বাঙালির রান্নাবান্না

নৃপেন ভৌমিক (Nripen Bhaumik)

বাঙালির রান্নাবান্না

বাঙালির রান্নাবান্না: ১—১২

নৃপেন ভৌমিক (Nripen Bhaumik)

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
 
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

বাঙালির রান্নাবান্না ১

মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ক্রম উত্তরণের চিত্রটি ছিল এই রকম: কাঁচা→পোড়া →সিদ্ধ →ভাজা। প্রাচীন কালের বাঙালি রান্না করত উনুনে। জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করত গাছের শুকনো পাতা, কাঠ, কয়লা, ‘ঘুঁটে’ ও ‘গুল’। রান্নাঘর ছিল মূল বাড়ি থেকে আলাদা – মূল বাড়ির লাগোয়া বা একটু দূরে। গ্রামের নিম্নবিত্ত বাঙালি এখনও এইভাবেই রান্না করে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালি এখন থাকে ফ্ল্যাট বাড়িতে – রান্নাঘরও ফ্ল্যাটের ভিতরে। তাদের উনান এখন ‘ওভেন’। জ্বালানি এখন তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি।
 
রান্না: ‘রান্না’ শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত √রধ্‌ ধাতু থেকে। √রধ্‌ + অন্‌ = রন্ধন। রন্ধন শব্দটি বাংলায় ভেঙে হলো রাঁধা বা রান্না। সংস্কৃত. ‘রন্ধন’ > রান্‌হা > রান্না। শব্দটির অর্থ পাক, রাঁধন, রন্ধন। রন্ধন অর্থ খাদ্যবস্তুকে তাপ প্রয়োগে ভোজ্য করা এবং মশলা প্রয়োগে সুস্বাদু করে সহজপাচ্য করা। এর থেকে তৈরি হয়েছে ‘রান্নাঘর’, ‘রান্নাবাড়ি’, ‘রান্নাবাড়া’, ‘রান্নাবান্না’ ইত্যাদি শব্দগুলি।
 
সুকুমার সেন লিখেছেন, ‘রান্না করা এবং গরম করা অর্থে সংস্কৃতে ছিল ‘পচ্‌’ ধাতু। এ ধাতু মধ্য ভারতীয় ভাষাতে লুপ্ত হয়ে এসেছিল। এই ধাতু থেকে উৎপন্ন একটি মাত্র তদ্ভব শব্দ বাংলায় প্রচলিত আছে। সে হলো ‘পোয়ান’ মানে শরীর তাতানো, যেমন রোদ পোয়ানো, আগুন পোয়ানো। মধ্য বাংলার ‘পনী’ শব্দও (মানে কুম্ভকারের অগ্নিকুণ্ড) সংস্কৃত ‘পচন’ (‘পচনিকা’ থেকে এসেছে)।
 
আরও একটি শব্দ প্রচলিত আছে সাধু বাংলায় – ‘পাক’, মানে রান্না। সংস্কৃতে একটি ধাতু ছিল ‘রন্ধ্‌’ (যেমন রন্ধয়তি)। এর আসল মানে ছিল পীড়ন করা, দমন করা, কষ্ট দেওয়া। মধ্য ভারতীয় আর্যভাষায় এই ধাতুটি পুরোনো ‘পচ্‌’ ধাতু অর্থে, অর্থাৎ রান্না করা বোঝাতে ব্যবহৃত হতে থাকে। সেই সূত্রে আমরা সংস্কৃত ‘রন্ধন’ থেকে পেয়েছি ‘রান্না’ শব্দ (সংস্কৃত ‘রন্ধনক’ থেকে) ও ‘রাঁধ’ ধাতু। যে ভালো রান্না করে সে ‘রাঁধুনি’।
 
বৈদিক যুগে প্রাচীন ভারতীয় রান্নার ছিল চারটি উপাদান: আগুন, ঘি, কর্ষিত শস্য (অন্ন) এবং অকর্ষিত খাদ্য সামগ্রী (ফল, দুধ ইত্যাদি)। রান্নাকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। চিড়ে, দই, খণ্ড ইত্যাদি দিয়ে আগুন ছাড়া রান্না। আর ঘি, শস্য, তরকারি দিয়ে আগুনে পাক করা রান্না। বৈদিক যুগে রান্না হতো ঘি দিয়ে। বাংলায়ও প্রাচীন ও মধ্য যুগে ঘি-এর ব্যবহার অনেক বেশি ছিল, কিন্তু আমিষ রান্না হতো সরিষার তেলে।
 
যুগের নিয়মে বাঙালির অনেক পরিবর্তন হলেও রান্নার তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি। বাঙালির রান্নাগুলি মোটামুটি এই রকম: বাটা, সিদ্ধ, ভাজা, শুক্তো, ছেঁচকি, ছ্যাঁচড়া, ছোকা,ঘণ্ট, ঘ্যাঁট, লাবড়া, চচ্চড়ি, দম, ডালনা, পাতুরি, ঝোল, ঝাল আর টক। মুসলমান আমলে যোগ হয়েছে কালিয়া, কোর্মা, কোফতা, কাবাব, পোলাও, বিরিয়ানি ইত্যাদি। ইংরেজ আমলে যোগ হয়েছে কিছু ইংরেজি খানা, তবে তার প্রভাব খুব বেশি নয়।
রান্নাঘর: অর্থে বাংলায় পাকশাল, রান্ধাঘর, রান্ধনঘর বা হেঁশেল শব্দগুলি চালু আছে। ‘হেঁশেল’ এসেছে ‘হণ্ডিশাল’ > ‘হাণ্ডিশাল’ > ‘হাঁড়িশাল’ থেকে। হাঁড়ি শব্দটি সংস্কৃত ‘হণ্ডী’ থেকে এসেছে। অর্থাৎ যে ঘরে হাঁড়ি প্রভৃতি থাকে এবং রান্নাবান্না হয় তাই হলো হাঁড়িশাল বা হেঁশেল। সেকালে রান্নাঘর অতি পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। বাসি কাপড় ছেড়ে, স্নান করে রান্না ঘরে ঢোকা ছিল সেকালের বিধি। শাস্ত্রে আছে, ‘চুল্লীতত্র প্রকর্তব্যা পূর্বপশ্চিমায়তা’ অর্থাৎ রান্নাঘরের পুব বা পশ্চিম দিকে উনুন বানানো বাঞ্ছনীয়।
 
 
বাঙালির রান্নাবান্না ২
রাঁধুনি: যে রাঁধে সে রাঁধুনি বা পাচিকা। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘রন্ধনিকা’ শব্দ থেকে। সংস্কৃতে রাঁধুনির অনেক নাম আছে: সুপকার, ভোজনদাত্রী, অলরিকা, ওদনকা এবং সুদাস। বাঙালির সংসারে রান্নার দায়িত্বে থাকে মহিলারা। রাঁধুনি হতে পারে পুরুষ বা মহিলা। ব্রাহ্মণ পাচককে বলা হয় ‘রাঁধুনি বামন’। এক ধরনের মসলার নামও রাঁধুনি।
 
বাবুর্চি: হলো মুসলমান পাচক। ফারসি ‘বাওয়র্‌’ আর তুরকি ‘চি’ এর জোড়কলমে তৈরি হয়েছে বাবুর্চি শব্দটি। ‘বাওয়র্‌’  অর্থ বিশ্বাস, ‘চি’ মানে ধারক। সেই অর্থে ‘বাওয়র্‌চি’ শব্দের অর্থ বিশ্বাসভাজন। প্রভুর খাওয়ার আগে বাওয়র্‌চি খাবার পরখ করে দিত। এই বিশ্বস্ততার কারণেই বাওয়র্‌চি শব্দের উদ্ভব। সেকালে মুসলমান পুরুষ পাচককে বাবুর্চি বলা হতো। পরবর্তী কালে শব্দটির অর্থ পালটে গিয়েছে – যে রান্না করে সেই বাবুর্চি।
 
বাবুর্চিখানা: হলো পাকশালা বা রান্নাঘর। কলকাতায় বাবুর্চি এবং মোগলাই রান্না এসেছে লখনউ থেকে, আওধের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্‌ কলকাতায় আসার পরে। লখনউ ছিল বাবুর্চি এবং বাবুর্চিখানা সংস্কৃতির পীঠস্থান। আজকাল বড়ো বড়ো হোটেল, রেস্তোরাঁয় যারা রাঁধে তারা হলেন ‘শেফ’ (chef)। এদের অধিকাংশই পুরুষ। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে আধুনিক মেয়েরাও ‘শেফ’ হচ্ছে।
রসুইকর: রাজা-রাজড়ার রান্নাঘর বোঝাতে সংস্কৃতে একদা চলিত হয়েছিল ‘রসবতীশালা’ শব্দটি। মানে ছিল রসাল খাদ্যের প্রস্তুতির কক্ষ। কথাটি বাংলায় চলে এসেছে ‘রসুইশাল’ ‘রসুইঘর’ হয়ে, আর ‘রসবতী’ শব্দটি স্বতন্ত্র হয়ে মানে হয়েছে ‘ফলাও রান্না কাজ’। যেমন ‘রসুই শেষ হতে দেরি কত?’ এখন বাংলা ভাষায় পেশাদার দক্ষ রাঁধুনিকে বলে ‘রসুইকর’।
খাসনামা: ফারসি শব্দ, যার অর্থ খাদ্য পরিবেশক, বেয়ারা।
 
 
বাঙালির রান্নাবান্না ৩
রান্নার উপকরণ
প্রাচীন বাংলার উনান, উনুন: ‘উনুন’ মানে চুলা, চুল্লি, যাতে আগুনের তাপ উৎপন্ন করে খাদ্য রান্না করা হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এটি আকা, আখা, উখা, আখাল, চুলা, চৌকা, তিউড়ি, তন্দুর নামেও পরিচিত। হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান অঞ্চলে জোড়া উনুন-কে বলা হতো ‘দোপাখা’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, উনান শব্দটি বাংলায় এসেছে সংস্কৃত উদ্ধান বা উদ্‌ধ্মান থেকে। সংস্কৃত. উদ্ধান, উদ্‌ধ্মান> পালি. উদ্ধান > প্রাকৃত. উংধাণ > বাংলা. উন্‌হান, উনান, উনুন। মারাঠিতে শব্দটি হয়েছে ‘উনূন’, উনহূন, উনউন, উনহ; অসমিয়াতে ‘উধান’।
 
মধ্য বাংলায় (অর্থাৎ অষ্টাদশ শতক বা তার আগের বাংলায়) ‘উনাএ’ (=উনায়) মানে ছিল গরম হয়। এই কথাটির উৎস সংস্কৃত ‘উষ্ণয়তি’ (গরম করে; ‘উষ্ণ’ শব্দ থেকে প্রাপ্ত নামধাতুজ ক্রিয়া) > সংস্কৃত স্ন/ষ্ণ থেকে বাংলা ‘ন’-এ পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে ‘উনায়’ > ‘উনান’। উনান শব্দ এই ‘উনায়’ ক্রিয়াপদ থেকে এসেছে (মানে গরম করার সরঞ্জাম) > পরে ‘উনান’ থেকে ‘উনোন’ হয়েছে শুরুর উ-ধ্বনির সঙ্গে স্বরসঙ্গতির প্রভাবে> তারও পরে ‘উনোন’ হয়েছে ‘উনুন’।
 
উনানের প্রতিশব্দ ‘চুলা’ শব্দটি বাংলায় এসেছে সাঁওতালি শব্দ ‘চুলহা’ থেকে। পূর্ববঙ্গের কোনও কোনও উপভাষায় উনুনকে ‘আখা’ বলা হয়। এতদিন আখা শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি দেখানো হতো – অগ্নিকা > অ ক খি আ > আখা। কিন্তু আসলে, ‘আখা’ শব্দটি এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে।
 
মাটির উনান: প্রাচীন কালে বাঙালি রান্না করত মাটির উনানে। সেকালের বাঙালি উনুন তৈরি করত মাটি দিয়ে বা ইট-মাটি সাজিয়ে। রান্নাঘর-এর মেঝেতে বা উঠানে মাটি খুঁড়ে বা মাটির উপরে উনুন বানানো হতো। উনুনের মাথায় থাকত তিনটি চূড়াকৃতি মাটির পিণ্ড যাদের বলা হতো ‘ঝিক’। সঠিক মাপের ঝিক তৈরি করতে পারার উপরেই নির্ভর করত উনুন তৈরির সাফল্য।
ঝিক: ‘ঝিক’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি অনিশ্চিত। মারাঠিতে ‘ঝিংক’ বলে একটি শব্দ পাওয়া যায় যার মানে ‘to catch’। সেখান থেকে শব্দটি বাংলায় এসে থাকতে পারে।
 
উনুনের মুখ হতো গোলাকৃতি এবং তা হতো একটি বা দুটি। দুই মুখের উনুনে দুটি রান্না একসঙ্গে করে ফেলা যেত। উনুনের মুখ দিয়ে মাটির গর্তে বা তোলা উনুনের পেটে ঢোকানো হতো জ্বালানি। রাঁধুনি পিঁড়িতে বসে এই সব উনুনে রান্না করত।
 
তোলা উনান: আজও গ্রাম বাংলার অনেক বাড়িতে মাটির উনুনে রান্না হয়। সেই উনুন তৈরিতেও বাঙালি বধূরা বেশ দক্ষ ছিলেন। এক সময় ঘরে ঘরে ‘তোলা উনান’ থাকত। পুরানো মাটির হাড়ি কেটেও মাটি দিয়ে তোলা-উনান বানানো হতো। সেটি ছিল ভ্রাম্যমান উনান। যে-কোনও জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাতে রান্না চাপানো যেত। কাঠ এবং কয়লা – এই দুই রকম জ্বালানি ব্যবহার করার মতো ভিন্ন ভিন্ন ‘তোলা উনান’ তৈরি হতো। কয়লা সহজ লভ্য হওয়ার পরে উনুনের আকৃতিও পালটে গেল – উপরে কয়লা দেওয়ার চেম্বার – মাঝে শিক-জালি – নিচে ছাই বের করার মুখ। কয়লা জ্বালাবার জন্য ব্যবহার করা হতো গোবরের ঘুঁটে বা কাঠ। কুমোররা মাটির তৈরি জিনিসপত্র পোড়ানোর জন্য এক ধরনের উনান বানায়, তাকে ‘পুয়ান ভাঁটি’ বলে।
 
উনান পূজা: হিন্দু গৃহস্থের কাছে উনান খুব পবিত্র জিনিস বলে হিন্দুরা উনুনের পূজা করে। ভাদ্র সংক্রান্তিতে যে রান্নাপুজো হয় তা কার্যত উনানেরই পূজা। সেদিন বাঙালি মেয়েরা উনান-এর চার দিকে ও ভিতরে আলপনা দেয় এবং উনুনের পূজা করে। সেদিন রান্না বন্ধ অর্থাৎ অরন্ধন। অরন্ধন উপলক্ষে আগের রাতেই রান্না করে রাখা পানতা ভাত এবং বিভিন্ন রকম ভাজা আর সিদ্ধ তরকারি খাওয়া হয়। বিশ শতকের শুরুতে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় আশ্বিন সংক্রান্তিতেও অরন্ধনের প্রবর্তন করা হয়েছিল। ওই দিন শোক প্রকাশের জন্য উপবাস এবং মৈত্রীর জন্য রাখি-বন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
 
তন্দুর: হলো সেঁকা বা ঝলসানোর উপযোগী বিশেষ ধরনের চুল্লি। হিন্দি এই শব্দটি ফারসি ‘তনূর্‌’ শব্দ থেকে এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে এই ধরনের চুল্লি ভারতে বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। কালিবাঙ্গান-এ সিন্ধু সভ্যতার যে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে তাতে মাটি লেপা এক ধরনের উনুন পাওয়া গেছে। সেই উনুনের সঙ্গে এখন-কার তন্দুরের মিল আছে। প্রায় চার ফুট উঁচু গোলাকার উনুনের নিচে আগুন জ্বালানো থাকে। সেই তাপে উনুনের মাটি লেপা দেওয়াল তেতে যায়। সেঁকা হয় উনুনের উত্তপ্ত দেয়ালে। তন্দুরে যা রান্না হয় তাই ‘তন্দুরি’। তন্দুরে তৈরি করা যায় নান-রুটি, বিভিন্ন রকম বিস্কুট এবং বাখরখানি। পনির, মাংস বা মাছ মসলা মাখিয়ে তন্দুরে সেঁকে কাবাবও বানানো যায়।
 
 
 
বাঙালির রান্নাবান্না ৪
রান্নার উপকরণ
বাইন: ইট ও মাটির তৈরি বড়ো যে উনানে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে খেজুরের গুড় বানানো হয় তাকে বলে বাইন। বাইন সম্ভবত দেশি শব্দ। এখনকার বাইন-গুলি আয়তাকার। কারণ, এই যুগে গুড় জ্বালানো হয় আয়তাকার টিনের পাত্রে। আগেকার দিনে গুড় জ্বালানো হতো গোলাকার মাটির হাঁড়িতে, তাই আগেকার বাইন-গুলি ছিল গোলাকার।
 
এখনকার বাইনের দুই দিকে দুটি বড়ো ছিদ্র থাকে। এক দিক থেকে জ্বালানি ঢোকানো হয়। অন্য দিক থেকে জ্বালানি পোড়া ছাই বেরিয়ে বাইনের ভেতরের জায়গাটিকে পরিষ্কার রাখে। বাইরের দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয়টি জানালা থাকে। অক্সিজেনের সরবরাহ ঠিক রাখা ও ভেতর থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করার সুবিধার্থে এই ব্যবস্থা।
 
জ্বালানি: যা জ্বালিয়ে রান্না করা হয় তাই জ্বালানি। শুকনো পাতা, লাকড়ি (কাঠ), কাঠকয়লা এবং ঘুঁটে হলো রান্নার আদি জ্বালানি। পরে কয়লা এবং কোক কয়লার ব্যবহার শুরু হয়েছে। তার পরে এসেছে কেরোসিন। তারও পরে শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহার।
 
লাকড়ি: জ্বালানির কাঠ। এসেছে হিন্দি শব্দ ‘লকড়ি’ থেকে। গাছ চেরাই করে শুকিয়ে লাকড়ি বানানো হয়।
 
কাঠকয়লা: কাঠ পুড়িয়ে যে কয়লা পাওয়া যায়। গ্রামে সাধারণত কাঠ-কে আধ পোড়া করে কাঠকয়লা প্রস্তুত করা হয়। এই জাতীয় কয়লার ভিতরে কাঠের অংশ বিশেষ আধ পোড়া অবস্থায় থাকে। এই কারণে একে কাঠকয়লা বলা হয়। বাংলার সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির নিচে এই জাতীয় কয়লা পাওয়া যায়। এছাড়া লাকড়ি দিয়ে রান্নার শেষে যে অর্ধ দগ্ধ লাকড়ির অংশ থাকে, তাকেও কাঠকয়লা বলা হয়।
 
ঘুঁটে: গোবর শুকিয়ে গেলে তাকে বাংলায় বলে বলে ঘুঁটে। ভারতীয় উপমহাদেশে গোবরকে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহারের জন্য গোল গোল চ্যাপটা চাকতি হিসাবে শুকানো হয়। ঘুঁটে বলতে সাধারণত এই খয়েরি রঙের চাকতিগুলিকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশে এরকম ঘুঁটে ছাড়াও আরেক রকমের ঘুঁটে তৈরি হয়। পাটকাঠি-তে গোবর মাখিয়ে শুকানো হয় এবং তার পর কাঠের মতো ব্যবহার করা হয়। গোবর-এর ঘুঁটে খুব ভালো জ্বালানি হিসাবে কাজ করে কারণ গোবরে অর্ধপাচিত ঘাস ইত্যাদির অনেক তন্তু থাকে যা সহজেই জ্বলে। এর কিছু অংশ দাউদাউ করে জ্বলে গেলেও বাকি অংশ অনেক ক্ষণ অবধি ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে, যাতে কম আঁচেও রান্না করা যায়।
 
গুল: কয়লার গুঁড়ার সাথে গোবর, কাঠের গুঁড়া, মাটি ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরি গুলি, যা শুকিয়ে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এখন বাংলার ঘরে ঘরে গ্যাস ওভেন আসায় ঘুঁটে ও গুল-এর ব্যবহার উঠে গেছে প্রায়।
 
কয়লা: কয়লা এক ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি। প্রাচীনকালের বৃক্ষ জলমগ্ন পরিবেশে দীর্ঘদিন মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকলে ধীরে ধীরে তা কয়লায় পরিণত হয়। এটি কালো বা গাঢ় বাদামি বর্ণের খনিজ পদার্থ। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে কয়লার খনি আছে। কয়লার প্রধান ব্যবহার রান্নার জ্বালানি হিসেবে।
 
বাঙালির রান্নাবান্না সব পর্ব একসঙ্গে: https://draminbd.com/বাঙালির-রান্নাবান্না/
 
 
বাঙালির আসবাবপত্র, নৃপেন ভৌমিক 
বাঙালির বাসনকোশন, নৃপেন ভৌমিক
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
২নং পৃষ্ঠায় বাঙালির রান্নাবান্না: ৫—৭

error: Content is protected !!