বানান শেখার আসর

জাবির হাসান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

বানান শেখার আসর

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/বানান-শেখার-আসর/

বানান শেখার আসর-২
বাংলা ভাষার চন্দ্রবিন্দু একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণ। চন্দ্রবিন্দু যোগে গঠিত শব্দগুলোতে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করতে হবে; না-করলে ভুল হবে। অনেক ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু বাদ দিলে শব্দার্থের পরিবর্তন ঘটে। এছাড়া চন্দ্রবিন্দু সম্মানসূচক বর্ণ হিসাবেও ব্যবহার করা হয়। যেমন- তাহাকে>তাঁহাকে, তাকে>তাঁকে ইত্যাদি। বাংলা বানানে অধিকাংশ চন্দ্রবিন্দু আসে সংস্কৃত বানানের ঙ, ঞ, ণ, ন, ম এবং ং লোপের ফলে, অর্থাৎ তৎসম বানানের নাসিক্যধ্বনি তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ লাভ করে। এই ঘটনাকে বলা হয় নাসিক্যভবন। যেমন-
ঙ: পঙ্ক>পাঁক, অঙ্কন>আঁকা, কঙ্কন>কাঁকন, শঙ্খ>শাঁখ, বঙ্কিম>বাঁকা, পঙক্তি>পাঁতি।
ঞ: পঞ্চ>পাঁচ, অঞ্চল>আঁচল, অঞ্জলি>আঁজলা।
ণ: ভাণ্ডার>ভাঁড়ার, ভাণ্ড>ভাঁড়, কণ্টক>কাঁটা, ষণ্ড>ষাঁড়, শুণ্ড>শুঁড়, পলাণ্ডু>পেঁয়াজ, হণ্টন>হাঁটা, চণ্ডাল>চাঁড়াল।
ন: স্কন্ধ>কাঁধ, দন্ত>দাঁত, সন্তরণ>সাঁতার, বান্দর>বাঁদর, বন্ধন>বাঁধন, ছন্দ>ছাঁদ, চন্দ্র>চাঁদ, গ্রন্থনা>গাঁথা, বৃন্ত>বোঁটা, সন্ধ্যা>সাঁঝ, অন্ধকার>আঁধার, ক্রন্দন>কাঁদা।
ম: ধূম>ধোঁয়া, আমিষ>আঁষ, কম্পন>কাঁপা, ঝম্প>ঝাঁপ, চম্পক>চাঁপা, গ্রাম>গাঁ, সমপর্ণ>সঁপা, গুম্ফ>গোঁফ।
ং: বংশী>বাঁশি, সংক্রম>সাঁকো, হংস>হাঁস, বংশ>বাঁশ।
তবে নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত না-হলে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন-
ঘৃণা>ঘেন্না, রত্ন>রতন, মানিক্য>মানিক, শাল্মলী>শিমুল, গঙ্গা>গাঙ, বন্য>বুনো, মনুষ্য>মানুষ, বান্দর>বানর, যত্ন>যতন, স্বর্ণ>সোনা, কর্ণ>কান, রন্ধন>রান্না, লাঙ্গল>লাঙল, জন্ম>জনম, হাঙ্গর>হাঙর, ব্রাহ্মণ>বামুন প্রভৃতি।
ব্যতিক্রম: কখনো দেখা যায় নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত হলেও চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন-
কঙ্ক>কাক, টঙ্ক>টাকা, কর্দম>কাদা, কৃপণ>কিপটে, লম্ফ>লাফ, ঝঞ্ঝা>ঝড়, কৃষ্ণ>কালো, শৃঙ্খল>শিকল প্রভূতি।
(বই: প্রায়োগিক প্রমিত বাংলা বানান, লেখক: ড. মোহাম্মদ আমীন Mohammed Amin)
 
বানান শেখার আসর-৩
ঢাকা শহরকে আপনি ঢাকা বলতে পারেন আবার শাক ঢাকা ভাতও ঢাকা। কিন্তু ভোরে আম্মুকে ডাকা অন্য কথা। তেমনইভাবে হোঁচট খেয়ে পড়ে শরীরে ঘা হতে পারে তাই বলে আপনার গা কি দোষ করলো? হতে পারে গাঁ এখনো পিচ্ছিল কাদায় লেপা। এই কাদা বলতে গিয়ে মনে পড়লো, একবার মামাবাড়ির কাদা দেখে সেকি কাঁদা। তবে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কারণ যখন মনটাই বাঁধা আছে ওখানে। অবশ্য হেঁটে যেতে হবে। হাটের হাট আর হেঁটে চলা কিন্তু এক নয়। যেমনভাবে এক বন্ধু গর্বকে গর্ভ বানিয়ে ফেলেছিলেন। দেশকে নিয়ে গর্ব করা গেলেও মায়ের গর্ভ নিয়ে কি গর্ব করা যায়? তবে গর্বে নয় দেশকে আমরা কাজের মাধ্যমে গড়বো। গড়তে গেলে তো পড়তে হবে। আর পড়তে হলে স্কুলে যাওয়া চাই। সেজন্য অবশ্য ভালো জামা পরতে হবে। ওড়নাও পরতে পারি আবার মেকআপ। কিন্তু জুতা পরে যাওয়া চাই না-হলে কখন যে হোঁচট খেয়ে পড়বে তার ঠিকানা নেই। এতেকরে দাঁতও পড়তে পারে। পারা না-পারার মাঝে কিন্তু পাড়াকে আনবেন না। কেননা কোন পাড়ায় কে থাকেন সেটা নিয়ে রসিকতা ঠিক নয়। আমার মনে আছে একদিন আরিফ ভাইয়া বলেছিলেন ‘জাবির, আমি বুঝি তুমি বোঝ না’। বোঝার সাথে খোঁজার মিল আছে তবে খুঁজতে হবে আপনাকে মিলটা।
 
এবার অন্য কথায় আসি। মেয়েরা যে হার পরে স্টাইল করে সেটা আমি হাড়েহাড়ে টের পাই হাড়-কাঁপা শীতেও ওরা পুঁতির হার দেখাতে গরমপোশাক পরতে অনীহা জানায়। শুধু কি তাই? ওষ্ঠকে অষ্টপ্রহর রাঙিয়ে রাখে। আপনি যদি মাছ খাওয়ার আশ করেন তারা কিন্তু নখের নখ-পালিশ মোছার ভয়ে আঁশটাও তুলবে না। তাদের এই ভয়ে আমাদের বয়েই গেল। আমরা নিজেরাই মাছ কাটতে পারি৷ তবে মাছের কাঁটা থেকে সাবধান বড়দা’কে দা দিবেন না, কারণ তিনি তো দা ধরতে পারেন না। সেজন্যই দা থেকে তিনি দূরে থাকেন। আজকাল অনেক ছড়াকার দূরের সাথে গোরের অন্ত্যমিল দিয়ে বসেন। এটা কিন্তু দুর্বল অন্ত্যমিল। আপনি গোরের সাথে ঘোরের দিলেও আপত্তি নেই কারণ ঘুমের ঘোর আর গোর-কবর এক নয়। আবার এই ঘোরের সাথে ঘুরাঘুরির কোনো মিল নেই। বন্ধুকে নিয়ে ঘুরি আবার সময় পেলে আকাশে ঘুড়িও উড়াই। এইটাই আমাদের স্বভাব। জননীকে মাতা বললেও মাথা বলতে যাবেন না, কারণ মাথা মানে মস্তক। তেমনিভাবে আঁসু চোখের জল হলেও আসু আঁধার এটা মনে রাখবেন। আঁধারকে আবার আধারের সাথে গুলিয়ে ফেললে অর্থ অন্ধকার থেকে বাটিতে পরিণত হবে। আর নয়, এই পর্যন্ত থাক। এই থাক’কে আবার তাক বানাবেন না। তাহলে ওটা বন্দুক তাক করায় চলে যাবে। 
 
বানান শেখার আসর-৭
কিছু বানান খুব দরকারি কিন্তু সরকারিভাবে ওগুলোতে আমরা ভুল করে যাচ্ছি। কেউ পাত্তাই দিচ্ছি না।
প্রথমে এই ‘না’ ধরা যাক। না শব্দের শেষে এলে আলাদা বসবে। আবার শব্দের প্রথমে এলে একসাথে বসবে কিংবা হাইফেন দিয়ে বসবে। কিন্তু আমাদের ‘না’ ব্যবহারে সেঁটে বসানোর অভ্যাস মোটেই পরিবর্তন হয় না।
কবিতা, গল্প অথবা প্রবন্ধকে আমরা লেখনী বা লিখনী বলে চালিয়ে দিই। আসলে লেখনী মানে লেখা নয়, লেখনী মানে কলম। এই কথাটা কেন যে কেউ মানতে চায় না আমার বুঝে আসে না।
যখন কাউকে স্মরণ করতে বলা হবে তখন সেটা স্মরুন হয়ে যাবে। অর্থাৎ মূর্ধন্য-ণ দন্ত্য-ন হয়ে যাবে। এটা স্মরণ রাখবেন।
যেমন- সেইদিনটাকে স্মরুন, যেদিন আপনাকে আমাকে বস্ত্রহীন অবস্থায় দাঁড়াতে হবে মালিকের সামনে।
সম্মানি ব্যক্তির নামের বদলে যখন সর্বনাম ব্যবহার করা হবে তখন চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করবেন। যেমন- তাঁর, তাঁহার।
অনেকেই কবিতা বা ছড়ায় লিখে বসেন ‘সব কবিদের’ । এমনটি লেখা ঠিক নয়। এখানে ‘কবিদের’ বলাতেই বহুবচন আছে তার উপর আবার ‘সব’ ব্যবহার করা ভুল। তেমনইভাবে আমাদেরকে, তাদেরকে লেখাও ঠিক নয়। লিখুন আমাদের, তাদের।
‘গুলো’, ‘রা’, ‘টি’, ‘টা’ ইত্যাদি শব্দের সাথে সেঁটে বসার কথা কিন্তু আমরা কতজন সেটা মানছি বলুন?
‘রে’ যখন ডাকার অর্থে বসবে তখন আলাদা বসবে অন্যথায় একসাথে বসবে। যেমন –
“আয় রে খুকু ঘরে আয়”
আবার-
“আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী”
 
বানান শেখার আসর-৯
বাংলা ভাষায় এমন কতগুলো শব্দ আছে যেগুলো বানান ও উচ্চারণের দিক থেকে একই, তবে অর্থ ভিন্ন। সেইসব শব্দের মধ্য থেকে কয়েকটি আপনাদের পড়তে দিলাম।
অকর- হাত নেই এমন
অকর- আলো নেই এমন
অকর- শুল্কের অযোগ্য
আধার- পাত্র, বাটি, স্থান, আশ্রয়, অবলম্বন
আধার-মাছ বা পশুপাখির খাবার।
কর- হাত
কর- ভ্যাট, খাজনা, ট্যাক্স
কর- কিরণ,আলো
কাম- যৌনতা, সম্ভোগের ইচ্ছা
কাম- কাজ, কর্ম
কাম- কামনা, ইচ্ছা, অনুরাগ
কার- গাড়ি (car)
কার- কাহার?
কার- ঝামেলা, সংকট (কারে পড়া)
খান- একটি বংশের নাম (খানদান – বংশ)
খান- খেতে বলা
খান- স্থান ও সংখ্য নির্দেশক
খান- টুকরো, খণ্ড
গাল- গালি, কটুবাক্য।
গাল- কপোল, মুখ-বিবর, মুখ
চাল- চাউল
চাল- ফন্দি,কৌশল( বেশতো একটা চাল চেলেছো)
চাল-বাঁশ খড় টিন ইত্যাদি দিয়ে তৈরি ঘরের ছাদ।(ফুটা চাল)
চাল- আচার, ব্যবহার ( নবাবি চাল)
ডাল- ডাল-ভাতের ডাল, শস্যবীজ- মুগ, মসুর
ডাল- গাছের ডাল, বা শাখা
নাও- নৌকা
নাও- কোনকিছু নেওয়ার জন্য বলা। (কোনকিছু নিতে বলা)
নাও- স্নান করো
নয়- ৯ সংখ্যা
নয়- নীতি, উপদেশ, শাস্ত্র সম্মত আচরণ ( নয়জ্ঞ)
নয়- নতুবা, কিংবা, নহে
পড়া- অধ্যয়ন (বই পড়া)
পড়া- পতিত হওয়া ( গাছ থেকে আম পড়া)
পড়া-বিপদগ্রস্ত হওয়া (ডাকাত পড়া), ধরা( মরচে পড়া), লাগা( পোকা পড়া)
পণ- দৃঢ়সঙ্কল্প, প্রতিজ্ঞা।
পণ-বিয়েতে বর বা কনে পক্ষকে যে অর্থ দিতে হয়।
পণ-২০ গণ্ডা বা ৮০ টি।
পান- পানীয় পান করা (তরল জাতীয় কিছু খাওয়া)
পান- পানসুপারির পান (এক প্রকার পাতা যা চুন সুপারীর সাথে খাওয়া হয়।)
পাড়া- মহল্লা
পাড়া- বৃন্তচ্যুত করা, নামিয়ে আনা, প্রসব করা, অবতারণা করা
পরে- পরিধান করে
পরে- অন্য সময়ে, কোনো ঘটনার শেষে, পশ্চাতে, ভবিষ্যতে
পরে- উপরের সংক্ষিপ্ত রূপ (কাব্যে)
বোল- আমের মুকুল
বোল- বাক্য, বচন, কথা, বাজনার গৎ, মন্ত্রজ্ঞান
বোল- ক্ষার জল
বোঝা- বুঝতে পারা (বোধ বা উপলব্ধি করা)
বোঝা- দায়, দায়িত্ব ( সে আমার বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বোঝা- মাথায় বা ঘাড়ের বোঝা (ভার,মোট- বহন করা হয় এমন।)
বোঝা- বিচার করা( বুঝে শুনে কাজ করা)
মুদি- বন্ধ করি, বুজিয়ে দেই
মুদি- দোকানদার
রব- পালনকর্তা
রব- আওয়াজ
হাল- নৌকার হাল( বৈঠা), কর্ণ, অরিত্র
হাল- অবস্থা, দশা, চলতি, বর্তমান কাল
হাল- লাঙল
 
বানান শেখার আসর-১১
.
কথাটি ইংরেজি হলেও আমরা ওটাই বেশি ব্যবহার করে থাকি, আর সেটা হচ্ছে ‘টাইপিং মিস্টেক’।
কারো জন্য এটা অনুশোচনা আবার কারো জন্য অজুহাত।
৫ম শ্রেণির ছাত্রীটি টাইপিং মিস্টেক করে কী লিখেছিলো জানেন? ‘ননীর পুতুল’ না লিখে লিখেছিলো ‘নানির পুতুল’!
আমার এক ভাই ‘আমিন’ কমেন্টের রিপ্লাই দিতে গিয়ে লিখে ফেলেছিলন ‘ছুম্মা আম্মু’! পরে অবশ্য এডিট করে ‘ছুম্মা আমিন’ লিখেছেন।
এই টাইপিং মিস্টেক যখন প্রেমিক-প্রেমিকার বেলায় ঘটে তখন কী হয় দেখুন।
(এক জুটিতে কি একটা কারণে কথা বন্ধ হয়ে যায়। একসময় ছেলেটি অভিমান দূরে ঠেলে প্রেয়সীকে চিরকুট পাঠালো- “ভুল হয়ে গেছে। এবারের মতো ‘মাপ’ চাই।”
উত্তরে প্রেমিকাও লিখে দিলো- “যাও, ‘কমা’ করে দিলাম।)
পরিমাপের ‘মাপ’ আর দাঁড়ি-কমার ‘কমা’ ওরা ব্যবহার করলেও প্রেমের বেলায় সাতখুন মাফ। তাই তাদের ‘টাইপিং মিস্টেক’ বলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু যখন প্রিয় বন্ধুটি এসএমএস করে – ‘বন্দু বালো আছো?’ তখন সত্যি দ্বিধায় না-হোক ধাঁধায় পড়ে যেতে হয়।
একটি সনদে গ্রুপের স্লোগান লেখা ছিলো এরকম-
“এমমন সাহিত্য গড়ো না তৈরী
যে সাহিত্য হয় অগ্নিপিন্ড নর্গতরী”
যদি সনদে এমন ভুল থাকে তবে সাহিত্য গোল্লায় না গিয়ে পারে?
আসুন আমরা টাইপিং মিস্টেক কিছুটা হলেও কমিয়ে আনি। লেখার সৌন্দর্য অর্ধেক ভাষায় আর অর্ধেক বানান শুদ্ধতায়।
 
 
বানান শেখার আসর-১৫
 
আমার মতো যারা বানানের বেলায় অপটু তাদের যে জিনিসটা লিখতে গেলে সর্বদা বিব্রত করে রাখে সেটা হচ্ছে মূর্ধন্য-ণ আর দন্ত্য-ন এর ব্যবহার। ব্যাকরণের ধারাগুলো পড়ে ঠিক যেনো মাথায় ঢুকে না। আর তাই তো কখনো একটু সাহস করে লিখতে গেলেই যে ভুলগুলো করে ফেলি সেগুলো পড়ে কেউ হাসেন আর কেউ চিন্তা-স্রোতে ভাসেন। ধরুন লিখতে গেলাম ‘আপন’ লিখে বসি ‘আপণ’। এতে নিজেকে বোঝাতে গিয়ে সোজা দোকান বুঝিয়ে বসলাম। আবার ঘরের ‘কোণ’ বলতে গিয়ে যখন ‘কোন’ লিখে বসি তখন সেটা প্রশ্ন করার ‘কোন’ হয়ে যায়। যেমন- কোন গাঁয়ে তোমার বাড়ি?
আবার মনে করুন তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কারো কাছে ‘পাণি’ চাইলাম, তখন সে যদি ‘পানি’ না দিয়ে নিজের খালি হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন কিন্তু রাগতে পারা যাবে না। কারণ ‘পাণি’ মানে তো আর জল নয়, পাণি মানে হাত। মনে ‘করুন’ বলতে গিয়ে যদি মনে ‘করুণ’ বলে বসি, এতেও সমস্যা হবে। কেননা, ‘করুণ’ অর্থ মর্মান্তিক। করতে বলা হলে ‘করুন’ লিখতে হবে, ‘করুণ’ নয়। ধানের ‘মণ’ আর মানুষের ‘মন’ তেমনই, মূর্ধন্য-ণ আর দন্ত্য-ন নিয়ে সমস্যা। কোন বর্ণের কোন গুণ সেটা গুনতে গিয়ে আমার মতো অনেকেরই অবস্থা কাহিল।
 
বানান শেখার আসর-১৮
নামের কথা আমি জানি না, নাম নিজস্ব বিষয়। তবে অন্যসব লেখার ক্ষেত্রে যখন আরবি শব্দ আসবে তখন আমরা কিছু শব্দে দ্বিধায় পড়ে যাই যে, ঠিক কোন বর্ণ দিয়ে লিখব? এটা যে শুধু মাদ্রাসার জন্য তা কিন্তু নয়, বরং বাংলা ভাষায় অসংখ্য শব্দ আরবি ভাষা থেকে এসেছে। আর এই আনিত শব্দগুলোর ﺵ, ﺙ, ﺹ, ﺱ বর্ণের বানানে অধিক ভুল হয়। আজ সেই সম্পর্কে আলোচনা হবে।
আরবি বর্ণ ﺵ ( শিন)-এর বাংলা বর্ণ রূপ হবে তালব্য-শ। এছাড়া ﺙ ( সা ) , ﺱ ( সিন) ও ﺹ ( সোয়াদ)-এর উচ্চারিত রূপ হবে দন্ত্য-স। বিষয়টি এই পর্যন্ত।
সেইসাথে খুব ভালো করে মনে রাখবেন- ছ, ণ ও ষ-এর ব্যবহার শুধু আরবি নয় বরং বিদেশি কোন ভাষাতেই হবে না।
এবার আসি ইংরেজি শব্দে। ইংরেজি বর্ণ S-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হবে দন্ত্য-স। এছাড়া sh, -sion, -tion শব্দগুচ্ছে তালব্য-শ হবে। আগেই বলেছি বিদেশি শব্দে ‘ষ’ এর ব্যবহার হয় না। যেমন- স্টোর, স্টার, মাস্টার্স ইত্যাদি।
বিদেশি শব্দে দীর্ঘ-ঈ কারের ব্যবহার হয় না। সেখানে হ্রস্ব-ই কার ব্যবহার করা হয়, এটা মনে রাখবেন।
 
 
বানান শেখার আসর-২২
 
হাত নিয়ে যে কতো কেচ্ছা-কাহিনি আছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমরা ঘুস খাওয়াকে ‘বাম হাতের কাজ’ বলে থাকি আবার ‘ডান হাতের কাজ’ হলো ভাত খাওয়া। ‘হাতের পাঁচ’ বললে বুঝি শেষ সম্বল। চুরি-বিদ্যাকে ‘হাতসাফাই’ বলা হয়। এদিকে ‘হাতটান’ বলতেও চুরির অভ্যাস সেটা সবাই জানি। যখন কেউ খ্যাতি অর্জন করেন তখন সেটিকে ‘হাতযশ’ বলি। মিছে অপারগতা প্রকাশকে বলি ‘অজুহাত’। ‘হাততোলা’কে প্রহার করা বলে অন্যদিকে ‘হাতপাতা’ মানে ভিক্ষা করা। যখন প্রমাণ সমেত কাউকে কোনো কাজে ধরি তখন বলি ‘হাতেনাতে ধরা’। ‘কাঁচা হাতের লেখা’ বলেও একটা কথা আছে, যখন নতুন লেখালিখি শুরু হয় তখন এটি ব্যবহার করি। কাউকে বশে আনতে পারলে ঐ কাজকে ‘হাতকরা’ বলেও চালিয়ে দেই। লুটে নেওয়াকে ‘হাতিয়ে নেওয়া’ বলা হয়। কারো কাজের মাঝখানে নিজে ঢুকে যাওয়াকে ‘হস্তক্ষেপ করা’ বলে থাকি। কেউই তার সব সম্পত্তি হাতে নিয়ে ঘোরেন না তবুও কবিতায় ‘পর হস্তের ধন’ বলে কথাটি আছে। ‘উপুড়হস্ত’ বলে দানশীল হওয়া বুঝানো হয়। হাতের অস্ত্রকে ‘হাতিয়ার’ বলি আবার অন্ধকারে খোঁজাকে ‘হাতড়ে’ খোঁজা বলা হয়। রোজকার খরচকে আমরা ‘হাতখরচ’ বলে থাকি। ‘হাতকষা’ কৃপণের কাজ। আসামিকে আটক করার লোহার বলয়কে ‘হাতকড়া’ বলা হয়। অন্যদিকে পুরোনো জিনিস হলো ‘হাতফেরতা’। মালিকানা বদলের ক্ষেত্রেও ‘হাতবদল’ বলে থাকি। হাতের নিশানাকে আবার ‘হাতসই’ বলি। কর্মিরা সহকর্মিদের, ‘হাত চালাও’ বলে কাজের গতি বাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। কারো কারো কিন্তু মুখ না চললেও মারামারির ক্ষেত্রে ‘হাত চলে’ বেশি। স্কুল-কলেজে ‘হাতের কাজ’ বলে আলাদা একটি পরীক্ষাও আছে! হাত নেড়ে টা টা জানানো, হাতজোড়ে ক্ষমা চাওয়া, হাত চুলকানোকে টাকা প্রাপ্তির লক্ষণ- এমন আরও কতো কথা আছে।
শুনলে অবাক হবেন ‘হাতি’ শব্দটিও কিন্তু হাত থেকে এসেছে। সংস্কৃত শব্দ হস্তী থেকে হাতি। আর হস্তী এসেছে হস্ত থেকে। হস্ত অর্থ হাত। অর্থাৎ হাতওয়ালাকেই হাতি বলা হয়। মানুষ হাতওয়ালা বলে তাদের কিন্তু হাতি বলতে যাবেন না। নয়তো কপালে দুঃখ আছে।
 
বানান শেখার আসর-২৪
কিছু প্রমিত বানান আপনাদের জানাবো। প্যাচালে ফাঁসতেও পারেন আবার হাসতেও পারেন, কেউ কেউ চিন্তা-স্রোতে ভাসতেও পারেন।
‘গরু’ বানান ‘গোরু’
‘জাহান্নাম’ বানান ‘জাহান্নম’
‘বড়’ বানান ‘বড়ো’
‘ঈদ’ বানান ‘ইদ’
‘ভিডিও’ বানান ‘ভিডিয়ো’
‘দ্বীন’ বানান ‘দিন’
‘স্বাগতম’ বানান ‘স্বাগত’
‘ব্যাঙ’ বানান ‘ব্যাং’
‘ঈগল’ বানান ‘ইগল’
‘সম্মানীয়’ বানান ‘সম্মাননীয়’
‘পেত্নী’ বানান ‘পেতনি’
‘ব্যবহারিক’ বানান ‘ব্যাবহারিক’
‘দিও’ বানান ‘দিয়ো’
‘পীর’ বানান ‘পির’
‘পরী’ বানান ‘পরি’
‘টমেটো’ বানান ‘টম্যাটো’
‘অংক’ বানান ‘অঙ্ক’
‘কৈ’ বানান ‘কই’
‘সাথী’ বানান ‘সাথি’
‘বৌভাত’ বানান ‘বউভাত’
বানানগুলো দেওয়ার মানে এই নয় যে আপনারা বিভ্রান্ত হোন, বরং সত্যটা জানুন।
 
 
 
 
বানান শেখার আসর- ৩৩
.
বিষয়টি মানতে বেখাপ্পা মনে হলেও ওটাই ঠিক যে, ‘রাণী’ শব্দ ভুল। শব্দটি ‘রানি’ হবে। অতৎসম শব্দে ‘ণ’ ব্যবহার হয় না। ‘প্রাণ’ মূর্ধন্য-ণ দিয়ে হলেও ‘পরান’ দন্ত্য-ন দিয়ে হয়। তেমনই আরো কিছু শব্দ দেখুন-
ইরান, কোরান, ধরন, ঝরনা, হর্ন, অঘ্রান, গভর্নর, চিরুনি, দরুন, পুরানো, ঠাকরুন প্রভৃতি।
তেমনইভাবে তৎসম শব্দে ট ঠ ড ঢ-এর পূর্বে মূর্ধন্য-ণ বসবে। যেমন- কণ্টক, প্রচণ্ড, লুণ্ঠন, আণ্ডা, মুণ্ডু, ষণ্ডা, খণ্ড ইত্যাদি।
আবার অতৎসম শব্দ ট ঠ ড ঢ-এর পূর্বে দন্ত্য-ন বসবে। যেমন-
ঠাণ্ডা নয় ঠান্ডা হবে।
ডাণ্ডা নয় ডান্ডা হবে।
গুণ্ডা নয় গুন্ডা হবে।
ঝাণ্ডা নয় ঝান্ডা হবে।
লণ্ঠন নয় লন্ঠন হবে।
বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে ণত্ববিধান প্রযোজ্য নয়। তাই বিদেশি শব্দে দন্ত্য-ন হবে।
 
বানান শেখার আসর-৩৮
 
আমরা ‘বাঙ্গালী’ থেকে ‘বাঙালি’ হলেও দীর্ঘ ঈ-কার দেওয়া ছাড়তে পারিনি৷ যেখানে আছে সেখানে তো দিই যেখানে নেই সেখানেও জোর করে বসাই। আমার কয়েকজন আপু আমাকে আদর করে ‘জাবীর’ লিখেন। এতে আমি খুশি কিন্তু বানানের ক্ষেত্রে এটা অর্থ পাল্টে দিতে পারে। যেমন- আপনি ‘বেশি’ (বাড়তি) লিখতে গিয়ে ‘বেশী’ লিখে ফেললে অর্থ বেশধারী/মুখোশধারী হয়ে যাবে।
আমি আপনাদের আগেও বলেছি মানুষের সাথে বসা ‘কারী’ দীর্ঘ ঈ-কার আর অন্যথায় ‘কারি’। যেমন লিখলেন ‘সহকারী’। এখানে মানুষের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দরকারি, সরকারি, এগুলো ‘কারি’ হবে।
কতগুলো শব্দ থেকে আমরা দীর্ঘ ঈ-কার আজ থেকে বর্জন করি চলুন-
দেশী→দেশি
বিদেশী→বিদেশি
বাড়ী→বাড়ি
গাড়ী→গাড়ি
দাদী→দাদি
নানী→নানি
শাড়ী→শাড়ি
খুকী→খুকি
খুশী→খুশি
খুড়ী→খুড়ি
খুনী→খুনি
চাকরী→চাকরি
চীৎকার→চিৎকার
জরুরী→জরুরি
ডাইনী→ডাইনি
দামী→দামি
দীঘি→দিঘি
দেরী→দেরি
নীচে→নিচে
পদবী→পদবি
বকুনী→ বকুনি
বর্ণালী→বর্ণালি
বাকী→বাকি
ভীড়→ ভিড়
মশারী→ মশারি
যুবতী→যুবতি
শরীক→শরিক
সরণী→সরণি।
 
 
বানান শেখার আসর- ৪০
 
অনেকের ধারণা বাংলা ভাষা থেকে হয়তো কিছুদিন পর দীর্ঘ-ঈ এবং দীর্ঘ ঈ-কার বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এমনটি আশা করা ঠিক নয়। কারণ কিছু শব্দে আষ্টেপৃষ্ঠে দীর্ঘ ঈ-কার জুড়ে আছে। বেশি দূর যেতে হবে না, আপনার স্ত্রীর কথাই ভাবুন। স্ত্রী থেকে কিন্তু দীর্ঘ ঈ-কার সরাতে পারবেন না। তেমনইভাবে স্ত্রী-বাচক শব্দগুলোতেও লেগে আছে দীর্ঘ ঈ-কার। যেমন- মানবী, ছাত্রী, নদী, মায়াবী, কামিনী, গৃহিণী ইত্যাদি। ভালবাসি ‘বাসি’ হলেও বাসী খাবারের ‘বাসী’ দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে।
নীতির কথাই ধরুন। রাজনীতি, অর্থনীতি, মূলনীতি এমনকি দুর্নীতিতেও রীতিমত দীর্ঘ ঈ-কার আছে। এই রীতি, প্রীতিও অনুরূপ। দীর্ঘ ঈ-কারে যে ঈ-কার আছে সেটা কি ভুলে গেলেন? দীর্ঘ ঈ-কার ছাড়া ‘জীবন’টাই বৃথা। প্রাণ থাকলেও দীর্ঘ ঈ-কার ছাড়া প্রাণী হওয়া যায় না।
ভোগ করলে ‘ভোগী’, রোগ হলে ‘রোগী’, যাত্রা পথে ‘যাত্রী’, সঙ্গ দিলে ‘সঙ্গী’, মন্ত্রণালয়ে ‘মন্ত্রী’।
যোগের সাথে যোগীর মিল আছে কি না জানি না তবে দীর্ঘ ঈ-কারের মিল আছে। হীন, লীনেও আছে দীর্ঘ ঈ-কার। আওয়ামী লীগের ‘লীগে’ আছে, রাতের শশীতে, মহিলার স্বামীতে দীর্ঘ ঈ-কার। অনুগামী, একাকী, উপকারী, পরমুখী, নীরব, নীরস, দ্বিতীয়, তৃতীয়, জননী, কী, কীভাবে, সন্ন্যাসী, সম্মাননীয়, শিল্পী, লক্ষ্মী, পক্ষী, মহীয়সী, মহতী, নীড়, বিশ্রী, ব্যতীত, অতীত, বীর, বীরাঙ্গনা, প্রবীণ, গ্রামীণ, পীড়ন, পীড়াপীড়ি, নিরীহ, দীর্ঘ, দীর্ঘজীবী, অধীন, অনুযায়ী -আর কতো বলবো যা দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে প্রণীত হয়। শেষমেশ মনে করিয়ে দিচ্ছি এই যে, দীর্ঘ ঈ-কার থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রীও বাদ যাননি।
 
বানান শেখার আসর- ৪৫
আপনারা যে কুরবানি দিতে যাচ্ছেন, মনে রাখবেন ওটা ‘কোরবানি’ বা ‘কুরবানী’ নয় বরং ‘কুরবানি’। এই কুরবানির ইদও কিন্তু ‘ঈদ’ নয় ‘ইদ’। ইদে জবাই হবে যেটা ওটা ‘গরু’ বললে ভুল হবে, বানানটা ‘গোরু’। সকালে ঘুম থেকে উঠে বড়োদের সালাম করতে গিয়ে খেয়াল রাখবেন শব্দটা ‘বড়দের’ নয় বরং ‘বড়োদের। তেমনই ‘ছোটদের’ বেলায়ও ‘ছোটোদের’ খেয়াল রেখে স্নেহ করবেন। কদমবুসি ‘সম্মাননীয়’ ব্যক্তিদের করা যায় কিন্তু ‘সম্মানীয়’দের নয়। অতঃপর ‘কোলাকুলি’ করতে ‘কুলাকুলি’ করে ভুল করবেন না। মরহুম-মরহুমাদের জন্য জান্নাতের ‘বাগ’ চাইতে গিয়ে ‘বাঘ’ বানিয়ে ফেললে হাসাহাসির পাত্রে পরিণত হবেন। আর নিজে ‘জাহান্নম’ থেকে পানাহ চাইতে খেয়াল রাখবেন শব্দটি ‘জাহান্নাম’ নয় ‘জাহান্নম’। ‘জায়নামাজ’টাকেও ‘জায়নামায’ বলা যাবে না। এদিকে ‘পীর’-ফকিরের ‘উছিলা’ নিয়ে ‘সর্গ’ চাইলে ভুল হবে বরং ‘পির’-ফকিরের ‘অসিলা’ নিয়ে ‘স্বর্গ’ চাইতে পারেন। আমরা তো আর যেচে ভুল বানানকে ‘স্বাগত’ জানাতে পারি না (এখানে ‘স্বাগতম’ বললে ভুল হবে)। নতুন কাপড় ‘পরা’ যায় কিন্তু ‘পড়া’ যায় না, এটাও মনে রাখবেন। আর যদি নতুন কাপড় কিনতে না পারেন তবে পুরোনো কাপড় ‘পরিষ্কার’ করে পরবেন, কিন্তু এই ‘পরিষ্কার’ করতে গিয়ে ‘পরিস্কার’ করলেও ভুল হবে। ‘উপরিউক্ত’ (উপরোক্ত নয়) বানানগুলো আমার মনগড়া নয়, এগুলো বাংলা ‘একাডেমি’ (একাডেমী বানান ভুল) থেকে প্রণীত।
.
 
বানান শেখার আসর- ৪৬
মানুষের মতো পশু-পাখির ভাষা বিস্তর নয়। ওদের সীমিত শব্দে ওরা তাদের ভাব প্রকাশ করে। ওদের না-আছে বর্ণমালার প্রয়োজন আর না-আছে ভাষা শিক্ষার তাগিদ। চলুন কিছু পশু-পাখির ডাক জেনে নিই।
.
কাকের ডাক- কা-কা
পাখির ডাক-কূজন
ময়ূরের ডাক- কেকা
অশ্বের ডাক- হ্রেষা
কুকুরের ডাক – বুক্কন
বিড়ালের ডাক- জিবন
রাজহাঁসের ডাক- ক্রেঙ্কার
ব্যাঙের ডাকের শব্দ- মকমকি
গাধার ডাক – রাসভ
হাতির ডাক – বৃংহিত
সিংহের ডাক – হুঙ্কার
বাঘের ডাক – গর্জন
গোরুর ডাক – হাম্বা
ভ্রমরের ডাক- গুঞ্জন
 
বানান শেখার আসর- ৪৮
সাধু থেকে চলিত রূপের কিছু শব্দ যথাক্রমে দেখানো হলো:
আঙ্গিনা→আঙিনা,
আঙ্গুল→আঙুল,
ভাঙ্গা→ভাঙা,
রাঙ্গা→রাঙা,
রঙ্গিন→রঙিন,
 
বাঙ্গালি→বাঙালি,
লাঙ্গল→লাঙল,
হউক→হোক,
যাউক→যাক,
থাউক→থাক,
 
লিখ→লেখ,
গুলি→গুলো,
শুন→শোন,
শুকনা→শুকনো,
ভিজা→ভেজা,
 
ভিতর→ভেতর,
দিয়া→দিয়ে,
গিয়া→গিয়ে,
হইল→হলো,
হইত→হতো,
 
খাইয়া→খেয়ে,
থাকিয়া→থেকে,
উল্টা→উল্টো,
বুঝা→বোঝা,
পূজা→পুজো,
 
বুড়া→বুড়ো,
সুতা→সুতো,
তুলা→তুলো,
নাই→নেই,
নহে→নয়,
 
নিয়া→নিয়ে,
ইচ্ছা→ইচ্ছে ইত্যাদি।
 
বানান শেখার আসর- ৭২
ভুলে গেলে হবে না যে, বিসর্গ একটি বর্ণ, তার ব্যবহারও হয় শব্দে। অথচ অনেকেই মনে করেন বিসর্গ স্বর্গে থাক মর্ত্যে এসে খামোখা ভেজাল বাড়ানোর প্রয়োজন কি? তবে যাই বলেন বিসর্গের জন্ম যেহেতু মর্ত্যে তাই তার ব্যবহারও মর্ত্যে হবে আর সেটা বাংলা বর্ণ হওয়ার দরুন বাংলায় হওয়া চাই। চলুন কিছু বিসর্গ শব্দের সাথে পরিচিত হই।
 
অতঃপর, অধঃপতন, অধঃপাত, অন্তঃপুর, অন্তঃসত্ত্বা,
অন্তঃকোণ, অন্তঃকরণ, অন্তঃক্রীড়া,অন্তঃসারশূন্য, অন্তঃস্থ,
অন্তঃরাষ্ট্রীয়, ইতঃপূর্বে, উচ্চৈঃস্বরে, গলাধঃকরণ, নিঃশঙ্ক,
 
নিঃশব্দ, নিঃশর্ত, নিঃশেষ,  নিঃসংকোচ, নিঃসংশয়, 
নিঃসঙ্গ, নিঃসন্তান, নিঃসন্দেহ, নিঃসম্বল, নিঃসরণ, 
নিঃসহায়, নিঃসাড়,  নিঃসীম, নৈঃশব্দ্য, নৈঃসঙ্গ্য, 
 
পয়ঃপ্রণালি, পুনঃপুন, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রকাশ, 
পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রাতঃকৃত্য, প্রাতঃক্রিয়া, প্রাতঃস্নান, 
প্রাতঃকাল, প্রাতঃস্মরণীয়, পৌনঃপুনিক, দুঃখ, দুঃশাসন,
 
দুঃসংবাদ, দুঃসময়, দুঃসহ, দুঃসাহস, দুঃস্বপ্ন, ধনুঃশর, 
বয়ঃকনিষ্ঠ, বক্ষঃস্থল, বয়ঃক্রম, বয়ঃসন্ধি, বয়ঃসীমা, 
বহিঃপ্রকাশ, বহিঃশুল্ক, বহিঃসমুদ্র, মনঃকষ্ট, মনঃপূত, 
 
মনঃপ্রাণ, মনঃক্ষোভ, মনঃক্ষুণ্ন, মনঃসংযোগ, মনঃসমীক্ষা,
মনঃপীড়া, শিরঃপীড়া, সদ্যঃস্নাত, সর্বান্তঃকরণ, স্বতঃসিদ্ধ,
স্বতঃস্ফূর্ত, স্বতঃপ্রবৃত্ত, স্বতঃপ্রণোদিত, স্রোতঃস্বতী, 
 
 
 
বানান শেখার আসর-৭৫
 
আপন কখনো আপণ হয় না তেমনই পরকে ‘পর ভাবতে নেই। কেননা আপণ তো দোকান আর ‘পর হলো উপরের সংক্ষিপ্ত রূপ। দাদার মুখের ধাঁধাঁর মতো এটাও একটা যে, কোনটি বাঁধা যাবে আর কোনটিকে বাধা দেওয়া যায় না। পার্থক্যটা ধরতে হবে আপনাকে চন্দ্রবিন্দু দিয়ে। বেঁধে রাখতে হলে চন্দ্রবিন্দু সাথে থাকা চাই, অথচ বাধা দিতে গেলে তার কোনো প্রয়োজন নেই। নতুন লিখুন আর নূতন অর্থ তার একই থাকবে তবে বানানের ক্ষেত্রে হ্রস্ব উ-কার পাল্টে দীর্ঘ ঊ-কার হয়ে যাবে। এমনি আর এমনই এই দুটির মাঝে কিন্তু বিস্তর ফারাক। এমনি হলো এমনি এমনি কোনকিছু করা হলে, অপরদিকে এমনই বলতে বোঝায় অনুরূপ। কীভাবে শব্দটি কিন্তু সেঁটে বসে তবুও আমরা আলাদা বসিয়ে ভুল করে ফেলি। নীরব শব্দটি নিরব লিখে অনেকেই নীরবে ভুল করে যান। ভুল যখন ভোলা মনে চলে যায় তখন হ্রস্ব উ-কার থেকে ও-কারে পাল্টে। পাল্টে বলতে গিয়ে মনে পড়লো শহীদ শব্দটি পাল্টে প্রমিত বানান শহিদ হয়েছে। আগস্ট তো আগস্ট আছে তারপরও আমরা আগষ্ট লিখে বানান বিভ্রাট ঘটাই। বাংলা বা বাংলাদেশ অনুস্বার দিয়ে লিখলেও বাঙালি লিখতে হবে শুধু উঁয়ো দিয়ে, সাথেসাথে পিছনের হ্রস্ব ই-কার যেন দীর্ঘ ঈ-কার না হয়।
 
বানান শেখার আসর-৭৬
 
ভাষা নিয়ে আমার মতো যাদের ভাসাভাসা জ্ঞান তারাই এসবের প্যাচালে অধিক জড়িয়ে পড়েন। বেশধারণ করলে তাকে বলে বেশী আবার অধিক অর্থে বেশি ব্যবহৃত হয়।
যখন অত্যন্ত অর্থে ভারি ব্যবহার করা হবে তখন হ্রস্ব ই-কার অপরদিকে ওজনের জন্য ভারী হবে দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে।
যিনি বীরত্ব দেখান তিনি বীর পক্ষান্তরে যেখানে মানুষের জটলা বাঁধে সেটা ভিড়। তবে মনে রাখতে হবে প্রথম বীর দীর্ঘ ঈ-কার আর দ্বিতীয় ভিড় হ্রস্ব ই-কার।
কপালের প্রতিশব্দ ভাল আর উৎকৃষ্টের প্রতিশব্দ ভালো এক নয়। উভয়ের উচ্চারণ ও কার-চিহ্নের পার্থক্য আছে।
বাসী শব্দটি চিনবেন দেশবাসী, শহরবাসী, অধিবাসী ইত্যাদি দ্বারা তেমনই বাসি শব্দটি বাসি খাবারের সাথে মিলে। অবশ্য ভালোবাসি শব্দটির বানান ঠিক আছে।
 
 
বানান শেখার আসর-৭৭
গরিবকে গরীব ভেবে ভুল করবেন না যেনো। কেননা গরীব বানান ভুল, সঠিক বানান হচ্ছে ‘গরিব’।
 
তেমনই হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজলেও পাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না ‘চাকরি’ বানান ঠিক করবেন।
 
ঝাঝালো মেজাজ নিয়ে কারো উপর ঝাপিয়ে পড়ার ঝুকি নেয়া হাস্যকর। প্রথমে আপনার ঝাঁজকে ‘ঝাঁজালো’ করতে হবে। অতঃপর ‘ঝাঁপিয়ে’ পড়ার ‘ঝুঁকি’ নিতে হবে। মনে রাখবেন সমস্যাটা চন্দ্রবিন্দু নিয়ে।
 
যারা বিবাহ নামক জটিল কাজটি সেরে ফেলেছেন তারা আরেকটি জটিল কথা স্মরণে রাখবেন। শ্বশুর মশাই ব-ফলার চাদর জড়িয়ে বসে থাকলেও শাশুড়ি ব-ফলা সহ্য করতে পারেন না!
 
আপনার পড়া তখন সার্থক হবে যখন ‘স্বার্থক’ বানানকে ‘সার্থক’ দ্বারা পাল্টাবেন।
 
বানান শেখার আসর-৭৮
যা খাপ খায় না সেটাই তো বেখাপ্পা। শব্দের বেলায় সেটা প্রয়োগের বিধান আছে কি-না বিজ্ঞজনেরা ভালো জানেন। কিছু শব্দ আছে যা আমাদের কাছে বেখাপ্পা লাগতে পারে তবুও সেটা প্রায়োগিক নিয়মে লেখা উত্তম।
 
এতোদিন আমরা তরী লিখলেও শব্দটি হ্রস্ব ই-কার দিয়ে তরি লেখা হয়। তেমনই ভাবে- পল্লি, পেশি, রজনি, সরণি, সূচি, বয়সি ইত্যাদি লেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেউ যদি তরী, পল্লী, রজনী, সরণী, সূচী, বয়সী ইত্যাদি লিখেন তবে তার সাথে তর্কে জড়াতে যাবেন না। কেননা উভয় নিয়মে লেখা হয় বলে দীর্ঘ ঈ-কার বাদ দিয়ে হ্রস্ব ই-কারে চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
 
যেটা কেচ্ছা সেটাই কাহিনি কি-না জানি না। তবে ‘কাহিনী’ যে নয়, অন্তত সেটা ভালো করে জানি। কারণ ‘কাহিনী’ বানান ভুল, শব্দটি ‘কাহিনি’ হবে।
সারাদিন ‘গাভী’ দোহন করলেও দুধ পাবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত ‘গাভি’ ঠিক না-করবেন।
 
আজকাল চালাকচতুর লোকের অভাব নেই। তবে তারা ‘চালাকি’ করতে গিয়ে ‘চালাকী’ করে ফেলে কি-না তা নিয়ে আমার যতো ভয়। জানেনই তো ‘চালাকী’ বানান ভুল, সঠিক হচ্ছে ‘চালাকি’।
 
ইতিকালে কানেকানে একটি কথা বলি, যারা এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে প্রিয়ার সমীপে চিঠি লিখেন তারা ‘সাথি’ শব্দটিকে ‘সাথী’ লিখে ভুল করবেন না।
বানান শেখার আসর-৭৯
 
কাব্য গাথা, মাল্য গাঁথা একই কথা নয়। যখন সুঁই সুতোয় গাঁথা হবে তখন ‘গাঁথা’ অথচ শব্দ দ্বারা সাজিয়ে তুললে সেটা ‘গাথা’ হয়ে থাকবে। গাঁথার সাথে মাথার একটা মিল আছে। দেহের মাথা আর ঘরের মাতাও এক নয়। মাথা শির অথচ মাতা জননী। অবশ্য ফাঁদপাতা আর গাছের পাতা বানান একই তবে অর্থ ভিন্ন। যেমন প্রতিদিনের দিন আর ধর্মের দিন। সখের তুলা আশি হলেই যে সৌখিন হওয়া যাবে তা কিন্তু নয়। আপনাকে আগে ‘শৌখিন’ হতে হবে। যাদের উঁয়ো ব্যবহারের অভ্যাস বেশি আপনারা ‘ব্যাং’ আর ‘রং’ থেকে অনুস্বার সরাতে যাবেন না কিন্তু। উঁয়ো দিয়ে ‘ব্যাঙ’ আর ‘রঙ’ লিখলে ভুল হবে, এটা মনে থাকে যেন।
 
বানান শেখার আসর-৮০
 
আজ বিজয়দিবস। এই দিনে আপনার বা আপনাদের যেসকল বানান ভুল হতে পারে তার প্রথমেই ‘বিজয়দিবস’। শব্দ দুইটি যুক্ত থাকবে। অথচ অধিকাংশে ‘বিজয় দিবস’ লিখে চালিয়ে দিচ্ছেন।
 
এইদিনে শহিদগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ‘শহীদ’ লিখে ভাষার প্রতি যেন অশ্রদ্ধা না-জানাই। কেননা ‘শহিদ’ বানান এভাবেই। স্রোত পানির হোক বা রক্তের সেটার বানান ‘শ্রোত’ হবে না, তাই স্রোতের বেলায় সতর্ক হওয়া চাই।
 
তাঁরা তাঁদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন সেজন্য আমরা তাঁদের প্রতি ‘কৃতজ্ঞতা’ না-জানিয়ে তাঁদের প্রতি ‘চিরকৃতজ্ঞ’ রই। কারণ ‘কৃতজ্ঞতা’ বানান ভুল, শব্দটি ‘কৃতজ্ঞ’ হবে।
 
উনিশ শত একাত্তরে পাওয়া এই স্বাধীনতাকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে রাখবেন, প্রমিত বানান ‘উনিশ’ লেখা ‘ঊনিশ’ নয়। একইভাবে ‘উনত্রিশ, উনসত্তর, উনচল্লিশ, উনআশি’ ইত্যাদি। ডিসেম্বর তো ঠিক আছে তবে ‘ষোলো’ লিখতে গিয়ে অনেকে ‘ষোল’ লিখে ভুল করেন। সেদিকে নজর রাখা চাই।
 
তাঁরাই ‘বীরাঙ্গনা’ এদেশের যেসকল মা-বোনেরা একাত্তরে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। তাঁদেরকে ভুলেও ‘বারাঙ্গনা’ বলতে যাবেন না। কেননা যৌনকামী খারাপ মেয়েদেকের বারাঙ্গনা বলা হয়।
 
বানান শেখার আসর-৮২
 
আপনি কি জানেন, নৈঃশব্দ্য শব্দের পিছনে য-ফলা সেঁটে আছে? চলুন খুঁজে বের করি এমনতর আরো কিছু শব্দ।
অচিন্ত্য
অলঙ্ঘ্য
উপলক্ষ্য
ঐকমত্য
ঔদ্ধত্য
গার্হস্থ্য
দারিদ্র্য
দৌরাত্ম্য
নৈঃসঙ্গ্য
বৈদগ্ধ্য
বৈশিষ্ট্য
মৎস্য
সামর্থ্য
স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি।
শব্দগুলোর পিছনে য-ফলা দিতে আমরা অনেকেই ভুলে যাই।
 
বানান শেখার আসর- ৮৪
 
বানান শেখা বা লেখার ক্ষেত্রে যেসকল বর্ণ উচ্চারণে আমাদের ভুল হতে পারে তার একটি তালিকা দেওয়া হলো। আসুন বর্ণগুলোর সঠিক উচ্চারণ জেনে নিই।
ই= হ্রস্ব-ই
ঈ= দীর্ঘ-ঈ
উ= হ্রস্ব-উ
ঊ= দীর্ঘ-ঊ
ঐ= ওই
ঙ= উঁয়ো
জ= বর্গীয়-জ
য= অন্তঃস্থ-য
ঞ= ইঁয়ো
ন= দন্ত্য-ন
ণ= মূর্ধন্য-ণ
শ= তালব্য-শ
ষ= মূর্ধন্য-ষ
স= দন্ত্য-স
ত= আস্ত-ত
ৎ= খণ্ড-ৎ
ং= অনুস্বার
ঃ= বিসর্গ
ঁ= চন্দ্রবিন্দু
 — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
 
লিংক: https://draminbd.com/বানান-শেখার-আসর/
 — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
বাকি অংশ এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দেখার জন্য নিচের লিংক
 
 
 
 
 
 
 
 
 
শুবাচ -ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
 
 
সূত্র:
 
error: Content is protected !!