বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক

বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক: ২
দাদা: বড়ো ভাই অর্থে ‘দাদা’ শব্দটি আধুনিক। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে শব্দটির উদ্ভব সংস্কৃত থেকে। সংস্কৃত. তাত > তাদ > দাদ > দাদা। হিন্দি ও মারাঠিতে অগ্রজ অর্থে ‘দাদা’ শব্দটির চল আছে।
 
ভাই: শব্দটি শুনলেই মনে পড়ে যায় ১৯৫২ সালের পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতিতে লেখা আবদুল গফ্‌ফর চৌধুরীর সেই বিখ্যাত গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’
‘ভাই’ মানে একই মা-বাবার পুত্র (সহোদর) কিংবা একই পিতার কিন্তু ভিন্ন মাতার পুত্র (বৈমাত্রেয় ভাই) কিংবা একই মাতার কিন্তু ভিন্ন পিতার পুত্র। সমার্থক শব্দ ভায়া, ভ্রাতা, দাদা। ভাই শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘ভ্রাতৃ’ শব্দ থেকে। সংস্কৃত. ভ্রাতৃ > প্রাকৃত. ভাতি > বাংলা. ভাই। হিন্দি, মারাঠি ও পাঞ্জাবিতে ‘ভাঈ’; মৈথিলিতে ‘ভাই’, ‘ভাঈ’; সিন্ধি, গুজরাটি ও ওড়িয়াতে ‘ভাই’। সহোদর বড়ো ভাইকে এপার বাংলায় বলে ‘দাদা’, ওপার বাংলায় বলে ‘ভাই’। জেঠার ছেলে ‘জেঠতুতো ভাই’। খুড়োর ছেলে ‘খুড়তুতো ভাই, বাঙালি মুসলমানরা বলে ‘চাচাতো ভাই’।
ভাইয়ের মেয়ে হলো ‘ভাইঝি’; ছোটো বা বড়ো ভাইয়ের ছেলে হলো ‘ভাইপো’। ‘ভাইবউ’ হলো ভাইয়ের স্ত্রী। ভাইয়ের স্ত্রীকে ‘ভাইজ’ বা ভাজ’ও বলে (ভ্রাতৃজায়া থেকে)।
 
বোন: ‘বোন’ অর্থ সহোদরা, ভগিনী। সংস্কৃত. ভগিনী > প্রাকৃত. বহিণী, ভইণী > বাংলা. বইনী, বহিন, বইন, বনি, বনী, বোন (কথ্য)। একই সংস্কৃত শব্দ পালটে গিয়ে হিন্দি ও মৈথিলিতে হয়েছে ‘বহিন’; মারাঠিতে ‘বহীণ’; পাঞ্জাবিতে ‘ভৈণ’; গুজরাটিতে ‘বেন’; সিন্ধিতে ‘ভেণ’। বয়সে বড়ো সহোদরাকে এপার বাংলায় বলে ‘দিদি’, ওপার বাংলায় বলে ‘আপা, আপু’। বোনের মেয়ে হলো ‘বোনঝি’, বোনের ছেলে হলো ‘বোনপো’। বোনের স্বামী হলো ‘বোনাই’ বা ভগিনীপতি। ‘বোন সতিন’ হলো সপত্নী ভগিনী।
 
পো: সংস্কৃত ‘পুত্র’ ও ‘পুত্রক’ থেকে আগত বাংলা ‘পুত’ ও ‘পুতা’ শব্দ এখন অপ্রচলিত। কিঞ্চিত চলিত আছে ‘পো’ শব্দ। এটি এসেছে সংস্কৃত ‘পোত’ শব্দ থেকে। গাছের চারা অর্থে ‘পুয়া’ বা ‘পোয়া’ শব্দ ‘পো’-এর সমার্থক। ভাইয়ের ছেলে ‘ভাইপো’, বোনের ছেলে ‘বোনপো’। ছেলে সন্তান অর্থে ‘পো’ শব্দটি মেদিনীপুরের দিকে চালু আছে।
 
ঝি: মধ্য বাংলা পর্যন্ত কন্যা সন্তান অর্থে ‘ঝি’ শব্দ চলিত ছিল। এটি এসেছিল সংস্কৃত শব্দ ‘দুহিতা’ থেকে। এখন শব্দটি ব্যবহৃত হয় বাড়ির দাসি বোঝাতে। শব্দটির একটু রেশ আছে ‘ঝিয়ারি’ (মধ্য বাংলা) ও ‘ঝিউরি’ শব্দে। দুটি শব্দই এসেছে সংস্কৃত আনুমানিক ‘দুহিতাবরী’ (মানে শ্রেষ্ঠ মেয়ে) থেকে। শব্দ দুটির অর্থ হচ্ছে বাড়ির কন্যা সন্তানেরা। উড়িষ্যায় ‘ঝিয়ারি’ বোঝায় বাড়ির ভাসুরের মেয়েকে। তাছাড়া, ভাইঝি, বোনঝি শব্দও চালু আছে।
 
মেয়ে: মেয়ে বাংলা শব্দ যার অর্থ স্ত্রী, স্ত্রীলোক, ঝি, বউ, গৃহিণী, গিন্নী, কন্যা, কিশোরী, নারী, অবলা, পাত্রী, বিয়ের কনে। মেয়ে শব্দটি এসেছে সংস্কৃত মাতৃকা (মানে ছোট্ট মা) শব্দ থেকে: সংস্কৃত. মাতৃকা > মাইয়া > মেয়ে। কোনও কোনও অঞ্চলে, যেখানে কন্যা সন্তান অর্থে ‘বিটি’ প্রচলিত, সেখানে কিন্তু ‘মায়্যা’ (মেয়ে) বোঝায় স্ত্রীকে।
 
মেয়ে থেকে মেয়েলি শব্দটি এসেছে যার অর্থ মেয়ের মতো, স্ত্রীজনোচিত, স্ত্রীসুলভ এবং মেয়েদের মধ্যে প্রচলিত কথা বা আচার। মেয়েলি দিয়ে যেসব শব্দ তৈরি হয়েছে: মেয়েলি গোছ, মেয়েলি ছড়া, মেয়েলি ঢং, মেয়েলিপনা, মেয়েলি বুদ্ধি, মেয়েলি ব্রত, মেয়েলি রূপকথা, মেয়েলি শ্লোক ইত্যাদি।
 
আইবুড়ো: বিয়ের আগের বিবাহযোগ্যা মেয়েকে বলে ‘আইবুড়ো মেয়ে’। এইখানে ‘আইবুড়ো’ বা ‘আইবড়ো’ শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তি বিচার করা যেতে পারে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে ‘আইবুড়ো’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অব্যূঢ়’ শব্দ থেকে যার অর্থ অবিবাহিত। কিন্তু সুকুমার সেন মনে করেন, কথ্য সংস্কৃতে অব্যূঢ় (মানে অবিবাহিত) শব্দের সঙ্গে ‘আইবুড়ো’র কোনও সম্পর্ক নেই। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘আয়ুবৃদ্ধি’ শব্দ থেকে।
 
ছেলে: ছেলে তদ্ভব বাংলা শব্দ যার অর্থ পুত্র, সন্তান, শিশু, বালক, ছাত্র, শিষ্য, বিবাহের পাত্র। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে: সংস্কৃত. ছল্লি (সন্তান) > ছাইলা > ছাল্যা, ছালিয়া, ছেল্যা, ছেল্যে > বাংলা. ছেলে। মধ্য বাংলায় ছাবাল, ছাওয়াল, ছবিল (সংস্কৃত) মানে ছবির মতো সুন্দর। খুব শিশু হলে ‘কচি ছেলে’। ‘ছেলে’র সঙ্গে সম্বন্ধ আছে ‘ছা’, ‘ছানা’ (যেমন, ‘কাকের ছা’, ‘পাখির ছানা’) শব্দের। ‘ছেলে’ সন্তান অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন, ‘বেটা ছেলে’, ‘মেয়ে ছেলে’।
 
‘ছেলে’ শব্দটির বিভিন্ন উপভাষায় বিভিন্ন নাম: যেমন, পো (মেদিনীপুর), ব্যাটা (মালদহ), বেটা (মানভূম), ছা (সিংহভূম), ছাওয়াল (খুলনা, যশোর), ব্যাটা ছৈল (বগুড়া), পোলা (ঢাকা, ফরিদপুর), পুত (ময়মনসিংহ), পুয়া (সিলেট), পুতো (মণিপুর), পোয়া (চট্টগ্রাম, চাকমা) এবং হুত (নোয়াখালী)।
 
সুকুমার সেনের মতে, পুত্র ও কন্যা অর্থে কোনও কোনও অঞ্চলে ‘বেটা’ ও ‘বেটি’ (বিটি) শব্দ চলিত আছে। ‘বেটা’ থেকে তৈরি স্ত্রীলিঙ্গ রূপ হলো ‘বেটি’। ‘বেটা’ এসেছে সংস্কৃত ‘বিষ্টি’ শব্দ থেকে, মানে বেগার খাটুনি। পুত্র পিতার কাজে সাহায্য করে কিন্তু সে কোনও পারিশ্রমিক পায় না। তাই ‘বেটা’কে বলা হতো বেগার শ্রমিক। এখন বাংলায় চলিত শব্দ হলো ‘ছেলে’।
 
‘পোলা’ তদ্ভব বাংলা শব্দ যার মানে ছেলে। পোলা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে: সংস্কৃত. পোত > প্রাকৃত. পোঅ > বাংলা. পোয়া, পো (পুত্র, ছেলে) > পো+ল (স্বার্থে) = পোলা (ছেলে, পুত্রসন্তান)। পোলা পূর্ববঙ্গীয় শব্দ। এর থেকে অন্য যেসব শব্দ তৈরি হয়েছে: ‘পোলাবধূ’ (পুত্রবধূ), ‘পোলাপান’ (শিশুগণ, বালকগণ), ‘পোলা যোগী’ (অল্পবয়স্ক যোগী)।
 
‘ছাওয়াল, ছাবাল’ দুটি শব্দের অর্থ একই। ছেলে, সন্তান, শিশু, অল্প বয়স্ক। ছাওয়াল শব্দের ‘ওয়া’ ছাবাল শব্দে ‘ব’ রূপ নিয়েছে। ওয়া বর্ণের উচ্চারিত রূপান্তরিত ‘ব’ বর্ণই হলো বাংলা বর্ণমালার অন্তস্থ ‘ব’। উদাহরণ হিসাবে সংস্কৃত গোয়াদি শব্দের বাংলা রূপ হলো গবাদি। গবাদি শব্দের ‘ব’ হলো অন্তস্থ ‘ব’। একই ভাবে নওয়াব শব্দের ওয়া বর্ণ নবাব শব্দে অন্তস্থ ব বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলা শব্দে যুক্ত বর্ণেও অন্তস্থ ব ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসাবে স্বামী শব্দের ‘স্ব’ যুক্ত বর্ণের ‘ব’ বর্ণটি অন্তস্থ ‘ব’ । স্বামী শব্দটি সংস্কৃত। এর উচ্চারিত রূপ সোয়ামি। একই ভাবে সংস্কৃত স্বদেশ শব্দের উচ্চারিত রূপ সোয়াদেশ। সোয়াদেশ শব্দের ‘ওয়া’ স্বদেশ শব্দে ‘স’ বর্ণের সাথে অন্তস্থ ‘ব’ বর্ণ হিসাবে যুক্ত হয়েছে।
 
 

error: Content is protected !!