বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক

বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক: ৩
বর: সংস্কৃত শব্দ (সং. √ বৃ + অ) যার মানে বিবাহের পাত্র (বরাসন, বরের টোপর); স্বামী, পতি (সখীর বর, ঘর বর, দোজবর)। একজন বর হলেন সেই পুরুষ যার শীঘ্রই বিয়ে হবে বা সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পরে বরকে ‘নতুন জামাই’ বলা হয়।
‘দোজবর’ মানে দ্বিতীয় বার বিবাহার্থী বা বিবাহিত পুরুষ। প্রাকৃত. দোজো + বাংলা. বর + ইয়া এ। ‘নিত-বর’ অর্থ বিবাহ কালে যে বালক বরের সহযাত্রী হয় – মিত্র বর > মিত বর > নিত বর।
 
কনে: তদ্ভব শব্দ এসেছে সংস্কৃত ‘কন্যা’ থেকে। কনে এর অর্থ বিবাহের পাত্রী; বিবাহযোগ্যা কন্যা (কনে দেখা); নববধূ (বরকনেকে নিয়ে সকলেই তখন মশগুল)। ‘কনে চন্দন’ মানে বিবাহের সময় কন্যার মুখমণ্ডল চন্দন দিয়ে চিত্রিত করা। ‘কনেবউ’ অর্থ নববধূ, বালিকাবধূ। কনে যাত্রী মানে বিবাহে কন্যাপক্ষের লোকজন, কন্যার সঙ্গে বিবাহ উৎসবে আগত লোকজন। ‘নিত-কনে’ এর অর্থ, বিবাহ কালে যে সখী বা ছোটো মেয়ে কনের সঙ্গে থাকে, মিতকনে (সংস্কৃত. মিত্রকন্যা > মিতকনে > নিতকনে)।
ভাতার-মাগ: এই বাংলা শব্দ দুটির অর্থ স্বামী-স্ত্রী। এরা এসেছে সংস্কৃত থেকে। ‘ভাতার’ মানে যে ভাত জোগায় অর্থাৎ স্বামী – ‘ভাতার’ শব্দটি সমাজের নীচু স্তরে প্রচলিত। ‘ভাতার’ এসেছে প্রাকৃত হয়ে, সংস্কৃত ‘ভর্তৃ’ শব্দ থেকে। ‘মাগ’ এসেছে ‘মাগি’, ‘মাগু’ (মধ্য বাংলা) এবং সংস্কৃত ‘মার্গিত’ (মানে প্রার্থিত) থেকে। ‘মাগ’ ও ‘মাগি’ একই শব্দ থেকে আগত হলেও শব্দ দুটির অর্থ আলাদা। ‘মাগ’ মানে স্ত্রী, ‘মাগি’ মানে স্ত্রীলোক (তুচ্ছার্থে)।
 
মাগি শব্দটি কোনও খারাপ শব্দ হিসেবে জন্ম নেয়নি। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সহ তখনকার অনেক নামি-দামি মানুষই এই শব্দটি তাদের কথাবার্তায় এবং সাহিত্যে ব্যবহার করতেন। রবীন্দ্রযুগ থেকে শব্দটি সাহিত্যে প্রায় অপ্রচলিত হয়ে যায়। রাজশেখর বসুর চলন্তিকায় শব্দটি অশিষ্ট, কিন্তু ‘মাগী’ বানানে। যদিও শব্দটি তদ্ভব যেকোনও ব্যুৎপত্তির দিক থেকে, আর তাই ই-কার ব্যবহার করাটাই বর্তমানের রীতি।
 
জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানে আছে: সংস্কৃত. মাতৃগাম > পালি. মাতুগাম > প্রাকৃত. মাউগ্গাম > বাংলা. মাউগ, মাগু এবং মাগী, মাগি। হরিচরণের মতে শব্দটি মাগ-এর সাথে ‘ই’ যোগে নিষ্পন্ন, মাগ এসেছে মাউগ বা মাগু থেকে, মৈথিলিতে মৌগী বা মাগু দুইয়েরই অর্থ নারী। সুকুমার সেনের ব্যুৎপত্তি-সিদ্ধার্থে শব্দটি মার্গিতা থেকে, যার অর্থ মাগিবার জিনিস।
 
১৯৭৫ পূর্ববর্তী অসংখ্য বাংলা চলচ্চিত্রে মাগি শব্দটি আদুরে ডাক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে! বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও কোনও কৃষক জমি থেকে ফিরে এসে উঠোনে বসে বউয়ের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়তেন, ‘আমার মাগি কোথায় রে?’ বলাই বাহুল্য, মাগি সম্বোধন তখন ছিল অত্যন্ত আদরের। এখনও কিছু কিছু অঞ্চলে মাগি বলতে নারী, মহিলা বা স্ত্রী লিঙ্গদের বোঝানো হয়। তবে বেশিরভাগ মানুষই এখন এই শব্দটির দ্বারা পতিতা বা গণিকাদের বুঝেন। তবে গুগল অভিধানের মতে, সেটা মাগি নয়, মাগী! কালে কালে মাগি-র কী হাল হয়ে গেলো। এটি এখন একটি গালি…।
 
ভাতার থেকে ‘বারোভাতার’ শব্দ এসেছে, যার মানে, যে মাগির বারো জন বা তারও বেশি অবৈধ বা বৈধ স্বামী আছে। অর্থাৎ বহুধবা বা বেশ্যা। আখতারুজ্জমান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে এবং হুমায়ূন আহমেদের ‘এলেবেলে’ বইয়েও এই শব্দটির ব্যবহার আছে।
বউ: বাপের বাড়ি থেকে বয়ে আনা হয়েছে বলেই নাম হয়েছে সংস্কৃতে ‘বধূ’ – তার থেকে বাংলায় ‘বউ’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বউ’-এর ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছেন: সংস্কৃত. ৱধূ > প্রাকৃত. ৱহূ, বহু > বাংলা. বা (বউ), বউ, বৌ। হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি এবং মৈথিলিতেও সংস্কৃত বধূ হয়েছে ‘ৱহূ’; ওড়িয়াতে হয়েছে ‘বোহ’, ‘বৌ’।
 
যে দু-চার দিন আগে কন্যা ছিল, এখন ‘বিয়েলি’, তাকে তার শ্বশুরবাড়িতে বলা হয় ‘কনে বউ’ (সংস্কৃত ‘কন্যাবধূ’ থেকে)। পুরুষের ছোটো ভাই-এর স্ত্রী হলো ‘ভাদ্দর বউ’ (সংস্কৃত ‘ভ্রাতৃবধূ’ থেকে)।
 
বউকে ‘ঘরনি’ এবং ‘গিন্নি’ নামেও অভিহিত করা হয়। ‘ঘর’ ইন্দো-ইরানীয় শব্দ যার ইন্দো-ইউরোপীয় মূল হলো ‘ঘোরো’। পরে শব্দটি সংস্কৃতে অনুপ্রবেশ করে। ‘ঘর’ শব্দটির প্রাচীনতম ব্যবহার দেখা যায় বৌদ্ধ সংস্কৃতে ‘ঘরণী’ শব্দে। এর থেকে সংস্কৃতায়ন রূপ হয়েছে ‘ঘরিণী’। তার থেকেই বাংলা শব্দ ‘ঘরনি’ এসেছে।
 
বাংলা অর্ধতৎসম ‘গিন্নি’ এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘গৃহিণী’ থেকে। সংস্কৃত. গৃহিণী > প্রাকৃত. গিহিণী > বাংলা. গিন্‌হী, গিন্নী, গিন্নি। ‘গিন্নিপনা’ মানে গৃহিণীর কাজ; ‘গিন্নি-বাড়নী, গিন্নিবান্নি’ অর্থ গৃহকর্ত্রী। ‘গিন্নি’ অর্থে ‘পরিবার’ শব্দটিও বাংলায় ব্যবহৃত হয়।
‘বউ’ থেকে বাংলায় অনেক শব্দ তৈরি হয়েছে। ‘বউকাঁটকি’ (যে শাশুড়ি পুত্রবধূকে নিরন্তর খোঁটা ও গঞ্জনা দেয়), ‘বউড়ি’ (অল্পবয়স্কা বধূ), ‘বউদি, বউদিদি’ (দাদার বউ), ‘বউভাত’ (হিন্দু বিবাহে বরের আত্মীয়-স্বজনের নববধূর দেওয়া অন্ন গ্রহণ রূপ অনুষ্ঠান), ‘বউমা’ (পুত্রবধূ বা তার তুল্য কোনও বধূ বা ছোটো ভাইয়ের বউ)।
নাইওর, নাইয়র, নায়র: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সম্ভবত সংস্কৃত ‘জ্ঞাতিগৃহ’ থেকে। এর মানে বিবাহিত নারীর স্বামীর গৃহ থেকে বাপের বাড়ি গমন। নাইওর বলতে গ্রাম বাংলার প্রচলিত নিয়মানুযায়ী বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে স্বীয় কন্যা অতিথি হয়ে আসাকে নাইওর বলে। ‘বিদায় হইয়া আমি যাইব নায়র’ – কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তুলনীয়, হিন্দি ‘নৈহর’ মানে স্ত্রীর মাতৃবংশ।
 
উত্তর ও পূর্ববঙ্গের স্বকীয় শব্দ ‘নাইয়র’। এসেছে সম্ভবত সংস্কৃত. মাতৃগৃহ > মাতৃঘর > মাইঅর > নাইঅর > নাইয়র। ‘নাইয়র করা’ (ক্রিয়াপদ) মানে বাপের বাড়িতে স্ত্রীলোকের কিছুদিনের জন্য অবস্থান করা। ‘নাইয়র যাওয়া’ (ক্রিয়াপদ) অর্থ বিবাহিতা নারীর পিতৃগৃহে গমন করা। ‘নায়রি’ শব্দের অর্থ কুটুম্বিনী; বিবাহাদিতে আগত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়াগণ।
 
ভাদর কাটানি উৎসবে গ্রামবাংলার নববধূরা তাদের স্বামীর বাড়ি থেকে ৩ দিনের জন্য বাবার বাড়িতে নাইওর যায়। এটাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ভাদর কাটানি। প্রচলিত রীতি ও জনশ্রুতি অনুযায়ী বিয়ের পরের প্রথম ভাদ্র মাসের প্রথম ৩ দিন নববধূ স্বামীর মুখ দর্শন করলে স্বামীর চোখ অন্ধ হয়ে যায় এবং স্বামীর অকল্যাণ হয়। এই জন্য ভাদ্র মাসে বিয়ে হয় না। তবে কবে থেকে কীভাবে এই প্রথার শুরু তার সঠিক তথ্য জানা যায় না।
 
জামাই: কন্যার স্বামী বা পতি হলো জামাতা বা ‘জামাই’। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে: সংস্কৃত. জামাতৃ, জামাতা > প্রাকৃত. জামাঊ > বাংলা. জামাই। হিন্দি ও গুজরাটিতে ‘জমাঈ’; মারাঠিতে জা(জাং)ৱই; মৈথিলিতে জমাঈ, জামায়; ওড়িয়াতে জুআঁই, জ্বাইঁ। পণের দাবিতে বধূ নির্যাতন ক্রমবর্ধমান হলেও বাঙালির জামাইরা যে জামাই-আদরে আছে তার প্রমাণ ‘জামাইষষ্ঠী’ (জৈষ্ঠ মাসের শুক্লষষ্ঠীতে হিন্দুদের জামাইবরণের অনুষ্ঠান) উৎসবের রমরমা। নাতনির স্বামী হলো ‘নাতজামাই’। যে ছেলে বিয়ের পরে শ্বশুড় বাড়িতেই ঘর-সংসার করে সে হলো ‘ঘরজামাই’।
 
সতিন: সেকালে ধনী সমাজে একাধিক পত্নী গ্রহণ চলত। স্বামীর অন্য পত্নীকে বলে ‘সতিন’। এসেছে সংস্কৃত সপত্নী থেকে। সংস্কৃত. সপত্নী > (স্বরাগমে) সপতিনী > সতিনী > সতিন > সৎ। হিন্দিতে ‘সৌতিন’। ‘সতিন-ঝি’ মানে সতিনের মেয়ে। ‘সতিন’ থেকে ‘সৎ’ এসেছে। যেমন সৎ-মা (সতিন মা), সৎ-ছেলে (সতিনের ছেলে), সৎ-বোন (সৎ-মায়ের মেয়ে), সৎ-ভাই (বৈমাত্রেয় ভাই, সৎ-মায়ের ছেলে), সৎ-মেয়ে (সতিনের মেয়ে), সৎ-শাশুড়ি (শাশুড়ির সতিন)।
 
বেয়াই: পুত্রের বা কন্যার শ্বশুরকে বলে ‘বেয়াই’। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বৈবাহিক’ থেকে: সংস্কৃত. বৈবাহিক > প্রাকৃত. বেআহিঅ > বাংলা. বেআহি, বেহাই, বেয়াই। ‘বেয়ান’ হলো পুত্র বা কন্যার শাশুড়ি্। বাংলা. বেহাই + ইনী > বেহাইনী > বেহাইন > বেয়ান। অনেক বাঙালি পুত্রের বা কন্যার শ্বশুরকে ‘বেয়াই মশাই’ও বলেন।
 
তালই: ভাই বা বোনের শ্বশুর। এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘তাত’ থেকে। বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিভিন্ন রকম উচ্চারণ: তালুই, তাউই (২৪ পরগণা), তাহই (মালদহ), তাঐ, তালৈ (ঢাকা), তালৈ (ত্রিপুরা), তালই (চট্টগ্রাম)।
 
শালা: স্ত্রীর ছোটো ভাই হলো ‘শালা’, স্ত্রীর বড়ো ভাই হলো ‘সম্বন্ধী’। ‘শালা’ শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত শ্যালক থেকে। সংস্কৃত. শ্যালক > প্রাকৃত. সালঅ > বাংলা. শালা। হিন্দি, পাঞ্জাবি, মারাঠিতে ‘সালা’; গুজরাটি ও সিন্ধিতে ‘সাল’; মৈথিলিতে ‘সার’। স্ত্রীর বড়ো ভাই ‘সম্বন্ধী’র পত্নী হচ্ছে ‘বউদি’ বা ‘ভাবি’। ‘শালা’র স্ত্রী হলো ‘শালাজ’, ‘শেলেজ’ (সংস্কৃত শ্যালক জায়া থেকে), ‘শালাবউ’।
 
স্ত্রীর ছোটো বোন হলো ‘শালি’ (সংস্কৃত ‘শ্যালিকা’ থেকে), বড়ো বোন হলো ‘জেঠাস’। ‘শালি’ ও ‘জেঠাস’-এর স্বামী হলো ‘ভায়রা ভাই’ (সংস্কৃত ভ্রাতৃবর ভ্রাতৃক থেকে)। কোনও কোনও অঞ্চলে সংক্ষেপে বলে ‘ভায়রা’।
 
এবার আসি শালার অন্য অর্থে! শালা দুই প্রকার। প্রথমটি, পূর্বে বর্ণিত, সংস্কৃত শ্যালক থেকে উদ্ভূত আত্মীয় ও গালি শালা। এই শালা সামনে পেছনে ডানে-বামে সব দিকে লাগতে পারে। এর অর্থ: স্ত্রীর ছোটো ভাই (শালা বলে দুলাভাই, টাকা দাও লাচ্ছি খাই), সম্বন্ধী; গালিবিশেষ (শালার শালা কত্তো বড়ো সাহস!)
 
দ্বিতীয়টি হাইফেন শালা (-শালা)। এই শালা সর্বদা পেছনে লাগে, কখনো সামনে লাগে না। হাইফেন শালা কারো পেছনে লাগলে সে আলয়, বাড়ি, কক্ষ, স্থান, ঘর, কারখানা, সঞ্চয় স্থান এবং ভাণ্ডার হয়ে যায়। যেমন: হাতিশালা, ঘোড়াশালা, পাঠশালা, কামারশালা, পণ্যশালা, লোহাশালা, চাকরশালা, গোশালা, বন্দিশালা (‘যতসব বন্দিশালা আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা’ – নজরুল)।
শালি: শালি তিন প্রকার! প্রথমটি সংস্কৃত ‘শ্যালিকা’ হতে আগত স্ত্রীর ছোটো বোন শালি। (আমার বাড়ি নোয়াখালী, ভাল্লাগে না বউ আমার, ভাল্লাগে শালি।) (শালিকারে শালিকা, নব্বই বছর বয়স তবু অষ্টাদশী বালিকা। গালি হিসেবেও শব্দটি ব্যবহৃত হয় (শালিরে ঠ্যাং ভেঙে ব্যাং করে দেব।)
 
দ্বিতীয়টি ধান্য শালি। যেমন: শালি ধান। এটি শালির ধান নয়। ধানটির নামই শালি। ধানটি হয়তো শালির মতো প্রিয় ছিল প্রভাবশালী কারো কাছে। তাই শালির নামে দিয়ে দিয়েছে ধানের নাম। পল্লিকবি শালি ধান নিয়ে লিখেছেন: ‘আমার বাড়ি যাইও ভোমর, / বসতে দেব পিঁড়ে, /জলপান যে করতে দেব /শালি ধানের চিঁড়ে। /শালি ধানের চিঁড়ে দেব, /বিন্নি ধানের খই, / বাড়ির গাছের সবরিকলা, / গামছা-বাঁধা দই।’
তৃতীয়টি হাইফেন-যুক্ত ঈ-কার শালী। এটি সমাসের উত্তর পদে যুক্ত হয়। যেমন: শক্তিশালী, বিত্তশালী, পরাক্রমশালী, ধনশালী, সম্পদশালী।
শ্বশুর-শাশুড়ি: স্বামী বা স্ত্রীর বাবা হলো শ্বশুর; শ্বশুরের স্ত্রী শাশুড়ি। শ্বশুর সংস্কৃত শব্দ, কিন্তু শাশুড়ি বাংলা শব্দ। সংস্কৃত শব্দ শ্বশুর থেকে ‘শাশুড়ি’ কীভাবে বাংলায় এসেছে তা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন: সংস্কৃত. শ্বশুর > শ্বশুরী > শ্বশুড়ী, শ্বাশুরী > শাশুরী, শ্বাশুড়ী, শাশুড়ি, শাসুর।
 
স্বামী অথবা স্ত্রীর পিসি হলো ‘পিস-শাশুড়ি’ (পিসি শাশুড়ি থেকে)। পিসির স্বামী হলো পিস-শ্বশুর (পিসা শ্বশুর থেকে)। স্বামী অথবা স্ত্রীর মাসি হলো ‘মাস-শাশুড়ি’ (মাসি শাশুড়ি থেকে)। মাসির স্বামী হলো মাস-শ্বশুর (মেসো শ্বশুর থেকে)। শ্বশুরের বা শাশুড়ির বাবা হলো ‘দাদাশ্বশুর’। শ্বশুরের মা হলো ‘দিদি শাশুড়ি’।
 
দেওর: স্বামীর ছোটো ভাইকে বলা হয় ‘দেওর’ বা ‘ঠাকুরপো’। সংস্কৃত. দেবৃ > দেবর > প্রাকৃত. দেঅর, দিঅর > বাংলা. ‘দেওর’। হিন্দিতে ‘দেউর’; মারাঠিতে ‘দীর’; গুজরাটিতে ‘ দিওর’, ‘দিবর’; মৈথিলিতে ‘দেওর’। ‘দেওর-ঝি’ মানে দেবরকন্যা। ‘দেওর-পো’ অর্থ দেবরপুত্র।
ননদ: স্বামীর ছোটো বোন হলো ‘ঠাকুর-ঝি’ বা ‘ননদ’, ‘ননদি’, ‘ননদিনি’। সংস্কৃত. নন্দা (ননন্দৃ) > প্রাকৃত. ণণংদা > বাংলা. ননদ। হিন্দিতে ‘ননংদ’, ‘ননদ’; মারাঠিতে ‘নণংদ’, ‘ননদ’। ‘ননদখেমি’, ‘ননদপুটুলি’ – বিবাহের সময় বধূ কর্তৃক ননদকে দেওয়া উপহার। স্বামীর বড়ো বোনকে বলা হয় ‘ননাস’।
 
ননদকে ‘নন্দা’ নামেও ডাকা হয়। ননদের এই নন্দা সম্বোধন থেকেই ননদের স্বামীকে ‘ননদাই’, ‘নন্দাই’ বলার প্রচলন। নন্দাইকে ‘ঠাকুর জামাই ‘ও বলা হয়। সুকুমার সেন মনে করেন, ননদাই (ননদের স্বামী) এসেছে ‘ননান্‌চু পতি’ থেকে।
ভাসুর: স্বামীর বড়ো ভাই ‘ভাসুর’ এসেছে সংস্কৃত ভ্রাতৃ-শ্বশুর থেকে। ভাসুরকে অনেকে ‘বড়োঠাকুর’ বলে ডাকে। ‘জা’ হলো ভাসুর ও দেবরের স্ত্রী। এসেছে সংস্কৃত ‘যাতৃ’ ধাতু থেকে। সংস্কৃত. যাতা > প্রাকৃত. জাউযা > বাংলা. জা। ‘ভাজ’, ‘ভাউজ’ এসেছে সংস্কৃত অসমাসবদ্ধ ‘ভ্রাতুঃ জায়া’ থেকে।
 
নাতি: পুত্রের পুত্র (সংস্কৃত. পৌত্র) অথবা কন্যার পুত্র হলো দৌহিত্র বা নাতি। নাতি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘নপ্তৃক’ (নপ্তৃ+ক) থেকে। সংস্কৃতে শব্দটির অর্থ ছিল পুত্র, পৌত্র, সন্তান, বংশধর। সংস্কৃতে পরে ‘পৌত্র’ শব্দ বেশি চল হয়েছিল। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাতি শব্দের ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছেন এইভাবে: সংস্কৃত. নপ্তৃক > প্রাকৃত. নওিঅ > বাংলা. নত্তি, নাতি। শব্দটির হিন্দি রূপ নাতী; মারাঠি রূপ নাতু; মৈথিলিতে নাঁতী।
 
নাতনি: পুত্রের অথবা কন্যার কন্যা হলো ‘নাতনী’ (মধ্য বাংলা)। বর্তমানে সবাই ‘নাতনি’ বানানই লেখেন। ‘নাতনী’ শব্দটির একটু ভিন্ন রূপও পাওয়া যায় ‘নাতিন’। নাতির স্ত্রীলিঙ্গ নাতনি বাংলা শব্দটি এসেছে আনুমানিক সংস্কৃত শব্দ ‘নপ্তৃণী’ থেকে। সমার্থক শব্দ হলো পুতি, পৌত্রী। নাতির স্ত্রী ‘নাতিবউ’, ‘নাতবউ’। নাতনির স্বামী ‘নাতি-জামাই’, ‘নাত-জামাই’।
 
পড়িনাতি: পৌত্রের পুত্র অর্থাৎ নাতি বা নাতনির ছেলে অর্থে ‘পড়িনাতি’ শব্দটি মধ্য বাংলায় পাওয়া যায়, যা এসেছে সংস্কৃত ‘প্রণপ্তৃ’ শব্দ থেকে। বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে নাতি-নাতনির সন্তান দেখে মরার সৌভাগ্য খুব কম লোকের ভাগ্যেই জোটে বলে সম্ভবত আধুনিক বাংলায় ওই রকম কোনো শব্দ গড়ে উঠেনি।
 
কুটুম: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত কুটুম্ব থেকে। মানে বৈবাহিক সম্বন্ধে আবদ্ধ ব্যক্তি (বাড়িতে কুটুম এসেছে)। নতুন কুটুম মানে সম্প্রতি যার সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপিত হয়েছে। বড়ো কুটুম অর্থ শ্যালক।
 
বিধবা: বিবাহিতা নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে বলা হয় ‘বিধবা’। আমরা স্কুলে পড়ার সময় শিখেছিলাম ‘বিধবা’ কথাটির ব্যুৎপত্তি এই – ‘বিগত ধবা যস্যা সা’ অর্থাৎ যার ধব (স্বামী) মারা গেছে। নীরদচন্দ্র চৌধুরী মনে করেন, ‘আসলে এটি সর্বৈব ভুল’। (তথ্যসূত্র: নীরদচন্দ্র চৌধুরী, আত্মঘাতী বাঙালী, মিত্র ও ঘোষ, ১৯৮৮)
 
সমস্ত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় বিগত-স্বামীর স্ত্রীকে এই শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। ইংরেজি ‘widow’ শব্দ যদি জার্মান নিয়মে উচ্চারণ করা যায় তাহলেও বুঝা যাবে যে শব্দটা ‘বিদভ’। পুরাতন ইংরেজিতে এর রূপ ‘widuwe’ – জার্মান ধরনে উচ্চারিত হবে ‘ভিডুভে’। এটি ল্যাটিন ভাষায় ‘vidua’, ইটালিয়ান ভাষায় ‘vedova’, স্লাভোনিক ভাষাগুলিতেও তাই। পুরাতন স্লাভোনিক ভাষায় বিধবা ‘vidova’, প্রকৃত প্রস্তাবে এই শব্দটি ইন্দো-ইউরোপীয় ধাতু ‘weidh’ থেকে এসেছে। এই ধাতুর অর্থ ‘বিচ্ছিন্ন করা’। সুতরাং বিধবা অর্থ – ‘যে নারী মৃত্যুর দ্বারা স্বামী হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে’ = ‘বিচ্ছিন্না’। সুতরাং সধবা (যার স্বামী জীবিত), বহুধবা (যাহার বহু স্বামী) শব্দগুলি ব্যুৎপত্তিগত ভাবে ভুল। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষে বিধবা শব্দটির উৎস নির্দেশ করেছেন ঋগ্বেদে।
 
এই বিধবা শব্দটির সঙ্গে বহু করুণ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এককালে ভারতে সতীদাহ প্রথা চালু ছিল। এই প্রথা অনুসারে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীকে বলপূর্বক এক চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো। অথচ বলা হতো যে, এটি নারীর স্বেচ্ছায় সহমরণ। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির দখল নিতেই তার আত্মীয়রা তার সদ্যবিধবা স্ত্রীকে জোর করে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারত। বিধবাকে জোর করে চিতায় তোলার সময় তার কান্নার আওয়াজকে চাপা দিতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ তোলা হতো, সে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলে তাকে পিটিয়ে চিতায় রাখা হতো। রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর এই নৃসংশ প্রথা আইন করে তুলে দেওয়া হয়।
 
সতীদাহ প্রথা রোধ হলেও স্বামীর মৃত্যুর পরে বিধবা নারীর শাখা-সিঁদুর-পলা-লোহা এবং রঙিন শাড়ি পরা বারণ। তাকে পরতে হয় সাদা থান। খুব ধীরে হলেও সেই প্রথা ফিকে হয়ে আসছে। এখন অনেক বিধবাই রঙিন শাড়ি পরছে।
 
সেকালে ভারতের হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ প্রথা চালু ছিল এবং বিধবা বিবাহ আইন সম্মত ছিল না। ১৮৫৬ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইনি স্বীকৃতি লাভ করে।
 
যমজ: সংস্কৃত শব্দ। একই সময়ে একই গর্ভ থেকে জাত দুটো সন্তানের যেকোনও একটিকে বলা হয় যমজ। একই সময়ে একই গর্ভ থেকে জাত তিনটি সন্তানকে বলে ‘ত্রিতয়’। একই সময়ে একই গর্ভ থেকে জাত চারটি সন্তানকে বলে ‘চতুষ্টয়’।
 
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

আমি শুবাচ থেকে বলছি

 
 
নৃপেন ভৌমিকের অন্যান্য লেখার সংযোগ নিচে দেওয়া হলো
বাঙালির মসলাপাতি. নৃপেন ভৌমিক
 

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

error: Content is protected !!