বার্মা (Burma) : ইতিহাস ও নামকরণ

বাংলা  বানান কোথায় কী লিখবেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

বার্মা (Burma)

মায়ানমার-এর প্রাচীন নাম বার্মা। কয়েক বছর আগেও দেশটি বার্মা নামে পরিচিত ছিল। উপমহাদেশে দেশটি দীর্ঘদিন যাবত ব্রহ্মদেশ নামে পরিচিত ছিল। সংস্কৃত প্রাচীন গ্রন্থেও এটি ব্রহ্মদেশ নামে চিহ্নিত। বার্মান, ব্রহ্ম দেশের বৃহত্তম নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর নাম। এ বার্মান জাতিগোষ্ঠীর নাম হতে বার্মা নামের উৎপত্তি। অষ্টাদশ শতকে পর্তুগিজদের কাছে দেশটি বির্মানিয়া নামে পরিচিত ছিল। তৎপূর্বে এটি বার্মাহ্ বা বির্মা নামে পরিচিত ছিল। ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় দেশটি বার্মা হিসাবে সমধিক পরিচিত ছিল। বার্মা শব্দটি হচ্ছে আধুনিক বার্মিজ ভাষার শব্দ ‘মায়ানমা’-এর প্রাচীন কথ্যরূপ। মায়নমা প্রাচীন বার্মিজ ভাষায় ¤্রানমা রূপেও উচ্চারিত হতো। মায়ান ও মার এ দুটি শব্দ নিয়ে মায়ানমার শব্দটি গঠিত। ‘মায়ান’ শব্দের অর্থ প্রথম এবং ‘মার’ শব্দের অর্থ শক্তিশালী। সুতরাং মায়ানমার শব্দের অর্থ প্রথম শক্তিশালী। যার অন্তর্নিহিত অর্থ প্রথম শক্তিশালী রাষ্ট্র বা অদ্বিতীয় শক্তিশালী জাতি। ভারতে মায়ানমার প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ব্রম্মদেশ নামে পরিচিত। এটি সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে ব্রহ্মের দেশ বা ঈশ্বরের দেশ।

মায়ানমারের উৎপত্তি নিয়ে অনেকে একটি প্রবাদ বলে থাকেন। মায়ানমার (Myanmar) শব্দটির মায়া (MAYA) হতে এসেছে। মায়া শব্দের অর্থ পান্না (emerald)। পান্না যেমন সবাইকে মোহিত করে, আকর্ষিত করে তেমনি বার্মার রূপরসও সবাইকে আকৃষ্ট করে। এটি পান্নার মতো সুন্দর ও আকর্ষণীয়। এজন্য মায়ানমারকে বলা হয় এশিয়ার পান্না (emerald of Asia)।

বার্মা সরকারিভাবে রিপাবলিক অব দ্যা ইউনিয়ন অব মায়ানমার, সংক্ষেপে মায়ানমার নামে পরিচিত। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। চায়না, থাইল্যান্ড, ভারত, লাওস ও বাংলাদেশ সীমান্ত ঘিরে দেশটির অবস্থান। তবে বার্মার মোট সীমান্তের এক তৃতীয়াংশ, প্রায় ১৯৩০ কিলোমিটার সীমান্ত বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর।

মায়নমারের মোট আয়তন ৬,৭৬,৫৭৮ বর্গ কিলোমিটার বা ২,৬১,২২৭ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ৩.০৬%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মায়ানমারে মোট জনসংখ্যা ৫,১৪,৮৬,২৫৩ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার ৭৬ জন লোক বাস করে। আয়তন বিবেচনায় মায়ানমার পৃথিবীর ৪০-তম বৃহত্তম দেশ হলেও জনসংখ্যা বিবেচনায় ২৫-তম। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় মায়ানমার পৃথিবীর ১২৫-তম জনবহুল দেশ। আয়তনের দিক থেকে মায়ানমার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার দেশটির শাসন ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী ঘৃণ্যময় করে তুলেছে। মায়ানমারের ৮৯% অধিবাসী বুড্ডিস্ট। এখানে ১৩৫ টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে। তন্মধ্যে বার্মিজ জনগোষ্ঠী বৃহত্তম। মায়ানমারের জনসংখ্যার ৬৮% বার্মিজ, ৯% সান, ৭% কোরিয়ান, ৪% রাখাইন, ৩% চায়নিজ, ২% ভারতীয়, ২% মন এবং ৫% অন্যান্য জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

ব্রিটিশ শাসনামলে মায়ানমার ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। দেশটি বহুমূল্য পাথর, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য বহু খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুকি দেশটির আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে মায়ানমারের জিডিপি (পিপিপি) ২৪৪.৩৩১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪,৭৫১ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৬৫.২৯১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১,২৬৯ ইউএস ডলার। এর মুদ্রার নাম কিয়াট। দেশের রাজধানী ইয়াঙ্গুন।

তাওকাইয়ান (Taukkyan cemetery) সিমেট্রি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিহতদের সমাধির জন্য নির্মিত বিশ্বের বৃহত্তম ৩টি ওয়ার সিমেট্রির অন্যতম। মায়ানমারে ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন নেই বললেই চলে। তাই মায়ানমার ভ্রমণ করতে হলে প্রত্যেককে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নগদ ইউএস ডলার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মধ্যে এটি অন্যতম, যেখানে একজন ব্যক্তির ওজন তুলতে পারার সক্ষমতা বিবেচনা করে তার শক্তির পরিমাপ করা হয়। সুপারি মায়ানমারে অত্যন্ত প্রিয়। দেশের প্রায় সবাই যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ সুপারি চিবিয়ে চলে।

পৃথিবীর ৩টি দেশের মধ্যে মায়ানমার অন্যতম, যে দেশে পরিমাপের ক্ষেত্রে এখনও মেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। বাকি দুটি দেশ হচ্ছে লাইবেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। সাধারণ্যে ওজন পরিমাপের ব্যবহৃত একক পিকথা (peiktha), যা ৩.৬ পাউন্ডের সমান। বক্সিং এখানকার খুব জনপ্রিয় খেলা। তবে এর রীতিনীতি ভিন্ন এবং খুবই নৃশংস। বক্সারের মধে যিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রথম রক্তপাত ঘটাতে পারে, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

গর্ভবতী নারীদের এখানে অনেক কুসংস্কার মেনে চলতে হয়। তাদের কিছু কিছু কাজ করা এবং কিছু কিছু জিনিস খাওয়া নিষিদ্ধ। মায়ানমারে কোনো গর্ভবতী নারী কলা খেতে পারে না। তাদের বিশ্বাস কলা খেলে শিশু খুব বড় হয়ে যাবে। মরিচ খাওয়াও নিষিদ্ধ, মরিচ খেলে নাকি শিশুর চুল উঠে না। গর্ভবতী কোনো নারীর বিবাহ অনুষ্ঠান বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যেতে নেই। জন্মগ্রহণের সাতদিন অতিবাহিত না হলে কোনো শিশুর নাম রাখা যায় না। শিশুদের প্রায় প্রত্যেকের গলায় বা হাতে পবিত্র সুতো বেঁধে দেওয়া হয়। নইলে খারাপ আত্মা তাদের ক্ষতি করবে।

চুলকাটা নিয়ে মায়ানমারের অধিবাসীদের একটি সংস্কার প্রচলিত আছে। ওই দেশে সোমবার, শুক্রবার ও জন্মদিনে কেউ চুল কাটে Dr.AMINনা। মায়ানমারের নারীপুরুষ উভয়ে হলদে রঙের একজাতীয় প্যাস্ট ব্যবহার করে। থানাখা নামক একটি গাছের ছাল হতে এটি প্রস্তুত করা হয়। চামড়াকে রোদের তাপ হতে রক্ষা করা ও তৈলাক্ত প্রতিরোধের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় মায়ানমারবাসী হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা অন্য কোথাও ওয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মুখ দিয়ে চুমোর শব্দ করে। তারা কাউকে কোনো কিছু দেওয়ার সময়, বিশেষ করে টাকা প্রদানের সময় বাম হাত দিয়ে ডান হাতের বাহুটি স্পর্শ করে এগিয়ে দেয়। এটিই শোভনীয় প্রথা।


ইন্ডিয়া / ভারত (India) : ইতিহাস ও নামকরণ

ইন্দোনেশিয়া (Indonesia): ইতিহাস ও নামকরণ

ইরান(Iran): ইতিহাস ও নামকরণ

ইরাক (Iraq) : ইতিহাস ও নামকরণ

বার্মা (Burma) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!