বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক

নৃপেণ ভৌমিক 

বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক

বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক: ১
প্রপিতামহ: ঠাকুরদার বাবা হলেন প্রপিতামহ। প্রপিতামহ সংস্কৃত শব্দ। সত্যন্দ্রনাথ দত্ত ‘কুহু ও কেকা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে / দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।’ রামের প্রপিতামহের নাম ছিল রঘু। আমাদের জীবদ্দশায় প্রপিতামহকে খুব কম লোকই দেখেছি বলে হয়তো এর কোনও সুপরিচিত বাংলা ডাক গড়ে উঠেনি। তবে কোনও কোনও অঞ্চলে প্রপিতামহকে ‘বড়ো বাবা’ বা ‘পর দাদা’ বলে ডাকা হয়। প্রমাতামহীকে ডাকা হয় ‘বড়ো মা’ বা ‘পর দিদি’ বলে।
ঠাকুরদা-ঠাকুরমা: বাবার বাবা মানে ঠাকুরদা অর্থাৎ পিতামহ; বাবার মা মানে ঠাকুরমা অর্থাৎ পিতামহী। পিতামহ অর্থে ‘ঠাকুর-দাদা’, সংক্ষেপে ‘ঠাকুরদা, ঠাকুদ্দা’ দুই বাংলাতেই চলে। কোথাও কোথাও বলে ‘কর্তা’ অর্থাৎ বাবার বাবা যিনি সংসারের খোদ কর্তা। তেমনি পিতামহী অর্থাৎ বাবার মা বলতে চলে ঠাকুর দাদার হুবহু স্ত্রী-লিঙ্গ রূপ হলো ‘ঠাকুরাণী দিদি’, সংক্ষেপে ঠান্‌দি, ঠাকুরমা, ঠাকুমা, ঠাম্মা। । বাংলা ভাষায় পিতামহী ও মাতামহী অর্থে ‘দিদি’ শব্দটির চল আছে কোনও কোনও সম্প্রদায়ে ও অঞ্চলে।
বাবার বাবা অর্থে ‘দাদা’ শব্দটি আধুনিক। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে শব্দটির উদ্ভব সংস্কৃত থেকে। সংস্কৃত. তাত > তাদ > দাদ > দাদা। ভাষাবিদ সুকুমার সেনের মতে, ‘দাদা’ শব্দটি এসেছে ফারসি থেকে, কিছু পরিবর্তন লাভ করে । যেমন, ফারসিতে ‘দাদ্‌দিহ’ মানে ন্যায়বিচারক, ঈশ্বর, বড়োভাই; ‘দাদ্‌’ মানে বর্ষীয়ান ব্যক্তি, শিক্ষক ইত্যাদি। পিতামহ অর্থে হিন্দি ও মৈথিলিতেও ‘দাদা’ শব্দটি পাওয়া যায়।
‘দাদা’ শব্দটি থেকেই তৈরি হয়েছে ‘দাদামহ’, ‘দাদি’, ‘দাদাভাই’, ‘দাদামশায়’, ‘দাদাশ্বশুর’ এবং ‘দাদু’। ‘দাদা-দাদি’ আর ‘নানা-নানি’ সমার্থক।
দাদু-দিদিমা: মায়ের বাবা হলেন দাদু/ দাদামশাই অর্থাৎ মাতামহ, আর মায়ের মা হলেন দিদিমা / দিদা অর্থাৎ মাতামহী। মাতামহ ও মাতামহী অর্থে ‘দাদু’ ও ‘দিদি / দিদা’ শব্দগুলি ‘দাদ’ শব্দ থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। মাতামহী অর্থাৎ মায়ের মা প্রায় সর্বত্র ‘দিদিমা’ বলে পরিচিত। দিদিমাকে অনেকে ‘দিদা’ বা ‘দিদুন’ বলে। মাতামহ-মাতামহীকে অনেকে ‘নানা-নানি’ও বলে।
মাতামহী অথবা / এবং পিতামহী অর্থে কোনও কোনও অঞ্চলে লুপ্তপ্রায় ‘আইমা’ শব্দ এখনও শোনা যায়। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অবিমাতা’ থেকে। ষোড়শ শতাব্দীতে এবং তার পরেও পিতামহী অর্থে ‘আইমা’র সঙ্গে তুলনা করা যায় ‘ধাই-মা’, ইংরেজি ডেলিভারি ও ওয়েট নার্স-এর মতো অর্থ। মধ্য বাংলায় ডেলিভারি নার্স অর্থে ‘খোলা ধাই’ (অর্থাৎ যে ধাই নাড়ি কেটে নবজাত শিশুকে গর্ভাশয় থেকে মুক্ত করে) পাওয়া যায়। ইংরেজি ওয়েট নার্স-এর অর্থে অনেক অঞ্চলে ‘দুধ-মা’ শব্দটি শোনা যায়।
বাবা: বাবা শব্দের অর্থ পিতা, জনক, পিতৃ। প্রাচীন সংস্কৃত শব্দ ‘পিতৃ’ বর্তমানে কেবলমাত্র ‘পিসি’, ‘পিসে’ শব্দে চিহ্ন রেখে একেবারে অন্তর্ধান করেছে প্রাকৃত-এর আমল থেকেই। সংস্কৃতে এই অর্থে চলিত হয়েছিল ‘তাত’ শব্দ। এই শব্দও প্রায় নিশ্চিহ্ন।
পিতা অর্থে গ্রিক, মালয়, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি ও মৈথিলি ভাষায় ব্যবহৃত হয় ‘বাবা’ শব্দটি। তুর্কি ভাষায় ‘ৱাবা’। পঞ্জাবী ভাষায় ‘বাবল’। ফারসিতে বলে ‘আবূ’। এখন অনেক উন্নাসিক বাঙালি ‘বাবা’র বদলে ইংরেজি ‘পাপা’ বলা পছন্দ করেন। বাঙালি মুসলমানরা বাবাকে ‘আব্বু’, ‘আব্বা’, ‘আব্বাজান’ বা ‘আব্বি’ বলে ডাকে।
শিশুরা যখন প্রথম ভাঙা ভাঙা কথা বলতে শুরু করে, সেই সময়ই তারা মা-বাবা শব্দ দুটি উচ্চারণ করে অনায়াসেই। এর কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, শিশুরা যখন প্রথম কথা বলতে শেখে তখন ম, ব, দ, ত এই রকম সহজ উচ্চারণের ব্যঞ্জনবর্ণগুলি উচ্চারণ করতে পারে আগে। তাই তারা সহজেই তাদের প্রথম উচ্চারিত শব্দ হিসেবে মা, বাবা, দাদা এগুলি উচ্চারণ করে থাকে।
বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাবা শব্দটির উৎস নির্দেশ করেছেন এইভাবে: সংস্কৃত. ৱপ্র > প্রাকৃত. ৱপ্প > বাংলা. ‘বাপ’ > ‘বাপা’ > বাবা। ‘বাবা’ অর্থে ‘বাপ’ শব্দটি চালু আছে আরবি, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, মৈথিলি, ওড়িয়া এবং অসমিয়া ভাষায়। আরবি, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, ও মৈথিলি, ওড়িয়া এবং অসমিয়া ভাষায় ‘বাবা’ শব্দটি ‘বাপ’ শব্দ থেকেই এসেছে।
ভাষাবিদ সুকুমার সেনের মতে, অবহট্‌ঠে একটি নূতন শব্দ দেখা যায়, ‘বপ্‌প’, মূলত ছেলে ভুলানো শব্দ। এই শব্দটি প্রচীন বাংলায় পাই ‘বপা’ রূপে, এখন ‘বাপ’। যেমন ‘বাপের বাড়ি’, ‘বাপের জন্মে’ ইত্যাদি। সুকুমার সেন মনে করেন, ‘বাবা’ এসেছে ফারসি থেকে, তবে তাতে ‘বাপ’, ‘বাপা’ শব্দের প্রভাব আছে।
আবার অনেকের মতে, বাবা শব্দের জন্ম তুরস্কে। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত তুর্কি বাবা অর্থ পিতা, জনক; পুত্র বা পুত্র স্থানীয়কে স্নেহ-সম্বোধনে ব্যবহৃত শব্দ; সাধু-সন্ন্যাসীর সম্মানসূচক আখ্যা (সাই বাবা, বাবা নানক)। বাবা শব্দটি বিস্ময়, ভয়, বিরক্তি প্রভৃতি ভাব প্রকাশক উক্তি হিসেবেও ব্যবহৃত হয় (বাবা গো, কী কষ্ট! ওরে বাবা কত বড়ো মাছ!)।
মা: ‘মা’ খাঁটি বাংলা শব্দ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘মা’ শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘মাতৃ’ শব্দ থেকে: সংস্কৃত. মাতৃ > প্রাকৃত. ‘মাআ’ > বাংলা. ‘মা’। হিন্দিতে মাতাকে বলে ‘মাঁ’, ‘মাঈ’; মরাঠি ও গুজরাটী ভাষায় ‘মা’, ‘মাই’; পাঞ্জাবি ভাষায় ‘মা’; মৈথিলি ভাষায় ‘মাই’, ‘মাঈ’, ‘মাএ’; ওড়িয়া ভাষায় ‘মা’।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ‘মা’ কে বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দগুলির উচ্চারণ প্রায় কাছাকাছি। আর সবগুলি শব্দের শুরুতেই ব্যবহৃত হয়েছে ‘এম’ (m) অথবা ‘ম’ ব্যঞ্জনবর্ণ। উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। জার্মান ভাষায় ‘মাট্টার’ (mutter), ওলন্দাজ ভাষায় ‘ময়েদার’ (moeder), ইতালির ভাষায় ‘মাদর’ (madre), চিনা ভাষায় ‘মামা’ (mama), হিন্দি ভাষায় ‘মাম’ (mam), প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় ‘মাত’ (mut) এবং আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষায় ও বাংলা ভাষায় ‘মা’ (ma)। বাঙালি মুসলমানরা মা-কে ‘আম্মা’, ‘আম্মাজান’, ‘আম্মু’ বলে ডাকে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত মা ডাকের শব্দগুলির মধ্যে উচ্চারণ গত এই মিল কীভাবে ঘটল তা এক রহস্য। তবে ভাষাবিদরা বলেন, শিশুরা যখন তার মায়ের দুধ পান করে, তখন তারা তাদের মুখ দুধ ভর্তি অবস্থায় কিছু শব্দ করে। সেই শব্দগুলি নাক দিয়ে বের হয় বলে উচ্চারণগুলি অনেকটা ‘ম’ এর মতো শোনা যায়। তাই প্রায় সব ভাষাতেই মা ডাকে ব্যবহৃত শব্দগুলো ‘ম’ বা ‘এম’ (m) দিয়ে শুরু হয়।
জেঠা: ‘জেঠা’র অর্থ বাবার বড়ো ভাই বা জ্যেষ্ঠতাত বা পিতার অগ্রজ। ‘জেঠা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে: সংস্কৃত. জ্যেষ্ঠক > প্রাকৃত. জেট্‌ঠ > বাংলা. জেঠ > জেঠা। বাঙালি মুসলমানরা জেঠাকে ‘বড়ো আব্বা’ বা ‘বড়ো চাচা’ বলে ডাকে।
‘জেঠা’ শব্দ থেকে এসেছে ‘জেঠামশায়’, ‘জেঠাশ্বশুর’, ‘জেঠশ্বশুর’, ‘জেঠশ্বাশুড়ি’, ‘জেঠি’, ‘জেঠাই’, ‘জেঠাইমা’, ‘জেঠিমা’। ‘জেঠা’র সন্তান হলো ‘জেঠাত’ ভাই বা বোন, ‘জেঠতুতো’ ভাই বা বোন।
অগ্রজ অর্থে হিন্দিতেও ‘জেঠা’ শব্দটি চালু আছে। হিন্দিতে ‘জেঠ’ মানে ভাশুর। ‘জেঠানি’ মানে ভাশুরের বউ। অকালপক্ক ও ফাজিল ছেলে অর্থেও ‘জেঠা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ‘জেঠাপণ’, ‘জেঠাম’, ‘জেঠামি’ মানে বালকের অকালপক্কতা।
কাকা: ‘কাকা’ মানে বাবার ছোটো ভাই। কাকার সমার্থক শব্দ পিতৃব্য, খুড়া, চাচা। বাংলায় ‘কাকা’ শব্দটি এসেছে ফারসি ‘কাকা’ থেকে। ‘কাকা’ শব্দটি হিন্দিতে কক্‌কা, কাকা; মৈথিলিতে কক্‌কা; গুজরাটিতে কাকা। ফারসি, বাংলা, হিন্দিতে কাকার স্ত্রী হলো কাকি যার অর্থ পিতৃব্যপত্নী, খুড়ি, চাচি, কাকিমা।
খুড়া শব্দটি এসেছে: সংস্কৃত. ক্ষুদ্রতাত > প্রাকৃত. খুড্ড > খুড্ডঅ > বাংলা. খুড়া। খুড়া থেকে এসেছে খুড়ো, খুড়ি, খুড়শাশ, খুড়শ্বশুড়, খুড়শাশুড়ি। ভাষাবিদ সুকুমার সেনের মতে, খুড়ার স্ত্রী ‘খুড়ি’ এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘ক্ষুদ্রিকা’ অথবা ‘ক্ষুদ্রার্ষিকা’ থেকে। মূল শব্দ ‘ক্ষুদ্রার্ষিকা’ ধরলে খুড়ি শব্দের ঠিক আগের রূপ অনুমান করতে হবে ‘খুড়াই’। খুড়ার সন্তান হলো ‘খুড়ুতা’(মধ্য বাংলা) – এখন ‘খুড়তুতো’ ভাই বা বোন।
চাচা শব্দের ব্যুৎপত্তি কুয়াসাচ্ছন্ন। সংস্কৃত ‘তাত’ শব্দের সঙ্গে তুলনীয় কিন্তু তাত থেকেই যে চাচা এসেছে তার কোনও প্রমাণ নেই। কাকা অর্থে হিন্দিতে আমরা পাই চচা, চাচা; গুজরাটিতে চাচ, চাচা। চাচা থেকে এসেছে চাচাতো ভাই ও বোন। হিন্দু বাঙালির চেয়ে মুসলমান বাঙালিরা চাচা শব্দটি বেশি ব্যবহার করেন।
আজকালের ছেলে-মেয়েরা কাকা-চাচার চেয়ে আঙ্কল বলা বেশি পছন্দ করে। ইংরেজি ‘uncle’ শব্দের অর্থে সবই বোঝায় যেমন চাচা, কাকা, মামা, জেঠা, পিসা, খুড়া, মেসো, খালা, জেঠা খুড়া, জেঠা মামা, খুল্লতাত, পিতৃব্য, মাতুল, পিসে, খুড়ো।
পিসি: বাবার বোনকে আমরা পিসি বলে ডাকি। এই শব্দ এসেছে সংস্কৃত থেকে বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। সংস্কৃত. পিতৃম্বসা > প্রাকৃত. পিউচ্ছা, পিউচ্ছী, পিউসিয়া > বাংলা. পিসি, পিসী > পিসা, পিসে। পিসির স্বামীকে আমরা ডাকি পিসে, পিসা বলে। পিসির স্বামী ‘পিসে’ এসেছে ‘পিসিয়া’ থেকে। এখন সম্ভ্রমার্থে এই শব্দে প্রায়ই ‘মশাই’ যোগ করা হয়। যেমন, পিসেমশাই।
পিসি থেকে এসেছে পিসাত/পিসতুতো ভাই-বোন, পিসশ্বশুর , পিসা-শ্বশুর, পেসশাশুড়ি, পিসি-শাশুড়ি। বাঙালি মুসলমানরা পিসিকে বলে ‘ফুফু’ বা ‘ফুপু’। শব্দটি এসেছে হিন্দি ‘ফুফু’ থেকে। ফুফুর স্বামী হলো ‘ফুফা’ বা ‘ফুপা’। ‘ফুফাতো’ বা ‘ফুফেরা’ ভাই হলো পিসতুতো ভাই।
মামা: মা-র ছোটো ভাই এবং দাদাকে আমরা মামা বলে ডাকি। এর অপর নাম মাতুল। মাতুলালয় মানে মামার বাড়ি। মামা শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ‘মাম’, ‘মামক’ থেকে। ফারসি, হিন্দি, মারাঠি, মৈথিলিতেও মামাকে ‘মামা’ বলা হয়; গুজরাটিতে ‘মাম’। মামার স্ত্রীকে বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি ও মৈথিলিতেও বলা হয় মামি। মামির অপর নাম মাতুলানী। মামা থেকে অন্যান্য যেসব শব্দ এসেছে তারা হলো মামাঠাকুর, মামাশ্বশুর, মামাশাশুড়ি, মামাইত বা মামাতো ভাই , মামাতো বোন, মামাতো দেওর, মামাতো শালা, মামাতো শালি। ‘মামার জোর’ শব্দটি ব্যঙ্গার্থে ব্যবহৃত হয় যার অর্থ মুরুব্বির জোর, খুঁটির জোর, প্রভাবশালী ব্যক্তির সহায়তার ভরসা।
মাসি: মা-এর বোনকে আমরা ‘মাসি’ বা ‘মাসিমা’ বলে ডাকি। এই শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। সংস্কৃত. মাতৃম্বসা > প্রাকৃত. মাউসিআ, মাউসী > বাংলা. মাসী > মাসি। প্রাকৃত শব্দ ‘মাউসিআ’ হিন্দিতে হয়েছে মউসী, মাসী, মৌসী; মারাঠিতে হয়েছে মারশী, মারসী; গুজরাটিতে হয়েছে মাসী, মৌঁসী: ওড়িয়ায় হয়েছে মাউসী।
মাসির স্বামী হলো মাসিপতি, মেসোমশায়, মেসো। মাসি থেকে মেসো শব্দটির বিবর্তন ঘটেছে এইভাবে: মাসী + উয়া, ঈয়া > মাসুয়া, মাসীয়া > মেস্বা, মেসো। মাসির স্বামী ‘মাসুয়া’ থেকে এসেছে ‘মেসো’। এখন সম্ভ্রমার্থে এই শব্দে প্রায়ই ‘মশাই’ যোগ করা হয়। যেমন, মেসোমশাই। ‘মেসো’-কে হিন্দিতে বলে ‘মৌসা’, ‘মৌসিয়া’; মারাঠিতে ‘মাৱসা’; ওড়িয়ায় ‘মউসা’।
মাসি থেকে এসেছে মাসতুতো ভাই, মাসতুতো বোন, মাসতুতো দেওর ইত্যাদি শব্দগুলি। মাসতুতো কথার অর্থ হলো: নিজের মাসির অথবা পতি বা পত্নীর মাসির সন্তানরূপে সম্পর্কিত। বাঙালি মুসলমানরা মেসোমশাইকে বলে খালা। মাসিকে বলে খালু বা খালামনি। মাসতুতো ভাই হলো খালাতো ভাই। মাসতুতো বোন হলো খালাতো বোন।

error: Content is protected !!