বাড়ি: ঘরবাড়ি: বাসা ও বাড়ি: বাঙালির বাড়ি বাঙালির ঘর: আধুনিক বাড়ি প্রাচীন বাড়ি

 
বাড়ি-১
ভাষাবিদদের মতে ‘বাড়ি’ শব্দ এসেছে সংস্কৃত ‘ৱাটিকা’ বা ‘ৱাটি (উদ্যান) শব্দ থেকে। সুকুমার সেনের মতে শব্দটির মৌলিক মানে হলো বর্ষণসিক্ত ভূমি (সংস্কৃত ‘বার্ত’ থেকে)। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে শব্দটির ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করেছেন এইভাবে: সংস্কৃত. ৱাটিকা, ৱাটি > প্রাকৃত. ৱাড়িআ, ৱাড়ী > বাংলা. বাড়ী, বাড়ি। হিন্দিতে ‘বাড়ী’ মানে উদ্যান; মারাঠি, গুজরাটিতে ‘বাড়ী’ অর্থ ঘেরা জায়গা; মৈথিলিতে ‘বাড়ী’ মানে উদ্বাস্তু। তামিল ও তেলেগুতে শব্দটি হয়েছে ‘ৱিড়ু’। সাঁওতালি ভাষায় ‘অড়া’ শব্দের অর্থ বাড়ি। যেমন, রাউত = রাজপুত্র = পুলিশ প্রধান, তার বাড়ি = ‘রাওতড়া’।
 
‘বাড়ি’ শব্দটির অর্থ কালক্রমে পালটেছে: বেড়া দেওয়া ভূমি → বাগিচা সুদ্ধ বাড়ি → ভিটা সুদ্ধ বাড়ি → বসত বাড়ি, গৃহ, ঘর। শেষোক্ত বসত বাড়ি অর্থে এসেছে কাঁচা বাড়ি, পাকা বাড়ি, কোঠা বাড়ি, দালান বাড়ি, বাগান বাড়ি, বাড়িওয়ালা, বাড়িওয়ালি, বাড়িউলি, বাড়িঘর, ঘরবাড়ি, বাড়িমুখো ইত্যাদি শব্দগুলি।
 
‘দালান’/‘ইমারৎ’: কোঠা বাড়ি অর্থে ‘দালান’ এসেছে ফারসি থেকে; ‘ইমারৎ’ শব্দ এসেছে আরবি থেকে। দালান বাড়ি মানে ইট পাথর দিয়ে গাঁথা পাকা বাড়ি যাতে থাকে এক বা একাধিক ঘর। ‘ইমারতি দোকান’ মানে, পাকা বাড়ি তৈরির জন্য লোহালক্কড় ও অন্যান্য উপকরণ যে দোকানে বিক্রয় হয়। ‘দালান কোঠা’ বা ‘দালান বাড়ি’ হলো বড়ো আকারের পাকা বাড়ি বা অট্টালিকা। ‘দালান দেওয়া’ মানে পাকা ইমারত বা বাড়ি তৈরি করা।
 
‘খামার বাড়ি’: ‘খামার বাড়ি’ হলো খামার ও বসত বাড়ির সমাহার। শস্য মাড়াই করার ও রাখার স্থানকে বলা হয় খামার। খামার শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘স্কম্ভাগার’ থেকে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘খামার’ শব্দটিকে দেশি শব্দ বলে মনে করেন। বাঁশের খুঁটির উপর খড়ের ছাউনি দিয়ে চারচালা বা আটচালা ঘর ছিল খামারের আসল রূপ। পরে অর্থ বদলে হয়েছে – খোলা জায়গা যেখানে মাঠ থেকে তুলে ধান রাখা হয়। সেই জমির চার ধারে বেড়া বা পাঁচিলও থাকতে পারে। তারপর এই খামারে ধান ঝেড়ে তোলা হতো গোলা বা মরাইয়ে।
 
‘বাগান বাড়ি’: ‘বাগানবাড়ি’ মানে বাগানশোভিত বা বাগানসমন্বিত প্রমোদভবন। ঊনবিংশ শতকের বাঙালির বাবু কালচারেরএকটি বৈশিষ্ট্য। বাগান অর্থ উদ্যান, বাগিচা (ছোটো বাগান), উপবন। বাড়ির উঠানের এক পাশে বাঙালি ফুলের বাগান করত। শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘বাগ্‌হ্‌বান্‌’ থেকে যার মানে উদ্যানপাল বা মালি। জঙ্গল অর্থেও বাগান শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যে গোরু বাগায় বা বশে রাখে (রাখাল) তাকেও বাগান বা ‘বাগাল’ বলা হয়। ‘বাগান’ থেকে এসেছে ‘বাগানি’ অর্থাৎ উদ্যান রক্ষক।
 
‘দরদালান’: ঘরের সংলগ্ন ঘেরা বারান্দা বা বড়ো ঘর। ঘরগুলির সামনে যে লম্বা ও প্রশস্ত ‘corridor’ থাকে তাকে বলে ‘দরদালান’। এসেছে ফারসি ‘দর্ দালান্’ থেকে। মানে লম্বা, কোল ঘর।
 
‘ছাদ’: ছাদ সংস্কৃত শব্দ (সং. √ ছদ্ + ণিচ্ + অ)। দালানবাড়ি বা ইমারতের উপরিভাগ যে সূদৃঢ় কাঠামো দিয়ে ঢাকা থাকে, তাকে ছাদ বলে। ঘর-বাড়িকে বৃষ্টি, রোদ থেকে আড়াল করার জন্য ছাদের প্রয়োজন। সেকালে দালান বাড়ি তৈরি হতো চুন-সুরকির মসলা দিয়ে ইটের উপর ইট গেঁথে। থামাল (বাংলা. থাম + আল) বা খাড়া গাঁথনি তৈরি করা হতো ইটের উপর ইট গেঁথে বা মোটা কাঠ দিয়ে। ছাদ তৈরি করা হতো থামালের উপর কড়ি-বরগা পেতে, তার উপরে বিশেষ মাপের টালি সাজিয়ে এবং চুন-সুরকির ঢালাই দিয়ে। ‘আলিসা’ শব্দের অর্থ দালান বাড়ির ছাদের প্রান্ত, ছাদের প্রাচীর, কার্নিস।
 
‘জলছাদ’: দালানবাড়ির সর্বোচ্চ তলার ছাদের উপরে যে জলনিরোধক প্রলেপ দেওয়া হলে তাকে জলছাদ বলে। সাধারণত বিটুমেনের প্রলেপ দিয়ে ছাদকে জলনিরোধক করা হয়। চুন: সুরকি: খোয়া নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়েও জলছাদ করা যায়। অনেকে এর সাথে মেশায় চিটা গুড় ও মেথির জল। ঢালাই করে ভালো করে পেটাই করতে হয়।
 
‘কড়ি-বরগা’: কড়ি হলো ছাদের অবলম্বন স্বরূপ আড়কাঠ। বরগা হলো কড়ির উপরে স্থাপিত অপেক্ষাকৃত পাতলা ছোটো কাঠ বা লোহার পাত। বরগার পোড়া মাটির টালি পেতে তার উপর চুন-সুরকি মিশিয়ে ঢালাই করে ছাদ নির্মিত হয়। ‘কড়ি’ শব্দটি সাঁওতালি। ‘বরগা’ শব্দটি এসেছে পোর্তুগিজ শব্দ ‘verga’ থেকে।
 
বাড়ির অংশ বা মহল বোঝাতেও বাড়ি শব্দটির চল আছে, যেমন বার বাড়ি (বাহির বাড়ি), রান্না বাড়ি (বাড়ির যে অংশে রান্না করা হয়), সদর বাড়ি (বাড়ির বাইরের অংশ), কাছারি বাড়ি। ‘কাছারি বাড়ি’ মানে হলো বাদী প্রতিবাদীর বিবাদ মেটানোর স্থান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারালয়, দফতর, অফিস, জমিদারের নায়েবের কার্যালয়, জমিদারবাবুর কাছারি ঘর।
 
ক্ষেত অর্থেও ‘বাড়ি’ শব্দের প্রয়োগ আছে যেমন বেগুন বাড়ি (বেগুনের ক্ষেত), মুলো বাড়ি (মুলোর ক্ষেত)। ‘খেত বাড়ি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ক্ষেত্র বাটিকা’ থেকে। এই শব্দটির মূল অর্থ, ‘ভূমি’ আজও অক্ষুন্ন আছে।
 
বেড়া দেওয়া বা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা স্থান অর্থেও বাড়ি শব্দটির ব্যবহার আছে যেমন গোয়াল-বাড়ি (গোলাবাড়ি)। এর অর্থ যে বেড়া দেওয়া বা প্রাচীর দেওয়া স্থানে ধানের গোলা বা মরাই থাকে। উদ্যান অর্থে বাড়ি শব্দের প্রয়োগ: পুষ্প বাড়ি (ফুলের বাগান), নন্দন বাড়ি, বাগান বাড়ি ইত্যাদি।
 
দেউড়ি’ এর বাংলা অর্থ হলো – বাড়ির সদর প্রবেশ পথ, তোরণ, ফটক (দেউড়িতে পাহারাওয়ালা বসে আছে)। এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘দেহলী’ থেকে। দেউড়ি আর ফটক সমার্থক শব্দ।
‘ফটক’-এর মানে বাড়ির নির্গমন পথ বা প্রবেশ পথ , দরজা, দুয়ার, গেট, সিংহদ্বার, সদর দরজা, দরজার কপাট, প্রবেশের পথ। ফটক এসেছে হিন্দি ‘ফাটক’ শব্দ থেকে।
 
 পইঠা: ‘পইঠা’ হলো বাড়ির সিঁড়ি, সোপান, ধাপ। পইঠা এসেছে সংস্কৃত ‘প্রতিষ্ঠা’ শব্দ থেকে। ‘সিঁড়ি’ এসেছে সংস্কৃত ‘শ্রিণি বা শ্রেঢ়ী’ থেকে। ‘সোপান’ সংস্কৃত শব্দ (সহ + উপ + √অন্‌ + অ)।
 
আধুনিক বাড়ির থামাল, কড়ি, মেঝে ও ছাদ তৈরি হয় স্টিল, স্টোন চিপস, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে। চুন-সুরকির ব্যবহার আজকাল হয় না বললেই চলে।
 
সিমেন্ট: সিমেন্ট ইংরেজি শব্দ। পাকাবাড়ি তৈরির মসলা হিসাবে সিমেন্টের ব্যবহার শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকে – উনবিংশ শতাব্দীতে। আজকাল ধূসর রঙের পোর্টল্যান্ড সিমেন্টই বেশি ব্যবহৃত হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণে বিভিন্ন খনিজ মিশ্রিত করে সিমেন্ট তৈরি করা হয়। এই মিশ্রণটি 1450 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রোটারি ভাটায় পোড়ানো হয়। উত্তাপের কারণে উপাদানগুলি আংশিক ভাবে বল-এর আকারে পরিণত হয়, যেটি ক্লিঙ্কার নামে পরিচিত। ক্লিঙ্কার ঠান্ডা হলে তার সঙ্গে কিছু জিপসাম (2–3%) যুক্ত করা হয় এবং পেষাই করে সূক্ষ্ম গুঁড়ায় পরিবর্তিত করা হয়। ফলস্বরূপ যে পণ্যটি পাওয়া যায় সেটিই সিমেন্ট যা আজকাল বাড়ি বানাতে বালির সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন আর বাঙালি বাড়ি বানায় না, বাড়ি বানায় প্রোমোটার। আজকাল বাঙালি কেনে প্রোমোটারের বানানো বহুতল বাড়ির বেড-হল-কিচেন-বাথরুম-ব্যালকনি সহ ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট! আধুনিক বহুতল বাড়িতে সেকালের পৈঠা থাকে না, থাকে লিফ্ট।
 
আস্তানা: আস্তানা ফারসি শব্দ। আস্তানা মানে সাময়িক বাসস্থান, আড্ডা, আখড়া, আশ্রম, ফকিরের আস্তানা। আস্তানা গাড়া (সাময়িকভাবে কোথাও থাকতে শুরু করা) – ঠগ লোকরা লোককে ঠকাবার আগে কোথাও একটা আস্তানা গাড়ে। আস্তানা গুটানো মানে আড্ডা তুলে দেওয়া বা পাততাড়ি গুটানো।
 
বাসা: ‘বাড়ি’ ও ‘বাসা’ দুটিরই অর্থ বাসস্থান হলেও উভয় শব্দের আভিধানিক অর্থে কিছু পার্থক্য আছে। মানুষের ক্ষেত্রে যা বাসা তা বাড়ি হলেও, পাখিদের বাসস্থানকে শুধুই ‘বাসা’ বলা হয়। মানুষের জন্য বাসা হচ্ছে পৈতৃক ভিটা ছাড়া অন্য কোনও বাসস্থান। এই হিসেবে শুধু শহরের ভাড়া করা বাড়ি নয়, কেউ তার আদি নিবাস বা পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও বাসস্থান নির্মাণ করে বসবাস করলে সেটিও বাসা হয়ে যায়। আবার অভিধান অনুযায়ী বাড়ি হচ্ছে, আদি নিবাস, পৈতৃক বাসস্থান এবং নিজের বাড়ি। হয়তো এইজন্যই বাড়ির মালিক অন্যকে ভাড়া-দেওয়া বাসস্থানকে সাধারণত বাড়ি বলেন। তবে নিজে যে বাসস্থানে থাকেন সেটি নিজের হলেও সাধারণত ‘বাসা’ বলেন। বাস্তবিক পক্ষে, ‘বাসা’ ও ‘বাড়ি’র মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষ করা যায় না। এখানে যা বাসা, তাই বাড়ি। শহরের মানুষের বাসস্থানকে বলা হয় ‘বাসা’। আর এই বাসার ঠিকানা হলো ‘সাকিন’। আরবি শব্দ থেকে আসা ‘সাকিন’ শব্দটির অর্থ হলো নিবাস, বাসস্থান বা বাসার ঠিকানা।

error: Content is protected !!