বাঙালির বাসনকোশন

  বাঙালির বাসনকোশন

নৃপেণ ভৌমিক (Nripen Bhaumik )

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বাঙালির বাসনকোশন ১
 
‘বাসন’ হলো রান্না খাওয়া ইত্যাদি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত পাত্র। ‘বাসন’ সংস্কৃত শব্দ কিন্তু বাংলার অনেক বাসনের নামই তদ্ভব শব্দ বা সাঁওতালি শব্দ।
খুব প্রাচীন কালে কাঠের জিনিসের ব্যবহার ছিল কেননা তখন লোকে ধাতুর ব্যবহার শেখেনি। মাটি, পাথর আর কাঠ – এই তিন ছিল প্রাচীন বঙ্গদেশের মানুষের বাসনকোশন বানানোর উপাদান। ধাতু ব্যবহারের পরেও অনেকদিন ধরে মাটি ও কাঠের বাসনের ব্যবহার চলে এসেছে। বর্তমান যুগেও কিছু কিছু মাটির ও কাঠের বাসন চালু আছে। সেকালে পাথরের বাসনের চল ছিল এবং এখনও কিছু আছে।
 
মাটি, পাথর, কাঠ ও ধাতুর তৈরি বাসন ছাড়াও বাঙালি প্রাচীন কালে ভাত খেত কলাপাতা, শালপাতা, কচুপাতা বা পদ্মপাতায়। এগুলিতে পরিবেশ দূষণ হতো না কারণ এইগুলি পচে মাটির সঙ্গে মিশে যেত। বর্তমানের প্লাস্টিক ও থার্মোকলের থালা, গ্লাস পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে।
 
যেসব ধাতু দিয়ে বাসন তৈরি হতো তারা হলো: তামা, লোহা, কাঁসা, পিতল। তামা দিয়ে দেবপূজার বাসন তৈরি হতো। অ্যালুমিনিয়াম ও স্টেনলেস স্টিল দিয়েই আধুনিক বাসনকোশন বেশি তৈরি হয়। ধাতু নির্মিত বাসনকে তৈজসপত্রও বলে।
 
১৩০৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বইয়ে রান্না ঘরে যেসব বাসনকোশন সর্বদা প্রয়োজন হয় তার একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। সেই তালিকায় দেখতে পাই ঝাঁটা, ধামা, চুপড়ি, শিল-নোড়া, বঁটি, ছুরি, হাঁড়ি, তন্দুর, চালুনি, ছাঁকনি, পাখা, বিড়া, হাতা, বেড়ি, খুন্তি, চিমটা, ঘুটনি, ঝাঁঝরি, তাওয়া, কড়াই, পিঁড়া, নুনপাত্র, তেলের বাটি, মসলার থালা, কাঠ কাটার জন্য কুড়াল ও দা, লেতা, গামছা, ঝাড়ন, লোহার শিক প্রভৃতি উপকরণের উপস্থিতি। আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িতে এখন এই সব অধিকাংশ বাসনই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
 
বাঙালির বাসনকোশন ২
 
বাসন তৈরির উপাদান:
মাটি: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ মৃত্তিকা থেকে। সংস্কৃত. মৃত্তিকা > প্রাকৃত. মট্টিআ > বাংলা. মাটি। মাটির তৈরি বাসনকে বলা হয় মেটে বাসন। পোড়া মাটির বাসন আজও ব্যবহৃত হয়। মানুষের ব্যবহার্য পোড়া মাটির তৈরি সকল রকমের দ্রব্য টেরাকোটা নামে পরিচিত। সেই অর্থে পোড়া মাটির বাসনকেও টেরাকোটা বলা হয়। টেরাকোটা একটি লাতিন শব্দ: ‘টেরা’ অর্থ মাটি, আর ‘কোটা’ অর্থ পোড়ানো। ঘুরন্ত চাকার উপর এঁটেল মাটির তাল থেকে মাটির বাসন যারা বানান তাদের বলা হয় ‘কুমোর’। তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘কুম্ভকার’ থেকে।
পাথর: এসেছে সংস্কৃত ‘প্রস্তর’ থেকে। প্রস্তর এসেছে √স্তৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ আচ্ছাদন। প্রস্তর ভেঙেই হয় পাথর। অনেক রকমের পাথর থেকে সেকালে বাঙালি বাসন বানাত। যেমন, গ্রানাইট, মারবেল ইত্যাদি।
 
কাঠ: এসেছে সংস্কৃত ‘কাষ্ঠ’ থেকে। প্রাচীন কালে পাথর বা ধাতুর অস্ত্র (বাইস) দিয়ে কুঁদে কুঁদে কাঠের বাসন বানানো হতো। কাঠ পাওয়া যেত গাছের গুঁড়ি থেকে।
 
বাঁশ: শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘বংশ’ শব্দ থেকে। অতি প্রাচীন কাল থেকে বাংলার অস্ট্রিক আদিবাসীরা বিভিন্ন গৃহস্থালির কাজে বাঁশ ব্যবহার করে আসছে। উদ্ভিজ্জ বাসন তার মধ্যে অন্যতম। বাঁশকে ফালি ফালি করে চিরে বাখারি বানিয়ে তা দিয়ে বিভিন্ন বাসনপত্র বানানো হতো, এখনও হয়। ‘বাখারি’ সাঁওতালি শব্দ।
 
বেত: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বেত্র’ থেকে। এককালে সুপ্রচলিত বেত গাছ আজ লুপ্তপ্রায়।
 
লোহা: খনিজ ধাতু। এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘লৌহ’ থেকে। স্টিল এসে বর্তমানে লোহাকে স্থানচ্যুত করেছে।
 
তামা: এসেছে সংস্কৃত ‘তাম্র’ থেকে। সাধারণত পূজার বাসন তৈরিতে তামা ব্যবহৃত হয়। তামার দাম বেশি বলে তামার সংকর কাঁসা ও পিতলও পূজার বাসন হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
 
কাঁসা: কাঁসা তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘কাংস্য’ থেকে। নির্দিষ্ট পরিমাণে তামা এবং টিন মিশিয়ে ৭০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গরম করে যে সংকর ধাতু তৈরি হয় তার নাম কাঁসা। এককালে জনপ্রিয় কাঁসা আজ অবলুপ্ত প্রায়।
 
পিতল: এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘পিত্তল’ থেকে। তামা ও দস্তার মিশ্রণে তৈরি সংকর ধাতু।
স্টেইনলেস স্টিল: লোহা ও কার্বনের সংকর যাতে মরচে ধরে না। দামেও সস্তা।
 
অ্যালুমিনিয়াম: হালকা এই ধাতুর তৈরি বাসন এখন খুব জনপ্রিয় হয়েছে। দামও কম। দেখতে রুপোর মতো বলে অনেকে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনকে সিলভার বাসনও বলেন।
 
কামার: এইসব ধাতুকে পিটিয়ে, ঢালাই করে বা ঝালাই করে বাসন তৈরি করা হয়। ধাতুকে হাপরে উত্তপ্ত করে পিটিয়ে যারা বাসন তৈরি করতেন তাদের বলা হয় ‘কামার’। কামার তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘কর্মকার’ শব্দ থেকে।
 
কাচ: বালি (কোয়ার্টজ), সোডিয়াম কার্বোনেট, ক্যালসিয়াম কার্বোনেট, বিভিন্ন ধরনের রঞ্জক পদার্থ নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে ট্যাংক ফারনেসে ১০-১২ ঘণ্টা প্রায় ১৪০০°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে গলানো হয়। ট্যাংক থেকে গলিত কাচকে বিভিন্ন ছাঁচে ঢেলে প্রয়োজনীয় আকৃতি প্রদান করা হয়। আকৃতি দানের পর গলিত কাচ সামগ্রীকে একটি বিশেষ তাপমাত্রায় (কোমলায়ন তাপমাত্রা) দীর্ঘক্ষণ রেখে ধীরে ধীরে শীতল করলে স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও সুষম ঘনত্বের কাচ সামগ্রী পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিকে অ্যানিলিং বা পাইন দেয়া বলে। অ্যানেলিং করার পর কাচ সামগ্রী ঘষে পরিষ্কার ও পালিশ করে বাজারজাত করা হয়।
 
পোর্সেলিন: পোর্সেলিন শব্দটি ইতালীয় শব্দ ‘porcellana’ থেকে এসেছে। porcellana এক ধরনের ঝিনুকের নাম। সেই ঝিনুকের খোলার বাইরের ঔজ্জ্বল্যের কারণে ফরাসি হয়ে ইংরেজিতে শব্দটি চীনামাটি বা পোর্সেলিনের জিনিসের নাম হিসাবে এসেছে। চীনামাটি বা পোর্সেলিন হলো ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত এক ধরনের কাদা মাটি যা দিয়ে বাসনপত্র তৈরি করা হয়। চীনামাটির বাসন তৈরির শিল্পকে সিরামিক শিল্প বলা হয়। চীনামাটির বাসন, পোর্সেলিনের বাসন আর সিরামিকের বাসন সমার্থক।
 
মেলামাইন: মেলামাইন এক প্রকার পলিমার। এর রাসায়নিক নাম পলি অ্যামাইড ক্রসলিংক থার্মোসেটিং। ইউরিয়া বা কার্বামাইডকে প্রভাবকের উপস্থিতিতে উত্তপ্ত করে মেলামাইন তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে TiO2 ব্যবহার করা হয়। গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত কাপ, প্লেট, বাটিসহ অন্যান্য বাসন তৈরি করতে মেলামাইন ব্যবহার করা হয়। আগুনরোধী কাপড় তৈরিতে মেলামাইন ব্যবহার করা হয়।
 
বাঙালির আসবাবপত্র, নৃপেণ ভৌমিক 
বাঙালির বাসনকোশন, নৃপেণ ভৌমিক

বাঙালির বাসনকোশন ৩

 
গৃহস্থালির বাসন:
ভাঁড়: সেকালে সংসারের ব্যবহার্য বস্তু সাধারণত থাকত মাটির ছোটো-বড়ো ভাঁড়ে। ‘ভাঁড়’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ভাণ্ড’ থেকে। যেমন ভাঁড়ের চা, এক ভাঁড় দই। ভাঁড়ে মুখ থাকে।
মুখ না থাকলে বলত ‘কুণ্ড’ বা ‘কুণ্ডিকা’। ‘কুণ্ড’ বা ‘কুণ্ডিকা’ থেকেই বংলায় ‘হাঁড়িকুঁড়ি’ শব্দের ‘কুঁড়ি’ এসেছে। ‘কুঁড়ি’ হলো পান্তি বা ‘মালসি’র প্রতিশব্দ। ক্ষুদিরাম দাসের মতে, ‘হাঁড়ি কুঁড়ি’ সাঁওতালি শব্দ।
 
আবার ফিরে আসি ‘ভাঁড়’-এর মূল সংস্কৃত শব্দ ‘ভাণ্ড’-এ। ‘ভাণ্ড’ শব্দটি সংস্কৃতে সংসারের সঞ্চিত দ্রব্য এবং ধনী ব্যক্তির আস্থাবর সম্পত্তি বোঝাত। রাজার ধনাগার, গৃহস্থের রসদের ঘর বোঝাত ‘ভাণ্ডাগার’ শব্দ। এর থেকে এসেছে ‘ভাঁড়ার’, ‘ভাঁড়ার ঘর’। এই ঘরের যে তদারকি করে সে ‘ভাঁড়ারি’ (সংস্কৃত ‘ভাণ্ডাগারিক’)। এখন ‘ভাঁড়ার’ শব্দ প্রায়শই সংসারের প্রয়োজনীয় দ্রব্যকে বোঝায়।
 
খুরি: ‘খুরি’ শব্দটি বাংলায় এসেছে দ্রাবিড় ভাষা থেকে। মাটির তৈরি ছোটো ভাঁড়কে ‘খুরি’ বলা হয়। যেমন, খুরিতে করে চা খাই।
টাটি: ‘টাটি’ দেশি শব্দ। মাটির ছোটো খুরি বা ভাঁড়-কে টাটি বলা হয়।
 
হাঁড়ি: ‘হাঁড়ি কুঁড়ি’র হাঁড়ি শব্দটি বাংলায় এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুকুমার সেনের মতে, বাংলা ‘হাঁড়ি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ভাণ্ড’+ইক/ইকা থেকে। সংসদ বাংলা অভিধানে শব্দটির উৎপত্তি নির্দেশ করা হয়েছে সংস্কৃত ‘হণ্ডী’ শব্দ থেকে। ‘হাঁড়ি’ শব্দটির অর্থ রান্নার জন্য ছোটো জালার মতো মুখ চওড়া মাটির পাত্র। শব্দটি হিন্দিতে হয়েছে ‘হংডী’, ‘হাডী’; পাঞ্জাবিতে ‘হাংডী; মারাঠিতে ‘হংডী’, ‘হাংডী’; গুজরাটিতে ‘হাংডী’; ওড়িয়ায় ‘হাংডী’; সিন্ধিতে ‘হংডী’।
 
‘হাঁড়ি’ থেকে এসেছে ‘হাঁড়িকুঁড়ি’, ‘হাঁড়িচাচা’ (হাঁড়ির তলানি চাঁচার শব্দের মতো কর্কশ শব্দে ডাকে যে পাখি), হাঁড়িয়া ইত্যাদি। সাঁওতালি মানুষরা খায় এমন ‘হাঁড়ি’তে তৈরি চাল-চোঁয়ানো মদের নাম হাঁড়িয়া।
 
সেকালের বাঙালি রান্না করত মাটির হাঁড়িতে। এখন করে ধাতুর হাঁড়িতে। হাঁড়ির তিনটি অংশ: অর্ধগোলাকৃতি নিম্নভাগ, মাঝে হেলানো কাঁধ আর মুখে উলটানো কানা। অরুণ নাগের ‘চিত্রিত পদ্মে’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারি যে, হাঁড়ির আদিরূপ থেকে বর্তমান রূপে বিবর্তনের তিনটি স্তর। অর্থাৎ প্রথমে রান্না হয়েছে কড়াইয়ে, তারপর তাপের অপচয় কমাতে যুক্ত হয়েছে কাঁধ, এবং সব শেষে তোলা-নামানো বিশেষত ফেন গালার অসুবিধা দূর করতে যোগ হয়েছে উলটানো কানা। ভারতের যেসব অঞ্চলে ফেন গালা হয় না, সেখানে হাঁড়ির আকারও ভিন্ন।
 
‘হাঁড়ি’ আর ‘ভাঁড়’-এর মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য আছে। হাঁড়ি সাধারণত রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয় আর ভাঁড় গৃহস্থের কাছে কখনওই রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয় না। ভাঁড় ছোটো, হাঁড়ি বড়ো। হাঁড়িতে শুধু সিদ্ধ করার কাজই চলে। শুধুমাত্র ধান বা চাল সিদ্ধ করা নয়, সেকালে হাঁড়ি ব্যবহৃত হতো তেল দিয়ে রান্না করার জন্যও। মধ্য বাংলায় এমন হাঁড়ির নাম ছিল ‘তেলানি’। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘তৈলপাচনিক’ (মানে তেল দিয়ে রান্না থেকে)। বাঙালি এখন তাকে বলে ‘তোলা হাঁড়ি’ (তেলো থেকে)। এই হাঁড়ির তলা বেশ শক্তপোক্ত এবং পুরু। পশ্চিমবঙ্গে এই রকম হাঁড়ির নামান্তর ‘তিজেল’ (tigella)। এই শব্দটি এসেছে পোর্তুগিজ ভাষা থেকে।
 
‘হাঁড়ি’ দিয়ে একটি পিঠার নামও আছে। হাঁড়িতে ফুটন্ত ভাত কিংবা ফুটন্ত জলের উপরে ন্যাকরায় বেঁধে চালের গুঁড়োর পিঠা সিদ্ধ করলে তাকে কোনও কোনও অঞ্চলে বলে ‘হাঁড়বড়া’ অর্থাৎ ‘হাঁড়ি-বড়া’।
 
বাঙালি এখন আর মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করে না। তার জায়গায় এসেছে অ্যালুমিনিয়ামের বা স্টিলের হাঁড়ি। অ্যালুমিনিয়াম হাঁড়িতেই বাঙালি এখন ধান সিদ্ধ করে। আজকাল অনেক বাড়িতেই ‘নন স্টিক প্যান’ ব্যবহৃত হয়। ‘প্রেসার কুকার’ও আজকাল ঘরে ঘরে সিদ্ধ করা ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়।
 
সেকালে রান্নাঘরের এক কোণে একটি ছোটো মাটির তৈরি বেদি বানানো থাকত। এখান থেকে ভাতের ফেন গালা হতো। এটাকে রাঢ় বাংলায় বলা হতো ‘পুরা’। আবার ময়মনসিংহ অঞ্চলে বলা হতো ‘ঠনা’। আবার ফরিদপুরে এই বস্তুটিকেই বলা হতো – ‘পৈথলা’ , আবার কোথাও কোথাও ‘পৈঠা’ ও বলা হতো।
 
পাতিল: আদি বাংলায় ছোটো হাঁড়িকে বলা হতো ‘পাতিল’। অল্প পরিমাণ চাল সিদ্ধ করার জন্য পাতিল ব্যবহার করা হয়। পাতিল দেশি শব্দ। যেমন, হাঁড়ি-পাতিল। পাতিল হাঁড়ির চেয়ে ছোটো কিন্তু ভাঁড়ের চেয়ে বড়ো।
 
ডেকচি, ডেগচি: ধাতু নির্মিত বড়ো হাঁড়িকে বলে ‘ডেগ’। এসেছে ফারসি ‘দেগ্‌’ থেকে। ‘ডেকচি, ডেগচি’ হলো ছোটো হাঁড়ি। শব্দটি তৈরি হয়েছে ফারসি. ‘দেগ্‌’ + তুরকি. ‘চি’-এর জোড়কলমে।
 
বেড়ি: হাঁড়ির কানা বেষ্টন করে ধরার ধাতুর নির্মিত যন্ত্রবিশেষ (হাতাবেড়ি)। [বাংলা. বেড়া + ই]।
 
সরা: পোড়া মাটির তৈরি অগভীর পাত্র বা হাঁড়ি-কলসির ঢাকনা। এসেছে সংস্কৃত. ‘শরাব, সরাব’ থেকে। ‘ধরাকে সরা জ্ঞান করা’ মানে অহংকারী। ‘ধরা’ মানে ‘পৃথিবী’। ‘সরা’ মানে মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিলের ‘ঢাকনা’। আর ‘ঢাকনা’ মাটির তৈরি হওয়ায় তা কম দামি জিনিস। তাই, এখানে সরার ঢাকনার অর্থ হবে – ‘তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য’ অর্থে। অতএব, সম্পূর্ণ কথার মানে দাঁড়াবে – পৃথিবীকে ছোটো সরার মতো মনে করা বা অহংকারে অন্ধ হয়ে সব কিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।
 
 
 
 
বাঙালির বাসনকোশন ৪
 
কড়াই: কড়া বা কড়াই বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘কটাহ’ থেকে। সংস্কৃত. কটাহ > প্রাকৃত. কডাহ > বাংলা. কড়াহ, কড়া, কড়াই। কড়াই তৈরি হয় পোড়া মাটি, লোহা, তামা, পিতল, অ্যালুমিনিয়াম এবং স্টিল দিয়ে। কড়াই হলো দুটি আংটাওয়ালা রান্নার পাত্র। অনেক কড়াইয়ে আংটা থাকে না। সাধারণত তেল গরম করে যেসব রান্না হয় তাতে কড়াই ব্যবহৃত হয়। দুধ জ্বাল দেওয়ার জন্য এবং মিষ্টি তৈরির জন্যও কড়াই ব্যবহার করা হয়। যদিও এখন কড়াই-এর জায়গায় স্মার্ট নন- স্টিক প্যান এসে তাকে হটিয়ে দেবার চেষ্টায় আছে। তবে এখনও সেই দুই ধারে আংটা দেওয়া পেটাই অথবা ঢালাই লোহার পাত্রটির বহুল ব্যবহার বজায় আছে।
 
হাতা: হাতা তৈরি হয় কাঠ, লোহা, পিতল, কাঁসা, অ্যালুমিনিয়াম বা স্টিল দিয়ে। হাতা হলো লম্বা ডাঁটের সঙ্গে যুক্ত ছোটো বাটি। ‘হাতা’ শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘হস্তক’ থেকে যার মানে হাতের মতো। সংস্কৃত. হস্তক > প্রাকৃত. হথ্থঅ > বাংলা. হথ্থা, হাথা, হাতা। পিতলের বড়ো হাতাকে বলা হয় ‘ডাবু’। ডাবু দেশি শব্দ।
 
খুন্তি: হলো লম্বা হাতলের মাথায় চওড়া ফলকযুক্ত ভাজাভুজির জন্য ব্যবহার্য রান্নার বাসন। শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘খনত্রিক’ থেকে যার মানে চাঁচবার ফলক। খুন্তি কাঠের হয়, লোহার হয়, পিতল কাঁসার হয় এবং স্টিলেরও হয়। একই অর্থে হিন্দিতে ‘খংতি’; অসমিয়াতে ‘খন্তি’ শব্দ দুটি চালু আছে।
 
ঘুঁট্‌নি, ঘুট্‌নি, ঘুটুনি: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘ঘট্ট’ থেকে। সংস্কৃত. ঘট্ট > ঘুঁট্‌ + নি। সিদ্ধ ডাল ভাঙার জন্য মন্থন করার বা ঘোঁটার দণ্ড (ডাল-ঘুঁটনি)। আগে ডাল সিদ্ধ হওয়ার পরে তা যা দিয়ে ঘোঁটা হয় তাকে কোথাও বলে ডাল ঘুঁটনি , কোথাও বলে ডালের কাঁটা । কিন্তু চট্টগ্রামের এই বস্তুটিকেই বলে ‘তালাশি’।
 
ঝাঁঝরি: ‘ঝাঁঝরি’ বা ‘ছানতা’ হলো বহু ছিদ্রযুক্ত হাতা। গরম তেলের কড়াই থেকে ভাজা খাদ্যবস্তু ছেঁকে তোলার বাসন। ঝাঁঝরি এসেছে সংস্কৃত. ‘জর্জরীক’ শব্দ থেকে, হিন্দি ‘ঝাঁঝর’ হয়ে। ছানতা এসেছে সম্ভবত হিন্দি ‘ছন্না’ থেকে।
 
চিমটা: দেশি শব্দ – তুলনীয় হিন্দি. চিম্‌টা। এর অর্থ জ্বলন্ত কয়লা কাঠ ইত্যাদি বা তপ্ত কোনো কিছু ধরার জন্য লোহার তৈরি যন্ত্র।
সাঁড়াশি: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘সন্দংশিকা’ থেকে। এর অর্থ – এঁটে ধরার জন্য চিমটা জাতীয় লৌহনির্মিত যন্ত্র। গরম কড়াই, তাওয়া ইত্যাদি উনুন থেকে নামানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
 
কাঁচি: তুর্কি ‘কইনচি’ থেকে বাংলায় এসেছে। বাংলায় এসে ধ্বনির পরিবর্তন ঘটেছে, অর্থ একই আছে।
 
থালা: হলো খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত গোলাকার কানা-উঁচু চ্যাপটা পাত্র। শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত ‘স্থালী, স্থালিক’ থেকে। গোড়ায় মানে ছিল মাটির পাত্র। কিছুদিন আগেও কাঁসা-পিতলের থালার চল ছিল, বর্তমানে নেই বললেই চলে। পুজোয় বা ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের জন্য কিছু কিছু কাঁসার বাসন এখনও পাওয়া যায়। কাঁসা-পিতলের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় কাঁসা-পিতলের বাসন আজকাল লুপ্তপ্রায়। সেই জায়গা দখল করেছে অপেক্ষাকৃত সস্তা স্টিলের থালা। বর্তমানে বাঙালি খায় কাচের থালা, স্টিলের থালা, মেলামাইনের থালায়।
 
প্লেট: ইংরেজি শব্দ। লাতিন plata বা গ্রিক platus থেকে ইংরেজিতে এসেছে plate শব্দটি, যার অর্থ ছোটো থালা বা ডিস। ইংরেজি plateau এবং platform শব্দও একই উৎস থেকে এসেছে।
 
রেকাব, রেকাবি: ক্ষুদ্র থালা, ডিস। এসেছে ফারসি শব্দ ‘রকাবি’ থেকে। জলখাবার খেতে ব্যবহার হয়।
 

প্রয়োজনীয় কিছু লিংক

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি
শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

পরবর্তী পৃষ্ঠায়:  বাঙালির বাসনকোসন ৫ থেকে ৮ পর্ব

error: Content is protected !!