পত্র’ থেকে। সেকালের নাবিকরা দীর্ঘকালীন সমুদ্র যাত্রায় শুকনো শাক-পাতা সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং প্রয়োজন মতো তা সিদ্ধ করে তার ঝোল খেতেন। এখন অবশ্য শব্দার্থ পালটে গেছে। সুক্তো হলো তেতো তরকারি। খনার বচনে আছে, ‘আগে তিতা পরে মিঠা’। আয়ুর্বেদ মতে, ভোজনের শুরুতে তিতা খেলে রুচি বাড়ে।
কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী খুল্লনার রান্নার বিবরণে লিখেছেন সুক্তো রান্নার পদ্ধতি— ‘বেগুন কুমড়া কড়া, কাঁচকলা দিয়া শাড়া / বেশন পিটালী ঘন কাঠি। / ঘৃতে সন্তলিল তথি, হিঙ্গু জীরা দিয়া মেথী / শুক্তা রন্ধন পরিপাটী।।’ সাধারণত পলতা পাতা, কচি নিম পাতা, উচ্ছে-করলার সঙ্গে কাঁচকলা-পেঁপে এবং আদা দিয়ে সুক্তো রান্না করা হয়। বাঙালির ভোজন তালিকায় এটি দ্বিতীয় ব্যঞ্জন। সুক্তো ছিল শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয় ব্যঞ্জন। মুসলমান বাঙালিদের মধ্যে চিংড়ি বা কুচো মাছ দিয়ে সুক্তো রান্নার চল আছে।
 
ঝাল: ‘ঝাল’ সাঁওতালি শব্দ। ঝাল হলো কাঁচা লংকার গন্ধ যুক্ত একটি ভিজে ভিজে ব্যঞ্জন যা পাঁচফোড়ন, শুকনো লংকা বাটা আর কাঁচা লংকা দিয়ে রান্না করা হয়। নাম ঝাল হলেও তাতে প্রচণ্ড ঝাল থাকে না। সাধারণত রুই, ভেটকি, মহাশোল জাতীয় বড়ো মাছের বা পাবদা, চিংড়ি এবং অন্যান্য চুনো মাছের ঝাল হয়ে থাকে। নিরামিষ ঝালও হতে পারে। ঝাল শব্দটি এখন লংকা চিবালে জিভে যে স্বাদ অনুভূত হয় তা বোঝাতে বেশি ব্যবহৃত হয়। পিপুল, চই, গোলমরিচও ঝাল অনুভূতির উদ্রেক করে।
 
ঝোল: ‘ঝোল’ শব্দটি এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে। মানে ডালের মতো তরল তরকারি যাতে থাকে আনাজ অথবা মাছ কিংবা মাংস। তবে শব্দটি ঝোর, ঝোরা, ঝরনা শব্দের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হয়।
সুরুয়া: ফারসি ‘শোরবা’ থেকে সুরুয়া শব্দটি বাংলায় এসেছে। ঝোল বা রসাকেই এক কালে সুরুয়া বলা হতো। সাধারণত মাংসেরই সুরুয়া হয়। শাক-সবজি দিয়েও সুরুয়া বানানো যায়। রান্নার সময় গোলমরিচ, ছোটো এলাচ, দারুচিনি ইত্যাদি মসলা দেওয়া যায়। অল্প মাংসে অনেক বেশি জল দিয়ে কম আঁচে পাঁচ ছয় ঘণ্টা রান্না করলে সুরুয়া প্রস্তুত হয়। রোগীর পথ্য হিসেবে প্রচলিত ছিল। আধুনিক বাঙালি সুরুয়া-র কথা ভুলে গেছে।
 
সূপ: সংস্কৃত শব্দ। খ্রিষ্ট জন্মের পাঁচ শত বছর আগে থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে ডালের জল বা পাতলা ঝোলকে সূপ বলা হতো। ডাল, চাল, গম এবং মাংস-এর সূপ হতো। বঙ্গদেশে পানতা ভাতের আমানি-তে পিপুল গুঁড়া, শুঁঠ আর বেদানা-র রস দিয়ে তৈরি হতো চালের সূপ।
কাই: এসেছে সংস্কৃত ‘ক্বাথ’ থেকে। তরকারির ঘন ঝোলকে কাই বলে। বাংলার কোনও কোনও অঞ্চলে মাখামাখা তরকারির ঝোলকে কাই বলে। আঠা হিসেবে ব্যবহার যোগ্য চাল বা আটার ঘন মাড়-কেও কাই বলে। আটা বা চালের গুঁড়ার গোলাকার পিণ্ডকেও কাই বলে।
ক্ষর: মানে ছিল রসা অর্থাৎ শুকনো নয় একটু ভিজে ভিজে, ঝোলেরই নির্ঝোল রূপ। এই বাক্যটি সুকুমার সেনের লেখা।
 
অম্বল: ‘অম্বল’ এসেছে সংস্কৃত থেকে। সংস্কৃত. অম্ল > পালি. অম্বিল > প্রাকৃত. অংবিল, অম্বিল > বাংলা. অম্বল। অম্বল আর টক সমার্থক। অম্বল রান্না হয় ঝোল রেখে।
 
টক: ‘টক’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি অনিশ্চিত, শব্দটি সংস্কৃত ‘তক্র’ (মানে ঘোল) থেকে এসে থাকতে পারে। এটি গুণবাচক শব্দ হলেও বাঙালি একে একটি ব্যঞ্জন বলেই জানে। টক-এর মধ্যে অম্বল আর চাটনি দুটিই পড়ে। অম্বল আটপৌরে, চাটনি শৌখিন। চাটনি অপেক্ষাকৃত ঘন, বেশি মিষ্টি। অম্বল বা টক জাতীয় ব্যঞ্জনকে অনেক অঞ্চলে খাটা বা খাটাই বলে। টক স্বাদের কোনও ফল বা সবজি সিদ্ধ করে তাতে মিষ্টি মিশিয়ে বা না-মিশিয়ে তৈরি রস যুক্ত এক তরকারি। তা হতে পারে আমিষ ও নিরামিষ। সাধারণত কাঁচা আম, টম্যাটো, আমড়া, কাঁচা বা পাকা তেঁতুল, কুল, করমচা, চালতা, জলপাই, মাদার জাতীয় ফল বা টক পালং দিয়ে অম্বল বানানো হয়। নিরামিষ অম্বলে মুলো, বেগুন, বড়ি দেওয়ারও রেওয়াজ আছে। মাছের অম্বলও বাঙালির কাছে সমান প্রিয় সেই প্রাচীন কাল থেকে। সেই চল এখনও রয়েছে। সাধারণত চুনো মাছ, ফলুই, ল্যাটা, ছোটো চিংড়ি বা পোনা মাছ দিয়ে আমিষ অম্বল রান্না করা হয়ে থাকে। বাঙালি অম্বল খেয়ে আহার শেষ করে। দূরে কোথাও যাওয়ার সময় মা সন্তানকে অম্বল খেতে দেয় না। এটিই যাতে সন্তানের শেষ আহার না হয় সেই কামনাই হয়তো মায়ের মনে কাজ করে !
 
 
 
এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/বাঙালির-খাবারদাবার/
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — 
নৃপেণ ভৌমিক (Nripen Bhaumik) এর লেখা: শুবাচ
 
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
 
 
 
বাঙালির আসবাবপত্র, নৃপেন ভৌমিক
 
বাঙালির বাসনকোশন, নৃপেন ভৌমিক
 
 
 
 
 
 
 
 
 
error: Content is protected !!