বানান-সমস্যা সমাধানের একটা পথ

অধ্যাপক ড. ক্ষুদিরাম দাস

(প্রবন্ধে পদের বানান লেখক যেমন লিখেছেন তেমন রেখে দেওয়া হয়েছে।)
কোনও কোনও সংবাদপত্র এমন কি শিক্ষক-লেখকদের মুদ্রিত বই খুললেও দেখা যায়-দিল, পেল, করল, দেখল, বলল। চোখে ঝলকানি ও কানে খটকা লাগে।এক্ষেত্রে বিশেষ কারও কারও মৌখিক ব্যবহারকে শিষ্ট চলিতের মধ্যে চালানো হয়েছে। আমরা আগাগোড়া শুনে এসেছি এবং ব্যবহার দেখে এসেছি-দিলে, পেলে, করলে, দেখলে, শুনলে; অথচ–গেল, চলল, হাসল, কাঁদল, ঘুমাল ইত্যাদি। ভাষায় এই ব্যবধান রাখার মধ্যে জনচিত্তে একটা অর্থ নিহিত ছিল। ক্রিয়া সকর্মক হলে অতীতের বেলায় অকর্মক থেকে তার পার্থক্য রাখার প্রয়োজন-বশে রূপে পার্থক্য মানুষ আপনা থেকেই সৃষ্টি করে নিয়েছে। নিয়েছে বোঝার এবং বোঝানোর সুবিধার জন্য। আরও একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। বাঙ্‌লা অতীতের ‘ল’ এসেছে প্রাচীনের ‘ত’ এর সূত্র ধরে, আর ভবিষ্যতের ‘ব’ এসেছে ‘তব্য’ থেকে, কর্মভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য রূপান্তরিত হয়ে। ঐ সময় যদি বেত্রধারী কেউ থাকতেন তাহলে বলতেন-না, না, ভাষায় এরকম অনাচার চলবে না। কিন্তু বাঙ্‌লা, হিন্দী, অসমীয়া, ওড়িয়া প্রভৃতি আধুনিক ভাষার সৌভাগ্যক্রমে তখনও কোনও দন্ডধারী গজিয়ে ওঠেন নি। বৈয়াকরণদের মনোযোগ ছিল সংস্কৃত-প্রাকৃতে। ভাষা গুলোকে তাঁরা কৃপা ও অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতেন। সাম্প্রতিকেও এমন দেখা গেছে যে সংস্কৃতের পঞ্চতীর্থ পন্ডিত মশায় বাঙলায় কিছু লেখার বেলায় হ্রস্ব-দীর্ঘ ন-কার শ-কার মানছেন না এবং তাতে তাঁদের কোনও আক্ষেপ নেই। রামমোহন, বিদ্যাসাগর এবং তাঁদের সমকালীন লেখকেরা সকর্মক ক্রিয়াপদের অতীত ও ভবিষ্যতের পুরূষগত রূপের পার্থক্য প্রচলিত মৌখিক থেকে নিয়ে সেগুলির সাধুরূপ দিয়েছিলেন-করিলেক, পাইবেক। মৌখিকে ছিল কইরলোক, পাইব্যেক। এই ল, ব o এক প্রথম-পুরুষবাচক। উত্তম-মধ্যম ছিল করিলুঁ, করিলাম, কইরলম্‌, এবং করিলে। বিদ্যাসাগর মশায় জোর করে ঐ ‘ক’ আমদানি করেন নি, ভাষায় পার্থক্য সংরক্ষণের নিয়ম অনুসারে লোকমুখেই তা সৃষ্ট হয়েছে। নতুবা একেবারে মূলে যখন কর্মভাববাচ্যের ‘তব্য’ থেকে-অব্ব, ব হয় তখনকার রূপ ছিল-আহ্মে (আমি) করিব, তোহ্মে (তুমি) করিব, তেঁ (সে) করিব। সব এক। কর্তৃবাচ্যেআসতেই পুরুষ-বাচক বিভক্তি জোড়া লাগল, একটা থেকে অন্যটা রূপে পৃথক্‌ হয়ে পড়ল।পার্থক্য রক্ষা করা ভাষার শক্তির চিহ্ন। বহু আগে সংস্কৃতে দ্বিবচন ছিল। সাঁওতালী ভাষায় আজও তা আছে। ‘আমরা’ বলতে আমরা দু’জন না বহু এ বোঝার উপায় নেই। সাঁওতালী ভাষায় নারী ও পুরুষে লিঙ্গভেদে তেমন নেই, যেমন গুরুতর প্রভেদ পুংলিঙ্গ ও ক্লীবলিঙ্গে। এর মূলে তাদের জীবনরীতি নিশ্চয়ই। অনেক আগে বাঙ্‌লা বহুবচন-বিভক্তি রা, এরা হীনতার প্রাণীতে যুক্ত হতে পারত না, সেক্ষেত্রে চলত, সব, গুলা, গুলি। ক্রমে সব একাকার হতে চলেছে। কিন্তু পার্থক্য রাখা উচিত-ভাষার সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বোধ্যতার জন্যই। লিখনের মধ্যে এই পার্থক্য রাখার কিছুটা দায়িত্ব বানানের। কারণ, ভাষা কেবল মুখে উচ্চারণের জন্যই নয়, লিখনের জন্যও বটে। একদা প্রাকৃত ভাষার শব্দের মধ্যেকার ব্যঞ্জনের উচ্চারণ উঠে গিয়ে স্বরবাহুল্য ঘটলে এমন অবস্থা হয়েছিল যে এক একটি শব্দে দুটি তিনটি পর্যন্ত ব্যক্তিবা বস্তুকে বোঝাতে লাগল। এর ফল দাঁড়াল সংস্কৃত বা কোলীয়ভাষা থেকে শব্দের ঋণ গ্রহণ। অর্থবিভ্রাটের জন্যই আজকের বাঙ্‌লায়-কর-করো-কোরো, করে এবং ক’রে, ধরে এবং ধ’রে, পাঠান এবং পাঠানো মত এবং মতো, বুঝা এবং বোঝা, কাল্‌ এবং কালো প্রভৃতির পার্থক্য রাখা উচিত, যদিও অকারণে যত্রতত্র একটা ক’রে ‘ও’ লাগানোর জলীয় অভ্যাস ত্যাগ না করলেই নয়। আবার সহজে পার্থক্য বুঝার দিকটি জোর করে আচ্ছন্ন করে দিয়ে ই-ঈ এর মধ্যে কেবল ই-কারই চালাব এমন ভ্রান্তবুদ্ধি সমর্থন করা যায় না। কারণ ঐ একই, ভাষা কেবল উচ্চারণের জন্যই নয়, লিখনে বোধ্যতার জন্যও।
আমাদের আজকের বানান-সমস্যার মূলে যে ব্যাপারটি রয়েছে তা হল সাধু থেকে চলিত রীতিতে ক্রিয়াপদ প্রভৃতি কয়েকটি বিষয়ে উচ্চারণ ও লিখনের ভিন্নতা। বানানের ক্ষেত্রে সাধু বলতে আমরা সংস্কৃত শব্দ এবং বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরৎ অনুসৃত লিখন-রীতিকে বুঝছি। যদিও একথা ঠিক যে শিষ্ট চলিতে সাধুর মতই সংস্কৃত শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার চলে। আবার সাধুরীতিতেও সংস্কৃত লৌকিক শব্দের ব্যবহার চলিতের মতই চলে, এমন কি ক্ষেত্রবিশেষে বেশীও চলে।বানানে বিশৃঙ্খলার যে কথা আজ উঠছে তা চলিতের মধ্যে মৌখিক এবং ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী চালানোর জন্য। চলিতে সংস্কৃত-জাত অথবা লৌকিক বাঙ্‌লা শব্দের বানানে আমরা অল্প স্বল্প সহজ পথে চলা স্বীকার করে নিয়েছি। কিন্তু সংস্কৃত অর্থাৎ সাধু শব্দের বানানকে সরল করতে পারছিনা এবং পারবও না, কারণ, বাঙ্‌লায় সাধুরীতি আজও অচল হয়ে যায়নি, আর বহু মনীষীর প্রচুর বই রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়। তা ছাড়া সারা ভারতে সংস্কৃত শব্দের বানানরীতি প্রায় এক। এই ঐক্য বিঘ্রিত করা চলেনা। দু’শ বছর ধ’রে চলতে থাকা সাধুরীতির বাঙ্‌লা গদ্যের মধ্যে বানানের একটা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েছিল, লেখকমাত্রেই তা অনুসরণ করতেন, আর বিচ্যুতি তেমন কিছু ছিল না বললেই চলে। চলিতে লেখার ধারা প্রবর্তিত হতেই দেখা গেল ঐসব সাধু শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ বাদে সাধুজাত এবং লৌকিক অর্থাৎ দেশী-বিদেশী শব্দের বানান লেখকেরা সকলে একরকম লিখছেন না। তখনকার স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথের লেখা দেখুন, বানানে গরমিল রয়েছে, আবার ডি-এল-রায় আসরে নামতেই ক্রিয়াপদের চোখ ঝলসানো বানান রীতি দেখা গেল। ঐ সময়কার বা স্বল্প পরের অন্যান্য লেখকদের মধ্যেও চলিতের বানানে প্রচুর বিশৃঙ্খলা ছিল। মৌখিক আর শিষ্ট চলিত যে এক নয় এ বোধ প্রথমের দিকে পাকা হয়নি। তা ছাড়া যেসব সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত বাঙ্‌লায় লেখনী চালনা করতেন তাঁরাও বাঙ্‌লায় বানান বিষয়ে অবহিত হওয়ার তেমন প্রয়োজন বোধ করতেন না। যাই হোক, উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রমথ চৌধুরীর চালনায় রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতায় এবং পরে ডঃ সুনীতিকুমারের স্বীকরণে ‘চলিত’ মৌখিক থেকে পৃথক্‌ হয়ে পড়ল আখ্যা হল শিষ্ট চলিত, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের বিশেষে ভাগীরথীতীরের শিক্ষিতজনের প্রায় মৌখিক অর্থাৎ মৌখিকের একটু উন্নত সংস্করণের ভাষা। ফলে সাধু-জাত ও লৌকিক শব্দের বানানের বিশৃঙ্খলা স্বল্প সময়ের জন্য কমল। কিন্তু আবার প্রারব্ধ হল কোনও কোনও আধুনিক সাহিত্য-লেখকের যথেচ্ছতা অবলম্বনে। তাঁরা বিষয়বস্তুতে বাঁধন-ছেঁড়া প্রবৃত্তি নিয়ে চলিত শব্দের বানানও খুশীমত বানাতে আরম্ভ করলেন। অন্যদিকে সাধুঘেঁষা লেখকেরা সংস্কৃতজাত শব্দের বানানে পুনঃ পুন দৃষ্ট সংস্কৃত বানান যেমন আগেও আঁকড়ে ছিলেন, তেমনই রইলেন। এইসব নিয়ে ১৯৩০ খ্রীঃ নাগাদ বেশ কিছু সংখ্যার একই শব্দের বানানে দ্বিত্ব ত্রিত্বদেখা যেতে লাগল। যেমন, লিখে-লেখে, শুনে-শোনে, পিছন-পেছন, ভিতর-ভেতর, অভ্যাস-অভ্যেস ওব্‌ভেস, উঠে-ওঠে, মত-মতো, ভাল-ভালো, পূজা-পূজো, সোণা-সোনা, কাণ-কান, বঙ্গ-বংগ, শঙ্কা-শংকা, গেল-গেলো, হল-হলো-হোল, করব-করবো-কোরব, পাখী-পাখি, বাড়ী-বাড়ি, কায-কাজ, যুঁই-জুঁই, পোষাক-পোশাক, জিনিষ-জিনিস, আশী-আশি, শীষ-শীস, কুমীর-কুমির, মাসী-মাসি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সব বিকল্প এ কল্পের তাড়ায় রবীন্দ্রনাথ অস্বস্তি বোধ ক’রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখলেন, রাজশেখর বসু-সুনীতিকুমার প্রমুখদের নিয়ে বানান সংস্কার সমিতি গঠিত হল এবং ১৯৩৫-৩৭ মধ্যে তাঁদের সংস্কার-পুস্তিকা প্রচারিত হল-চলিত শব্দের বানানে পুরানো রীতিকে আংশিকভাবে মান্য ক’রে, আংশিক ভাবে নোতুন বানানের বিধান সহ প্রচুর বিকল্প রেখে। লক্ষ্য করার বিষয় এই যে তাঁরা যেমন পুরানো রীতির বানানকে স্বীকৃতি দিয়ে অতি শৈথিল্য থেকে শব্দগুলিকে বাঁচাবার চেষ্টা করলেন, তেমনি জীবন্ত চলমান ভাষার অগ্রগামীতাও রোধ করতে চাইলেন না। ঐ বিধান বেশ কয়েক বৎসর শিক্ষিতদের মোটামুটি চালিয়েছিল, অন্ততঃ ১৯৫০-৫৫ পর্যন্ত তেমন বিশৃঙ্খলা অনুভূত হয় নি। অধ্যাপক-শিক্ষকেরা মেনে নিয়েছিলেন, সংবাদপত্রীরা মেনে চলেছিলেন, আর অতি-আধুনিক লেখকেরা বিচ্যুতি-স্বভাবের উঁকিঝুঁকি দেখিয়েও সংস্কার ব্যবস্থাটাকে একেবারে অসম্মান করতে পারেন নি। এরই মধ্যে পূর্ববঙ্গ থেকে শরণাগতেরা আসেন এবং বানানে এখানকার সহজিয়াদের সঙ্গে তাঁদের মিলন ঘটার ফলে কয়েকটি ক্ষেত্রে পুনরায় ত্রিকল্প পঞ্চকল্প পর্যন্ত গড়ে উঠতে থাকে, বিশেষ অতীত-ভবিষ্যতের ক্রিয়ার ক্ষেত্রে। অবশ্য চলমান ভাষায় এরকম বাঁধন-ছেঁড়া স্বভাবের পরিচয় পাওয়া যে খুবই উৎকণ্ঠার বিষয় হয় এমন নয়, কিন্তু ব্যাপারটির মধ্যে অনর্থকতা এবং আত্মতুষ্ট যথেচ্ছাচার থাকলে এবং সেই সঙ্গে দিকে দিকে তা প্রবল হয়ে উঠলে সংযমন আবশ্যক হয়ে পড়ে। কালে কালে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার বৈয়াকরণেরা লেখার ভাষায় এরকম বিশৃঙ্খলা রোধের চেষ্টাও ক’রে এসেছেন। যে-সব সভ্যজাতের নিয়ম-মানা ধাত তাঁরা সহজেই একটা সমাধানের মধ্যে এসেছেন। তবে খুব সম্প্রতি আমাদের অধ্যাপক-শ্রেণীর দু- চারজন অতিমাত্রায় শঙ্কিত হয়ে আর এক-দফা সংস্কারের চেষ্টায় নেমে পড়েছিলেন, কিন্তু কোথায় কোথায় ক্ষত হয়েছে সে ক্ষেত্রগুলির চিকিৎসায় না গিয়ে কয়েকটি ভিন্ন ও নূতন বিষয়ে বৈপ্লবিক বিধান দিলেন। ভেবে দেখলেন না যে এটা যদি সত্যই গৃহীত হয় তা’হলেও বিশৃঙ্খলা সীমাহীন হয়ে উঠবে। আর তখন পিছনে ফিরে যাওয়ার পথ থাকবে না। এই অবকাশে ভাষাতত্ত্বের এক অধ্যাপক তৎসম, অর্ধতৎসম দেশী, বিদেশী, ফরাসী জার্মান প্রভৃতির তত্ত্ব উপস্থাপিত করে এক, দুই, তিন, চার ক্রমে নিয়ম টেনে এবং বিকল্প দেখিয়ে এমন এক পাণ্ডিত্যময় সারস্বত প্রতিমা তৈরি করলেন যে তা আপাততঃ কোনো কাজে এল না। বাঙ্‌লা একাডেমি প্রশস্ত মিটিং-এর আয়োজন করে অতি আলট্রা থেকে অতি রক্ষণশীল পর্যন্ত যাবতীয় মত ছাপিয়ে দিয়ে তার কর্তব্য শেষ করলেন। কেউ কেউ মনে করলেন, বানান নিয়ে এত হৈ-চৈ এর কি যথার্থই প্রয়োজন আছে? পাকা সাহিত্যব্রতীদের লেখা যাঁদের চলিত গদ্য অনুকরণযোগ্য, তাঁদের এবং সেই সঙ্গে ছাত্রপাঠ্য গ্রন্থ নিয়ে তো তেমন বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। তাহলে হৈ-চৈটা কি অতিকৃত এবং এই সুযোগে কারও কারও স্বমত চালানোর বাসনায় পরিকল্পিতনয়? সে যাই হোক, সংস্কারের ক্ষেত্র যে বেশ কয়েকটি আছে, তাতে আমি সন্দেহ করি না। যদিও এতে শিশুশিক্ষা রসাতলে যাচ্ছে এমন অভিমতও গ্রহণ করতে রাজী নই। খৈ-খই, বৌ-বউ, নৌকা, চৌকা, দৈহিক প্রভৃতির মধ্যে, কোন্‌ বানানটি নিলে দু’রকম লিখতে হবে না, তা তাদের শিক্ষক-অভিভাবক নিজেরা বুঝে জানিয়ে দিলেই হ’ল। একাক্ষরে অমুক হবে, তিন অক্ষরে তমুক হবে, তৎসম হলে এই হবে, তদ্ভব হলে ঐ হবে-এরকম বিড়ম্বনার মধ্যে ছাত্র তো দূরের কথা, ছাত্রের বাবাও যেতে পারবেন না। কারণ দেখানোর দরকার নেই, সোজাসুজি শুদ্ধ বানানের একটি তালিকা ব্যাকরণের বইয়ের সঙ্গে অথবা অন্যভাবে দিলেই হয়। আর নোতুন তরকিছু দেখানোর মোহে যেসব অধ্যপক বা লেখক অধীন হন, তাঁদের দমন করার জন্য বৈয়াকরণদের হাতে তো আর সি-আর-পি থাকে না।
কিন্তু চোখে লাগার মতো যেক’টি বিশৃঙ্খলা এসে গেছে অবশ্যই তার নিবাকরণ চাই, লেখকেরা তা মানবেন এমনটা প্রত্যাশা ক’রেই। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বা অভ্যসমূলক প্রবণতাকে বেশীদূর অতিক্রম করলে কোনো কাজ হবে না এবং কতিপয় লেখকের না হোক, বানানের দিক থেকে জনসাধারণের মানসিক প্রবণতা এখনও সাধুঘেঁষাঁ, অর্থাৎ বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরৎ-মধুসূধন-বিভূতিভূষণ প্রভৃতির সংলগ্ন। এই জন্যই সুনীতিকুমার-রাজশেখর সাধু শব্দের ই-ঈ এবং শ-স-ষ বানান সাধুজাত শব্দের রাখার বিধান দিয়েছিলেন, অবশ্য কয়েকটি বিকল্প জুড়ে দিয়ে। যদিও তা না দিলেই পারতেন, আজকের এই বিশৃঙ্খলা পোয়াতে হ’ত না। তারপর স্বরসংগতি এবং অভিশ্রুতি ভাষাবিজ্ঞানে যত মূল্যবান্‌ বস্তুই হোক এবং ক’লকাত্তিয়া মৌখিক বাঙ্‌লার চালক হোক না কেন, বানানে সব ক্ষেত্রে তা দেখানো অধিকাংশের অভ্যাসজনিত প্রত্যাশার বিরোধী। পূজো, কুয়ো, পেছন, ভেতর, ও ওব্‌ভেস, হিসেব, বিলিতি এগুলো কলকাতার বাইরে তো ধাতস্থ হয়নি বললেই চলে। তারপর ঐ ঙ এবং অনুস্বারের স্থান নির্দেশ। কোথায় সন্ধি হচ্ছে বা হচ্ছেনা তা বয়স্কেরা কবে ভুলে গেছেন, আর সম্‌ উপসর্গের ক্ষেত্রে এখানে ঙ চলতেও পারে, কি ওখানে অনুস্বার দিতেই হবে এসব নিয়মের নিরীখ সাধারণের কাছে অবোধ্য হয়েছে এবং তাঁরা ধরে নিয়েছেন যে অনুস্বার লাগিয়েই সর্বত্র অংগভংগি করা চলবে। তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব এবং বিদেশী শব্দের নজীর টেনে বলা হ’ল এ ক্ষেত্রে এই শ হবে, ঐ স হবেনা, কিন্তু কোন্‌টি তদ্ভব, কোনটি বিদেশী এবং কাকে বলে অর্ধতৎসম এসব বোঝাতে গেলে সাহিত্যিক ও সাধারণের জন্য নোতুন করে ইস্কুল খুলতে হবে। বিদেশী শব্দের মূল উচ্চারণ কী এবং বাঙ্‌লায় কেনই বা তার যথাযথতা রক্ষণীয় এ শিক্ষিতদের মাথায়ও ঢুকতে চাইলে না। এই সেদিন মাধ্যমিকের পাঠক্রম থেকে বিদেশী শব্দের অনুলিখনের অধ্যায়টি আমাদের তুলে দিতে হয়েছে। ধানের শীষ আর হুইসিলের শিসেরই বা পার্থক্য ক’জন রাখবে? শহর, পোশাক, আর শরবৎ, খ্রীস্ট প্রভৃতি নিয়ে বুড়োরাও হিমসিম খেতে লাগলেন। এই সেদিন বাঙ্‌লা একাডেমির তরফে বানান বিষয়ে মতান্তর মালা প্রকাশের পর পথে এক শিক্ষক আমাকে প্রশ্ন করলেন- শুনছি ক্ষ এবং ষ আপনারা বানান থেকে তুলে দিয়েছেন। তাহলে ক্ষয়, ক্ষতি ক্ষেত্র আমাদের খ দিয়েই লিখতে হবে, তাই না? এই গেল একদিক অন্য দিকে অতীতের ল-যুক্ত কয়েকটি ক্রিয়াপদে, এমনকি ভবিষ্যতের ‘ব’ এর ক্ষেত্রও শব্দে ‘ও’ কারের শ্রাদ্ধ। ক্রিয়ার শেষে ‘ল’ দেখলে আর রক্ষা নাই, ভাদ্র-বৌরা ঘোমটা টানবেনই। এ কথা বুঝবেন না যে শব্দন্তের ও-কার প্রবণতা আছে মাত্র, পূর্ণ “ও” উচ্চারণে নেই। ঐ প্রবণতার একটা দিক বিবেচনা ক’রে বলা যায় যে হোল এবং কোরব বরং শুদ্ধ বানান; হলো, গেলো, দিলো, ছিলো প্রভৃতি কখনই নয়। এই কারণে ১৯৩৭ এর কমিটি শব্দ শেষে ও-লেখার অনর্থকতা দেখেছিলেন। তবু একথা মনে করা বোধহয় অসংগত হবে না যে উক্ত বানান-সমিতি প্রায় প্রতি পদক্ষেপে বিকল্প রেখেছিলেন বলে সেই রন্ধ্রেই শনি প্রবেশ করেছে। বিকল্প বিহিত করার কারণ, চলমান ভাষাকে কলমের খোঁচার বাঁধন পরানো ঠিক হবে না। যাই হোক, এখন উপায়? বানান-সংস্কার যাঁরা অত্যাবশ্যক মনে করছেন তাঁদের পক্ষে উপায় এই যে, চলিত-চলিত এবং উচ্চারণ –উচ্চারণ করে বেশী বায়ুগ্রস্ত না হয়ে সাধুরীতির বানান-কাঠামোকে চলিতেও যথাসম্ভব মান্য করার আয়োজন করুন এবং বিকল্পের অবকাশ যথাসাধ্য সীমিত করুন। যেমন উচ্চারণ তেমন বানান হবে এই-ভূতটাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলুন। দু চার’টা ক্ষেত্রে কোনও কোনও লেখক মৌখিক ঢুকিয়ে যথেচ্ছাচার করতে চাইলেও তা উপেক্ষা করতে হবে এবং সেই সঙ্গে সরকারী সহযোগিতায় গোলমেলে বানানগুলির একটি শুদ্ধ তালিকা প্রণয়ন করে প্রচার করতে হবে। এইটিই বোধকরি বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বানান-সংস্কারে যে মূল নীতিটি প্রথমেই অনুসরণীয় তা এই যে, যে শব্দের যে-বানান নিতান্ত প্রচলিত হয়ে নাম-করা লেখকদের প্রায় সকলের লেখায় একই মূর্তি নিয়েছে তার পরিবর্তন কোনো মতেই বাঞ্ছনীয় হবে না। সে বানান অশুদ্ধ হলেও চলবে। দ্বিতীয় পালিতব্য এই যে, বানানের বিধান দিতে গিয়ে বারংবার ভাষা বিজ্ঞানের দোহাই দেব না, কারণ, লেখক সাধারণের কাছে তা অর্থহীন হবে। বিকল্পের অবকাশ কম রাখব। এর জন্য বানান সাধুরীতির সংলগ্ন করতে দ্বিধা করব না। কিছুটা পিছনে ফিরে গিয়েও যদি বিশৃঙ্খলা রোধ করা যায় তা অবশ্যই করতে হবে। চতুর্থতঃ একই শব্দের যদি দুই অর্থ ইঙ্গিত করে তাহলে তার রূপে পার্থক্য রাখতেই হবে। কিন্তু জোর করে বিদেশী শব্দের বিদেশী উচ্চারণের অনুসরণে কোনও বানান বিহিত করব না। বিদেশী শব্দ বাঙ্‌লার স্বভাবে যা দাঁড়ায় সেইমতই তা রক্ষা করব। পঞ্চমতঃ বানানের বিষয় ভাবতে গিয়ে অনর্থক মুদ্রণ-টাইপ প্রভৃতি টেনে আনব না। মাথার কমা ও হাইফেন বর্জন তো করবই না, বরং সার্থক ইঙ্গিত দিতে আরও সঙ্কেত উদ্‌ভাবনের বিষয় চিন্তা করব। দু’একটা ক্ষেত্রে বানানের অপব্যবহার দেখলে গেল গেল রব তুলব না। এইভাবে কয়েকটি সাধারণ নীতির উপর দাঁড়িয়ে বানানের যেসব ক্ষেত্রে বিপর্যয় চোখে লাগে তার জড় তু’লে ফেলা যায় কিনা চিন্তা করা যাক।
১)ই – ঈ। উ – ঊ। মূল সাধু বা সংস্কৃতশব্দে যা আছে এবং যা প্রচলনের ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তার চলিত রূপেও তাই থকবে। বিকল্প থাকবে না। অর্থাৎ কুমীর, পাখী, বাড়ী, শীষ, পূব প্রভৃতি লিখব। কুমির,পাখি, বাড়ি, শিস, পুব, লিখব না। পিসী মাসী লিখব। ঝি, দিদি, কচি, মিহি প্রভৃতি বানান সাধুরীতিতেই ‘ই’কার দেওয়া আছে। সংস্কৃতের দোহাই দিয়ে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত বানানের বিপর্যয় ঘটাতে প্রয়াস করব না।
স্ত্রীলিঙ্গে এবং বিশেষণ-বোধক শব্দের সর্বত্র ঈ রাখব। তবে এক্ষেত্রে সাধুরীতিতে যদি ই-কার চলে গিয়ে থাকে তা বদলাব না। যা প্রচলিত এবং প্রতিষ্ঠত অর্থাৎ বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরতের সাধুরীতিতে যা দেখা গেছে তা মান্য করব। এই হিসাবে ইংরেজী, বিলাতী, হিন্দী, দাগী, আসামী, দেওয়ানী, পূজারী সব ঈ-কারান্ত হবে। স্ত্রীলিঙ্গে ঈ, নী, ইনী সর্বত্র বজায় রাখতে হবে। নাত্‌নী লেখার বেলায় নাতিনীর ঈ-টা কেড়ে নেবে না। সাধুরীতির আদর্শটা বজায় রাখলে ভুলের অবকাশ থাকবে না এমন মনে করা যায়। নতুবা চলিত-মৌখিক রীতি বানানেও জীবন্ত থাকুক আর বিশৃঙ্খলাও চলে যাক, এ দুই একত্র কাম্য হতে পারে না।
(২) সাধুরীতির একটি বিশেষ ক্ষেত্র অবশ্য মান্য করা খুবই দুরূহ হয়ে পড়েছে। সেটি হল গুণী, মন্ত্রী, রথী, মনস্বী, প্রভৃতি সংস্কৃতের ইন্‌ ভাগান্ত শব্দের ক্ষেত্র। এ শব্দগুলি যে মূলে ইন্‌ ভাগান্ত এবং সমাসে ও প্রত্যয়ের যোগে এগুলি ই-কারান্ত হবে। এ ব্যাপারটি বাঙ্‌লার ক্ষেত্রে প্রায় অবোধ্য। আমরা গুণী, মনস্বী প্রভৃতি শব্দগুলিকে ঈ-কারান্ত মূল শব্দ হিসাবে দেখতে এমনই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে তা পরিবর্তন করা কষ্ট সাধ্য। এগুলির সঙ্গে-দের,-দিগের প্রত্যয় যোগ করতে আমরা ঈ বদলাই না। অতএব ঐ শব্দগুলির গুণীজন, মন্ত্রীগণ, রথীবৃন্দ, তেজস্বীতা, প্রতিযোগিতা প্রভৃতি বানানই সর্বত্র চালু হোক।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি,মনুষ্যত্ব, দেবত্বের সাদৃশ্যে মহত্ব বানানও নিয়ম হোক, সান্তনা, উচ্ছাস সন্যাসী, উজ্বল প্রভৃতিও চলুক। কেউ নিয়ম চাইলে বলতে পারব বাঙ্‌লায় ঐ সব ক্ষেত্রে মহৎ স্থানে মহ, উৎস্থানে উ প্রভৃতি আদেশ হয়েছে।
(৩)সাধুরীতির দৃষ্টান্তকে আদর্শ মেনে নিয়ে হিসাব, পিছন ভিতর, অভ্যাস, ছোট, বড়, কুয়া, পূজা প্রভৃতিই চলুক। ছন্দ রক্ষার্থে রবীন্দ্র-উদ্‌ভাবিত আমারো, তোমারি, যখনি প্রভৃতি বর্জন করে সাধুতে ফিরে গিয়ে আমারই, তোমারও যখনই কোনও প্রভৃতি বানানেই বরং থাকব। বিশৃঙ্খলা কমাতে গেলে যা ছিল সেখানে প্রত্যাবর্তনের রীতিই সর্বজ্বরহর পন্থা।
(৪)সাধারণ অতীত ও ভবিষ্যৎ ক্রিয়াপদের শেষে অ-স্থানে কখনই ও লাগাব না। ছিলো, হলো, করবো বানান উচ্চারণ অনুসারেও ভুল। পার্থক্য রাখতে আদেশ বা অনুনয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য ও যোগ করতেই হবে। যেমন-কর কিন্তু কোরো (করিও) দেখো, শোনো, চলো তো প্রভৃতি।
(৫) ং এবং ঙ এর বিকল্প পরিহার করে অহঙ্কার, ঝঙ্কার, সঙ্গীত, সঙ্ঘ, রঙ্‌ বাঙ্‌লা প্রভৃতি বানান রাখব। তবে সাধুতেই যেহেতু সংস্কার, সংস্কৃত, সংযম প্রভৃতি বানান স্থির আছে তা বর্জন ক’রে ঙ চালাব না।
(৬) বিদেশী শব্দের বাঙ্‌লায় যা স্বাভাবিক লিখন ও উচ্চারণ দাঁড়িয়েছে তা-ই চলবে। শাজাপন, সাজাহান, সরম, সাদী,পোষাক, প্রভৃতি বদল করে কী সৌভাগ্যলাভ হবে? আর এডয়ার্ড, ও আর্ডসওআর্থ প্রভৃতি লিখে?
(৭)সাধুরীতির বানানের ঐ, ঔ চলিতে চলবে। যখনই যেমনই প্রভৃতি আগের সূত্র অনুয়ায়ী চলিতেও চালু রাখতে হবে। নতুবা আমারি, তোমারো, কখনি, তখনো, তারো প্রভৃতি বেলায় আপত্তি করা চলবে না। একাক্ষর চলিত শব্দের ক্ষেত্রে খৈ, দৈ, বৌ না লিখে কেউ যদি খই, দই, বউ লেখেন তাহলে তার বিনিপাত কামনা করব না। ছোটখাট ব্যাপার কিছু থেকেই যাবে, তা নিয়ে আপত্তি তোলো অন্যায় হবে।
(৮) এক, দেখ, গেল প্রভৃতি বহু বানানে আমরা এ্যা উচ্চারণ করি। ‘এ’ দিয়ে খাঁটি ‘এ’ –ও বোঝাচ্ছি আবার ‘এ্যা’ ও বোঝাচ্ছি। নিঃসন্দেহে এ্যা উচ্চারণের জন্য একটি পৃথক্‌ স্বরচিহ্ন ও কার চিহ্ন উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। ‘এ্যা’ পূর্বঞ্চলীয় ভাষাগুলির মজ্জাগত উচ্চারণ। এর উদ্‌ভব কোল-মুন্ডা সূত্রে। যাই হোক, যতদিন নূতন বর্ণ উদ্‌ভাবিত না হচ্ছে ততদিন এ চলুক। তবে আদিতে ‘এ্যা’ ব্যাবহার স্বচ্ছন্দে চলতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন ‘এ্যা’ স্থানে ‘অ্যা’ লিখন ঠিক। আমরা তা মনে করি না, কারণ, ‘এ’ ও ‘এ্যা’ পূরা সম্মুখধ্বনি, ‘আ’ এর উচ্চারণে জিভ একটু পিছনে থাকে।
(৯) ক্রমশঃ, বশতঃ,ন্যায়তঃ,দৃশ্যতঃ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাধুরীতিতে ফিরে গেলেই আর হাঙ্গামা থাকে না।
(১০) অর্থের পার্থক্য চিহ্নিত করতে মত্‌-মতো, কাল্‌-কালো, কোন-কোনো, কোনও,বাড়ি-বাড়ী এরকম বানানই রাখা ভালো-কী সাধু, কী চলিতে। সেই রকম চলিতে করে-ক’রে, ধরে-ধ’রে, বলে-ব’লে প্রভৃতির পার্থক্য রাখা খুবই প্রয়োজন।
যাঁরা বানানের বিশৃঙ্খলা নিয়ে বেশী বিব্রত বোধ করেছেন তাঁরা এইভাবে একটু পিছনের দিকে যেতে চাইবেন কি না জানি না, নাহ’লে চলিতের সুযোগে যা খুশী তাই রোধ করা সম্ভব হবে এমন মনে করি না। এক,দুই,তিন, চার প্রভৃতি অসংখ্য নিয়ম-পত্তন পন্ডশ্রম হয়ে দাঁড়াবে।
সংস্কারকদের প্রস্তাবিত বিষয় অনুসারে মন্তব্য
২. সংস্কৃতজ শব্দের বানান
(ক) অ এবং ও – শব্দের আদিতে ও অন্তে
বাঙলায় উচ্চারিত ‘অ’ স্বরের একটু বাঁকানো বা ‘ও’ এর কাছ-ঘেঁসা উচ্চারণ আঠারো-উনিশ শতাব্দী থেকে আরম্ভ করে এখন একটু ব্যাপক হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এবং বিশেষ করে কোলকাতার আবহাওয়াতেই এই প্রবণতার বিস্তার। ‘অ’ এর আগে পিছে উচ্চারিত ই বা উ কেবল ‘অ’ এর উপরেই নয়, ‘আ’ এর উপরও একাধিকভাবে তাদের প্রভাব রাখছে। আবার ‘অ’ স্বরের ও-কার প্রবণতা এখন আর কেবল সংস্কৃতজ শব্দেই সীমিত নয়, খাঁটি সংস্কৃত শব্দের উচ্চারণকেও আক্রমণ করেছে, নিয়মিত= নিয়োমিতো, ব্যবহার= ব্যাবোহার উচ্চারণে আমরা কোনো ত্রুটি অনুভব করি না। তেমনি সংস্কৃত শব্দ-ওতিশোয়, ওরুণ, মোনি, ওনু, বোধূ, পোশুপোতি, ওনুমোতি, গতো হয়েছেন, স্বকর্ণে শ্রুতো, এটা কার কৃতো, গ্রহো, বিরহো, দেয়ো, বিধেয়ো প্রভৃতিতে ও-কার-ঘেঁসা উচ্চারণে এখন আমরা কোনো বিচ্যুতি বোধ করি না।
সংস্কৃতজ শব্দের ক্ষেত্রে আঠারো শতাব্দী থেকেই উচ্চারণে স্বভাবসংগত পরিবর্তনের সূত্র ধ’রে ‘অ’ এর ও-এর দিকে টান দেখা যেতে থাকে। যেমন, আগেকার করিল, পড়িল, করিতে, ধরিতে, করিব, চলিব, করহ, চলহ, দেখহ এবং ভদ্রক, অন্ধক, দ্বাদশ= বারহ, কালক, প্রভৃতি শেষ রূপ নিলে যথাক্রমে- কোরলে, পোড়লে, কোরতে, ধোরতে, কোরবো, চালবো, করো, চলো, দ্যাখো এবং ভালো, কালো, এঁদো, বারো প্রভৃতিতে।
আমরা ও-কার দিয়েই যদিচ পরিবর্তনের রূপ দেখালাম, তবু ভেবে দেখতে হবে ঐ ওকার সর্বত্র পূর্ণ ও-উচ্চারণের রূপ নেয়নি। নিয়েছে কেবল সেইখানে, যেখানে ‘অ’ এর ঠিক পরে ই-কার বা উ-কার আছে। ই, উ উচ্চস্বর, তাই সমীভবনের নিয়মে অ-টাকে উঁচুতে উঠিয়ে ও-তে নিয়ে গেছে। আর কাছে পিঠে ই-উ না থাকলে, যেমন শব্দের অন্তে, ভিন্ন কারণে ও-এর মতো হচ্ছে, কিন্তু পূর্ণ ‘ও’ হচ্ছে না। যেমন- করহ=করো, ধরহ=ধরো, চলহ=চলো। এগুলি আধা ও-এর ব্যাপার। এজন্যই আচার্য সুনীতিকুমার প্রমুখেরা, ‘কর, ধর, দেখ, পড়, গেল, ছিল, নাচল’ প্রভৃতির বানানে ‘ও’ দিতে নিষেধ করেছেন। পূর্ণ-ও নয়, ও-কারের রেশ বা আধা-ও উচ্চারণ আধুনিক বাঙ্‌লার একটি প্রবণতা। এটিকে বানানে জানানোর কোনো হরফ নেই, আর পুরো-ও হিসাবে লিখতেও আমাদের দ্বিধা হয়। এমন ক্ষেত্রে বানান-সংস্কারকেরা যদি পূর্ণ ওকারেই তাঁদের মতি স্থির করেন, করুন। তবে নিলো, দিলো, ছিলো, গেলো, পেলো প্রভৃতি লিখন মানসিক শৈথিল্যেরই নিদর্শন। শব্দান্ত আকারের আগে ‘উ’ থাকলে ঐ আ ও-রূপ নিয়ে থাকে যেমন- কুয়া=কুয়ো, সুতা=সুতো, পড়ুয়া= পোড়ো, মাছুয়া= মেছো, জলুয়া= জোলো ইত্যাদি কোলকাতা- কৃষ্ণনগর অঞ্চলের চলিতে। এসব চলবে। তা ছাড়া অর্থের পার্থক্য রাখতে প্রেরণার্থক ‘বলান, করান্‌ শোনান্‌’ প্রভৃতির সঙ্গে ক্রিয়া ও ক্রিয়া-বিশেষ্য বাচক-বলানো, করানো, শোনানো প্রভৃতির পার্থক্য রাখার জন্য ও-যোগ প্রয়োজন। এ অভিমতও ঠিক।
এই ভাবে স্থানে স্থানে (সর্বত্র নয়) অ-স্থানে ও-কার দিয়ে বানানের সপক্ষতা করা গেলেও সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে তা কোনোমতেই বিধেয় হবে না, এই হ’ল বানান-সংস্কারকদের অভিপ্রায়। এর ফলে একটা গোলমেলে পরিস্থিতি থেকেই যাচ্ছে। অর্থাৎ অরুণ, মধুকে আমরা বারংবার ‘ওরুন, মোধু’ বলে ডাকলেও লেখায় তা দেখাতে পারব না, একমাত্র উপন্যাস-নাটকের সংলাপের ক্ষেত্র ছাড়া। লক্ষ্য করতে হবে যে সংস্কৃতশব্দের ক্ষেত্রেও আমরা ঐ ধরনের ‘ও’ বা ‘আধা-ও’ উচ্চারণ করলেও, আদি অ নিষেষবাচক বা নিষেধের রেশ-যুক্ত হলে সেখানে, ‘ও’ উচ্চারণ ক’রে আমরা ডাকতেও পারি না, যেমন – অজিত, অখিল, অসীম, অনীলা। তবে ই বা উ পরে থাকলে বোধ হয় কোথাও কোথাও পারি। যেমন- ওতীশ, ওতুল, ‘ওনুপম’, অথচ ‘অরুপ’ এর ক্ষেত্রে পারব না। এই কারণে যে, ওসব ক্ষেত্রে অভাববোধকতা বাধা দিচ্ছে।
কঃ বিঃ সমিতির অর্থাৎ সুনীতিকুমার প্রমুখদের নির্দেশ ছিল যে যেখানে অন্তে ‘ও’ ছাড়াই অর্থটা বোধ্য সেখানে ও-যোগের প্রয়োজন নেই। যেমন কর, ধর, করব, ধরব, রাখব প্রভৃতি। এ থেকে সাধারণ মধ্যম পুরুষের বর্তমান অনুজ্ঞার ক্ষেত্রটা বেছে নিয়ে ‘কী লিখবেন’ প্রণেতা এবং তদনুসারে ‘ভিত্তিপত্র’ নির্দেশ দিচ্ছেন যে উক্ত অনুজ্ঞায় ও-যোগ সহ করো, শোনো প্রভৃতি লিখতে হবে। বোধ হয় তুচ্ছার্থক কর্‌ ধর্‌ এর সঙ্গে পার্থক্য রাখার জন্য। আর উভয়েই প্রস্তাব দিচ্ছেন উক্ত মধ্যম পুরুষের ভবিষ্যতে পূর্বেকার নির্ণয় অনুযায়ী ‘ইয়ো’ প্রত্যয় অথবা স্থান বিশেষে ও+ও, এ+ও, ই+ও দিতে হবে। যেমন দাও, কিন্তু দিয়ো; নাও, কিন্তু নিয়ো; পাও, কিন্তু পেয়ো; করো, কিন্তু কোরো; ধরো, কিন্তু ধোরো; শোনো, কিন্তু শূন্যে; লেখো, কিন্তু লিখো; শেখো কিন্তু শিখো-ইত্যাদি। এর উপর ‘ভিত্তিপত্র’ যোগ করছেন যে প্রেরণার্থক ক্রিয়ার মঃ পুঃ ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞাতেও লিখতে হবে-বলিয়ো করিয়ো, দেখিয়ো, শুনিয়ো। বলিও করিও প্রভৃতি নয়। ঠিক কথা। সব একাত্মক হোক। কিন্তু আসলে তা তো হচ্ছে না। এক এক শ্রেণীর ক্রিয়ার ক্ষেত্রে তো এক এক রূপ হয়ে পড়ছে। মানুষ সঠিক লিখতে অভ্যস্ত হবে তো? সেই সঙ্গে এই অনিবার্য প্রশ্নটাও থাকছে যে উক্ত বলিয়ো, করিয়ো প্রভৃতি লিখনে যাই হোক, উচ্চারণে তো অতি শীঘ্রই ‘ও’ তে দাঁড়াবে এবং লেখাতেও তা সংক্রামিত হয়ে কেবল বলিয়ো, করিয়ো-কেই নয়, খেয়ো নিয়ো-কেও দাঁড় করাবে-বলিও করিও খেও নিও দিও-তে। সুতরাং আগেকার সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের নির্দেশক ‘ব’ প্রত্যয় নিষ্পন্ন তুমি বলবে, করবে, তুমি বলাবে; তুমি দেবে বা দিবে, তুমি দেওয়াবে, তুমি শুনবে, তুমি শোনাবে প্রভৃতিই তো সহজতর এবং অব্যভিচারী পদ্ধতির প্রয়োগ ছিল। রবীন্দ্র-প্রদর্শিত নিয়ো, দিয়ো উত্তম আদর্শের হলেও অব্যভিচারী নয়, যার ‘র’ উচ্চারণটাও তেমন সম্ভবপর নয়। আরও এক কথা। আস্‌ ধাতু বা ‘আসা’ ক্রিয়ার বর্তমান অনুজ্ঞায় ‘এসো’ হোলে ভাবী অনুজ্ঞায় কী হবে? ‘দেখো’ ক্রিয়ার ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় যদি হয় ‘দেখো’ তো বর্তমান অনুজ্ঞায় লিখতে হবে ‘দ্যাখো’। পূর্বপক্ষে যদি বলেন যে ভবিষ্যতের ‘ব’ ব্যবহারে প্রথম পুরুষের সাধারণ ‘সে বলবে’ এর সঙ্গে ‘তুমি বলবে’ এর অনুজ্ঞা তো একই হয়ে পড়ছে, সেক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে সে পার্থক্য উদ্দেশ্য-বিধেয় স্থাপনের সাহায্যেই তো ধরা পড়ছে। যাই হোক, ঐ ‘ইয়ো’ লাগানোতে ব্যাপারটা বিচিত্র এবং পূর্ণ কার্যকর হচ্ছে না ব’লেই আমাদের মনে হয়েছে।
‘কী লিখবেন’ আরও নিয়ম বেঁধেছেন, এখনো, কখনো, কোনো, আজো, আরো প্রভৃতি লেখা চলবে না, লিখতে হবে এখনও, কখনও, আজও, আরও প্রভৃতি এবং এই রীতিতেই লিখতে হবে যখনই, তখনই; যখনি তখনি নয়। এখানে একটা প্রশ্ন। ঐ বিধি কি ‘কক্‌খনও, কখনও-সখনও’ অথবা ‘কখনওই’ পর্যন্ত অগ্রসর হবে? বহুল ব্যবহারের সঙ্গে দ্রুত উচ্চারণে ‘আরো’র সঙ্গে ‘কোনো’ শব্দটা আমাদের এমনই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে গুরুমশায়দের বেত্রও তা থেকে হটাতে পারবে না মনে করি। তবে একথা মাননীয় যে সঠিক বাচকতার কারণে ঐ ও-টাকে ‘আজও, কখনও’ প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন রাখাই বিধেয়। আর কবি-প্রস্তাবিত আমারো, তোমারো, আজো, যখনি, তখনি প্রভৃতি ছন্দরক্ষার্থে না হয় কবিতায় চলুক, গদ্যে চলার দিন বিলম্বিত হোক। এ প্রসঙ্গে দেবপ্রসাদ ঘোষ মশায়ের সেই সমালোচনা কৈশোর-স্মৃতি থেকে মনে পড়ল ‘আমি দুধো খাই তামাকো খাই’। and, also বাচক এই ও-টা কোল-মুণ্ডার হঁ থেকে আমরা পেয়েছি। কৃ-কী তে ‘আরহ’ দ্রষ্টব্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হয় কবিগুরুর অধ্যায়ন একেবারে ফেলে দেওয়ার যোগ্য নয়, অন্তত আমারো, তোমারো ক্ষেত্রে, যেখানে ও-টার গায়ের জোর তত প্রবল নয়।
শব্দান্ত ও-যোজনা বিষয়ে এত, যত, তত, কত বহু আগেই রেহাই পেয়ে গেছে কঃ বিঃ সমিতির হস্তক্ষেপে। অপিচ উক্ত সমিতি সঠিকভাবেই তো, হয়তো-বা প্রভৃতিতে ও-কারের খানিকটা অধিকার মেনে নিয়েছেন প্রচলিত হয়ে পড়ার কারণে। আবার উক্ত সমিতি কিন্তু ‘ছোট, বড়’র ক্ষেত্রে ও-যোজনা অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন। প্রয়োজনীয় বিবেচনা করেছেন ‘এগারো’ থেকে ‘আঠারো’ পর্যন্ত সংখ্যায় লিখনে। এ নিয়ে সাম্প্রতিক বানান-স্ংস্কারকদের ভিন্ন মত নেই। আমাদেরও না।
শব্দের আদিতে আধা-ও এমনকি স্থানবিশেষে প্রায় পূর্ণ-ও উচ্চারিত হোলেও অর্থ-পার্থক্যের দ্বারা চালিত না হোলে অথবা আগেকার ও বা ঔ বা উ মূলের বিকৃতি-জাত না হোলে পর ও-কার যোগ হবে না এই মনে রেখে কঃ বিঃ সমিতির নিয়ম-বন্ধন। সুতরাং কোরি, ধোরি, বোলি চলবে না; কোরব, বোলব, কোরলে, চোললে, কোরতে, মোরতে প্রভৃতিও নয়। যদিও ভাবী অনুজ্ঞা (মধ্যঃ পুঃ) হিসাবে কোরো, বোলো চলবে, আর শু থেকে শোওয়া, গুন্‌ থেকে গোনা, তুল্‌ থেকে তোলা, চৌর থেকে চোরা ক্রোড় থেকে কোল, ঔষধ থেকে ওষুধ প্রভৃতি শব্দ তো আছেই।
বলব, করব, বললে, করলে, চল্‌ল, ছিল, দিল, গেল, পৌঁছাল প্রভৃতির কোনো অঙ্গে ‘ও’ লাগানো যাবে না এই নির্বারণে স্থির হতে পারলেও ‘হোল’ বা হ’ল বানানটার চতুরঙ্গ বিকৃতি –হল, হলো, হোল, হোলো-একটি সমস্যার মতো রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমত বুঝতে হবে, ক্রিয়ান্ত ‘ল’ এর গায়ে ও-কার যোগ একমাত্র দু’একটি অনুজ্ঞা ছাড়া (তুলো না, ভুলো না) কোথাও বিহিত নয়। ‘হোল’ বানানের প্রারম্ভ আদ্য ‘হ’ বা ‘হো’ নিয়ে। এক্ষেত্রে দেখতে হবে যে ক্রিয়ার ঐ হ-মূলটার পিছনে দুটো ধাতু কাজ করে, একটি ‘ভূ’ অন্যটা ‘অস্‌’ ধাতু-জাত ‘হ’ যা অসম্পূর্ণ ধাতু। হএ=হয় ক্রিয়ার মূল ঐ অস্‌ ধাতু,(মৈথিলী ব্রজবুলির হোএ, হোয় যদিও ভূ-জাত) কিন্তু ‘হোল’ ক্রিয়ার মূল হ’ল ভূ ধাতু। ফলে ঊ এর ও-তে রূপান্তর স্বাভাবিক পদ্ধতির অন্তর্গত। অতএব হো+ইল্ল= হোইল=‘হোল’ এটিই সঠিক বানান। প্রসঙ্গক্রমে সংবাদপত্রে প্রচারিত ‘কইলকাতা’ (=কপিল-খাতা=কপিলের দল) শব্দটার বানান হওয়া উচিত কোলকাতা বা ক’লকাতা- ‘কলকাতা’ কখনোই নয়। ‘কলকাতা’ লিখনে তা পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণে দাঁড়ায়।
পরিশেষে জানাতে হয় যে উক্ত অ-বিকৃতির ‘ও’ উচ্চারণ ছাড়া আদিতে ও বা ও-ক’রে দেওয়া সংস্কৃতজ (দ্বার=‘দোর’) দেশজ 😊 কোল-মুণ্ডা) বিদেশী বহু শব্দ আমরা ব্যবহার করি। সেগুলির পূর্ণ ও-ত্ব নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিধার অবকাশ নেই।
সংস্কারকদের প্রস্তাবিত বিষয় অনুসারে মন্তব্য
(খ) সংস্কৃতজ শব্দে ই-ঈ
দেশী, বিদেশী বা সংস্কৃতজ শব্দের ঈ-দেওয়া বানান গুলোকে বেবাক ই-তে নিয়ে যেতে হবে, এই হোল সাম্প্রতিক সংস্কারকদের পণ। কিন্তু কী কারণে তাঁরা এই অদ্ভুত পণ ক’রে বসেছেন বোঝা যায় না। কই, ঈ বানানের ঈ-টা তো আমরা দীর্ঘ উচ্চারণ করি না (একমাত্র বিশেষ ছান্দিক প্রয়োজনের ক্ষেত্র ছাড়া)। তা ছাড়া ঈ-টা তো একটানে লেখা সোজা। আর সর্বোপরি কথা হোল, অর্থগত পার্থক্য দ্যোতনার জন্য কোথাও ‘ই’ কোথাও ‘ঈ’ দিয়ে বানান রাখা। উচ্চারণে এক-প্রকৃতির হোলেও এই বিশেষ প্রয়োজনের জন্যই পৃথক দুটো হরফ আমাদের ব্যবহার করতেই হচ্ছে। এই কারণেই কঃ বিঃ সমিতির আচার্য সুনীতিকুমার প্রমুখেরা নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন যে-
স্ত্রীলিঙ্গ এবং জাতি, ব্যক্তি, ভাষা ও বিশেষণবাচক শব্দের অন্তে বাঙলায় ‘ঈ’ বিহিত থাকা প্রয়োজন।
তারা লক্ষ্য করেছিলেন যে ঐ জাতীয় শব্দগুলিতে ঈ এর ব্যবহার বাঙলায় বহুপ্রচলিত, আর সেই সঙ্গে নিশ্চয়ই স্ত্রী-পুং ও বিশেষ্য-বিশেষণে আর্যভাষাগুলিতে পার্থক্য রাখার চিরন্তন প্রবণতার দিকটিও অধ্যয়ন করেছিলেন। বস্তুত দেখা যায়, সৌন্দর্য অর্পণের মোহে প’ড়ে ক্লীবলিঙ্গ পদার্থের বাচক শব্দেও স্ত্রীত্ব আরোপ ক’রে আমরা সুখী হয়েছি। যেমন- নদী, মহী, ধরা, ধরণী, ধরিত্রী, মেদিনী, অটবী, রজনী, নিশিথিনী, যামিনী, শর্বরী, নগরী, মঞ্জরী, লেখনী, মায় অরণ্যানী, হিমানী পর্যন্ত। আর, ইনী-নী-প্রিয়া খাঁটি বাঙলায়-সাপিনী, তাপিনী, নাগিনী, বিহঙ্গিনী, নির্ঝরিনী, প্রয়োজনী (দোকানের নাম), আগমনী, সায়ন্তনী, সজনী, নির্বাচনী এমনকি ‘ভীমা অসি’ পর্যন্ত। প্রতীচ্যের বহু ভাষাতেও এরকম স্ত্রী-বিবক্ষার নিদর্শন আছে। আবার আমাদের পাশের হিন্দীতে তো কথাই নাই-বই(কিতাব),গাড়ি, কচুরি, ছুরি পর্যন্ত। সে যাই হোক, কোনো শব্দ পদার্থতঃ স্ত্রীলিঙ্গের হোক না-ই হোক, মানুষের স্ত্রীত্ব–বোধটাই বড় কথা। ফলে ব্যবহৃত শব্দগুলিতেও স্ত্রীত্ব সংরক্ষণের আগ্রহ, আর সেই হিসাবেই স্ত্রীবোধাত্মক শব্দের শেষে ‘ঈ’-ইনী, আনী, নী পর্যন্ত।
বাঙ্‌লায় স্ত্রী-প্রত্যয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়-আ, ঈ, ইকা, ইনী, আনী এবং নী। এগুলির আদর্শ সংস্কৃত থেকেই যদিচ গৃহীত হয়েছে, সংস্কৃতের সঙ্গে সর্বত্র মেলে না এমন ইনী, আনী, নী-দের প্রতাপই বাঙলায় বেশী। বৈষ্ণব পদাবলীর সেই গোপিনী, রজকিনী, ননদিনী, বিনোদিনী, সজনী, ধনী থেকে আরম্ভ ক’রে সাপিনী, তাপিনী, মালিনী, সতিনী, নাতিনী, ঠাকুরানী উন্মাদিনী, নাচনী, ডাইনী, ভূজঙ্গিনী, কুরঙ্গিনী, মাতঙ্গিনী, মৃগনয়নী প্রভৃতি পার হয়ে চলতি প্রয়োগের –ধোবানী, ময়রানী, কলুনী, মজুরনী, নাপিতানী চাকরানী এবং নাচুনী, ছিঁচ-কাঁদুনী, পাড়া-বেড়ানী এবং নব্য ঈ প্রত্যয়ের পাড়া-কুঁদুলী, চিরনদাঁতী, ভাতারখাকী, হতভাগী, মাগী, আবাগী, পেঁচামুখী, বেরালচোখী পর্যন্ত। এ ছাড়া সংস্কৃতে পাওয়া-দেবী, মানবী, তন্বী, সুন্দরী, সখী, নর্তকী, কুমারী, কিন্নরী, বৈষ্ণবী, পিশাচী, সহচরী, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষোড়শী, শ্রীমতি, গুণবতী, প্রেয়সী, সুমুখী, ইন্দ্রাণী, আচার্যানী গৃহিণী, রমণী, মালিনী, বিলাসিনী, মনোহারিণী প্রভৃতি শব্দ তো বাঙলার সঙ্গী হিসাবে আছেই। তবু পুনরায় বলি, ঐ ইনী, নী-টার দিকেই বাঙালীর বেশি আগ্রহ। এমনতর যে-পাগলিনী, ননদিনী, সতিনীর মত ডবল স্ত্রী-প্রত্যয়েও তার দ্বিধা নেই।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সংস্কৃত শব্দের গায়ে হাত না দিয়ে প্রাকৃত বাঙলার ইনী, আনী, নী বা ঈ প্রত্যয়ান্ত শব্দাবলীর উপরেই বিষদৃষ্টি প্রয়োগ ক’রে সাম্প্রতিক দুই সংস্কারক ‘ভিত্তিপত্র’ এবং তদনুসারে ‘কী লিখবেন’ জুলুম করছেন “ঈ-কার ঊকার দিয়ে কোনো বানানই আমরা রাখব না”। আর ভিত্তিপত্র একটি পণ্ডিতী মন্তব্যের সহায়ে স্ত্রীলিঙ্গে ঈ-কারের ব্যবহার এই ব’লে রোধ করতে চেয়েছেন যে-ঈ-কারের সঙ্গে স্ত্রীত্বের বা স্ত্রীলিঙ্গের কোনো অনিবার্য যোগ নেই। আবার এঁদের ঈ-বিতাড়ন উদ্যমের সাফাই দিতে গিয়ে ‘নিয়ম ও অনিয়ম’ প্রণেতা ব্যাপারটার গোড়া ঘেঁসে কোপ মেরেছেন এই ব’লে যে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ নিয়ম ‘এখন আর রক্ষিত হচ্ছে না’!
ঐ-জাতীয় মন্তব্যের প্রত্যেকটিই খণ্ডনীয়, যদি সংবাদপত্র বা অন্য অস্ত্র হাতে নিয়ে গায়ের জোর না দেখানো যায়। বিশেষ্য-বিশেষণ এবং স্ত্রীং পুং এর পার্থক্য রাখার মনোভাব সব ভাষায় এবং সব জাতিতেই আছে, অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। প্রত্যয়-মুখ্য আর্য ভাষায় তা প্রত্যয়ের সাহায্যে নিষ্পন্ন হয়েছে। আর্যকন্যা বাঙলা হিন্দী সেই পথ ধ’রে চ’লে তারই মধ্যে কিছু স্বকীয়তাও দেখিয়েছে। সংস্কারকেরা যদি পারেন, প্রত্যয়ের রাস্তায় না গিয়ে ঐ শ্রেণীর স্ত্রী-বোধক যাবতীয় শব্দকে তাড়িয়ে নোতুন শব্দ সৃষ্টি বা আমদানি করুন, যেমন আছে-ছেলে-মেয়ে, ভাই-বো্ন, বলদ-গাই, বাদশা-বেগম, Lord-Lady, রাজা-রানী প্রভৃতি। না পারলে ঐ সব প্রত্যয়ের উপরেই নির্ভর করতে হবে, আর প্রত্যয়গুলি তো তার বানানসহ বাঙলায় সুনির্দিষ্ট, স্থির; ওতে হস্তক্ষেপ করলে মূল বোধকতাটাই বিনষ্ট হয়ে যাবে। এই নিয়ম অর্থাৎ স্ত্রী-বিশেষণে সুনীতিকুমার প্রমুখের নির্ধারিত নিয়ম ‘এখন আর রক্ষিত হচ্ছে না’ ‘নিয়ম অনিয়ম’ প্রণেতার এধরনের মন্তব্য অ-সম্যক্‌-দৃষ্টিপ্রসৃত। কোথায় রক্ষিত হচ্ছে না? কে রক্ষা করছে না? মাতৃভাষায় অর্ধ-শিক্ষিত কতিপয় বাচালের লিখনকেই শিরোধার্য করতে হবে নাকি?
ভাবতে গিয়ে আমরা অবাক হই যে পাশাপাশি চলমান সংস্কৃত শব্দের ঈ গুলোকে সংস্কাকেরা ছুঁতে চাইছেন না। ওদিকে না তাকিয়েই তদ্ভব অর্ধতৎসম আর ফোনিম-স্বনিমের তত্ত্ব নিয়ে মশগুল আছেন। সংস্কৃত শব্দগুলোর ঈ-দেওয়া বানানের আমেজ যে বহু আগে থেকেই আমাদের চোখে রঙ লাগিয়ে দিয়েছে, তার কী হবে? আর আমরা আগেই বলেছি যে ফোনিমের বিচারে ই-ঈ এক হোলে পর ই-টাই বা বিতাড়িত হবে না কেন? ফোনিমীরা না হয় এক কাজ করুন। এখন তো দলীয় রাজনীতির যুগ, একটি রাজনীতিক সন্ধিতে আসুন- অর্ধেক ঈ যাক, অর্ধেক ই থাক।
স্ত্রী-বাচকতার ক্ষেত্রে সংস্কৃতের আ, ঈ, ইনী, ও আনী’র মধ্যে বাঙলা ‘আ’ টাকে তেমন পছন্দ করে নি। ঈ কে খানিকটা করেছে (বড়কী, ছুটকী, শাশুড়ী, মাসী, ননদী, মাগী, খুড়ী, ভেড়ী, পাগলী), কিন্তু আত্মসমর্পণ করেছে ঐ ‘ইনী’ প্রত্যয়টায় কাছে। যা পরে ‘নী’ তেও দাঁড়িয়েছে। এই ‘নী’ টাকে ‘নি’ করলে ক্রিয়া –বিশেষ্য বাচক-শাসানি, দাপানি, ঝাঁকানি, লাফানি, ফোঁসানি, জ্বলানি, পুড়ুনি, নাকানি, চোবানি, পারানি, বকুনি, বিনুনি, কাঁদুনি-প্রভৃতির সঙ্গে তা এক হয়ে যাবে যে? প্রাচীন থেকে আজ পর্যন্ত ঐ ‘ইনী ’ প্রত্যয়টাই বাঙলার শোভা, সৌন্দর্য, কবিতা, রসিকতা রক্ষা করেছে, কেবল প্রয়োজন নির্বাহই করে নি। ওর বিশিষ্ট আভরণটা খুলে নিয়ে পাবলিকের রাস্তায় দাঁড় করাচ্ছে কোন্‌ বেরসিকের দল?
প্রসঙ্গ-শেষে জানাই ই-কার লাগানোর সমর্থনে সংস্কৃতের অটবী-অটবি, রজনী-রজনি, শ্রেণী-শ্রেণি, সূচী-সূচি প্রভৃতির বিকল্প দেখিয়ে লাভ নেই, কারণ, ওসব ক্ষেত্রে বাঙলা আগাগোড়া ঈ-দেওয়া বানানেই স্বাক্ষর রেখেছে।
এখন বিশেষণ ও বিশেষণাত্মক বা সম্পর্ক-সম্বন্ধ-বাচক ‘ঈ’ প্রত্যয়টার কথা ধরা যেতে পারে। এখানেও মূল তত্ত্বটা সেই পার্থক্য রাখার। ভাষা মনস্তত্ত্ব বিষয়ে সুনীতিকুমার প্রমুখের অভিজ্ঞতার সমর্থন। আধুনিকতম যুক্তিবিচারেও তাঁদের নির্ধারণের সারবত্তা স্বীকার।
সাহসিক ভিত্তিপাত্রিকেরা ঘোষণা দিয়েছেন-অতৎসম শব্দের ক্ষেত্রে বিশেষ্য বিশেষণে কোনো পার্থাক্য আমরা রাখব না। বেশ কথা! কিন্তু তৎসম শব্দেই বা তা রাখবেন কেন? আমরা বাঙলা শিখছি, সংস্কৃত তো নয়। আর বানানের মধ্য দিয়ে বিশেষ্য-বিশেষণকে একাকার ক’রে দিয়ে শিক্ষায় ও বোধে কোন্‌ উন্নতি আনতে চান তাঁরা? স্ত্রী-পুরুষের মতো বিশেষ্য-বিশেষণ বোধেও পার্থক্য রাখার প্রয়োজন নেই এমনতর ধারণার দ্বারা যদি তাঁরা চালিত হয়ে থাকেন তাহলে একধরনের সাম্যের তত্ত্ব হয় বটে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রথমে জনচিত্ত থেকে সেই ভেদবোধটা দূর করার জন্য তাঁদের কোমর বেঁধে লাগতে হবে, আর তা না হোলে ঈ তাড়িয়ে অন্য চিহ্ন উদ্‌ভাবন করতে হবে, নইলে দুই একাকার হয়ে লড়াইয়ে নামলে উক্ত পণ্ডিতেরা না হয় তদ্‌ভব অর্ধতৎসম প্রভৃতি জপ করতে করতে আত্মরক্ষা করতে পারবেন, কিন্তু অসহায় শিশুদের কী হবে? কিল চড় গাধালিখন তারা কতকাল সহ্য করবে?
আমাদের বিশেষণের ঈ-টা দুটো সূত্র থেকে এসেছে। এক, সংস্কৃতের ইন্‌ বিন্‌ ভাগান্ত শব্দের ঈ থেকে (মানী, গুণী, ধনী, মনস্বী প্রভৃতি অসংখ্য), আর এসেছে ফারসী সম্পর্ক-দ্যোতক ঈ প্রত্যয় থেকে (খুনী, খুশী, নামী, দামী, রেশমী, জাহাজী, কেতাবী, জরুরী, গ্রেপ্তারী, বে-আইনী, তৈয়ারী, পুলিসী, চালানী, মাঘী, চৈতী, বেনারসী, রেশমী, বাঙালী, হিন্দী, মারাঠী, ইরানী, জাপানী, তেজী, সরকারী, পাকিস্তানী, ইংরাজী প্রভৃতি)। বলা যেতে পারে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর বেশ কয়েকটি শব্দ বহু-প্রচলিত হওয়ার কারণে ‘ই’ কার দিয়েও লেখা হচ্ছে। যেমন, সরসারি, দরকারি, বেশি, মিহি, দাবি, তৈরি, ইংরেজি, বাঙালি প্রভৃতি। কিন্তু তাই ব’লে বিশেষ্যের ই-কারে ও বিশেষণের ঈ-কারে এক হয়ে গিয়ে যেসব ক্ষেত্রে বোধে বিভ্রান্তি ঘটায় সে সব ক্ষেত্রে আমাদের সাবধান হতেই হবে। যেমন, চালানি-চালানী, বড়মানুষি-বড়মানুষী, পণ্ডিতি-পণ্ডিতী, মাস্টারি-মাস্টারী প্রভৃতি। দেশীয়, বিদেশীর ‘ঈয়’ প্রত্যয়ান্ত সংস্কৃত থেকে আগত এই বিশেষণ দুটোকে দেশি, বিদেশি বানান সংস্কারকের দল লিখছেন, কিন্তু বিবেচক লেখকেরা তার অনুসরণ করবেন এমন মনে হয় না। কারণ সংস্কৃত বানানের গন্ধটা ওদের গা থেকে এখনও যায় নি। তা ছাড়া বিশেষণ-বোধকতা বজায় রাখার কারণেও বটে।
সংস্কৃতজ বিশেষ্য শব্দে (বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে পার্থক্য রাখার প্রয়োজন ছাড়া) সর্বত্র ই-কার বা উ-কার হোক, অর্থাৎ পাখি, কুমির, হাতি, আশি, পুব, পুজো, শিষ (শীর্ষ) প্রভৃতি চলুক, সুনীতিকুমার প্রমুখদের এ খুবই সমুচিত বিবেচনা এবং বলা বাহুল্য এগুলি প্রচলিত হয়েই পড়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও লক্ষণীয় হওয়া উচিত যে একই বানানের দুই বিভিন্ন জাতীয় শব্দ যাতে অর্থবিভ্রাট না ঘটায়, সে ক্ষেত্রে একটিতে ই এবং অন্যটিতে ঈ লাগিয়ে পার্থক্য রাখাই কর্তব্য। যেমন বাড়ী=গৃহ, কিন্তু বাড়ি=লাঠি। কালি কিন্তু কালী। হাতি কিন্তু হাতী (দেশ-হাতী কাপড়)। বাগানের মালি, কিন্তু মালাধারী মালী, যার স্ত্রীলিঙ্গের মালিনী (সং) হকিমি, ডাক্তারি, মাস্টারি; কিন্তু হকিমী দাওয়াই, ডাক্তারী প্রেসক্রিপ্‌শান, মাস্টাবী বুদ্ধি। তিনি তেজারতি করেন, কিন্তু তাঁর তেজারতী ব্যাবসা। বিজলি, কিন্তু বিজলী বাতি। চালানির ব্যবসা বা মাল-চালানি, কিন্তু চালানী মাল, বদলির ব্যবস্থা, কিন্তু বদলী হওয়া ইত্যাদি।
ঈ বিতাড়নের নেশায় কোনো কোনো সংস্কারক বেশ কিছুদিন ধ’রে জনমন থেকে উৎসারিত-জীবনী, বিবরণী, অনুশীলনী, নির্বাচনী, প্রয়োজনী, মিলনী, আগমনী, আবহনী, সাধারণী, চিরন্তনী, সায়ন্তনী, এমনকি শতাব্দী বার্ষিকী শব্দেও ভুল ধরেছেন। দেখা যায়, এগুলির কোনোটি বিশেষণাত্মক, কোনোটি বা স্ত্রী-বোধাত্মক। বিশেষণাত্মক হোলে ফারসী ঈ, স্ত্রীবোধে সৌন্দর্য যুক্ত করার অভিপ্রায়ে গঠিত হোলে সংস্কৃতের ঈ লাগানো। বঙ্গসরস্বতীর স্বকীয়তার মানদণ্ডেই এসবের সৃষ্টি, পণ্ডিতী শাসনে নিরর্থক হতে পারে, সৃষ্টিকৌশলে সার্থক। ‘নিয়ম-অনিয়ম’ প্রণেতা দেখি ‘শতাব্দী, বার্ষিকী’তেও আপত্তি জানিয়েছেন। কেন? পঞ্চবটী, সপ্তপর্ণী ঠিক আছে তো? আর, বর্ষে বর্ষে ভবঃ বার্ষিকঃ স্ত্রিয়ামীপ্‌ এতেই বা পণ্ডিত্যের হানি ঘটছে কোথায়?
সংস্কারকেরা সব (ভুল করলাম নাকি) এক এক সময় এক এক মূর্তি ধরেন দেখি। উপরের প্রসঙ্গক্রমেই এ কথা মনে হোল। বাঙলার স্বভাবসিদ্ধ (প্রাচীন থেকে আধুনিক পর্যন্ত) অভ্যাস হ’ল বহুবচন-জ্ঞাপক কেবল ‘রা’ ‘গলি, গুলো’ প্রত্যয়ে নিঃসংশয় না হয়ে (না হবার বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে) অতিরিক্ত বহু- জ্ঞাপক ‘সব সকল’ শব্দ যোগ করা। বিশেষ জোর দেওয়ার জন্যও এরকম বহুবোধক অতিরিক্ত শব্দ আমাদের ব্যবহার করতে হয়। ‘কী লিখবেন’ গ্রন্থের রচয়িতা ব্যাকরণ শিক্ষকের দায়ীত্ব নিয়ে আমাদের এই পিতৃপিতামহক্রমে আগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চান। এজন্য সংস্কৃত ও ইংরেজির নজির দেখিয়েছেন (১৫-১৬ পৃঃ দ্রষ্টব্য) । যেন ইংরেজি-সংস্কৃতের চালনাতেই বঙ্গসরস্বতীর পা ফেলা সমুচিত। এ ধরনের অনুশাসন ভাষাজননীর পক্ষে মানহানিকর ব’লেই আমরা মনে করি।
শেষ কথা বলে ই-ঈ কলহের সমাপ্তি ঘটাই। পারিবারিক সম্পর্কের মাসী,পিসী, খুড়ী, জেঠী, চাচী, মামী, ননদী প্রভৃতি শব্দে ঈ-যোগ নিশ্চয়ই সংস্কৃতের দেবী, মানবী, নারী, প্রভৃতির অনুসরণে। রাজশেখর বসু , সুনীতিকুমার প্রমুখেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে ওগুলির মধ্যে মাসী, পিসীতে অধুনা ই-কার ব্যবহার চলছে। দিদি (সাঁও) শব্দে অবশ্য ই-কার আগাগোড়াই প্রচলিত। এ কারণে আচার্যেরা অনুমোদন করেছিলেন যে ঐ পিসী, মাসী শব্দ দুটোতে বিকল্পে ই দেওয়া চলবে। তা হোক, কিন্তু বাকিগুলো ঈ-যোগে স্থূলাঙ্গী হয়ে সংসারের ভার বাড়াতে থাকবে এ কেমন কথা? যেহেতু স্ত্রী-বাচক শব্দ দেখলে ‘ই’ করার সূত্র আমরা মেনে নিতে পারি না, সেইহেতু পিসী, মাসীকেও আমরা ই-যুক্ত দেখতে চাই না।
যাবতীয় স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ও যাবতীয় বিশেষণবোধক শব্দ ঈ দিয়ে বিজ্ঞাপিত হোক এবং ঐ হিসাবে বিশেষ্য, ক্রিয়া-বিশেষ্য ও ভাব-বিশেষ্যের সঙ্গে ওদের পার্থক্য বজায় থাক এই সরল ও শিক্ষামূলক সত্যেই আমরা আস্থাবান।
উ ঊ নিয়ে বাঙলায় তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে এক্ষেত্রেও সংস্কারকদের জানাই, যেসব ‘তৎসম’ শব্দের সামনে তাঁরা করজোড়ে থাকেন, সেগুলি তো তদ্‌ভব বাঙ্‌লার গা ঘেঁসেই রয়েছে, একই সঙ্গে চলেছে। সেগুলির সঙ্গে প্রাকৃত বাঙলাকে মিলিয়ে তবেই যথার্থ সমাধান সম্ভব, নতুবা, অর্ধ-জরতীকে ‘সাথী’ ক’রে ভিত্তিপাত্রিক সংবাদপাত্রিকেরা খোশ-আমোদে দিন কাটাতে পারেন, কিন্তু সন্তান-সন্ততির সর্বনাশ হবে। তা ছাড়া যে-দেশে অশিক্ষিতের সংখ্যা শতকরা ৬০/৭০ আর অর্ধ-শিক্ষিতের সংখ্যা অন্তত বিশ-পঁচিশ, সে-দেশের গতিই বা কী হবে!

সূত্র: Professor Khudiram Das, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ), সংস্কারকদের প্রস্তাবিত বিষয় অনুসারে মন্তব্য

ক্ষুদিরাম দাসের আরও কিছু লেখার সংযোগ:
Language
error: Content is protected !!