বানান বিপর্যয় : বড়ো বিপদে বাংলা

ড. মোহাম্মদ আমীন

বানান বিপর্যয়: বড়ো বিপদে বাংলা

যিশুখ্রিষ্ট হাওয়া। রাতের মধ্যে এতদিনের শুদ্ধ ও প্রমিত খ্রিস্টাব্দ অপ্রমিত হয়ে গেল। খ্রিস্টানকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সবাই এখন খ্রিষ্টান। নিয়মানুযায়ী বিদেশি শব্দে মুর্ধন্য-ষ’ হয় না; তো এরা কীভাবে বিদেশি হয়েও মূর্ধন্য-ষ নিয়ে নিল? অতৎসম শব্দটি রাতারাতি তৎসম হয়ে গেল বেকার লোকটির মন্ত্রীর হওয়ার মতো অবলীলায়? ‘ক্রিয়া’রা কেন জানি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির অনুসরণে ‘নি’ পদের সঙ্গে সেঁটে বসতে শুরু করেছে।  আগে ‘নি’ লেখা হতো ক্রিয়া হতে ফাঁক রেখে। যেমন: যায় নি, খায় নি; চায় নি। বেচারা ‘ব্যবহারিক’ বহুদিন পর আ-কার পেয়ে নাচতে নাচতে ‘ব্যাবহারিকহয়ে গেল। ব্যবহারিক শব্দকে বাংলা একাডেমি তার সর্বশেষ অভিধানে ঠাঁই দেয়নি। ‘বাংলা একাডেমী’ও নেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে তাকে। সে এখন ‘একাডেমি’। ‘সুপ্রীম কোর্ট’ও ‘সুপ্রীম ছাড়েনি, যদিও আমার আপনার সুপ্রীম, এখন সুপ্রিম। কারণ, বিদেশে শব্দের বানানে নাকি /ঈ.ঊ/ চলে না।তাহলে কী-বোর্ডে কেন ঈ-কার দেওয়া হলো?
সরু গরু ও-কার পেয়ে মোটা গোরু। অনেক চেষ্টা করেও পাশের সরু গলিটা সোরু হতে পারল না। সে এখনো সরু। পটলের পেটটা মোটা হয়ে পটোল পটল, পটল তুলেছে পটোলে। কেউ এখন আর পটল তুলতে পারবেন না, তুলতে হবে ‘পটোল’।  পটল যদি পটোল হয় তো পাশের দিঘির কমল কী দোষ করল? তার তো ইচ্ছে করে ও-কার নিয়ে একটু মোটাতাজা কমোল হতে! ছোট ভাইটাও ‘ও-কার’ পেয়ে নাদুস-নদুস— ছোটো। আদরের ছোট্ট বোনটার অবস্থা আগের মতোই করুণ। ছোট, ছোটো হলেও এত চেষ্টা করেও সে ছোট্টো হতে পারল না ছোট্ট রয়ে গেছে। বিয়ে হবে কীভাবে?
ব্যবসায় বাণিজ্যে ঘুষ আর চলে না, আগে এটি হরদম চলত যত্রতত্র। এখন কেবল ঘুস চলে।ঘুষের দিন শেষ। গণ্ডটা গোল শব্দের সঙ্গে লেগে শুরু করে দিয়েছে গন্ডগোল। ফারসি গোল-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে বলেই গণ্ড বানানকে গন্ড করে গন্ডগোল বানানো হয়েছে। তাহলে কাণ্ডকারাখানা বানানের কাণ্ডকে কেন কান্ড করা হয়নি? সেও তো ফারসি কারখানার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বাংলা একাডেমির শব্দোপাচারের টেবিলের নিম্নে পড়ে রাতারাতি আমার বইগুলো অপ্রমিত বানানে ভরে গেল। পাঠক এখন বলেন, এই লেখকের বই ভুলে ভুলে ভরা। আগে দেখতাম ‘সমসাময়িক’ ভুল, এখন এটি শুদ্ধ। আমার মতে ‘সমসাময়িক’ ও ‘সামসময়িক’ দুটোই চলে।
কী করব ভাই?
২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে শুবাচের জানালায় প্রকাশিত আমার এক যযাতিতে ‘উপলক্ষ্য’ বানানকে ভুল এবং ‘উপলক্ষ’ বানানকে শুদ্ধ বলা হয়েছে। সে পুরানো যযাতি দেখে শুবাচি জনাব Mizanur Rahman Khan Sujan লিখেছেন— “স্যার, আপনি এর আগে যযাতিতে লিখেছিলেন ‘লক্ষ্য’ থেকে ‘উপলক্ষ্য’, ‘উপলক্ষ’ ভুল।” কিন্তু আপনার বইতে আছে উপলক্ষ্য ভুল। আমরা কোথায় যাব? তাঁর প্রতি আমার সবিনয় উত্তর— এ তো ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের কথা। এখন ‘উপলক্ষ্য’ বানানই শুদ্ধ। আগে ‘উপলক্ষ্য’ বানান ছিল ভুল; ‘উপলক্ষ’ বানান ছিল শুদ্ধ। কয়েক বছরে পাশা উলটে গেছে। কী করব ভাই? আমরা একটা শব্দ লেখা শেষ করার আগে ‘বাংলা একাডেমি’ ওই শব্দের বানান পরিবর্তন করে দিচ্ছে। বাংলা আর বাঙালিকে কোথাও আত্মনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ বুঝি কেউ দেবে না।

ণ-ত্ব বিধানে ‘অতৎসম’ শব্দের যুক্তাক্ষরের বানানের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির বানান কমিটির সদস্যগণ একমত হতে পারেননি। একটি মতে বলা হয়েছে যে, এসব শব্দের যুক্তাক্ষরে ণ্ট, ণ্ঠ, ণ্ড, ণ্ঢ হবে। যথা :ঘণ্টা, লণ্ঠন, গুণ্ডা। অন্যমতে বলা হয়েছে যে, এসব শব্দের যুক্তাক্ষরে ন্ট, ন্ঠ, ন্ড হবে। যথা: ঘণ্টা,

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

প্যান্ট, প্রেসিডেন্ট, লন্ঠন, গুন্ডা, পান্ডা, ব্যান্ড, লন্ডভন্ড। এখানে ঘণ্টা, লণ্ডভণ্ড প্রভৃতি তৎসম শব্দ। এগুলো কীভাবে অ-তৎসম শব্দের বানানে অন্তর্ভুক্ত হলো! এসব শব্দ তৎসম বলে ণত্ব বিধানের নিয়মানুসারে ‘মূর্ধন্য-ণ’ হবে। যেমন : ঘণ্টা, লণ্ঠন, গুণ্ডা। উল্লেখ্য, ‘গুণ্ডা’ শব্দ{√গু-+অ(ঘঞ+বা. গুণ্ডা) সংস্কৃত গুণ্ড থেকে আগত ।

পান্ডা শব্দের অর্থ তীর্থস্থানের পূজারি। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত পণ্ডিত থেকে। তাই এখানে মূর্ধন্য-ণ হবে।কিন্তু পান্ডা (panda) শব্দ এসেছে নেপালি পান্ডা শব্দ থেকে। এর অর্থ : চীনের বনাঞ্চলে-জাত কচিবংশদণ্ড-ভোজী সংবেদনশীল ভালুকজাতীয় বিরল প্রজাতির প্রাণী। এটি সংস্কৃত পণ্ডিত হতে আগত পাণ্ডা নয় বরং নেপাল হতে আগত panda। তাই এই panda বানান বাংলায় লিখতে হলে দন্ত্য-ন হবে। যেমন: পান্ডা। কারণ, অতৎসম শব্দে ণত্ব বিধি প্রযোজ্য নয়।

পাকিস্তানি না কি পাকিস্তানী
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (২০১৭)-এর ৯৬৪ পৃষ্ঠায় বিজয়দিবস ভুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তানী। আকাশ অর্থে অন্তরিক্ষ না কি অন্তরীক্ষ? বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান-এর ১২৭ পৃষ্ঠায় আকাশ ভুক্তিতে লেখা অন্তরীক্ষ। আবার একই অর্থে ৫৪ পৃষ্ঠায় মূল অন্তরিক্ষ ভুক্তিতে লেখা অন্তরিক্ষ। কোনটি শুদ্ধ, কোনটি লিখব আমরা? বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের ( ২০১৭ খ্রি.) ৫৬৩ পৃষ্ঠায় ডজন (dozen) ভুক্তিতে আছে: ‘ডজন’ ইংরেজি শব্দ। অর্থ: বারোটির গুচ্ছ। পরবর্তী ভুক্তি ‘ডজনখানেক’। এখানে বলা হয়েছে ডজন ফরাসি শব্দ। কোনটি সত্য?


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান

error: Content is protected !!