বাড়ি: ঘরবাড়ি: বাসা ও বাড়ি: বাঙালির বাড়ি বাঙালির ঘর: আধুনিক বাড়ি প্রাচীন বাড়ি

বাড়ি-২
‘দরজা’: ঘরে ঢোকার জন্য এবং ঘর থেকে বের হবার জন্য থাকে ‘দরজা’। দরজা এসেছে ফারসি থেকে – ফারসি, ‘দর্‌ওয়াজহ্‌’ > বাংলা, দরওয়াজা, দরজা। দরজা তৈরি হয় কাঠ দিয়ে। কাঠ দুর্লভ হওয়ায় আজকাল ধাতুর তৈরি এবং প্লাস্টিকের তৈরি দরজাও ব্যবহৃত হচ্ছে।
‘জানালা’: ঘরে আলো-বাতাস খেলার জন্য থাকে ‘জানালা’। জানালা এসেছে পোর্তুগিজ থেকে – পোর্তুগিজ ‘janella’ > বাংলা. জানালা, জালনা। সেকালে দরজা-জানালা তৈরি হতো কাঠ দিয়ে, আজকাল বানানো হয় লোহা বা অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমে কাচ লাগিয়ে। নিরাপত্তার খাতিরে জানালায় লাগানো থাকে লোহার গ্রিল।
 
‘তালা’: ‘তালা’ এসেছে সংস্কৃত ‘তালক’ থেকে। দরজা-জানালা-বাক্স-সিন্দুক ইত্যাদি আটকাবার যন্ত্র হলো তালা, কুলুপ। ‘কুলুপ’ এসেছে আরবি ‘কুফ্‌ল’ থেকে, ধ্বনি বিপর্যয়ের ফলে তার এমন চেহারা হয়েছে।
 
‘চাবি’: ‘চাবি’ এসেছে পোর্তুগিজ ‘chave’ থেকে। তালা বন্ধ করা বা খোলার ধাতব শলাকা হলো চাবি।
 
‘ছিটকিনি’: এসেছে হিন্দি ‘সিটকিনী’ থেকে। দরজা-জানালা-আলমারি ইত্যাদি বন্ধ করার ছোটো হুক বা হুড়কা বা অর্গল। দরজা-জানলার খিল বা ছিটকিনিকে ‘হুড়কা’ও বলে। হুড়কা দেশি শব্দ। হুড়কাকে আরবিতে বলে ‘তসলা’। ‘খিল’ এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘কীলক’ থেকে।
 
‘ঘুলঘুলি’: এটি দেশি শব্দ। রাতে যখন দরজা-জানালা বন্ধ থাকে তখন কার্বনডাইঅক্সাইড বের হবার জন্য এবং ঘরে বাতাসের অক্সিজেন ঢোকার জন্য দেওয়ালের উপর দিকে রাখা ছোটো-বড়ো ছিদ্রকে বলা হয় ‘ঘুলঘুলি’। আজকালের ফ্ল্যাট বাড়িতে ঘুলঘুলি থাকে না।
 
‘চৌকাঠ’: চৌকাঠ হলো চার টুকরো কাঠ জুড়ে তৈরি দরজার বা জানালার ফ্রেমের কাঠ যাতে কবজা দিয়ে দরজার পাল্লা লাগানো হয়। চৌকাঠের একটি সংস্কৃত প্রতিশব্দ হলো ‘দেহলি’ (সং. দেহ + √লা + ই)। দরজার চৌকাঠের নিচের কাঠকে বলা হয় ‘গোবরাট’। গোবরাট অর্থে চৌকাঠ শব্দটিও ব্যবহৃত হয়। ‘গোবরাট’ দেশি শব্দ। আপাত দৃষ্টিতে চৌকাঠ গৃহস্থ বাড়িতে অত্যন্ত মামুলি একটি জিনিস যা দরজার ফ্রেমের নিচে নিরীহ ভাবে পড়ে থাকে। আমাদের ছোটোবেলায় ঘরে ঘরে দরজায় দরজায় চৌকাঠ ছিল। মা-ঠাকুরমার বিশ্বাস ছিল, চৌকাঠে পা রাখতে হয় না। ওটা আলগোছে ডিঙিয়ে যেতে হয়, কেননা চৌকাঠে মা-লক্ষ্মী থাকেন। আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িগুলিতে আজকাল সাধারণত চৌকাঠ রাখা হয় না।
 
‘বারান্দা’: মানে ঘরের সংলগ্ন কিন্তু ঘরের বাইরের চালযুক্ত বা চালবিহীন চত্বর। শব্দটি সম্ভবত বাংলায় এসে থাকবে ফারসি ‘বরাম্‌দা’ অথবা পোর্তুগিজ ‘varanda’ শব্দ থেকে। বাঙালির ফ্ল্যাটের এক চিলতে বারান্দাকে বাঙালি আজকাল ‘ব্যালকনি’ (balcony) বলতে পছন্দ করে। ‘ঝুল-বারান্দা’ এর বাংলা অর্থ হলো – বাড়ির উপর তলার যে বারান্দা রাস্তার দিকে ঝুলে থাকে (বাংলা. ঝুল + পোর্তুগিজ. varanda)। ঝুল বারান্দার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ব্যালকনি।
 
‘দাওয়া’: দাওয়া দেশি শব্দ। অনেকে মনে করেন শব্দটি হিন্দি ‘ঢাবা’ বা সংস্কৃত ‘দার্বট’ থেকে এসেছে। দাওয়া শব্দের অর্থ বারান্দা, রোয়াক। ঘর সংলগ্ন চালবিহীন চত্বরকে সাধারণত ‘দাওয়া’ বলা হয়। যেমন ‘দাওয়ায় বসে হাওয়া খায়’। ইংরেজিতে এর নাম টেরাস (terrace)। দাওয়ায় উঠার সিঁড়িকে বলে ‘পৈঠা’। আধুনিক বাঙালির ছাদহীন দাওয়াকে টেরাস বলাই এখন বাঙালির স্ট্যাটাস। আর ফ্ল্যাটবাড়িতে ছাদহীন দাওয়া লাগোয়া থাকলে সেই ফ্ল্যাট বাড়ি হয়ে যায় ‘পেন্ট হাউস’। এটাও এখনকার ধনকুবের বাঙালির স্ট্যাটাস সিম্বল!
 
‘রোয়াক’: ‘রোয়াক’ বা ‘রক’ মানে বাড়ির সামনের, বাড়ি সংলগ্ন নয়, চালহীন খোলা চাতাল। যেমন, রকে বসে আড্ডা মারা। তুর্কি শব্দ ‘রওয়াক’ বা আরবি শব্দ ‘রিওআক’ থেকে সম্ভবত ‘রোয়াক, রক’ শব্দ এসেছে। এর থেকে বাংলায় এসেছে ‘রকবাজ’, ‘রকবাজি’ শব্দ দুটি। ‘রকবাজ’ মানে রোয়াকে বা রকে বসে সচরাচর বাজে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে অভ্যস্ত এমন ব্যক্তি। ‘রকবাজি’ মানে ওই রকম বাজে আড্ডা দেওয়ার অভ্যাস।
 
‘চাতাল’: ‘চাতাল’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘চত্বর’ থেকে। চাতাল ও ‘রোয়াক’ সমার্থক। চাতাল মানে পাথর বা সিমেন্টে বাঁধানো খোলা উঁচু জায়গা যেখানে বসে বাঙালি আড্ডা মারে।
 
‘আখড়া’: আখড়া শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অক্ষবাট’ শব্দ থেকে যার অর্থ জুয়া খেলার স্থান। সংস্কৃত. অক্ষবাট > প্রাকৃত. অক্‌খআড > বাংলা. আখাড়, আকড়া, আখড়া। হিন্দিতে ‘আখাড়া’; অসমিয়াতে ‘আখরা’। আখড়া শব্দটির মানে বৈষ্ণবদের আশ্রম বা মল্লক্রীড়ার স্থান। স্বভাবতই তার অবস্থান হতো গ্রামের বাইরে। ব্যায়াম, গানবাজনা, মল্লযুদ্ধ বা অভিনয়ের মহড়ার স্থান হিসাবেও কথাটির চল আছে। ‘আখড়াই’ হলো অভিনয়ের মহলা, মহড়া বা রিহার্সাল। ‘আখড়াধারী’ হলো আখড়া বা মঠের অধ্যক্ষ। হিন্দিতেও ‘আখড়া’ শব্দটি চালু আছে।
 
‘খিড়কি’: ‘খিড়কি’ মানে বাড়ির পিছনের দরজা বা পাছ-দোর’ বা ‘ছোটো দুয়ার’। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত. ‘খড়ক্কিকা, খড়ক্কী’ শব্দ থেকে। হিন্দি ও মারাঠিতে ‘খিড়কী’; ঢাকাই বাংলা ‘খড়কি’। ‘খিড়কি পুকুর’ মানে বাড়ির পিছন দিকের পুকুর, মেয়েরা যেখানে বাসন মাজে ও কাপড় কাচে। ‘খিড়কি-দুয়ার’ মানে পাছ-দোর, ‘খিড়কিদার পাগড়ি’ মানে যে পাগড়ির উপরে কোনও স্থান খোলা থাকে। ‘বাহির খিড়কি’ মানে সদর-দরজা।
 
‘আঁস্তাকুড়’: আঁস্তাকুড় দেশি শব্দ – আঁস্তা ও কুড় মিলে শব্দটি তৈরি হয়েছে। সমার্থক শব্দ ‘আদাড়’। উচ্ছিষ্ট বা আবর্জনা ফেলার স্থান। ‘আঁস্তা’ মানে আমিষ। এসেছে আঁস থেকে। গৃহস্ত বাড়ির আমিষ আবর্জনা হলো আঁস্তা। গেরস্তের আরেক রকমের আবর্জনা হলো ওঁচলা/ওঁৎলা। ‘ওঁচলা’ হলো নিরামিষ আবর্জনা। আর উঠান ঝেঁটিয়ে যে ঘাস-পাতা, ধুলো-বালি জড়ো করা হয় তাকে বলে ‘ওঁৎলা’। ‘কুড়’ মানে ঢিপি, স্তুপ। বাংলা কুড়, প্রাকৃত ‘কুড’ আর সংস্কৃত ‘কুট’ একই কথা। বাড়ির সব আঁস্তা/ওঁচলা/ওঁৎলা আবর্জনা বাড়ির বাইরের যে ফাঁকা জমির উপর রোজ একই জায়গায় ফেলা হয় তা হলো কুড়। কুড়েতে রোজকার আঁস্তা/ওঁচলা/ওঁৎলা ফেলার ফলে ময়লার একটি উঁচু ঢিপি তৈরি হয়। আঁস্তার ঢিপিই হলো আঁস্তার কুড় → আঁস্তাকুড়।
 
‘আঁস্তাকুড়ের পাতা’ মানে ফেলনা এঁটো পাতা; হেয় ব্যক্তি। ‘আঁস্তাকুড়ের পাতা কখনো স্বর্গে যায় না’ অর্থাৎ নীচ কখনও উচ্চ সমাজে উঠতে পারে না। (তথ্যঋণ: ইউসুফ খান)।
 
‘আদাড় পাদাড়’: ‘আদাড়-পাদাড়’ সাঁওতালি শব্দ। ‘আদাড়’ এর অর্থ – আবর্জনা বা নোংরা জিনিস ফেলার জায়গা, আঁস্তাকুড়। ‘আদাড়-পাদাড়’ মানে বাড়ির পিছনের আবর্জনা পূর্ণ নোংরা জায়গা। ‘কেন তখন থেকে আদাড়ে-পাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?’ সুকুমার সেনের মতে, বাড়ির পিছনের অংশে বাগান না থাকলে, পতিত জমি হলে, চলবার রাস্তা থাকে না, কোনো রকমে পায়ে চলা যায়। অর্থাৎ ‘পাঁদাড়’ হল পায়ে চলার রাস্তা আছে এমন ধরনের পতিত জমি অর্থাৎ খিড়কি পথ। ‘আঁদাড়’ মানে যেখানে পায়ে চলার কোনো রকম রাস্তা নেই। বাংলা ‘আঁদাড় পাঁদাড়’ এই যুগ্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অ-দণ্ড পাদ-দণ্ড’ থেকে। দেশি শব্দের কষ্টকল্পিত সংস্কৃত ভিত্তিক ব্যুৎপত্তি নির্ণয়!
 
কোঠা
ইটের অথবা পাথরের ঘরের নাম ‘কোঠা’ (কোটা)। বড়ো পাকা বাড়ি বা অট্টালিকা বোঝাতেও কোঠা শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যেমন দালানকোঠা। কোঠা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কোষ্ঠ’ থেকে। সংস্কৃত. কোষ্ঠ > প্রাকৃত. কুট্‌ঠ, কোট্‌ঠ > বাংলা. কোট, কোঠ, কোঠা। এর মানে পাকাবাড়ি বা ইট দিয়ে নির্মিত নিবিড়ভাবে আবদ্ধ এক-দ্বার কক্ষ। আগে কোঠাঘরের ছাতও কাঁচা বাড়ির চালের মতো ঢালু হতো। প্রাচীন বাংলায় পূজার মণ্ডপ তৈরি করা হতো ইট-পাথর গেঁথে (পুজোর দালান), কিন্তু মানুষের বাসগৃহ ছিল কাঁচা।
সুকুমার সেনের মতে, দেবমন্দির ও কোষাগার ছাড়া কোঠাঘরের ব্যবহার মুসলমান অধিকারের আগে ছিল না। পোর্তুগিজ, দিনেমার, ইংরেজ প্রভৃতি বিদেশি বণিকদের আগমনের পরই বঙ্গদেশে সাধারণ লোকের ইটের ঘর করার প্রবণতা বেড়ে যায়। ঘরে জানালা লাগাবার রীতিও এই সময় থেকেই চালু হয়।
 
‘দালানকোঠা’ হলো বড়ো আকারের পাকা বাড়ি বা অট্টালিকা। ‘চিলেকোঠা’ হল ছাদের উপরের সিঁড়িসংলগ্ন ছোটো ঘর। ‘চিলে’ শব্দটি এসেছে ‘চিলতা’ বা তার কথ্য রূপ ‘চিলা’ থেকে। ছাদের ওপরের এক চিলতে সরু ঘরকেই বলে চিলেকোঠা। চিলেকোঠার সংস্কৃত নাম হলো বলভি, বলভী [সং. √ বল্ (আচ্ছাদন) + অভি, ঈ]।
 
‘কোট’ বা ‘কোঠ’ শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয় সুরক্ষিত কক্ষ বা দুর্গ অর্থে। শহর বা নগরের নামেও ‘কোট’ শব্দটির ব্যবহার আছে, যেমন শিয়ালকোট, পাঠানকোট, মঙ্গলকোট ইত্যাদি।
 
‘কুঠি’ হলো ‘কোঠা’ শব্দের খর্ব রূপ অর্থাৎ ছোটো কোঠা। এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘কোষ্ঠিকা’ থেকে। ইংরেজরা আসার পরে ওদের কার্যালয় বা বাসস্থান হিসাবে শব্দটি প্রচলিত হয়। যেমন নীলকুঠি, রেশমকুঠি, কালেক্টরের কুঠি, ম্যাজিস্ট্রেটের কুঠি। কুঠির মালিককে বলা হতো ‘কুঠিয়াল’।
 
কোঠা থেকে আরও কিছু শব্দ বাংলাভাষায় এসেছে। ‘কোঠার’ (মধ্য বাংলা) এসেছে ‘কোষ্ঠাগার’ থেকে, অর্থ কারাকক্ষ। ‘কুঠুরি’ হলো ‘কোঠার’ শব্দের খর্ব রূপ, মানে ছোটো কোঠা। যেমন ‘চোর-কুঠুরি’ – মানে চোর থেকে জিনিস রক্ষা করার নিমিত্ত তৈরি সুরক্ষিত কক্ষ। ‘কোটাল’ শব্দটি বাংলায় এসেছে ‘কোষ্ঠ পাল’ থেকে, যার মানে কারারক্ষী, খাজনা-খানার প্রহরী।
 
প্রাচীন বাংলায় কোঠাবাড়ি বা পাকাবাড়ি বানানোর উপাদানগুলি ছিল ইট, চুন, সুরকি। ইট গাঁথা হতো চুন-সুরকি-জলের মিশ্রণ দিয়ে। এখন ইট গাঁথা হয় বালি-সিমেন্ট-জল মিশ্রণ দিয়ে।
 
ইট: তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘ইষ্টক’ থেকে। সংস্কৃত. ইষ্টক > প্রাকৃত. ইট্টা > বাংলা. ইট। পাকা ঘর বাড়ি ইত্যাদি তৈরি করার জন্য পোড়া মাটির পিণ্ড বিশেষ; ইষ্টক। আঠালো মাটির সঙ্গে খড়কুটো, তুষ প্রভৃতি মিশিয়ে কাদামাটি প্রস্তুত করা হয়। নরম কাদা-মাটিকে নির্দিষ্ট আকারের ছাঁচে ঢেলে কাঁচা ইট তৈরি হয়, তারপর এক রোদে শুকানো হয়। কাঁচা ইটকে আগুনে পোড়ালে পাকা ইট তৈরি হয়। বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়ানো ইট ব্যবহার হয়ে আসছে। যদিও ইট পাথরের মত দীর্ঘস্থায়ী এবং মজবুত নয়; তারপরও সহজলভ্যতা, অল্প খরচ এবং স্বল্প ওজনের জন্য এর জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহার সর্বাধিক।
 
‘ঝামা ইট’: ইট বানানোর সময় কিছু ইট বেশি পুড়ে যায় ও কেকের মত ফুলে উঠে এক ফোপড়া শক্ত কালচে খয়েরি রঙের আঁকা-বাঁকা আকৃতির ইট তৈরি করে, যাকে বলে ঝামা বা ‘ঝামা ইট’। ঝামা শক্ত ও এবড়ো খেবড়ো বলে ঘষামাজার কাজে ব্যবহৃত হয়। ‘ঝামা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ঝামক’ শব্দ থেকে।
 
‘ইটভাঁটা’ বা ‘ইটখোলা’ হলো যে জায়গায় মাটি কেটে ছাঁচে ফেলা হয় ও সেই পিণ্ড কাঠ পুড়িয়ে, বা কখনো কয়লা জ্বালিয়ে শক্ত ইট তৈরি হয়। ভাঁটি বা ভাঁটা দেশি শব্দ যার অর্থ ইট, মাটির পাত্র, চুনাপাথর ইত্যাদি পোড়ানো ও শুকানোর জন্য ব্যবহৃত বড়ো চুল্লি।
 
‘ইটপাটকেল’ মানে পুরো ইট ও টুকরো ইট, ইট ও তার টুকরো। ‘ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়’ – এর অর্থ কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে বিনিময়ে দুর্ব্যবহার পেতেও হয় অর্থাৎ যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাঙা ইটের মতো লাল রঙকে বলে ‘পাটকেলি রং’। ‘ইটের পাঁজা’ হলো পোড়াবার জন্য রাখা ইটের স্তূপ বা পোড়ানো ইটের স্তূপ।
 
‘টেরাকোটা’: মানুষের ব্যবহার্য পোড়া মাটির তৈরি সকল রকমের দ্রব্য টেরাকোটা নামে পরিচিত, সেই অর্থে ইটও টেরাকোটার অন্তর্ভুক্ত। টেরাকোটা একটি লাতিন শব্দ: ‘টেরা’ অর্থ মাটি, আর ‘কোটা’ অর্থ পোড়ানো। ভারতবর্ষের সিন্ধু নদীর তীরে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ বৎসর বা তারও আগে বিকশিত সিন্ধু সভ্যতায় প্রচুর টেরাকোটার ইট ও অন্যান্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে মৌর্য সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্যের বহু টেরাকোটার নিদর্শন পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহর টেরাকোটা ইটে তৈরি মন্দির ও টেরাকোটা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের দিকে বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে বিকশিত সভ্যতায় টেরাকোটার নমুনা পাওয়া গেছে। এই বিচারে বলা হয়, বহু আগে থেকেই বাংলাদেশের শিল্পীরা টেরাকোটা তৈরির কৌশল শিখেছিল।
 
সুরকি: ইটের গুঁড়াকে বলে সুরকি। এসেছে ফারসি শব্দ ‘সুর্‌খী’ থেকে। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইট ভেঙে সুরকি বানানোর কৌশলও পালটেছে। একসময় হাতে ভাঙা ইটের সুরকির ব্যাপক প্রচলন থাকলেও আধুনিক কালে এই পদ্ধতিটি সেকেলে হয়ে গেছে। বর্তমানে মেশিনের সাহায্যে ইট ভেঙে সুরকি তৈরি করা হয়। তবে গাঁথনির কাজে আজকাল চুন-সুরকির বদলে বালি-সিমেন্ট বেশি ব্যবহৃত হয়।
 
চুন: পাথর, শামুক, ঝিনুক, কড়ি, গেরি প্রভৃতি পুড়িয়ে বা চুনাপাথর (লাইমস্টোন) থেকে যে সাদা ক্ষার পাওয়া যায় তাকে চুন বলা হয়। চুন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘চূর্ণ’ থেকে। হিন্দিতে চুনকে বলা হয় ‘চূণা’। এই চুন সুরকির সাথে জল দিয়ে মিশিয়ে ইটের গাঁথনি গাঁথা হয়। ‘মুখ চুন হয়ে যাওয়া’ মানে বিবর্ণ, ফ্যাকাশে, পাংশু মুখ। ‘চুনকাম’ মানে দেওয়ালে চুন-গোলা জলের প্রলেপ লাগানো (বাড়ি চুনকাম করা)। ‘চুনকালি’ অর্থ কলঙ্ক (মুখে চুনকালি দেওয়া)।
 
চুন-এর সঙ্গে ভাতের জাউ মিশিয়ে তাকে আধুনিক সিমেন্টের মতো ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল সুবিখ্যাত চীনের প্রাচীর যা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিক ঝড়ঝাপটা সয়ে আজও টিকে আছে।
 
কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী বিভাগের উপদেশ মতো। ১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই ভবন তৈরি করেছিল। ভবনের মূল প্রকৌশলী ছিলেন থমাস লেয়ন। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরানো এই ভবন নির্মাণে কোনো সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি। ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল গুঁড়া চুন, মার্বেল পাথরের গুঁড়া, ইট ও বালি। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিল গোবর। আগে যেসব উপকরণ দিয়ে বিল্ডিংটি নির্মিতি হয়েছিল সেসব উপকরণ ব্যবহার করেই ভবনটির পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে।
আঁজি : এই শব্দটির অর্থ রেখা; ডোরা দাগ; দালানবাড়ি তৈরির সময় সাজানো ইটের সন্ধিস্থলে রেখার আকারে চুন-সুরকির বা সিমেন্ট-বালির প্রলেপের রেখা। ‘আঁজি ধরানো’ মানে ইটের সন্ধিস্থলে চুন-সুরকি বা বালি-সিমেন্টের প্রলেপ জমানো, ইংরেজিতে যাকে বলে পয়েন্টিং (pointing)।
 
 
প্রয়োজনীয় কিছু লিংক

error: Content is protected !!