বাঙালির মসলাপাতি

নৃপেন ভৌমিক

বাঙালির মসলাপাতি

এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/বাঙালির-মসলাপাতি/

বাঙালির মসলাপাতি ১
মসলা
 
‘মসলা’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘মশালহ্‌’ থেকে। খাদ্যবস্তুকে সুস্বাদু ও সুগন্ধি করার জন্য রান্নার সময় ব্যবহার্য যে কোনও উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের অংশ যেমন ফুল, ফল, বীজ, কুঁড়ি, পাতা, বাকল, মূল (কন্দ) ইত্যাদি উপাদানকে বলা হয় মসলা। বিভিন্ন রকম ওষধিও (যে গাছ ফুল দেওয়ার পরে মরে যায়) খাদ্যের স্বাদ-গন্ধ বাড়াতে এবং থালায় খাদ্য সাজাতে ব্যবহৃত হয় যেমন পায়েস পাতা, ধনে পাতা, কুলেখাড়া ইত্যাদি।
মসলা মিষ্টি, টক, ঝাল, তেতো, অম্ল, লবণাক্ত ইত্যাদি নানা ধরনের স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণ নিয়ে আসে খাবারে। মসলার প্রাধান্য থাকায় সারা বিশ্বেই ভারতীয় রান্নার একটি আলাদা পরিচিতি রয়েছে। মসলা শুধু খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনে সাহায্যও করে। এইগুলি স্বাদ এবং পুষ্টি দুটিই বৃদ্ধি করে কোনও রকম ক্যালরি বা ফ্যাট বাড়ানো ছাড়াই।
 
যেসব শস্যের বীজ বাঙালি প্রাচীন কাল থেকে মসলা হিসাবে ব্যবহার করে আসছে তারা হলো: কালো জিরা, সাদা জিরা, ধনে, সরিষা, মেথি, মৌরি, রাঁধুনি, এলাচ, জোয়ান ইত্যাদি। যেসব ফুলকে মসলা হিসাবে ব্যবহার করা হয় তাদের দুটি হলো: লবঙ্গ, জয়ত্রী। গাছের পাতা হলো তেজপাতা। গাছের ছাল হলো দারচিনি। কন্দ হলো আদা, পিঁয়াজ, রসুন, হলুদ। জাফরান হলো ফুলের শুষ্ক কেশর। লংকা, গোলমরিচ হলো গাছের শুষ্ক ফল।
 
বাঙালির রান্নায় মসলার কোনও বিকল্প নেই। বাঙালির মতোই অন্যান্য ভারতীয়ও ঝাল-মসলা প্রধান রান্না করে থাকে। প্রাচীন কাল থেকেই তারা রান্নায় নানা ধরনের মসলা ব্যবহার করে আসছে। একই সাথে রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে মসলার বিকল্প নেই।
খ্রিষ্ট জন্মের পূর্বে মসলা পাশ্চাত্যে প্রসাধনী হিসাবে ব্যবহৃত হতো; প্রাচ্যে ভেষজ হিসাবে ব্যবহৃত হতো। মসলার খোঁজে যুগে যুগে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। মসলার জন্য প্রথম যুদ্ধ হয় ভারতবর্ষে। পোর্তুগিজদের সাথে কালিকটের রাজার মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই মসলার খোঁজেই পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা একদিন জাহাজ ভেড়ান কেরল উপকূলে। তার আগে আরব বণিকদের একচেটিয়া ছিল মসলার ব্যবসা। প্রথমে পোর্তুগিজ, তার পরে ডাচ এবং সর্ব শেষে ইংরেজ বণিকরা প্রাচ্যের মসলার বাজার দখল করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পোর্তুগিজ আমলে মসলার মূল্য স্বর্ণ বা যে কোনও মূল্যবান পাথরের চেয়েও বেশি ছিল।
 
মসলার সাথে ভারতের ইতিহাস ও ধর্ম দুটিই সম্পৃক্ত। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের রান্নাতে সুদূর অতীত থেকে মসলা ব্যবহার করে আসা হচ্ছে। প্রতিটি মসলারই আছে কিছু না কিছু ভেষজ গুণ। যে যুগে এই সব জিনিসের গুণাগুণ লেখা হয়েছিল সে-কালে তো মসলার ব্যবহার ছিল না। মসলা বাঙালির হেঁশেলে ঢুকেছে মুসলমান শাসন আমল থেকে।
 
আলোচনার সুবিধার্থে রান্নার যাবতীয় মসলাকে মোটামুটি নয় রকম দলে ভাগ করা যায়: শস্যজ মসলা, পুষ্পজ মসলা, বল্কলজ মসলা, ফলজ মসলা, কন্দজ মসলা, বৃক্ষরসজ মসলা, পত্রজ মসলা, লতাজ মসলা এবং মিশ্র মসলা। পরবর্তী যযাতিতে বাঙালির রান্নায় ব্যবহৃত কিছু মসলার নাম, নামের ব্যুৎপত্তি ও তাদের গুণাগুণ বর্ণনা করা হবে।
 
 
 
 
বাঙালির মসলাপাতি ২
শস্যজ মসলা
 
সরিষা: সরিষা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘সর্ষপ’ শব্দ থেকে। সংস্কৃত. সর্ষপ > প্রাকৃত. সরিসৱ > বাংলা. সরিষা, সরষে। সরিষা দুই রকমের: সাদা সরিষা এবং কালো সরিষা। সাদা সরিষা বাঙালির রান্নায় ব্যবহার করা হলেও কালো সরিষাই অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। ‘রাই’-ও এক ধরনের সরিষা যা এসেছে সংস্কৃত ‘রাজিকা’ থেকে। ফোড়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মসলা হলো সরিষা। বিভিন্ন ধরনের মাছ রান্নায় ও সবজি রান্নার জন্য সরিষা লাগে। সরিষা বাটাও রান্নায় ব্যবহার করা হয়। কাসুন্দির মূল উপাদান সরিষা। রাইয়ের গুঁড়া জলের সাথে মেশালে ঝাল হয়। সালাদ সাজাতেও রাই ব্যবহার করা হয়। সরিষা গাছের কচি পাতা শাক হিসাবে খাওয়া হয়।
 
ধনে: ধনে এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘ধন্যাক’ থেকে। ধনে হলো বর্ষজীবী ক্ষুদ্র শাখা যুক্ত গুল্ম জাতীয় গাছের বীজ। আহার্য ও ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা হয় এর পাতা ও বীজ। এর বীজ সুগন্ধি মসলা হিসাবে আমিষ ও নিরামিষ, দুই রকম রান্নাতেই ব্যবহার করা হয়। গোটা ও গুঁড়া দুই-ই মসলা হিসাবে কাজে লাগে। ধনে পাতা বিভিন্ন তরকারি, চাটনি ও সুপে ব্যবহৃত হয়। ধনে-র অনেক ভেষজ গুণ আছে।
 
জিরা: জিরা এসেছে সংস্কৃত ‘জীরক’ থেকে যার মানে যে জীর্ণ করে। এই মসলা বহিরাগত, আদি নিবাস মিশর। বহিরাগত হলেও খ্রিষ্ট-পূর্ব তিন শত বছর ধরে এই দেশে জিরার ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায় চরক, সুশ্রুত ও কৌটিল্যে। ভারতের উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে বেশি জন্মে। দুই তিন ফুট উঁচু বহু শাখা বিশিষ্ট গুল্ম জাতীয় গাছ। ফুল ও ফল শীতের শেষে হয়। এর বীজ মসলা এবং ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
 
বাঙালির রান্নায় জিরার ব্যবহার বহু কালের। মঙ্গলকাব্যে বর্ণিত আমিষ ও নিরামিষ রান্নায় ‘জিরা বাটা’-র বহু উল্লেখ আছে। বাঙালির হেঁশেলে একে ‘সাদা জিরা’ বলা হয়। আয়ুর্বেদে একে কৃমি নাশক, মূত্র বর্ধক ও অজীর্ণতা নাশক বলা হয়েছে।
 
আর এক রকমের জিরা আছে যাকে বাংলায় ‘সা-জিরা’ বলে। এটি কাশ্মীরে দশ-বারো হাজার ফুটের উচ্চতায় স্বাভাবিক ভাবে যেমন জন্মে তেমন এটির চাষও করা হয়ে থাকে।
 
কালো জিরা: কালো জিরা একটি মাঝারি আকৃতির মৌসুমি গাছ, একবার ফুল ও ফল হয়ে গাছ মরে যায়। ফলটি হয় গোলাকার এবং প্রতিটি ফলে ২০-২৫টি তেকোনা আকৃতির কালো রঙের বীজ থাকে। হিন্দিতে বলে কলৌঞ্জি, মুগ্রেলা। কালো জিরাও বহিরাগত, দক্ষিণ ইউরোপ থেকে এদেশে এসেছে। তরকারিতে বিভিন্ন ধরনের ফোড়ন দিতে কালো জিরা বাঙালির রান্নায় ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হয়। পাঁচফোড়নের একটি মসলা এই কালো জিরা।
 
মেথি: মেথি এসেছে সংস্কৃত ‘মেথিকা’ শব্দ থেকে। এক-দেড় ফুট লম্বা বহু ক্ষুদ্র শাখা বিশিষ্ট গুল্ম জাতীয় ছোটো গাছ। গাছের বীজ তীব্র-গন্ধী ও তেতো স্বাদের। ফোড়নের মসলা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। পাঁচফোড়নের একটি মসলা মেথি। চরকসংহিতা ও সুশ্রুতসংহিতায় মেথির কোনও উল্লেখ নেই। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে এটির আদি জন্মস্থান দক্ষিণ ইউরোপ। ওখান থেকে এটি কবে ভারতে এল তা জানা যায় না। মেথির অনেক ভেষজ গুণ আছে। মেথি শাক বাঙালির খুব প্রিয় শাক।
 
মৌরি: মৌরি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত মধুরী থেকে। সংস্কৃত. মধুরী> প্রাকৃত. মহুরী> বাংলা. মহুরী, মউরী, মৌরী, মৌরি। মৌরির অপর নাম ‘শালেয়’ শব্দটিকে পাই চরকসংহিতায়। ওখানে বলা হয়েছে – জোয়ান, ভাজা জোয়ান ও মৌরি অত্যন্ত হৃদ্য, রুচি-কারক এবং হৃদ্‌-বান্ধব।
মৌরি গাছ গুল্ম জাতীয় বর্ষ জীবী উদ্ভিদ। দেখতে হুবহু শুলফা গাছের মতো। এই গাছের ফুল দেখতে ছাতার মতো, পুষ্প দণ্ড ফাঁপা। এর বীজই মৌরি যা মসলা এবং মুখশুদ্ধি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। স্বাদে মিষ্টি। মৌরি পাঁচফোড়নের একটি মসলা। বিভিন্ন রান্নায় ফোড়ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়। মৌরি পানের মসলাও বটে। মৌরি গাছের কচি শাক অনেকে খেয়ে থাকেন।
 
রাঁধুনি: রাঁধুনি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘রন্ধনিকা’ থেকে। বাংলায় রাঁধুনি নামে পরিচিত এই উদ্ভিদটি সংস্কৃতে ‘আজমোদিকা’ এবং হিন্দিতে ‘চান্দেরি’ নামে পরিচিত। এর ক্ষুদ্র শুকনো সুগন্ধি ফল দেখতে জোয়ান, পাথুরি ও সা-জিরা বীজের মতো। রাঁধুনি পাঁচফোড়নের একটি মসলা। রাঁধুনি খুবই ঝাঁঝালো একটি মসলা। দুই চিমটি রাঁধুনি দিলেই তরকারির গন্ধ সম্পূর্ণ বদলে যায়। আমিষ রান্নায় রাঁধুনির ব্যবহার নেই। সাধারণত সুক্তোর ফোড়ন হিসাবে রাঁধুনি ব্যবহার করা হয়।
 
জোয়ান: এসেছে সংস্কৃত ‘যমানী’ শব্দ থেকে। প্রায় ধনে গাছের মতো দেখতে গুল্ম জাতীয় গাছের ফল। রাঁধুনির মতো দেখতে তীব্র স্বাদের মসলা হিসাবে ব্যবহৃত ক্ষুদ্র শস্য বীজ। রান্নায় জোয়ানের তেমন ব্যবহার নেই। মূলত মুখশুদ্ধি হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
 
টোটকা ওষুধ হিসাবে জোয়ানের ব্যবহার আছে। নুন লেবু দিয়ে জারিত জোয়ান অরুচি দূর করে। জোয়ানের আরক বা নির্যাস বদহজমে ভালো কাজ করে। আরক এসেছে আরবি শব্দ ‘আরক্‌’ থেকে।
 
 
বাঙালির মসলাপাতি ৩
 
 
লবঙ্গ: সংস্কৃত শব্দ। √লু + অঙ্গ = লবঙ্গ। সংস্কৃত √লু ধাতুর অর্থ ছেদন। গাছের ছেদন করা অংশ বলেই লবঙ্গের এমন নাম। আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা দ্বীপপুঞ্জে। মালয় নাম ‘বঙ্গালবঙ্গ’। হিন্দিতে একে ‘লাউঙ্গ’ বলে। রামায়ণ, চরকসংহিতা, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ, কালিদাসের রঘুবংশ কাব্য এবং জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যে লবঙ্গ-এর উল্লেখ আছে। তাতে বোঝা যায় লবঙ্গ বহু শতাব্দী ধরে এদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
 
মাঝারি গাছ, সাধারণত ১৫-২০ ফুট উঁচু, পাতা দেখতে অনেকটা বকুল পাতার মতো। শাখার অগ্রভাগে গুচ্ছ আকারের ফুল হয়। বোঁটা সহ ফুলের কুঁড়ি শুকিয়ে গেলে লবঙ্গে পরিণত হয়। ভারতে সযত্নে রোপিত এবং লালিত হলেও তাতে ফুল হয় না। ফলে এটি মূলত আমদানি করা মসলা। লবঙ্গ গরম মসলার একটি মসলা। রান্নায় সুগন্ধ আনতে লবঙ্গ ব্যবহার করা হয়। মুখশুদ্ধি এবং টোটকা ওষুধ হিসাবে লবঙ্গ কাজে লাগে।
 
ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয় লবঙ্গের তেল। সুশ্রুতসংহিতায় লবঙ্গকে কফ নাশক ও তৃষ্ণা নিবারক বলা হয়েছে। এটি লালাস্রাব বাড়ায় এবং হজমে সাহায্য করে। দুই তিনটি লবঙ্গ থেতো করে খইনির মতো দাঁতের গোড়ায় টিপে রাখলে দাঁতের ব্যথা তাড়াতাড়ি কমে যায়।
 
জয়ত্রী: জায়ফল গাছের ফলের শুকনো ছাল হলো জয়ত্রী। মোগলাই রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
 
জায়ফল: জয়ত্রী গাছের ফলের বীজ হলো জায়ফল। এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘জাতিপত্রী’ থেকে। জায়ফল হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা দ্বীপের একটি চিরসবুজ গাছ। এই গাছে খোসা যুক্ত একটি রসালো ফল হয়। আর সেই ফলের খোসার ভেতর থাকে বাদামি পাঁপড়ির বীজ। এটিই জায়ফল। ভারতের কেরল প্রদেশে এটি জন্মে। বিরিয়ানি রান্না করতে জায়ফল, জয়ত্রী দুটোই লাগবেই। এটি হালকা মিষ্টি স্বাদ যুক্ত হওয়ায় কাস্টার্ড, পুডিং, কেক, সবজি, ডিম ইত্যাদিতে বাঙালিরা ব্যবহার করে।
 
জাফরান: শব্দটি এসেছে আরবি ‘জা-আফ্‌রান্‌’ থেকে। পৃথিবীর সব থেকে মূল্যবান মসলা। জাফরানকে ‘কেশর’ বা ‘কুমকুম’-ও বলা হয়। ‘কুমকুম’ সংস্কৃত শব্দ। পিঁয়াজের মতো এক ধরনের ছোটো গুল্মের ফুলের গর্ভ কেশরই হলো জাফরান। এই কেশর শুকিয়েই তৈরি হয় জাফরান। প্রতি পাউন্ড জাফরান তৈরি করতে প্রায় ৮০ হাজার ফুল লাগে। সেই জন্য জাফরান এত মূল্যবান। কাশ্মীরে যে জাফরান তৈরি হয় সেটিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাফরান। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিসে প্রথম জাফরানের ব্যবহার হয় বলে জানা যায়। চরকসংহিতা ও সুশ্রুতসংহিতায় একে ‘রুধির’ বলা হয়েছে। মহাভারতে দ্রৌপদীর কুমকুম লিপ্ত স্তন যুগলের বর্ণনা আছে।
 
জাফরান সাধারণত দুধে গুলে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। এটি গুঁড়া হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। জাফরান দেখতে চমৎকার বলে এটি খাবার পরিবেশনেও কাজে লাগানো হয়। চালের তৈরি খাবার যেমন বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি ইত্যাদিতে জাফরান ব্যবহার করা হয়। এই জাফরান-এর জন্যই বিরিয়ানির সুগন্ধ এবং কমলা রং আসে। এছাড়া শরবত ও মিষ্টি জাতীয় খাবারে এটি ব্যবহার করা হয়।
 
আয়ুর্বেদে এই গাছের পরাগ, পাতা ও কন্দমূল ব্যবহার করা হয়। জাফরানের অনেক ভেষজ গুণ আছে। জাফরান উষ্ণ বীর্য, কৃমি নাশক, বিরেচক, রুচি বর্ধক ও দেহের কান্তি বর্ধক।
 
বাঙালির মসলাপাতি ৪
বল্কলজ মসলা
দারচিনি: শব্দটি এসেছে ফারসি ‘দারচীনা’ থেকে। সংস্কৃতে এর নাম ‘গুড়ত্বক্‌’। চরকসংহিতায় এর উল্লেখ আছে ‘ত্বক্‌’ নামে। দারচিনি গাছের সুগন্ধ যুক্ত মিষ্টি স্বাদের ছালই মসলা রূপে ব্যবহৃত হয়। দারচিনি গরম মসলার একটি মসলা। শ্রীলংকার দারচিনি উৎকৃষ্ট। ভারতেও দারচিনি হয়। মাঝারি মাপের গাছ, পাতা দেখতে তেজপাতার মতো, তবে আর একটু পুরু। তিন বছর পর পর গোড়া রেখে গাছ কাটা হয় এবং ছাল ছাড়িয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। কুঁকড়ে যাওয়া শুকনো ছালই দারচিনি।
 
ক্ষার: কলা গাছ থেকে তৈরি রান্নার উপাদান। কলা গাছের ছাল শুকিয়ে তা পুড়িয়ে ক্ষার তৈরি করা হয়। ডাল, পেঁপে, শাক, মোচা, সজনে ডাঁটা রান্নায় ক্ষার ব্যবহার করা হয়। বলা হয়, ক্ষার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। উত্তর বঙ্গের রাজবংশী এবং অসমিয়া-দের মধ্যে এর চল ছিল এক কালে।
 
বাঙালির মসলাপাতি ৫
ফলজ মসলা
কিশমিশ: ফারসি শব্দ। ছোটো বীজ বিহীন এক জাতের আঙুর শুকিয়ে কিশমিশ তৈরি হয়। পোলাও, পায়েস এবং নানা রকমের মিষ্টান্নে কিশমিশ দেওয়া হয়। শুকনো ফল হিসেবেও খাওয়া হয়।
এলাচ: শিবকালী ভট্টাচার্যের মতে, এলাচ এসেছে দ্রাবিড় ভাষা থেকে। বেদে এর উল্লেখ নেই। সুশ্রুত সংহিতার সূত্রস্থানে উল্লিখিত ‘দ্রাবিড়ীনাং ফলং’ আসলে এলাচ। এই ব্যাখ্যাই সঠিক বলে মনে হয়, কেন না এটির চাষ হয় মূলত দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় অঞ্চলে। এলাচ গাছের গোড়া থেকে যে পুষ্প দণ্ড বের হয় তাকে দেখে মনে হয় যেন এলিয়ে শুয়ে আছে। দ্রাবিড় ভাষায় এই অবস্থাকে বলে ‘এলা’। সেই পুষ্প দণ্ডেই ফুল এবং পরে এলাচ ফল জন্মে – সেই হেতু তার এই নামকরণ।
এলাচ দুই রকমের: বড়ো এলাচ এবং ছোটো এলাচ। দুই রকমের এলাচ দুই রকমের গাছে ফলে। বড়ো এলাচ গাছগুলি দেখতে আদা গাছের মতো, তবে পাতাগুলি একটু বেশি লম্বা ও চওড়া। স্যাঁতসেঁতে পাহাড়ি অঞ্চল এই গাছের বাড়-বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত।
বিভিন্ন ধরনের রান্নায় এলাচ গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। দামি মসলার দিক থেকে পৃথিবীতে এলাচের অবস্থান দ্বিতীয়। এলাচ যেমন ঝাল জাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয়, তেমনি মিষ্টি জাতীয় খাবারেও ব্যবহার করা হয়। এলাচ সাধারণত গুঁড়া হিসেবে রান্নায় দেওয়া হয়, তবে গোটা এলাচও রান্নায় দেওয়া হয়ে থাকে। এটি পরিপাকের উন্নতি ঘটায়, ক্ষুধা বৃদ্ধি করে, কিডনি-র স্বাস্থ্য ভালো রাখে। আয়ূর্বেদ চিকিৎসায়ও এলাচ ব্যবহার করা হয়।
 
লংকা: লংকা সাঁওতালি শব্দ। এই নামের কোনও শব্দ বৈদিক সাহিত্য এবং চরক-সুশ্রুত সংহিতায় পাওয়া যায় না। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, লংকার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ প্রধান অঞ্চল। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপ পুঞ্জ থেকে একে পোর্তুগিজরা ভারতে আমদানি করে। যেকোনও রান্নায় ঝাল স্বাদ আনতে লংকার কোনও বিকল্প নেই। দুই তিন ফুট উচ্চতার গাছের ফল। কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে লাল। কাঁচা ও পাকা উভয়ই ঝাল হিসাবে বাঙালির বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহৃত হয় গোটা ও বাটা হিসাবে। শুকনো লংকার গুঁড়াও মোড়কে কিনতে পাওয়া যায়। গ্রাম বাংলায় পানতা ভাতের সঙ্গে কাঁচা লংকার ব্যবহার প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। লংকা-এর বিকল্প শব্দ ‘মরিচ’।
গোলমরিচ: মরিচ সংস্কৃত শব্দ। এর আর একটি সংস্কৃত নাম ‘উষণ’। মসলা রূপে ব্যবহৃত সামান্য ঝাল স্বাদের ছোটো গোলাকার ফল। দেখতে গোল বলে একে গোলমরিচ বলা হয়। লতা জাতীয় গাছ, আম-সুপারি গাছকে আঁকড়ে ধরে উপরে ওঠে। এর স্বাদ হালকা ঝাঁঝাল এবং ঘ্রাণ বেশি। মিষ্টি জাতীয় খাবারে এটি কখনও ব্যবহার করা হয় না। এই গোলমরিচ একমাত্র মরিচ জাতীয় মসলা যা রান্নায় স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়, ঝাল বাড়াতে নয়।
 
পাপরিকা পাউডার: ক্যাপসিকাম জাতীয় মিঠা মরিচের গুঁড়াকে বলা হয় পাপরিকা পাউডার। এটা মরিচের গুঁড়ার মতো ঝাল নয়। ডিম, সবজি, মুরগি, সালাদ, বিরিয়ানি, আলুর দম ইত্যাদি রান্নায় পাপরিকা পাউডার ব্যবহার করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি রয়েছে।
পোস্ত: এসেছে ফারসি ‘পোস্‌ত’ থেকে। পোস্ত হলো পপি বা আফিম ফলের ধূসর রঙের ছোটো ছোটো বীজ। বাঙালির খুব প্রিয় খাদ্য। পোস্ত-র বাটা, পোস্ত-বড়া, পোস্ত-র তরকারি, পোস্ত-র টক, আলু-পোস্ত, ঝিঙা-পোস্ত সবই খাওয়া চলে। ভারতে পপি চাষ নিষিদ্ধ। সরকার নিয়ন্ত্রিত খামারে কিছু পপি চাষ হয়; তার বীজই আমরা বাজার থেকে কিনি বলে পোস্ত-র দাম এত বেশি।
তেঁতুল: তেঁতুল শব্দটি এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে। শব্দটি সংস্কৃত ‘তিন্তিড়ী’ থেকে এসে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এদেশে তেঁতুল-এর ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়। চরক-সুশ্রুত সংহিতায় তেঁতুল-এর উল্লেখ রয়েছে। অথর্ববেদ-এর বৈদ্যককল্প-এ তেঁতুলকে ‘চিঞ্চা’ বলা হয়েছে। পাকা তেঁতুল শুকিয়ে বানানো হয় ‘আমলি’। এটা তেঁতুল-এর মতোই টক। ব্যবহারের আগে আমলি-কে জলে ভিজিয়ে রাখতে হয়। খাসির মাংস রান্নায় আমলি ব্যবহার করা হয়। টক, অম্বল, আচার, চাটনি, সালাদ এবং পানীয় বানাতে আমলি ব্যবহার করা হয়। ওড়িশার গ্রামাঞ্চলের গরীব মানুষরা তেঁতুলের কচি পাতা বেটে লংকা ও লবণ মিশিয়ে বড়া ভেজে পানতা ভাত দিয়ে খায়।
 
খনার বচনে আছে, ‘তাল, তেঁতুল, কুল – তিন করে বংশ নির্মূল।’ তাহলেও আয়ুর্বেদে ভেষজ হিসাবে এর বহুল ব্যবহার আছে। ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয় এর পাতা, ছাল, কাঁচা ও পাকা ফলের শাঁস, পাকা ফলের খোসা, বীজের শাঁস ও খোসা। তেঁতুল এমনই একটি ভেষজ গাছ যার সব অংশই কোনও না কোনও কাজে লাগে। এর কাঁচা কাঠও জ্বলে। তেল পিষাই-এর ঘানি এই কাঠ ছাড়া তৈরি হয় না।
আমচুর: এসেছে সংস্কৃত ‘আম্র চূর্ণ’ থেকে। শুকনো কাঁচা আমের গুঁড়া। কাঁচা আমের ছোটো ছোটো চাকলা শুকিয়ে তৈরি হয় আমসি। আমসি গুঁড়ো করলে আমচুর। এটি টক এবং হালকা মিষ্টি এক ধরনের পাউডার। সুপ জাতীয় ও নিরামিষ রান্নায় আমচুর ব্যবহার করা হয়। মসলা চাট, পাপড়ি চাট জাতীয় খাবার রান্নায় আমচুর অতি আবশ্যিক উপাদান। বিভিন্ন ধরনের পাঁপড় বানাতেও আমচুর লাগে। রান্নায় লেবুর মতো হালকা টক স্বাদ নিয়ে আসে আমচুর। লেবুর পরিবর্তেও এটি ব্যবহার করা হয়। আমসির টক বাঙালির প্রিয় পদ।
কাবাবচিনি: গোলমরিচের মতো দেখতে ঈষৎ তিতা স্বাদের এক ধরনের ছোটো ফল। মূলত মোগলাই রান্নায় ব্যবহার হয়। আয়ুর্বেদে ওষুধ হিসেবেও কাবাবচিনির ব্যবহার আছে।
 
বাঙালির মসলাপাতি ৬
কন্দজ মসলা
আদা: এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘আর্দ্রক’ থেকে। সংস্কৃত. আর্দ্রক > পালি. অদ্দঅ > বাংলা. অদ্দা, আদা। মসলা হিসাবে ব্যবহৃত ঝাঁঝাল কন্দমূল যা রান্নায় মসলা হিসাবে এবং কবিরাজিতে ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আর্দ্রক নামকরণের তাৎপর্য হলো – জন্ম ক্ষেত্র স্যাঁতস্যাঁতে ভূমিতে (আর্দ্র ভূমিতে)। সেই হিসাবে তার নাম আর্দ্রক। বৈদিক যুগে এর নাম ছিল ‘সৌপর্ণ” অর্থাৎ সুন্দর পর্ণ বিন্যাস যুক্ত গাছ। রান্নায় আদার রস দেওয়া বা আচারে আদার ব্যবহার প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় চালু ছিল এবং এখনও আছে।
 
মসলা ছাড়াও আদার অনেক ভেষজ গুণ আছে। আদাকে যখন বিশেষ প্রক্রিয়ায় শুকিয়ে নিয়ে আয়ুর্বেদে ভেষজ হিসাবে ব্যবহার করা হয় তখন তাকে বলা হয় ‘শুঁঠ বা শুণ্ঠী’। ভেষজ হিসাবে তার আরও নাম আছে যেমন – বিশ্ব, শৃঙ্গবের, কটুভদ্র, নাগর প্রভৃতি। সর্দি-কাশি, বদহজম, পেট ফাঁপা ও জন্ডিস-এ আদা-র ব্যবহার হয়। মুখের রুচি বাড়াতে-ও আদা-র জুরি নেই।
 
বাংলা ভাষায় ‘আদায়-কাঁচকলায়’ বলে একটি বাগধারা আছে। আদায়-কাঁচকলায় শব্দটির অর্থ বিরুদ্ধ স্বভাব যুক্ত, পরস্পর শত্রু ভাবাপন্ন। পরস্পর দ্বন্দ্ব ময় সম্পর্ক প্রকাশের ক্ষেত্রে উপমা স্বরূপ ‘আদায়-কাঁচকলায়’ কথাটি ব্যবহার করা হয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে আদা-র গুণ হলো রেচন, কিন্তু কাঁচকলার গুণ হলো ধারণ। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য হলে খেতে হয় আদা। অন্যদিকে, উদরাময় রোগে খেতে হয় কাঁচকলা। অধিকন্তু, আদা যদি কাঁচকলার তরকারিতে পড়ে, তো কাঁচকলা আর সহজে সিদ্ধ হয় না। একটি অন্যটির ক্রিয়াকে অকেজো করে দেয়। অর্থাৎ একটি অন্যটির বিপরীত কার্য করে। আদা ও কাঁচকলার পরস্পর বিপরীত এই ধর্ম হতে শব্দটির এমন অর্থ দ্যোতনা।
 
শুঁঠ: শুঁঠ তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘শুণ্ঠি’ থেকে। শুকনো আদাকে বলে শুঁঠ। কাশ্মীরি রান্নায় ব্যবহৃত হয়। টাটকা আদা-র থেকে গন্ধ একটু ভিন্ন। ওষুধ হিসেবেও শুঁঠ-এর ব্যবহার আছে।
 
আম-আদা: আদার মতোই দেখতে আম্র গন্ধী কন্দ। আম-আদার গাছও আদা গাছের মতো দেখতে। সাধারণত চাটনি তৈরিতে আম-আদা দেওয়া হয়। কয়েক রকমের নিরামিষ রান্নাতেও আম-আদার ফালি বা বাটা দেওয়া হয়।
 
হলুদ: দেশি শব্দ, এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে। অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত ‘হরিদ্রা’ থেকে হলুদ এসেছে। সংস্কৃত. হরিদ্রা > প্রাকৃত. হলিদ্দা > বাংলা. হলোদি, হলোদে, হলুদ। প্রধানত মসলা রূপে ব্যবহৃত হলুদ রঙের কন্দ। ভারতীয়রা প্রাক্‌-আর্য যুগ থেকেই হলুদ ব্যবহার করে আসছে। এটি ভারতের এক অতি প্রাচীন ও উপকারী মসলা। এর জন্মও সম্ভবত ভারতে। লোক-সাহিত্যেও হলুদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা পাওয়া যায় – ‘তোদের হলুদ মাখা গা, তোরা সোজা রথে যা। আমরা হলুদ কোথায় পাবো, আমরা উলটো রথে যাবো।’ হলুদ দুই রকম ভাবে ব্যবহার করা হয় – কাচা হলুদ এবং সিদ্ধ হলুদ। গোটা হলুদ সিদ্ধ করে শুকিয়ে বেটে বা গুঁড়া করে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। বাঙালির বিয়ের ‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠানে কাঁচা হলুদ বেটে বর-কনের গায়ে মাখানো হয়।
 
এর অনেক ভেষজ গুণ আছে। হলুদ কান্তি বর্ধক, বিশোধক, রোগ প্রতিষেধক, সংক্রমণ রোধক এবং বহু ব্যাধি নাশক। টোটকা হিসাবেও হলুদের ব্যবহার আছে। যেমন মচকানিতে চুন-হলুদ-নুন মিশিয়ে গরম করে লাগালে ব্যথা ও ফুলা দুইই কমে যায়। কার্বাঙ্কল জাতীয় ফোঁড়ায় কাচা হলুদের বাটা গরম করে লাগালে তা তাড়াতাড়ি সেরে যায়। হলুদ বাটা বা হলুদ গুঁড়া দিলে জোঁক ছেড়ে যায়।
 
পিঁয়াজ: শব্দটি এসেছে ফারসি ‘পিয়াজ’ থেকে। পিঁয়াজ অতি প্রাচীন ফসল হলেও বেদ বা উপনিষদে এর উল্লেখ নেই। পরবর্তীকালে আর্য-দের লেখায় ‘পলাণ্ডু’-র যে উল্লেখ পাওয়া যায় তাতে জানা যায় যে, সেকালে পিঁয়াজের ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল কেবল ম্লেচ্ছ ও যবন-দের মধ্যে। এখন হিন্দু মুসলমান সবাই পিঁয়াজের ভক্ত। পিঁয়াজ আসলে কোনও সবজি নয়। এটি আসলে একটি মসলা জাতীয় উদ্ভিদ। এই বর্গের অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে রসুন। রসুনের মতোই এর গোত্র হচ্ছে লিলি। পিঁয়াজের পাতা এবং ‘পিঁয়াজ কলি’-ও সবজি হিসাবে খাওয়া হয়।
 
পিঁয়াজে থাকা এলিসিন নামের উপাদান ছত্রাক নাশক এবং জীবাণু নাশক হিসেবে কাজ করে। এই এলিসিনই পিঁয়াজ কোটার সময় চোখের জল ঝরায়। অনেক সময় এটি ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে বলে দাবি করা হয়। হৃদ্‌-রোগের ঝুঁকি হ্রাস, রক্তে গ্লুকোজ-এর মাত্রা ঠিক রাখা, ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে পিঁয়াজের ব্যবহার দেখা যায়। পিঁয়াজ কাঁচা খেলে সর্দি-কাশি কম হয়। এটা মানুষের শরীরকে রোগ-প্রতিরোধক হিসেবে তৈরি করে।
 
বেরেশতা: ভাজা পিঁয়াজ। বিরিয়ানি, পোলাও ইত্যাদি মোগলাই রান্নার স্বাদ বাড়াতে বেরেশতা ব্যবহার করা হয়। মাঝারি আঁচে পিঁয়াজ ভেজে রাখলে তা মুচমুচু হয়ে যায়। হালিম পরিবেশনের সময় উপর থেকে বেরেশতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
 
রসুন: এসেছে সংস্কৃত ‘রসোন বা লশুন’ থেকে। আরবিতে ‘সূম্‌’। পিঁয়াজের মতো আকৃতি যুক্ত উগ্র গন্ধী সাদা কন্দ। চরকসংহিতার আগে পর্যন্ত সংস্কৃত সাহিত্যে রসুন-এর উল্লেখ পাওয়া যায় না। বৌদ্ধ পর্যটক ফা হিয়েন এবং হিউয়েন সাং-এর লেখা থেকে জানা যায় যে, সেকালে ভারতে কেউ রসুন-পিঁয়াজ খেত না। মিলন দত্তের মতে, বাংলার হিন্দুদের মধ্যে রসুনের ব্যবহার শুরু হয়েছে অনেক পরে, আনুমানিক ১৮৯০ সালে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, রসুনে পাঁচটি রস বিদ্যমান – মূলে তীক্ষ্ণ, পাতায় তিক্ত, নালে কষায়, ডাঁটার ডগায় লবণ, কলিতে মধুর রস। শুধু অম্ল রস নেই। একটি রস কম বলে রসুনকে সংস্কৃতে ‘রসোন’ (রস + ঊন)। ‘রসুন তেল’ হলো রসুনের সঙ্গে পাক-করা সরিষার তেল যা গোরুর ঘা-এর ওষুধ।
 
বাঙালির মসলাপাতি ৭
বৃক্ষরসজ মসলা
হিং: হিং শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘হিঙ্গু’ শব্দ থেকে। চরক-সুশ্রুতের আমলে হিং ব্যবহার করা হতো ওষুধ হিসাবে। বাঙালি প্রাচীন কাল থেকেই রান্নার মসলা হিসাবে হিং ব্যবহার করে আসছে। মুকুন্দরাম-এর চণ্ডীমঙ্গল-এ লেখা আছে খুল্লনা-র মুসুরি ডালে হিং দেওয়ার কথা: ‘মসুরি মিশ্রিত মাস, সূপ রাঁধে রস বাস / হিঙ্গু জীরে বাসে সুভাসিত’।
 
হিং হলো ‘ফেরুলা’ গাছের আঠা। অন্য এক প্রজাতির হিং ‘রামঠ’ বলে পরিচিত। আরেক প্রকার হিং বাজারে পাওয়া যায় তাকে ‘হিংগ্রা’ বলে। আমরা চলতি কথায় বলে থাকি ‘হ্যাগ্রা’। সেটির গন্ধ খুব উগ্র। কয়েক দশক আগেও কাবুলিওয়ালা-রা কলকাতার হিং-এর চাহিদা মেটাত। আজকাল আর এদের দেখা যায় না।
 
এই গাছের আঠা সংগ্রহের পদ্ধতিও বেশ চিত্তাকর্ষক। হিং গাছ সাধারণত ৫-৬ ফুট লম্বা হয়। চার-পাঁচ বছরের গাছের গোড়া কেটে একটি পাত্র উপুড় করে ঢাকা দেওয়া হয়। ওই গোড়া থেকে সাধারণত তিন মাস পর্যন্ত আঠা বেরোতে থাকে। পরে বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে মিশিয়ে তার ওজন বাড়ানো হয় এবং গুঁড়া করে বিক্রি করা হয়। বিশুদ্ধ হিং পাওয়া যায় না বললেই চলে।
 
‘চিওড়া’ নামের এক রান্নায় হিং খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। হিং-এর কচুরি বাঙালির অতি প্রিয় জলখাবার। শুকনো ফল সংরক্ষণেও হিং ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মাছ ও সবজি রান্নায়ও হিং স্বাদ বৃদ্ধি করে। গরম তেলে এক চিমটি হিং অন্যান্য মসলার সাথে মিশিয়ে রান্নায় ব্যবহার করা হয়।
 
এটি শুধু মসলা না, ভেষজ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। হিং কফ নিঃসারক, শ্বাসকষ্ট নিবারক, কোষ্ঠকাঠিন্য নাশক, দন্ত বেদনা নাশক এবং হজম শক্তি বর্ধক।
 
কর্পূর: সিন্নামোনাম ক্যামফোরা নামক কর্পূর গাছ থেকে প্রাকৃতিক কর্পূর পাওয়া যায়। এই গাছের এর কাণ্ড, পাতা এবং ডালা থেকে মোমের মতো যে রস বের হয় তা থেকেই কর্পূর তৈরি হয়। কর্পূর গাছের কাঠ থেকে পাতন পদ্ধতিতে কর্পূর সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে তার্পিন থেকে কৃত্রিম উপায়ে কর্পূর তৈরি করা হচ্ছে। কর্পূর-এর স্বাদ তেতো, তবে সুগন্ধি, রং সাদা।
 
কর্পূর-এর অনেক গুণ রয়েছে। চামড়ায় অ্যালার্জির সমস্যা দূর করে, জলে কর্পূর-এর তেল ফেলে স্নান করলে অ্যালার্জি কমে যায়। নখে ছত্রাক সংক্রমণও ঠেকায়, ক্যান্ডিডা প্যারাপসিলোসিস, ট্রাইকোফাইটন মেন্টাগ্রোফাইটস জাতীয় ছত্রাকের সংক্রমণ দূরে রাখে। একজিমা কমানোর লোশন-ক্রিমে ব্যবহৃত হয়। বালিশে এক ফোঁটা কর্পূর তেল ফেলে রাখলে রাতে ভালো ঘুম হয়। শ্বাসনালির প্রদাহ, সর্দি-কাশিও দূর হয় ।
 
 
বাঙালির মসলাপাতি ৮
পত্রজ মসলা:
তেজপাতা: এসেছে ফারসি শব্দ ‘তেজ’ থেকে। এই তেজ শব্দের জ-এর নিচে একটি ফুটকি আছে। এই শব্দের অর্থ হলো তীব্র গন্ধ। সুগন্ধি মসলা হিসাবে ব্যবহৃত হয় তেজপাতা গাছের শুকনো পাতা। আমিষ, নিরামিষ তরকারি, হালুয়া, পায়েস, মিহিদানা, পোলাও এবং বিরিয়ানি-তে তেজপাতা ব্যবহার করা হয়। এই গাছের ছাল, পাতা ও ফলের ভেষজ গুণ আছে।
কারি পাতা: সুগন্ধি পাতা। দেখতে নিম পাতার মতো কিন্তু তিতা নয়। সংস্কৃতে একে ‘সুরভি নিম্ব’, হিন্দিতে ‘গন্ধেলা’ এবং বাংলায় ‘কারি পাতা বা মিঠা নিম’ বলে। তরকারিকে সুগন্ধি করার জন্য এবং চাটনি বানানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ ভারতে এর প্রচলন বেশি। শুকনো বা কাঁচা পাতা দিয়ে ডাল সাঁতলানো হয়, বেসন-এর সঙ্গে মিশিয়ে পকোড়া তৈরি করা হয়। চানাচুর-কে সুগন্ধি করার জন্যও কারি পাতা ব্যবহৃত হয়।
পুদিনা পাতা: পুদিনা সাঁওতালি শব্দ। পুদিনা এক প্রকারের গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। পুদিনা বিভিন্ন ভাবে চাষ করা যায়। খুব সহজেই মাটিতে বা টবে পুদিনার চাষ করা যায়। ঔষধি গুণাগুণ থাকায় এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাপক। বর্তমানে হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে ঘরের ভিতরেও এর চাষ করা সম্ভব।
 
ভারতীয় পুদিনা পাতা বিশ্বের অন্য সব পুদিনা পাতার থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি ঝাঁঝাল। উত্তর প্রদেশের খাবারে পুদিনা পাতা প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। পুদিনা পাতা সুগন্ধি হিসাবে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। শরবত, চাটনি, সালাদ, চা, বিভিন্ন ধরনের পানীয়, মোগলাই, বিরিয়ানি ইত্যাদি রান্নায় পুদিনা পাতা ব্যবহার করা হয়। পুদিনা জীবাণুনাশক হিসাবে কাজ করে। কাশি,অরুচি ও পাকস্থলীর প্রদাহে পুদিনা উপকারী। পুদিনা পাতার চা বেশ জনপ্রিয় পানীয়। এছাড়া পুদিনা পাতা রূপ চর্চায়ও ব্যবহৃত হয়।
ধনে পাতা: ধনে একটি বর্ষ জীবী সুগন্ধি ঔষধি গাছ। রান্নায় ব্যবহার করা ছাড়াও সুস্বাদু ধনের পাতা চাটনি ও বিভিন্ন তরকারিতে ব্যবহার করা হয়। ধনে পাতার পকড়া খেতে দারুণ লাগে। ধনে পাতার বাটা বা ভর্তা তো জিভে জল আনে! ধনে পাতার পরোটা-ও খেতে স্বাদু।
পায়েস পাতা: একে পোলাও পাতাও বলা হয়। পোলাও পাতার গাছের আকৃতি ও পাতার চেহারা দেখতে কেয়া গাছের মতো। তবে কেয়া গাছের মতো অত বড়ো হয় না।
 
গাছের পাতায় পায়েস বা পোলাও-এর মতো গন্ধ আছে বলেই এর নাম পায়েস পাতা বা পোলাও পাতা। এই সুগন্ধ দিয়ে খাদ্য দ্রব্য সুরভিত করতেই পোলাও পাতা ব্যবহৃত হয়। চা বানানোর জন্য চায়ের জল ফুটে এলে তার ভেতর পোলাও পাতার কয়েকটি টুকরো ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর সেই জল ছেঁকে চা-এর মতো খেলে সেই চা থেকেও পোলাও-এর সুঘ্রাণ ভেসে আসে। একই ভাবে বিভিন্ন রকম সুপ, জাউ ভাত, ফিরনি, পায়েস ইত্যাদি সুগন্ধ যুক্ত করতে পোলাও পাতা ব্যবহার করা যায়।
 
তুলসী পাতা: তুলসী পাতাকেও মসলা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তুলসী গন্ধি দই বাংলার অনেকে খেয়ে থাকেন। চা-পাতায় তুলসী পাতা মিশিয়ে চা করলে তা শরীরের পক্ষে ভালো। সর্দি-কাশিতে তুলসী পাতা খুব উপকারী।
 
নিম পাতা: নিম পাতা রান্নায় দিলে তিতা স্বাদ আনে। সেই হিসেবে এটিও একটি পত্রজ মসলা। বাঙালি নিমপাতা ব্যবহার করে কখনও শুক্তোয় দিয়ে আবার কখনও ভেজে। নিম-বেগুন ভাজা বাঙালির একটি প্রিয় পদ। শ্রীচৈতন্যদেব-ও কচি নিম পাতা দিয়ে বেগুন ভাজা খেতে ভালোবাসতেন।
বাঙালির মসলাপাতি ৯:
লতাজ মসলা:
চই লতা: হালকা ঝালের লতা। একে ‘চই ঝাল’ বা ‘চুই ঝাল’-ও বলা হয়। নিরামিষ এবং আমিষ এই দুই ধরনের রান্নাতেই চই লতা ব্যবহার করা যায়। চই লতার ডাল ছোটো ছোটো টুকরা করে কেটে ছেঁচে রান্নায় দেওয়া হয়। চই ঝাল বেশি ক্ষণ স্থায়ী হয় না।
 
মিশ্র মসলা:
পাঁচফোড়ন: রান্নায় ব্যবহৃত পাঁচ রকমের গোটা মসলার মিশ্রণ – জিরা, কালো জিরা, মেথি, মৌরি ও রাঁধুনি। পাঁচফোড়ন একান্ত ভাবেই বাঙালির নিজস্ব মসলা। এদের প্রত্যেকের কথা আগে আলাদা করে বলা হয়েছে।
 
কারি পাউডার: কারি পাউডার হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মসলার মিশ্রণ যা মসলাদার রান্নায় উভয় বাংলায় ব্যবহার করা হয়। আমিষ ও নিরামিষ রান্নার জন্য ভিন্ন রকমের কারি পাউডার বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। তরকারিকে আলাদা স্বাদ ও ঘ্রাণ যুক্ত করে এই মসলাটি।
গরম মসলা: গরম মসলা নিজে কোনও মসলা নয় কিন্তু বিভিন্ন মসলার মিশ্রণ। লবঙ্গ, ছোটো এলাচ আর দারচিনিকে একত্রে গরম মসলা বলা হয়। গরম মসলায় বড়ো এলাচও ব্যবহার করা হয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে। মাংস রান্নায় গরম মসলা একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। আর অন্যান্য রান্না যেমন: মাছ, সবজি ইত্যাদির সাথে সাথে গরম মসলার উপাদানগুলিও পরিবর্তিত হয়। কোনও কোনও রান্নায় গরম মসলার সঙ্গে জিরা, আদা ইত্যাদিও যুক্ত করা হয়।
(সমাপ্ত)
(ঢাকার অবসর প্রকাশনা এবং কলকাতার কারুকথা প্রকাশনা থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিতব্য)।
 
 
———————————————————————————————————–
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
 
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
 
 
 
 
 

আমি শুবাচ থেকে বলছি

 
 
নৃপেন ভৌমিকের অন্যান্য লেখার সংযোগ নিচে দেওয়া হলো
বাঙালির মসলাপাতি. নৃপেন ভৌমিক
 

 

 

 

 
error: Content is protected !!