বাঙালির রান্নাবান্না

বাঙালির রান্নাবান্না: ৫—৭
 
বাঙালির রান্নাবান্না ৫
আধুনিক যুগের উনান
ইকমিক কুকার: ইংরেজি শব্দ ‘হাইজিনিক’-এর ‘ইক’, ‘ইকনমিক’-এর ‘মিক’, তার সঙ্গে ‘কুকার’— সব মিলিয়ে ইকমিক কুকার। আজকের প্রেশার কুকারের পূর্বসূরি।
 
বিশ শতকের কলকাতার মধ্যবিত্তের ঘরে ইকমিক কুকার খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ইন্দুমাধব মল্লিক নামে কলকাতার এক ডাক্তার ১৯১০ সালে এই উনান আবিষ্কার করেন।
 
পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেব-এর রান্নাঘর দেখেই আইডিয়াটা ঝিলিক মেরেছিল তাঁর মাথায়। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, জ্বলন্ত উনুনে প্রথমে বড় একটি হাঁড়ি, তার পর ক্রমশ ছোটো থেকে আরও ছোটো, এই ভাবে পর পর ছয়টি হাঁড়ি বসানো। প্রতিটি হাঁড়িতেই খাবার রয়েছে। এই ভাবেই শত শত লোকের জন্য ভোগ রান্না হচ্ছে। মনে হল, এই ভাবে রান্না হলে পরিশ্রম বাঁচবে। সময় বাঁচবে। জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং খাদ্যগুণ বজায় রাখাও সম্ভব হবে। শুরু হল তাঁর ভাবনা-চিন্তা। কয়েক মাসের পরিশ্রমে তৈরি হল ‘ইকমিক কুকার’।
ভাত, ডাল, রুটি এবং তরকারি রান্নার উপযোগী চারটি চেম্বার থাকত এই কুকারে। কুকারের নিচের চেম্বারে কাঠকয়লা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকত। চাল, ডাল এবং তরকারিতে প্রয়োজনীয় নুন-মসলা দিয়ে বসিয়ে দিলেই রান্না শেষ। এটি ছিল জ্বালানি সাশ্রয়কারী স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার চুল্লি। প্রেসার কুকার বাজারে আসার পরে এটি অপ্রচলিত হয়ে গেছে।
 
প্রেসার কুকার: ইংরেজি শব্দ। ফরাসি চিকিৎসক ড্যানিস পাপিন ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসার কুকার আবিষ্কার করেন। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ভারতে প্রেসার কুকার আসে। উচ্চ চাপ ও তাপে রান্না করার উপকরণ। অধিকাংশ প্রেসার কুকার অ্যালমুনিয়াম-এর তৈরি। বিশেষজ্ঞদের প্রেসার কুকারে রান্নায় কি খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়?মতে, অত্যধিক গরম হয়ে গেলে প্রেসার কুকার-এর রান্নায় অ্যালমুনিয়ামের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে পুষ্টি-গুণ নষ্ট করে দিতে পারে। তবে ইদানীং, অনেক প্রেসার কুকারই অ্যালমুনিয়ামের তৈরি নয়। সেগুলি লোহা বা মিশ্র ধাতুতে তৈরি যা খাবারের পুষ্টি-গুণের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলে না।
 
প্রেসার কুকারে রান্নার ক্ষেত্রে এক একটি খাবারের ক্ষেত্রে একেক রকম ফল হতে পারে। যেমন, প্রেসার কুকারে মাংস রান্না করলে তা সহজেই হজম হয়ে যায়। আবার প্রেসার কুকারে ভাত রান্না করলে তাতে জল বসে সেটি আরও ভারী হয়ে যায়। এই ভাত বেশি খাওয়া যায় না। প্রেসার কুকারে রান্না করলে সময় বাঁচে, আর জ্বালানিও বাঁচে।
 
কেরোসিন স্টোভ: এই উনানের জ্বালানি হলো কেরোসিন তেল। ধাতু নির্মিত তেলের আধারে চুবানো থাকে Tin Plated Kerosene Stove, QB-S-04, Rs 200 /piece Queenbee Industries & Exim | ID: 13455458355 বলয় আকৃতির পলতের একটি প্রান্ত। পলতের অপর প্রান্তটি বেরিয়ে থাকে বার্নারের মাথায়। একটি চাবি দিয়ে পলতে বাড়ানো-কমানো যায়। দিয়াশলাই দিয়ে পলতে-তে আগুন ধরিয়ে দিলে তা জ্বলতে থাকে। আর এক ধরনের কেরোসিন স্টোভে পাম্প করে কেরোসিন তেল ফেলতে হয় বার্নারে যা আগে থেকে স্পিরিট জ্বলিয়ে গরম করে রোখা হয়। এল পি জি আসার পরে এই উনানের ব্যবহার কমে আসে।
 
গ্যাস ওভেন: এই উনুন জ্বলে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসে বা এলপিজি-তে। জেমস শার্প নামে এক ব্রিটিশ আবিষ্কারক ১৮৩৪ সালে প্রথম গ্যাস ওভেন বাণিজ্যিক ভাবে তৈরি করেন। গ্যাস আসে সিলিন্ডার থেকে। গ্যাস, সিলিন্ডার, বাংলাদেশ, বিবিসি অনেক দেশে বাড়িতে বাড়িতে পাইপ লাইন করা থাকে। তা দিয়ে রান্নাঘরে গ্যাস আসে। চাবি ঘোরালেই গ্যাস পাওয়া যায়। গ্যাস জ্বালানোর জন্য লাগে লাইটার। এই উনান খুব স্বাস্থ্যকর – ধোঁয়া ও কালি-ঝুলি মুক্ত। কাঠ ও কয়লার উনানে যেমন ধোঁয়াতে ফুসফুসের ক্ষতি হতো এতে আর তা হয় না।
মাইক্রোওয়ভ ওভেন: ইংরেজি শব্দ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন ড. পার্সি স্পেন্সার। আবিষ্কারের ইতিহাসটি একটু মজার।
 
ড. পার্সি স্পেন্সার আঠারো বছর বয়সে আমেরিকান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। সেই সময় জাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাডার ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য গবেষণা শুরু করেন।
 
১৯৪৫ সালের দিকে এক দিন অসাবধানতা বশত বেশ কয়েক বার তিনি হেঁটে চলে যান কতগুলি রাডার মেশিন-এর সামনে দিয়ে। বেলা বাড়তে থাকার সাথে সাথে তার কিছুটা খিদে জাগে। পকেটে রাখা চকলেট বারের দিকে হাত বাড়াতেই তিনি দেখলেন, চকলেট বারটি একে বারে গলে তরল হয়ে আছে!
 
তিনি ধারণা করলেন, হয়তো রেডিও তরঙ্গের এতে কোনও ভূমিকা আছে। সেটি প্রমাণ করতে তিনি এক বস্তা ভুট্টার মধ্য দিয়ে চালিয়ে দিলেন সেই রাডার-এর তরঙ্গ। ফট ফট শব্দ করে তৈরি হতে লাগলো পপকর্ণ!
 
শত্রু মারার যন্ত্র আবিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার হলো সুস্বাদু খাবার রান্নার মেশিন। প্রথম দিক-কার মাইক্রোওভেন ছিলো প্রায় ফ্রিজের সমান বড়ো; দামও ছিলো অনেক। আর এখনকার দিনের মাইক্রোওভেন তো ছোট্ট একটি বাক্সের সমান। তাতে রান্না হয় কেক-পেস্ট্রি-পুডিং সহ আরো কত মজার খাবার।
 
ওটিজি: ইংরেজি তিনটি শব্দের আদ্যক্ষর। পুরো নাম ওভেন-টোস্টার-গ্রিলার। এতেও খাবার গরম করা, গ্রিল করা, এবং বেক করা যায়। মাইক্রোওয়েভ-এর সঙ্গে ওটিজি-র কিছু পার্থক্য আছে। পার্থক্য গরম করার পদ্ধতিতে। মাইক্রোওয়েভ-এ গরম করার জন্য তাপ তৈরি হয় না, ওটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ বিস্তার করে খাদ্যকে গরম করে। ওটিজি হলো ছোটো ইলেকট্রিক যন্ত্র, যার মধ্যে তাপ উৎপাদক রড থাকে। ইলেকট্রিসিটি এই যন্ত্রে তাপে রূপান্তরিত হয়ে খাবার গরম করে। তাই কনভেকশন কুকার-এর চেয়ে ওটিজি-তে অনেক ভালো কেক হয়। তবে, দৈনন্দিন সংসারে খাবার গরম করাই যদি মূল কাজ হয় তাহলে কনভেকশন কুকার কেনাই ভালো। কারণ এতে অনেক দ্রুত খাবার গরম হয়। ইলেকট্রিকের খরচ অনেক কম। আবার উল্টো দিকে ওটিজি তুলনায় সস্তা।
 
ইনডাকশন কুকার: ইংরেজি শব্দ। ইনডাকশন কুকারে রন্ধন পাত্রের তলায় তামার তারের একটি কুণ্ডলী জড়ানো থাকে। তারের তলায় থাকে একটি কুলিং ফ্যান। তামার তারের কুণ্ডলীটির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করানো হয়। এই প্রবাহ একটি চুম্বকীয় ক্ষেত্র উৎপন্ন করে। সেই চুম্বকীয় ক্ষেত্রই আবার পাত্রটিতে আবেশিক বৈদ্যুতিক প্রবাহের সৃষ্টি করে, তাপ সৃষ্টি করে এবং সেই তাপ দ্বারা রান্নাবান্না করা, ঠাণ্ডা খাদ্য গরম করা ইত্যাদি সকল রন্ধন কার্য করা যায়।
 
ইনডাকশন কুকারে তাপ সৃষ্টি হওয়ার প্রক্রিয়া অতি দ্রুত৷ অন্য সকল রন্ধন-পাত্রের তুলনায় ইনডাকশন কুকার-এর গরম করার ক্ষমতা বহু উন্নত। বহু সময় ধরে স্থিরভাবে তাপ সৃষ্টি করতে ইনডাকশন কুকার-এর সমকক্ষ কেউ নয়। ইনডাকশন কুকারের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বেশ উন্নত৷ ইনডাকশন কুকার সম্পূর্ণ নিরাপদ, কারণ এর বাইরে, রন্ধন-পৃষ্ঠে তাপ সৃষ্টি হয় না৷ এই উনান হালের আবিষ্কার।
 
 
বাঙালির রান্নাবান্না ৬
 
রান্নার অন্যান্য উপকরণ:
ঘানি: ঘানি সাঁওতালি শব্দ। অনেকে মনে করেন, শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ঘন’ (মানে মুদ্গর) থেকে। এতে কাঠের তৈরি জামবাটির মতো যেটি থাকে তার নাম ‘পিঁড়ি’। পেষণ দণ্ডের নাম ‘জাঠ’। ঘানির নিচে যেখান দিয়ে তেল বের হয় তান নাম ‘পাতনালি’।
সেকালে তৈলবীজ ঘানিতে পিষে তেল বার করা হতো। আর এই পেষাই-এর কাজটি করা হতো গোরু বা বলদ দিয়ে। কাঠের ঘানিকে হিন্দিতে বলে ‘কাচ্চি ঘানি’।
 
তেল নিষ্কাশনের পরে যে অবশিষ্ট ছিবড়া পরে থাকে তাকে বলে ‘খইল বা খোল’। এটি মাছের খাদ্য, গোরুর খাদ্য এবং গাছের সার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ‘ছিবড়া’ শব্দটি দেশি যার অর্থ শিটা অর্থাৎ পদার্থের রস বার করে নেওয়ার পরে যা অবশিষ্ট থাকে।
কলু: এসেছে সাঁওতালি শব্দ ‘কুল্‌হু’ থেকে। যারা সরিষা ইত্যাদি পিষে তেল বের করে তাদের ‘কলু’ বলে। তাই কলু হলো তৈলকার, যার কাজ তেল উৎপাদন করা।
 
বাংলায় কলুর বলদ বলে একটি বাগধারা আছে। বলদ তেল তৈরি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে। কিন্তু দিন শেষে ফল লাভ করে তার মালিক কলু। এই সত্যটি উঠে এসেছে ‘কলুর বলদ’ বাগধারায়। যার অর্থ এমন ব্যক্তি যাকে অন্যের ইচ্ছা অনুসারে খেটে মরতে হয়, কিন্তু নিজের কোনও লাভ হয় না।
 
রেফ্রিজারেটর: ইংরেজি শব্দ। বিদ্যুতে চলে। খাদ্যবস্তু সংরক্ষণ করা, পানীয় ঠান্ডা করা এবং বরফ তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
মিক্সার: ইংরেজি শব্দ। বিদ্যুতে চলে। মসলা গুড়া করা, শাক-সবজি-ফলের কাই তৈরি করা, আদা-রসুন-পিঁয়াজ বাটা ইত্যাদি কাজে মিক্সার ব্যবহৃত হয়। মিক্সার আসার পর বাঙালির হেঁশেল থেকে শিল-নোড়া বিদায় নিয়েছে।
 
রান্নার উপাদান:
ভাত, ডাল, সবজি, আমিষ ইত্যাদি রান্না করতে যেসব আনুষঙ্গিক জিনিস লাগে তাদের কথা এখানে আলোচনা করা হলো।
তেল: তেল তদ্ভব শব্দ, এসেছে তৎসম ‘তৈল’ থেকে। সংস্কৃত. তৈল > পালি. তেল > প্রাকৃত. তেল, তেল্ল > বাংলা. তেল। হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি ও মৈথিলি-তেও ‘তেল’। মিলন দত্তের মতে, তেল শব্দটি এসেছে ‘তিল’ থেকে। তাঁর অনুমান, অতীতে হয়তো কেবলমাত্র তিলের তেলই হতো। কিন্তু এখন তেল শুধু তিল থেকে উৎপন্ন হয় না সরিষা, সয়াবিন, বাদাম, সূর্যমুখী, চালের কুঁড়ো, নারকেল থেকেও তেল হয়। এছাড়া আরও এক প্রকার অদৃশ্য তেল আছে, যেটি স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অফিস-আদালতে ব্যবহার হয়।
 
তেল একটি মেদসমৃদ্ধ খাদ্য। বাঙালি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে সরিষার তেল। দক্ষিণ ভারতে বেশি ব্যবহার হয় নারকেল তেল। প্রাচীন যুগে এবং মধ্য যুগে বাংলায় সরিষার তেল নিয়মিত ব্যবহার করা হতো। ধনী পরিবারে নিরামিষ রান্না হতো ঘি দিয়ে, আর মাছ ভাজা হতো সরিষার তেল দিয়ে। সেকালে তেল বানানো হতো ঘানিতে পিষে।
 
ঘি: শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ঘৃত’ শব্দ থেকে। সংস্কৃত. ঘৃত > প্রাকৃত. ঘিঅ > বাংলা. ঘি। তেলের মতো একটি স্নেহ জাতীয় খাদ্য যা রান্নার সময় ভাজাভুজিতে ব্যবহৃত হয়। গোরু বা মহিষের দুধ, সর, দই ইত্যাদি মন্থন করে হয় মাখন, তা জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় ঘি। গোরুর দুধের ঘি হলো ‘গাওয়া ঘি’, আর মহিষের দুধের ঘি হলো ‘ভৈসা ঘি’। বাঙালির পছন্দ গাওয়া ঘি। বাঙালি ঘি তৈরি করে দুধের সর জ্বাল দিয়ে। মিষ্টান্ন-এর দোকানে এই ধরনের ঘি পাওয়া যায় যা বাজারি ঘি-এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভেজাল মুক্ত।
 
প্রাচীন যুগে এবং মধ্য যুগে বাংলার ধনী পরিবারে ঘি-এর ব্যাপক ব্যবহার চালু ছিল। প্রাকৃত ভাষায় ঘি-এর ব্যবহারের কথা জানা যায়। মধ্যযুগ-এর মনসামঙ্গল কাব্যে ঘি দিয়ে গিমা শাক, কাঁঠালের বিচি, নিম পাতা ভাজার উল্লেখ আছে।
 
ডালডা: ডালডা এক প্রকার জমাট বাঁধা কৃত্রিম তেল জাতীয় পদার্থ। আমরা রান্নার কাজে যে সব তেল ব্যবহার করি সেগুলি ঘরের তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। যেমন সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, সুর্যমুখী তেল, ধানের কুঁড়ার তেল, তিলের তেল ইত্যাদি। এদের বলা হয় আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট।
 
ঘরের তাপমাত্রায় যেগুলি তরল নয়, তাদেরকে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বলা হয়। পশুর দেহ থেকে প্রাপ্ত বেশির ভাগ ফ্যাট হচ্ছে স্যাচুরেটেড, অন্যদিকে মাছ ও সবজি থেকে প্রাপ্ত ফ্যাট সাধারণত আনস্যাচুরেটেড হয়ে থাকে। আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণে হার্ট-এর রোগ ও অন্যান্য রোগ কম হয়।
 
শস্যজ তরল তেলের মধ্যে দিয়ে নিকেল অনুঘটক-এর উপস্থিতিতে অত্যুচ্চ চাপে হাইড্রোজেন গ্যাস চালনা করা হলে তখন আর তেল তরল থাকে না, নিরেট হয়ে যায়, এটিই হচ্ছে ডালডা। ডালডা অনেকের কাছে, এটি বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত।
ডালডা-র সবচাইতে বেশি ব্যবহার হয় বেকারি পণ্যে। এছাড়াও চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস ভাজা ইত্যাদিতে ডালডার ব্যবহার হয়ে থাকে। উপরন্তু, আমাদের দেশে পরোটা ভাজতে, লাচ্চা সেমাই বানাতে ডালডার ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে।
ডালডা জাতীয় স্যাচুরেটেড ফ্যাট খেলে শরীরে ভালো কোলেস্টেরল কমে যায়, ও খারাপ কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। সেই জন্য ভারত সরকার ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ভারতকে ডালডা-ফ্যাট মুক্ত করতে ঘোষণা দিয়েছে।
 
ডালডার সঙ্গে মার্জারিন-এর মূল তফাত হলো, ডালডা তৈরি করা হয় আংশিক ভাবে হাইড্রোজেন গ্যাস মিশিয়ে কিন্তু মার্জারিন তৈরি করা হয় সম্পূর্ণ হাইড্রোজেন গ্যাস মিশিয়ে। সেই জন্য ডালডা হয় জমাট ঘি-এর মতো শক্ত, আর মার্জারিন হয় মাখনের মতো নরম। এখানে বলে রাখা ভালো যে, মাখন আর মার্জারিন কিন্তু এক জিনিস নয়।
 
মার্জারিন: মার্জারিন হচ্ছে হাইড্রোজেন মিশ্রিত উদ্ভিজ্জ তেল। উদ্ভিজ্জ তেল-এর মধ্যে দিয়ে অতি উচ্চ চাপে হাইড্রোজেন গ্যাস পূর্ণ ভাবে চালিয়ে যখন জমাট বাধানো হয়, তখন এটি ট্রান্স-ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। মার্জারিন দেখতে ঠিক মাখনেরই মতো। এটি মাখনের মতো নরম বলে অনেকে একে মাখন বলে ভুল করেন। এই ট্রান্স-ফ্যাট রক্তে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়ায়। কেক, পেস্ট্রি ও বেকারির খাবার তৈরিতে এবং ভাজার জন্য মার্জারিন ব্যবহৃত হয়।
 
মসলা: শব্দটি এসেছে আরবি ‘মশালহ্‌’ থেকে। খাদ্যবস্তুকে সুস্বাদু ও সুগন্ধি করার জন্য রান্নার সময় ব্যবহার্য যে কোনও উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের অংশ যেমন ফুল, ফল, বীজ, কুঁড়ি, পাতা বাকল ইত্যাদি উপকরণকে বলা হয় মসলা। যেমন ধনে, জিরা, মরিচ, মেথি, সরিষা, পাঁচফোড়ন, তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, জয়ত্রী, আদা, পিঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি।
 
যেসব শস্য বীজ বাঙালি প্রাচীন কাল থেকে মসলা হিসাবে ব্যবহার করে আসছে তারা হলো: কালো জিরা, সাদা জিরা, ধনে, সরিষা, মেথি, মৌরি, রাঁধুনি, এলাচ, জায়ফল ইত্যাদি। যেসব ফুলকে মসলা হিসাবে ব্যবহার করা হয় তাদের কয়েকটি হলো: লবঙ্গ, জয়ত্রী।
গাছের পাতা হলো তেজপাতা, ধনে পাতা;
গাছের ছাল হলো দারচিনি;
কন্দ হলো আদা, পিঁয়াজ, রসুন।
জাফরান হলো ফুলের শুষ্ক কেশর;
লংকা, গোলমরিচ হলো গাছের শুষ্ক ফল।
 
বাঙালির রান্নাবান্না ৭
রান্নার উপাদান
লবণ/নুন: বাঙালির রান্নার একটি অত্যাবশ্যক উপাদান হলো নুন। এসেছে সংস্কৃত ‘লবণ’ থেকে। সংস্কৃত. লবণ > প্রাকৃত. লোণ, লুন > বাংলা. নুন। নুনকে হিন্দিতে বলে ‘নিমক’। আরবিতে ‘নামক’ শব্দের অর্থ নুন। অনেকে মনে করেন, নুন শব্দটি আরবি ‘নামক’ এবং সংস্কৃত ‘লবণ’ – এই উভয় উৎস থেকেই এসে থাকতে পারে।
 
প্রাচীনকালে খনি থেকে লবণ উত্তোলন করা হতো। ধারণা করা হয় যে, চীনের সানসি প্রদেশের ইয়নচুন-এর খনি-ই লবণের সবচেয়ে পুরানো ভূ-গর্ভস্থ উৎস। প্রাচীন রোম-এ সৈন্যদের বেতন হিসেবে দেওয়া হতো লবণ। ইংরেজি ‘সোলজার’ ও ‘স্যালারি’ শব্দ দুটির উৎপত্তি সল্ট থেকেই। এই লবণ নিয়ে অনেক খণ্ড যুদ্ধ হয়েছে। সামুদ্রিক লবণ বানানোর কৌশল জানার পরে লবণ সহজ লভ্য হয়েছে। ভারতবর্ষে লবণের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরানো। চরকসংহিতায় পাঁচ রকম লবণের কথা বলা আছে: সৈন্ধব লবণ, সমুদ্রী লবণ, বিট লবণ, সাম্ভর লবণ ও সোঞ্চর লবণ।
সৈন্ধব লবণ: এই লবণ হলো এক প্রকার খনিজ লবণ যা মূলত পাওয়া যায় সিন্ধু দেশে। এই লবণ খনি থেকে তোলা হয়। চরকসংহিতায় সৈন্ধব লবণকে ‘লবণোত্তম’ বা শ্রেষ্ঠ লবণ বলা হয়েছে।
সমুদ্রী লবণ: আমরা রোজ যে নুন খাই তা হলো সমুদ্রী লবণ। তা তৈরি হয় সমুদ্রের লোনা জল শুকিয়ে। সমুদ্র জাত লবণকে করকচ লবণও বলা হয়। করকচ ধ্বন্যাত্মক শব্দ, এসেছে সংস্কৃত. ‘কড়ক’ থেকে। সমুদ্রের জল বা ফেনা শুকিয়ে যারা লবণ তৈরি করে তাদের বলে ‘নুনিয়া’।
বিট লবণ: এই লবণ হলো কবিরাজি ওষুধে ব্যবহৃত কৃত্রিম লবণ। সৈন্ধব লবণের সঙ্গে হরীতকীর গুঁড়া মিশিয়ে ভেজে তৈরি করা হয় বিট লবণ।
সাম্ভর লবণ: রাজস্থানের সম্বর সরোবরের লোনা জল থেকে তৈরি লবণের নাম সাম্ভর। একে সম্বর ও সুকস্তুরী লবণও বলা হয়।
 
সোঞ্চর লবণ: সোঞ্চর লবণ কালো রঙের। কালো রঙের এই নুনকে কালো লবণও বলা হয়। লবণ মিশ্রিত মাটি থেকে এই লবণ বের করা হয়।
খাদ্যে স্বাদ আনা ছাড়াও লবণের অনেক উপকারী ভূমিকা আছে। বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যিক ইলেকট্রোলাইট ও সোডিয়াম ছাড়াও ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালশিয়াম পাওয়া যায় অপরিশোধিত লবণে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের বাসিন্দাদের শরীরে লবণের প্রয়োজন বেশি। যারা শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাদের বেশি লবণ খাওয়া জরুরি। দেহে লবণের পরিমাণ কমে গেলে যেমন ক্ষতিকর, তেমন বেড়ে গেলেও ক্ষতিকর। উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে নুন কম খেতে বলা হয়। দীর্ঘকাল ধরে নুন কম খেতে খেতে রোগীর রক্তে সোডিয়াম-এর পরিমাণ কমে যায় – রোগী ঝিমিয়ে পড়ে, খিঁচুনি হতে পারে, এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ দিন লবণ-স্বল্পতায় ভুগলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
 
কলকাতার বউবাজার অঞ্চল-টির নামকরণ লবণের সাথে জড়িয়ে আছে। ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে ভারত থেকে লুঠ করা মাল জাহাজে ভরে ইংল্যান্ডে পাঠান হতো। খালি জাহাজ ফেরার সময় ঝড়ের কবলে পড়লে সমুদ্রে ডুবে যেত। ইংরেজ সাহেবরা তাই সেই জাহাজগুলি সবচেয়ে সস্তার সামগ্রী নুন দিয়ে ভরে ভারতে পাঠাতে লাগল। প্রথম প্রথম সেই নুন এমনিই ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু পরবর্তী কালে দেশি বাজারে বিলিতি নুন বিক্রির জন্য ইংরেজ-রা কিছু বাঙালিকে কাজে লাগায়। এদের এক জন ছিলেন বাবু বিশ্বনাথ মতিলাল। অনেকের মতো তারও ভাগ্য ফিরেছিল নুনে। এক পুরুষেই তিনি প্রচুর টাকা রোজগার করেছিলেন নুন বেচে। বাড়ির পাশে বসিয়েছিলেন একটি বাজার এবং কিনে নিয়েছিলেন আশেপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তার অগাদ বিষয় সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছিলেন উত্তরাধিকারীদের মধ্যে। পুত্রবধূকে দিয়েছিলেন বাড়ির পাশের বাজারটি। সেই বউরানি-র বাজারের নামই লোকের মুখে মুখে হয়ে যায় বউবাজার। ক্রমে পুরো পল্লী-টিরই নাম হয় বউবাজার।
 
নুন খাই যার, গুণ গাই তার। না গাইলে তা হয় নিমকহারামি। বিশ্বাসঘাতক অর্থে নিমকহারাম শব্দটি আরবি থেকেই বাংলায় এসেছে। আলুনি মানে লবণহীন। যে রান্নায় নুন দেওয়া হয়নি তাকেই বলে আলুনি।
 
জল: রান্নার একটি অপরিহার্য উপাদান হলো জল বা পানি। বাংলার প্রাচীনতম গ্রন্থ চর্যাপদ-এ জল ও পানি দুটি শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে এপার বাংলার মানুষ পানিকে জল বলেন, আর ওপার বাংলার মানুষ জলকে পানি বলেন।
 
প্রাচীন বাংলায় পুকুর, দিঘি বা নদীর জল খাওয়া হতো। পরে পাতকুয়া এবং আরও পরে টিউবওয়েল এসেছে। কাঠকয়লার মধ্যে দিয়ে পরিস্রুত করে তাতে কর্পূর বা কেওড়া জল মিশিয়ে জলকে সুপেয় করা হতো। গরম কালে ঠান্ডা রাখার জন্য জলকে রাখা হতো পোড়া বেলে মাটির পাত্রে। সেই পাত্রের গায়ে ভিজে কাপড় জড়ানো থাকত।
 
জলচল প্রথা: মধ্যযুগে হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে এই প্রথা চালু ছিল। বাংলার প্রথম ও প্রধান স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট-এর ‘প্রায়শ্চিত্তকরণ’ গ্রন্থে জলচল প্রথার কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। চণ্ডালের স্পর্শ করা ও অন্ত্যজ জাতির স্পর্শ করা জল পান করলে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো।
 
হিন্দু সমাজে ঘটি বা গেলাসে সরাসরি মুখ লাগিয়ে জল খাওয়ার নিয়ম ছিল না। জল খেতে হতো আলগোছে, মুখে জল পাত্র না লাগিয়ে। ভোজন শুরু করার আগে গেলাস থেকে ডান হাতের তালুতে সামান্য পরিমাণ জল নিয়ে থালার চারপাশে ছিটিয়ে তারপর খাওয়া শুরু করতে হতো। বৈষ্ণব ও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই প্রথা এখনও চালু আছে।
 
মোগল আমলে পানীয় জল ঠান্ডা করা এবং বরফ আমদানির ব্যাপারে তদারকি করার জন্য একটি আলাদা সরকারি দফতর ছিল। সেই দফতরের নাম ছিল ‘আবদারখানা’। পোড়া বেলে মাটির কুঁজোতে পানি ভরে তার মুখ ভিজে কাপড় দিয়ে বেঁধে একটি বড়ো গামলায় রাখা হতো। সেই গামলায় থাকত সোরা মেশানো পানি। কুঁজোর গলায় তিন পাক রেশম দড়ি দিয়ে কুঁজোকে গামলার মধ্যে ঘোরানো হতো। খানিক ক্ষণ ঘোরালেই কুঁজোর জল খুব ঠান্ডা হতো। একে বলা হতো ‘গড়গড়ি’-র পানি। বাদশাহের পাকশালায় গঙ্গা ও যমুনার পানি ব্যবহার করা হতো – সেই জল আনা হতো হরিদ্বার বা প্রয়াগ থেকে। হিমালয় থেকে বরফ আনা হতো।
 
কেওড়া জল: কেওড়া, কেয়া বা কেতকী ফুলের নির্যাস মেশানো জল। খাওয়ার জলে বা খাবারে সুগন্ধ আনার জন্য ব্যবহার করা হয়। মোগলাই রান্নায়, বিরিয়ানিতে, মিষ্টিতে এর ব্যবহার আছে।
 
গোলাপ জল: গোলাপের গন্ধ যুক্ত রং-হীন তরল। মোগলাই রান্নায়, পোলাও রান্নায় গোলাপ জল ব্যবহার করা হয়। সদ্য ফোটা গোলাপের পাপড়ি জলে ফেলে সূর্যের আলোয় সাত-আট দিন রেখে দিয়ে তৈরি করা হয় গোলাপ জল। আজকাল অবশ্য কৃত্রিম উপায়েও গোলাপ জল তৈরি হচ্ছে।
 
 
 
 
বাঙালির আসবাবপত্র, নৃপেন ভৌমিক 
বাঙালির বাসনকোশন, নৃপেন ভৌমিক
 
পরবর্তী পৃষ্ঠায়  বাঙালির রান্নাবান্না: ৮—১২
 

Language
error: Content is protected !!