বাচ্যার্থ ও লক্ষ্যার্থ: আগুন কেন বহ্নি

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাচ্যার্থ ও লক্ষ্যার্থ

কোনো শব্দ উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যে ছবি, অবয়ব, বিষয়-প্রতিকৃতি আমাদের মনে ভেসে ওঠে, দেদীপ্যমান হয় কল্পনায় সেটিই ওই শব্দের মূল অর্থ—যা মূখ্যার্থ বা বাচ্যার্থ নামে পরিচিত। এটাকে আক্ষরিক বা শাব্দিক অর্থও বলা হয়। ইংরেজিতে বলা হয় literal meaning। যেমন: কান বললে আমাদের মনে ভেসে ওঠে শরীরের দুটি ক্ষুদে অঙ্গ যা দিয়ে আমরা শ্রবণ করি, শ্রবণেন্দ্রিয়। তাই এটি হলো কান শব্দের বাচ্যার্থ।

যখন বলা হয় কানকাটা; তখন কান আর বাচ্যার্থে থাকে না। কারণ এটা এখানে তার শাব্দিক অর্থ প্রকাশ করে না। এজন্য লক্ষ্যার্থে পৌঁছতে হয়। কানকাটা অর্থ— নির্লজ্জ; বাচ্যার্থের চেয়ে অনেক দূরে এই অর্থ। এটিই হচ্ছে লক্ষ্যার্থ।
লক্ষ্যার্থ হলো রূপকার্থ, আলংকারিক অর্থ। আবার যখন বলা হয় কানকথা তখন অর্থ হবে— কানে কানে কথা বলা, গোপন মন্ত্রণা; এটাও লক্ষ্যার্থ। যখন বলা হবে কান দেওয়া, তখন এর অর্থ হবে— কর্ণপাত করা, মনঃসংযোগ করা। এটাও লক্ষ্যার্থ।
আবার যখন বলা হয় কানাভাঙানি, তখন এটি হয়ে যাবে লক্ষ্যার্থের বাইরের আর একটি অর্থ। যার অর্থ হয়— বিভেদ সৃষ্টি করা, কুমন্ত্রণা দেওয়া।যা ব্যাঙ্গার্থ বা সাংকেতিক অর্থ নামে পরিচিত। এটি লক্ষ্যার্থের একটি বিশেষ রূপ। লক্ষ্যার্থ ও বাচ্যার্থ অনেক সময় সমীকৃত হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কোন অর্থটি গ্রহণ করা হবে— সেটি নির্ভর করবে অন্য বাক্যে ব্যবহৃত অন্যান্য পদের সঙ্গে শব্দটির মিলিত সম্পর্ক কেমন তার ওপর। খেয়াল রাখতে হবে লক্ষ্যার্থের মধ্য দিয়ে ব্যাঙ্গার্থে পৌঁছতে হয়।

আগুনকে বহ্নি বলা হয় কেন?

একটি শব্দের অনেকগুলো প্রতিশব্দ থাকতে পারে। প্রত্যেকটি প্রতিশব্দ মূল শব্দটির বাচ্যার্থের অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের এক বা একাধিক বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে নির্মাণ করা হয়। আগুনে যেসব আহুতি দেওয়া হয় অগ্নি তা বহন করে দেবতাদের কাছে নিয়ে যায়। তাই অগ্নি বা আগুনের অপর নাম বহ্নি।
বায়ু-যুক্ত হলে অগ্নি প্রাণবন্ত হয়, প্রাণ পায়। তাই তার আরেক নাম বায়ুসখ— বায়ু সখা যার। কৃপীটযোনি আগ্নির আরেক নাম। আগে কাষ্ঠে কাষ্ঠ ঘষে আগুন জ্বালানো হতো। তাই আগুনের আরেক নাম কৃপীটযোনি— কৃপীট (কাষ্ঠে) যোনি (জন্মস্থান) যার; কাঠে যার জন্ম।
অগ্নি নাম হলো কেন? অগ্নি অর্থ — যা ঊর্ধ্বদিকে গমন করে। অগ্নির আরেক প্রতিশব্দ তনুনপাৎ; যার অর্থ তনুকে পতিত করে না যে। অর্থাৎ যা নিচু দিয়ে যায় না তাই তনুনপাৎ বা অগ্নি। অগ্নির দাহিকা শক্তি আছে। তাই তাকে দহন ও জ্বলন নামেও ডাকা হয়। উজ্জ্বল বলে তার আরেক নাম বিভাবসু এবং সুন্দর ও কিরণদায়ক বলে অগ্নির আরেক প্রতিশব্দ চিত্রভানু।
—————————–
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
—————————————————–
error: Content is protected !!