বাঙালির সামাজিক সম্পর্ক: বাঙালির অসামাজিক সম্পর্ক: সামাজিক ও অসামাজিক

 

নৃপেণ ভৌমিক (Nripen Bhaumik )

বাঙালির সামাজিক সম্পর্ক: বাঙালির অসামাজিক সম্পর্ক: সামাজিক ও অসামাজিক

বাঙালির সামাজিক সম্পর্ক:
অতিথি: অতিথি এর অর্থ কোনো গৃহস্থের গৃহে আগত অনাত্মীয় ব্যক্তি, আগন্তুক, অভ্যাগত। [সং. অত + ইথি]। অতিথি পরায়ণ, অতিথি বৎসল মানে অতিথিকে যত্ন করে এমন, অতিথির সেবা করাই যার স্বভাব। অতিথি-শালা মানে অতিথির থাকবার স্থান বা গৃহ। ‘অতিথি শিল্পী’ অর্থ যে আমন্ত্রিত শিল্পী বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে। অতিথি সৎকার, অতিথি সেবা অর্থ অতিথিকে আহার ও আশ্রয় দেওয়া বা তার ব্যবস্থা করা।
বন্ধু: বন্ধু সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ মিত্র, সখা, মিতা, সাথী, বয়স্য, সঙ্গী, ইয়ার, দোস্ত ইত্যাদি। ‘বন্ধুতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক। বন্ধুতার মূল ভিত্তি হলো মনের মিল।
 
দোস্ত: এসেছে ফারসি শব্দ ‘দোস্ত্‌’ থেকে। মানে বন্ধু। ‘দোস্তি’ মানে বন্ধুত্ব। যেমন, দোস্তি করা, দোস্তি পাতানো।
 
ইয়ার, এয়ার: এসেছে ফারসি ‘ইয়ার্‌’ থেকে। মানে সখা; বয়স্য; বন্ধু। ‘গেলাস-সাথী মস্ত্ ইয়ার’ – কাজী নজরুল ইসলাম; ‘এ ভব মাঝে সবই ফক্কা – জেনেছি আমরা পাঁচটি এয়ার’ – দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।
 
এই ‘ইয়ার’ থেকে তৈরি হয়েছে ‘ইয়ারকি, ইয়ার্কি’ শব্দ যার মানে ফাজলামি, রসিকতা, তুচ্ছ বা বৃথা আমোদে তৎপরতা। ‘যা যা ইয়ারকি করিসনি’ -রাজশেখর বসু; ‘আবার এয়ার্কি হচ্ছে?’ – সুকুমার রায়।
 
‘ইয়ারবক্সি’ মানে রসিক বন্ধু বা রঙ্গপ্রিয় সঙ্গী; আড্ডার সঙ্গী; সমপর্যায়ের বন্ধু-বান্ধব; তুচ্ছ ও হালকা আনন্দে বা কাজে সাহায্যকারী বন্ধুর দল; কুকর্মের সঙ্গী। ‘সভাস্থ ইয়ারবক্সির দল’ – প্রথম চৌধুরী; ‘ঘাসের উপর ইয়ারবক্সী….. বসবে’ – সৈয়দ মুজতবা আলী; ‘ইংরাজি-নবিশ ইয়ারবক্‌শিকে মদ খাওয়ান’ – বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
 
সই-সখি-সহেলি-সহচরী: সখীর কথ্য রূপ হলো ‘সই’। সাধারণত দুটি মেয়ে নিজেদের মধ্যে সই পাতায়। ‘সই’ শব্দের সাধারণ অর্থ সখি, মিতা, বন্ধু, সুহৃদ, সহেলি, সহচরী ইত্যাদি। সংস্কৃত ও বিভিন্ন পৌরাণিক সাহিত্য-নাটকে সই-সখি-সহেলি-সহচরীদের দেখা পাওয়া যায়।
শাগরেদ: ফারসি শব্দ ‘শাগির্দ’ থেকে উদ্ভূত শাগরেদ শব্দের অর্থ (বিশেষ্যে) শিষ্য, ছাত্র, চেলা, সহকারী ইত্যাদি। উচ্চারণ শাগ্‌রেদ।
সাঙাত, স্যাঙাত: এর অর্থ – ১. বন্ধু, মিতা, সখা ২. (মন্দার্থে) সহচর, সহযোগী, সহকর্মী। এসেছে সংস্কৃত. ‘সঙ্গতু’, ‘সাঙ্গতিক’ থেকে। ‘সাঙাতি’ মানে সাঙাতের কাজ।
 
চেলা: এর অর্থ হলো শিষ্য, ছাত্র; শাগরেদ। এসেছে হিন্দি. ‘চেলা’ থেকে।
 
কমরেড: কমরেড কথার প্রকৃত অর্থ বন্ধু বা সাথী। শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ একই কামরার বন্ধু। ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৮৯-১৭৯৯) থেকে শব্দটি জনপ্রিয় হয় ওঠে। পরবর্তীকালে কমিউনিজম আন্দোলনে সতীর্থ রাজনৈতিককে সম্বোধন করতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কমিউনিস্ট বিপ্লবী চে গুয়েভারা লিখেছিলেন, ‘If you tremble with indignation at every injustice, then you are a comrade of mine’.
সতীর্থ: সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ একই সময়ে অধ্যয়নকারী একই গুরুর ছাত্র, ছাত্রী, সহপাঠী, সহাধ্যায়ী। (সংস্কৃত. স (সমান) + তীর্থ (গুরু)। এই গুরু বিদ্যার, ধর্মের নয়।
 
জাতভাই: একই জাতির বিভিন্ন সদস্যকে বুঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
 
গুরুভাই: একই গুরুর বিভিন্ন শিষ্যকে বলা হয় গুরুভাই। গুরুভাই ও সতীর্থ সমার্থক নয়। এই গুরু মানে ধর্মীয় গুরু। যেমন সাই বাবা, লোকনাথ বাবা, অনুকূল ঠাকুর।
 
শিষ্য: সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ নির্দিষ্ট কোনও মতাবলম্বী ব্যক্তির ভক্ত (গান্ধির শিষ্য); ছাত্র; চেলা।
 
ঘরানা: হিন্দি শব্দ যার অর্থ পরিবার। বংশবিশেষ কর্তৃক পুরুষানুক্রমে প্রচলিত অনুশীলন রীতি। সাধারণত সংগীতের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কোনও একজন সঙ্গীত আচার্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সঙ্গীত পরিবেশনের স্বতন্ত্র ধারা।
 
ছোকরা: এর অর্থ – বিশেষ্য. বালক; নবযুবক; কিশোর; ছোঁড়া; বালকভৃত্য। বিশেষণ. অপরিণত বয়স্ক (একটা ছোকরা চাকর আছে)। ছোকরা শব্দটি এসেছে হিন্দি ভাষা থেকে। ছোকরার স্ত্রী-লিঙ্গ ছুকরি।
 
এছাড়াও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আরও অনেক সামাজিক সম্পর্ক আছে যেমন: অহিনকুল সম্পর্ক, শত্রুতা, সহযাত্রী, সহকর্মী, প্রভু-ভৃত্য, গোলাম, ঝি-চাকর ইত্যাদি।
 
 
বাঙালির অসামাজিক সম্পর্ক
বেশ্যা: ‘বেশ্যা’ সংস্কৃত শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বেশ’ থেকে। সংস্কৃত. বেশ + য + আ। মোনিয়র উইলিয়ামস তাঁর সংস্কৃত-বাংলা অভিধানে ‘বেশ’ শব্দটির মানে লিখেছেন বেশ্যার গৃহ বা বেশ্যালয়। বেশ্যা বলতে আমরা সেই স্ত্রী-লোকদের বুঝি যারা অর্থের বিনিময়ে পুরুষ নির্বিশেষে যৌন মিলনে রত হয় বা নিজের দেহ সমর্পণ করে। সমার্থক শব্দ: পতিতা, গণিকা, খানকি, নাগরী, বারবণিতা, বারাঙ্গনা, দেহোপজীবিনী, নগরপটিয়সী ইত্যাদি। ভারতে বেশ্যাবৃত্তি বেআইনি।
 
কথিত আছে যে, ‘বেশ’ শব্দটির সাথে উজ্জয়িনীর মহারাজা বিক্রমাদিত্যের নাম জড়িয়ে আছে। বিক্রমাদিত্য ছিলেন বিদ্যোৎসাহী এবং প্রজাবৎসল মহারাজা। তাঁর রাজসভাতেই কালিদাস প্রমুখ নবরত্নরা ছিলেন। প্রজাদের সুবিধার্থে বিক্রমাদিত্য রাজপথের ধারে ধারে অনেক জলসত্র (তৃষ্ণার্ত পথিকদের বিনামূল্যে জল দান করার স্থান) গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি এই জলসত্রগুলির নাম দিয়েছিলেন – ‘বেশ’, আর এই জলসত্রগুলির পরিচালনের ভার দিয়েছিলেন রাজ্যের মহিলাদের। পথিক, বণিক, সৈনিক, পর্যটকরা প্রথমে শুধু জল পেলেও কালক্রমে পেতে থাকেন জল, খাদ্য, আশ্রয় এবং নারী-সঙ্গ। কথিত আছে যে, এইভাবেই ‘বেশ’-এর মালকিন ‘বেশ্যা’য় পরিণত হন এবং ‘বেশ্যা’ শব্দটির উৎপত্তি হয়। বেশ্যার উৎপত্তির এই কাহিনিটি সঠিক বলে মনে হয় না।
 
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় মৌর্য যুগের বহু আগে থেকেই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে গণিকা বা বেশ্যা রাখা হতো। পুরাণে উল্লেখ আছে যে, বেশ্যা দর্শনে ‘দিন ভালো যায়’। মহাভারতে উল্লেখ আছে, উৎসবের সময় বেশ্যারা রক্তবর্ণ বস্ত্র, মালা, স্বর্ণালঙ্কার পরে উৎসবে যোগদান ছাড়াও যুদ্ধের সময় সৈন্যবাহিনীর অনুচারী হতো।
 
তন্ত্রশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, চক্রপূজায় পাঁচ শ্রেণির বেশ্যা শক্তি বা দেবীর স্থান অধিকার করতে পারে। পাঁচটি শ্রেণি হলো: ১. নাগরী – নগরবাসিনী গণিকা ২, রাজবেশ্যা – রাজার দ্বারা অনুগৃহীত গণিকা ৩. গুপ্ত বেশ্যা – সদ্বংশীয়া গোপন অভিসারী নারী ৪. ব্রহ্ম বেশ্যা -তীর্থস্থানে যারা গণিকাবৃত্তি করে ৫. দেববেশ্যা – মন্দিরের দেবদাসি।
 
তাহলে এটিই প্রতিপন্ন হয় যে, বিক্রমাদিত্যের অনেক আগে থেকেই ভারতে বেশ্যাবৃত্তি চালু ছিল। ভারতে গণিকাবৃত্তি হিন্দু যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ অবধি চলে আসছে। বর্তমানে কলকাতার সোনাগাছিতে এদের সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করতে দেখা যায়।
‘খানকি’ বলে যে গালির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত তার অর্থও বেশ্যা। শব্দটি এসেছে ফারসি ‘খান্‌গী’ থেকে। ‘খানকিপনা’ মানে বেশ্যার মতো আচরণ।
 
বিষকন্যা: সংস্কৃত শব্দ। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর History of Hindu Chemistry গ্রন্থে ‘বিষকন্যা’ নামক এক ধরনের গণিকার কথা লিখেছেন। যারা বড়ো হতো রাজার হারেমে। ছোটোবেলা থেকে ওদের ক্রমবর্ধী মাত্রায় অ্যাকোনাইট নামক বিষ খাইয়ে বড়ো করা হতো। শত্রু রাজা বা বিপক্ষের সেনাপতিকে কাবু করার জন্য এদের উপহার পাঠানো হতো। ওদের সঙ্গে সহবাস ছিল নিশ্চিত মৃত্যু!
নাগর: নাগর সংস্কৃত শব্দ। বঙ্গীয় শব্দকোষে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, এটি বৈদিক শব্দ। ‘নগ’ (ন + √গম্ + ড) মানে যা যায় না, যা স্থির। অর্থাৎ পর্বত। নগেন্দ্র বলতে তাই বুঝি হিমালয়কে। অন্য মানেও হয় অবশ্য: গাছ। গাছও চলে না। পর্বততুল্য প্রাসাদ অর্থাৎ ‘নগ’ যেখানে আছে তা-ই হল নগর।
 
‘নাগর’ শব্দের আদি অর্থ নগরবাসী, নগরস্থিত, নগরসম্বন্ধীয়। গ্ৰামবাসীর তুলনায় নগরবাসী লেখাপড়া বেশি জানে, তাই ‘নাগর’-এর একটা মানে দাঁড়াল বিদগ্ধ। স্বভাবত সুভদ্র আদব-কায়দাতেও নগরবাসী দুরস্ত, তাই শিষ্ট অর্থটিও দাঁড়িয়ে গেল। আবার গ্ৰামীণ লোকজনের তুলনায় নগরবাসীর স্বার্থবুদ্ধিও বেশি। তাই ‘নাগর’ শব্দের একটি মানে দাঁড়াল চতুর বা ধূর্ত। তা থেকে ক্রমে রসিক, গোপন প্রণয়ী, লম্পট। এখন ‘নাগর’ প্রায় অপশব্দের পর্যায়ে পৌঁছেছে। নগরের যে লম্পট পুরুষ নাগরী বা বেশ্যার প্রেমে আসক্ত সেই হলো নাগর। ‘নাগরী’ মানে প্রণয়িনী।
 
পরকীয়া: সংস্কৃত শব্দ। পরকীয় শব্দের স্ত্রী-লিঙ্গ। যে প্রণয়িনী অপর পুরুষের পত্নী। বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক ভারতীয় আইনে একটি অপরাধ ছিল এবং যে পুরুষ এই ধরনের সম্পর্কে যুক্ত থাকবেন বলে আদালতে প্রমাণিত হবে, তাঁর সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের ব্যবস্থা ছিল এই দণ্ডবিধিতে। প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো এই আইনকে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বিবাহিত কোনও নারী বা পুরুষ যদি স্বামী বা স্ত্রী-র বাইরে অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক করেন – যাকে বলা হয় পরকীয়া – তা আর ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে না। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলেছে, পরকীয়া সম্পর্ককে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসাবে আগেও যেমন গ্রাহ্য করা হতো, এখনও সেই ভাবেই করা হবে। পরকীয়া কোনও অপরাধ নয়। স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি নয়। তাই স্বামী কখনওই স্ত্রীর উপর জোর খাটাতে পারে না। সমাজে নারী ও পুরুষের অধিকার সমান। ভারতীয় আইনে পরকীয়া বৈধ।
 
অজাচার: সংস্কৃত শব্দ। অজাচার হলো ঘনিষ্ঠ রক্তের সম্পর্ক আছে এমন আত্মীয়ের সঙ্গে যৌনকর্ম বা যৌনসঙ্গম। সাধারণত অজাচার তিনটি যৌন সম্পর্কে ইঙ্গিত করে: কন্যার সঙ্গে পিতার, পুত্রের সঙ্গে মাতার এবং বোনের সঙ্গে ভাইয়ের যৌন সঙ্গম। সকল প্রধান ধর্মেই অজাচার নিষিদ্ধ ও গর্হিত হিসাবে ধিকৃত।
 
সমকামিতা: সংস্কৃত শব্দ। সমকামিতা বলতে সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি ‘রোমান্টিক আকর্ষণ, যৌন আকর্ষণ অথবা যৌন আচরণকে বোঝায়। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো ভারতেও সমকামিতা বেআইনি ছিল। ২০১৩ সালে সমকামিতাকে অবৈধ ঘোষণা করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৮ সালে আবার ওই কোর্টই সমকামিতাকে বৈধ বলে ঘোষণা করে।
 
ধর্ষণ: সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ নারীকে বলাৎকার। কোনও ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোনও ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া কিংবা অন্য কোনও ভাবে তার দেহে যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে বুঝায়। বিশ্বজুড়ে প্রধানত পুরুষদের দ্বারাই নারীর ধর্ষণ সংঘটিত হয়। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন – কোনও অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনও ব্যক্তির সঙ্গে যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। যে কোনও লিঙ্গ, বয়স, জাতি, সংস্কৃতি বা ধর্মের ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হতে পারে। ধর্ষণকে বেশ কয়েকটি ধরনে ভাগ করা হয়, যেমন- গণধর্ষণ, বৈবাহিক ধর্ষণ, অজাচার ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, কারাগারে ধর্ষণ এবং যুদ্ধকালীন ধর্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে কোনও রকম শারীরিক ক্ষতির শিকার না হয়ে কোনও ব্যক্তি ধর্ষণের শিকার হতে পারে।
 
ধর্ষকাম হলো বিপরীত লিঙ্গকে পীড়ন করে যৌন তৃপ্তি লাভ করা। যে এতে আসক্ত তাকে বলা হয় ধর্ষকামী। সে নারী বা পুরুষ উভয়ই হতে পারে। ‘ধর্ষ’ সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ পীড়ন, অত্যাচার।
ধর্ষণ ও ‘বলাৎকার’ সমার্থক শব্দ।
 
শ্লীলতাহানি: সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ নারীর সম্মান বা শ্লীলতাকে নষ্ট করা। ভারতীয় আইনে এটি দণ্ডণীয় অপরাধ। শ্লীলতাহানি আর ধর্ষণ সমার্থক নয়। ‘শ্লীল’ সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ ভদ্র, শিষ্ট, রুচিসম্মত।
খুনি: এসেছে ফারসি শব্দ ‘খুন’ থেকে। খুনি মানে যে হত্যা করে, বিশেষত মানুষকে। দণ্ডণীয় অপরাধ। ভারতে খুনির শাস্তি ফাঁসি।
 
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/

আমি শুবাচ থেকে বলছি

 
 
নৃপেন ভৌমিকের অন্যান্য লেখার সংযোগ নিচে দেওয়া হলো
 
বাঙালির মসলাপাতি. নৃপেন ভৌমিক
 

 

 
কোঠা
ইটের অথবা পাথরের ঘরের নাম ‘কোঠা’ (কোটা)। বড়ো পাকা বাড়ি বা অট্টালিকা বোঝাতেও কোঠা শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যেমন দালানকোঠা। কোঠা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কোষ্ঠ’ থেকে। সংস্কৃত. কোষ্ঠ > প্রাকৃত. কুট্‌ঠ, কোট্‌ঠ > বাংলা. কোট, কোঠ, কোঠা। এর মানে পাকাবাড়ি বা ইট দিয়ে নির্মিত নিবিড়ভাবে আবদ্ধ এক-দ্বার কক্ষ। আগে কোঠাঘরের ছাতও কাঁচা বাড়ির চালের মতো ঢালু হতো। প্রাচীন বাংলায় পূজার মণ্ডপ তৈরি করা হতো ইট-পাথর গেঁথে (পুজোর দালান), কিন্তু মানুষের বাসগৃহ ছিল কাঁচা।
 
সুকুমার সেনের মতে, দেবমন্দির ও কোষাগার ছাড়া কোঠাঘরের ব্যবহার মুসলমান অধিকারের আগে ছিল না। পোর্তুগিজ, দিনেমার, ইংরেজ প্রভৃতি বিদেশি বণিকদের আগমনের পরই বঙ্গদেশে সাধারণ লোকের ইটের ঘর করার প্রবণতা বেড়ে যায়। ঘরে জানালা লাগাবার রীতিও এই সময় থেকেই চালু হয়।
 
‘দালানকোঠা’ হলো বড়ো আকারের পাকা বাড়ি বা অট্টালিকা। ‘চিলেকোঠা’ হল ছাদের উপরের সিঁড়িসংলগ্ন ছোটো ঘর। ‘চিলে’ শব্দটি এসেছে ‘চিলতা’ বা তার কথ্য রূপ ‘চিলা’ থেকে। ছাদের ওপরের এক চিলতে সরু ঘরকেই বলে চিলেকোঠা। চিলেকোঠার সংস্কৃত নাম হলো বলভি, বলভী [সং. √ বল্ (আচ্ছাদন) + অভি, ঈ]।
 
‘কোট’ বা ‘কোঠ’ শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয় সুরক্ষিত কক্ষ বা দুর্গ অর্থে। শহর বা নগরের নামেও ‘কোট’ শব্দটির ব্যবহার আছে, যেমন শিয়ালকোট, পাঠানকোট, মঙ্গলকোট ইত্যাদি।
 
‘কুঠি’ হলো ‘কোঠা’ শব্দের খর্ব রূপ অর্থাৎ ছোটো কোঠা। এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘কোষ্ঠিকা’ থেকে। ইংরেজরা আসার পরে ওদের কার্যালয় বা বাসস্থান হিসাবে শব্দটি প্রচলিত হয়। যেমন নীলকুঠি, রেশমকুঠি, কালেক্টরের কুঠি, ম্যাজিস্ট্রেটের কুঠি। কুঠির মালিককে বলা হতো ‘কুঠিয়াল’।
 
কোঠা থেকে আরও কিছু শব্দ বাংলাভাষায় এসেছে। ‘কোঠার’ (মধ্য বাংলা) এসেছে ‘কোষ্ঠাগার’ থেকে, অর্থ কারাকক্ষ। ‘কুঠুরি’ হলো ‘কোঠার’ শব্দের খর্ব রূপ, মানে ছোটো কোঠা। যেমন ‘চোর-কুঠুরি’ – মানে চোর থেকে জিনিস রক্ষা করার নিমিত্ত তৈরি সুরক্ষিত কক্ষ। ‘কোটাল’ শব্দটি বাংলায় এসেছে ‘কোষ্ঠ পাল’ থেকে, যার মানে কারারক্ষী, খাজনা-খানার প্রহরী।
 
প্রাচীন বাংলায় কোঠাবাড়ি বা পাকাবাড়ি বানানোর উপাদানগুলি ছিল ইট, চুন, সুরকি। ইট গাঁথা হতো চুন-সুরকি-জলের মিশ্রণ দিয়ে। এখন ইট গাঁথা হয় বালি-সিমেন্ট-জল মিশ্রণ দিয়ে।
 
ইট: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘ইষ্টক’ থেকে। সংস্কৃত. ইষ্টক > প্রাকৃত. ইট্টা > বাংলা. ইট। পাকা ঘর বাড়ি ইত্যাদি তৈরি করার জন্য পোড়া মাটির পিণ্ড বিশেষ; ইষ্টক। আঠালো মাটির সঙ্গে খড়কুটো, তুষ প্রভৃতি মিশিয়ে কাদামাটি প্রস্তুত করা হয়। নরম কাদা-মাটিকে নির্দিষ্ট আকারের ছাঁচে ঢেলে কাঁচা ইট তৈরি হয়, তারপর এক রোদে শুকানো হয়। কাঁচা ইটকে আগুনে পোড়ালে পাকা ইট তৈরি হয়। বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়ানো ইট ব্যবহার হয়ে আসছে। যদিও ইট পাথরের মত দীর্ঘস্থায়ী এবং মজবুত নয়; তারপরও সহজলভ্যতা, অল্প খরচ এবং স্বল্প ওজনের জন্য এর জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহার সর্বাধিক।
 
‘ঝামা ইট’: ইট বানানোর সময় কিছু ইট বেশি পুড়ে যায় ও কেকের মত ফুলে উঠে এক ফোপড়া শক্ত কালচে খয়েরি রঙের আঁকা-বাঁকা আকৃতির ইট তৈরি করে, যাকে বলে ঝামা বা ‘ঝামা ইট’। ঝামা শক্ত ও এবড়ো খেবড়ো বলে ঘষামাজার কাজে ব্যবহৃত হয়। ‘ঝামা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ঝামক’ শব্দ থেকে।
 
‘ইটভাঁটা’ বা ‘ইটখোলা’ হলো যে জায়গায় মাটি কেটে ছাঁচে ফেলা হয় ও সেই পিণ্ড কাঠ পুড়িয়ে, বা কখনো কয়লা জ্বালিয়ে শক্ত ইট তৈরি হয়। ভাঁটি বা ভাঁটা দেশি শব্দ যার অর্থ ইট, মাটির পাত্র, চুনাপাথর ইত্যাদি পোড়ানো ও শুকানোর জন্য ব্যবহৃত বড়ো চুল্লি।
 
‘ইটপাটকেল’ মানে পুরো ইট ও টুকরো ইট, ইট ও তার টুকরো। ‘ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়’ – এর অর্থ কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে বিনিময়ে দুর্ব্যবহার পেতেও হয় অর্থাৎ যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাঙা ইটের মতো লাল রঙকে বলে ‘পাটকেলি রং’। ‘ইটের পাঁজা’ হলো পোড়াবার জন্য রাখা ইটের স্তূপ বা পোড়ানো ইটের স্তূপ।
 
‘টেরাকোটা’: মানুষের ব্যবহার্য পোড়া মাটির তৈরি সকল রকমের দ্রব্য টেরাকোটা নামে পরিচিত, সেই অর্থে ইটও টেরাকোটার অন্তর্ভুক্ত। টেরাকোটা একটি লাতিন শব্দ: ‘টেরা’ অর্থ মাটি, আর ‘কোটা’ অর্থ পোড়ানো। ভারতবর্ষের সিন্ধু নদীর তীরে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ বৎসর বা তারও আগে বিকশিত সিন্ধু সভ্যতায় প্রচুর টেরাকোটার ইট ও অন্যান্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে মৌর্য সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্যের বহু টেরাকোটার নিদর্শন পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহর টেরাকোটা ইটে তৈরি মন্দির ও টেরাকোটা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের দিকে বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে বিকশিত সভ্যতায় টেরাকোটার নমুনা পাওয়া গেছে। এই বিচারে বলা হয়, বহু আগে থেকেই বাংলাদেশের শিল্পীরা টেরাকোটা তৈরির কৌশল শিখেছিল।
 
সুরকি: ইটের গুঁড়াকে বলে সুরকি। এসেছে ফারসি শব্দ ‘সুর্‌খী’ থেকে। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইট ভেঙে সুরকি বানানোর কৌশলও পালটেছে। একসময় হাতে ভাঙা ইটের সুরকির ব্যাপক প্রচলন থাকলেও আধুনিক কালে এই পদ্ধতিটি সেকেলে হয়ে গেছে। বর্তমানে মেশিনের সাহায্যে ইট ভেঙে সুরকি তৈরি করা হয়। তবে গাঁথনির কাজে আজকাল চুন-সুরকির বদলে বালি-সিমেন্ট বেশি ব্যবহৃত হয়।
 
চুন: পাথর, শামুক, ঝিনুক, কড়ি, গেরি প্রভৃতি পুড়িয়ে বা চুনাপাথর (লাইমস্টোন) থেকে যে সাদা ক্ষার পাওয়া যায় তাকে চুন বলা হয়। চুন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘চূর্ণ’ থেকে। হিন্দিতে চুনকে বলা হয় ‘চূণা’। এই চুন সুরকির সাথে জল দিয়ে মিশিয়ে ইটের গাঁথনি গাঁথা হয়। ‘মুখ চুন হয়ে যাওয়া’ মানে বিবর্ণ, ফ্যাকাশে, পাংশু মুখ। ‘চুনকাম’ মানে দেওয়ালে চুন-গোলা জলের প্রলেপ লাগানো (বাড়ি চুনকাম করা)। ‘চুনকালি’ অর্থ কলঙ্ক (মুখে চুনকালি দেওয়া)।
 
চুন-এর সঙ্গে ভাতের জাউ মিশিয়ে তাকে আধুনিক সিমেন্টের মতো ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল সুবিখ্যাত চীনের প্রাচীর যা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিক ঝড়ঝাপটা সয়ে আজও টিকে আছে।
 
কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী বিভাগের উপদেশ মতো। ১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ভবন তৈরি করেছিল। ভবনের মূল প্রকৌশলী ছিলেন থমাস লেয়ন। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরানো এই ভবন নির্মাণে কোনো সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি। ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল গুঁড়া চুন, মার্বেল পাথরের গুঁড়া, ইট ও বালি। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিল গোবর। আগে যেসব উপকরণ দিয়ে বিল্ডিংটি নির্মিতি হয়েছিল সেসব উপকরণ ব্যবহার করেই ভবনটির পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে।
আঁজি : এই শব্দটির অর্থ রেখা; ডোরা দাগ; দালানবাড়ি তৈরির সময় সাজানো ইটের সন্ধিস্থলে রেখার আকারে চুন-সুরকির বা সিমেন্ট-বালির প্রলেপের রেখা। ‘আঁজি ধরানো’ মানে ইটের সন্ধিস্থলে চুন-সুরকি বা বালি-সিমেন্টের প্রলেপ জমানো, ইংরেজিতে যাকে বলে পয়েন্টিং (pointing)।

———————————————————————

error: Content is protected !!