বিন্দুবিসর্গ বাহন বাহিনী বানচাল বদ্ধপরিকর বরদা বশংবদ ও বসুমতী

ড. মোহাম্মদ আমীন

বিন্দুবিসর্গ
শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ অতিসামান্য অংশ, আভাসমাত্র প্রভৃতি। ‘বিন্দু’ ও ‘বিসর্গ’ শব্দের সমন্বয়ে ‘বিন্দুবিসর্গ’ বাগ্ভঙ্গির উৎপত্তি। বিন্দু সাধারণত ইংরেজি ফুলস্টপের ন্যায় একটি চি‎হ্ন। গাণিতিক ভাষায় বিন্দু এমন একটি প্রত্যয় যার অবস্থান আছে, কিন্তু কোনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নেই। তবে বিন্দুবিসর্গ শব্দের বিন্দু বলতে অনুস্বার বোঝানো হয়। বাংলা বর্ণমালার শেষ দুটি অক্ষর যথাক্রমে অনুস্বার (ং) ও বিসর্গ (ঃ) বর্ণদ্বয় ‘বিন্দুবিসর্গ’ শব্দের প্রতিভূ। বিন্দু বলতে কোনো ছোট বা সামান্য জিনিসকে বোঝানো হয়। বিন্দু বা অনুস্বারের পাশে অবস্থিত বিসর্গ দুটো বিন্দুর একটি কলাম। এটিও ক্ষুদ্র কিছু প্রকাশে ব্যবহার করা হয়। এ কারণে ‘বিন্দুবিসর্গ’ শব্দটি বাংলা ভাষায় ‘অতিসামান্য কোনো বিষয়’ প্রকাশে একটি উত্তম সংযোজন।
 
বাহন
যে বহন করে সে বাহন। প্রায় প্রত্যেক দেবতারই কোনো না কোনো জীবজন্তু বাহনরূপে আছে। যেমন ব্রহ্মার হংস, বিষ্ণুর গরুড়, শিবের বৃষ, ইন্দ্রের ঐরাবত ও মেষ, যমের মহিষ, কার্তিকেয়ের ময়ূর, কামদেবের মকর বা টিয়াপাখি, অগ্নির ছাগ, বরুণের মৎস্য, গণেশের ইঁদুর, বায়ুর হরিণ, শনির গৃধ্র, দুর্গার সিংহ, লক্ষ্মীর প্যাঁচা, সরস্বতীর হংস, ষষ্ঠীর বিড়াল, বিশ্বকর্মার হাতি, শীতলার গর্দভ এবং নারদের ঢেঁকি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত বাহন (বাহি+অন) অর্থ (বিশেষ্যে) যা দিয়ে বহন করা হয়, অশ্ব, শিবিকা, রথ প্রভৃতি; যাতে চড়ে যাওয়া যায় (যানবাহন); মাধ্যম, অনুচর, স্তাবক। 
 
বাহিনী
বাহিনী  একটি অতি প্রাচীন শব্দ। ভারতীয় পুরাণে শব্দটি নানা জায়গায় পাওয়া যায়। ‘বাহ’ শব্দ থেকে ‘বাহিনী’ শব্দের উৎপত্তি। বাহ শব্দের অর্থ অশ্ব এবং বাহিনী শব্দের অর্থ অশ্ব বা ঘোড়া যার প্রধান সেনাঙ্গ। এ বিবেচনায় বলা যায়, যে দলে অশ্বারোহী সৈন্যরা মুখ্য ভূমিকা পালন করে, সেটাই বাহিনী। তবে বাহিনীতে প্রাচীনকালে বিদ্যমান সব প্রকৃতির সেনার সমাবেশ ছিল। একসময় গাড়ি ছিল না। দ্রুতগামী ছিল বলে অশ্বই গাড়ির ভূমিকা পালন করত। বিমানও ছিল না। আরও প্রাচীনকালে নৌ-সামরিক দপ্তরের ভূমিকাও ছিল অতি নগণ্য। মূলত অশ্বারোহী বাহিনীই দেশের সামরিক ব্যবস্থাপনার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করত। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাহিনী (বাহ+ইন্‌+ঈ) অর্থ (বিশেষ্যে) সৈন্যদল। পৌরাণিক ৮১টি হাতি, ৮১টি রথ, ২৪৩টি ঘোড়া এবং ৪০৫ জন পদাতিক নিয়ে গঠিত সেনাসমাবেশকে বলা হয় বাহিনী। বর্ণিত সংখ্যক সেনাসমাবেশ ছিল আদর্শ সমাবেশ। তাই শব্দটি সামরিক সমাবেশের প্রতিশব্দ হিসেবে স্থান পেয়ে যায়। বাহিনী(বাহ+ইন্‌+ঈ) শব্দের আর একটি ভুক্তি আছে। তার অর্থ প্রবাহিণী, নদী।
বানচাল
‘বানচাল’ শব্দটির আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ: ভণ্ডুল, ফেঁসে যাওয়া, ভেস্তে যাওয়া প্রভৃতি। ‘বান’ ও ‘চাল’ শব্দের সমন্বয়ে ‘বানচাল’। ‘বানচাল’ শব্দের মূল অর্থ নৌকার তক্তার জোড় ফাঁক বা আলগা হয়ে যাওয়া। নৌকা তৈরি করার সময় এক তক্তার সঙ্গে আর একটি তক্তাকে জোড়া দেওয়ার জন্য যে খাঁজ কাটা হয় তাকে বলা হয় ‘বান’। ‘চাল’ শব্দের অর্থ: ঢিলা হওয়া। সুতরাং ‘বানচাল’ অর্থ তক্তাকে জোড়া দেওয়ার জন্য যে খাঁজ কাটা হয় সেটি ঢিলে হয়ে যাওয়া। বানচাল হলে নৌকা অকেজো হয়ে যায়। আর নদীর মাঝখানে যদি এমন ঘটনা ঘটে তো নৌকা ডুবে সহায়সম্পদ ও জানমালের প্রচুর হানি হতে পারে। তখন মাঝ-নদীতে নৌকার মাঝিমাল্লাসহ যাঁরা থাকেন তাঁরা সবাই ফেঁসে যান, শধু তাঁরা নন, নৌকা ডুবে যাওয়ায় নৌকার মালিকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। যে উদ্দেশ্যে নৌকার যাত্রা সে উদ্দেশ্যও ভণ্ডুল হয়ে যায়। সুতরাং দেখা যায়, বানচাল হলে অনেকের আশা-ভরসা ভণ্ডুল হয়ে যায়। অনেকে ফেঁসে যায় বিভিন্ন কারণে। ভেস্তে যায় অনেক কিছু। তাই নৌকার ‘বানচাল’ কথায় এসে যে-অর্থ ধারণ করেছে তা যেমন যৌক্তিক তেমনি প্রায়োগিক।
 
বদ্ধপরিকর
‘বদ্ধপরিকর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দৃঢ়সংকল্প, কঠোর প্রতিজ্ঞা, ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘বদ্ধ’ ও ‘পরিকর’ শব্দ হতে বদ্ধপরিকর শব্দের উৎপত্তি। বদ্ধ শব্দের অর্থ বাঁধা আর পরিকর শব্দের অর্থকাপড়। সুতরাং বদ্ধপরিকর শব্দের অর্থ কাপড় বাঁধা। কিন্তু সংস্কৃতজাত কাপড় বাঁধা বাংলায় এসে ‘দৃঢ়সংকল্প’ অর্থ ধারণ করেছে। মানুষ কাপড় পরে কাজ করে, তবে কাপড় না-বেঁধে কেউ কাজ করতে পারে না। কাজ যত শ্রমসাধ্য, কঠিন ও বড়ো হবে কাপড় বাঁধার প্রকৃতিই তত শক্ত হওয়া আবশ্যক। তাছাড়া কাপড় শক্ত করে না-বাঁধলে খুলে পড়ার সম্ভাবনা আছে। কৃষক, শ্রমিক প্রমুখ কাজ শুরু করার আগে এমন শক্তভাবে কাপড়কে বেঁধে নেয় যাতে পড়ে না যায়।  কাজের মাঝখানে কাপড় পড়ে গেলে কাজের ব্যাঘাত ঘটবে। পর্বতারোহী, ডুবুরি থেকে শুরু করে সবাই কাজ শুরুর আগে শক্ত করে কাপড় বাঁধে। এ কাপড় বাঁধার ওপর কাজের ধরন, প্রকৃতি ও ইচ্ছা নির্ভরশীল। কেউ চায় না কাজের মাঝখানে বাধাগ্রস্ত হোক। ইদানীং মেয়েরাও পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করছে। তাদের ক্ষেত্রে কাপড়কে শক্ত করে বাঁধা আরও বেশি প্রয়োজন। কাপড় বেঁধে কাজ করতে হয়। ‘কাপড় বাঁধা’ কাজের ইচ্ছা, সংকল্প, অধ্যবসায় ও কঠোরতার ইঙ্গিত। অধিকন্তু, কাজের মাঝে কাপড় খুলে গেলে কাজ বন্ধ করে হলেও; যে-কোনো মূল্যে কাপড়ের পতনকে রোধ করা হয়। তাই সংস্কৃত দৃঢ়সংকল্প বাংলায় কাপড় বাঁধা অর্থ ধারণ করেছে।
 
বরদা
বর + দাতা থেকে বরদাতা এবং বরদাতা থেকে বরদা। যিনি বর দান করেন তিনি বরদা। ভারতীয় পুরাণে বরদা নামের একজন দেবী আছেন। সরস্বতীকেও ‘বরদা’ বলা হয়। কারণ তিনি তাঁর ভক্তদের বর দেন।
 
বশংবদ
‘বশংবদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অনুগত, অধীন, হুকুমের আওতায়, বশবর্তী প্রভৃতি। বশংবদ সংস্কৃত শব্দ। এর আদি ও মূল অর্থ দ্বারা এমন আচরণের ব্যক্তিকে নির্দেশ করত ‘যিনি বলেন আমি নিশ্চিত বশ’। মূলত যে পূর্ব থেকে অন্যের বশে বা অধীনে বা অনুগত হওয়ার নিশ্চিত ঘোষণা দিয়ে বসে আছে, সেই ‘বশংবদ’। বাংলায় শব্দটির অর্থ-পরিবর্তন হয়নি। কারণ যিনি অনুগত, অধীন তিনিই বশংবদ। তবে এককালে সম্মানিত ব্যক্তি ও মুরব্বিদের চিঠি লেখার সময় চিঠির শেষে, প্রেরক সম্মান বা কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ ‘বশংবদ’ লিখত। পুরনো ব্যক্তিগত পত্রে এটি দেখা যায়। এখন কিন্তু সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ শাব্দিক অর্থে দৃশ্যত বশংবদ লেখা না-হলেও চিঠিপত্রে কিন্তু বশংবদ রয়েই গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক পত্রে ‘আপনার অনুগত’ শব্দ এখন বশংবদের বাবা হয়ে অবস্থান করছে। কারণ অনুগত মানে বশংবদ এবং বশংবদ মানে অনুগত। অবশ্য এ অনুগত শব্দটি এখন প্রাচীন বশংবদ শব্দের ন্যায় সম্মান প্রদর্শনের জন্য লেখা হয়।
 
বসুমতী
পৃথিবীর অন্য নাম বসুমতী। সুবর্ণ অগ্নির তেজে বসুমতীর সৃষ্টি। পৃথিবী এ সুবর্ণ বর্ণ ধারণ করেছিলেন বলে তাঁর নাম হয় বসুমতী।
 
তদবির ও তকদির
তদবির আরবি শব্দ। এর অর্থ (বিশেষ্যে) সুপারিশ (চাকুরির তদবির); চেষ্টাচরিত্র, জোগাড়যন্ত্র (তদবির করো, যাতে কাজটা হয়।); প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ (তদবির না করলে তকদির মেলে না)।
তকদির আরবি শব্দ। এর অর্থ (বিশেষ্যে) ভাগ্য, অদৃষ্ট, কপাল, নসিব।
তকদির তদবিরের অনুগত সুজন।
 
 
— — — — — — — — — — — — — — — — — — —
 
 
 
লিংক: https://draminbd.com/বিন্দুবিসর্গ-বাহন-বাহিনী/

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

সূত্র পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. (প্রকাশনীয়)

error: Content is protected !!