বাসর রাতের বিড়াল: বাসর রাতে বিড়াল মারা

ইউসুফ খান

বাসর রাতে বিড়াল মারা’ কথাটা কোথা থেকে এসেছে অর্থাৎ কথাটার ব্যুৎপত্তি কী জানতে চেয়ে বহু জন বিভিন্ন বছরে শুবাচে প্রশ্ন করেছেন দেখলাম। কিন্তু তার মূলগত কোনও উত্তর কোনও কমেন্টে নজরে এলো না। কথাটা এসেছে একটা ইরানি প্রবাদ গুরবে কুশ্‌‌তন্‌ শব্‌-এ-আও্‌অল্‌ থেকে। এই আসল উত্তরটা বহু আগে দিয়ে গেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘পঞ্চতন্ত্র’ বইয়ে মার্জারনিধন কাব্যে। পরে এটা ‘সৈয়দ মুজতবা আলীর শ্রেষ্ঠ রচনা’ এবং ‘হাস্যমধুর’ বইতেও অন্তর্ভুক্ত হয়।
এত বড়ো উত্তর কমেন্ট হিসেবে ধরলো না বলে পোস্ট হিসেবে দিলাম। আলী সাহেবের এই লেখাটা নেটে পাওয়া যায়, কিন্তু সর্বত্র অসংখ্য বানান ভুল। আমি দুটো সোর্স দেখে ওনার বানান এবং যতিচিহ্নগুলো যথাযথ রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই সোর্সের মধ্যে ভূত থাকলে আমারও ভুল আছে।
এই দাগের নিচের পুরো লেখাটা সৈয়দ মুজতবা আলীর।
______________________________________
মার্জারনিধন কাব্য
বা
গুরবে কুশ্‌তন শব্‌-ই-আওওয়াল
 
কোন্ দেবে পূজা করি কোন শীর্নী ধরি?
গণপতি, মৌলা-আলী, ধূর্জটি, শ্ৰীহরি?
মুশকিল্‌-আসান্‌ আর মুর্শীদ মস্তান্‌
কোম্পানি কি মহারানী, ইংরেজ, শয়তান?
হিন্দুস্থান, পাকিস্তান, যেবা আছ যথা
ইস্পাহানী, ডালমিঞা – কলির দেবতা।
সবারে স্মরণ করি সিতুমিঞা ভনে
বেদরদ বেধড়ক ভয় নাহি মনে॥
ইরান দেশের কেচ্ছা শোনো সাধুজন
বেহদ্‌ রঙীন কেচ্ছা, বহুৎ বরণ।
এন্তার তালিম পাবে করিলে খেয়াল
রোশনী আসিবে দিলে ভাঙিয়া দেয়াল।
পুরানা যদিও কেচ্ছা তবু হর্বকৎ
সমঝাইয়া দিবে নয়া হাল হকীকৎ॥
ইরান দেশেতে ছিল যমজ তরুণী।
ইয়া রঙ, ইয়া ঢঙ, নানা গুণে গুণী।
কোথায় লায়লী লাগে কোথায় শিরীন
চোখেতে বিজলী খেলে ঠোঁটে বাজে বীণ।
ওড়না দুলায়ে যবে দুই বোন যায়
কলিজা আছাড় খায় জোড়া রাঙা পায়।
এ্যাসা পীরিতি তোলে ফকিরেরও জানে
বেহুঁশ হইয়া লোক তারীফ বাখানে।
দৌলতও আছিল বটে বিস্তরে বিস্তর
বাপ দাদা রাখি গেলা চাকর-নফর।
ধন জন ঘর বাড়ি তালাব খামার
টাকা কড়ি জওয়াহর এন্তারে এন্তার।
তাই দুই নারী চায় থাকিতে আজাদ
কলঙ্কের ভয়ে শুধু বিয়ে হৈল সাধ।
তখন সে করিল শর্ত সে বড় অদ্ভুত
সে শর্ত শুনিলে ডর পায় যমদূত।
বলে কিনা প্ৰতি ভোরে মিঞার গর্দনে
পঞ্চাশ পয়জার মারি রাখিবে শাসনে!
এ বড় তাজ্জব বাৎ বেতালা বদ্‌খদ্‌
এ শর্ত মানিবে কেবা হয় যদি মর্দ?
দুল্‌হা বরেতে ছিল পাড়া ছয়লাপ
শর্ত শুনে পত্রপাঠ হয়ে গেল সাফ।
সিতু মিঞা বলে সাধু এ বড় কৌতুক
মন দিয়া কেচ্ছা শোনো পাবে দিলে সুখ॥
শীত গেল বর্ষা গেল আসিল বাহার
ফুলে গুলে ইস্‌ফাহান হৈল গুলজার।
শীরাজ তব্রীজ আর আজরবৈজান
খুশীতে ভরপুর ভেল জমিন আসমান।
শুধু দুই ভাই নাম ফিরোজ মতীন
পেটের ধান্দায় মরে দুঃখে কাটে দিন।
অবশেষে ছোট ভাই বলে ফিরোজেরে
“কি করে বাঁচিবে বলো, কি হবে আখেরে।
তার চেয়ে জুতা ভালো চলো দুই জনে
শাদী করি পেট ভরি দু মেয়ের সনে।”
দুআভুআ ফিরোজের মন মাঝে হয়
শাদীতে আয়েশ বটে জুতারও তো ভয়।
হদীসের লাগি ঘাঁটে কুরান পুরাণ
দীন সিতু মিঞা ভণে শুনে পুণ্যবান॥
মজলিস জৌলুস করি দুনিয়া রওশন
জোড়া শাদী হয়ে গেল খুশ ত্ৰিভুবন।
চলি গেলা দুই ভাই ভিন্ন হাবেলিতে
মগ্ন হইলা মত্ত হইলা রসের কেলিতে।
পয়জারের ভয়ে নারি করিতে বয়ান
সিতু ভণে চুপিসাড়ে শুনে পুণ্যবান॥
তিন মাস পরে বুঝি খুদার কুদ্রতে
আচম্বিতে দুভায়েতে দেখা হল পথে।
কোলাকুলি গলাগলি সিনা কলিজায়
মরি মরি মেলামেলি করে দুজনায়॥
“তোমার মাথায় টাক নাই কেন?”
শুধায় ফিরোজ ভাই
মানিয়া তাজ্জব উত্তরে মতীন
“টাক কেন বলে তাই?”
কাঁচুমাচু হয়ে পুছিল ফিরোজ
“জোরে কি মারে না চটি?”
“আরে দুত্তোর হিম্মত কাহার
আমি কি তেমনি বটি?
বাখানিয়া বলি শোন কান পেতে
তরতিব কাহারে কয়।
আজব দুনিয়া আজব চিড়িয়া
মামেলা ঝামেলা ময়।
তাই বসিলাম তলওয়ার হাতে
বীবী দিলা খানা আনি
কোর্মা পোলাও তন্দুরী মুর্গী
ঢাকাই বাখরখানী।
খানা আইল যেই বীবীর পেয়ারা
বিড়াল আসিল সাথে
যেই না করিল মরমিয়া ‘ম্যাও’
খাপটা না তুল্যা হাতে, –
খুল্যা তলোয়ার এক কোপে কাট্যা
ফালাইনু কল্লাডারে
তাজ্জব বীবী আকেল গুডুম
জবানে রা’টি না কাড়ে।
গুসসা কৈরা কই ‘এসব না সই’
মেজাজ বহুৎ কড়া
বরদাস্ত নাই বিলকুল আমার
তবিয়ৎ আগুনে গড়া।’
তার পর কার ঘাড়ে দুইডা মাথা
করিবে যে তেড়িমেড়ি?”
সিতু মিঞা কয় নিশ্চয় নিশ্চয়
বাঘিনী পরিল বেড়ি॥
“ক্যাবাৎ”, “ক্যাবাৎ” বলি হাওয়া করি ভর
চলিলা ফিরোজ মিঞা পৌঁছি গেলা ঘর।
মিলেছে দাওয়াই আর আন্দেশা তো নাই
খুদার কুদ্রতে ছিল তালেবর ভাই।
তার পর শোনো কেচ্ছা শোনো সাধুজন
ঠাস্যা দিল সেই দাওয়া পুলকিত মন।
সে রাতে খানার ওক্তে খুল্যা তলোয়ার
কাট্যা না ফালাইল মিঞা কল্লা বিল্লিডার।
চক্ষু দুইডা রাঙ্গা কর‌্যা হুঙ্‌কারিয়া কয়
“তবিয়াৎ আমার বুরা গর্বড় না সয়।
হাঁশিয়ার হয়ে থেকো নয় সর্বনাশ।”
সিতু মিঞা শুনে কয়, শাবাশ শাবাশ॥
হায়রে বিধির লেখা, হায়রে কিস্মৎ
জহর হইয়া গেল যা ছিল শর্বৎ।
ভোর না হইতে বীবী লয়ে পয়জার
মিঞার বুকেতে চড়ি কানে ধরি তার।
দমাদম মারে জুতো দাড়ি ছিঁড়ে কয়
“তবিয়ৎ তোমার বুরা, বরদাস্ত না হয়?
মেজাজ চড়েছে তব হয়েছ বজ্জাৎ?
শাবুদ করিব তোমা শুনে লও বাৎ
আজ হৈতে বেড়ে গেল রেশন তোমার
পঞ্চাশ হৈতে হৈল একশ’ পায়জার।”
এত বলি মারে কিল মারে কানে টান
ইয়াল্লা ফুকারে সিতু, ভাগো পুণ্যবান॥
কোথায় পাগড়ি গেল কোথায় পাজামা
হোঁচট খাইয়া পড়ে কভু দেয় হামা।
খুন ঝরে সর্ব অঙ্গে ছিঁড়ে গেছে দাড়ি।
ফিরোজ পৌঁছিল শেষে মতীনের বাড়ি।
কাঁদিয়া কহিল, “ভাইয়া কি দিলি দাওয়াই
লাগাইনু কামে এবে জান যায় তাই।”
বর্ণিল তাবৎ বাৎ, মতীন শুনিল
আদর করিয়া ভায়ে কোলে তুলি নিল।
বুলাইয়া হাত মাথে বুলাইয়া দেহ
“বিড়াল মেরেছ” কয়, “নাই তো সন্দেহ।
ব্যাকরণে তবু, দাদা, কৈলা ভুল খাঁটি।
বিলকুল বরবাদ সব গুড় হৈল মাটি।
আসল এলেমে তুমি করো নি খেয়াল
শাদীর পয়লা রাতে বধিবে বিড়াল।”
বাণীরে বন্দিয়া বান্দা বান্ধিলো বয়ান।
দীন সিতু মিঞা ভণে শুনে পুণ্যবান॥
* * *
মল্লিনাথস্য
স্বরাজ লাভের সাথে কালোবাজারীরে
মার নি এখন তাই কর হানো শিরে।
শাদীর পয়লা রাতে মারিবে বিড়াল
না হলে বর্বাদ সব, তাবৎ পয়মাল॥*
*ইরানে এ কাহিনী সবিস্তার বলা হয় না। শুধু বলা হয়, ‘গুরবে কুশতন, শব-ই আওওয়াল’। অর্থাৎ গুরবে = বিড়াল, কুশতন = মারা, শব = রাত্রি, আওওয়াল = =প্ৰথম। সোজা বাঙলায়, ‘পয়লা রাতেই মারবে বিড়াল।’
 
 
লিংক: https://draminbd.com/বাসর-রাতের-বিড়াল-বাসর-রাত/
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!