বাঙালি প্রণীত প্রথম বাংলা অভিধান: বাংলা হরফে লেখা প্রথম বাংলা অভিধান

ড. মোহাম্মদ আমীন

 
আঠারো শতকের শেষার্ধে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড বা হালেদ-এর পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম মুনশি প্রণীত বাংলা-ফারসি অভিধানটি বাংলা অক্ষরে লেখা প্রথম বাংলা অভিধান। এটি বাংলা ভাষায় বাংলা হরফে বাঙালি রচিত প্রথম বাংলা অভিধান হিসেবেও খ্যাত।
ড. মোহাম্মদ আমীন
মুনশির হাতের লেখা এই অভিধানটির প্রত্যেকটি ভুক্তি বাংলা হরফে লেখা। এ পর্যন্ত যতটুকু জানা যায় তাতে, এটি আঠারো শতকে প্রণীত প্রথম ‘বাংলা-ফারসি’ অভিধান। এই অভিধানের পাণ্ডুলিপিটি দুই কলামে সজ্জিত। প্রতিকলামের বামদিকে বাংলা শব্দ এবং ডানদিকে শব্দটির ফারসি অর্থ লেখা হয়েছে। মোহাম্মদ আবদুল কাইউমের মতে, ১৭৭৪-১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে হ্যালহেডের পূর্ববঙ্গীয় মুনশি প্রণীত বাংলা-ফারসি শব্দকোষ বাঙালি প্রণীত প্রথম বাংলা অভিধান। প্রসঙ্গত, এখানে বর্ণিত মুনশি অর্থ ভাষা শিক্ষক। যে বাঙালির কাছ থেকে হ্যালহেড বাংলা ও ফারসি ভাষা শিখেছেন তাঁকে হ্যালহেডের মুনশি বলা হয়। 
 
 
 হ্যালহেডের মুনশির বাড়ি: অভিধানে বর্ণিত অধিকাংশ শব্দই পূর্ববঙ্গে প্রচলিত দেশজ বা আঞ্চলিক শব্দ। এ বিবেচনায় মনে করা হয়, অভিধানটির রচয়িতার বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গ। অনেকের মতে, মীরসরাই। পবিত্র সরকার ও আবদুল কাইউমের মতে, অভিধানটির রচয়িতার বাড়ি ছিল নোয়াখালী বা তার পাশ্ববর্তী অঞ্চেলে। মুনশির ইসলামি শব্দের প্রতি বিশেষ প্রীতি ও প্রজ্ঞা, কিন্তু সংস্কৃত শব্দের প্রতি স্বল্প জ্ঞান দেখে পণ্ডিতগণ অনুমান করেন  যে, হ্যালহেডের মুনশি ছিলেন মুসলিম।
 
অভিধানের পৃষ্ঠা ভুক্তি ও ভাষাভিত্তিক শব্দ: পঞ্চাশ (৫০) পাতা ১০০ পৃষ্ঠা পরিসরে বিস্তৃত পাণ্ডুলিপিটিতে মোট ১৮৯৬টি শব্দ রয়েছে। তবে ২৮২টি শব্দের কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি এবং  ১২০টি শব্দের অর্থ বা লেখা অস্পষ্ট। অভিধানে মোট কৃতঋণ শব্দ রয়েছে ৩৮৩। তন্মধ্যে আরবি-ফারসি— ৩৪৫, হিন্দি—২৫, তুর্কি— ৬, পর্তুগিজ— ৫, ইংরেজি—১, চায়নিজ —১টি। পণ্ডিতগণের অনুমানএই অভিধানে বর্ণিত  তুর্কি শব্দসমূহও ফারসির মাধ্যমে বাংলায় এসেছে। চাক্কু> চাকু; কাবু, ঠাকুর, বোগোম, বোচকা, বাবর্চি। হ্যালহেডের মুন্সির এই অভিধানে বর্ণিত পোর্তুগিজ শব্দসমূহ হলো: চাবি, নিলাম, বোতল, তাবাকো এবং সাবন (সাবান)। অভিধানে বর্ণিত চীনা শব্দটি হলো— চেনি। ফারসি এর অর্থ দেওয়া হয়েছে: শাক্কর সাফেদ বা সাদা চিনি। এই অভিধঅন যখন প্রণীত হয় তখন ইংরেজ আমল শুরু হয়ে গেছে। তবু কেবল একটি ইংরেজি শব্দ স্থান পেয়েছে। সেটি হচ্ছে— চেমনি (chimeny)।
 
লেখকের নাম ও অভিধানের সংরক্ষণ: পূর্ববঙ্গীয় যে মুসলিম বাঙালির  বাংলা হরফে লেখা প্রথম বাংলা অভিধান প্রণয়ন করেন তাঁর নাম এখনো অজ্ঞাত। অভিধান রচনাকালীন তিনি হ্যালহেডের মুনশি ছিলেন। ধারণা করা হয়, হ্যালহেডের ইচ্ছায় মুনশি অভিধানের কোথাও তাঁর নাম রাখেননি বা রাখতে পারেননি। তাই এখন আর তাঁর নাম জানা সম্ভব নয়। পাণ্ডুলিপিটি ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। আগ্রহীগণ ব্রিটেনে গেলে তা দেখতে পারেন।
 
ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড: ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড  বা হালেদ ছিলেন  ইংরেজ প্রাচ্যবিদ ও বৈয়াকরণ।  তিনি ১৭৫১  খ্রিষ্টাব্দের  ২৫শে মে লন্ডনের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে  হিন্দু আইনশাস্ত্রের অনুবাদ ‘আ কোড অব জেন্টু ল’জ’  এবং ১৭৭৮  খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ (A Grammar of the Bengal Language) রচনা করেন। তিনিই প্রথম বৈয়াকরণ যিনি বাংলা ব্যাকরণ রচনায় উদাহরণের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ ও বাংলা লিপি ব্যবহার করেন। তাঁর ব্যাকরণেই সর্বপ্রথম বাংলা অক্ষরের প্রকাশ ঘটে। ভোকাবুলারিও’ (Vocabulario em idioma Bengalla e Portuguez) পোর্তুগিজ ভাষায় রচিত এবং ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে লিসবন থেকে প্রকাশিত ‘ভোকাবুলারিও’ (Vocabulario em idioma Bengalla e Portuguez) গ্রন্থকে বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত ব্যাকরণ বলা হয়। এখানে বাংলার কোনো চিহ্ন  ছিল না। হ্যালহেডের ব্যাকরণ ইংরেজি ভাষায় রচিত এবং এতে বাংলায় প্রচুর উদাহরণ ও উদ্ধৃতি প্রভৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারি হ্যালহেড মারা যান।
 
বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ: ভোকাবুলারিও (Vocabulario)  প্রথম মুদ্রিত বাংলা  ব্যাকরণ। এর পুরো নাম Vocabulario em idioma Bengalla e Portuguez, সংক্ষেপে যা Vocabulario নামে পরিচিত। কয়েকজন পর্তুগিজ ধর্মযাজক এর সংকলক।  সম্পাদনা করেছিলেন Manoel da Assumpcam।  গ্রন্থটি ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দের পর্তুগিজের রাজধানী লিসবন শহর থেকে  মুদ্রিত ও  প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি মূলত এদেশে  খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের সুবিধার জন্য সংকলিত হয়েছিল। অভিধানটি ধর্মযাজকদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য প্রণীত হয়ে। মুদ্রিত ৪০ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটি স্থানীয় ভাষার অনুকরণে  রচিত। এতে  সংস্কৃত ভাষার কোনো প্রভাব ছিল না। পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার লোকদের কথোপকথনের ভিত্তিতে ব্যাকরণটি রচিত হয়। 
বাংলা হরফে বাঙালি রচিত প্রথম বাংলা অভিধান থেকে
প্রতিলাইনে বামের শব্দটি বাংলা। এভাবে অভিধানে উপস্থাপিত। ডানের শব্দটি এর ফারসি অর্থ। যেভাবে অভিধানে আছে ঠিক সেভাবে লেখা হয়েছে। দ্বিতীয় বন্ধনীর মধ্যে দেওয়া হয়েছে আধুনিক বানান ও বাংলা অর্থ। 

অকাল [অকাল]— বেওয়াক্ত [ অসময়]
অজাগার [অজগর]— আযদাহার (বৃহদাকার সর্প]
অতয়েব [অতএব]— লেহাযা [অতএব]
অদিক [অধিক]— বেসুমার (অনেক)
 
অধোম [অধম]— কম্‌নসীব [দুর্ভাগ্য]
অনাসে [অনায়াসে]— আহেস্তহ্ [নিঃশব্দে]
অনেক [অনেক]— বিস্‌আর [বহু, অনেক]
অন্য [অন্য]— দিগর [অন্য]
 
অপস্তিত [উপস্থিত]— রসীদ [প্রাপ্তিস্বীকার, প্রাপ্তিপত্র]
অবস্য [অবশ্য]—  আলবত্তহ্‌ [অবশ্য]
অগোয়ান [অজ্ঞান]— তিফল্‌ [শিশু]
অলপ [অল্প]— আন্দক [অল্প, সামান্য]
 
অসইদ [ঔষধ/ওষুধ ] — দারু [ঔষধ/ওষুধ]
অস্তোর [অস্ত্র] — আওযারে তবীব [চিকিৎসকের সরঞ্জাম]

আইজ [আজ<অদ্য] — এমরোয [অদ্য, আজ]
আউলান [ আউলান< সং আকুলায়িত] — পুরাগন্দহ্‌ করদন [এলোমেলা করা]
আউস [আউষ] —
আওয়াজ [আওয়াজ-ফা.] — আওয়াজ [শব্দ]
আঁচান [] —
আকাল [] —
আকিল [] —
আখাজা [] —
আগাও [] —
আগুন [] —
আগে [] —
আজ্ঞাকারী [] —
 
 
 
error: Content is protected !!