বাদর: বাদরদিনে,  কিসে বনাম কীসে; মাঝিমাল্লা মাল্লা অর্থ কী; মনিষ, মনিষী ও মনিষা

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাদর: বাদরদিনে,  কিসে বনাম কীসে; মাঝিমাল্লা মাল্লা অর্থ কী; মনিষ, মনিষী ও মনিষা

আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে

ঝরঝর ঝরো ঝরো ঝরঝর
ঝরঝর ভুক্তি দুটি। প্রথম ভুক্তি: সংস্কৃত ক্ষর থেকে উদ্ভূত ঝরঝর অর্থ (অব্যয়ে) অবিরল ধারায় জল পড়ার অনুকার শব্দ; কোনো তরল পদার্থের ক্রমাগত ক্ষরণ; চূর্ণপদার্থ পড়ার শব্দ; (বিশেষণে) অবিরাম ধারায় ঝরছে এমন(ঝরঝর বৃষ্টি)। শব্দটির কাব্যিক রূপ; ঝরো ঝরো
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, দেশি বাদর অর্থ (বিশেষ্যে) মেঘ; (কাব্যিক অর্থ) বৃষ্টি, বর্ষাঋতু। ‘মৈথিলী কোকিল’ উপাধি-খ্যাত মধ্য যুগের কবি বিদ্যাপতির কাব্যে বাদর শব্দের প্রয়োগ রয়েছে—
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর,
এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর।”
রবীন্দ্রনাথের একটি গানে ঝরো ঝরো ও বাদর শব্দের হৃদয় মুচড়ানো প্রয়োগ দেখুন—
“আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে
জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।।”
 
দ্বিতীয় ভুক্তি: হিন্দি ঝকঝক থেকে উদ্ভূত ঝরঝর অর্থ পরিচ্ছন্নতা বা নির্মলতার ভাব।
চারদিক ঝরঝর,
কাঁপে পাতা থরথর।
সূত্র: গীতবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান।
৩. নিমোনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন।
 
 

 কিসে বনাম কীসে

১. ‘কি’ প্রশ্নবোধক অব্যয়। যে সকল প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ’ বা ‘না’ শব্দের মাধ্যমেও কিংবা কেবল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও সন্তোষজনকভাবে দেওয়া যায় সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কি’ লিখবেন। যেমন : আমি কি খাব? (Will I eat?), আমি কি আসতে পারি স্যার? টাকা আছে কি? তুমি কি জানো? (Do you know?)
২. যে সকল প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ বা ‘না‘ দিয়ে কিংবা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে দেওয়া সম্ভব নয় সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কী’ লিখবেন। যেমন : আমি কী খাব? (What will I eat?), তুমি কী চাও? (What do you want?), কী করে এতদূর এলে? তোমার বাবা কী করেন? তুমি কী জানো? (What do you know?)
৩. ‘কী’ বিস্ময়সূচক পদ। তবে বিস্ময় ছাড়াও অনিশ্চয়তা, অবজ্ঞা, সম্মান গৌরব, প্রশংসা প্রভৃতি প্রকাশেও ‘কী’ ব্যবহার করা হয়। যেমন – বিস্ময় : কী দারুণ! অনিশ্চয়তা : কী জানি কী হয় না হয়। অবজ্ঞা : সে আবার কী ধনী? প্রশংসা : কী ধনী তিনি জানো? ছেলেটি যে কী সাহসী জানলে তুমি হতবাক হয়ে যাবে।
 
 

মাঝিমাল্লা শব্দের মাল্লা অর্থ কী?

মাঝি ও মাল্লা শব্দের মিলনে মাঝিমাল্লা শব্দের উদ্ভব। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা মাঝিমাল্লা অর্থ: মাঝি ও তার সহকর্মী। নৌযানের মাঝি এবং মাঝিকে নৌ পরিচালনার কাজে সহায়তাকারীদের একত্রে মাঝিমাল্লা বলা হয়। আরবি মল্লাহ্ থেকে উদ্ভূত মাল্লা অর্থ: (বিশেষ্যে) নৌকার মাঝি বা তার সহযোগী, মাঝির সহযোগী, নাবিক।
 
 
মনিষ অর্থ কুলি, দিনমজুর; মনিষী/ মনিষা অর্থ মহিলা কুলি, মহিলা দিনমজুর
 
অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘মনুষ্য’ শব্দ থেকে মনিষ্যি ও মনিষ শব্দের উদ্ভব। ‘মনুষ্য’ ও ‘মনিষ্যি’ উভয় শব্দের অর্থ মানুষ। যে ব্যক্তি দৈনিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করে অভিধানে তাকে ‘মনিষ’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ‘মনুষ্য’ অর্থ মানুষ কিন্তু ‘মনিষ’ অর্থ এমন ব্যক্তি যে দৈনিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করে, দিনমজুর, কুলি প্রভৃতি। ‘মনিষ’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ ‘মনিষী’ বা ‘মনিষা’। যাকে আমরা মহিলা কুলি বা মহিলা দিনমজুর বলতে পারি। ‘মনিষী’ বা ‘মনিষা’ শব্দ দিয়ে মহিলা দিনমজুর, কাজের বুয়া, গৃহকর্মী প্রভৃতিকেও প্রকাশ করা যায়।
 
অন্যদিকে, ‘মনীশ’ শব্দের অর্থ অন্তরের ঈশ্বর এবং ‘মনীষা’ শব্দের অর্থ প্রজ্ঞা, প্রতিভা, তীক্ষ্ণধী এবং ‘মনীষী’ শব্দের অর্থ বিশেষণে বিদ্বান, তীক্ষ্ণধী, প্রতিভাসম্পন্ন এবং বিশেষ্যে অসাধারণ প্রতিভা ও গভীর পাণ্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তি।
সুতরাং মনিষ, মনিষী, মনিষা, মনীশ, মনীষা, মনীষী শব্দের উৎপত্তি, উচ্চারণ, বানান এবং উচ্চারণগত গভীর নৈকট্য এটাই প্রকাশ করে যে, সব মানুষই মনিষ, সব মানবীই মনিষী বা কুলি অথবা দিনমজুর।
 
শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানার জন্য: All Link– এ ক্লিক করতে পারেন।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।
 
error: Content is protected !!