বাঙালি: বাঙালির স্বভাব: শূয়োরের চর্মের চেয়ে স্থূল চর্মের জাতি

সংকলনে: ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/বাঙালি-বাঙালির-স্বভাব-শূ/
নিচের কবিতাটির লেখক বাংলা সাহিত্যে স্বভাবকবি নামে পরিচিত গোবিন্দচন্দ্র দাস (কবির জীবন পড়ুন: স্বভাবকবি গোবিন্দচন্দ্র দাস: জীবন ও কর্ম: কবিতা)।কবিতাটিতে বাঙালি জাতির চরিত্রকে দেশপ্রেমের নিরিখে অপূর্ব তথ্য এবং চরম সাহসিকতায়  বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ কবিতায় বাঙালি জাতির যে স্বভাব তুলে ধরা হয়েছে তার সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন; তবে অনেকে যে একমত হবেন তাতে সন্দেহ নেই।  এটাই হবে কবির ও কবিতার সার্থকতা। গোবিন্দচন্দ্র দাসের লেখা এই কবিতাটি  যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত গোবিন্দ চয়নিকা কাব্য সংকলন (১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) হতে সংগৃহীত। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩০৩ বঙ্গাব্দে।  এবার তাহলে দেখে নেওয়া যাক বাঙালির চরিত্র।
বাঙালী
গোবিন্দচন্দ্র দাস
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
 এমন অধম জাতি,
বুকে মার শত লাথি,
মুখে মার শত ঝাঁটা, অনায়াসে সয়!
না দেখিতে, লইয়া পুঁছে,
সে ফেলে যে দাগ মুছে,
যাহারে মেরেছে এ যে সে-যন সে নয়!
তার নাই স্পর্শ বোধ,
ঘৃণা পিত্তি হর্ষ ক্রোধ,
শূয়োরের চেয়ে চর্ম স্থূল অতিশয়।
মেড়ার ডলিলে কান,
সেও করে অভিমান,
সে-ও এসে মারে ঢুস্, নাহি করে ভয়;
মেড়ারও অধম এরা অতি নীচাশয়!
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
মানুষের মতো নহে,
এদের শোণিতে বহে,
নরক-নর্দ্দমা শিরা পচাগন্ধময়।
কে বলে হৃৎপিণ্ড উহা,
নীচতার অন্ধগুহা,
পাতিত্যের প্রস্রবণ, প্রাণ উহা নয়।
অস্থিতে ও-নহে মজ্জা,
ভরা শুধু ঘৃণা লজ্জা,
কলঙ্কে গাঢ় ক্লেদ হয়েছে সঞ্চয়!
প্রতি লোম কূপে কূপে,
অপমান অনুরূপে,
করেছে অনন্ত ছিদ্র নাহিক সঞ্চয়!
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
 কি আছে মানবধর্ম্ম,
কি করে মানবধর্ম্ম,
কি দিয়ে চিনিব বল পশু এরা নয়?
এ-কি মত খায় হাগে,
আর কাষে নাহি লাগে,
এদের জীবনশুধু বিষ্ঠামূত্রময়।
নাহি বীর্য্য নাহি তেজ,
উদরে গুণ্ঠিত লেজ,
বিলুণ্ঠিত পরপদে সকল সময়!
অলস শিথিল অতি,
স্খলিত জীব-গতি,
আঁখিভরা অশ্রুজল বুকভরা ভয়,
বিচার বিতর্কহীন,
আত্মজ্ঞান উদাসীন,
অবিচারে পরবাক্যে করিবে প্রত্যয়!
এমন পশ্চাদগামী,
সদা ঘৃণা করি আমি,
গু মাখিয়া মারি ঝাঁটা যত মনে লয়
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
 যত মুসলমান হিন্দু,
পতনের মহাসিন্ধু,
নাহিধর্ম এক বিন্দু অতি নীচাশয়!
বৃথা ও তিলক ফোটা,
পাঁচ-ওক্ত মাথা কোটা,
ধূর্ত্তমি ভণ্ডামি ওটা নিশ্চয় নিশ্চয়!
একমেবাদ্বিতীয়ং,
সেও থিয়েটারি সং,
কলেজি নলেজি ঢং আর কিছু নয়।
শত ভাল কীট কৃমি,
এরা নরকের তিমি,
ইহাদের আদি অন্ত অনন্ত নিরয়!
অধম পিশাচগুলি,
গর্দ্দভের পদধূলি,
মাথায় মাখিয়া ছি ছি বড়লোক হয়!
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
হেন ঘোর মিথ্যাভাষী
অনুগ্রহ অভিলাষী,
জগতে ধনীর দাস আর কে নয়।
হ’তে তার কৃপা-পাত্র,
কি শিক্ষক কিবা ছাত্র,
উকীল ডাক্তার আদি সম্পাদক-চয়,
যারা বড় মান্য গণ্য,
দেশের উদ্ধর জন্য,
‘বঙ্গের উজ্জ্বল আলো’ যাহাদের কয়;
যত তার অবিচার,
যত তার ব্যাভিচার,
যত তার ভয়ঙ্কর  কার্য্য পাপময়।
জানিয়া নাহিক জানে,
শুনিয়া শোনেনা কাণে,
তাহারি প্রশংসা গানে করে জয় জয়।
এমন সাহস-হীন,
ভীর কাপুরুষ ক্ষীণ,
বলিতে উচিত কথা সঙ্কুচিত হয়;
পাপেরেও বলে পুণ্য,
হেন মনুষ্যত্ব শূন্য,
এমন করিয়া করে বিবেক বিক্রয়।
 এ নীচ নিরয়গামী,
সদা ঘৃণা করি আমি,
দেখিলে এদের মুখ মহাপাপ হয়,
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বৃথা ও ইংরাজী শিক্ষা,
বৃথা ও পাশ্চাত্য দীক্ষা;
প্রসবে যে বিএম, এমএ বিশ্ব-বিদ্যালয়,
কি বলিব শেম্‌ শেম্‌
রাস্কেল ফুল্ ডেম্,
গোল্ড্ পাম্প্ -কিন সব আর কিছু নয়!
বৃথা অই হেট্-কোট্‌,
বিজাতী কথার চোট্,
হৃদয়ে নাহিক মোটে জ্ঞানের উদয়;
আপনার প্রতিবেশি,
আত্মীয়স্বজন দেশী,
দরিদ্র দীনের দুঃখে গলে না হৃদয়,
করে না জীবন-পণ,
উদ্ধারে বিপন্ন জন,
অত্যাচারে যদি দেশ ছারখার হয়!
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
ওই যে ভাওয়ালবাসী,
নিত্য অশ্রুজলে ভাসি,
অবিচারে ব্যাভিচারে ভস্মীভূত হয়,
কে করে তাহার খোঁজ,
অসুরেরা রোজ রোজ,
কত যে কূলের বধূ চুলে ধরি লয়!
দিবালোক দ্বিপ্রহরে,
পতিরে বাঁধিয়া ঘরে,
কোলের কাড়িয়া লয় কত কুবলয়।
কত যে  জননী বোন্‌,
কাটিয়া ঘরের কোণ,
চুরি করে পিশাচেরা নিশীথ সময়।
কি ব্রাহ্মণ কিবা শুদ্র,
কিবা বড় কিবা ক্ষুদ্র,   
সবারে শোষণ করে রাজা তারে কয়,
তিলে তিলে পলে পলে পুড়িছে হৃদয়।
আহা এরা চক্ষু খেয়ে,
একটু দেখে না চেয়ে,
ইহাদেরি একদেশী প্রতিবেশী হয়!
ও উচ্চ শিক্ষায় ধিক্‌,
আমি যা’ দিয়েছি— ঠিক্,
জগতে জঘণ্য হেন নাহি নীচাশয়,
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
কোথায় সাগর পারে,
তুরুকে আর্মাণি মরে,
ইংরেজ রুষের তারা কেহই ত নয়!
এক গোষ্ঠী এক জাতি,
নহে তারা এক জাতি,
কেবল খৃষ্টের সনে এক পরিচয়!
তবু যে আর্মাণি-নারী,
ত্যজিল আখির বারি,
তাহাতে ডুবিল ‘আল্‌প্‌’ অল্প কি বিস্ময়!
অবিচারে ব্যাভিচারে,
তাহাদেরি হাহাকারে,
বিলাতী আকাশ ভেঙে চুরমার হয়!
তাদেরি— তাদেরি জন্য,
কি হৃদয় ধন্য ধন্য,
খেপিয়াছে খৃষ্টানের জাতি সমুদয়।
শিক্ষিত বীরের প্রাণ,
কি মহান! কি মহান!
করুণায় যেন এক কালান্ত প্রলয়!
নাহি বুঝে আত্মপর,
নাহি বুঝে দেশান্তর,
বিপন্ন উদ্ধারে তার প্রাণ করে ব্যয়,
না ছাড়ে সম্রাট রাজা,
পাপীরে প্রদানে সাজা,
উৎপীড়িত নারী নরে দিতেছে অভয়!
স্বাধীন তুরষ্ক—রুম,
সুলতানের সিংহভূম,
এসলামের প্রিয় পূজ্যস্থান পুণ্যময়।
আশি বছরের বুড়া,
তাহারে করিতে গুড়া,
করিয়াছে পদাঘাত সাহস দুর্জ্জয়!
মোদের শিক্ষাভিমানী,
নব্য বাবু সভ্য জ্ঞানী,
থাক্‌ তার পর-দুঃখে গলিবে হৃদয়,
রে’লে কি জাহাজে গেলে,
কেহ তারে ঠে’লে ফে’লে,
নিলে তার মা-বোনের চুপ করে রয়।
জুতা, লাথি ঝাঁটা বেতে,
এরা না কিছুতে চেতে,
অচেতন জড়ে কবে ব্যথা বোধ হয়?
দেও তারে শত গালি,
দেও গালে চূণ কালী,
বেহায়ার তাতে কিবা লোক-লাজ ভয়।
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাসের কবিতা: বাঙালি: 
error: Content is protected !!