বাহরাইন (Bahrain) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাহরাইন (Bahrain)

বাহরাইন পারস্য উপসাগরের পশ্চিম অংশের ৩৬টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত মধ্যপ্রাচ্যের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। আরবীয় ভূমির মাত্র ২.৮২ ভাগ নিয়ে বাহরাইন গঠিত। যার মোট ভূমির ৯২ শতাংশ মরুভূমি। বাহরাইনের পূর্বে সৌদী আরব ও পশ্চিমে কাতার। সবচেয়ে বড় দ্বীপটিও বাহরাইন নামে পরিচিত। বাহরাইন নামক দ্বীপে বাহরাইনের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী মানামা অবস্থিত। এটি বিশ্বের তিনটি দেশের একটি, যেখানে শিয়া সংখ্যাঘরিষ্ট হলেও দেশ শাসন করে সুন্নি।

আরবি ‘বাহার’ শব্দের অর্থ সাগর। ‘বাহার’ থেকে ‘বাহরাইন’। বাহরাইন দ্বিবচন-বাচক শব্দ। সুতরাং ‘বাহরাইন’ শব্দের অর্থ দুটি সাগর। অনেকের মতে, ‘বাহরাইন’ নামের উৎপত্তি আল বাহরাইন হতে। আল বাহরাইন আরবি শব্দ। এর অর্থ দুটি পবিত্র সাগর। তবে কোন দুটি সাগর হতে এর উৎপত্তি সে নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। পবিত্র কোরআনে দুই-সাগর শব্দটি পাঁচ বার উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দুই সাগরের মাঝখানে যে জনপদ, সেটিই বাহরাইন। অনেকে মনে করেন, এ বিষয়ে সন্দেহ থাকার কোনো অবকাশ নেই। মূলত পূর্বসাগর ও পশ্চিম দ্বীপ কিংবা উত্তর সাগর ও দক্ষিণ দ্বীপ কিংবা লবণাক্ত ও মিষ্টি জলের মধ্যবর্তী ভূখ-টিই বাহরাইন। এ তিনটি সূত্রের যে কোনটি বিবেচনা করা হোক না কেন, বাহরাইন যে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দুই সমুদ্র নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সে ব্যাপারে তেমন সন্দেহ জাগে না।

বাহরাইনের মোট আয়তন ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার বা ২৯৫.৩৭ বর্গমাইল। দেশের ভেতর কোনো জলভাগ নেই বললেই চলে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের অনুমিত হিসাবমতে বাহরাইনের জনসংখ্যা ১৩,৪৩,০০০ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১,৬২৬.৬ জন। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, জিডিপি (পিপিপি) ৩৪.৯০৮ বিলিয়ন ডলার ও মাথাপিছু আয় ২৯,১৪৫ ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ২৯.০২৮ বিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ২৪,২৮১ ইউএস ডলার। আয়তন বিবেচনায় বাহরাইন পৃথিবীর ১৮৭-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় বাহরাইন পৃথিবীর ১৫৫-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ৭ম জনবহুল রাষ্ট্র। দেশটির এইচডিআই ০.৮১৫ (অতি উঁচু) এবং তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ৪৪-তম। বাহরাইনের মুদ্রার নাম বাহরাইনি দিনার এবং সরকারি ভাষা আরবি।

আরব উপদ্বীপে বাহরাইনে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম তেল আবিষ্কার হয়। এরপর বাহরাইন পারস্য উপসাগরের প্রথম তেল-ভিত্তিক অর্থনীতি গঠন করে, কিন্তু ১৯৮০ এর দশকের প্রারম্ভেই সব তেল নিঃশেষ হয়ে যায়। তবে দেশটি এ পরিবর্তনের কথা বিবেচনায় রেখে পূর্বেই অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করে রেখেছিল। ফলে দেশটির অর্থনীতি এখনও উন্নতি করে যাচ্ছে।

বাহরাইন প্রাচীনকাল হতে সমৃদ্ধ জনপদ হিসাবে পরিচিত ছিল। প্রায় ৫,০০০ বছর আগেও বাহরাইন একটি বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। ১৭শ শতকে এটি ইরানের দখলে আসে। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য সৌদি আরবের আল-খলিফা পরিবার নিজেদেরকে বাহরাইনের শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকে তারা দেশটিকে শাসন করে আসছে। ১৯শ শতকের চুক্তির ফলে যুক্তরাজ্য দেশটির প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব পায়। ১৯৭১খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত বাহরাইন ব্রিটিশের অধীনেই ছিল বলা যায়।

বাহরাইনের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি স্থানীয়। এখানে শিয়া মুসলিমদের সংখ্যা সুিন্ন মুসলিমদের প্রায় দ্বিগুণ। তবে সুন্নিরা বাহরাইনের সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। আরবি বাহরাইনের সরকারি ভাষা হলেও এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোতে ফার্সি, উর্দু এবং হিন্দি ভাষা প্রচলিত। বাহরাইনের ৯৯% মুসলমান। বাকী ১% মূলত ইহুদি ও খ্রিষ্ট ধর্মাবলবম্বী। মুসলমানদের মধ্যে প্রায় ৭০% শিয়া মতাবলম্বী। বাকিরা সুন্নি। অমুসলিম বিদেশিদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন মতাবলম্বী ছাাড়ও হিন্দু, বাহাই, বৌদ্ধ, শিখ, ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী আছে।

বাহরাইনে ১৫০০ জনের মতো ইহুদি রয়েছে। বাহরাইনের হাভা বিনতে রশিদ আল খালিফা মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম মহিলা, যিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ দেশের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকৃত। এখানে অনেকগুলো চার্চ রয়েছে। হিন্দু ও ইহুদিদের প্রার্থনাগৃহও রয়েছে। বাহরাইনি খ্রিষ্টান অ্যালিস থমাস সামান যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বাহরাইনি ইহুদি মহিলা হোওদা ইজরা ইব্রাহিম নোনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাহরাইনের অ্যামবেসাডর। তিনি হচ্ছেন অ্যামবেসাডরের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহরাইনের প্রথম ইহুদি মহিলা। হাভা হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশসমূহের প্রথম মহিলা অ্যামবেসাডর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত প্রথম মহিলা অ্যামবেসাডর।

কথিত হয়, বাইবেলে বর্ণিত এডেন গার্ডেন ছিল বাহরাইন। বাহরাইন সৌদি আরবের মূলভূমির সঙ্গে কিং ফাহদ কসওয়ে নামক সেতু দ্বারা যুক্ত। বাহরাইনে ৪০০ বছরের পুরানো একটি মেসকিট বৃক্ষ আছে। যেটি জীবনবৃক্ষ নামে পরিচিত। যা একাকী বাহরাইনের মরুভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এর আশেপাশে আর কোনো বৃক্ষ নেই। বিশ্বের আর কোথাও এমন বৃক্ষ দেখা যায় না। বাহরাইন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম আকাশচুম্বী ভবন, যেটির নকশায় উইন্ড টারবাইন রয়েছে।

বাহরাইন সরকার তার নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন এবং বৃদ্ধদের জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পেনশন প্রদান করে। আরব বিশ্বে অবস্থিত হলেও এটি অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের মতো অনুদার ও নৃশংস নয়। এখানে আছে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানুষের কথা বলার অধিকার। যা অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে নেই।বাহরাইনের পতাকায় বামপাশে লালরঙের মাথায় পাঁচটি সাদা ব্যান্ড আছে। এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ। ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমানে প্রচলিত পতাকাটি গ্রহণ করা হয়।

লিবিয়িা (Libya) : ইতিহাস ও নামকরণ

মাদাগাস্কার (Madagascar) : ইতিহাস ও নামকরণ

মালাউই (Malawi) : ইতিহাস ও নামকরণ

মালি (Mali) : ইতিহাস ও নামকরণ

 মৌরিতানিয়া (Mauritania) : ইতিহাস ও নামকরণ

মরক্কো (Morocco) : ইতিহাস ও নামকরণ

মরিশাস (Mauritius) : ইতিহাস ও নামকরণ

মোজাম্বিক (Mozambique): ইতিহাস ও নামকরণ

আফগানিস্তান (Afghanistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

আযারবাইজান (Azerbaijan) : ইতিহাস ও নামকরণ

এশিয়া মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র: কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!