বাজখাঁই পঁচা বনাম পচা এবং যদ্যপি

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাজখাঁই পঁচা বনাম পচা এবং যদ্যপি

 

বাজখাঁই: ‘বাজখাঁই’ শব্দের অর্থ গম্ভীর ও কর্কশ গলা বা কণ্ঠস্বর। কিন্তু এর ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাস অন্যরকম। বাজবাহাদুর খাঁর গম্ভীর ও চড়া গলা থেকে বাগ্‌ভঙ্গিটির উদ্ভব। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে মালব প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন বাজবাহাদুর খাঁ। গীতবাদ্যে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতা ছিল। রাজকার্য অবহেলা করে তিনি সংগীত, নৃত্য প্রভৃতি কাজে অধিক সময় ব্যস্ত থাকতেন। বাজবাহাদুর খাঁ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দে একবার এবং ১৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে আর একবার সম্রাট আকবরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। অবশ্য দুবারই তিনি হেরেছেন।
শেষ জীবনে তিনি সম্রাট আকবরের দরবারে সংগীত-সাধক হিসাবে স্থান পান। বাজবাহাদুরের কণ্ঠ ছিল যেমন চড়া তেমন গম্ভীর, অনেক দূর থেকে তাঁর গলা শুন যেত। তার এ চড়া ও গম্ভীর গলা থেকে বাংলা ‘বাজখাঁই’ শব্দের উদ্ভব ও বিকাশ। যদিও বর্তমান অর্থ নেতিবাচক।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা বাজখাঁই অর্থ (বিশেষণে) অতিশয় কর্কশ ও অনভিপ্রেত। অথচ বাজবাহাদুর খাঁর গলা অনিভিপ্রেতি ছিল না। তাহলে কি সম্রাট আকবর তাঁকে দরবারে স্থান দিতেন? এভাবে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে। ইতিবাচক অর্থ হয়ে যায় নেতিবাচক। আবার অনেক সময় নেতিবাচক উৎসও ইতিবাচক হয়ে যায়।
সূত্র: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়।

পঁচা বনাম পচা: বাংলা পচা অর্থ (ক্রিয়াবিশেষ্যে) গলে যাওয়া, বিকৃত হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া; (বিশেষ্যে) বিকৃত, খারাপ,

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

নষ্ট।নষ্ট, বিকৃত, খারাপ প্রভৃতি অর্থে পচা লিখুন। পঁচা লিখবেন না। নষ্ট বা খারাপ জিনিসে চন্দ্রবিন্দু থাকে না। যেমন: পচা মাছে ভারি দুর্গন্ধ। পচা জিনিস খেলে পেট খারাপ হয়। পচা লোক পচা কথা বলে

পচা মানে নষ্ট, কিন্তু পঁচা মানে পঞ্চ বা পাঁচ। সংস্কৃত পঞ্চ থেকে উদ্ভূত পাঁচ আঞ্চলিক ভাষায় কোথাও কোথাও পঁচা। কথ্য এমনকি প্রমিত কথাতেও পাঁচ অর্থে পঁচা শব্দের ব্যবহার আছে। পঞ্চগড়কে একসময় বলা হতো পঁচাগড় (পঞ্চগড়)। পঁচা দিন গেল, তবু লোকটি আমার এলে না। পঁচা বছর আগের কথা।
আলমের পঁচা সাবান মানে আলমের বিকৃত বা নষ্ট সাবান নয়; পঞ্চ সাবান, পঁচা মিয়ার সাবান ইত্যাদি।
পঁচানব্বই মানে নষ্টনব্বই নয়, ৯৫।
পঁচা+আশি= পঁচাশি।
৮৫।

যদ্যপি

সংস্কৃত যদ্যপি (যদি+অপি) অর্থ (অব্যয়ে) যদিও, একান্তই যদি। শব্দটির বানানে কোনো আ-কার নেই। ই/ঈ এর সঙ্গে ই/ঈ ভিন্ন অন্য স্বরবর্ণের সন্ধি হলে ই/ঈ-এর স্থানে য-ফলা হয়। পরের স্বর ‘য্-ফলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথম পদের শেষ বর্ণে বসে। যেমন:
যদি+অপি= যদ্যপি,
অতি+উচ্চ= অত্যুচ্চ,
ইতি+আদি= ইত্যাদি
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!